ঘ্যানঘ্যান

সাবিহ ওমর এর ছবি
লিখেছেন সাবিহ ওমর [অতিথি] (তারিখ: শনি, ১০/০৭/২০১০ - ১১:৫৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমার স্মৃতিশক্তি জঘন্য। মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার মাশুল। কিন্তু মুখস্থ কাজে দেয়। সেজন্য জাফর ইকবালের ব্যাপক অপপ্রচারণার মধ্যেও ওটা ধরে রেখেছিলাম। পরে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে শুধু মাত্র অনুভূমিক (নাকি আনুভূমিক?) কোন জায়গায় কোন লেখা পড়লে সেটাই খালি মনে থাকে। আর কিছু মনে থাকে না। যেমন ধরেন কম্পিউটার স্ক্রিনে কিছু পড়লে মনে থাকে না। এ তো মহাবিপদ। কারণ বুয়েটে ঢুকতেই সি প্রোগ্রামিং-এ বসিয়ে দিয়েছে। কোড মুখস্থ করি টেবিলে আনুভূমিকভাবে রাখা বই থেকে, কিন্তু যেই উলম্ব স্ক্রিনে দেখে সেটা টাইপ করতে যাই, সব হাওয়া!

কী করা যায়, কী করা যায়...বুদ্ধি করে বইগুলা চোখের সামনে তুলে ধরে পড়া শুরু করলাম।

কিন্তু এইবার আরো বড় ধরা।

টার্ম ফাইনাল দিতে গিয়ে দেখি পুরা ব্ল্যাকআউট। বাসায় ফিরে ভান করলাম আমার ভীষষণ শরীর খারাপ। এহহু এহহু করে কাশি, আর বালিশে হেলান দিয়ে হরলিক্স খাই।

যথাসময়ে রেজাল্ট দিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না, রেজাল্টটা কতটা খারাপ হয়েছে। চারপাশের লোকজনের বিকারহীন চেহারা দেখে ভাবলাম, চলে। আর ইউনিভার্সিটি লেভেলে এসে গ্রেড নিয়ে কিসের এত লাফালাফি? পাশ, নাহয় ফেল। ফেল যখন করি নাই, তখন নিশ্চয়ই পাশ করেছি। তাও বহুকালের অভ্যাসমত ভ্যান্দামার্কা একটা ছেলের কাছে গিয়ে বললাম, "মন খারাপ নাকি বস? রেজাল্ট কী?"

পোলা ঠোঁট উল্টায় বলে, "নাইন এইট।"

আমি প্রথমে ভাবলাম আমার কোশ্চেন বুঝতে পারে নাই বোধহয়। খাবি খেয়ে আবার জিগ্যেস করি, "কত?"

পোলা আবার সেই অশ্লীল মুখভঙ্গি করে বলে, "নাইন এইট, নাইন এইট। তোমার কত?"

আমি মনযোগ দিয়ে আকাশ-বাতাস দেখতে লাগলাম।

যাই হোক, মুখস্থবিদ্যাজনিত এই ব্রেন ডেমেজের কারণে আরো অনেকবার ভুগতে হয়েছে। এই যেমন রাস্তাঘাট কিছুই চিনিনা। কোথাও যেতে হলে ম্যাপ খুলে মুখস্থ করে নিই...পিকেন্স-ওয়েলি-সামটার-মেইন, পিকেন্স-ওয়েলি-এ্যাঁ এ্যাঁ এ্যাঁ...

আরেকটা প্রবলেম, ঝগড়া করতে পারি না। আমার ধারণা একটা সাক্সেস্ফুল গিয়াঞ্জাম করতে প্রায় ইনফাইনাইট মেমোরি লাগে। কে কবে কাকে কী বলছিল, কোন কনটেক্সটে বলছিল, সে কী বোঝাতে চেয়েছিল এবং কী বোঝাতে চায় নাই, এইসব নিয়ে ভাল আইডিয়া থাকা লাগে। আমার মাথা তো ফাঁকা কলসি, বাড়ি দিলে খালি টং করে একটা আওয়াজ দেয়।

মেমোরির অভাবে ঝগড়া যেমন করতে পারি না, আড্ডাও দিতে পারি না। কারণ যেকোন আড্ডার মেইন টপিক হচ্ছে পরচর্চা, যেটা কিনা বেশ ভালই একটা চর্চার ব্যাপার। যেমন ধরেন আমার খালি মনে আছে একটা মেয়ে একটা ছেলেকে ক্যাফের সামনে চড় দিয়েছিল। আমি তাদের চেহারাও দেখি নাই, খালি ফটাস করে একটা শব্দ শুনেছি। আর অন্যরা? কোন ছেলেকে কোন মেয়ে চড় দিয়েছিল, ছেলে কোন হলের, মেয়ের বাসা কোথায়, তাদের মধ্যে কী প্রবলেম, সেই প্রবলেমে নজরুল হলের অমুক ভাইয়ের কী ভূমিকা, মেয়ের কয় বোন বুয়েটে পড়েছে, তারা আরো কী কী কাহিনী ঘটিয়েছে, সেই কাহিনীতে অমুক স্যারের কী ভূমিকা ছিল এবং তার পেছনে তাঁর কী স্বার্থ লুকানো ছিল-- সব জানে। এদের সাথে আড্ডা দেওয়া সম্ভব?

আমি তাই সমমনা কিছু লোকজনের সাথে ঘুরতাম। আমাদের আড্ডার বিষয়বস্তু ছিল এরকম।

"টম এন্ড জেরি ভুয়া হয়ে গেসে রে..."

"আগেরগুলাই তো দেখায় খালি। নতুন বানায় না মনে হয়।"

"হুঁ যে বানাতো সে মরে গেছে বোধহয়। ওগি এন্ড দ্যা কক্রোচেস দেখস নাকি? বিকালে দেখায়, ভাল আছে।"

"কবে কবে দেখায়?"

"কে জানে, আমি মাঝে মাঝে বিকালে টিভি খুলে দেখি।"

"আমি বিকালে হানা মন্টানা দেখি।"

"হানা মন্টানা কোনটা, মাইলি সিরাস?"

"কে জানে, সব তো একরকম দেখতে..."

সেন্স এন্ড সিম্পলিসিটি। সুখী হতে স্মৃতিশক্তি লাগে না...অকাট্য প্রমাণ।


মন্তব্য

রিম সাবরিনা এর ছবি

তোমার লেখা অইত্থান্ত্য ভালো লাগছে...
রিম সাবরিনা

নিবিড় এর ছবি
যাযাবর ব্যাকপ্যাকার এর ছবি

আমারো এই রকম প্রব্লেম, স্মরণশক্তি বাজে, কাজেই সাকসেসফুল গিয়াঞ্জাম করতে পারি না! মন খারাপ

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

দাঁড়ান, আপ্নের স্মৃতিশক্তি টেস্ট করি...

বলেন তো বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল কেডা দিসে ?? দেঁতো হাসি

_________________________________________

সেরিওজা

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

প্রথম সেমিস্টারে দুই শূন্য পাইয়া মনটা ছিল ব্যাপক খ্রাপ। তিন মাস বন্ধের পর পরীক্ষা হইল। এই তিন মাসে সবাই ধুমায়া পড়াশোনা করছে। আর আমি করছি ইন্টারনেট বাজি। মন খারাপ

এক বান্ধবী জিজ্ঞেস করে, 'কিরে তুই এত খারাপ করলি কেন? কোনটাতে খারাপ করছিস? দেখি তোর গ্রেড শিট।' কইলাম, 'চুপ কর। দুই শূন্য পাইতে গেলে সব গুলিতেই খারাপ করা লাগে।' :-|

পরের সেমিস্টারগুলোতে ঠিক এই ইন্টারনেট/কম্পিউটার বাজির কারনেই উল্টা আমার ব্যাপক উপকার হইছিল। তবে শেষ মেষ এই দুই শূন্যই আমার কাল হইছিল। সিজি সাত চার চারে গিয়ে আটকে গেছিলো। মন খারাপ

====
চিত্ত থাকুক সমুন্নত, উচ্চ থাকুক শির

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

মাইগড... আপ্নেতো গুরু গুরু...

মুর্শেদ ভাই কি তারেক স্যারদের ব্যাচমেট ছিলেন নাকি ?? তারেকুল আলম স্যার - ফৌজদারহাট ক্যাডেট ??

_________________________________________

সেরিওজা

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

হুঁ তারেকের ব্যাচমেট। তারেক তো এখন পেনসিলভেনিয়াতেই, ফিলাডেলফিয়ায় সম্ভবতঃ।

====
চিত্ত থাকুক সমুন্নত, উচ্চ থাকুক শির

অতিথি লেখক এর ছবি

লেখাটা খুবই ভালো লাগল। সামান্য বিষয় অথচ অসাধারণ বর্ণনা। সত্যি চমৎকার।

কুটুমবাড়ি

অতিথি লেখক এর ছবি

অসাধারণ। বিশেষ করে এই অংশটা:
"আর অন্যরা? কোন ছেলেকে কোন মেয়ে চড় দিয়েছিল, ছেলে কোন হলের, মেয়ের বাসা কোথায়, তাদের মধ্যে কী প্রবলেম, সেই প্রবলেমে নজরুল হলের অমুক ভাইয়ের কী ভূমিকা, মেয়ের কয় বোন বুয়েটে পড়েছে, তারা আরো কী কী কাহিনী ঘটিয়েছে, সেই কাহিনীতে অমুক স্যারের কী ভূমিকা ছিল এবং তার পেছনে তাঁর কী স্বার্থ লুকানো ছিল-- সব জানে।"
এরকম লেখা আরো চাই।
ধন্যবাদ ।
ওলি
oli

রাফি এর ছবি

হা হা...মজা পেলাম...
তবে তোমার স্মৃতিশক্তি বেশ ভালোই মনে হয়...খালি ধরতে পারি না ঠিক কী টাইপের জিনিস তোমার স্মৃতিতে কী পরিমাণে আছে...খাইছে

---------------------------------------
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মতন ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!

---------------------------------------
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মতন ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!

সাবিহ ওমর এর ছবি

আপনাদের তো ভুজুং দিই। আপনারা যখন বলেন, "ভার্জিনিয়া টেকের পলাশকে চেন তো বোধহয়..." তখন আমি প্রচণ্ড স্পিডে মাথা ঝাকিয়ে বলি, "হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ পলাশ ভাই পলাশ ভাই, কোন হলে ছিল জানি?" অথবা যখন বলেন, "সাগর তো ফুটবল নিয়ে সেরম ক্রেজি ছিল।" তখন আমি চোখ বড় বড় করে বলি, "ওরেশ-সব্বনাশ, উনি এক প্লেয়ার ছিল..."

টেকনিক, সবই টেকনিক...

আর সুহান ব্রো, আর কয়েকটা বিশ্বকাপের পর তোমার প্রশ্নের জবাব হবে টমাস মুলার...

বোহেমিয়ান এর ছবি

হাহা । ব্যাপক ব্যাপক!
_________________________________________

_________________________________________
ওরে! কত কথা বলে রে!

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

আরেকটা প্রবলেম, ঝগড়া করতে পারি না। আমার ধারণা একটা সাক্সেস্ফুল গিয়াঞ্জাম করতে প্রায় ইনফাইনাইট মেমোরি লাগে। কে কবে কাকে কী বলছিল, কোন কনটেক্সটে বলছিল, সে কী বোঝাতে চেয়েছিল এবং কী বোঝাতে চায় নাই, এইসব নিয়ে ভাল আইডিয়া থাকা লাগে।
কথা সত্য।

সিরাত এর ছবি

মজা পাইসি।

স্পর্শ এর ছবি

দারুণ!


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

দুষ্ট বালিকা এর ছবি

ঘ্যান ঘ্যান ভালু পাইসি! আমিও কিছুই মনে রাখতে পারি না আজকাল! ইয়ে, মানে... বয়েস হয়ে গেসে মনে হয়! ইয়ে, মানে...

-----------------------------------------------------------------------------------
...সময়ের ধাওয়া করা ফেরারীর হাত থিকা যেহেতু রক্ষা পামুনা, তাইলে চলো ধাওয়া কইরা উল্টা তারেই দৌড়ের উপরে রাখি...

**************************************************
“মসজিদ ভাঙলে আল্লার কিছু যায় আসে না, মন্দির ভাঙলে ভগবানের কিছু যায়-আসে না; যায়-আসে শুধু ধর্মান্ধদের। ওরাই মসজিদ ভাঙে, মন্দির ভাঙে।

মসজিদ তোলা আর ভাঙার নাম রাজনীতি, মন্দির ভাঙা আর তোলার নাম রাজনীতি।

বাউলিয়ানা এর ছবি

হে হে হে...দিনপঞ্জি অতি মনোহর হয়েছে।

স্মৃতি শক্তির যেকোন টেষ্টে আমি সর্বশেষ স্থান অধিকারী। আমার চেয়ে খারাপ স্মৃতি শক্তির কোন লোক পৃথিবীতে আছে আমি বিশ্বাস করি না।

নাশতারান এর ছবি

দেঁতো হাসি

_____________________

আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।

গৌতম এর ছবি

একটা সাক্সেস্ফুল গিয়াঞ্জাম করতে প্রায় ইনফাইনাইট মেমোরি লাগে। কে কবে কাকে কী বলছিল, কোন কনটেক্সটে বলছিল, সে কী বোঝাতে চেয়েছিল এবং কী বোঝাতে চায় নাই, এইসব নিয়ে ভাল আইডিয়া থাকা লাগে। আমার মাথা তো ফাঁকা কলসি, বাড়ি দিলে খালি টং করে একটা আওয়াজ দেয়।
বুড়ো আঙ্গুল।

স্মৃতিশক্তি বাড়ানোটা দরকারি। কিন্তু আমাদের পড়ালেখাটা মূলত স্মৃতিশক্তিনির্ভর বলেই জাফর ইকবালরা এটা নিয়ে এতো কথা বলেন। আমিও বলি, কারণ আমার স্মৃতিশক্তি পুরা খ্রাপ! হাসি

.............................................
আজকে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল
এই জীবনের পদ্মপাতার জল - জীবনানন্দ দাশ

শিক্ষাবিষয়ক সাইট ::: ফেসবুক

.............................................
আজকে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল
এই জীবনের পদ্মপাতার জল - জীবনানন্দ দাশ

অতিথি লেখক এর ছবি

চরম লেখা। আপনি তো ভাই আমার বস।
আমার ফ্রেন্ডদের দেখি হলি-বলির সব নাতি-নাতনির নাম,বংশপরিচয় মুখস্ত। কোন ছিঃনেমায় কখন কি হইসিলো, কেন হইসিলো, ওইটার অন্তর্নিহিত মাজেজা কি সব গড়গড় কইরা বইলা দিতে পারে। মানুষ এতো কিসু মনে রাখে কেম্নে?

অতিথি লেখক এর ছবি

কথা সত্য। র‌্যাম আর হার্ডডিস্ক বিহীন কম্পিউটার ই এই দুনিয়ায় সবচেয়ে সুখী।

সজল

রাইয়্যান আউয়াল এর ছবি

আরে এ তো পুরা আমার কাহিনি। ৪টা ০ দিয়ে শুরু করেছিলাম বুয়েট জীবন। প্রথম সেমিস্টারে পেয়েছিলাম ২ দশমিক ৮৩। তখনি বুঝেছিলাম আমাকে দিয়ে এখানে চলবে না। অনেক কষ্টে ৩ টার্ম পার করলেও আর পারি নি। বুয়েট গ্র্যাজুয়েটরা আসলেই অসাধারণ।

তিথীডোর এর ছবি

হো হো হো মজা প্লাম!
আমার মেমরি মাশাল্লাহ ভালোই, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সবই মনে থাকে... ইয়ে, মানে...

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

তিথীডোর এর ছবি

হো হো হো মজা প্লাম!
আমার মেমরি মাশাল্লাহ ভালোই, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সবই মনে থাকে... ইয়ে, মানে...

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।