১৯৫০ এর বরিশাল থেকে ২০০২ গুজরাট, জীবন্ত চোখের উপাখ্যান। ০৫

তাপস শর্মা এর ছবি
লিখেছেন তাপস শর্মা [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ২০/১২/২০১১ - ১০:৩০অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

গুজরাটের গণহত্যার পর হর্ষ মান্দার নামে এক আই.এ.এস. অফিসার রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে, রাষ্ট্রের দেওয়া চাকরি ছেড়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প বুকে নিয়ে বলেছিলেন “ এই গ্লানি আমি আর একা বহন করতে পারছি না।”

- এই গ্লানি কি সত্যিই বহন করা যায়? পরিবর্তন, ধর্ম নিয়ে জুয়া, সাম্প্রদায়িকতা, ভোটের রাজনীতি, মৌলবাদের হুঙ্কার, আর এসবের মাঝে সব হারানোর সঙ্কট। এবং প্রতারিত, অত্যাচারিত হয় কে? প্রশ্ন নয়... একটা উত্তরের সন্ধান চাই।

• এবং স্বাধীনতার লাশ •

১৯৪৭ এর ১৩ আগস্ট পর্যন্ত সবটাই এক ছিল। অভিন্ন ভারতবর্ষ। রবীন্দ্রনাথের ‘একজাতি এক প্রাণ’ ছিল কিন্তু ‘একতা’য় অনেকটা ফাটল তৈরি হয়ে যায়। ১৪ আগস্ট জিন্নাহ এর নেতৃত্বে জন্ম নেয় একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র। যার শোষণ এবং অত্যাচারের পরিণতিতে ৭১ এর গণঅভ্যুত্থান এবং পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের হৃদয়জোড়া স্বাধীনতা, এবং মুক্তি। যার মূল্য দেয় প্রায় ত্রিশ লক্ষ্যাধিক মানুষ। আর বাঙলার মাটি রক্তের জোয়ারে স্নান করল...

আগস্ট ১৫, ১৯৪৭, ভারত নামের একটি দেশ ভূগোলের খাতায় স্বাধীন হল। ডিভাইড এন্ড রোল এর অসভ্যতায় এল মধ্যরাতের স্বাধীনতা। কোটি প্রাণের চিৎকার। ধর্ম দিয়ে দেশ ভাগ হল। পাশের বাড়ির আবির মিয়া এবং গলির প্রান্তের অবিনাশ দাশগুপ্ত আর একসাথে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয়না। তারা হারিয়েছে সেই স্বাধীনতা। আর সেই হারানোর মধ্যে দিয়েই এলো স্বাধীনতা...

• ১৯৫০ বরিশাল •

ভাবেনি। কমলা দাশগুপ্ত ভাবেনি দেশ এই করে স্বাধীন হয়ে যাবে। ভাবেনি যে ওর চারপাশ এইভাবে ছিন্ন হয়ে যাবে। কেননা ও এখন ভাবতে পারছেনা যে তাকে দেশ ছেড়ে চলে আসতে হবে। তার কারণ সে হিন্দু। এই দেশ এখন মুসলিমদের দেশ। কমলা ভেবে পায়না দেশ কি করে একটা ধর্মের হাতে চলে যায়। এই ক’দিন আগেও তো আব্দুল চাচা তার বাবার গদিতে বসে চা খেয়ে গেলো। আর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে গেলো – বেঁচে থাকো মা, সুখি হও। আচ্ছা বেঁচে থাকো বলে গিয়ে কি করে একটা মানুষ তার গলার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়?

এই আব্দুল চাচাই গতকাল রাতে দলবল নিয়ে এসে শাসিয়ে গেলো – এই দেশ তোমাগো না, এই দেশ মুছলমানের। তোমরা ওই পারের মানুষ। জানে বাঁচতে চাইলে পালাও, নইলে...। এখন রাত হলেই কমলার বুকটা থরথর করে কাঁপে। এই বুঝি ওর প্রাণটা চলে গেলো। বাড়ির বড়রা মিলে রাতের বেলায় ডিউটি দেয়। পরশুদিন থেকে দত্ত বাড়ির অম্বিকাকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। বারবার বারণ করা সত্বেও ও কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। বলে গেয়েছিল – কিচ্ছু হবেনা, কেউ আমাকে কিচ্ছু করবে না। এই দেশ আমার। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কমলা ভাবে হয়তো কাল সকালেই কীর্তনখলার কোন একপ্রান্তে ভেসে উঠবে রক্তে ক্ষত বিক্ষত একুশের তরণী বেয়ে উঠা একটা লাশ। আর ভাবতে পারছে না ও। আশেপাশের প্রায় সবাই পালিয়ে গেছে। সেন বাড়ির মধ্যেও চাপা উত্তেজনা... আর এখন কমলা ভাবছে তার প্রাণের প্রিয় মানুষটির কথা। যাকে ও ভালোবাসে। কিন্তু সেও যে......

• আগস্ট ১৫। ১৯৪৭। কলকাতা •

দাঙ্গায় বিধ্বস্ত দেশ। তাঁর স্বপ্নের দেশ। তিনি হিংসা পরিহার করতে চেয়েছিলেন এই বলে – “আগুনের বদলে আগুন, তাহলে সমগ্র দুনিয়াটাই অন্ধ হয়ে যাবে।” কিন্তু পারেননি। কিছুতেই আটকাতে পারেননি রক্তঝরা লাশ। নেহেরু, বল্লভরা যখন স্বাধীনতার জ্বলন্ত লাশের উপর দাঁড়িয়ে তেরঙ্গার রঙে ভিভোর তখন সেই স্বাধীনতার ছোঁয়া একটি মানুষকে দেয়নি। তিনি মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী। তিনি কি সত্যিই সুখি ছিলেন ? এই স্বাধীনতা কি তিনি চেয়েছিলেন? কি পেয়েছিলেন তিনি তাঁর সত্যাগ্রহের পরিবর্তে? – একটা ভাঙা দেশ... একটা রক্তাক্ত দেশ... নাকি কিছু পোড়া এবং দগ্ধ মানুষ?

এই সেই মানুষ যিনি ১৯৪২ এ বলেছিলেন – “ধর্ম যারযার ব্যাক্তিগত ব্যাপার, রাজনীতিতে তার কোনও স্থান থাকা উচিৎ নয়।” ৪৭ এ এসেও তিনি বলেছিলেন “ধর্ম প্রতিটি মানুষের ব্যাক্তিগত ব্যাপার, তাকে রাজনীতির সঙ্গে কিংবা জাতীয় ঘটনাবলীর সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা কখনোই উচিৎ নয়।” কিন্তু তিনি তাঁর কথা রাখতে পারেননি। আটকাতে পারেননি ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে। যে হাত উঠলেই একদিন সমগ্র ভারত তাঁর দিকে ছুটে আসত, যে হাতের ইশারায় আসমুদ্র হিমাচল আলোড়ন তুলত একসাথে সেই ব্যাক্তি সেদিন কেন এত অসহায় ছিলেন। এটা কি তাঁর দুর্বলতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব, নাকি তিনি অসহায় ছিলেন?

৪৭’এর পনেরো তারিখ তিনি দিল্লিতে বসে স্বাধীনতার জশন পালন করতে পারেননি। ঐদিন ছিলেন কলকাতায়। কলকাতার এক অখ্যাত পোড়া বাড়িতে অনশনে বসেছিলেন তিনি। কেন? জাতিকে আহ্বান করেছিলেন- দাঙ্গা থামাও। ভাতৃঘাতি দাঙ্গা থামাতে তিনিই নিজের উপর প্রতিশোধ নিতে শুরু করলেন। না খেয়ে, সমস্ত কিছু পরিত্যাগ করে তিনি পড়ে রইলেন সেই পোড়া বাড়িতে। কারণ তিনি বলেছিলেন – দেশ ভাগ হলে ওটা আমার বুকের উপর দিয়ে হবে... কিন্তু দেশ ভাগও হল, আর উনার বুক অক্ষতও রইলো।

দেশের মানুষ স্বাধীনতার আনন্দে বিহ্বল, আবার একদিকে ঝরছে লাশ...। লাহোর থেকে ট্রেন ভরে লাশ আসছে অমৃতসরে আবার এখান থেকে ট্রেন ভরে লাশ যাচ্ছে করাচীতে। লাশের যজ্ঞ চলছে তো চলছেই। আর উনি দেশের এপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে যাচ্ছেন, তা আটকাতে। কিন্তু কতটা পেরেছিলেন? এই জিনিষটা কেন তিনি আরও আগে ভাবেননি? কেন নেহেরু, প্যাটেলদের তিনি দিয়ে দিয়েছিলেন সীমাহীন ছাড়পত্র? দেশের এই বিভাজনের জন্য ওরা দায়ী নয় তো? স্বাধীনতা পাওয়ার তাড়া কি একা নেহেরুই ছিল? কেন গোল টেবিলের বৈঠকে এই সম্মতি দেওয়া হল? কেন জিন্নাহ এর উত্থান হল? প্রশ্ন হল জিন্নাহকে সেই চোরা পথ কে দেখাল? চোর কি নিজের ঘরের মধ্যেই ছিলনা? এর জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও পাঁচ মাস পনের দিন... ১৯৪৮ এর ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত... তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি বোধ হয় এটাই ছিল তিনি ছিলেন - জাতির পিতা!!

• ২০০৩। কলকাতা •

মনের ভেতর একটা অনাবিল আনন্দ অনুভব করছেন সেন মশাই। একটা ভালোলাগার পরশ। একটা চাপা উত্তেজনা। মাঝি মাল্লার ডাক শুনতে পাচ্ছেন তিনি, অনুভব করছেন আউল বাউলের সুর। পঞ্চাশ বছরের স্মৃতি তাকে ডাকছে। ডাকছে তার বাংলাদেশ। সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। সেন গিন্নির চোখে জল। দুজেনের স্বপ্নের বরিশাল কেন জানি এখান থেকে খুব কাছের মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই চেকপোস্ট, তারপর ঢাকা , তারপর বরিশাল... সেন বাবুর দুটি চোখ বেয়ে জল শুধু গড়িয়ে যাচ্ছি, অবিরত... এই ঝড় এখন থামবে না।

==========================================================
পেছনে ফিরে দেখাঃ পর্ব - ১ পর্ব - ২ পর্ব - ৩
পর্ব - ৪

====================

আমার শহর
ডিসেম্বর। ২০ । ২০১১


মন্তব্য

তৌফিক জোয়ার্দার এর ছবি

এই ইতিহাস আমাদের অপরাধী করে দেয়। অপরাধের দায় মুক্তি হতে কত শতাব্দী যে লাগবে কে জানে? আদৌ কি তা হবে; হয়?

Saurav Shome এর ছবি

খুব ভালো লেখা | এ এক মর্মান্তিক সত্য যে মানুষ মানুষের মধ্যে বিবেধ খুঁজে চলে | ধর্ম নামক বিবেধ টা বরই মানানসই | কারণ ধর্মের আড়ালে রয়েছে এক আশ্চর্য আশ্রয় | রাজনীতিকের কাছে এ এক লোক ভোলানো মোয়া | কিন্তু আমরা যা দেখি, টা কি সবটাই সত্য ? ধর্মের নামে দেশ ভাগ করে ক্ষমতা লোভির ভোগ মেটানোর ইতিহাস কি ইস্কুল সিলেবাসে আছে ? ইতিহাস বন্ধ করে ভবিষ্যত গড়ে তোলা যায়না | আমি ভাবছি বইয়ের বাইরের ইতিহাস আজ খুব দরকার | ধন্যবাদ লেখক কে |

তাপস শর্মা এর ছবি

ধন্যবাদ Saurav Shome ।

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যদি আমরা ধর্মের জুয়া খেলতে থাকি তাহলে বলব আমরা আরও একশ বছর পিছিয়ে আছি।

আমি ভাবছি বইয়ের বাইরের ইতিহাস আজ খুব দরকার |

চলুক

তাপস শর্মা এর ছবি

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ তৌফিক জোয়ার্দার।

ইতিহাসের এই দায় কিন্তু আমাদেরই নিতে হবে... আর এত কিছুর পরও যদি আমরা 'সভ্য' হতে না পারি তাহলে আর কিছুই বলার নেই... কেননা এই জুয়া খেলায় বিচারক কেউই নেই

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

এই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাতো পরিকল্পিতভাবে বিনির্মিত। এর পিছনেতো তদানিন্তন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদেরই ইন্ধন ছিল। ইতিহাসের অনিবার্যতা পরিবর্তনের সাধ্য কী আমাদের!
লেখা ও প্রকাশভঙ্গি ভাললেগেছে।

তাপস শর্মা এর ছবি

ইতিহাসের অনিবার্যতা পরিবর্তনের সাধ্য হয়তো আমাদের নেই কিন্তু বর্তমানকে ইতিহাসের কলঙ্কিত দায়ভার থেকে মুক্তি দেওয়ার সময় বোধ হয় এসে গেছে...

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।