যেখানে নদী এসে থেমে গেছে ...

কিংকর্তব্যবিমূঢ় এর ছবি
লিখেছেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় (তারিখ: মঙ্গল, ২৩/১০/২০০৭ - ১:২৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আয় ছুটে আয় ... ছুটে আয় খালি পায় ...

জুলাইয়ের শেষ দশদিনের প্ল্যান ... অগাস্টের শুরুতে সফল বাস্তবায়ন ... যারা দেশে থাকেন তাদের ঐ সময়টা মনে করিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে ভাল উপায় হল রেংস ভবন ... ঐ ভবন যখন ভাঙ্গা হচ্ছিল আর জিপির সিক্সটি পার্সেন্ট সাবস্ক্রাইবার বুড়ো আঙ্গুল ব্যথা করে ফেলছিল নেটওয়ার্ক পাওয়ার চেষ্টায় সেইসময়ের কথা ...

ছয়জনের দল ... ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা ... সহজতম গন্তব্য কক্সবাজার ... শেষ মূহুর্তে দুয়েকজন ঝরে পড়বে এই চিরন্তন সত্য মাথায় রেখেই বিপুল উৎসাহে প্ল্যান করা শুরু হল ...

আশ্চর্যের ব্যপার হচ্ছে কেউ ঝরে পড়ল না ... দুই লেকচারার ক্লাস শিফট করে ফেলল ... আইটি অডিটর তার অডিট দুইদিন আগেই খতম করল ... টেলিকমের দুই কামলা কিভাবে জানিনা ছুটি ম্যানেজ করল তাদের খাইষ্টা বসদের পটিয়ে ... আর এই অধম "চাইর-পাঁচদিন না থাকলে কি খুব সমস্যা হবে" বলে ইনিয়ে-বিনিয়ে ছুটির কথা তোলা মাত্র "তুমি এমন কি কাজ কর যে তুমি না থাকলে আমাদের চলবে না" বলে ছুটি দিয়ে দেয়া হইল ...

স্টুডেন্ট অবস্থায় এস. আলম আমাদের বড় সহায় ছিল ... এখন অর্থমন্ত্রীদের মানুষের ক্রয়ক্ষমতাবৃদ্ধিজনিত সূত্রকে সত্যি প্রমাণ করার নেশায় উঠলাম সোহাগ ভলভোতে ... ঢালা বৃষ্টির মধ্যে রওনা দিলাম ... এক বন্ধুর বাপ এসেছিল তার পোলাকে বাসে তুলে দিতে ... বারবার সাবধান করলেন "বিষটিবাদলার দিন, ভুলেও বেশি পানিতে নামবা না" ... "আরে চাচাজান ভাইবেন না, আমরা তো পানিতে নামবোই না, খালি হওয়া খাইতে যাইতেছি " জাতীয় বাণী দিয়ে তাকে শান্ত করা হল ...

কক্স সাহেবের বাজারে পৌছালাম ভোরে ... বাস থেকে নামিয়ে দিল হোটেল সী প্যালেসের সামনে ... শুরু হল হোটেল খোঁজার অভিযান ... অফসীজন বলে খুব বেশি পেইন খাওয়া লাগে নাই অবশ্য ... এক হোটেলে চেকইন করেও পরে পছন্দ না হওয়ায় কিঞ্চিৎ অর্থদন্ড দেওয়া লেগেছে অবশ্য ...

ফাইনালি উঠলাম লাবণি পয়েন্টের ঠিক মুখে হোটেল মিডিয়া ইন্টারন্যাশনালে ... হোটেলের নামটাই শুধু খ্যাত ... বাকি সবই পছন্দ হয়েছে ... সেরা আকর্ষণ অবশ্যই সামনের বিশাল খোলা টেরেস, যেখান থেকে দেখলাম আমার জীবনের সেরা ছবিগুলির একটা:

সেইদিনটা গেল মোটামুটি আলস্য মেখে ... সমুদ্রে সামান্য ঝাঁপাঝাঁপি আর দুপুরে খানাদানার পরে জম্পেশ ঘুম মেরে ... সন্ধ্যার পরে বীচে বসে সমুদ্র দেখা আর রাত্রে খোলা টেরেসে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে আড্ডা ...

পরেরদিন সকালে একটা জীপ ভাড়া করে রওনা দিলাম হিমছড়ি ইনানী ... সৈকতের পাশ দিয়ে নেভির বানানো হাইওয়ে ... একদিকে বিশাল সাগর ... আর একদিকে সবুজ পাহাড় ... এই কম্বিনেশন বাংলাদেশে খুব বেশি নাই:

রওনা দেয়ার সময়ে খানিকটা গোলমাল করে ফেলায় ইনানী পৌছলাম ভরা জোয়ারের সময় ... তাতে ইনানীর মেইন আকর্ষণ কোরাল পাথর দেখা গেল না ... আমার যে তাতে খুব মুডঅফ হল সেটা বলব না ... কোরাল তো সেন্টমার্টিনেই দেখেছি ... ইনানী এসে যে দুর্দান্ত ঢেউ আর সমুদ্রের ধারে পাতা বিচিত্ররকমের মাছ ধরার জাল দেখলাম তাই বা মন্দ কি?

অনেকক্ষণ ঝাঁপাঝাঁপির পরে আবার রওনা দিলাম ... উল্টা দিকে ... থামলাম হিমছড়ি এসে ... টিকেট কাটতে হয় ইদানিং ... তখনি জানলাম হিমছড়ির বিখ্যাত ঝর্ণা পাহাড় ধ্বসে ইন্তেকাল করেছে ... গেল মেজাজ খারাপ হয়ে ... নেহায়েত টিকেট করা হয়ে গেছে (যদিও দাম দশ টাকা মাত্র) তাই কাঠফাটা রোদের মধ্যে সিঁড়ি বাওয়া শুরু করলাম ...

ভাগ্যিস উঠেছিলাম ... নাহলে এই ছবিগুলি কিভাবে তুলতাম? সাগরের এত চমৎকার ভিউ আর কোথায় পাওয়া যায় আমি জানি না:

ফেরার পথে অবশ্য হিমছড়ির ঝর্না বন্ধ হওয়ার দুঃখ ভুললাম পথের পাশে পাহাড়ের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা আরেকটা ঝর্ণা আবিষ্কার করে, আগের রাতের বৃষ্টিতে সেটা তখন ঢল নেমেছে:

বিকালে কক্সেসবাজার বীচের কিছু ভাল ফটো তোলার শখ ছিল, কিন্তু গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি সেই শখ খুব ভালমত পূরণ করতে দিল না ... তাও যা তুললাম তার থেকে দুয়েকটা তুলে দিলাম:

পরদিন ভোরে আবার পানিতে নামলাম, আরও দুয়েকটা ছবি নিলাম:

তারপর বাড়ি ফেরা ...


মন্তব্য

কিংকর্তব্যবিমূঢ় এর ছবি

ছবির ব্যপারে ডিসক্লেইমার: আমাদের টীমে দুইটা ডিজিক্যাম আর দুইটা বেশ ভালো কোয়ালিটির মোবাইল ক্যাম ছিল ... সেগুলি সবার হাতে হাতে ঘুরছে ... যে যখন পারছে ছবি তুলছে ... সব ছবি একসাতেহ কইরা তার মধ্যে সেরাগুলি বাছাই করা হইছে ... সো কোন ছবি কে তুলছে সেটা আর এখন বাইর করা যাবে না ...

মোটামুটি চাইর জনরে ছবি তোলার সকল কৃতিত্ব ভাগাভাগি কইরা দেয়া হইল: শাহান, পারভেজ, সাব্বির আর এই আমি (চামে নিজের ঢোল বাজাইলাম একটু) ...

ছবি ব্লগে দেওয়ার সময় অবশ্য কারও পারমিশন নেই নাই, বদলে সবাইরে আমার কৃতজ্ঞতা জানাইলাম ...

কিংকর্তব্যবিমূঢ় এর ছবি

চাইলে এই ট্যুরের বর্ণনা দিয়েই কয়েক পর্বের সিরিজ করা যাইত, কিন্তু মহাকাব্য লিখতেও যেমন শখ হইতেছে না তেমনি সেই মহাকাব্য পাবলিক পড়বে বইলাও মনে হয় না, সো ছবিই ভাল ...

নজমুল আলবাব এর ছবি

আরে মিয়া এখনতো আমারো যাইতে ইচ্ছা করতাছে। আর কি ফাটাফাটি ফটুক দিলেনরে ভাই।

ভুল সময়ের মর্মাহত বাউল

ধুসর গোধূলি এর ছবি

- আলিবাবা ভাই, ফটুক দেইখা যাওনের শখ জাগছে নাকি ক্যামেরা কিনার শখ জাগছে ঠিক কইরা কন।
_________________________________
<সযতনে বেখেয়াল>

নিঘাত তিথি এর ছবি

দারুণ!
ছবিগুলাও মারাত্মক।
কক্সবাজারের তুলনা হয় না আসলে কোন। যেখানেই যাই, যে সমুদ্রই দেখি, কক্সবাজারের তুলনা সে নিজেই। ইনানী বীচের কোরাল না দেখে মিস করেছো এটা ঠিক। আর হিমছড়ির ওই পাশের ঝর্ণাটাই তো বেশি সুন্দর আসলটার চেয়ে জানো না? তবে আসল ঝর্ণাটা পাহাড় ধসে ভেঙে গেছে এটা তো জানা ছিলো না, খুব মন খারাপ হলো শুনে, মানে পড়ে। ইনানী বিচে যাবার পথের জার্নিটা আসলেই সুপার! একপাশে পাহাড়, একপাশে সমুদ্র- অসাধারণ! আমরাও সব বন্ধুরা মিলেই গিয়েছিলাম এক ঝটিকা ট্যুরে। ইশ, ধুর, সব মনে করিয়ে দিলা ছেলে। মাইর দেয়া দরকার।

কনফুর সাথে আবার গেছিলাম বিয়ের পরপর, হানিমুন আর কি লইজ্জা লাগে । তারে ছাড়া সেন্টমার্টিন যাবো না বলে আগেরবার বন্ধুদের সাথে যাই নি, কিন্তু কপালের ফের, তখন তুমুল হরতাল(হরতাল না আসলে কি জানি শব্দটা, ভুলে গেলাম!)। যাওয়া হলো না।
এরপরের বার দেশে গেলে সব সুন্দর জায়গা একদম চইষ্যা ফেলব, কসম!
----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

তারেক এর ছবি

ছবিগুলা অসাধারণ হইছে! লেখাটাও ভাল লাগল।

_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে

_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে

শ্যাজা এর ছবি

ওয়াও...


---------
অনেক সময় নীরবতা
বলে দেয় অনেক কথা। (সুইস প্রবাদ)

আরিফ জেবতিক এর ছবি

নতুন ঝর্নাটার কোন নাম দেয়া হয় নি কেন কে জানে ?

ইশতিয়াক রউফ এর ছবি

ধ্যাৎ! এইসব পোস্ট দিবা না। মন-মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। "দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া" মাথায় ঘুরে শুধু। পরের দেশের যত রাজ্য দেখেছি, নিজের দেশের তত জেলা দেখি নাই। লজ্জা লাগে। ভিসা শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাই চাইলেও আর যাওয়া যাবে না। সাথে যাওয়ার কেউ না থাকার কথা বাদই দিলাম।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।