মরতে এসে আজরাইলও জান ফেরত দিলে বিপাকে পড়ে গেলো গোরখোদক ঠান্ডু মিয়া। নগরীর সবগুলো গোরস্তানে তার যাতায়াত। ঝড়বৃষ্টি বাদলা যে কোন দিনে আধঘন্টার মধ্যে কবর খুঁড়ে লাশের জন্য ঘর তৈরী করা তার জন্য নস্যি। জীবনে যতবার কবরে নেমেছে অতবেলা ভাতও খায়নি পেট ভরে। আজরাইলের সাথে পরিচয়টা বহুকাল আগেই। দেখতে দেখতে মুখ চেনা হয়ে গেলে যা হয়, আজরাইলের সুনজরে থেকে এত দুর্যোগ, এত মহামারী, এত ভয়াবহ দুর্ঘটনা কোন কিছুই তার সাতাশি বছর বয়সী শরীরকে কাবু করতে পারেনি। কোন মাটিতে কিরকম বিছানা দরকার হয় মুর্দার, কোন আবহাওয়ায় কিরকম বাঁশ কাটতে হয়, সবকিছু নখদর্পনে তার।
শুরু হয়েছিল চৈতন্যগলির এক টিলাময় কবরসস্থান থেকে। বাবা মারা গেছে জন্মের পরপর। মায়ের কাছে ছিল। একদিন দেখলো মাও তাকে রেখে অন্যপারে। সেই প্রথম আজরাইলের নাম শোনে। বারো বছর বয়সে। খুব রাগ হয়েছিল আজরাইল লোকটার উপর। এতটা নির্দয়। দুনিয়াতে দেখার কেউ নেই এরকম একজনকে পিতামাতাহীন করা।
রাগ করে সে গোরস্থানে চলে আসে আজরাইলকে খুঁজতে। জিজ্ঞেস করবে কেন সে এরকম অন্যায় করলো। যেখানে মাকে মাটিচাপা দিয়েছিল বস্তির দয়ালু লোকেরা সেখানে গিয়ে বসে থাকে। কিন্তু আজরাইলের সাথে দেখা হয় না তার। আজরাইল তার কাছ থেকে দূরে থাকে লজ্জায়।
মা মরার পর বস্তির লোকেরা তাকে ভাত খাইয়েছিল দুদিন। কিন্তু কদিন খাওয়াবে বাইরের লোক। তিনদিন যেতেই যে পাড়াতো খালা, "আয় কাদিস না, আইজ থেকে তুই আমার পেটের সন্তান, আমার কাছে খাবি" বলে বুকে টেনে নিয়েছিল, দেখা গেল দুপুর হলেই দরোজা বন্ধ তার।
"ভাইফুত ন কান্দিস, আঁরা থাইকতে তোর খন অসুবিধা নইবো", বলে যে পাড়াতো চাচা তাকে ঘরে নিয়ে মুরগীর ঝোল দিয়ে পরোটা নান খাইয়েছিল সেদিন, সেই চাচা তাকে দেখে চিনতে পারে না কদিন বাদে। আস্তে আস্তে পাড়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলে সে খিদের সময় কবরস্থানে গিয়ে বসে থাকে। মায়ের কাছে ভাত খোঁজে।
মা তাকে একেকদিন ব্যবস্থা করে দেয় একেকভাবে। প্রতিদিন কেউ না কেউ মরে। লোকজন দল বেধে খাটিয়া নিয়ে আসে গোরস্থানে। লাশ কবরে নামিয়ে চলে যাবার সময় তাদের পিছুপিছু মৃতদের বাড়ী গিয়ে দরজার বাইরে মলিন মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে ঠান্ডু।
এরকম বাড়িগুলোতে লোকজনের কলিজা থাকে নরম থাকে কদিন। মলিন চেহারার দরিদ্র লোকদের খুব কদর তখন। প্রায়ই খাওয়া জুটে যায় তার। এভাবে একেকদিন একেক বাড়ীতে ভোজন করে, রাতে স্টেশানের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে ঘুমোয়। যদি কোন দিন কেউ মারা না যায়, সে একটু বিপাকে পড়ে।
একবার পরপর তিনদিন কোন লাশ এলো না। সে কি কষ্ট তার। ভিক্ষা করার অভ্যেস না থাকলেও মাজারের পাশে বসে গিয়েছিল। বহু কষ্টে তিনটা দিন পার করার পর চতুর্থ দিনে যখন খাটিয়া মাথায় টুপিওয়ালা লোকদের আসতে দেখলো দূর থেকে, তখন ঈদের আনন্দে সে দৌড়ে কবরস্থানে পৌছে যায়। কিন্তু এলোমেলো ছুটতে গিয়ে পা হড়কে ঢুকে যায় পাশের পুরোনো একটা কবরে। মাটি নরম হয়েছিল বৃষ্টিতে, কোমর পর্যন্ত দেবে যায়। লাশ দাফন করতে আসা লোকজন হায় হায় করে তাকে তুলে নেয়।
কে একজন বললো, "কবরে টানছে তারে"। কথাটার মানে মউত টানছে। ভয় পেয়ে গেল সে। পাশেই মার কবর। মা কি তাকে ডাকছে কবরে? মাকে খুব ভালোবাসলেও মায়ের এরকম ডাক তার ভালো লাগলো না।
আরেকজন সদয় কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, "কী করো তুমি"?
সে মুখ ফসকে বলে ফেলে, "কবরের কাজ করি।"
শোনামাত্র দাফন করতে আসা লোকজন তাকে কবরের কাজে লাগিয়ে দিল অন্যদের সাথে। সেদিন আর পরবর্তী চারদিন তাকে খাওয়া নিয়ে ভাবতে হলো না। কিছু টাকাও পেল বকশিশ।
জীবন নতুন পথে হাঁটতে শুরু করে সেদিন থেকে। মুর্দার আগেই কবরে নেমে কবর ঠিক করা, মাটির অবস্থা বুঝে ফিনিশিং লাইন টানা, মুর্দার গায়ে যেন মাটি না পড়ে সে ব্যবস্থা করা, কবরের উপর লাগানো ফুলের চারায় পানি দেয়া ইত্যাদি কাজ করে সে মোটামুটি ভালো আয় করতে থাকে। কিন্তু পরবর্তী পঁচাত্তর বছর যে তার কবরের সাথে কাটবে সেটা কল্পনাও করেনি তখন।
ফুলমতীর সাথে সংসারের ৬০ বছর পেরিয়েছে। কিন্তু দুজন একা রয়ে গেছে। সন্তানের বাবা-মা হতে পারেনি অজ্ঞাত কারণে। বংশরক্ষার কোন সম্ভাবনা নেই। ঠান্ডু মিয়া ছাড়া ফুলমতীকে দেখাশোনা করার কেউ নেই। বুড়ো বয়সে দুজন দুজনকে আগলে রাখে একরকম। ফুলমতীর মুখের কথা ফুলের মতোই নরম, এখনো মুগ্ধ হয়ে যায় ঠান্ডু মিয়া। কখনো কাঁটার ছোঁয়া পায়নি কথার মধ্যে।
কিন্তু আজ সকালে হঠাৎ কি মতিভ্রম হলো?
ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে রান্নাঘরের দিকে যাবার সময় ঠান্ডু মিয়ার হাতে লেগে ফুলমতীর বড় শখের কাঁচের গেলাসটা ঠক্কাস করে মেঝেতে শুনে গুড়ো হয়ে গেলে ফুলমতীর মুখে হঠাৎ একটা বিস্ফোরন ঘটলো, "মিনসের মিনসে মরণও হয় না তোর, চোখের মাথা খাইছস? আমার এত সাধের গেলাসটা ভাইঙ্গা দিলি? দুর হ আমার সামনে থেকে........"ইত্যাদি আরো অনেক অকথ্য গালিগালাজ।
ফুলমতীর মুখ দিয়ে এরকম অপ্রত্যাশিত গালিগালাজ ঠাণ্ডু মিয়াকে স্তদ্ধ করে দিল। রাগে অপমানে এক কাপড়েই ঘর থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় চলে এলো। ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চতুর্দিক। শহর এলাকার একটা বাস আসতেই কিছু না ভেবে উঠে বসলো বাসে। পেছনের সীটে হেলান দিয়ে বসে রইলো। কোথায় যাবে জানে না। কিন্তু এই জায়গা ছেড়ে, এই দুনিয়া ছেড়ে, এই জগত ছেড়ে তার নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল সেই মুহূর্তে। বাসটা তাকে যেখানে খুশী নিয়ে যাক। বাসটা চলতে চলতে গিয়ে থামলো পতেঙ্গার শেষ মাথায় সব যাত্রী নেমে যাবার পর ঠাণ্ডু নামলো। সামনে কর্নফূলীর মোহনা। অদূরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ দেখা যাচ্ছে।
সোজা সমুদ্রের দিকে হাঁটতে লাগলো নেভী রোড ধরে। জেদের তেজে এত জোরে হাঁটছিল যেন কোন জরুরী কাজে যাচ্ছে। লুঙ্গি শার্ট ভিজে সপসপ করছে হাঁটার তালে তালে। বাতাস আছে প্রচুর। বুড়ো হাড়ে কনকন করে বিঁধছে বৃষ্টির ছাঁট। প্রবল বৃষ্টির তোড়ে চোখে ঝাপসা দেখছে সে। কিন্তু অপমানের জ্বালা তার চেয়েও বেশী। তাই কোন দুর্যোগ তার চামড়ায় আঘাত হেনে সুবিধা করতে পারলো না।
কিন্তু সে সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে কেন? মরতে হলে রেল লাইন সবচেয়ে সোজা। এদিকে রেল লাইন নেই। কাছাকাছি জায়গার মধ্যে স্টীলমিল বাজার পর্যন্ত রেল লাইন আছে, কিন্তু ওই পথে রেল চলেনি বহুবছর। ভুল রাস্তায় চলে এসেছে। কদমতলী রেলক্রসিংএর দিকে যাওয়া দরকার ছিল। এখন ফিরে যাবার ভাড়াও পকেটে নেই। দশটাকা খরচ হয়ে গেছে আসার পথেই। মরতে গেলে তাকে আরো পনেরো টাকা যোগাড় করতে হবে। কে দেবে টাকা? ভিক্ষা করার উপায় নেই এদিকে এই সময়ে।
ধুশশশ.....খিদেও পেয়ে গেছে আবার। সকালে খাওয়া হয়নি এই ক্যাচালে। খিদে পেটে মরতেও কেমন লাগছে।
বেশী ভাবলো না। পাশের একটা মসজিদের দানবাক্স দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল। মসজিদের টাকার উপর পরকালের হক আছে। সে তো পরকালেই চলে যাচ্ছে খানিক বাদে। যাবার আগে না হয় কিছু এডভান্স নিয়ে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দানবাক্সের তালায় একটা মোচড় দিতেই তালাটা ঠুস করে খুলে গেল।
কতটাকা আছে গোনার সময় নাই। বেশী হবে না। দু'পাঁচ টাকার নোটের সাথে কিছু চকচকে কয়েন। সবগুলো মুঠোর মধ্যে নিয়ে লুঙ্গির গিটের ভেতর রেখে দিল। তারপর জোর কদমে হাঁটা শুরু করলো জাইল্যা পাড়া বাস স্টপেজের দিকে। আঠারো নম্বর পৌঁছালে দোকানপাট মিলবে। দুটো তেলে ভাজা গরম পরোটা আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের ঘ্রানটা নাকে আসতেই খিদেটা আবারো বজ্জাতি শুরু করলো পেটের ভেতর। কিছুদূর গিয়ে একটা ঝুপড়ি দোকান পেয়ে পেটপুরে চা পরোটা ভাজি খেয়ে নিল।
খিদেটা মরার পর রাগটা চাঙা হলো আবার। আজকে মরতেই হবে। স্টেশানে না গিয়ে কাছে ধারে মরার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে ভাবতে থাকলো সে মরার পর ফুলমতী কি করবে? খবর পেয়ে কিরকম ভেউ ভেউ করে কাঁদবে, সকালের গালাগালির জন্য কিরকম অনুতপ্ত হয়ে মাথা কুটবে মেঝেতে, এই দৃশ্যটা তাকে বিপুল আনন্দিত করলো। মরতেও সুখ সুখ লাগছে।
এসব ভাবতে ভাবতে বৃষ্টির ছাঁট উপেক্ষা করে হাঁটতে থাকলো ঠান্ডু। এখানে ব্যবস্থা না হলে স্টেশান রোডেই চলে যেতে হবে। সামনে একটা আম গাছ দেখে ওটা থেকে ঝুলে পড়া যায় কিনা দেখার জন্য দাঁড়ালো।
ঠিক তখনই পাশের বিরাট উচু ইউক্যালিপটাস গাছটার মধ্য দিয়ে একটা বিদ্যুতের রেখা হাজার ওয়াটের বালবের মতো আলো জ্বালিয়ে গাছটাকে ফড়ফড় করে দুভাগে ফেড়ে দিল এবং অবাক হবার আগেই আকাশ ভেঙ্গে একটা মহাজাগতিক গর্জন নেমে আসলো। বুঝতে পারলো বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে সে।
দুপুরের পর জ্ঞান ফিরলো হাসপাতালের মেঝেতে। মরেনি সে। কয়েক সেকেন্ড পর বুঝতে পারলো কাজটা কতো লজ্জাজনক হয়েছে। সে পরিষ্কার দেখেছে বজ্রপাতে গাছটা কেমন দুই ফাঁক হয়ে গেছে। কিন্তু গাছটার এত কাছে থেকেও সে বেঁচে থাকলো কিভাবে। নিশ্চয়ই আজরাইলের কারসাজি। খাতির করে তার প্রাণটা নিয়ে যায়নি। ফুলমতীকে মুখ দেখানোর উপায় কী এখন?
একটা নার্স সামনে আসলে সে ডাক দিয়ে কিছু একটা বললো। কিন্তু কন্ঠটা তার নিজের কানেই গেল না। সমস্যাটা বুঝতে পারলো না সে। নার্সও মুখ নাড়ছে, কিন্তু সে কিছু শুনতে পাচ্ছে না। পুরা কবরের নিস্তব্ধতা। আশেপাশে কেউ কোন কথা বলছে না। সবাই চুপচাপ মুখ নাড়ছে, ফিসফিস করছে যেন।
অনেকক্ষণ পর সে বুঝলো, আজরাইল তার প্রাণ নেয়নি, কিন্তু কানটা নিয়ে গেছে। ফুলমতীর আর কোন কটুবাক্য তার কানে বিদ্ধ হবে না কোনদিন। এবার তাহলে বাড়ি ফেরা যায়?
কোমরের কাছে হাত দিয়ে লুঙ্গির খুঁটে পয়সাগুলোর অস্তিত্ব পেল। ভাবলো, পরকালের হিসেব থেকে নেয়া এই ক্ষুদ্রঋনের কি ব্যবস্থা হবে?
মন্তব্য
বেশ অভিনব। পড়ে ভালো লাগলো।
আনিসুলপনা | বরাহশিকার ♪♫ | কালাইডোস্কোপ
নতুন মন্তব্য করুন