সদ্য পড়া বইঃ শমন শেকল ডানা

কনফুসিয়াস এর ছবি
লিখেছেন কনফুসিয়াস (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৭/০২/২০০৯ - ৮:৩১pm)
ক্যাটেগরি:

হাসান ভাইয়ের বইটা হাতে আসতে বেশ লম্বা সময় লেগে গেলো।
বইমেলার পরপর একবার বই আনিয়েছিলাম কিছু, এবারে দেশ থেকে আরও কিছু বই আনালাম। বইগুলো হাতে পেয়ে দেখি একেবারে হাসান-হোসেনময় বই সব! আবুল হাসান আর আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতার কালেকশান, হাসান ভাইয়ের শমন শেকল ডানা আর আকমল হোসেন নিপুর জলদাসের মৎস্য ঘ্রাণ। শমন শেকল ডানাই পড়া শেষ হলো সবার আগে।

বইটার প্রচ্ছদেই বিষণ্ণ ছাপ রয়েছে একটা, মন খারাপ করিয়ে দেয়া একটা অনুভুতি, আশ্চর্য এই যে এই অনুভুতিটাই পুরো বইটুকু পড়ার সময় হাত ধরে হেঁটেছে আমার সাথে।

ফ্ল্যাপের ভূমিকাটুকু কে লিখেছে জানি না, কিন্তু খুব ভাল লিখেছেন। বই পড়তে শুরু করার আগেই বেশ ভাল রকম প্রস্তুত করিয়ে দেয় মনটাকে।
বইয়ের গল্পটা একেবারেই আমাদের চেনাজানা গল্প। গত কবছরে, বা তারও আগে থেকে এখন পর্যন্ত, বা আর কোন অজানা ভবিষ্যত পর্যন্ত হয়ত এই গল্পের ভেতরের ঘটনাগুলোকে ঘটতে দেখেছি এবং দেখতে থাকবো আমরা। বামপন্থী মিছিলের সামনে দাঁড়ানো ছেলেটি সামরিক বাহিনিতে যোগ দিয়ে কেমন করে বদলে যায়, অথবা রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা নাসিমা আপা মৌলবাদী স্বামীর কবলে পড়ে কেমন করে বোরকার অন্তরালে চলে যায়। পাহাড়ের মানুষদের উচ্ছেদের গল্পও আছে এখানে, ধর্মের ব্যবধানে সংখ্যায় কম যারা, অত্যাচারিত হয়ে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবার দুঃখও আছে। একদম, পত্রিকার পাতায় প্রতিদিনের খবরগুলোই গল্প হয়ে এসেছে এ বইটিতে।
তবে এখানেই খানিকটা সমস্যা আছে। বইয়ের গল্পটি আমাদের জানা, এবং বইটি পড়ে শেষ করার পর আমি আর নতুন কোন অনুভবে আন্দোলিত হইনি। এই জায়গাটায় সম্ভবত হাসান ভাই কিছু করে দেখাতে পারতেন।
হাসান ভাইয়ের লেখার স্টাইল চমৎকার, খানিকটা ফিচারধর্মী, অবশ্য একথা বললে সরলীকরণ হয়ে পড়ে। আরেকটু ভালভাবে বললে, উনি যা করেন, একটা স্টেটমেন্ট দেন, তারপর সেটাকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে গল্পের বুনোট।

একটু অবাক করা ব্যাপার হলো, বইটির মধ্যে তাড়াহুড়োর ছাপ পেয়েছি আমি। অথচ এমনটা হবার কথা নয়। গ্রন্থ হিসেবে বের হবার কথা ছিলো গতবইমেলায়, তার মানে তখুনি একটা বই হিসেবে এটা তৈরিই ছিলো, কিন্তু বের হয়েছে এবারের বইমেলায়। মাঝখানে অন্তত এক বছর সময় ছিলো, এর পরেও বইটির কোথাও তাড়াহুড়োর চিহ্ন আশা করিনি।

গল্পের যে মূল চরিত্র, মানে কথক, তার সাথে একাত্ম বোধ করার জন্যে যথেষ্ঠ সময় দেননি লেখক। পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিলো, খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছি যেন, ঘটনাগুলোও আমার পরিচিত, জানা, কিন্তু কোনটাই যেন ঠিক আমার ঘটনা নয়, যেন দেয়ালে লাগানো স্ক্রাপবুকের মত করে আঠা দিয়ে সাঁটা বিচ্ছিন্ন কিছু ছবি দেখে চলেছি আমি। এই ব্যাপারটাতেই আমার মনে হয়েছে, আরেকটু যদি আপন আপন করে তুলতেন চরিত্রটাকে, আরেকটু যদি আমি-আমি!

অবশ্য, বইয়ের পরিচিতি দিতে গিয়ে ফ্ল্যাপে বলা হয়েছে, এটি একটি ডকুফিকশন। এ কথাটা মাথায় রাখলে উপরের অনেক অভিযোগই খন্ডিত হয়ে যায়, কিন্তু তারপরেও আমার মতে, এটিতে ফিকশনের চেয়ে ডকু-র পাল্লাই ভারী থেকে গেছে!

আর, বইয়ের চেহারা ছবি নিয়ে বেশ দুঃখ পেলাম। খানিকটা এতিম এতিম লেগেছে বইটিকে। প্রকাশনায় যত্নের খানিকটা অভাব ছিলো যেন। বইয়ের ফরম্যাটিং অমনোযোগের ছাপ নিয়ে এসেছে, কাটা বা বাঁধাইয়েও পাশ মার্ক পাবে টেনেটুনে। ঠান্ডা, বা ভন্ড- এ ধরণের শব্দগুলোর "ন্ড" আসেনি একটাও, ফ্ল্যাপের সব গুলো "ণ" সপাটে হয়ে গেছে "ন", আর মায়িশা নামটা অনেক জায়গায় হয়ে গেছে মালশা! বাংলা হরফে লেখা ইংরেজি যে বাক্যগুলো কথোপকথনে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতেও রয়ে গেছে অনেক ভুল। আরও দুঃখ পেয়েছি, বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় বিভিন্ন রকমের স্পেসিং দেখে, দু লাইনের মাঝের ফারাক কোথাও কম, কোথাও বেশি। হাতে এক বছর পাবার পরেও বইটির উঠ-ছেঁড়ি-তোর-বিয়া ধরণের গেটআপ মনঃপুত হয়নি আমার।

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে বইটি হাতে পেয়ে মনে হলো, লেখক ও প্রকাশক এই বেচারা পাঠকের উপরে সুবিচার করেননি তেমন।
তবে আমি জানি, খুব ভাল করেই জানি যে হাসান ভাইয়ের হাতে জাদু আছে। পরবর্তী বইয়েই তিনি আবার তাঁর মত করে ফিরে আসবেন বলেই আশা রাখি।


মন্তব্য

নিবিড় এর ছবি

আপনার কাছে মাঝে মাঝে কিছু বই কুরিয়ার করে পাঠান উচিত তাইলে আপনার শীত নিদ্রা যদি কিছুটা ভাঙ্গে হাসি


মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় ।

কনফুসিয়াস এর ছবি

চমৎকার আইডিয়া! আমার কোনই আপত্তি নাই, তুমি মনে রাইখো, তাহলেই হবে। চোখ টিপি

-----------------------------------
আমার ইচ্ছে হলো বাজাতে গীটার, মন আমার, মন আমার, মন আমার-

পরিবর্তনশীল এর ছবি

পড়লাম

---------------------------------
ছেঁড়া স্যান্ডেল

---------------------------------
ছেঁড়া স্যান্ডেল

ফারুক হাসান এর ছবি

ধুমকেতুর ন্যায় নিয়মিত পোষ্টানো কি ঠিক?

***
রিভিউ ভাল লেগেছে।

কনফুসিয়াস এর ছবি

হা হা হা। হ্যালির ধূমকেতু না হয়ে যাই আবার! হাসি
-----------------------------------
আমার ইচ্ছে হলো বাজাতে গীটার, মন আমার, মন আমার, মন আমার-

হিমু এর ছবি
হাসান মোরশেদ এর ছবি

অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।
নতুন লেখকদের বই প্রকাশ ও বিপণন নিয়ে বিকল্প কিছু ভাবনার দরকার।
-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

দ্রোহী এর ছবি

ভিডিওটা অসাধারণ!!

হাসান মোরশেদ এর ছবি

কৃতজ্ঞতা কনফু।
তোমার রিভিউ একেবারে পারফেক্টো হাসি
-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

কনফুসিয়াস এর ছবি
হিমু এর ছবি

একটু খাপছাড়া মনে হতে পারে, কিন্তু এই ভিডিওটাও প্রকাশকদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ।



হাঁটুপানির জলদস্যু আলো দিয়ে লিখি

কনফুসিয়াস এর ছবি

এই ভিডিওটা দেখে বেশি ভাল লাগলো। মজা পেলাম শুনে ভ্দ্রলোকের ব্যাকগ্রাউন্ড সোশিওলজিতে, কিন্তু কাজ করছেন ডিজাইনের ওপরে!

-----------------------------------
আমার ইচ্ছে হলো বাজাতে গীটার, মন আমার, মন আমার, মন আমার-

সুলতানা পারভীন শিমুল এর ছবি

পড়লাম।

...........................

সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন

...........................

একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

তবে এখানেই খানিকটা সমস্যা আছে। বইয়ের গল্পটি আমাদের জানা, এবং বইটি পড়ে শেষ করার পর আমি আর নতুন কোন অনুভবে আন্দোলিত হইনি।
আপনার রিভিউয়ের এই অংশটা আমার কাছে নতুন। আমি পড়ার পর এভাবে ভাবিনি। আপনার রিভিউ পড়ে মনে হলো-- তাইতো, এ গল্প শুধু একজন গল্পবলিয়ের বলে যাওয়া কোন একটা ঘটনামাত্র।

আবার মনে হয় লেখক হয়তো সেটাই চেয়েছেন। লেখক নিজেই চোখে আঙুল দিয়ে না দেখিয়ে শুধু বুঝিয়ে দিয়েছেন, আর বাকীটা পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন।
চলুক

আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

কনফু একেবারে নির্মোহ পাঠক হাসি

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে বইটি হাতে পেয়ে মনে হলো, লেখক ও প্রকাশক এই বেচারা পাঠকের উপরে সুবিচার করেননি তেমন।

কনফু, এই সুবিচার না করাটা লেখক আর প্রকাশকের দুইজনের মধ্যে ভাগাভাগি করে দিলে - কে কতো শতাংশ? ফিফটি ফিফটি, নাকি কম বেশি? হাসি

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

আমার একটা ব্যাখ্যা আছে। লেখক হয়তো বইগুলো হাতে পেয়েছেন অ-নে-ক দেরীতে। তারপর পোস্ট করে আসতে আসতে সময় লেগেছে। হাসি

কনফুসিয়াস এর ছবি

নির্মোহই বটেক, কথা সইত্য। তবে সেই সাথে নীরব হতে পারলে আরও নিরাপদ হতো আমার জন্যে। হাসি
*
বইয়ের গল্পটাই মূল ধরি আমি, মানে কন্টেন্ট। সে ক্ষেত্রে লেখকের দায়ই বেশি, সবসময়েই। কিন্তু প্রকাশকের কাজটা হলো বইটাকে নির্ভুলভাবে পাঠকের সামনে নিয়ে আসা। এটার গুরুত্ব কম না, কারণ লেখার ভেতরে ওলট-পালট হলে পাঠকের সামনে ভুল মেসেজ চলে আসবে।
আর দৃষ্টিনান্দনিকতারও একটা ব্যাপার আছে, এটাও বোধ করি প্রকাশকেরই এখতিয়ার।
পারসেন্ট হিসেব করলে সত্তর-তিরিশ ধরবো আমি, লেখকে আর প্রকাশকে।

-----------------------------------
আমার ইচ্ছে হলো বাজাতে গীটার, মন আমার, মন আমার, মন আমার-

আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

আচ্ছা, জানলাম হাসি
কেনো, কনফু! সরব হলে আপদ হতে হয় বুঝি?

দময়ন্তী এর ছবি

বইয়ের গেট আপের ব্যপারে আমার খুব খুঁত্খুঁতুনি আছে৷ ভুল বানান, বাজে কাগজে ছাপা ইত্যাদি দেখলে খুব খারাপ লাগে৷ মন খারাপ
----------------------------------------------
"নিভন্ত এই চুল্লিতে মা
একটু আগুন দে
আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে৷'

-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'

দময়ন্তী এর ছবি

আমিও হাতে পাব আর দিন ১০ - ১২ র মধ্যেই৷ দেখা যাক .....................
--------------------------------------------------
"নিভন্ত এই চুল্লিতে মা
একটু আগুন দে
আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে৷'

-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'

কনফুসিয়াস এর ছবি

তুমি কোথায় ছিলা এই কদিন? দেখি নাই মনে হচ্ছে।
-----------------------------------
আমার ইচ্ছে হলো বাজাতে গীটার, মন আমার, মন আমার, মন আমার-

দময়ন্তী এর ছবি

হ্যাঁ মাঝে প্রায় একমাস খুব চাপে ছিলাম রে৷
-------------------------------------------
"নিভন্ত এই চুল্লিতে মা
একটু আগুন দে
আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে৷'

-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'

দ্রোহী এর ছবি

অনেকদিন পর কনফুর লেখা পড়লাম!! চমৎকার রিভিউ হয়েছে। ভালোমন্দ দিকগুলো এরচেয়ে সুন্দর করে বলা সম্ভব না।

সুমন সুপান্থ এর ছবি

সৌভাগ্যই বলতে হবে মহাত্মা উপন্যাসিকের ।
বেশ কিছু আলোচনা এলো সচলে । ( ৩ টা তো অবশ্য আমিই পড়ে ফেলছি গভীর মনযোগ দিয়ে - আরো কিছু আসবে হয়তো, এসেছে হয়তো)

কেউ কেউ ১০ দিন পর , কেউ ৩ দিন পর শমন পাবেন, ডানা পাচ্ছেন । আর কেউ, আরশীনগরের পড়শীরা, শেকল ও পাচ্ছে না । কপাল !
দয়া কর প্রভু । আমরা অধম পাঠক-তার উপর দীনহীন ।

@ কনফু, তোমার আলোচনা খুব নির্মোহ লাগলো । সাধুবাদ ।

---------------------------------------------------------
তুমি এসো অন্যদিন,অন্য লোক লিখবে সব
আমি তো সংসারবদ্ধ, আমি তো জীবিকাবদ্ধ শব !

---------------------------------------------------------
তুমি এসো অন্যদিন,অন্য লোক লিখবে সব
আমি তো সংসারবদ্ধ, আমি তো জীবিকাবদ্ধ শব !

হিমু এর ছবি

একটা ডায়াগ্রাম যোগ করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

prakash11



হাঁটুপানির জলদস্যু আলো দিয়ে লিখি

অতন্দ্র প্রহরী এর ছবি

দুর্দান্ত রিভিউ, কনফু ভাই। পাঠ-পরবর্তী আমার চিন্তাভাবনার সাথে অনেকটাই মিল পেলাম।

এত কম লেখেন কেন আজকাল? বেশি ব্যস্ত?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।