টুকরো টুকরো পাপড়ি |
১।
"সময় আমাদের ঘিরে রাখে মৃদু বৃষ্টির মতন/অশেষ সময়/ সুখদুখমন্থন সময়/মেঘপালকের মতন ঘরের মতন উড়ে যায় জীবন----" কথাগুলো গুণ গুণ করতে করতে লাবণি মনে করতে চেষ্টা করে কার লেখা লাইনগুলো। মনে পড়ে, পড়ে, পড়ে না। ছাদের উপরে স্নিগ্ধ ঠান্ডা রাত, ঘুমেলা চোখে এসে লাগে তারাদের বিস্ময়, কতকাল হয়ে গেলো সে দেখছে ওদের, অথচ পুরানো হয় না, একই প্রথমদিনের ঝিমঝিম শিরশিরানি চারিয়ে যায় ওর চোখের ভিতর দিয়ে আরো ঘন ...
শরত্সখী |
"জলকে চল্" বলে কোথায় গেলো সখী
থম্কে থাকে ছবি আয়না-ঘাটে,
ঝিম্কিনি লাগা ঘোর মুছে ফেলে
চম্কে চেয়ে দেখি খিল কবাটে।
স্বর্ণচূড়া মেঘে আলোর লতা এঁকে
শারদবেলা আসে সোনার রথে,
শিউলি-ভোর মেখে আকাশ দোর খোলে
শিশিরকণা ঝরে উদাস পথে।
কোথায় সেই সখী, কোথা শেফালিমালা
কোথায় কাশ দোলে অলখপুরে?
কোন্ রাখালি বাঁশী ব্যাকুল করে তাকে
কোথায় গান ভাসে কোন্ দূরে?
আকাশে কান পাতি, আসে কি সুর ভেসে-
আছড়ে প...
চিত্রবিচিত্রা |
১
আমার অনেক গ্রীষ্মছুটির দুপুর ছিলো
দুপুর জুড়ে রোদের ঝুড়ি উপুড় ছিলো-
আমকাঁঠালের ছায়ায় ছায়ায়,
বনসবুজের স্নিগ্ধ মায়ায়-
লুকিয়ে কোথায় গল্প-টাপুরটুপুর ছিলো।
আমার অনেক গ্রীষ্মছুটির দুপুর ছিলো.....
বটের ছায়ায় জলটল্টল্ ঝিল ছিলো,
তির্তিরে ঢেউ রোদ্দুরে ঝিল্মিল্ ছিলো-
দূর আকাশের নীল খিলানে
বাতাসবাড়ীর দরদালানে
একলা একলা ভাসতে থাকা চিল ছিলো।
আমার অনেক গ্রীষ্মছুটির দুপুর ছিলো
দ...
গতজন্মের বাড়ী |
ধূপছায়া রঙের পর্দার আড়ালে এসে দাঁড়ায় সে। তাই ওকে স্পষ্ট করে দেখতে পাই নি কোনোদিন। শুধু ওর সজল চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে অস্তসূর্যের আলোয়। মুখের বাকীটা ভালো করে বোঝা যায় না। কেন জানি মনে হয় ওর অল্প-স্ফীত ঠোঁটে, এলোমেলো হাওয়াওড়া চুলে, করুণ হাতের ছন্দে অচেনা অভিমানের আভাস থাকে। কেজানে! বোঝা যায় না ভালো করে কিছুই। ও যে কে, তাও বুঝতে পারিনা।
দূর দিগন্তে হীরকধূলি ওড়ে, অস্ত-আভায় জ্বলজ্বল ...
উত্তরমুকুট |
দু'হাত বাড়াই, মুখ রাখি নদীমুখে-
ঝলকে ঝলকে রাঙা হয়ে যায় তীর,
দগ্ধ আঁচলে পুড়ে যাওয়া কাশফুল
নিঘুম পাথরে রক্তগোলাপ নীড়।
হারানো সবুজ আনবে কি রাতপাখি?
কোমল ডানায় শান্তিপারের নীর?
গভীর আঁধারে জ্বলে থাকে তারাশিখা
ঝরঝর গানে ভরবে কি মরুতীর?
পুড়ে যাওয়া ঘাসে পড়ে থাকা ছেঁড়া তারে
রাখবে কি হাত করুণ সেই ফকীর?
ছিন্ন সেতারে আবার পরিয়ে তার
ফিরিয়ে দেবে কি যাদুজ্যোত্স্নার মীড়?
বেলা বয়ে গেলো কো...
শুভেচ্ছা |
সারারাত বাজীপটকার শব্দ, জানালার বাইরে আলোর আলোড়ন। পর্দার ওপার থেকে আলো চলকে পড়ে ঘরের ঘুমের অন্ধকারে। আধোস্বপ্নে মনে পড়ে বহু আগের সেইসব আলোমুখরিত উত্সবরাত্রিদের। সেই ছাদের উপরে মোমবাতির সারি, পাঁচিলে টুনি আলোর মালা। সেইসব আতশবাজী পটকা, তুবড়ী, ফুলঝুরি, চকোলেট বোম, চর্কিবাজী,দোদমা। আকাশে ভেসে যাওয়া মস্ত বড় আলোর হাতি আর আগুনপাখা হাঁসের দল। তখন সেসব হতো দীপাবলি রাতে।
এখানে এম...
অলীক পাখিরা |
অলীক পাখিরা সব
উড়ে গেছে দলে দলে
হিমঝুরি মোমজ্যোত্স্নায়।
তাদের ডানার ঝাপটায়-
বাতাসে ঝিকিয়ে ওঠা ঢেউয়েরা
থিতিয়ে গেছে-
সেও হলো বহুক্ষণ।
অনেক অনেক দূরে-
দুধের মতন সাদা
কোনো স্বপ্নবালুচরে,
স্বচ্ছ নীল নদী-কিনারে
হয়তো দলে দলে
নেমেছে তারা সবাই।
সে দেশ অনেক দূর
সে নদীর মেলেনি ঠিকানা-
তবু শোনা যায় তাকে
শঙ্খের ভিতরে কান পেতে,
তবু দেখা যায় তাকে
কোনো সাঁঝছোঁয়া বিকালে
রাঙা মেঘ মাখা ...
আলোছায়া-পৃথিবী |
আজকে বিকালে মেঘ সরে গিয়ে দেখা দিয়েছে রোদ। আকাশ কোমল নীল, রোদ্দুরে সোনারঙ। সূর্যপিয়াসী প্রাণগুলি আজ হারানো সুর খুঁজে খুঁজে বের করে তোড়া বাঁধে, বেসুরো শুকনোপাতা ফেলে দিয়ে। ভুলে যাওয়া শরতের মতন কাশফুলী মেঘেরা ভাসে আকাশে, ডানামেলা পাখির মতন উড়ে যায় সবুজ অরণ্যের দিকে, ওদের দিগন্তপ্রিয় ডানার নীচে তরল জলের ধারার মতন গলে পড়ে দূরত্বের কাঠিন্য।
খুব ঈর্ষা হয় ওদেরকে। কেমন দিগন্ত থেকে ...
বহে যায় অন্ধ নদী অন্ধকারে |
বহে যায় অন্ধ নদী অন্ধকারে-
এলোমেলো আঁকে বাঁকে ঘুম্ঘুম্
পৃথিবীটা পড়ে থাকে নি:ঝুম্।
পাতাহারা শীতশিমূলের
ডালপালা ঝুলে থাকে চাঁদে,
শিরশিরে উত্তুরে হাওয়া
গুম্গুম্ গুমরায় খাদে।
রাত্রির নদী বহে চলে
ঐ যে জলের বেভুলে-
জ্বলে ওঠে না-বলা বেদনা
কেউ দেখেনি,কেউ দেখে না।
ঐ সেই কালো পাহাড়ের গা,
নদী থেকে ওইদিকে-
পথ গেছে হাঁটি হাঁটি পা।
সেপথে কেউ আসেনি,কেউ আসে না।
সে কথা পুরানো কথা,কথা-...
তবক |
সুখের তবক মোড়া গোপণ অসুখে
সূচে গাঁথা প্রজাপতি, স্বপ্নেরা ভুখে-
মেঘের যা ছিলো কানাকড়ি,
ভাঁজে ভাঁজে ক্ষয়ে যাওয়া জরি-
সবই আজ খোয়া গেছে তার,
ব্যাপারীরা কষে ধরে' ঘাড়
নিয়ে গেছে কেজানে কোথায়-
হাওয়া শুধু করে হায় হায়।
এলোমেলো শব্দেরা ভাসে
চৌকোনা জলছবি হাসে-
হাসির আড়ালে থাকে ঘাস
মুছে যাওয়া শিশিরের মাস।
বিলুপ্ত শেফালির ঘ্রাণ
আজো কেন প্রাণে তার টান?
কোথাও এখনও বুঝি জানালা খুলে,
অপেক্...
অভিসিঞ্চন |
ফ্রাইং প্যান থেকে তপ্ত তেল ছিটকে এসে লাগে কব্জির কাছে আর আঙুলে, চড়াত্ করে ওঠে যন্ত্রণার অনুভূতি। কলের ঠান্ডা জলধারার নিচে রাখি হাত, জল কব্জি আর আঙুল ধুয়ে স্নিগ্ধ করে দেয়। তবু জ্বালা করে বেশ, তখন রাঁধছিলাম,হাতের কাছেই আলুর টুকরো ছিলো অনেক, সেগুলোর থেকে একটা তুলে পোড়া জায়গায় বোলাতে থাকি। সঙ্গে সঙ্গে জল পড়েছে, আশা করতে থাকি হয়তো পোড়াদাগ ফুটবে না।
কিন্তু রান্না অর্ধেক হয়ে আছে, সেট...
চন্দনের বনে |
আজকে মেঘলা ধূসর দিন, মনখারাপ করে দেওয়া ঘোলাটে সব। মাঝে মাঝে নামছে বৃষ্টি, বাদামী হলুদ শেষ পাতাগুলো ও ঝরে পড়ছে পর্ণমোচীদের শীতনগ্ন কঙ্কালশরীর থেকে। ওদের ভ্রূক্ষেপ নেই। ওরা জানে বসন্তে বসন্তে নবযৌবন আসে ওদের। আমাদের মনুষ্যজীবনের মতন কৃপণ নয় বৃক্ষজীবন।
হায়, " অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়।" কী ভীষণ ক্ষুরধার সূক্ষ্ম কৃপণ বর্তমান ! সময়ের ধারা কী বেগবান! ক্ষণিকের জীবন, ত...
অসেতুসম্ভব |
টুকরো টুকরো দ্বীপেরা ছড়িয়ে আছে। অসেতুসম্ভব সব দ্বীপেরা। মাঝে বয়ে গেছে বিচ্ছেদের আর বিষাদের নোনাপানি। অবিশ্বাস আর বেদনার নীল সমুদ্র। একদিন এইরকমই এক দ্বীপে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। মাঝে মাঝে গতজন্মস্মৃতির মতন মনে পড়ে বহুদিন আগে আমরা একটা মহাদেশে থাকতাম।
দিনগুলো কেমন ছিলো তখন? সোনালী, রূপালী, মেঘলা, রোদ্দুরে ঝলসানো, শুভ্র মেঘের ওড়না ওড়া সোনারঙের দিন--সবই ছিলো। নানারকম সব দিন...
ছন্দহীন রাত্রিদিন ভুল গড়ায় |
ছন্দহীন রাত্রিদিন বল গড়ায়
মৌনমুখ সুখ-অসুখ কল ঘোরায়-
রাতবাতির নিঘুম রাত কি ঘুম চায়?
ঘুমপাহাড় মাথা পাতে জলঝোরায়।
একটি লোক ঢালপথে ভুল গড়ায়
ছিন্নশব খোলা হাওয়ায় ভয় ছড়ায়,
ছন্দহীন রাত্রিদিন পিছ্লে যায়-
স্পন্দমুখ রাত্রিসুখ ঘুম ভরায়।
সবুজঘাট লালপাখির ঝাপটা খায়
ধূলিবাকল, ছেঁড়াঘুড়ি, ভুলের ঘায়-
রাতপাহাড় ভয় পেয়ে থমকে যায়
এক নদী, জলবতী, দূর পালায়।
মরুবালি ঝড়পিঠে জোর ঝাঁকায়
ফটিকজল মরী...
সেইসব দিনরাত |
মাঝে মাঝে অদ্ভুত শূন্যতা আসে। সুখদু:খ দিয়ে নিবিড় করে ভরাট যে জীবনটা, সেটার থেকে ছিঁড়ে গিয়ে ভেসে যাবার মতন একটা অসহায় অনুভব। স্বপ্নের মধ্যে গলা চিরে চিত্কার করলেও যেমন কোনো শব্দ হয় না সেরকম একটা অনুভব। ভয়ের স্বপ্নের মধ্য থেকে যেমন ছুটে পালানো যায় না তেমন একটা কিছু।
স্বজনভরা সংসার থেকে হারিয়ে গিয়ে দূর কোনো নির্জন প্রান্তরে নিজেকে আবিষ্কার করার মতন অসহায় শূন্যতা। সজল বর্ষাদি...
তুলার মেঘ,তুলাতুষার |
এখানে তুলার মেঘ, এখানে তুলার তুষার
এখানে সূর্যদুয়ার, এখানে মোমের ডানা-
এখানে জীবনকথা, অলীক আখরে আঁকা
এখানে মরণব্রত, নজরসুতায় টানা।
এখানে তুলার মেঘ, এখানে তুলার তুষার.......
ওখানে নীল পাহাড়, ওখানে আয়নাহ্রদ
ওখানে উদাসীবন, উতরোল কথা কয়-
ওখানে হরিণী চরে, রূপকথারঙ মাঠে
ওখানে নরম নদী,পরণকথায় বয়।
এখানে তুলার মেঘ, এখানে তুলার তুষার
এখানে ভুলের মেঘ, এখানে ভুলতুষার......
কাকজ্যোত্স্না |
কাকজ্যোত্স্নায় বালিহাঁস ওড়ে,
বালিসৈকত গর্ভিণী নৈ:শব্দ নিয়ে-
ভিজে যায় গহন রাতের অলীক আলোয়।
মিশরী ওড়নার মতন নেমে আসে
শিরশিরে শিশিরকণা, নীল চিত্রা তারার কাছ থেকে-
সমুদ্রঝিনুকের মেলে রাখে ডানা।
বালুতীরে হেঁটে যাই একা একা
আধোঘুমে আধো জাগরণে-
মগ্ন চেতনে লেগে থাকে নোনাপানি।
কোনোদিন চেনা ছিলো এই বালি?
চেনা ছিলো ও গহীন জল?
চেনা ছিলো ঐ মায়াচাঁদ ?
শোনা ছিলো ওই পাখিদের দিগন্তপ্র...
আরেকদিন |
মায়ের বুকের কাছে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে তৃণার। কেমন একটা নরম ওমের গল্প সেখানে! সে কল্পনায় অনুভব করার চেষ্টা করে কেমন হবে সেই দেশ! কিন্তু মাকে বলতে পারে না, কেমন সঙ্কোচ হয়। মা আবার তাড়িয়ে দেয় যদি? যদি বলে যা যা, চলে যা?
মা নিতো না তৃণাকে। তৃণা ওর ঠাকুমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতো সবসময়, ঘুমাতো ও ঠাকুমার সঙ্গে। মায়ের সঙ্গে ঘুমাতো ছোট্টো ভাইটা। একেকদিন মায়ের সঙ্গে ঘুমাতে চাইলে মা ঠ...
আঁধারমাণিক |
আঁধার আঁচলে ছড়ানো তারার কুড়িরা
গোড়েমালা করে তাদের গেঁথেছে চাঁদ,
জলের মুকুরে থেমে থাকে বোবা মুখ
ও পাথর মেয়ে,এইবারে তুই কাঁদ।
লক্ষ্মীপ্যাঁচারা ওড়ে জ্যোত্স্নায়, ছাদে-
পাখায় পাখায় সুখ করে কানাকানি,
লক্ষ্মী মা তুই, তবু কেন তোর দোরে
আলতায় রাঙা দুইমুঠা দানাপানি?
লোহার ডগায় ছিঁড়ে নিয়ে যায় ঘাস
পড়ে থাকে শুধু দিগন্তজোড়া বালি-
রোদ্দুরে ভাজা আকাশ তপ্ত তামা
পাথর কবরে নীরবে ঘুমায় মালী।...
স্বপ্নে কওয়া কথার মতন |
স্বপ্নে কওয়া কথার মতন বসন্তরাত ছেয়ে
ছড়িয়ে গেছে গড়িয়ে গেছে দখিন হাওয়ার নেয়ে-
তারা-টল্মল্ আকাশঘরে অবাক পরীর মেয়ে
মধ্যরাতের কোন্ রাগিণী আনমনে যায় গেয়ে?
রাত শন্শন্ রাত শন্শন্
ঘুম কন্কন্ ঘুম কন্কন্
তারা ঝম্ঝম্ তারা ঝম্ঝম্
হাওয়া গম্গম্ হাওয়া গম্গম্ .......
মৌপাহাড়ী নেশায় টলে মোমজ্যোত্স্নায় নেয়ে-
অমলতাসের কোমল কোরক ভুবনডাঙা ছেয়ে,
হদয়পুরীর জানলা থেকে আকুল ব্...