গিবরিল আসিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে কহিল, "শিগগীর আইস, সর্বনাশ ঘটিতেছে!"
আদম খড়শয্যায় অর্ধশায়িত হইয়া সাভিনিবেশে একটি পাতলা পুস্তক পাঠ করিতেছিল, মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটায় সে চটিয়া কহিল, "সর্বনাশের জন্য কিছু বাকি আছে নাকি? আমার যা কিছু ছিল বুঢ়বাক ঈশ্বরের চক্রান্তে মাটি হইয়াছে। মহাপ্লাবনে স্বর্গ ডুবিলেও আমার কিছু আসে যায় না হে গিবরিল!"
হ্রদের তীরে একটি মন্দসমীরণপুষ্পবিভূষণকোকিলকূজিত কুঞ্জের কোণে কদম্বতরুর দিকে চাহিয়া ঈশ্বর উলু দিয়া উঠিয়া কহিলেন, "কেউ কি একটি বাঁশি যোগাড় করিতে পার?"
আদম গিবরিলের পঞ্জরে কনুই দ্বারা খোঁচা মারিয়া কহিল, "যাও হে দূত, তোমার ফরমায়েশ খাটিবার ওয়াক্ত নজদিক।"
গিবরিল বিরস কণ্ঠে কহিল, "আমি শুধু বার্তা বহন করি ওহে আদম! বাঁশি সংগ্রহের কর্ম সে আমার নহে।"
ঈশ্বর গলা খাঁকরাইয়া কহিলেন, "ব্যাপার কী আদম, এই প্রাতঃকালে তোমার এইরূপ উত্থিত দশা কেন? চুরি করিয়া নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ কর নাই তো?"
আদম গোঁ গোঁ করিয়া কহিল, "ঈভের জামাকাপড় ঠিক নাই।"
ঈশ্বর কহিলেন, "তাই বলিয়া তুমি এইরূপে তোমার শ্রীলঙ্কাটিকে বাগাইয়া চলাফিরা করিবে?"
আদম পাড়ার চায়ের টংদোকানের সম্মুখে দাঁড়াইয়া একটি ভাঁড়ে করিয়া সুরুৎ সুরুৎ চা পান করিতে করিতে মুচকি হাসিতেছিল। গিবরিল ডানা ঝাপটাইয়া নামিয়া আসিয়া শুধাইল, "ভাই আদম, খাটাশের ন্যায় হাসিতেছ কেন?"
আদম চক্ষু টিপিয়া কহিল, "ঈভকে এইবার এমন ইসকুরু টাইট দানের এন্তেজাম করিয়াছি ওহে গিবরিল, স্বয়ং ঈশ্বরও তাহাকে রক্ষা করিতে অপারগ।"
ঊষাকালে নন্দন কানন নিঝুম নিস্তব্ধ থাকে। কাকপক্ষীও তখন নীড়ে কুণ্ডলী পাকাইয়া নিদ্রামগ্ন থাকে। আদম এই সময়েই প্রাতকৃত্য সারিতে গাড়ু হস্তে বাহির হয়। আশেপাশে নন্দন কাননের অপূর্ব সব বৃক্ষ ও ঝোপঝাড়, তারই কোন এক গহীন কন্দরে ঢুকিয়া সে কর্মসাধন করিয়া আসে। বেলা চড়িলে লোকজনের সমাগম বাড়ে, এবং তাহাদের ভিড়ে দুই-চারিটি পরিবেশবাদী সর্বদাই থাকিবে, যাহারা ঝোপেঝাড়ে বাগানক্রিয়া সারিতে দেখিলে হল্লাচিল্লা করে। একবার তো ত
বিজ্ঞাপন দেখিয়া দরখাস্ত করিতে না করিতেই আদমের চাকরি জুটিয়া গেল।
বিজ্ঞাপনে বলা ছিল, প্রার্থীকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হইতে হইবে। শিক্ষাদীক্ষার পরিমাণ তেমন একটা না হইলেও চলে। কিন্তু প্রার্থীকে টিকিয়া থাকিবার ব্যাপারে পারদর্শী হইতে হইবে। তাহার চামড়াটি কিঞ্চিৎ পুরু হইলে ভাল। সর্বোপরি, গুরুজনের কথা মান্য করিতে হইবে। তনখা আলোচনাসাপেক্ষ।
আদম চটিয়া কহিল, "টাকা নাই মানে? টাকার অভাবে একলা থাকিব?"
ঈশ্বর কাশিয়া কহিলেন, "দেখ আদম, স্বর্গের কোষাগারে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা নাই। যা ছিল সব বিরোধী দলের স্বর্গদূতেরা মারিয়া কাটিয়া লুটিয়া পাচার করিয়াছে। কিয়ৎকাল ধৈর্য ধর। সুমায়ে সুনা ফলে।"
ঈশ্বর মঞ্চে বসিয়া বসিয়া বিরক্ত মুখে পাতি স্বর্গদূত নেতাদিগের বক্তৃতা শুনিতেছিলেন। ইহারা কর্মে পটু না হইলেও মুখের জোরে একেকটি গগ ও মাগগ। হাতের নাগালে মাইক ঠেকিলেই ইহারা অগ্রপশ্চাৎ জ্ঞান হারাইয়া আসুরিক শক্তিতে আর্তনাদ করিতে থাকে। মাইক ছাড়াই ইহাদের আওয়াজ সায়হুনের তীর হইতে ফোরাতের পূর্ব পার পর্যন্ত পৌঁছিবে। ইহারা খায় কী?
স্বর্গে প্রমত্তা জায়হুন নদীর তীরে ঈশ্বর বিরক্তমুখে পায়চারি করিতেছেন। অদূরে আদম উদাস মুখে বসিয়া বসিয়া বাদাম চিবাইতেছে। গিবরিল ঈশ্বরের পিছু পিছু সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখিয়া ডানা ঝাপটাইয়া বাতাস করিতেছে।
ঈশ্বর অস্ফূটে কহিলেন, "ফেরিঘাটে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া ঠ্যাং দুটি ব্যথা হইয়া গেল!"
আদম হেঁড়ে গলায় গান ধরিল, "জায়হুন-ঢেউ রে এ এ এ, মোর শূন্য হৃদয় জায়হুন নিয়ে যা, যা রে ...।"