আরেকটা নতুন বাসা ৷
অবশ্য বাসা বদলানোটা বা নতুন বাসা আমার কাছে আর নতুন বিষয় নেই ৷ ছোট থেকে বেশ কবার বাসা বদলিয়ে বদলিয়ে রীতিমত অভ্যস্ত হয়ে গেছি ! কখনো পাশের জেলায়, কখনো বা অনেক দূরে, কখনোবা একই শহরে - সব ধরনের বাসা বদলের অভিজ্ঞতাই হয়ে গেছে আমাদের ৷ প্রথম প্রথম একধরনের স্মৃতিকাতরতা কাজ করতো ৷ আস্তে আস্তে সেসব হাওয়া হয়ে গেছে ৷ তাই খুব একটা গায়ে লাগছেনা আর ৷
এ মাসেই উঠলাম ৷ স্বাভাবিক ভাবেই এখনও পুরোপুরি গুছিয়ে ওঠা হয়নি ৷ বেশ বিরক্তও লাগে, এবারের ছুটিটাও গেলো এসব ধানাই পানাইয়ে ৷ যাহোক, মজার ব্যাপার হল আমাদের বাসা ভাগ্য বেশ ভাল ! ছোটবেলায় একটা বাসায় ছিলাম যেটা আসলে মেস মত, ফলে একলাইনে তিনটে রুমের পাশ দিয়ে লম্বা একটা বারান্দা— সাক্ষাৎ ক্রিকেট পিচ ! ফলাফল— জানালার পাল্লাগুলো, আর বারান্দার বাল্ব গুলোর নিয়মিত বদল ! পরের দিকেও যেসব বাসায় উঠেছি এমনকি ঢাকা শহরেও, বেশ আলো হাওয়া-পূর্ণ ঝকঝকে নতুন বাসা ৷ যে বাসাটা ছাড়লাম ওটাও প্রথমে ভালই ছিল— পুর্ব—দক্ষিণে খোলা ৷ পরে অবশ্য দক্ষিণ দিকটা বন্ধ হয়ে যায় ৷ কিন্তু এইবার আর নিস্তার পাওয়া গেলো না ৷ ঢাকা শহরে বসবাসের আসল মজাটা এবার পেতেই হল ৷ তিন রুম, ড্রয়িং, ডাইনিং ৩টা বাথ - সচরাচর যা হয় আর কি ৷ কিন্তু এইবার একটু নতুন নতুন ব্যাপার ঘটছে ৷ আমার জন্য যে ঘরটা জুটেছে সেটায় দিনের বেলায়ও বাতি জ্বালিয়ে রাখতে হয়, বাতাসের কথা বাদ-ই দিলাম ৷ এসি-আইপিএস ওয়ালা লোকও আমরা না ৷ এমন অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয়নি ৷ আগের বাসাটায় আমার রুমটার সাথে একটা বারান্দা ছিল ৷ বারান্দার কাঁচটা সারাক্ষণ হা করে খুলে রেখে ঘরটা ধুলো করার জন্য সবসময় মা এর বকাঝকা শুনতে হত ৷ এমনকি ঝড়ের সময়ও আমি যতটুকু সম্ভব কাঁচটা খোলা রেখে দাঁড়িয়ে থাকতাম ! আর এবার— চারদিক বন্ধ স্তব্ধ একটা ঘর ৷ চোখ মেলে তাকালে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কিছু দেয়াল শুধু দৃষ্টিসীমাকেই রুখে দাঁড়ায় না যেন মনের জানালাটাও এক ঝটকায় বন্ধ করে দিতে চায় ৷ ভীষণ মন খারাপ করা একটা ব্যাপার ৷ কিন্তু কিছুই করার নেই ৷ নিজের বিছানায় শুয়ে ঐ দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি শুধু একটা শব্দই দেখতে পাই, লাল কালি দিয়ে সারা দেয়ালজুড়ে বড় বড় করে যেন লেখা আছে— "বাস্তবতা" ৷
এ বাড়ির একটা ঘরেই একটু আলো বাতাস ঢোকে ৷ যেটাকে আমি নবাবী করে 'একটু' বলছি সেটা আসলে ঢাকা শহরে 'অনেক' ! সেই ঘরটা স্বাভাবিক ভাবেই মা-বাবার জন্য ৷ বাড়িতে থাকেন আসলে ঐ দুটি প্রাণিই ৷ আমার ছুটি আর বড় ভাই তার কর্মস্থলে ৷ সে যাইহোক, একটু আলো বাতাসের জন্য যখন মন আঁকু-পাঁকু করে তখন ঐ ঘরটাই আমার সম্বল ৷ মে মাসের ভ্যাপসা গরমে, ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘন্টায় ঘন্টায় বৈদ্যুতিক পাল্সে অতিষ্ট হয়ে আমরা একটু বাতাসের জন্য ঐ রুমটায় বসি ৷ রুমটার সাথে একটা বারান্দা আছে দক্ষিণ দিকে ৷ কিন্তু একে ঠিক "দখিণের বারান্দা" বলার কোন উপায় নেই ৷ চারপাশের প্রায় গা-বেয়ে ওঠা বিল্ডিংগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণার দিকে দুটো প্লট খালি আছে ৷ না, খালি না বলে 'এখনও ভরেনি' বলা বোধ হয় ভাল ৷ তো ঐটুকু নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে ৷ অবশ্য খুব বেশিদিন যে ঐ জায়গাটুকুও খালি থাকবেনা তা বলার অপেক্ষা রাখেনা ৷ আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুনে দেখেছি ঐ একটুকু কোণা দিয়েই প্রায় ১২টা বিল্ডিং এর চেহারা দেখা যায় যাদের কোনটাই ছয় তলার কম না ৷ আর আমরা থাকি ৪ তলায় ৷ তো এরকম এক বারান্দায় আজ আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম ৷ খুব বাজে রকমের গরমের মধ্যে যথারীতি বিদ্যুৎ এর ঘন্টাখানেকের ব্রেক ৷ সাথে যোগ হয়েছে প্রকৃতির 'সবকিছু আটকে যাওয়া' ভাব ৷ মনে হচ্ছে কেউ যেনো তার গলাটা দুহাতে খুব জোরে টিপে ধরেছে, সে নিঃশ্বাস নেবার জন্য হাঁসফাঁস করছে কিন্তু আজব ব্যাপার হল সে মরছেও না আবার সে দু-হাত সরছেও না ৷ এক অন্তহীন যন্ত্রনা ৷ পুরোটাই অনুভব করছি পুরো মাত্রায় ৷ বারান্দার কোণাটায় দাঁড়িয়ে- একটুকু খোলা জায়গাটায় মধ্যে দিয়ে একটুকু আকাশের দিকে তাকিয়ে ৷ নিঃশ্বাস আটকে থাকায় যে মুখটা কালো হয়ে গেছে তা বেশ দেখা যাচ্ছে ৷ খুব কষ্ট হওয়ার কথা, কিন্তু ঐ কালো মুখটুকু দেখে আমার কেন জানি খুব ভালো লাগলো ৷ মনের মধ্যে একটু আশা জাগলো ৷ এবার হয়তো হাত দুটো সরবে, প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেবে প্রকৃতি- সে নিঃশ্বাসের তোড়ে চারিদিকে ধুলো উড়বে ৷ তারপর মুক্তির কান্না সব ধুয়ে মুছে দেবে ৷ সেই অপার্থিব মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম বোধ হয় ৷ এমনি সময় হঠাৎ, পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিংগুলোর মধ্যে দিয়ে কোথা থেকে জানি একদল ঠান্ডা বাতাস নিঃশব্দে এসে আমাকে ছুঁয়ে গেল ৷ পরম স্বস্তির আনন্দে একটুক্ষণের জন্য আমি ভুলে গেলাম আমি কোথায় আছি কি করছি সমস্ত কিছু ৷ বাতাসের দলটা চলে যেতেই আবার সেই পুরোনো ভ্যাপসা ভাবটা জেঁকে বসলো ৷ কিন্তু আমি হারিয়েই থাকলাম ঐ একটুকু সময়ের ছন্নছাড়া বাতাসের দলটার মাঝে ৷ মনে হল ওরা যেন আমার চেনা কেউ ৷ যেন কোন দূর অতীতের একান্ত সঙ্গী ৷ আস্তে আস্তে মনে পড়লো সব, পরিষ্কারভাবে ৷
এই মাসখানেক আগেই আমার পরীক্ষা চলছিল ৷ হলে ছিলাম ৷ হলেও আমার রুমটা ৪তলায় ৷ পুর্ব দিকের আমগাছটা রুমের ভিতর দিয়ে বাতাস বইতে দেয় না ৷ অবশ্য হলে আর আমাকে বারান্দায় যেতে হয়না ৷ সামনেই খোলা ছাদ ৷ ইচ্ছে হলেই দুদন্ড জিরিয়ে নেয়া যায় ৷ অবশ্য ক্লাস চলাকালীন সময়ে খুব একটা বসাও হয়না ৷ তো যখনকার কথা বলছি তখন চৈত্র মাস, ভরা বসন্ত, বৈশাখি প্রস্ততি চলছে ৷ সাথে পরীক্ষার প্রস্তুতিও ৷ অবশ্য একটা কথা অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে- আমরা আসলে পরীক্ষার সময়ই খুব আরামে থাকি ৷ খুব ফুরফুরে মেজাজে ৷ কারণটাও খুব স্পষ্ট— পুরো সেমিস্টারের ধকল এক লম্বা পিএল-এ কাটিয়ে উঠে প্রায় এক সপ্তা পর পর ধীরে সুস্থে পরীক্ষা ৷ শুধু পরীক্ষার আগের দিনটাতে সবার চেহারা একটু পাল্টে যায়— ওটুকু তো স্বাভাবিক ৷ তো এই সময়টায় খুব স্বাভাবিকভাবেই রাত জাগার অভ্যেস হয়ে যায় ৷ মোটামুটি ৩/৪টা তো বাজেই ৷ কিন্তু এটা ভাবার কোন কারণ নেই সেটা পড়ার জন্য ! পড়া যখন শেষ হওয়ার তখন শেষ হয়েছে, বাকিটা ফুর্তি ! একেক জনের একেক ধরন ৷ কেউ কম্পিউটারে সিনেমা দেখে, কেউ পুরান ঢাকায় খাওয়া দাওয়া আড্ডাবাজি কেউবা তাসের আসরে ! এসবই কিন্তু রাত ২/৩টের কথা— যারা হলে থাকেননি তাদের জন্য বলছি ৷ তো যাহোক আমার রূটিন ছিল- পড়াশুনা শেষ করে আমি আর আমার এক বন্ধু রাত্রিকালীন ভ্রমণ ও খাওয়া দাওয়ার জন্য বের হতাম ৷ কাছেই একটা হোটেল আছে সারারাত খোলা থাকে ৷ ওখানে কিছু-মিছু খেয়ে একটু হাঁটাহাঁটি ৷ মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে শহীদ মীনারে গিয়ে কিছুক্ষণ বসা ৷ যারা বসন্তের রাতে দুটো-আড়াইটার সময় শহীদ মীনারে বসেননি তাদের বলি- আপনারা বড় হতভাগা ! যাহোক, হাঁটাহাঁটির পর দুজন দুজনের হলে ফিরে যেতাম ৷ কিন্তু আমি আমার রুমে যেতাম না, আমি গিয়ে বসতাম আমাদের ছাদটায় ৷
প্রায় তিন বছর হল হলটাতে আছি ৷ এই ছাদেও এসেছি বহুবার ৷ কিন্তু ঐ সময়ে ঐ ছাদ ছিল সম্পুর্ণ অন্য কিছু ৷ ছাদটার ঠিক উত্তর-পশ্চিম কোণায় একটা চেয়ার পাতা আছে ৷ অবস্থান থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে মুখটা কোনদিকে— পুর্ব-দক্ষিণে, এসময়ের বাতাসটা ওদিক থেকেই আসে ৷ চেয়ারটার সামনেই একটা ভাঙ্গা চৌকি পড়ে আছে ৷ আসলে পড়ে নেই- ওটা ওভাবেই রাখা হয়েছে, চেয়ারটায় বসে আয়েশ করে ওটার ওপর পা-টা রাখার জন্য ৷ যেই রেখে থাকুক তার রুচির প্রশংসা করতে হয় ৷ তো, রাত আড়াইটার দিকে ওখানে গায়ের গেঞ্জিটা খুলে পা-দুটো ভাঙ্গা চৌকিটার উপর রেখে ঐ চেয়ারটায় বসার সাথে সাথে এক অদ্ভুত অতিপ্রাকৃত অনুভূতি আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলত ৷ পুর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে ছুটে আসতো রীতিমত উন্মাদ এক বাতাসের দল ৷ ওরা ছিল ছন্নছাড়া, ভীষণ দুরন্ত আর সেকি দোর্দন্ড প্রতাপ ৷ অহংকারে, দম্ভে ভারি রাজকীয় ভাব ছিল সে বাতাসের ৷ আবার একই সাথে ভারি কোমল ছিল ওরা ৷ নাহ, বোধ হয় ভাষা হার মানছে, নয়তো আমি ৷ ঐ এলোমেলো ছন্নছাড়া বাতাসগুলো খুব উচ্ছৃংখল, উদ্ধত ভাবে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তো আমার মুখে, বুকে, গলায়, ঘাড়ে সর্বত্র ৷ যেন কাড়াকাড়ি করে চুমো খেত সবাই ৷ আমি অনুভুতির পূর্নতায় প্রশান্তিতে চোখদুটো বুঁজে ফেলতাম ৷ আর অস্তিত্বের সবটুকু দিয়ে অনুভব করতাম বেজায় দুরন্ত সেই বসন্তের বাতাসের কোমল আদর ৷ বাতাস কি শুধুই বাতাস ? সে কি সাথে করে নিয়ে আসেনি প্রকৃতির সুর ? এলোপাথাড়ি বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দের সাথে গাছপালার পাতাগুলোর সরসর শব্দ এক অপূর্ব সুর মূর্ছণা তৈরি করে যা শোনা যায় শুধু মনের কান দিয়ে ৷ কখনো চোখ খুলে আকাশের দিকে তাকালে কেমন জানি একটা অনুভুতি হত ৷ ওখানে বড় বড় দালানকোঠা নেই ৷ উন্মুক্ত স্বাধীন আকাশ ৷ সেই আকাশে কিছু এলোমেলো মেঘ থাকে ৷ যারা একটুর জন্যও দাঁড়াতে পারেনা ৷ খালি ছুটে বেড়ায় ৷ এতো ছুঠে ওরা কোথায় যায় তা আমরা জানিনা ৷ বাতাসের দলটার ওপর ওদের খুব আস্থা ৷ হায় ! ওরা তো মানুষ না ৷ কিসের আশায় পাগলের মত ওরা ঐ বাতাসের পিছু ছুটছে তা কেউ জানেনা, কিন্তু তাদের ঐ পাগলের মত বিরামহীন ছোটাছুটি আমাকে একটুর জন্য হলেও অন্যমনস্ক করে দেয় ৷ মেঘেদের এই বাধাহীন বয়ে চলার দৃশ্যটা কেন জানি আমার মধ্যে একধরণের বেদনাবোধের জন্ম দেয় ৷ হয়তো নিজের আপাত অসাড়তা, হয়তো ওদের সাথে হারিয়ে যাওয়ার নিতান্ত ছেলেমানুষী ইচ্ছে, হয়তোবা মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর কোন যন্ত্রনার হঠাৎ বেরিয়ে আসা ... কিছু একটা আমাকে আনমনা করে তুলতো ৷ ঐ একটুখানি সময়ে হঠাৎ করে মানুষের নিদারূন অসহয়াত্বটা খুব স্পষ্ট করে চোখের সামনে চলে আসতো ৷ নিজেকে ভয়াবহ নিঃস্ব, একা এবং খুব দুর্বল একজন মানুষ মনে হত ৷ কিন্তু পরক্ষণেই একটা দমকা বাতাসে সব বেদনা, সব নিঃস্বতা, রিক্ততা ধুয়ে মুছে যেত ৷ এক অনাবিল প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়তো সারা শরীর জুড়ে ৷ তখন খুব ভাল লাগতো ৷ যাকে সত্যিকার অর্থেই 'ভাল লাগা' বলা যায় ৷ একদম নিঃষ্পাপ, ফুরফুরে, সদ্য জন্ম নেয়া মানব শিশুর মতই নিশ্কলঙ্ক আর পবিত্র মনে হত নিজেকে ৷ চোখের সামনের সব কিছুকেই ভালবাসতে ইচ্ছে করত ৷ আমার বেশ মনে আছে ঠিক ছাদটার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ঝাকড়া চুল-অলা নারিকেল গাছটাকে অনন্তকালের কোন প্রাণপ্রিয় বন্ধু মনে হত ৷ তার সাথে একটা কথাও বিনিময় হয়নি কখনো, তারপরও যেন খুব কাছের লোক সে ! রাতের পরিবেশের এমন অপরূপ স্নিগ্ধতা পরিপূর্ণভাবে প্রস্ফুটিত হয় বোধ করি এই বসন্তে ৷ আমার একটুও উঠতে ইচ্ছে করতো না ঐ চেয়ারটা ছেড়ে ৷ মনে হত যদি অনন্তকাল এভাবে বসে থাকতে পারতাম তবে আর কিছুর দরকার হতো না আমার বেঁচে থাকবার জন্যে ৷ মাঝে মাঝে সাথে থাকা মোবাইলটায় খুব ধীরে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজতো—
কোন সুদূর হতে আমার মন মাঝে
বাণীর ধারা বহে
আমার প্রাণে প্রাণে
আমি কখন শুনি না যে
কখন কি যে কহে আমার কানে কানে ...
এমন অপূর্ব জগৎ আমি আগে কখনো দেখিনি ৷ এটা যে পৃথিবী, বা পৃথিবীটা যে এরকম তা আগে কখনো অনুভব করিনি ৷ জীবনে অনেক বসন্ত এসেছে, কিন্তু 'বসন্ত' শব্দটার পেছনে যে রঙিন, প্রগাঢ় অনুভুতিটুকু মেশানো থাকে তা আমাকে আগে কখনো ছোঁয়নি ৷ বাতাসেরও যে একটা সমুদ্র হয় আর সে সমুদ্র যে এতো মোহনীয় তা আমি আগে কখনো বুঝিনি ৷ এতটা বাঁচতে ইচ্ছে হয়নি কখনো ৷ এতটা মরতেও ইচ্ছে হয়নি কখনো ৷ এতটা সম্পূর্ণ মনে হয়নি কখনো নিজেকে ৷ এতটা অসহায়ও বোধহয় হইনি কখনও ৷ কখনোবা জোছনায় আবার কখনোবা আবছায়া আলোয় দেখা রাতের অপার্থিব পৃথিবীটাকে কখনও এমন আপন করে দেখা হয়নি ৷ পুরনো, ভাঙ্গা, বেঁকে পিছনে হেলে পড়া, একটা জীর্ণ চেয়ারকে স্বর্গীয় সিংহাসন মনে হয়নি আগে কখনো ৷ নিজের শরীরের প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, প্রতিটা অণু-পরমাণুতে এতটা গভীর প্রাণের আহ্বান পাইনি কখনো ৷ হারিয়ে যাওয়ার এমন তীব্র নেশা আমাকে কখনো আসক্ত করেনি ৷ নিতান্ত নিঃস্বতার মাঝে এমন রাজকীয় ঐশ্বর্য আমি আগে কখনো আবিষ্কার করিনি ৷ একাকীত্নের এমন বিশালতাও ছিল আমার ধারনার বাইরে ৷ শুধু একটা বোধ কাজ করছিল সব সময়— "বসন্ত" ৷
কারেন্ট এসেছে ৷ বারান্দা থেকে বেরোবার সময় হঠাৎ কি মনে করে একবার পিছনে ফিরে তাকিয়েছিলাম ৷ হয়তো আরো একবার আরো একটুখানি বাতাসের জন্য ৷ না, ওরা আসবেনা আর ৷ বসন্তের সাথে সাথে ঐ ছন্নছাড়া বাতাসের দলও চলে গেছে বছরখানেকের ছুটিতে ৷ যে এসেছিল সে ওদেরই কোন পথভোলা সাথী ...
_______________________________________________________________
পাদটীকাঃ এই লেখাটি লিখবার কিংবা "বসন্ত" কে অনুভব করবার পেছনে আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর "বসন্তের বাতাস" ও "বাতাসের সমুদ্রে" গদ্য দুটি ৷ সময় করে পড়ে নেবার অনুরোধ রইলো ৷
মন্তব্য
তারা দেয়া নিয়ে আমার তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই, অর্ঘ্য।
কিন্তু এই লেখাটা পড়ে মনে হচ্ছে, দুহাত ভরে অনেক অনেক অনেক তারা যদি দিতে পারতাম...
প্রচন্ড ভালো লাগলো।
...........................
একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা
...........................
একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা
আপনার ভালো লাগার 'প্রচন্ডতা' ছুঁয়ে গেল আমাকেও ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
বস কি বর্তমান বুয়েটিয়ান না কি ??? কোন হল ?? আপনের লগে পরিচিত হওন দরকার...
সায়ীদ স্যারের 'ওড়াওড়ির দিন ' পড়তেসিলাম কিছু দিন আগে। উল্লেখিত গদ্যদ্বয় পড়ি নাই...
_________________________________________
সেরিওজা
_________________________________________
সেরিওজার গল্প
হুমম ... সবচেয়ে পুরনো, ছোট্ট যে হলটা !
আমি অবশ্য পড়েছি "রৌদ্র ও প্রকৃতির কাব্য" থেকে ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
ভাল লাগল
-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'
-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
- লেখাটা পড়ে মনে হলো আপনার দেখার চোখ না কেবল, অনুভব করারও ইন্দ্রিয় আছে। এই ইন্দ্রিয় থাকলে মরুভূমিতে বসেও প্রাণের স্পন্দন অনুভব করা যায় অনায়াসেই। আফ্রিকার ধূলি-ধূসর প্রান্তরে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে দারুণ প্রেমের গল্প লিখে ফেলা যায়!
___________
চাপা মারা চলিবে
কিন্তু চাপায় মারা বিপজ্জনক
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকাণ্ড । বিএসএফ ক্রনিক্যালস ব্লগ
ওটুকুই তো সম্বল ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
হ। আপনে বড়ই সোন্দর লিখসেন।
দেশের গ্রীষ্মকাল মনে পড়ে গেল।
কৌস্তুভ
লেখা দারুণ লাগলো।
বাড়ি পাল্টানোর নাম শুনলেই আমার কান্দা পায় এখন। পণ করেছি, আর বাড়ি পাল্টাবো না
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল
সুন্দর। মুগ্ধ হলাম। এরকম দেখার চোখ আর অনুভূতি প্রকাশের হাত থাকা ভাগ্যের কথা! আরো লিখে যাবেন।
---মহাস্থবির---
আশা রাখি ... ধন্যবাদ
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
এত চমৎকার কিভাবে লেখেন আপনি?
আজব!
______________________________________
যুদ্ধ শেষ হয়নি, যুদ্ধ শেষ হয় না
______________________________________
যুদ্ধ শেষ হয়নি, যুদ্ধ শেষ হয় না
আমি তো লিখিনি ... কেবলই বলেছি
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
ভীষণই ভালো লাগলো!
আপানার ভালো লাগাটা আমারও ভালো লাগল
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
জীবনে বাড়ি বদলেছি সাকুল্যে একবার,
দেখতে দেখতে নয় মাস কেটে গেলো তো..
রোজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পুরনো বাড়িটার জন্যে কি যে মায়া লাগে!!!
________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"
________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"
"তুই রে বসন্তসমীরণ,
তোর নহে সুখের জীবন।।"
খুব প্রিয় এই গানটা মনে করিয়ে দিল আপনার লেখাটা।
খুব খুব ভাল লাগল পড়তে
ও গানতো কখনো শুনিনি
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
------------------------------------------------------
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক ... খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ ...
নতুন মন্তব্য করুন