১
কিছু জিনিস পাল্টানো সম্ভব, কিছু জিনিস পাল্টানো তত্ত্বগতভাবে অসম্ভব। আমি কি ধরনের মানুষ হবো, সেটার সিদ্ধান্ত মোটামুটি হয়তো আমি নিতে পারি, কিন্তু আমার গায়ের রং বা আমার পারিপার্শ্বিকের সাথে সম্পৃক্ত বেশ কিছু চলকে মৌলিক পরিবর্তন আনা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এগুলো আবার পরবর্তীতে কিন্তু আমি কি ধরনের মানুষ হবো সেটাকেও প্রভাবিত করে।
এটি কেবল ব্যক্তির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না, জাতিরাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও। সম্প্রতি স্ট্র্যাটফরে পিটার জাইহান-এর একটি প্রবন্ধে এই জিনিসগুলো কিছুটা উঠে এসেছে। পড়ে বেশ মজা লাগলো, তাই ভাগাভাগি করা।
২
বর্গমাইলের হিসাবে চীন আমেরিকার প্রায় সমানই, অস্ট্রেলিয়া একটু ছোট, রাশিয়া প্রায় দ্বিগুন।
কিন্তু বর্গমাইলের হিসাবে যে জিনিসটা আসে না সেটা হল আমেরিকার 'ব্যবহারযোগ্য ভূমি'। চীন, অস্ট্রেলিয়া বা রাশিয়ার ম্যাপ দেখলেই জিনিসটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
অস্ট্রেলিয়া মূলত এক ধরনের 'রিম সেটলমেন্ট'। মহাদেশটির উপকূল ধরেই মূলত জনবসতি লক্ষ্য করা যায়।
চীনের অবস্থা অস্ট্রেলিয়ার মত অতটা কট্টর না হলেও, খুব দূরেও না। এ ব্যাপারে পরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইলো, তবে হঠাৎ ভাবলে চীনের যেসব শহরগুলোর কথা মাথায় আসে, সেগুলো কিন্তু উপকূলবর্তী। চীনের রুক্ষ অভ্যন্তরে বড় শহর অনেক দূরে দূরে।
রাশিয়ার আলোচনায় আমরা সামনে আসবো, সুতরাং তখনই দেখবো।
৩
তাহলে আমেরিকার কি হলো?
যেটা হলো তা হলো, আমেরিকার চাষযোগ্য ভূমির বিশাল প্রাচুর্য। আমেরিকান মিডওয়েস্ট হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় 'অনবরত' চাষযোগ্য ভূমি (তুলনায় কেবল ভাবুন অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরের কাহিনি!)।
মিডওয়েস্ট যদি আমরা বাদও দেই, পূর্ব বা পশ্চিম উপকূলের ইউরোপ-আয়তনের এলাকাগুলো কিন্তু কোনোভাবেই ফেলে দেয়া যায় না।
৪
এরপর আসি আমেরিকার পানিব্যবস্থায়।
মানচিত্রে একটু খুঁটিয়ে তাকালে বৃহত্তর মিসিসিপি অববাহিকা এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। মিসিসিপি, রেড, মিসৌরি, ওহাইও আর টেনেসি নদী পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সংযোজিত নদীপথ।
গেল নদী। এবার আসুক বন্দর।
স্যান ফ্র্যান্সিসকো, চেসাপিক আর লং আইল্যান্ড/নিউ ইয়র্ক মিলিয়ে আমেরিকার আছে পৃথিবীর তিনটি বৃহত্তম এবং সেরা প্রাকৃতিক বন্দর। সঙ্গে টেক্সাস আর পূর্ব উপকূলের তীর থেকে একটু দূরে ব্যারিয়ার দ্বীপগুলোর কারণে গড়ে ওঠা চমৎকার 'অন্তঃউপকূলীয় (ইন্ট্রাকোস্টাল) পানিপথ'। এই ব্যারিয়ার দ্বীপগুলোর কারণে আবহাওয়ার প্রকটত্ব থেকে অনেকটাই রক্ষা পায় মার্কিন বেসামরিক জাহাজবহর।
৫
তবে এখানে সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হল জল আর স্থলের অসাধারণ প্রতিসাম্য (বা সিমেট্রি)। অন্তঃউপকূলীয় পানিপথ আর বেশিরভাগ উপসাগরীয় বন্দরগুলো উপকূলীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে, আর মিসিসিপি বেসিন নিশ্চিত করেছে আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। খাল ইত্যাদি ছাড়াও, মোটামুটি বড় আকারেরও যে কোন নৌযান উপকূল থেকে শুরু করে মিডওয়েস্টের গভীরের বড় শহরে ঢুকে পড়তে পারে।
৬
এতে আমেরিকার বিশাল একটা সুবিধা হয়েছে: শস্য পরিবহন। এখানে বাংলাদেশের পানিব্যবস্থার সাথে উপমা আসতেই পারে, তবে পার্থক্য হল আকারে। অনেকটা (তবে পুরোটা না, বাংলাদেশের ইতিহাস ভাবুন) এ কারণেই আমেরিকার খাদ্য নিরাপত্তার কোন অসুবিধা কখনোই হয়নি; আমেরিকার ইতিহাসে বড় ধরনের কোন দুর্ভিক্ষ কখনোই হয়নি। খুব সস্তায়, সহজে বিশাল পরিমাণে খাদ্য পরিবহন করা সম্ভব হয়েছে। আমেরিকান কৃষকদের বরং চিন্তা ছিল অতিরিক্ত উৎপাদনে দাম নাকি কমে যায়, যেটা একেবারে নিয়মিতই হতো।
এটি শুধু যে শস্য উৎপাদনে সাহায্য করেছে তা-ই না, অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিশাল সুবিধা করে দিয়েছে। তবে খাদ্য নিরাপত্তা যেহেতু মৌলিক ব্যাপার, সে কারণে এর গুরুত্বও ততোধিক।
৭
অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই, এই বিশাল ভৌগোলিক সুবিধার অর্থনৈতিক প্রভাবও আছে। 'ঈশ্বরের কৃপায়' আমেরিকা অসাধারণ একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেয়েছে। এ ধরণের একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা পেতে অন্যান্য দেশগুলোর বিশাল পরিমানে মূলধন বিনিয়োগ করতে হয় (আফগানিস্তান দিয়ে শুরু করুন, চীন রাশিয়া দিয়ে শেষ করুন)।
সুতরাং, আবারও, অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি মূলধন-ধনী দেশ। জাইহান এটিকে 'আইসিং ইন দ্য ফ্রি কেক' বলে উল্লেখ করেছেন; কেকটি ইতোমধ্যেই মাগনা, কিন্তু তারপরও, আমেরিকা এত মূলধনে ভাসছে যে বাকিটা দিয়ে পৃথিবীসেরা একটি যোগাযোগব্যবস্থা বানাতে তাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি।
তবে এর মূল প্রভাব হল, এই বিশাল মূলধনের ব্যবহারযোগ্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে 'ক্যাপিটালিস্ট' কেন বলে একটু ভাবুন তো। ![]()
পরের পর্বে আমরা ভৌগোলিক অবস্থানের এই বিশ্লেষণটা কিছুটা আগাবো, বিশেষত আমেরিকার প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে। তাছাড়াও, আমেরিকার 'স্বাভাবিক' অর্থব্যবস্থা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করবো। ![]()
তবে যাওয়ার আগে শুধু একটাই কথা বলে যাই: জাইহানের বিশ্লেষণ পড়ে আমার কেন যেন মনে হয়েছে, আমেরিকা আসলে যে পরিমান প্রাকৃতিক সম্পদে ভর্তি, দেশটা সে তুলনায় কিন্তু অত ধনী না!
আপনাদের কী মত?
মন্তব্য
১.
২. ভালো আলোচনা। এই দিকটা ভাবা হয় নি। এটা অবশ্যই একটা বড় সুবিধা, তবে এই সুবিধা আরও অনেক দেশের আছে; কিন্তু সেগুলো তারা ব্যবহার করতে পারে নি। অন্যেরা পারে নি, আমেরিকা কেন পারলো- সেটা নিয়েই বরং আরেকটা আলোচনা হতে পারে।
৩. বাংলাদেশ কেন এত গরীব- এই নিয়ে কোনো আলোচনা নাই?
.............................................
আজকে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল
এই জীবনের পদ্মপাতার জল - জীবনানন্দ দাশ
শিক্ষাবিষয়ক সাইট ::: ফেসবুক
.............................................
আজকে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল
এই জীবনের পদ্মপাতার জল - জীবনানন্দ দাশ
বাংলাদেশের শিক্ষা ::: শিক্ষাবিষয়ক সাইট
বাংলাদেশ তো চার-পাঁচশো বছর আগেও তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি পর্যায়ে ধনী/
স্বচ্ছল ছিল, যদিও তুলনাটা আপেল-কমলামার্কা হয়ে যাচ্ছে। গত দুই শতকে কিছু বাজে এক্সটার্নিলিটি, কিছু দূর্ভাগ্য, আর কিছু 'অঘটন' একেবারে চেপে ধরেছে আমাদের।
যাহোক, বিস্তারিত লিখতে না পারার মূল কারণ জ্ঞানাভাব। হয়তো এ সিরিজটার শেষে চেষ্টা করবো একটা, তবে ভাসাভাসা লিখা রিস্কি; এটা তো কপি-পেস্ট কেস। এ ব্যাপারে জ্ঞানী সচলরা কিছু করেন!
ন্যাচার ভার্সেস নার্চার আর্গুমেন্ট আসতেই পারে। এখানে প্রথমত আছে বিশাল ভৌগোলিক সুবিধা, সুতরাং পরের ধাপগুলি অনেক সহজ হয়েছে। স্থানের সাথে কালের ব্যাপারও আছে, সঙ্গে বাহ্যিক চলক, যেমন উপরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বললাম।
আমেরিকার মত সুবিধা নিয়ে অন্যান্য দেশ কেন পারলো না, সেটা নিয়ে একটা আলোচনা হতে পারে। আগে ওরকম একটা দেশ দরকার যদিও।
চলুক
ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...
ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...
এই লেখাটা ভালো লেগেছে। লেখার দৈর্ঘ্যটাও আরামদায়ক। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
অফটপিক: 'পরিবেশী' বলতে কী বুঝিয়েছেন?
|| শব্দালাপ ||
আই হাই! আমি আসলে প্রতিবেশী বলতে চেয়েছিলাম। এডিট করে দিয়েছি!
অনেক ধন্যবাদ ধরিয়ে দেয়ার জন্য!!
সময় থাকলে উপরের লিঙ্কেও(শব্দালাপ) একটা গুঁতা মেরে আসেন।
মন্তব্য করতে পারতেসি না ওখানে - ডান। কেবল ক্যাপিটালিস্টটা উদ্দেশ্যমূলক।
আমি সিরাতের লেখা বেশী পড়ি না, হয় মাথার উপর দিয়ে যায়, অথবা মাথার ভিতর ঢুকাতে একটু পরিশ্রম করতে হয়। আমার মত আলসে মানুষ পরিশ্রমকে ভয় পায় :)।
যেহেতু আমি আম্রিকা প্রবাসী, তাই কৌতুহলবসত এই লেখাটা পড়লাম, এবং বুঝেও ফেললাম মোটামুটি। আমেরিকার ভৌগলিক সুবিধার কথা এদিক ওদিক পড়েছি, তবে এই তুলনামূলক আলোচনা ভাল লাগল।
আমার কাছে এদেশের যেই জিনিশ সবচেয়ে ভালো লাগে, তা হল এদের নিয়মানুবর্তিতা। হয়তবা অনেক ফাঁকফোকর আছে, তারপরও মোটামুটি সাধারণভাবে সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। হয়তবা বাধ্য বলেই, কিন্তু মানুষকে এই বাধ্য করাতেও আইন-নিয়মের প্রয়োগ করতে হয়েছে।
আমি বলতে চাচ্ছি, ভৌগলিক সুবিধার পাশাপাশি এই অভ্যাসটাও এদের উন্নতির সহায়ক।
এর পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম, আশা করি সেগুলিও বুঝতে পারব
।
-লাবণ্য-
ফাহ_বেগম@ইয়াহু
লেখাটা পড়ে ভাল লাগল।
পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।
আমেরিকা, ইউ.কে. আর জাপান ... তিন উন্নত দেশের ভৌগলিক সীমানা রক্ষা করা অন্যদের তুলনায় সহজ মনে হয়। ইউ.কে. আর জাপান দ্বীপ রাষ্ট্র। আমেরিকা পুরাপুরি দ্বীপ না হলেও সীমানার বিরাট অংশই উপকূল। এই ব্যাপারটা আমাকে আগে বেশ ভাবাতো।
পাশে এক বা একাধিক দেশ থাকলেই সীমানা দিয়ে কামড়া-কামড়ি চলতে থাকে। আর ওটাতে সুরক্ষা দিতে অনেক সম্পদ ব্যয় হয় ... যদিও এই হাইপোথেসিস সমস্ত উন্নত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে না।
________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।
________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।
পরের পর্ব - সচলায়তনে আমার ব্লগে বা কফি হাউসের আড্ডায়।
সিরাত ভাইয়ের এই লেখাটা অনেক পরিষ্কার হইসে। বিষয়বস্তুর কারণেই হোক আর অবোধ্য কোন কারণেই হোক- এইটা মোটামুটি বুঝছি।
অফটপিকঃ আপনের কাছ থেকে আম্রিকার ইতিহাসে ফ্রী-ম্যাসনদের ভূমিকা নিয়া একটা লেখা আশা করি।
_________________________________________
সেরিওজা
_________________________________________
সেরিওজার গল্প
নতুন মন্তব্য করুন