লাগামহীন পাগলা ঘোড়া

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি
লিখেছেন ইস্কান্দর বরকন্দাজ [অতিথি] (তারিখ: সোম, ১১/০৭/২০১১ - ৯:০০অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমার পাগলা ঘোড়ারে, কই থেইকা কই লইয়া যাও...

পাগলা ঘোড়াতুল্য দ্রব্যমূল্য। লাগাম হয়তো আছে, কিন্তু সেটা দুপাশে আটকানো নয়। ফলে,“কই থেইকা কই, ছুটছোই”। ঠেকিয়ে রাখবে কিংবা রুখবে, কার সাধ্য! আরাধ্য হলেও অবাধ্য। প্রাকৃতিক দূর্যোগ, আন্তর্জাতিক বাজার, বাজেট, রমজান, ঈদ, হরতাল ইত্যাদি উপলক্ষ্য। লক্ষ্য, এ সুযোগে টু’পাইস্ কামানো। কামান দাগানো। যত কষ্ট, সাধারণের জীবন ধারণের। দ্রব্যমূল্য ধাবমান, লাভবান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

জনজীবনে প্রাকৃতিক দূর্যোগ যোগ হওয়া মানে সুযোগ সেই সিন্ডিকেটের। সাপ্লাই বন্ধ। এই উছিলায় বাড়াও দাম। বাজেট মানেই জেট এর গতিতে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়া। ঘোষণার আগে আগেই। আমি বুঝিনা, যদি এইসব দ্রব্যের উপর সরকার কর বাড়ায়, তবে সেটা কি পরিমান বাড়ায় যে প্রতি এককে(কেজি/লিটার ইত্যাদি) এত বেশি বেড়ে যায়। হিসাব মেলে না, গোলমেলে লাগে। বাজেটে যে সব পণ্যের উপর থেকে কর কমে যায়, তাদের কিন্তু দাম কমে না। একটুও দমে না তারা।

উপলক্ষ্য রমজান, পাগলা ঘোড়া কি কম যান! কম যান না মোটেও। মুটিয়েই যান মোটামুটি। আমাদের সর্বশান্ত করতে তার এই অশান্ত আচরণ। ভালো খাওয়াতো দুরে থাক, মন্দ খাওয়া জোটানোও মুশকিল। ঈদ। আনন্দের উপলক্ষ্য। যতটা না আমাদের জন্য, তারচেয়েও বেশি সেই সিন্ডিকেটের জন্য। দাম বাড়াও। পাবলিকের তো কিনতেই হবে। উপায় নাই। হরতাল হলেতো কথাই নেই। সাপ্লাই নিয়ে ঘাপলা-ই। দাম বাড়ুক। বাড়তে বাড়তে আকাশে উঠুক। আমরা চেয়ে থাকি, আর না খেয়ে থাকি।

মজার ব্যাপার হল, যে জিনিসের দাম একবার বাড়ে, তা আর কমতে চায় না। কে চায় নিজের দাম কমাতে! দ্রব্যের একটা মান-সম্মান আছে না!

শায়েস্তা খাঁর আমলে নাকি টাকায় আট মন চাল পাওয়া যেত। এখনও পাওয়া যায়, তবে সেটা টাকার অংকে হলে পকেট ফাঁকায় গিয়ে দাঁড়ায়। ভাগ্য ভালো এখনো হাজারে আছে, তবে লক্ষই লক্ষ্য। সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আট মন চাল পেতে শায়েস্তা খাঁর রাজকোষের সমস্ত অর্থের সমপরিমান ব্যয় করতে হবে।

এক পরিচিতের সাথে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন আছেন?”। বললেন,“আছি, কোনরকমে শুধু উইকেটটা বাঁচায়া”। এই বাজারে চরম দুঃখের মাঝেও হাসি পেল। উইকেট, মানে জীবনটা কোন রকমে বাঁচিয়ে থাকতে পারাটাই যোগ্যতা, বিশাল যোগ্যতা। “অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, তেলাপোকা টিকিয়া আছে। টিকিয়া থাকাটাই চরম স্বার্থকতা”। তেলাপোকারা(!) মানে আমরাও টিকিয়া থাকবো। দাম বাড়াও। তোমরা দাম বাড়াও। রক্তচোষারা, চুষে নাও আমাদের।

প্রশ্ন হচ্ছে, কি করছে সরকার? কি করা দরকার? কেন পাগলা ঘোড়ার লাগাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না? পারবে কিভাবে? সর্ষের ভেতরেই যে ভূত। সরকারে কতজন রাজনীতিবিদ আর কতজন ব্যবসায়ী, হিসেব করে দেখুন। সুস্থ রাজনীতি তো সেই কবেই এই অসুস্থ ব্যবসার কাছে বিকিয়ে গেছে। লঙ্কায় যে যায়, সেই রাবন। সরকারে যে যায়, সে-ই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে নাম লেখায়। নচিকেতার মত বলতে হয়, “আমরা সব খোদার খাসি যাবই ফাঁসি...”।

মাস শেষে যে ক’টা টাকা মাইনে পাই, তাতে আর কুলোচ্ছে না। সাধ-আহ্লাদ শিকেয় তুলে দিয়েছি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কে যেন বলেছিলেন, জনসাধারণ আর পাবলিক এক জিনিস না। নিজেকে এখন আর জনসাধারণ মনে হয় না, পাবলিক পাবলিক লাগে। আর, পাবলিকের মাইর...

ইস্কান্দর বরকন্দাজ
একজন সাধারন মানুষ। অতিসাধারন।


মন্তব্য

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

আগামীকাল সকালে বাজারে যেতে হবে ভাবলে রাতে ঘুম আসে না...

কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই... লাগামছাড়া

শুধু দ্রব্যমূল্য আর যানবাহন খরচের এই উর্ধ্বগতির জন্য আমজনতাই রাস্তায় নামবে সরকার পতনে... কিচ্ছু করার নাই

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

ভাই, বাজারের কথায় মুখ ব্যাজার হয়ে যায়। সেদিন বাজারে গিয়ে মেজাজ এত খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, আপনাআপনি গালিগালাজ বের হয়ে এল মুখ দিয়ে। ওদেরতো কিছু হলনা, মাঝখান থেকে নিজের পাপের বোঝাটা ভারী হয়ে গেল। তারপর এই প্রতিবাদ লিখলাম...

তানিম এহসান এর ছবি

নিজের বাড়ীর দেয়ালতো ভেঙেছে সেই কবে, পাশের বাড়ীর দেয়ালে ঠকঠকাচ্ছি আমরা, সেই পাশের বাড়ীর মানুষেরা টেরই পায়না যে আমরা ধাক্কাই, তারাও তাদের পাশের বাড়ীর দেয়ালে যেয়ে ঠেকেছে। একদিন সব বাড়ীর দেয়াল ভেঙে পড়বে ...

ভাই, খুবই বিক্ষুব্ধ কয়েকটা দিন ধরে, রাতে ঘুমাতে পারিনা, কাল রাতে মাকে জীবনে এই প্রথমবারের মত বললাম ভালো নাই, আমার মা, বাবা, একমাত্র বোনটা এখন আমারে নিয়া টেনশনে আছে। ।

আমি সারাদেশ ঘুরি চাকুরীর কারনে, ইদানীং প্রতিদিন অন্তত একবার কাউকে না কাউকে শুনি মোবাইলে সাইদী হারামজাদার ওয়াজ শোনে, সেইদিন নিজেরে ঠিক রাখতে না পেরে ঢাকায় একজনরে বললাম “ওই মিয়া রাজাকারের বাচ্চার সাউন্ড পাইতেছি, পিটায়া হাড়চামড়া এক কইরা ফালামু”, সে সুড়সুড় করে চলে গেলো, বলে দুই মিনিট দেরী নাই, দেখি আরেকজন শুনতেছে। জাহাঙ্গীরনগরে নিজের হাতে পিটায়ে যেই শিবির বের করছিলাম তাদের মধ্যে অন্তত দুইজনকে চিনি বর্তমান আমলে বিরাট ক্ষমতা, তাদের একজন আমারে বলছে কি শোনেন, “তহন কইছিলামনা, আবার দেখা হবে, দেখা হবে!”

আমারতো ভাই দুইচাইরটারে নিয়া মইরা যাইতে ইচ্ছা করে, বাচতে আর ইচ্ছা করতাছেনা

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

সান্তনার ভাষা নেই...

নাম নাই  এর ছবি

তানিম এহসান, আপনার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে বিক্ষুব্ধ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের সবার জীবনেই কমবেশি এরকম সময় আসে কিন্তু, আবার চলেও যায়। সুখের সময় যেমন চিরকাল থাকেনা, কষ্টের সময়ও না। সময় বদলায়। আর ওদের দু চারটেকে নিয়ে মরে কি আদৌ কিছু লাভ হবে ? একটা দুটো মশা মাছি মেরে কি লাভ হয় ? বরং টিকে থাকতে হয় শক্ত পায়ে। তবেই না একবারে দু চারটে মেরেই মরে না যেয়ে, রোজ দিন গোটা চারটে কে মারবার সুযোগ পাওয়া যায় !
ভালো থাকুন হাসি

তানিম এহসান এর ছবি

কে সান্তনা দিয়ে যায়!! পরিচিতিপর্বতো হলোনা!

তিথীডোর এর ছবি

যে জিনিসের দাম একবার বাড়ে, তা আর কমতে চায় না।

শুধু মানুষের জীবনের কোন দাম নেই। অ্যাঁ

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

ঠিক...

মর্ম এর ছবি

এখনো অতিথি লেখক হিসেবে লিখছেন, কিন্তু দুয়েক প্যারা না পড়তেই ঠিক বুঝে নেয়া যায় যে বরকন্দাজ সাহেব হাজির। শিবরামের একটু আধটু পরশ টের পাওয়া যায়, পড়তে তাই আরামই লাগে।

এ লেখাতেও ব্যতিক্রম কিছু হয় নি।

অট: একটা কথা না বলে পারছি না। আপনার পছন্দ হবে না হয়ত, তবুও বলি।

যখনি আপনার লেখা পড়ি, নামের নীচের দুটো লাইন বেশ ধাক্কামত দেয়।

লেখক হিসেবে আপনি স্বাধীন, যেভাবে আপনি লিখবেন তা-ই ঠিক হয়ত, কিন্তু পাঠক কীভাবে নিচ্ছেন সেটাও বোধ হয় হিসেবে রাখাটাই দস্তুর।

বাকিদের কথা জানি না, আমার এ দুটো লাইন কেন পছন্দ না সেটা বলি, বাকিটা একান্তই আপনার ব্যাপার।

১। কেন জানি না কথাগুলোকে আরোপিত মনে হয়। একই কারণে অস্বস্তি লাগে একটু।

২। পাঠক হিসেবে আমি যখন পড়ছি তখন ব্যক্তি ইস্কান্দর বরকন্দাজের লেখা পড়ছি না আমি, লেখক ইস্কান্দর বরকন্দাজের লেখা পড়ছি। কাজেই ব্যক্তি বরকন্দাজ সাহেব সাধারণ নাকি অসাধারণ সে চিন্তা আমার কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। আর যদি লেখক সত্তার কথাই ধরি, বরকন্দাজ সাহেব সাধারণ না অসাধারণ তা তো পাঠকেরই ঠিক করার কথা, তাই নয় কি?

৩। ব্যক্তি হিসেবে আপনি কেমন তা আপনি নিশ্চিতভাবেই ভাল জানেন। এটা চেনা অচেনা আধাচেনা সবাইকে জানানো খুব কি জরুরি? লেখক তাঁর লেখার গুণেই আলাদা হবেন, ওটা আলাদা করে বলে দিতে হবে কেন?

আপনার লেখা ভাল লাগে বলেই এতগুলো কথা বলে ফেললাম, আশা করি ভুল বুঝে বসবেন না।

লেখা চলুক, শুভেচ্ছা।

~~~~~~~~~~~~~~~~
আমার লেখা কইবে কথা যখন আমি থাকবোনা...

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

আন্দাজেই টের পান দেখছি বরকন্দাজ হাজির। ধন্যবাদ।

২নং ম: উ:
বাপ্রে, আমার লেখা যে এতটা ‘মর্মস্পর্শী’ হবে বুঝতে পারিনি। আশালতাও একদিন একথা বলেছিলেন।

লেজখানাই কেটে ফেলতে হবে দেখছি। আরেকখানা লেজ নামের শেষে জুড়ে দিলে কেমন হয়-“একজন ম্যাঙ্গো পাব্লিক”। না, থাক। আবার সে Co-লেজে কলজে শুকিয়ে যাবার জোগাড় হবে। (কাস্টমাইজ্ড হতে হতে আবার না নিজেকেই হারিয়ে ফেলি। কি আর করা, পাঠক ঠকানো যাবে না।)

লিখেছি প্রতিবাদ। কিন্তু দৃষ্টি তার প্রতি বাদ দিয়ে অন্য দিকে দিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আফসোস।

মৌনকুহর. এর ছবি

ইস্কান্দর ভাই, আপনি যে 'সিরিয়াস' বিষয়েও সাবলীল, সেটা প্রমাণিত হল। হাততালি

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

নাহ, সিরিয়াস বিষয়ে ছন্দের ব্যবহার বন্ধ করে দেব ভাবছি। সিরিয়াস বিষয়ে ছন্দের ব্যবহার মনে হচ্ছে লোকজন হালকাভাবে নেয়।

মৃত্যুময় ঈষৎ এর ছবি

ইস্কান্দর ভাই, আপনি ভালো লেখেন, আসলেই পড়লে বোঝা যায় এটা আপনার লেখা...................আর মর্ম ভাইয়ের এই কথাটা আমিও অনুরোধ করলাম বিবেচনা করার জন্য "আর যদি লেখক সত্তার কথাই ধরি, বরকন্দাজ সাহেব সাধারণ না অসাধারণ তা তো পাঠকেরই ঠিক করার কথা, তাই নয় কি?"

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

বিবেচনা করলাম, সেইসাথে অনুরোধে ঢেঁকি গিললাম। গলায় না আটকালেই্ হল। চোখ টিপি

JP এর ছবি

লেখকদের এই এক সুবিধা । যা উপলদ্ধি করেন তা চট করে প্রকাশ করতে পারেন । কিন্তু আমরা তো ভাই ”পাবলিক”! আমরা এটা করতে পারিনা । তাই ক্ষোভটা নিজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে । লেখা অনেক ভাল লেগেছে । ধন্যবাদ রম্যরচনার বাইরে কিছু লেখার জন্য ।

ইস্কান্দর বরকন্দাজ এর ছবি

আমার কলমটা এই পাবলিকের জন্যই। ধন্যবাদ।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।