আবারও বিজ্ঞাপন

কনফুসিয়াস এর ছবি
লিখেছেন কনফুসিয়াস (তারিখ: বুধ, ২৩/০৯/২০১৫ - ৫:৫৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এক
বহু বছর আগে রহস্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার আহবান জানিয়ে দেয়া বিজ্ঞাপনে চমৎকার একটি কথা পড়েছিলাম, এতদিন বাদেও কথাটা পষ্ট মনে আছে, “ বিজ্ঞাপন না দিয়ে ব্যবসা করা আর অন্ধকারে কোন সুন্দরীর দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসা একই কথা; তুমি জানো তুমি কী করছ, অথচ আর কেউ জানে না।’’ বলেছিলেন, Steuart Henderson Britt। এই লেখাটা লিখতে লিখতেই একবার গুগল করে নিশ্চিত হয়ে নিলাম, গুডরিডসে পাওয়া গেলো, মূল কথাটা এরকম- “Doing business without advertising is like winking at a girl in the dark. You know what you are doing but nobody else does.”। ইংরেজিটা পড়ে আরেকবার চমৎকৃত হলাম সেবা’র অনুবাদে, এত সুন্দর বাংলা অনুবাদ সেবা প্রকাশনী না হলে আসলেই পেতাম না আমরা।

একাডেমিক কিছু কাজে গত কিছুদিন দেশবিদেশের নানা বিজ্ঞাপন দেখে বেড়াচ্ছি। মজার এবং অদ্ভুত সব আইডিয়ার বিজ্ঞাপন দেখে ব্যাপক আনন্দ পেয়েছি বলা যায়। কয়েকটার কথা বলি এখানে।
১/ এই বিজ্ঞাপনটা পৃথিবীর প্রাচীনতম বিজ্ঞাপনগুলোর একটি। একটি রোমান ব্রোথেলের বিজ্ঞাপন। বড় পায়ের পাতা দিয়ে দিক নির্দেশনা দেয়া আছে, কোন দিকে যেতে হবে।

২/ মাত্র এক শতাব্দী আগেও সিগারেটের বিজ্ঞাপন দেয়া হতো ডাক্তারদের রেফারেন্স দিয়ে, এই সিগারেট খেলে গলা চুলকায় না, খেয়ে দেখুন ভাইসকল!

৩/ বউ কীভাবে পেটানো হয় এ নিয়ে বই বের হতো একসময়, সেসবের বিজ্ঞাপনও হতো।

মজার বিজ্ঞাপন লিখে সার্চ করলে আরও অনেকগুলোর খোঁজ পাওয়া যাবে, বেশ ভাল রকমের অবসর বিনোদন, সন্দেহ নেই।

দুই
সাধারণত পত্রিকার ইভার্সনটা পড়া হয় এখন। মানে, স্ক্যান করে যে পাতা গুলো তুলে দেয়া হয় সেগুলো। সত্যিকারের পত্রিকার একটা আমেজ আসে তাতে, এ জন্যেই মূলত। সুবিধা হচ্ছে, শুধু খবরই নয়, খবরের সাথে সাথে মূল পত্রিকায় ছাপা হওয়া বিজ্ঞাপন দেখা যায় স্ক্যানের কল্যাণে। সেদিন প্রথম আলোর চট্টগ্রাম বিষয়ক আঞ্চলিক পাতায় একটা অদ্ভুত বিজ্ঞাপন দেখলাম!
সেই বিজ্ঞাপনের কথা বলছি, তার আগে একটা গল্প বলে নিই।
দেশে গেলে আত্মীয়দের সাথে আলাপের সময় অদ্ভুত সব কথা শুনতে হয়, যেহেতু বহুদিন পর পর দেশে যাই, নিজেকে ব্যাকডেটেড ধরে নিয়ে প্রায় বেশিরভাগ কথাই গিলে ফেলি কোন প্রতিবাদ ছাড়া।
এবারে এক আত্মীয়ের বাসায় যেতে হল, উনার ছেলে সম্প্রতি গাড়ি কিনেছেন একটা। পেশায় ডাক্তার। পরিশ্রমী ছেলে, অল্প সময়ে উন্নতি করছে বেশ। অনেক ভাল লাগে দেখে।
আমি যাবার পরে খানিক আলাপ- সালাপের পরেই সেই আত্মীয় জিজ্ঞেস করলেন, “ তা অস্ট্রেলিয়ায় যেতে এখন কত টাকা লাগে?”
আমি প্রশ্ন বুঝতে পারলাম না, প্রথমে ভাবলাম মেলবোর্ন থেকে ঢাকার প্লেনের টিকেটের দাম জানতে চাইছেন বোধহয়। এটা ওনার কী কাজে লাগবে বুঝতে না পারলেও উত্তর দিলাম সুন্দর করে, “জ্বি, ষাট হাজার টাকার মতো লেগেছে এবার, কমবেশি হয় মাঝে মাঝে।”
উনি হাত নেড়ে আমাকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আরে না না, সেটা না, ওখানে একবারে গিয়ে থাকার জন্যে কত লাগে এখন? শুনেছি তো দশ-পনের লাখ টাকা হলেই নাকি এখন চলে যাওয়া যায়।”
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইলাম, আমার অনেক বন্ধুই সম্প্রতি ওদেশে থাকবার জন্যে আবেদন করেছে এবং করছে, তাদের নানা ঝুট-ঝামেলার গল্প শুনি, নানা নিয়মের বেড়াজাল নিয়ে অভিযোগ শুনি। বেকুবগুলা কোন মতে পনের লাখ টাকা যোগাড় করতে পারে না? ধুর!
গত বছর দশেকের মেলবোর্ন-স্মৃতি এক পলকে চোখের সামনে দিয়ে ভেসে গেলো, পড়াশোনার সেই দৌড়ের ওপর থাকার দিনগুলো থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত নানা স্মৃতি। শুনেছি মৃত্যুর আগে নাকি এরকম ফ্ল্যাশব্যাক দেখা যায়, ওই সোফায় বসেই ঘেমে নেয়ে গেলাম, মরে টরে যাচ্ছি না তো?
নাহ, মরছি না সহজে, মরে গেলে পরের লাইনটা শুনতে পেতাম বলুন?
সোফায় এক পা তুলে দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আমার আত্মীয় ভদ্রলোক বললেন, “এত করে বললাম এখন কিনিস না, তা না, গাড়ি কিনবেই। পনের লাখ টাকা চলে গেলো। গাড়িটা না কিনলে তো অস্ট্রেলিয়ায় চলে যেতে পারতো!”

তিন
প্রথম আলোর সেই পাতায় নিচের বিজ্ঞাপনটা দেখে আমার এই স্মৃতি মনে পড়লো।

আমার আত্মীয় ভদ্রলোক আগেই এই বিজ্ঞাপন দেখেছিলেন কি না বলতে পারবো না, এরকম সাঙ্ঘাতিক বিজ্ঞাপন কেমন করে পত্রিকায় ছাপা হয় জানি না। দেশে বিজ্ঞাপন নিয়ে নীতিমালা বলবত আছে কি না তাও জানি না, কিন্তু এভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে ধোঁকাবাজি করার উদাহরণ খুব একটা চোখে পড়ে না।
কিছুদিন আগে হলে শুধু হেসেই উড়িয়ে দিতাম এটাকে। কিন্তু আমরা এক আজব দেশের বাসিন্দা, যে দেশের লোকে চাঁদের বুকে সাঈদীকে দেখে প্রতিবেশীর ঘর ভেঙ্গে দিয়ে এসে নাক ডেকে ঘুমায় রাতে, কোন অপরাধবোধ ছাড়াই। সে দেশের লোকে এরকম বিজ্ঞাপন দেখে ছুটবেনা এরকম গ্যারান্টি কে দিবে? আর এই বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব কে নিবে? পত্রিকা, নাকি সরকার?

জানা নেই।


মন্তব্য

JituChowdhury এর ছবি

খুব অনায়াসে চমত্কারভাবে সামাজিক ভয়াবহতার দারুন এক প্রতিফলন ঘটালো অত্যন্ত প্রিয় এই লিখক. অনুরোধ রইলো আমাদের অসাধারণ এধরনের লিখা আরো ঘনঘন পড়ার সুযোগ দিয়ে যাবার.

কনফুসিয়াস এর ছবি

ধন্যবাদ হাসি

-----------------------------------
বইদ্বীপ ডট কম

স্পর্শ এর ছবি

এরাই, টেকনাফ নিয়ে ট্রলারে তুলে দেয় ছেলেগুলোকে। ভিসার নাম করে টাকাও নেয়। আবার দাস হিসাবে বিক্রি করেও টাকা। ডাবল লাভ! বাংলাদেশে এটাই সবচেয়ে সাস্টেইনেবল বিজনেস। শিক্ষাব্যবস্থার যে হাল করা হচ্ছে দিনে দিনে...


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

কনফুসিয়াস এর ছবি

মানুষ জন কিন্তু ঠিকই যাবে ওদেরকে বিশ্বাস করে, এটাই মুশকিল।

-----------------------------------
বইদ্বীপ ডট কম

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

কর্মের অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। বাকস্বাধীনতা, অর্থাৎ প্রকাশের অধিকারও তাই। এই দুই অধিকারের হানি করছেন কেন গো বাহে? এই বিজ্ঞাপন না থাকলে দুঃস্থ সম্পাদকেরা খাবে টা কি বলুন? জবাব দিন! আর মানুষের লোভের চেয়ে বড় পণ্য বোধহয় খুব কম আছে দুনিয়াতে, অন্তত ডেস্টিনি আর ধর্মবিক্রেতারা সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে বহুবার। তারচেয়ে লাইনে আসুন। আপনার অভিজ্ঞতা আর ছবি দিয়ে "নুরুল ইমিগ্রেশন এন্ড এডুকেশন" এই মর্মে একখান ফোর-কালার বিজ্ঞাপন পাঠায় দেই। ট্যাকাটুকা ভাগ কইরা লমুনি, রাজি? চোখ টিপি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

কনফুসিয়াস এর ছবি

আমার অভিজ্ঞতা এখন পুরনো হয়ে গেছে, আপনাকে কষ্ট করে নবীনদের খুঁজে নিতে হবে হাসি

-----------------------------------
বইদ্বীপ ডট কম

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

অভিজ্ঞতা দিয়ে হবেটা কি শুনি? পলিসিই হল আসল! লাইনে আসুন। চোখ টিপি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নজমুল আলবাব এর ছবি

হাড্ডি শক্ত হয়, বাচ্চারা লম্বা হয় এমন বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাদের দেশে শিশুখাদ্য বিক্রি হয়। সেখানে, ১৫ লাখে বিদেশ যাওয়াতো কিছুই না।

কনফুসিয়াস এর ছবি

সেটাই।

-----------------------------------
বইদ্বীপ ডট কম

স্যাম এর ছবি

প্রথমটা কি পাথরে?

২০১৩ তে অনেকগুলো টিভে চ্যানেলে হটাত করেই ইসলামী ব্যাঙ্ক স্পনসরড সংবাদ প্রচার শুরু হয়েছিল, এখন চোখে পড়েনা ...... টিভিনিউজ স্পন্সর করার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে হয়তো।

কনফুসিয়াস এর ছবি

পাথরেই হবে। অন দ্য গ্রাউন্ড বলা আছে, মাটিতে হলে স্থায়িত্ব থাকবার কথা না বেশি।

-----------------------------------
বইদ্বীপ ডট কম

প্রোফেসর হিজিবিজবিজ এর ছবি

চলুক

____________________________

অতিথি লেখক এর ছবি

চলুক

দেবদ্যুতি

মেঘলা মানুষ এর ছবি

দৈনিক পত্রিকা পড়তে গিয়ে একবার শর্টকাটে ইউকে যাবার বিজ্ঞাপন গুনতে বসেছিলাম। দু'পাতায় ১৮ গোনার পর আর এগুই নি। তবে সত্যি বলতে মিডিয়া ফার্মের কল্যাণে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন অনেক এগিয়েছে, অনে নতুন নতুন কনসেপ্ট দেখতে পাই এখন।

কর্ণজয় এর ছবি

খুবই ভাল লাগলো- পুরোটাই।মজার তৈরী হাড়। তার ভেতরে জ্ঞানের মজ্জা-

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA