গাল ফুলিয়ে আমার রুমে ঢুকলো ওশিন। একটু আগে তার মা তাকে বকেছে। মৃদু মারও দিয়েছে। পাঁচ বছরের একটি শিশু মুখকে যতটা গম্ভীর করতে পারে, তার চেয়ে দ্বিগুন গম্ভীর মুখে ওশিন আমাকে বললো, জানো ফুফু, মা আর দাদু দোষ করেছে।
আমি বললাম, কী দোষ করেছে?
-- মা আমাকে বকেছে, মেরেছেও! আর দাদু মায়ের বিচারটাই করলো না!
ছেলেটি শুধু এক মুহূর্ত ভালবেসেছিল মেয়েটিকে। আর কেউ না জানুক, মেয়েটি জানে, সেই একটি মুহূর্ত একটি মহাকাল। ছেলেটি চিনিয়েছিল মেয়েটিকে জীবনের অপরূপ রূপ। মেয়েটি ছেলেটিকে দিয়েছিল একটিমাত্র স্ফুলিঙ্গ— যার তপস্বায় ছেলেটি মগ্ন ছিল জীবনভর।
ছেলেটি মেয়েটিকে ডাকে জুনি। মেয়েটি ছেলেটিকে ডাকে জিউস।
সময়গুলো উড়ে যাচ্ছে। পেছনে ফেলে স্মৃতির পালক। বছরের শেষদিনে অস্তগামী সূর্যটার দিকে তাকাতেই মন কেমন যেন করে ওঠে! ওই সূর্যটার সাথে সাথে যেন বছরের সব হাসি-কান্না-আনন্দ-বেদনা ডুব দিচ্ছে। মনে হয়, হারিয়ে যাচ্ছে, ফুরিয়ে যাচ্ছে সব। এভাবেই তো যায়...। সুখ যায়...। দুঃখ যায়...। হারায় কতকিছু। আবার পাওয়া হয় নতুন কিছু। প্রাপ্তির কথা তেমনভাবে গেঁথে থাকে না মনে, যেমন ভাবে গেঁথে থাকে অপ্রাপ্তির বেদনা।
বাসার লোকেশন জানাতে গিয়ে তিনি আমাকে ফোনে বললেন, ...গলিতে ঢুকে যে-কাউকে ব্লাইন্ড বাপ্পীর বাসা কোনটা জিজ্ঞেস করলে দেখিয়ে দেবে। এমন সহজভাবে কথাটি তিনি বললেন, অথচ শুনে আমার মন কেমন করে উঠলো!
গলির ভেতরে ঢুকে দেখি ৬/৭ বছরের একটি শিশু খেলছে। তাকে বললাম, বাপ্পী ভাইয়ের বাসাটা চেন? সে আঙুল উঁচিয়ে বললো, ও-ই বাড়িটার দোতলায়।
মনের আনন্দে গাইছে শিশুটি, আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপের বাহির হলে জননী...
প্রিয় গানটি শুনে হঠাৎ আমার চোখ দুটো ভিজে ওঠে। জন্মান্ধ এই শিশুটি কোনোদিন অপরূপ জননী আর রূপসী বাংলাদেশের রূপ দেখতে পায় নি চোখ মেলে!
মুনিয়ার ডিভোর্সের খবরটা শুনে আমি বেশ একটা ধাক্কা খাই। প্রথমে ভেবেছিলাম, এটা ঠাট্টা। ঠাট্টা বটে, নিয়তির নির্মম ঠাট্টা! মুনিয়ার সাথে আমার প্রায়ই দেখা হতো বাড়ির গেটের কাছে। বিকেলে আমি বাসা থেকে বেরুতাম অফিসের উদ্দেশ্যে আর মুনিয়া তখন অফিস থেকে ফিরতো বাসায়। টুকটাক কথা হতো। প্রতিবেশীসুলভ কুশল বিনিময়। যদিও আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, কিন্তু আমাদের প্রথম পরিচয় হয় এপার্টমেন্টের লিফটে। মুনিয়া তার স্বামী-সন্তান-পরিবার নিয়ে থাকতো আমাদের ওপরের তলায়। হাসিখুশি মেয়েটির প্রাণোচ্ছ্বলতা আমাকে ছুঁয়ে যায়। আমাদের আলাপ-পরিচয়টা টুকটাক কথাবার্তাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। একই এপার্টমেন্টে থেকেও কেউ কারো বাসায় যাবার সময় আমাদের হয় না। ইট-কাঠ-কংক্রিটের এই শহরে আমরা ক্রমশ নিরেট নিরস মানুষে পরিণত হচ্ছি। আমরা নিজের মাঝে নিজেকে শামুকের মত গুটিয়ে রাখি। কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক মেলামেশার ঐতিহ্য!
ভোরের চাদরটা তখনো ঘুমের আবেশ জড়ানো। সে চেয়ে আছে নিষ্পলক। ভোর বেলার বাতাসে একটা আলাদা ঘ্রাণ থাকে। সেই ঘ্রাণে থাকে মিষ্টি এক অনুভব। আমি সবটুকু মিষ্টি অনুভব জড়িয়ে তাকে বলি, ভালো থাকিস আজ সারাদিন। সে কোনো তোয়াক্কা করে না, সে তার মতই থাকে।
স্বপন গাঙ্গুলি। আমাদের অফিসের পিয়ন। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে অনেক বছর ধরে। পত্রিকা অফিসে সম্পাদক থেকে শুরু করে সবার আচরণই বন্ধুসুলভ। কিন্তু গাঙ্গুলি যেন এই পত্রিকা অফিসে বস। সবার সাথে চলে তার ধমকাধমকি। তাকে কোনো কাজের কথা বললেই ধমক! তবু তার আচরণে কেউ কিছু মনে করে না। তার মাথায় সামান্য দোষ আছে, এটা সবাই জানে।
প্রেমের ঋতু হিসেবে বসন্ত নাকি বর্ষা, কোনটা বেশি উপযোগী-এ নিয়ে ধুন্ধুমার তর্ক চলছে। স্থান--শাটল ট্রেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালযে পৌঁছতে ওটাই প্রধান ভরসা। প্রেমের ঋতু বর্ষা,এই ঘোষণা দিয়ে আমি তর্কের সূচনা করে দিলেও, শেষ করার দায়িত্বটা অন্যদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ট্রেনে জানালার পাশের সিটে বসে আমি বৃষ্টি উপভোগ করছি।
এক.
সমুদ্রবালক জলের তৃষ্ণা নিয়ে হাত বাড়ায় আকাশবালিকার পানে। বিপুল জলরাশির ভিড়েও তৃষিত সমুদ্রবালক প্রতীক্ষার প্রহর গোনে, তৃষ্ণার জল নিয়ে আসবে আকাশবালিকা!