মিশর এবং মধ্যপ্রাচ্য

সিরাত এর ছবি
লিখেছেন সিরাত (তারিখ: রবি, ৩০/০১/২০১১ - ১১:০২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বিপ্লবের পরেরদিন

মিশরের বিপ্লব-পরবর্তী অবস্থা নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা আছে।

দিন গড়ানোর সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে মিশরীয় সেনাবাহিনীর প্রভাব বাড়ছে। মুবারকনিযুক্ত শফিক, সুলায়মান এবং এখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী তানতানউয়ি তিনজনই সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ডের। সুলায়মান যদিও 'ইন্টেলিজেন্স' শাখার, সরাসরি সেনা নন; শফিক এয়ারফোর্সের, যেটি মিশরের সবচেয়ে সম্মানজনক উইং। এখানে সেনাপ্রধান সামি আনানের কথা বাদই দিলাম।

সেনাবাহিনী সামলাতে পারবে কিনা তা নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা আছে। '৮১-তে সাদাতকে সেনাবাহিনীরই মধ্যমপর্যায়ের অফিসাররা হত‌্যা করেছিল। ওসময় মুবারক ছিলেন সেকেন্ড-ইন-কমান্ড।

মিশরীয় সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের রক্ষক, সেটা মানা গেলেও, কিভাবে রক্ষা করা হবে, সে ব্যাপারে সেনাবাহিনীতে নানামত স্পষ্ট।

এর কারণ?

মিশরীয় সমাজের অংশই মিশরীয় সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর নিম্নস্তরে জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে ইসলামপন্থা বেশ জনপ্রিয়।

ইসলাম এবং মিশর

আশি এবং নব্বই এর দশকে মিশর অত্যন্ত দ্রুতগতির ওয়াহাবিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ষাট লাখের উপরে মিশরীয় শ্রমিক সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে নানাবর্ণের সালাফিধারার সাথে পরিচিত হয়। হ্যাঁ, মিশরের কুতবী ওয়াহাবী ধারার সাথে সৌদি মূলধারার সালাফধারার তফাৎ আছে, কিন্তু সেটা কড়াপ্রয়োগকারীই কেবল ধরতে পারে। মূলকথা, সালাফধারা মিশরে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দ্রুত বাড়তে থাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের জনপ্রিয়তা। এখানে আরো মনে রাখা দরকার হাসান-আল-বান্না এবং সৈয়দ কুতবের কাহিনী, যাদের মূল কর্মসূচী মিশরভিত্তিকই ছিল।

পশ্চিমা রক্ষণশীল পর্যবেক্ষকরা মিশরীয় সমাজে ইসলামের পেনেট্রিশন নিয়ে বেশ ভীত। আগে হোক, পরে হোক, তাদের মতে ইসলামপন্থী একটি সরকার আসবেই।

কিভাবে?

হয় সেনাবাহিনীর পতনের মধ্য দিয়ে, যেটা যে কোন মুহূর্তেই হতে পারে হঠাৎ এক রক্তস্নাত বিকেলে। তখন আর মুসলিম ব্রাদারহুডকে থামায় কে?

বা সেনাবাহিনীতেই ক্যু এর মধ্য দিয়ে। বা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে - মুসলিম ব্রাদারহুড মিশরের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল, মুবারকের সরকারি দল ছাড়া। তখন আমেরিকা-ইসরায়েল-মিশর ভারসাম্যের কি হবে?

পরিবেশ পরিচিতি

ইরান

ইরানের '৭৯ বিপ্লব ছিল মূলত শিয়া ধর্ম-সমাজদর্শন তথা ভেলায়েত-ই-ফাকিহর জয়। সুন্নী ইসলামের তথা সুন্নী আরবদের ফুলক্রাম আশির দশক পর্যন্ত নিঃসন্দেহে ছিল মিশর। এরপর তেলের টাকায় সৌদি সালাফধারার বিশাল উদ্ভব ঘটে, যেটা মিশরকেও পাল্টে দিয়েছে। মিশরে ইসলামিক বিপ্লবে সুন্নী চরমপন্থার হাত থাকবে না সেটা ভাবা বাতুলতা। সম্প্রতি উইকিলিকসের ফাঁস করা কেবলেও দেখা গেছে সৌদি আরব আর মিশরীয় শাসকগোষ্ঠীকে, চুনোপুঁটি জর্দান-কাতারসহ - আমেরিকাকে ইরানকে আক্রমণ করতে হাতে-পায়ে ধরতে।

লেবানন এবং শিয়া-সুন্নী ভারসাম্য

সম্প্রতি লেবাননে সরকারপতন আর ইরাকে সরকার গঠনের পর মধ্যপ্রাচ্যে শিয়াশক্তিও উত্থানের মুখে - অনেকটা যেমনটি ভালি নাসর তার 'দ্য শিয়াইট ক্রিসেন্ট' বইয়ে বলেছিলেন। ইরান মাঝখানে খুবই শক্তিশালী ছিল, কিন্তু 'দ্য রেভ্যুলুশন বিজনেস' (চার্লি স্ট্রসের একটি বই হাসি ) ইরানকেও একটু লেজেগোবরে করে ফেলেছে, নাহলে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়াবিজয় ষোলআনা সাধিত হইতো।

ইসরায়েল

এখন ইসরায়েলের কেরোসিন অবস্থা বলাই বাহুল্য। দিন দুয়েক আগে নেতানিয়াহুরা বললেন মোসাদ ইত‌্যাদি নিশ্চিত করছে আসলেই কিছু হবে না। এখন দেখা যাচ্ছে ইসরায়েলিরাই '৭৯-র শান্তিচুক্তির থোড়াই কেয়ার করে মিশরীয় সৈন্যদের রীতিমত ঠেলেঠুলে রাফাহ ক্রসিং-এ নিয়ে আসছে?

কেন?

কারণ নিউ ইয়র্ক টাইমস আর স্ট্রাটফর যা বলছে - রাফাহ দিয়ে গণহারে হামাস সৈন‌্যরা মিশরে ঢুকছে আর মুসলিম ব্রাদারহুডের ভাইয়েরা তাদের আশ্রয় দিচ্ছে।

এখানে ঘটনা একটু কেমন যেন লাগে। হামাসের সাথে ইরানের সম্পর্ক দারুণ, অন্তত এই ক‌য়দিন আগে তকও ছিল। মুসলিম ব্রাদারহুডের মত কড়া সুন্নী গোষ্ঠীর সাথে (যদিও এটা হামাসের ক্ষেত্রেও অপ্রযোজ্য নয় তা না) ইরানের সম্পর্ক খুব একটা ভাল নয়। তাহলে এখানে হচ্ছেটা কি? ইরানের চালটা কি এখানে?

তুরস্ক

তুরস্কের অবস্থাটা "খালি আমাদের সময়ই কেন এমন হয়" ধরণের। কয়দিন আগেই লেবাননের মাধ্যমে মোটামুটি সৌদি-মিশর-ইরান প্রায়-নিরপেক্ষ (যদিও সুন্নী) তুরস্ক যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজা মেনে নিলো। এখন যদি মাঘরেবে, বিশেষত মিশরে আবার ইসলামপন্থার উদ্ভব হয়, তুরস্ককে গদি আবার ছাড়তেই হবে কেবল ভৌগোলিক অবস্থার জন্য হলেও।

বিপ্লবের পরেরদিনের পরেরদিন

এদিকে তিউনিসিয়ায় জনপ্রিয় ইসলামপন্থী নেতাদের আগমন ঘটছে। তাহরির চত্বরের বিপ্লবের ধরণের সাথে ইসলাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর ওদিকে পশ্চিমের শিক্ষা হয়েছে গাজার নির্বাচন নিয়ে, রিপাবলিকানরা গণহারে বলে বেড়াচ্ছে গণতন্ত্র চাই না, উদার গণতন্ত্র চাই, যদিও প্রচুর খবর পাওয়া যাচ্ছে যে মার্কিনীরা মিশরে বিরোধীদের সমর্থন দিচ্ছে, মূলত মিশরের (তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র) বামকে।

সমীকরণ খুবই ঘোলাটে।


মন্তব্য

দিগন্ত এর ছবি

সবাই টিউনিশিয়া থেকে বিপ্লব শুরু হচ্ছে বলে মনে করেছেন, আমার মনে হয় শুরু হয়েছে সুদান থেকে। সুদানে দেখে টিউনিশিয়া আর মিশরে মানুষের মনে ধারণা হয়েছে পিপলস উইল কাজ করে। তাই ভেতরে চোরাস্রোত থাকলেও সুদান আর উইকিলিকসের ঘৃতাহুতি পড়ায় মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত। তবে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত হয়ে গেছে বললে বাড়াবাড়ি হবে। সৌদি, ওমান বা কাতারে বিশেষ কিছু হবার নয়। পরবর্তী ক্যান্ডিডেট দেশ হল ইয়েমেন।

তবে মিশরের খ্রীষ্টানদের কপালে দুর্গতি আছে। এমনিতে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে গণতান্ত্রিক উপায়ে তাদের উৎখাত করা হবে, সামরিক সরকার থাকলে সংখ্যালঘুদের ওপর বন্দুক তাক করে পয়েন্ট ঘরে তোলার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

সুদানে পট পরিবর্তন ও মিশরে সম্ভাব্য গণতন্ত্র নীলনদের জলের শেয়ারের ইকুয়েশন ঘোলা করে দেবে - এ নিয়ে আমার সন্দেহ নেই।

আপনার লেখায় ভবিষ্যত কি হতে পারে তা নিয়ে কিছু লেখা দেখি না।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

সিরাত এর ছবি

ভবিষ‌্যতের কয়েকটা সিনারিও বললাম তো।

অতিথি লেখক এর ছবি

@ দিগন্ত ,
সুদানের অবস্থা আর তিউনিশিয়া-মিশরের অবস্থা ব্যতিক্রম ।
সুদানেরটা জাতিগত সংঘাত ; সরকার বনাম জনগণ নয় ।

-------------------------------
নিক : সবুজ পাহাড়ের রাজা ।

অতিথি লেখক এর ছবি

@ দিগন্ত ,
সুদানের অবস্থা আর তিউনিশিয়া-মিশরের অবস্থা ব্যতিক্রম ।
সুদানেরটা জাতিগত সংঘাত ; সরকার বনাম জনগণ নয় ।

-------------------------------
নিক : সবুজ পাহাড়ের রাজা ।

দিগন্ত এর ছবি

জাতিগত সংঘাত বটে কিন্তু সরকার এদের একটি জাতির প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করেছে। সুতরাং এটাও সরকার বনাম এক অংশের জনগণের লড়াই ছিল। জনগণ জিতে গেছে, দারফুরের হত্যাকাণ্ডের পরেও। বিপ্লবী চেতনা জাগার যথেষ্ট কারণ আছে সুদানের ঘটনায়।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

অতিথি লেখক এর ছবি

কিছুদিন আগে স্বাধীনতার প্রশ্নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো দক্ষিণ সুদানে ।
দারফুর পশ্চিম সুদানে । দারফুর এখনো অমীমাংসিত ।
দক্ষিণ সুদান বা, দারফুর দুটিই জাতিগত দ্বন্দ্ব ।

---------------------------------------------------
নিক : সবুজ পাহাড়ের রাজা ।

অতিথি লেখক এর ছবি

জটিল অবস্থা। কি যে হবে বুঝতে পারছি না।

মনমাঝি

রেশনুভা এর ছবি

আজকে ইটিভিতে 'এ সপ্তাহের বিশ্ব' অনুষ্ঠানে আবীর হাসান (নাম একটু এদিক ওদিক হতে পারে) নামের এক সাংবাদিক বললেন মিশরের এই অভ্যুত্থান হচ্ছে পশ্চিমাদের অঙ্গুলি হেলনে। আমার মনে হয় অভ্যুত্থান সফল হলেও হয়ত নেতৃত্বের গুণগত মানের কোন পরিবর্তন আসবে না।

দিগন্ত এর ছবি

দেখেন এত বড় আন্দোলন পশ্চিমাদের অঙ্গুলীহেলনে হওয়া সম্ভব হলে পশ্চিমারা আর কোনোদিন মিশর নিয়ে মাথাই ঘামাতেন না। আমাকে কেউ আন্দোলনে নামতে বললেই আমি কেন নামব? কিছু মানুষের সব-কিছুতেই পশ্চিম টেনে আনা প্রাচ্যের দেশগুলোর সেলফ কনফিডেন্সের অভাব ছাড়া আর কিছু প্রকাশ করে না। পশ্চিমের ষড়যন্ত্র আর অঙ্গুলীহেলনে কিছুই হয়না আজকাল।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

সিরাত এর ছবি

চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

মিশরীয় বিপ্লব পশ্চিমাদের ইন্ধনে? দেঁতো হাসি এমনকি ফক্স নিউজকেও এরকম হাস্যকর কথা বলতে শুনিনি।এতগুলো লোক জীবন দিয়েছে পশ্চিমাদের ইশারায়?পশ্চিমারাই বা কেন দিলের দোস্ত মোবারককে সরাতে চাইবে?

পলাশ মুস্তাফিজ

ফাহিম হাসান এর ছবি

নতুন লেখা পেয়ে খুশি! দেঁতো হাসি

মিশরের সেনাবাহিনী শুনলাম ট্যাঙ্ক নামালেও পুলিশের মত ফায়ার করে নাই। এখনো কেউ কেউ তাহলে মানুষের বাচ্চা আছে।

দিগন্ত এর ছবি

কে ফায়ার করবে? সেনাবাহিনীর বড় অংশ জনগণের সমর্থনে। সেনাদের গুলি চালানোর অর্ডার দিলে সিভিল ওয়ার লেগে যাবে।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

ফাহিম হাসান এর ছবি

কথা সত্য

অতিথি লেখক এর ছবি

আরবরা যেভাবে ওহাবী-সালাফী মতবাদ অনুসরণ করে সেটার সাথে ভারতীয় ওহাবী মতধারার পার্থক্য রয়েছে । উদ্ভব একই উৎস হতে হলেও প্রয়োগক্ষেত্র আলাদা । আমাদেরটা অপ্রয়োজনীয় উগ্র ।
আর আরব-ইরানে শিয়া-সুন্নী তর্কটা শাসক নির্বাচনকেন্দ্রিক(আরব শাসকরা শিয়াদের বা, ইরানকে সমীহ বা, অপছন্দ করার কারণও এটি) ; ভারতীয় উপমহাদেশের মত ধর্মকেন্দ্রিক নয় ।

আর আরব জনজাগরণ হয়েছে এটাকে আরবদের জন্য আর্শীবাদ হিসেবে দেখছি ।
জনগণই শক্তি - এটি আরবরা অনেকদিন হলো বিস্মৃত হয়েছে ।
এখন জেগে উঠার সময় ।

--------------------------
নিক নেম : সবুজ পাহাড়ের রাজা ।

দিগন্ত এর ছবি

আমার জানামতে ভারতীয় উপমহাদেশে শিয়া-সুন্নী বিতর্কটা অনেকটাই কম। তবে হায়দ্রাবাদে শিয়াদের দেখেছি সাদ্দামের ফাঁসীর পরে খুশী ভাব ...


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

শামীম এর ছবি

ইত্তেফাকের গতকালের খবরটা একটু বিশ্লেষন করে দিবেন নাকি কেউ?

মিসরের বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন

চৌদ্দ কোটি ডলার ঢেলেছে দেশটি,

তথ্য উইকিলিকসের

০০ প্রতাপ চন্দ্র

মিসরের সরকারবিরোধী নজিরবিহীন বিক্ষোভ খোলা চোখে যেমনটি দেখা যাচ্ছে তার আসল আদলটি সেরকম নয়! মিসরীয় প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের রক্তচক্ষুকে দেশবাসী এখন আর ভয় পাচ্ছে না তার কারণও অতটা সরল নয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তিউনিসিয়ার সাম্প্রতিক সফল গণ অভ্যুত্থানে সরকার পতনে উদ্বুদ্ধ হয়ে মিসরীয়রা এতটা 'সঞ্জীবনী শক্তি' লাভ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকসের ফাঁস করা একটি নথি থেকে দেখা গেছে, মিসরের এই বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের অদৃশ্য হাত আছে! মিসরে সরকার পরিবর্তন জন্য যুক্তরাষ্ট্র গত তিন বছর আগে থেকেই গোপনে তৎপরতা শুরু করেছে। এই উপলক্ষ্যে খরচ করেছে প্রায় ১৪ কোটি মার্কিন ডলার।

ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া মূল নথিটিসহ গতকাল এই খবর প্রকাশ করেছে। দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এই উদ্দেশ্যে কায়রোতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস সন্দেহজনকভাবে একজন মিসরীয় ভিন্নমতাবলম্বীকে গোপনে নিউইয়র্কে 'অ্যালায়ান্স অব ইয়ুথ মুভমেন্ট সামিট' শিরোনামের একটি গণতান্ত্রিক সম্মেলনে অংশ নিতে সহায়তা করেছিল। ওই সম্মেলনের খরচ বহন করেছি মার্কিন সরকার। মিসরের রাষ্ট্রীয় পুলিশের কাছে ওই ব্যক্তির পরিচয় বিস্ময়করভাবে সম্পূর্ণরূপে গোপন করেছিল মার্কিন দূতাবাস। ওই লোকটি ২০০৮ সালে মিসরে ফিরে এসেই মার্কিন কুটনীতিকদের আন্দোলনের নকশা প্রণয়নের 'সুখবরটি' দিয়েছিলেন। ফাঁস হওয়া নথি থেকে দেখা যায়, তিনি মার্কিন কুটনীতিকদের বলেছিলেন, ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারককে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে মিসরে একটি গণতান্ত্রিক সরকার বসানোর জন্য চমৎকার নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।

মিসরে যে সরকারবিরোধী তুমুল বিক্ষোভ চলছে তাতে ওই ব্যক্তিও অংশ নেন। তবে তিনি বিক্ষোভ-মিছিল থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আটক আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই গোপন তৎপরতার খবর হোসনি মোবারকের কাছে মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো।

উইকিলিকসের যে গোপন নথিটি থেকে এই খবর জানা গেছে, কায়রোর মার্কিন দূতাবাস থেকে তা পাঠিয়েছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্গারেট স্কুবি। তিনি নিজেই ওই বার্তাটি লিখে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ করেছিলেন ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। তিনি ওই বার্তার লেখেন, বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে ফেলে দেয়ার জন্য মোবারক-বিরোধীরা একটি গোপন নকশা প্রণয়ন করেছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে পাঠানো এই গোপন তারবার্তাটি তিনি 'অতি গোপনীয়' শ্রেণীভুক্ত করেছিলেন। বার্তার শিরোনাম দিয়েছিলেন, '৬ এপ্রিলের সেই প্রতিনিধির যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং মিসরে সরকার পরিবর্তন বিষয়ক'।

জানা গেছে, মিসরীয় সরকার পতন আন্দোলনের পরিকল্পনাকারীদের যুক্তরাষ্ট্র অর্থ দিয়েছিল গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার নামে। ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট (ইউএসএআইডি) ২০০৮ সালে দেশটিতে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন সংগঠনকে ৬ কোটি ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার ও ২০০৯ সালে ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার দান করে। গণতান্ত্রিক শাসন প্রণয়ন, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব অর্থ খরচ করার কথা ছিল। এভাবে যুক্তরাষ্ট্র মোবারক বিরোধী বাহিনী গড়ে তুলতে সরাসরি কাজ করেছে বলে উইকিলিকসের তথ্যে ধরা পড়েছে।

উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া তারবার্তাটি থেকে দেখা যায়, মার্কিন রাষ্ট্রদূত লিখেছিলেন, 'প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের বিরোধী বেশ কয়েকটি পক্ষ মিসরে সংসদীয় গণতন্ত্র আনার জন্য কাজ করতে অলিখিত চুক্তি করেছে। তারা দুর্বল প্রেসিডেন্ট শাসন থেকে বের হয়ে প্রধানমন্ত্রীর শাসন চায়। মিসরে আগামী ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা। আন্দোলন বিক্ষোভের মাধ্যমে তাই কাজটি সারতে হবে ২০১১ সালের নির্বাচনের আগেই। মার্কিন কুটনীতিক ওই তারবার্তায় আরো লেখেন, মোবারক বিরোধীরা তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার ব্যাপারে একমত হয়ে চুক্তি করলেও তাদের লিখিত সমর্থন নেয়া হয়নি। কারণ এসব স্পর্শকাতর তথ্যের লিখিত প্রমাণ রাখা ঠিক হবে না। তিনি ওয়াশিংটনকে অনুরোধ করেন, কোনোভাবেই যেন ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ না করা হয়। তাহলে মিসরে ফিরে তার বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। গোটা নথিতে লোকটির পরিচয় উলেস্নখ করা হয়েছে মিস্টার 'এঙ্' হিসাবে।

মিসরের সাম্প্রতিক আন্দোনের প্রকৃতি বিশেস্নষণ করে দেখা যায়, উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্যের সাথে বিক্ষোভ শুরুর প্রেক্ষাপটের দারুণ মিল রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকে 'এপ্রিল ৬ ইয়ুথ মুভমেন্ট' নামের একটি গ্রুপ সরকাবিরোধী একটি পৃষ্ঠা খুলে সমমনা ও সরকারবিরোধী সমর্থকদের জড়ো করে। এই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এই গ্রুপটিই আন্দোলনের ডাক দিয়ে সদস্যদের রাজপথে এনেছিল গত মঙ্গলবার। এরপর শুরু হয় মোবারকবিরোধী দুর্বার বিক্ষোভ।

________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।

অতিথি লেখক এর ছবি

গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুক ও টুইটারে উইকিলিক্সের প্রায় সবগুলো পোস্ট দেখে আসছি, মিশর নিয়ে ফাঁস হওয়া সবগুলো তারবার্তা নিয়ে গার্ডিয়ানের বিশ্লেষন পড়েছি।এরকম অদ্ভুদ কোন খবর কোথাও দেখিনি।

স্বাধীন এর ছবি

খুশি হতাম তিউনিসিয়া, মিশরের হাওয়া জর্ডান, ইয়েমেন পেরিয়ে যদি সৌদি আরবে গিয়েও লাগতো। তবে সৌদিতে মনে হয় না বিপ্লব হওয়া সম্ভব। বিপ্লব হওয়ার জন্য যে নিগৃহীত জনগন দরকার সেরকম জনগণ তো নেই। তারপরেও মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে তার কিছু উত্তাপ তো লাগবেই। দেখা যাক, কি হয়। মুবারককে মনে হয়ে যেতেই হবে। কাল আরো বড় রকমের সমাবেশ রয়েছে। এবং সেনাবাহিনী জনগণের সরাসরি বিপক্ষে যেহেতু যায়নি, তখন মুবারকের পরাজয় কেবল সময়ের ব্যাপার বলে মনে হয়।

দিগন্ত এর ছবি

পশ্চিমা ষড়যন্ত্র নিয়ে যারা মাথা ঘামান তাদের জন্য একটা নতুন তথ্য। মিশরে বিক্ষোভ হলে তা পশ্চিমা-বিরোধী কিন্তু চিনে হলে সবাই বলবে এটা পশ্চিমের মদতেই হচ্ছে। চিন সরকার অবশ্য সতর্ক, তাদের দেশে তারা মিশর শব্দটা সার্চ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। মিশরের বিষয়ে কোনো সাড়াশব্দও পাওয়া যাচ্ছে না চিন থেকে। অনেকেই কিন্তু তো চিনকে মিশরের পরবর্তী স্টেশন হিসাবে দেখছে।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

কৌস্তুভ এর ছবি

চীন এক্ষুণি পরবর্তী মিশর হবার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। এ নিয়ে একটুখানি লিখেছিলাম আগে। অবশ্য চীনের অবস্থা USSRএর মত হলে ভালোই হবে। কিন্তু ওদের লোকজন এখনও গণ্ডগোল বাধানোর মত অসুখী নয়। লাগব লাগব করেও আন্দোলন লাগছে না বরং পাকিস্তানে, তাই একটা ফেইলড স্টেট হয়েও এখনও টেনে দিচ্ছে।

এই শিয়া-সুন্নী গণ্ডগোলের ব্যাপারটা খোলসা করে বলে একখানা পোস্ট দাও না। আমার মাঝে মাঝেই ঝাপসা হয়ে যায়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA