নীড়পাতা | সন্দেশ | লিংকস | আড্ডাঘর

Primary Links:

‹ পুরোনো ব্লগসব ব্লগনতুন ব্লগ ›

আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বিষয়ে গৌতম ভদ্র এর আলোচনা


লিখেছেন ইমরুল হাসান (তারিখ: বুধ, ২০০৭-১০-২৪ ১৫:৩৪)
ক্যাটেগরী: |

আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বিষয়ে গৌতম ভদ্র এর আলোচনা

“জাতি বলুন আর সমাজই বলুন, তাহাকে জাতীয় ভাষার সাহিত্য হইতে জীবনীশক্তি ও উহার আদর্শ খুঁজিয়া লইতে হইবে, জাতীয় ভাষার সাহিত্য হইতে রাসকর্ষণ করিতে হইবে, নচেৎ তাহার উন্নতি অসম্ভব। কেবল দুই-চারি জন শিক্ষিত ব্যক্তি লইয়া কিছু জাতি বা সমাজ হয় না, আপামর সাধারণ, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকলকে লইয়াই জাতি বা সমাজ গঠিত হয়। জাতীয় বা সমাজ দেহের অণুতে পরমাণুতে পর্য্যন্ত প্রবাহ সৃষ্টি করিবার একমাত্র উপায় মাতৃভাষা।”

“দেশপ্রচলিত আপামরসাধারণের বোধ্য ও নিত্য-ব্যবহৃত জীবন্ত ভাষাই সকল জাতির জাতীয় ভাষা হওয়া উচিত। তাহা হইলেই সেই জাতি সেই ভাষার সাহায্যে উন্নতির দিকে অগ্রসর হইতে পারে।”

“একমাত্র জাতীয় সাহিত্যের অভাবেই বঙ্গীয় মুসলমান-সমাজ আজও ‘যে তিমিরে সে তিমিরে’ রহিয়া গিয়াছে, এবং আরও বহুদিন এভাবে থাকিবে, তাহাতে আর সন্দেহ হইতে পারে না।”

- মুনশী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, বাংলার মুসলমানগণের মাতৃভাষা

১. বহি-বৃত্তান্ত

মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বিষয়ে আলোচনা করছেন গৌতম ভদ্র, ব্যাপারটা দেইখাই প্রথমে চমকাইয়া উঠলাম। কি এর কারণ? কি এই বৃত্তান্ত? বইটার নাম “মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও আত্মসত্তার রাজনীতি”। বইটা প্রকাশ করছে সংহতি, গত সেপ্টেম্বর মাসে। এটা মূলতঃ গৌতম ভদ্রের দেয়া একটা ভাষণ এর একটা পরিবর্ধিত রূপ। ভাষণটা তিনি প্রথম পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ-অধ্যয়ন কেন্দ্রের আমন্ত্রণে ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৩ সালে। এরপর আরো দুই একটা জায়গায় তিনি এটা পড়ছেন এবং ছাপাও হৈছে দুই একটা পত্রিকায়। আর এই বহিখানার সংযোজন হিসাবে আছে মুনশী আবদুল করিম এর লিখা একটা প্রবন্ধ।

২. দ্বন্দ্ব ও বিষাদ: জাতীয়তাবাদের আইকন

ভাষণটার প্রথম বাক্যটাই একটা প্রশ্নরূপে বিষাদবয়ান। “আজ থেকে কত শত আলোকবর্ষ দূরে বাস করেন মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ?” এই বিষাদে আমিও ভাবতে শুরু করি, আসলেই তো তিনি কত যুগ আগে ছিলেন; তার নাম পড়ছিলাম, স্কুলের কোন পাঠ্যপুস্তকে হয়তো। তিনি আজ কই?

কিন্তু কয়েক লাইন পরেই আবার বিস্মিত হই, গৌতম ভদ্রের স্টেটমেন্ট এ। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ জাতীয় ‘আইকন’ বলেই স্বীকৃত, তার জীবনপন্ঞির নানা ঘটনা সুপরিজ্ঞাত, এমনকি জন্মের সাল নিয়েও বির্তকটির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে শুনতে পাই।” আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বাংলাদেশের জাতীয় আইকন? কবে? কিভাবে? পাঠ্যপুস্তকের কোণা কানচিতে তাকে স্থান দেয়া গেছে বলেই কি তিনি ‘আইকন’ হয়া যাইতে পারছেন! বর্তমান বাংলাভাষায় বা বাংলাভাষায় সাহিত্যসংস্কৃতিচর্চায় তার নাম বছরে কয়বার উচ্চারিত হয়? কিভাবে তার অবদান প্রভাব রাখে? এইসব প্রশ্নগুলি সামনে আনলে আইকন হিসাবে কি তাকে স্বীকার করা যায়? (গেল হয়তো ভালোই হৈতো।) কোন বিচারে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে বাংলাদেশের আইকন বলেন গৌতম ভদ্র, তার ভিত্তি আমার কাছে অস্পষ্ট লাগে। বরং বাংলাদেশের সংস্কৃতিচর্চার প্রেক্ষিতে তাকে এখনো আমার মনে হয়, প্রান্তিক একটা চরিত্র। আমার মনে হওয়ার ভিত্তি অবশ্যই একাডেমিক কোন ব্যাপার না, যেখানে বাংলাসাহিত্যের ছাত্রদের হয়তো তার উপর একটা গোটা কোর্স পড়তে হয়, তারে নিয়া হয়তো নানা গবেষণাপত্র লিখার ভিতর থাকে তারা; কিন্তু এই একাডেমির বাইরে, তিনি কে? কি তার সিগনিফিকেন্স?

৩. পাটাতনের বয়ান

তিনি পুঁথি-সংগাহক। গৌতম ভদ্র বয়ান করেন যে, বাঙালির সংস্কৃতিমনস্কতার এক বিশেষ পর্যায়ে ও সময়ে বাংলা পুথির সংগ্রহরীতির অভ্যাসটি গড়ে ওঠে এবং পুথিমনস্কতার ধরনধারণ এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ফল। এই পুঁথি সংগ্রহটাকে গৌতম ভদ্র তুলনা করছেন বর্তমান সাইবার স্পেসের সাথে বই এর টিকে থাকার লড়াইয়ের সাথে। (এই উপমা নিয়া কথা বলার অবকাশ আছে।) সময় তখন উনিশ শতকের গোড়ার দিকে। ভারতজুড়েই বিভিন্ন ভাষার এই প্রক্রিয়া দেখা যাইতেছে, যা প্রাচ্যবিদ্যারই একটা অংশ বলে তিনি উল্লেখ করছেন। তো আবদুল করিম এর আলোচনার দুইটা দিক এর কথা তিনি প্রথমেই বলে নিচ্ছেন; এক. আবদুল করিম এর লেখালেখির মধ্যে পাশ্চাত্যবিরোধিতার কোন উপাদান পাওয়া যায় না এবং তার কাজ প্রাচ্যবিদ্যার না, বরং সেইটা কেবলই বাংলা পুথিচর্চা। আরো ব্যাপার হচ্ছে, তার চর্চাটা কোন প্রাতিষ্ঠানিক কোন জায়গা থেকে না। তার সময় এমন একটা সময়, যখন প্রাচ্যবিদ্যার নানাবিভাগগুলি স্পষ্ট হয়া উঠতেছে, তখন শখের চর্চা ক্ষেত্র থেকে আবদুল করিমের মতো ব্যক্তিত্ব নিজের মতো করে পেশাদারিত্বের মোকাবিলা করছেন।

এই প্রেক্ষাপট থেকে গৌতম আবদুল করিম কে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদে আইকন বা প্রতীকী চরিত্র হিসাবে উল্লেখ এর কারণ ব্যাখ্যা করেন, তার দ্বন্দ্ব (দ্বন্দ্ব বিষয়ে ভারতচন্দ্রের ছত্র: ‘কুকথায় পন্ঞমুখ কণ্ঠভরা বিষ। কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।’) বা যুগল সর্ম্পক এর আবিষ্কারকে। যেখানে, সমগোত্রর দ্বিত্বের বেড়াজালেই তো মুনশী আবদুল করিমের চিন্তা তথা সমাজমানস আবদ্ধ, নিজের কালে ও সমাজে দ্বন্দ্ব বৃত্তির নানা পরিসর খোঁজা ও প্রকাশ নির্ণয় করাই যেন তাঁর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অর্থাৎ, আমি পাঠ করি যে, বাঙ্গালী মুসলমানের অবস্থান নিয়াই তিনি ভাবিত ছিলেন এবং এই অর্থে তার যে আত্মসত্তার রাজনীতি, তা হৈতেছে বাঙ্গালী মুসলমানেরই। তাই তিনি এর আইকনরূপে বিবেচ্য। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের কর্মকান্ডে এই আইকন এর উপস্থিতি বা উপলদ্ধির যে বিচার সেই বিষয়ে আমার ধারণা স্পষ্ট হয় না। তিনি আইকনরূপে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য এবং তিনি আইকন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত: এই দ্বন্দ্বটাই সম্ভবত এরপরও জারি থাকে।

(গৌতম ভদ্রের আলোচনা চিন্তা উদ্রেককারী। খুবই ডিটেইলসে তিনি পুরা বিষয়টাকে তুলে ধরছেন। কিন্তু আমার লেখাটা অসর্ম্পূণ। তার প্রথম দুইটা চ্যাপ্টারের ফলো-আপ।

বইটা পড়ার পরপরই, আলোচনাটা মনে ধরে এবং মনে হয় এই নিয়া কথা বলার আছে। কিন্তু অন্যান্য অনেক কাজের মতো অসম্পূর্ণ করে রাখি। আসলে সময় নিয়া বিষয়গুলির ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনও ফিল করি। যেমন ধরেন, যেখানে জ্ঞান সবসময়ই একটা একাডেমিক বিষয়, সেখানে আবদুল করিম এর অ্যামেচার চেষ্টাগুলি কিভাবে গৃহীত হয়? এমন তো না যে, তার জ্ঞানচর্চার প্যার্টানটা প্রধান ধারা হয়ে উঠতে পারছে, বরং আগে যেমন পাশ্চাত্য ভাবধারার আধিপত্য এবং বিবেচনাবোধ হাজির ছিল, এখনো তো তারই বিবর্তিত রূপ হাজির আছে; সেই অর্থে, তার অবস্থান কি প্রান্তিক হয়া থাকে কিনা, এইটা একটা চিন্তা। আবার ‘আইকন’ বিষয়টা, কাকে আমরা বলবো জাতীয়তাবাদের আইকন? সন্দেহ নাই, তার পুঁথি-আবিষ্কার বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিচর্চাতে বাঙ্গালী মুসলামনদের জায়গাটাকে এক্সপ্লোর করে; কিন্তু পরিচয় এর যে দ্বন্দ্ব হিন্দু ও মুসলমান এবং বাঙ্গালী ও মুসলমান সত্তায় তার যে বিচার আবদুল করিম এর, তা কি এখন মিমাংসিত? এইসব কিছু . . . মানে, বইটা চিন্তার উদ্রেক করে, যাকে আমি আমার অবস্থান থেকে আলোচিত হওয়াটা জরুরি মনে করি . . . যারা ঢাকায় থাকেন, পড়ে দেখতে পারেন বা যারা পড়ছেন তাদের চিন্তাটা জানতে পারলেও ভাল্লাগবে. . . একটু সময় করেই পুরাটা নিয়া আবার বসবো হয়তো . . . )


গড় রেটিং
( ভোট)
লিখেছেন ইমরুল হাসান (তারিখ: বুধ, ২০০৭-১০-২৪ ১৫:৩৪)
উদ্ধৃতি | ইমরুল হাসান এর ব্লগ | ৫টি মন্তব্য | ১৪১বার পঠিত

Views or opinions expressed in this post solely belong to the writer, ইমরুল হাসান. Sachalayatan.com can not be held responsible.

হাসান মোরশেদ এর ছবি
১ | হাসান মোরশেদ | বুধ, ২০০৭-১০-২৪ ১৬:৫৭

অতিকথন ।
আপনার লেখা নয়,গৌতম ভদ্রের মন্তব্য । হয়তো ভালো হতো,কিন্তু হয়নি । আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ বাঙ্গালদেশের সাহিত্য আইকন হয়ে উঠেননি ।
পুঁথিসংগ্রহের মতো গুরুত্বপুর্ন কাজ করা ছাড়া তাঁর নিজস্ব কাজের কোন খবর পাওয়া যায় কি?
-----------------------------------
মানুষ এখনো বালক,এখনো কেবলি সম্ভাবনা
ফুরোয়নি তার আয়ু


ইমরুল হাসান এর ছবি
১.১ | ইমরুল হাসান | বিষ্যুদ, ২০০৭-১০-২৫ ০৯:৫২

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পুঁথি-সংগ্রহটাও একটা বিশাল কাজ, এই অর্থে যে, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে মুসলামনদের যে অবদান তাকে তিনি তুলে ধরছেন, আলাওল এর সাহিত্যকর্মগুলি তিনি প্রকাশ এবং প্রচার করছেন, এইভাবে বাঙ্গালী মুসলামান যে অচ্ছুৎ কেউ না, সেইটাকে এস্টাবলিশ করার চেষ্টা করছেন। তার আত্মসত্তার যে রাজনীতি, তা বাঙ্গালী মুসলামনের জাতীয়তাবাদের পক্ষে। তার এই প্রচেষ্টা মহৎ এবং গুরুত্বপূর্ন বলে আমারও মনে হৈছে। তার সর্ম্পকে জানার আগ্রহ বাড়ছে।

কিন্তু গৌতম ভদ্র তার সিগনিফিকেন্স তুলে ধরতে গিয়া যে প্রসঙ্গগুলি আনছেন, তাতে অনেককিছু ঝাপসা, যার দুই-একটা জায়গা আমি বলার চেষ্টা করতেছি। দেখা যাক, পুরাটা বলা গেলে, হয়তো একটা চেহারা দাঁড়াবে, আমার বক্তব্যটার।

. . . . . . . . .
ভ্রমণ বিলাসী হও, কাতর হয়ো না


ফারুক ওয়াসিফ এর ছবি
২ | ফারুক ওয়াসিফ | বুধ, ২০০৭-১০-২৪ ১৭:৪৩

দারুণ বিষয়ে হাত দিয়েছেন। এই গর্তে মস্ত বড় সাপ আছে। আরো একটু এগোলে সঙ্গে পাবেন।
হাসান মোরশেদ যে অর্থে বাতিল করেছেন কিংবা গৌতম যে অর্থে বলেছেন তার সঙ্গে আত্মা আলাদা করতে দোষ নাই। কিন্তু দীনেশ সেন এবং আব্দুল করিম যে ‌‌"জাতীয় সাহিত্য" বাসনা করেছেন এবং তার সুলুক দিয়েছেন, তার সঙ্গে বাংলার কোন জাতীয় সাহিত্য মেলে?
যদি না মেলে তাহলে আত্মপরিচয়ের রাজনীতির এক পরাস্থ ধারার পক্ষে তিনি আইকন হতেই পারেন। তবে সেই অর্থে, যেই অর্থে চর্যাপদ দেখিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীরা বাংলা ভাষার হাজার বছর আবিষ্কার করে উদীয়মান জাতীয়তাবাদকে সহায়তা করেন ঠিক সেই অর্থেই আব্দুল করিম পুরানা বাংলা সাহিত্য তথা পুঁথি এবং দীনেশ সেন গীতিকার প্রস্তাব করে সাহিত্যের অন্য দিশা নির্দেশ করেন। এখানেই বিষয়টা রাজনীতির, মানা না মানার নয়।


ইমরুল হাসান এর ছবি
২.১ | ইমরুল হাসান | বিষ্যুদ, ২০০৭-১০-২৫ ১২:২৯

আবদুল করিম এর সাহিত্য এবং রাজনীতি’র বিষয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষন আছে লেখাটাতে . . . সাহিত্য-রাজনীতি এবং জ্ঞান-পদ্ধতি, এই দুইটা জায়গাতেই আগ্রহ আছে আমার . . . যা-ই হোক এই লেখাটা এবং বিষয়গুলি যে জরুরি . . . এই উপলদ্ধিটাই শেয়ার করতে চাইছিলাম, এইখানে . . .

. . . . . . . . .
ভ্রমণ বিলাসী হও, কাতর হয়ো না


হাসান মোরশেদ এর ছবি
৩ | হাসান মোরশেদ | বুধ, ২০০৭-১০-২৪ ২০:২১

তাহলে আরেকটু এগিয়ে যাক ।
-----------------------------------
মানুষ এখনো বালক,এখনো কেবলি সম্ভাবনা
ফুরোয়নি তার আয়ু


নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ফায়ারফক্সান » কেন?

লগইন করুন