| ‹ পুরোনো ব্লগ | সব ব্লগ | নতুন ব্লগ › |
[সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ লিখতে গিয়ে টের পাই নাই কিন্তু পরে দেখলাম অনেক বড় হয়ে গেছে, পড়তে পড়তে ঘুম আসলে গাইল্লাবেন না আগেই বলে রাখলাম
]
১ ...
কানাডায় আসলাম পাঁচ মাস পার হয়ে গেল ... যদিও পাঁচ মাসে পড়ালেখার অগ্রগতি একেবারে শূণ্য, কিন্তু সেটা নিয়ে দুঃখ করে আর কি হবে, দুঃখ করার মত অনেক বড় বড় জিনিস আছে ... যেমন এই পাঁচ মাসে পিচ্চি উলফভিল আর দুইএকবার হ্যলিফ্যক্সে একটু উকিঝুঁকি মারা ছাড়া আর কোথাও যাওয়া হয়নি ... কানাডার শহর সম্পর্কে আমার জ্ঞান একেবারেই কম এখন পর্যন্ত ...
এইবার অবশেষে একটা সুযোগ পাওয়া গেল ... লতাপাতার এক রিলেটিভ আছে মন্ট্রিল, প্রতি সপ্তায় একবার করে দাওয়াত দেন, কিন্তু তাঁদের সঙ্গ কেমন উপভোগ্য হবে সেটা নিয়ে কিঞ্চিত সন্দেহ থাকায় বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পিছলে যাই ... এইবার দাওয়াত কবুল করে ফেল্লাম, কারণ আরেক কাজিনও আসবে ভ্যাঙ্কুভার থেকে কনফারেন্স করতে, তার সঙ্গ একেবারে খারাপ হওয়ার কথা না ...
দাওয়াত তো কবুল করলাম, কিন্তু ট্যাকের অবস্থা করুণ এজ ইউজুয়াল, গুগোল ম্যাপ বললো উলফভিল টু মন্ট্রিল চোদ্দশো কিলোর মত, এয়ার কানাডা বললো আপডাউন লাগবে সাড়ে তিনশো, আমার ক্রেডিটকার্ড নাই এখনো, একজনের সাথে কথা বলে ম্যানেজ করে একদিন পরে আবার লগিন করে দেখি ভাড়া ততক্ষণে সাড়ে চারশো ছাড়িয়ে গেছে ... ধুর খেলব না ...
বাসে খোঁজ নিলাম, গ্রে হাউন্ডের ওয়েবসাইট স্টার্ট ডেট রিটার্ন ডেট প্রেফারড টাইম অরিজিন-ডেস্টিনেশন সব ইনফরমেশন নিয়ে এভেইলেবল ফ্লাইট বের করার কথা বলে হাত-পা-ছড়িয়ে মারা গেল ... এরর ফোর-জিরো-ফোর প্লীজ ট্রাই এগেইন লেটার ... কেমন লাগে! [মজার ব্যপার হল, গ্রে হাউন্ড কানাডার ওয়েবসাইট এখনো ঠিক হয়নি, এত বড় নামকরা একটা কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন হবে কেন বুঝলাম না ...]
নেটে কায়দা করতে না পেরে ফোন করলাম ... মহেশ নামে এক ভারতীয় ছেলে একেবারে আমাদের স্কুলমাস্টারের ইংরেজী নিয়ে জানাল নোভা স্কশিয়ায় গ্রেহাউন্ড চলে না, কিন্তু তাতে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নাই, কারণ অন্য কোন কোম্পানীর বাস যায়, সেই বাসের টাইমিং, স্টপেজ সব সে এক মিনিটের মধ্যে জানিয়ে দিল ... আর ভাড়া ... স্টুডেন্ট হিসাবে দশ পার্সেন্ট ছাড় পাওয়া যাবে, তাতে ট্যাক্স-ফ্যাক্স দিয়ে আসে আড়াইশোর মত, আমি যা আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশি ...
মহেশ সাহেবের সাথে কথা বলে একটু মুগ্ধ এবং একটু আনন্দিত হলাম ... মুগ্ধতার কারণ এদের প্রফেশনালিজম ... গ্রেহাউন্ড আর একাডিয়ান লাইন আলাদা দুইটা কোম্পানি, এক কোম্পানি আরেক কোম্পানির সম্পর্কে এত বিশদ তথ্য না দিলেও পারতো, শুধু নাম জানানোটাই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু এরা তাও জানায় ... শুধু এই এক জায়গায় না, আমি আরো অনেক জায়গায় এটা খেয়াল করেছি ... এরা যে খুব বন্ধুবৎসল বা তোমাকে সাহায্য করতে সবসময় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্যপারটা ঠিক তা বলে আমার মনে হয় না, ব্যপারটা স্বাভাবিক ব্যবসাবুদ্ধি ... ভাল ব্যবহারে মুগ্ধ হলে তুমি আবার ঘুরেফিরে আসবা, ওদেরই লাভ ...
আনন্দের কারণটা আরো সহজ ... মহেশ সাহেব যদি তার এই টিপিক্যাল পাঠ্যপুস্তকের ইংরেজি দিয়ে করে খেতে পারেন, তাহলে আমাদের দেশের কল সেন্টারের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কারণ দেখি না ...
ফোন রেখে কিছুক্ষণ বসে বসে হিসাব করলাম ... প্লেনে ভাড়া বেশি যাবে, কিন্তু আমার যা অবস্থা তাতে আড়াইশো আর চারশো আসলে একই কথা, দুইটাই যোগাড় করা পেইন ... কিন্তু সবচে কাছের এয়ারপোর্ট হচ্ছে হ্যালিফ্যক্স, একশ কিলো দূরে, সেই পর্যন্ত যাওয়া-আসা একটা ভেজাল ... আর এই তিমিমাছ সাইজের দেশে লং ডিস্ট্যান্স বাস জার্নির সুযোগ খুব বেশি পাওয়া যায় না, এইবার যখন পাওয়া গেলই একটু দেশটা দেখতে দেখতে যাই এই চিন্তা করে বাসে যাওয়ার পক্ষেই ভোট দিলাম ... একটাই খালি সমস্যা, বিমানযাত্রা দুই ঘন্টার, বাস জার্নি কাগজে-কলমেই প্রায় আঠারো ঘন্টা ... এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলোতো টাইপ ...
বাসের টিকিট কাটা যায় কোথা থেকে নেট থেকে বের করলাম, সেটা গুগলম্যাপকে বল্লাম খুঁজে বের কর ... গুগলম্যাপ পুরা একটা রাস্তা পয়েন্ট করল, দুই মাইল লম্বা ... সেই রাস্তার যেকোন জায়গায় হতে পারে ... পুরা এক বিকাল হাঁটাহাটি করে খুঁজে বের করলাম, জায়গাটা আমার বাসা থেকে বড়জোর দুইশ গজ দূরে ...
বাসার সামনে থেকে বাসে উঠা যাবে এই আনন্দে নিজের বেকুবি মাফ করে দিলাম ...
২ ...
আগের রাতে শেষ মূহুর্তের জন্য ফেলে রাখা একশো একটা কাজ সামাল দিয়ে বান্দরবান-সেন্টমার্টিন-দুবাই-লন্ডন ঘুরে আসা বিশ্বস্ত ব্যাকপ্যাকে সব জিনিসপত্র ঠেসে ভরার পর (যা জায়গা হবে না তা নিব না এই নীতি কঠোরভাবে মেনে চলে) এখন ঘুমালে আর জাগতে পারব না এই আশংকায় ঘুমের চিন্তা বাদ দিলাম ... নেট আর ল্যাপটপ নিয়ে টাগুর টুগুর করে কোনরকমে সময় পার করে সকাল দশটায় জায়গামত হাজির ... (বাস স্টপ বাসা থেকে দুইশো গজ দূরে, কিন্তু কমসে কম আধাঘন্টা আগে নাকি রিপোর্ট করা নিয়ম এমন একটা নোটিশ দেখে আর রিস্ক নিলাম না) ...
এখানে স্মল টাউনে বেশিভাগ সময়ই আলাদা বাস কাউন্টার থাকে না ... রাস্তার পাশের গ্যাস স্টেশন বা ডিপার্টমেণ্ট শপের গায়ে একটা স্টিকার লাগিয়েই কাজ শেষ ... সেই নিয়মে মাডক্রীক মিনিমার্টের সামনের ফেলে রাখা কয়েকটা কাঠের বেঞ্চ হচ্ছে যাত্রী ছাউনি, আমার আগে থেকেই সেখানে এক স্বর্ণকেশী পক্কবিম্বাধরোষ্ঠিনী, এক ক্রুকাট সাড়ে ছয়ফুটি আর এক ছোটখাট চাংকু হাজির ... বলাবাহুল্য, স্বর্ণকেশীর পাশেই জায়গা নিলাম ...
বাস কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে দশটায় ... থামা মাত্র দরজা খুলে এক সুঠামদেহী ইউনিফর্মধারী অফিসার হাজির ... সুনীলের বই পড়া ছিল বলে এই ব্যাটাই যে ড্রাইভার বুঝতে অসুবিধা হল না ... দেখলাম ব্যাটা শুধু ড্রাইভারই না, সে একাধারে কুলি, টিকেট চেকার, গাইডও ... যার যার টিকেট চেকের পরে ব্যাগবোচকা হোল্ডে তুলে গম্ভীরভাবে স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে সে বাস ছাড়ল ...
হ্যালিফ্যক্স পর্যন্ত দেড়শো কিলো রাস্তা, ড্রাইভ করে সময় লাগে দেড় ঘন্টার কাছাকাছি, বাসে সেটাই আড়াই ঘন্টা ... কারণ হ্যালিফ্যক্স পর্যন্ত বাসটা প্রায় লোকাল ... প্রতি গ্রামেই থামে (এরা বলে স্মলটাউন) ... দুই চারজন বুড়াবুড়ি নাহলে আমাদের বয়সী পোলাপান ওঠে ... বাসে উঠার আগে কাউকে কাউকে দেখা যায় জড়াজড়ি করে চুমু খায় ... মনের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি ...
হ্যালিফ্যক্স পর্যন্ত বাস মোটামুটি খালি ... দুই সীট দখল করে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে থাকি ... বাসগুলি চমৎকার, আমাদের গ্রীণলাইন ভলভো টাইপ ... টিভি চালিয়ে আজিজুল হাকিম-বিজরীর অখাদ্য নাটক দেখিয়ে মেজাজ গরম করে না এই যা পার্থক্য ...
হ্যলিফ্যক্সে পা দিয়ে প্রথম যেটা দেখলাম সেটা হচ্ছে বেডফোর্ড বেসিন আর সেই বেসিনের উপরে বিশাল এক ব্রীজ ... এই শহরে আগেও দুয়েকবার পা রাখা হয়েছিল কিন্তু ব্রীজটা দেখা হয়নি ...
হ্যলিফ্যক্সে বাস বদলাতে হল ... নেক্সট গন্তব্য মংকটন, নিউ ব্রান্সউইক ...
একই বাস, তবে মানুষের চরিত্র আলাদা ... বুড়াবুড়ির পার্সেন্টেজ কম ... মেয়ে বেশি (কিন্তু আমার পাশে কেউ বসে না, শালার চেহারাটা এমনিতেই মার্কামারা, আর চুল কাটা বাদ দেয়ায় এখন তো মাঝে মাঝে আয়না দেখেই ভির্মি খাই) ... বাচ্চাকাচ্চাও আছে কিছু, কেউ কেউ শুধু মা আর দুয়েকটা ভাগ্যবান মা-বাবা দুইজনের হাত ধরে ... যেমনে পিলপিল করে মানুষ উঠছে তাতে আর আগের মত হাত পা ছড়িয়ে দুই সীট দখল করে যাওয়ার সৌভাগ্য হবে না বুঝলাম ... কে বসে কে বসে সেই জল্পনা-কল্পনা শেষ হওয়ার আগেই টাক মাথা বিশাল মোচের এক সাড়ে ছয়ফুটি এসে গম্ভীর গলা আর বেমানান রকমের অমায়িক হাসিমুখে পাশে বসার পার্মিশন চেয়ে ফেললো ... আবার দীর্ঘশ্বাস ...
বাস প্রায় ভরি ভরি আর ছাড়ি ছাড়ি অবস্থায় ডালহৌসি ইউনি পড়ুয়া একজোড়া কপোত-কপোতী লাফিয়া-ঝাঁপিয়ে বাসে উঠল ... বেচারাদের কপাল খারাপ ... কোন জায়গাতেই পাশাপাশি দুই সীট আর খালি নাই ততক্ষণে ... করুণ চোখে খানিকক্ষণ এদিক সেদিক দেখে আমার ঠিক সামনে আইলের দুই পাশে দুই জনের জায়গা হল ... দুইজনের পাশেই অন্য দুই ললনা ... খেয়াল করলাম ললনাদের কেউই সীট বদলানোর কোন অফার-টফার দিল না ... আর কপোতকপোতীর চেহারা দেখেই যদিও বোঝা যাচ্ছিল তারা খুবই মর্মাহত, কিন্তু তারাও কাউকে কোন রিকোয়েস্ট করল না ... এদেশের লোকজনের মাঝে কথায় কথায় মিষ্টিহাসি সরি-থ্যাংকু কিংবা ছোটখাট ভদ্রতা এত বেশি যে এই ব্যপারটায় বেশ অবাক হলাম ...
দেশে থাকতে বউকে নিয়ে অসংখ্যবার ঢাকা-চিটাগাং করা হয়েছে ... বাস বা ট্রেনে ... অনেকবারই পাশাপাশি সীট পাইনি, কিন্তু পাশেরজনকে “ভাই কাইন্ডলি একটু এখানে আসবেন, আমরা দুইজন একটু একসাথে যেতে চাচ্ছিলাম” বলামাত্র মুশকিল আসান ... আমাদের দেশের মানুষ গোমড়ামুখি আর খানিকটা রূক্ষ ঠিকই কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় আমরা এখনো আশ্চর্যরকম ভদ্র ... এই কপোতকপোতীকে দেখে পুরান স্মৃতি ধাক্কা দেয়ায় খুব ইচ্ছা হল নিজের সীটটা অফার করি, কিন্তু পাশের ঝাকড়ামোচকে দেখে দমে গেলাম ...
বাস এবং বাসে লেজে লেজে চলা কুরিয়ার সার্ভিস ...
৩ ...
হ্যলিফ্যক্স থেকে বাস ছাড়ার পরে বেশ খানিক্ষণ পরে পাশের মোচুয়ার সাথে আলাপ হল ... এদেশের এই জিনিসটা আমার বেশ লাগে, কারো চোখ চোখ পড়লেই হাই-হ্যালো বলে আলাপ শুরু করে দেয়া যায় ... জানা গেল ভদ্রলোক এক প্যাস্টর ... কিন্তু কাজ চার্চের বাইরে ... গৃহহীন মানুষের জন্য তার একটা অর্গানাইজেশন আছে, নাম ওপেন আর্মস ... বললাম নাম শুনলে তো গুলি করতে যাচ্ছ বলে মনে হয় ... ব্যাটা বাস কাঁপিয়ে হাসা শুরু করলো ... “হা হা আই এম এ প্যাস্টর, নাউ টেক দিস ... ঢিঁশু ঢিঁশু ...” তারপরে ব্যাখ্যা শুরু করলো, “আসলে ওপেন আর্মস মানে আমার হাত প্রসারিত ... আয় বুকে আয় টাইপ” ... আমি আলতো করে একটু সরে বসলাম, নটরডেমের মানুষ, ফাদার বিমলরে ভুলি কেমনে?
পরে মন্ট্রিল আসার পরে কাজিনের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় জানলাম ওপেন আর্মস কানাডায় অনেক নামকরা অর্গানাইজেশন ... সারা কানাডায় এদের কাজ ... এর ফাউন্ডার বাসে চড়ে চলাফেরা করে শুনে সবাই দেখলাম বেশ অবাক ...
যাই হোক, প্যাস্টর ভদ্রলোকের সাথে বেশ কথাবার্তা হল ... সে বাংলাদেশের নাম জানে ... কারণ বাংলাদেশে অনেক মিশনারী অর্গানাইজেশন কাজ করে ... কাজের সূত্রে সে ইন্ডিয়া গেছে কিন্তু বাংলাদেশ যাওয়া হয়ে ওঠেনি ... আমাকে জিগ্যেস করলো নোভা স্কশিয়ার ইউনিতে আসার পার্টিকুলার কোন কারণ আছে কিনা ... বল্লাম ফান্ড দিচ্ছে ... শুনে মাথা দোলায় “দীস ইজ দ্য বেস্ট রিজন টু কাম, আর কিছু লাগেনা ” ...
মংকটন পৌছলাম বিকাল ছয়টার দিকে ... প্যস্টর সাহেব দুই হাত ঝাঁকিয়ে বিদায় নিলেন ... “বাই দ্য ওয়ে, আয়্যাম এন্ড্রু ... ইট ওয়াজ নাইস টকিং উইথ ইউ ...” আমিও দুয়েকটা ভদ্রতার কথা বলে নতুন বাসে উঠলাম, এবার গন্তব্য ফ্রেড্রিকটন হয়ে রিভেয়ার-ডু-লুপ ...
৪ ...
এইবার বসলাম এক বুড়ি দাদীআম্মার পাশে ... এদেশে দাদীরা কথা বলতে খুব পছন্দ করে (যদিও বাড়িওলি বুড়িগুলি তুমুল ধড়িবাজ আর খিটখিটা হয়) ... এই দাদীও ব্যাতিক্রম না, কিছুক্ষণের মাঝেই তার চোদ্দ গুষ্টির খবর আমার জানা হয়ে গেল ...
অন্য পাশে এক খালাম্মা আর খালাম্মার নীলচোখা কন্যা ... খালাম্মার সাথে হাই হ্যালো হয়ে গেল কিন্তু কন্যা তো আর তাকায় না ... তবে কন্যার দিকে তাকাতে গিয়ে অন্য একটা জিনিসে চোখ পড়লো, বাসের জানালার নিচে একটা প্লাগপয়েন্ট ... বামে তাকিয়ে দেখি দাদীআম্মার পাশেও আছে ...
আর আমারে পায় কে ... লাফিয়ে ল্যাপটপ বের করে দাদীজানের ঠ্যাংয়ের নিচ দিয়ে তার নিয়ে কানে হেডফোনে সঞ্জীব চৌধুরি বাজিয়ে (একটি চোখে কাজল আর অন্য চোখ সাদা) আমার তাইরে নাইরে না অবস্থা ... আইপড নাই বলে কি গান শুনবো না নাকি ... একটু সার্চ করতেই দেখি সাত-আটটা ওয়ারলেস নেটোয়ার্কের সিগনাল ধরা যায়, বেছে বেছে একটা আনসিকিওর বের করে ফেসবুক ওপেন করে ফেল্লাম ...
একটু পরে শুনি পাশ থেকে কে জানি কোমল গলায় ডাকে ... দেখি আমার খালাতো বোন ... কি ব্যাপার? না উনি নেটওয়ার্ক পাচ্ছেন না তাই আমি কেমনে কি করলাম জানতে আগ্রহী ... বললাম অমুক নেটওয়ার্কটা সিলেক্ট কর, এইটায় পাসোয়ার্ড লাগে না ... ছেমড়ির ভরসাহারা দৃষ্টি দেখে বুঝলাম এইসব তার এন্টিনার নাগালের বাইরে ... বললাম আমারে ল্যাপ্টপটা দেও ... কিছুক্ষণ খুটখাট করে ঠিকঠিক কানেকশান যোগাড় করে দেয়া মাত্র খালাম্মা এবং খালাতো বোন দুইজনেই আমার উপর খুশি হয়ে গেল ![]()
বাকি রাস্তার বর্ণনা দিয়ে আর পাবলিকের ধৈর্যচ্যুতি করে লাভ নাই ... সংক্ষেপে শুধু বলি, বাসে আসার বুদ্ধিটা খারাপ হয় নাই ... বসে বসে বাপ্পা আর সঞ্জীবকে নিয়ে সময়টা ভালোই কাটলো ... ঘন বনের মধ্য দিয়ে বাস ছুটে চলে, মাঝে মাঝে দুয়েকটা ব্রেক দেয়, ড্রাইভার চেঞ্জ হয় তখন ... আস্তে আস্তে কড়া রোদ থেকে মিঠা রোদ তারপর লালচে বেগুনী সূর্যাস্ত আর তারও পরে বনভূমির মাঝে চুপচাপ রাত নামে ... সবাই ঝিমায় ... আশেপাশের কপোতকপোতীপূর্ণ সীটগুলি থেকে হালকা কিন্তু পরিচিত কিছু আওয়াজ আসে ... আমার হাসি পায়, এই জিনিস ঢাকা-চিটাগাং ভলভো নাইট জার্নিতেও দেখা (মানে শোনা) ...
পাশে সহযাত্রী বদলায় ... দাদীআম্মার জায়গায় আসে সদাহাস্যময় অস্ট্রেলিয়ান ট্যুরিস্ট (“ইয়াহ মাইট আই নো বাংলাদেশ, দে প্লে প্রীটি গুড ক্রিকেট”, বেঁচে থাকো আশরাফুল-মাশরাফি) ... ছোটখাটো বিড়ি ব্রেকে (আমার জন্য অবশ্য শুধু হাঁটাহাটি ব্রেক) আলাপ হয় ব্রায়ান লারার দেশের ভারতীয় বংশোদ্ভূত রোনাল্ড আর তার সুপারসেক্সি গার্লফ্রেন্ডের সাথে; সাবওয়েতে স্যান্ডুইচ কেনার ফাঁকে কংকর্ডিয়ায় পড়ুয়া নীল চুলে ঝুঁটি করা বিশালদেহী যুবক (নামটা জানা হয় নাই ছেলেটার) জানায় তার ছুটি শেষ তাই ফিরে যাচ্ছে, মাকে মিস করছে খুব, তখন মনে হয় পৃথিবীটা আসলে বেশি বড় না ...
৫ ...
মন্ট্রিলে ঢোকার মুখে সেন্ট লরেন্সের ব্রীজ ...
মন্ট্রিলে ঢুকলাম ভোর ছয়টায় ... সেন্ট লরেন্স নদীর উপরে সেই রকম বড় একটা ব্রীজ পার হয়ে ... শহরে ঢুকতেই শত শত হাইওয়ে আর ফ্লাইওভার আর টানেল দেখে আমার ভিরমি খাওয়ার অবস্থা ... তাও ভালো নিল চুলো কংকর্ডিয়ান সাথে ছিল, মেট্রো ধরতে চাই শুনে নিজেই সাথে করে বাসস্টপের উল্টাদিকের মেট্রো স্টেশনে নিয়ে কেমনে কি করতে হবে বুঝিয়ে হাত ঝাঁকিয়ে বিদায় নিল ... আমি বেকুব বাংগাল জীবনের প্রথম পাতালরেলে চড়ে রোমাঞ্চিত হওয়ার বদলে হকচকিয়ে গেলাম খানিকটা ... দুম দাম একেকটা স্টেশন আসে আর বড়জোর দশ সেকেন্ডের জন্য দরজা খোলা থাকে, নামতে একটু দেরি করলেই পরের স্টেশনে নিয়ে যাবে ... চোখমুখ কুঁচকে কামরার দেয়ালে আঁকা ম্যাপে ফ্রেঞ্চ বানানে লেখা জায়গাগুলি দেখে বোঝার চেষ্টা করছি আছি কই আর যাব কই ... সাহায্যের হাত বাড়ালেন একটুও ইংরেজি না জানা এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক ... ম্যাপের এক কোনায় হাত দিয়ে আমরা কোথায় আছি দেখিয়ে দেয়া মাত্র বাকিটা ডালভাত হয়ে গেল ... মাথা ঝুঁকিয়ে বল্লাম “মার্সি” (আমার ফ্রেঞ্চের দৌড় এদ্দুরই) ...
মেট্রো টার্মিনাল, ট্রেনের অপেক্ষায় ...
জায়গামত নেমে উপরে উঠে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি পরিচিত কাউকে দেখা যায় কিনা, হঠাৎ “ফাহিইইইইম” বলে এক বিকট চিৎকার শুনে নাইন্টি ডিগ্রি ডানে মাথা ঘুরিয়ে দেখি ছোটখাট এক মেয়ে প্রবলভাবে হাত নাড়ছে, ছবি দেখা ছিল তাও বুঝতে একটু সময় লাগলো যে এই মেয়েই আমার পনের বছর না দেখা কাজিন ...
যাক বাবা, চলে আসলাম তাহলে
[চলবে আশা করি, তবে ধীরে ...]
২
অনেক ধন্যবাদ আপু ... আমি আসলেই ভয়ে ভয়ে ছিলাম কেউ পড়বে কিনা ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৩
অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও পড়ে ফেললাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি পৌঁছে না গেলেও হতো। পথের বর্ণনাইতো আসল বর্ণনা। ভাল লাগল পড়ে।
৪
ব্যাস্ততার মাঝেও পড়লেন বলে কৃতজ্ঞতা ...
আর তাড়াতাড়ি পৌছে যাওয়া প্রসঙ্গে বলি, এটা আসলে আমার অক্ষমতা ... আমি মানুষজন বা ঘটনা-টটনা নিয়ে লিখতে পারি, কিন্তু প্রকৃতি, নিসর্গ এসবের বেলায় অসহায় হয়ে যাই ... এগুলির বর্ণনা দেয়ার মত শব্দভান্ডার বা ভাষার দক্ষতা আমার নাই ... আমি তাই সচেতনভাবেই এসব এড়িয়ে যাই, পারলে শুধু ছবি দিয়ে কাজ সারি ![]()
আবারো ধন্যবাদ ...
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৫
শুধু সাইজ দেখেই পড়ার আগে গালি দিয়ে নিলাম একটা। পড়া শেষ হতে হতে জেগে থাকলে আবার গালি দিবো নে। ভয় নাই, দিন দুয়েকের মধ্যে আমিও প্রতি-গালি দেবার উছিলা দিচ্ছি একটা।
৭
হে হে নাম-ঠিকানা-বায়োডাটা সহ গোপন চ্যানেলে যোগাযোগ কর (বাদবাকি টার্মস এন্ড কন্ডিশন না হয় লোকচক্ষুর আড়ালেই
... )
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৮
- আধাঘন্টা আগে বাসস্টেশনে গিয়া বইসা বইসা মশার কামড় খাইতে আপনারে কে বললো? কোনোমতে পাঁচমিনিট আগে গিয়া ব্যাগ ফেলতে পারলেই হয়।
নেক্সট টাইম বাসে উইঠা পরিচিত ঐসব শব্দে কান দিয়েন না, লোকে খারাপ কইবো! আর এতো বউ বউ করেন ক্যান মিয়া? শালার জনগণ প্রেম করার লাইগা কোনো সুহৃদয় বালিকার হদিসই পায় না আর আপনে কানের ডগায় বউ বউ কইয়া চিল্লান। সহ্য হয় এগুলা?
___________
চাপা মারা চলিবে
কিন্তু চাপায় মারা বিপজ্জনক
৯
নেক্সট টাইম বাসে উইঠা পরিচিত ঐসব শব্দে কান দিয়েন না, লোকে খারাপ কইবো!
আর এতো বউ বউ করেন ক্যান মিয়া? শালার জনগণ প্রেম করার লাইগা কোনো সুহৃদয় বালিকার হদিসই পায় না আর আপনে কানের ডগায় বউ বউ কইয়া চিল্লান।
১১
আর যদি একাধিক শালী থাকে? ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১২
সুন্দর গুছিয়ে লিখেছেন। ভালো লাগলো পড়ে।
কীর্তিনাশা
১৩
ধন্যবাদ আবার আসবেন ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১৪
তাও ভালো বড় হয়ে যাচ্ছে বলে লেখা ছোট করে ফেলেলনি। এই ধরণের লেখা আসলে এই ব্লগের অলংকার।
ফেইসবুকে ছবিগুলা দেখে মনে অনেক প্রশ্ন হচ্ছিল এই পুচ্চি মেয়েটা কে, ইনি কে, উনি কে...জিজ্ঞেস করি নাই। কারণ আমি জানতাম ব্লগ আসছে। আসতেই হবে।
লেখা ভালো লাগছে খুব। চলুক, ধীরে কিংবা জোরে।
---------------------------------
১৫
ফেইসবুকে ছবিগুলা দেখে মনে অনেক প্রশ্ন হচ্ছিল এই পুচ্চি মেয়েটা কে, ইনি কে, উনি কে...জিজ্ঞেস করি নাই। কারণ আমি জানতাম ব্লগ আসছে। আসতেই হবে।
লেখা ভালো লাগায় ধন্যবাদ ... দেখি নেক্সট কবে দেয়া যায় [নেক্সটগুলি অবশ্য ছবির উপর দিয়া বাইর হয়ে যাওয়ার প্ল্যান আছে, ফেসবুকাররা হতাশ হইতে পারো
]
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১৬
বর্ণনায় কাব্য আছে। বেশ, তাহলে চলতে থাকুক।
________________________________________
ব্যাকুল প্রত্যাশা উর্ধমুখী; হয়তো বা কেটে যাবে মেঘ।
দূর হবে শকুনের ছাঁয়া। কাটাবে আঁধার আমাদের ঘোলা চোখ
আলোকের উদ্ভাসনে; হবে পুন: পল্লবীত বিশুষ্ক বৃক্ষের ডাল।
১৭
কাব্য? আর আমি
... এই প্রথম শুনলাম ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১৮
![]()
ভ্রমণ-কাহিনী সেরম হইছে। একটু গোলাগুলি কইরে নিলাম ![]()
= = = = = = = = = = =
ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত
আমরা আনিব রাঙ্গা প্রভাত
আমরা ঘুচাব তিমির রাত
বাধার বিন্ধ্যাচল।
১৯
ধন্যবাদ
[এই গুল্লিটা কেম্নে দেয়?
]
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
২০
খুব্ভালোইছে।
২১
শুইনা খুশি হইলাম ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
২২
১
আহারে, শেষ হয়ে গেল
প্রতিটা লাইন উপভোগ করলাম। *****