| ‹ পুরোনো ব্লগ | সব ব্লগ | নতুন ব্লগ › |
১ ...
ল্যাপ্টপের সামনেই ছিলাম, কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম ঠিক মনে নাই, অঁদ্রে নক করলো, কালকে কি করতেছ?
চিন্তা করে দেখলাম, পরের দিন থার্সডে ঠিকই, কিন্তু যেহেতু প্রফেসর কাছেধারে নাই কাজেই ক্যাম্পাসে গেলাম কি না গেলাম কিছু যায় আসে না ... বললাম, তেমন কোন প্ল্যান নাই ... ক্যান, বাইর হবা নাকি?
বালিকা বললো, পরশু তো যাবগা ... কালকে যদি সারা বা হারমান কারো গাড়ি ধার নেয়া যায় তাহলে লাস্ট কোথাও থেকে ঘুরে আসা যায় ...
বললাম, ঠিকাছে ... তেলের পয়সা ভাগাভাগি করা যাবে ... ফাইনাল করে জানায়ো ...
ঘন্টা দুয়েক পরে আবার টোকা, ব্রায়ার আইল্যান্ড যাবা?
বললাম, সেটা আবার কই?
ম্যাপ দেখো ... ডিগবির পরে, হোয়েল ওয়াচিং ট্যুর আছে ... চল, ঘুরে আসি ...
দেখলাম, নোভা স্কশিয়ার প্রায় শেষ মাথায় ... উলফভিল থেকে প্রায় আড়াইশো কিলো, দুইটা ফেরি পার হতে হয় ... দূর আছে ...
বললাম, সকাল সকাল বের হইতে পারলে যাওয়া যায় ...
অঁদ্রে বললো, নয়টার মধ্যে বের হব ... উঠতে পারলে নিব, না পারলে ফালায়ে যাবগা ... তুমি আজিমরে জিগাও যাবে কিনা, আমি চার্লিরে বলতেছি ... আর একটু নেট ঘেঁটে দেখ হোয়েল ওয়াচিং ছাড়া আশেপাশে আর কি দেখার আছে ...
নেট ঘাঁটলাম কিছুক্ষণ, হোয়েল ওয়াচিং ট্রিপের বিবরণ দেখে তো মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ... বেশ খরচান্ত ব্যাপার ... গত চারমাস হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি গেছে পকেট থেকে, এই অবস্থায় এইভাবে হুট করে ডলার খরচ করতে গায়ে লাগে ...
চিন্তাভাবনা করলাম কিছুক্ষণ, যাব কি যাব না ... অন্যদের ট্রিপ মাটি করে লাভ নাই, তাই ভাবলাম চুপচাপ থাকি, সকালে জানায়ে দিলেই হবে যে জরুরী কাজ পড়ে গেছে, আমি যেতে পারতেছি না ...
ডিসিশান নিয়ে একটু শান্তি শান্তি লাগলো ... কাজকাম সব শেষ করলাম ... ভোরে ঘুমাতে যাওয়ার আগে হঠাৎ মনে হল, কি আছে জীবনে, এত ভেবে কি হবে ...
২ ...
সকালে ঠিক নয়টায় অঁদ্রে এসে পিক করলো ... যাওয়ার পথে বারউইক থেকে চার্লিকে তোলা হলো ... তারপরে দুইএকবার ডানবাম করে হাইওয়ে ওয়ান-ও-ওয়ান ...
ব্রায়ার আইল্যান্ড অনেক দূরে ঠিকই কিন্তু গুগোল ম্যাপ থেকে জানা গেল যে যাত্রাপথ বিশেষরকম সরল ... হাইওয়ে ওয়ান-ও-ওয়ান ধরে সোজা দেড়শো কিলো, তারপরে রাইট টার্ন নিয়ে ডিগবি মিউনিসিপ্যাল্টি ... সেটা পার করে আবার লেফটে টার্ন নিলে হাইওয়ে টূ-ওয়ান-সেভেন ... সেটা ধরে সোজা পঞ্চাশ কিলো গেলে প্রথম ফেরি ... ফেরি পার হয়ে উঠতে হবে একটা দ্বীপে, দ্বীপের নাম লং আইল্যান্ড ... লং আইল্যান্ডের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যেতে সময় লাগে বিশ মিনিটের মত, তারপরে আরেকটা ফেরি ... সেই ফেরি পার হলে যে পিচ্চি আরেকটা দ্বীপ পাওয়া যাবে সেটাই ব্রায়ার আইল্যান্ড ...
দেশে বাপের গাড়ি ছিল না আর নিজের গাড়ি হওয়ার কোন সম্ভাবনাও ছিল না, কাজেই ড্রাইভিংটা শেখা হয়নি ... এখানে দেশের এমাথা ওমাথা বিস্তৃত হাইওয়ে আর অটোগিয়ারের ইজি-টু-ড্রাইভ গাড়িগুলি দেখলে ড্রাইভিংয়ের জন্য হাতটা যে কিরকম নিশপিশ করে সেটা বলার না ... মনে মনে নিজেকে স্বান্তনা দেই, আর কয়টা দিন যাক, তারপর আমিও ...
যাই হোক, চার্লি আর অঁদ্রে পালা করে গাড়ি চালায় ... আমি কোলের উপরে মস্ত একটা ম্যাপ নিয়ে বসে বসে ডিরেকশন দেই আর রাস্তায় চোখ রাখি কোন রোডসাইন বাদ পড়ে যায় কিনা ... একবার ব্রেক নিয়ে লং আইল্যান্ডের ফেরিতে পৌছাই সাড়ে এগারটার দিকে ... গিয়ে দেখি সেই আমাদের ভৈরববাজারের মত অবস্থা ... ছোট একটা পন্টুন ... একপাশে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি ... আর ইতস্তত হাঁটাহাটি করা মানুষজন ...
পন্টুনের সামনে নীল একটা টঙঘরে নীল ইউনিফর্ম গায়ে দারূণ সুন্দরী এক ললনা বসে আছে, তাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল নেক্সট ফেরি বারোটায় ... সেটা পার হয়ে আমরা যদি কোথাও সময় নষ্ট না করে সোজা গাড়ি চালিয়ে যেতে পারি তাহলে পরের ফেরিটা ধরা যাবে সাড়ে বারোটায় ...
হাতে আধাঘন্টা আছে নিশ্চিত হয়ে জনগণ ঢুকে গেল পাশের স্যুভেনির প্লাস খাওয়ার দোকানে ... আর আমি হাতে ক্যামেরা নিয়ে শুরু করলাম বাঁদরামি ... কিছুক্ষণের মাঝেই নদী (আসলে চ্যানেল), ঘাটে বাঁধা নৌকা, লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি, দূরে আবছা দেখা যাওয়া লাইটহাউজ আর পাহাড়-পাথর-বুনো ফুল জাতীয় হাবিজাবির একগাদা ছবি তুলে ফেললাম ...
আমার ক্যামেরাটাকে একটা পয়েন্ট-এন্ড-শূট খেলনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না, তারপরেও এটা দিয়ে ছবি তুলেই আমি যথেষ্ট মজা পাই ... কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে আমার মেমোরি কার্ডটা দুম করে নষ্ট হয়ে গেছে ... সনির ক্যামেরা কোয়ালিটী খুব ভালো হলেও মেমোরি কার্ড নষ্ট হওয়ার পরে আসল ভেজালটা টের পাওয়া গেল ... সনির ডিভাইসে সনি ছাড়া আর কোন এক্সেসরিজ ইউজ করা যায় না, আর সমান ক্যাপাসিটির অন্যান্য ব্র্যান্ডের মেমোরিকার্ডের চেয়ে সনিরটার দাম প্রায় দেড়-দুইগুণ বেশি ... মেজাজ খারাপ করে কার্ড আর কেনা হয় না, ছবির রেজোলিউশন কমিয়ে দুই মেগাপিক্সেলে প্রায় সত্তুরটা ছবি ইন্টারনাল মেমোরিতে রাখা যায়, আপাতত সেটাই সম্বল ...
কাজেই যা দেখি তারই ছবি তুলি আর একটু পরে দুই একটা রেখে বাকিগুলি একধারসে ডিলিট করি ... কি যে দুঃখ লাগে তখন কেমনে বোঝাই ![]()
৩ ...
ফেরি টাইমমতই ছাড়লো ... আক্ষরিকভাবেই সাঁই সাঁই করে চ্যানেল পার করে দিল মাত্র পাঁচ মিনিটে ... একটানে পনেরো কিলো লম্বা লং আইল্যান্ড পেরিয়ে ব্রায়ারের ফেরিতে এসে দেখি হাতে এখনো দশ মিনিট আছে ...
হাফ কিলো চ্যানেল পার হয়ে ব্রায়ার আইল্যান্ডে পা রাখলাম পৌনে একটার দিকে ... পিচ্চি একটা দ্বীপ ... লম্বায় মাত্র সাত কিলো, চওড়া আড়াই ... দুই মাথায় দুইটা লাইটহাউজ, মাঝের চ্যানেলে পিটার আইল্যান্ড নামের গুড়াগাড়া সাইজের একটা দ্বীপে আরেকটা ... পুরা নোভা স্কশিয়ায় যে টোটাল কতগুলি লাইটহাউজ কে জানে ... আমি নিজেই মনে হয় সাত-আটটা দেখে ফেলেছি ... সবগুলিই এখন কানাডিয়ান কোস্টগার্ডরা দেখাশুনা করে ...
যাই হোক, দ্বীপে নেমে আগে খোঁজ নেয়া হল হোয়েল ওয়াচিং ট্যুরের ... জানা গেল তিনটার সময় ছাড়বে ... হাতে ভালো সময় আছে ... কাজেই ওয়াটারফ্রন্টের সামনে বাঁধানো ঘাটে বসে লাঞ্চ সেরে কিছুক্ষণ পাখি দেখলাম (আসলেই পাখি, অন্যকিছু না
... ব্রায়ার আইল্যান্ড মাইগ্রেটিং পাখিদের জন্য একটা গুরুত্বপুর্ণ স্টপওভার) ... আরো কিছু ছবি নিলাম ... এক মহিলার সাথে আলাপ জমিয়ে জানা গেল বামদিকে মিনিট বিশেক গেলে নাকি সীল মাছ দেখা যাবে ... আধাঘন্টা খাড়াই ভেঙে পাহাড়ের মাথায় উঠে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারলাম মহিলা আসলে বিশ মিনিট ড্রাইভিং ডিস্টেন্স বুঝিয়েছিল ... হাতে সময় নাই কাজেই ফেরার পরে সময় পেলে গাড়ি নিয়ে দেখে যাব এই চিন্তা করে আপাতত এবাউট টার্ন করা গেল ...
তিমি মাছ দেখার জন্য যে বোটে উঠতে হবে কাছে গিয়ে দেখি সেটা ছোটখাট একটা ট্রলার সাইজের ... টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যেবার প্রথম গেলাম সেবার একেবার ছোট একটা সীট্রাকের ডেকে বসে রোদে পুড়ে ছাতু হয়েছিলাম ... এদের বোটের সাইজ দেখি পুরা সেইরকম ... বোটটা অবশ্য যথেষ্ট নতুন এবং ঝকঝকা ... কেবিন আছে, সেই কেবিনের সামনে পাইলটের প্যানেলে একগাদা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ... কেবিনের পিছনে ডেকে সুন্দর বসার ব্যাবস্হা ... আণ্ডা-বাচ্চা-বুড়া-বুড়ি মিলায়ে একুশজন মানুষ, আর তিনজন ক্রু ... ক্যাপ্টেন বাদে বাকি দুইজন মহিলা ...
শুরুতেই এক মহিলা ছোটখাট একটা ভাষণ দিয়ে আমরা কি করব কিভাবে করব এইসব নিয়ে হালকা জ্ঞান দিল ... বোটে অনেক ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি আছে কিন্তু তিমি খোঁজার জন্য যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না, নাক-কান-চোখই ভরসা ["তিমির শ্বাসে খুব বাজে গন্ধ, কাজেই ব্যাড স্মেল পাইলে সেটার জন্য পাশের লোকরে দায়ী ভাবার দরকার নাই"
] ... সী-সিকনেস হতে পারে সেটা নিয়া দুশিন্তিত হওয়ার কিছু নাই, খালি বমি করার আগে বাতাসের দিক বুঝে নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ... গভীর সমুদ্রে অনেক ঠান্ডা পড়বে যারা পর্যাপ্ত গরম কাপড় আনে নাই তাদের জন্য কম্বলের সুব্যবস্থা আছে ... তিমি দেখা না গেলে পয়সা ফেরত তবে তেমন ঘটনা খুব কমই ঘটে, সমুদ্রে আরো অনেক বোট আছে তারা কোন তিমি দেখলেই রেডিওতে সবাইকে জানিয়ে দেয় কাজেই আমরা জানি তিমি কোথায় পাওয়া যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি ...
তারপরে যাত্রা শুরু ...
৪ ...
প্রথম এক ঘন্টা বৈচিত্র্যহীন ... শুরুতে খানিকক্ষণ ব্রায়ার আর লং আইল্যান্ডের উপকূল দেখলাম ... পানির উপর দিয়ে ভেসে চলা বিচিত্র সব পাখি দেখলাম ... চ্যানেলের মাঝখানে কিছু জায়গা জাল দিয়ে ঘিরে স্রোতের মধ্যে স্যামন চাষ করতে দেখলাম ... তারপরে শুধু সমুদ্র ...
ঠান্ডা একটু পরেই টের পাওয়া গেল ... যদিও ওয়েবসাইটে বলা ছিল গরম কাপড় আনতে কিন্তু এই সামারের কটকটা দিনে আর কত ঠান্ডাই বা হবে ভেবে একটা হুডি ছাড়া কিছুই সাথে রাখি নাই ... কাজেই একটু পরেই একটা উলেন চাদর (এদের ভাষায় ব্ল্যাঙ্কেট) গায়ে জড়ায়ে বসে রইলাম ... অদ্রে, চার্লি আর আজিম ভাই খ্যাকখ্যাক করে হাসি দিচ্ছিলো একটু পর পর, কিন্তু "এইটা পঞ্চো স্টাইল, গুড-ব্যাড-আগলি দ্যাখো নাই? ভাবের বুঝ কিছু?" জাতীয় ডায়লগ দিয়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে রাখা গেল ...
মোটামুটি এক ঘন্টা পরে দূরে এক জায়গায় ফুস করে ফোয়ারার মত জল ছিটাতে দেখা গেল ... ক্যাপ্টেন সাথে সাথে বোটের মুখ ঘুরিয়ে দিল সেদিকে ... কাছাকাছি দিয়ে ইঞ্জিনের আওয়াজ কমিয়ে মোটামুটি একজায়গায় থামিয়ে রাখলো বোট ...
কিন্তু তিমির আর সাড়াশব্দ নাই ... মোটামুটি যখন নিঃসন্দেহ হয়ে গেছি যে ব্যাটা পগাড়পার ঠিক তখনি আবার ফুস ... অবশেষে তাকে দেখা গেল ... প্রথমে মাথা, তারপরে পিঠ, তারপরে লেজ ... হোয়েলটেল ফ্যাশনের নামকরণের স্বার্থকতা এতদিনে টের পেলাম
...
পরের এক ঘন্টায় আরো পাঁচ ছয়টাকে দেখা গেল ... বোটের মহিলা গাইড বেশ কয়েকটা স্পিশীজের নাম বললো, তার মাঝে একটাকে আলাদা করে চেনা যায় কারণ ফিন আর লেজে সাদা সাদা ছিটা ... একবার একসাথে দুইটা আরেকবার একসাথে তিনটাকে দেখা গেল যেটা নাকি খানিকটা বিরল ঘটনা ... তিমি নাকি একলা চলো নীতিতেই বেশি বিশ্বাসী ... শেষেরবার একটা তিমি বোটের পনের-বিশ হাত দূরে ভেসে উঠলো ... বোটের ঠিক নিচে যদি কারো মাথা তোলার সাধ হয় তাহলে কি হবে সেই চিন্তা বাদ দিয়ে তিমির শ্বাসের গন্ধ যে আসলেই কিঞ্চিত সন্দেহজনক সেটা হৃদয়ঙ্গম করলাম [কিংবা কে জানে, কেউ হয়তো সুযোগের অপেক্ষায় ছিল
]
খেলনা অটোমেটিক উইথ নো মেমরি কার্ড দিয়েই কিছু ছবি নিলাম, আশেপাশের মানুষজনের সুপারসেক্সি ক্যামেরা দেখে নিজেকে স্বান্তনা দিলাম, আমারো দিন আসবে ...
ফেরার পথে অঁদ্রে দেখি গম্ভীর, জিগাইলাম কি ঘটনা ... বলে বমি আসতেছে ... আমি চট করে বাতাসের উল্টা দিকে গিয়ে বসলাম ... তারপরে বললাম, বমি আসলে চেপে রাখার দরকার নাই ... আর সুন্দর সুন্দর চিন্তা করো দেখবা বমি গেছেগা ... বালিকার চেহারা দেখে মনে হল আমার পরামর্শ বিশেষ মনে ধরে নাই ... মুখ হাড়ি করে ডেকের এক কোণায় বসে রইলো ... আমিই বরং কিছু ভালো ভালো চিন্তা করে ফেললাম ![]()
ফেরার পথে ব্রায়ারের পাশে চ্যানেলে হঠাৎ দেখি কিজানি শুশুকের মত টুপ করে মাথা বের করে আবার ডুব দেয় ... ভালো করে তাকাতেই দেখি সীল মাছ ... আমার ক্যামেরার এই জিনিস ধরে রাখার মুরোদ নাই, কাজেই চোখ ভরে দেখলামই শুধু ...
৫ ...
সাতটার পরে ঘাটে পৌছলাম ... ওয়াশরুম আর খানা-খাদ্যের পেছনে কিছু সময় ব্যয় করে সোজা গাড়ি নিয়ে সাড়ে সাতটার ফেরির অপেক্ষা ...
সারাদিন মেঘলা ছিল, কিন্তু এই সময় হঠাৎ আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল ... আমাদের পরিকল্পনার জন্য এটা বিশেষ গুরুত্বপূর, কারণ আমাদের আরেকটা জিনিস দেখা বাকি আছে ... সেটা ব্যালেন্সিং রক ...
ব্যলেন্সিং রক হচ্ছে একটা ব্যসাল্টের কলাম, যেটা দেখলেই মনে হয় আলতোভাবে আরেকটা পাথরের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে, একটা টোকা দিলেই পড়ে যাবে ... লং আইল্যান্ডের মাঝামাঝি গিয়ে দক্ষিণদিকে একটা ট্রেইল ধরে আধামাইলের মত গেলে নাকি পাওয়া যাবে ...
ট্রেইলটা খুঁজে পেতে একটু সময় লাগলো, ছোট একটা রোডসাইন, প্রায় দেখাই যায়না এমন ... ট্রেইলের গোড়ায় পৌছে দেখি লেখা আছে আটটার পরে বন্ধ হয়ে যায় ... বাজেও প্রায় আটটা ... আশেপাশে কেউ নাই দেখে হাঁটা শুরু করলাম ... এসেছি যখন দেখেই ছাড়বো ...
এদের এই ট্রেইলগুলি দেখলে মন খারাপ হয়ে যায় ... এত যত্ন করে বানানো, অথচ প্রাকৃতিক চেহারাটা একটুও নষ্ট করে না ... দুদিকের জঙ্গল কেটে সাফ করে বানানো সরু পায়ে চলা পথ ... মাঝে মাঝে না হলেই না এমন কিছু জায়গায় কাঠের দুয়েকটা ধাপ ... শেষমাথায় অবশ্য খাড়া নিচে নামতে হয় অনেকক্ষণ, সেখানেও কাঠের ধাপ আর পাশে কাঠের রেলিং ছাড়া পুরাটাই ন্যাচারাল ... আমাদের হিমছড়ির কথা ভাবি আর মেজাজ খারাপ করি ...
ধাপের শেষমাঠায় গিয়ে একটা মোড় ঘোরা মাত্রই মুখ দিয়ে আপনা-আপনি বের হয়ে গেল, ওয়াও ... সী-লেভেল থেকে একশ ফুটের মত উঁচুতে একটা কাঠের প্ল্যাটফর্ম ... সামনে খোলা সাগর ... বামে পাহাড় ... আর ডানে সেই এমেজিং পীস অফ ব্যালেন্সিং রক ...
প্ল্যাটফর্মটা উঁচু রেলিং দিয়ে ঘেরা ... সেই রেলিং টপকানো ঘোরতর বেআইনী এবং বিপজ্জনক ... চার্লি একটু দেখলো, তারপরে ডানদিকের রেলিং টপকে নিচের কাঠে ঝুলে নেমে গেল ... তারপর পাথরে পাথরে লাফিয়ে সোজা রকের গোড়ায় ... গিয়ে বলে, ছবি নেও তো একটা ভাল দেখে ...
চার্লির দেখাদেখি আজিম ভাইও নেমে গেল একইভাবে ...
এইবার আমার মাথায় মাল উঠলো ... রেলিংয়ে ঝুঁকে পরীক্ষা করলাম ... প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচের পাথরটা প্রায় এক মানুষ সমান নিচে ... নামতে পারবো, কিন্তু আমার এত ফিটনেস নাই যে উঠতে পারবো ... একবার নামলে অবশ্য ইজি, পাথরে পাথরে পৌছে যাওয়া যাবে ... পা ফস্কালে বড়জোড় হাত-পা ভাঙবে, মরার চান্স কম ...
কি করবো ভাবছি, চার্লি প্ল্যাটফর্মের সামনে গিয়ে বললো, হাইটফোবিয়া না থাকলে এদিক দিয়ে নেমে যাও ... গিয়ে দেখি ঐদিকে প্ল্যাটফর্ম আর পাথরের গ্যাপ অনেক কম ... তিন ফুটের বেশি হবে না ... নামা যাবে, ওঠাও যাবে ... ঝামেলা হইলো, পাথরের প্ল্যাটফর্মটা ওইদিকে মাত্র দুই ফুট চওড়া ... এরপরে খাড়া নেমে গেছে প্রায় একশ ফুট ... নামতে গিয়ে যদি মোমেন্টাম সামলাতে না পারি বা আচমকা পা পিছলায় তাহলে কি হবে ভাবার দরকার নাই ...
কি জানি কি মাথায় আসলো অঁদ্রের হাতে ক্যামেরা দিয়ে নির্বিকারভাবে রেলিং টপকে নেমে গেলাম ... পড়ে গেলে কি হবে এই চিন্তা মাথাতে আসতে না দিয়ে সাবধানে উপরের কাঠের মাথা ধরে চার-পাঁচ ফুট গিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় ... তারপরে পাথর পর্যন্ত যাওয়া আর কোন ব্যাপার না ...
পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে পোজ দিলাম ... অঁদ্রে বিকট চিৎকার দিল, ডোন্ট টাচ ইট, পড়ে যাবে ... আমি আর চার্লি হাসা শুরু করলাম ... এই পাথর এত এত বছর যদি নোভা স্কশিয়ার বিখ্যাত ঝড়-বিষ্টি-বাতাস ঠেলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে আমার ভর তার নিতে পারা উচিৎ ...
পোজ-টোজ শেষে ওঠার পালা ... প্রথমে চার্লি যেখান দিয়ে নেমেছিল সেখানে গিয়ে পরীক্ষা করলাম, বুঝলাম আমার এজাম্পশন ঠিক ছিল ... এখান দিয়ে ওঠা আমার কম্মো না ... কাজেই সামনের সেই দুই ফুট বারান্দায় গিয়ে রেলিং ধরে কোনরকমে উপরে উঠলাম ... আজিম ভাই আর চার্লি দুই হাত ধরে টেনে তুললো, নামামাত্র অঁদ্রে বললো, থ্যাংক গড, ভয় পাওয়ায় দিছিলা তো ...
ওর থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে ছবি দেখলাম ... ভালো ছবি উঠছে কোন সন্দেহ নাই, কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, দিস ডাজন্ট ওয়র্থ ইট ... এই ছবির জন্য এত রিস্ক নেয়ার কোন মানে নাই ...
৬ ...
সাড়ে আটটার ফেরি অল্পের জন্য মিস করলাম ... নয়টার ফেরি ধরে মেইনল্যান্ডে ফিরে ডিগবি টাউনে কফি ব্রেক নিয়ে ধীরে-সুস্থে ফিরতে ফিরতে প্রায় বারোটা বাজলো ... চার্লিকে নামানো হল বারউইকে ... “ইট ওয়াজ নাইস টু মীট ইউ ব্রো ... সী ইউ ইন ফেইসবুক ... টেইক কেয়ার ...” বাকি রাস্তাটুকু টুকটাক কথা হল তিনজনে ... অঁদ্রে তার নতুন শেখা বাংলা ভোকাবুলারি প্র্যাক্টিস করলো ... “কুকুল”, “বিলাল”, “সাপ”, “গলম কুকুল” [এইটার মানে হটডগ], “বিশটি” [মানে বৃষ্টি], “গান” [মিউজিক], “পুলা” [মানে ছেলে
], আর “বালিকা” ... ওর নামটা আমরা এখনো ঠিকমত উচ্চারণ করতে পারিনা বলে খানিকক্ষণ হতাশা প্রকাশ করলো [“উদেয়হরররররররে” বলে কেমনে জানি গার্গল করার মত টান দিতে হয়, আমাদের জিহবার অসাধ্য ] ... কার কি ফিউচার প্ল্যান সেটা নিয়ে আলোচনা হল কিছুক্ষণ ... সামনের বছর ও হয়তো আবার আসবে কানাডা, সম্ভবত উইনিপেগের দিকে ... বললো, তুমি অন্টারিওর দিকে চলে আইসো, এরপরে অন্টারিও ঘুরে দেখবোনে ... আমি বললাম, ঠিকাছে, আর আমি ফ্রান্সে গেলে তোমারে কল দিব, তুমি আমারে প্যারিস দেখাবা ...
এরপরে হঠাৎ কথা শেষ হয়ে গেল ... চুপচাপ গাড়ি চলতে লাগল ... এক্সিট নাইন কখন জানি পার হয়ে গেল কেউই দেখলাম না ... খামাখা আপডাউন দশ কিলো বেশি ঘুরতে হলো ...
রেডিওর বকবকানি ভাল্লাগছিলো না, সিডি প্লেয়ার অন করলাম ... কেল্টিক মিউজিক বাজতে শুরু করলো ... বললাম, কার মিউজিক এটা, সুন্দর তো ... বালিকা বললো, লোরিনা ম্যাককেনিট , তুমি শোন নাই আগে? ... বললাম, নাহ, নামই শুনি নাই, কিন্তু পছন্দ হইছে, আজকেই ডাউনলোড করবো ... অঁদ্রে হেসে ফেললো, বললো, ভালোই হইছে শোন নাই, এখন থেকে যতবার শুনবা এই সময়টার কথা মনে পড়বে ...
সোয়া বারোটায় বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে গেল ... “বাই সী ইউ টেক কেয়ার” ...
তারপর নীরবতা ...
৭ ...
কালকে থেকে খালি লোরিনা ম্যাককেনিট বাজাচ্ছি ... ইউটিউব লিংক দিলাম ... জনগণই রায় দিক ট্র্যাকটা আসলেই এত ভালো নাকি খালি আমারই ভালো লাগছে ...
২
প্রীত হইলাম ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৩
দারুণ লাগল। জীবনে তো যাইতে পারমু না। পড়ে পড়ে আশ মেটাই।
৪
আমার মত আইলসা না হইলে যে কোন জায়গাতেই যাইতে পারবা ... চিন্তা কইরো না ...
ভালো লাগছে জাইনা খুশি হইলাম ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৫
চমৎকার বর্ননা...!
ফেসবুকে আরোও ছবি চাই...বিশেষ করে ব্যলেন্সিং রকের কিছু দুধর্ষ ছবি...
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
http://biprodhar.com
৬
ধন্যবাদ ... কিন্তু আর ছবি নাই তো ... বলছি না, হাইয়েস্ট সত্তুরটা ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৭
খিক খিক!! ম্যাডামের বমির কথাটা উঠার পরই মনে হইলো আর পড়বোনা। যদি সত্যি সত্যি করে দেয় তাহলে সহ্য করতে পারবো না ![]()
পুরাটা পড়লাম। মজার সময় তো শেষ হয়ে আসলো, এখন যান পড়ালেখায় মন দেন। কুইক কুইক!
=============================
তু লাল পাহাড়ীর দেশে যা!
রাঙ্গা মাটির দেশে যা!
ইতাক তুরে মানাইছে না গ!
ইক্কেবারে মানাইসে না গ!
৮
দিলা তো মন খারাপ কইরা ... পড়ালেখা কী যে পেইন ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৯
গত চারদিন ধরে কুলখানি খেতে খেতে আজ একটা ভাল লেখা পড়লাম।
১০
ধন্যবাদ ... কিন্তু কুলখানিটা কি জিনিস? ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১১
ভালো লিখসস.........চালায়া যা, পঞ্চা!
১২
ধন্যবাদ ... তুই আর লেখোস না ক্যান? ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১৪
ওয়াও, দারূণ তো ... আমার লেখা দেখি রেফারেন্স ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১৫
নামামাত্র অঁদ্রে বললো, থ্যাংক গড, ভয় পাওয়ায় দিছিলা তো ...
অঁদ্রে তার নতুন শেখা বাংলা ভোকাবুলারি প্র্যাক্টিস করলো ... “কুকুল”, “বিলাল”, “সাপ”, “গলম কুকুল” [এইটার মানে হটডগ], “বিশটি” [মানে বৃষ্টি], “গান” [মিউজিক], “পুলা” [মানে ছেলে
ঘটনাতো বেশি সুবিধার মনে হইতেসেনা। দুই আর দুই এ চার মিলাতে আমার আবার বেশি কষ্ট করতে হয়না। ![]()
---------------------------
থাকে শুধু অন্ধকার,মুখোমুখি বসিবার...
১৬
মাথায় খালি বাজে চিন্তা না? ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১৭
আপনার পয়সায় এবং লেখা-ছবিতে এটা ভার্চুয়াল ট্যুর দেওয়া গেলো। খরচের ভাগ দিতে রাজি। অথবা ক্যামেরার মেমরি কার্ডের চাঁদা। ![]()
-----------------------------------------------
ছি ছি এত্তা জঞ্জাল!
১৮
ধন্যবাদ বস ... তাড়াতাড়ি টিনের বাক্সে বারো টাকা ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
১৯
বেচারি অড্রে যাইবোগা! ধুর! আমারতো খারাপ-ই লাগতেছে ভেবে। ফেসবুকে আর জমবো না তাইলে!
কী ব্লগার? ডরাইলা?
১
মজা পাইলাম