অন্ধকারে দু'চোখ আলোয় ভরো প্রভু

চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ এর ছবি
লিখেছেন চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ (তারিখ: মঙ্গল, ২২/০৭/২০০৮ - ১২:১৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

[সামহোয়্যারইনব্লগ এ প্রকাশিত...১৭ ই অক্টোবর, ২০০৬]

"একটি বাংলাদেশ
তুমি জাগ্রত জনতা।
সারা বিশ্বের বিস্ময়, তুমি আমার অহংকার!"

ভিন্ন মতাবলম্বী দের মতামতের প্রতি যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সবিনয়ে বলতে চাই যে,আমি ডক্টর ইউনুস এর পক্ষে,আমি গ্রামীণ ব্যাংক এর পক্ষে। নোবেল পুরষ্কার লাভের পর আবেগের আতিশয্যে ডক্টর ইউনুসকে 'মহামানব' এর অভীধায় অভিষিক্ত করার মত বালখিল্য আমার নাই,কিন্ত যাবতীয় দুর্বলতা ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে,ফতুয়া-পরা এই ভদ্রলোক এবং উনার ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প ,নিদারূণ নৈরাশ্যবাদী এই আমাকেও জাগ্রত বাংলাদেশের স্বপ্ন দ্যাখায়।

আমাদের দারিদ্র্য এবং বিবিধ দুর্ভাগ্যের জন্য দৈব দুর্বিপাকের পাশাপাশি আমাদের দুর্বিনীত রাজনীতিবিদ সকলের অবদান ও নেহাত বেশি বৈকি,কম নয়। সম্পদের উপর সাধারণ মানুষের অধিকারহীনতাও শতাব্দীব্যাপী বিরাজমান অপব্যবস্থার ফসলমাত্র।রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা এবং রাষ্ট্রী য় অপশাসনের সাথে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমাদের জাতিগত চারিত্রিক ত্রুটি তো অগণিত আছেই।এইখানে সেইসব ত্রূটির উল্লেখ করে আর নিজেকে লজ্জা দিতে চাইনা।যাইহোক,দুঃশাসনে কোমরভাঙ্গা এই আমাদের কাছে যখন কেউ ক্র্যাচ নিয়ে এগিয়ে আসে,তখন তাকে ক্র্যাচ ব্যবসায়ী বলে অভিহিত করে, আমাদের কোমরভাঙ্গার পেছনে তার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হই।

তবে আশার কথা যে,যারা মাটির সবচেয়ে কাছাকাছি মানুষ-ষড়যন্ত্র উদঘাটনের চাইতে ভাঙ্গা কোমরের চিকিৎসাতেই তাদের আগ্রহ অধিক বলে মনে হয়।সেই জন্যই ২৫% সুদে (গ্রামীণ ব্যাংকের ভাষ্যমতে ২০%) ধার করা ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় তাদের শতকরা ৯৮.৮৫ জনই সফল হন।মুক্তবাজার অর্থনীতির করূণ শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা যখন রাস্ট্র করতে পারলোনা,তখন তারা ক্ষুদ্রঋণের টাকায় মুরগীর আন্ডা বেচে,লাউ চাষ করে নিজেদের ভরণ-পোষণের যোগাড় টুকু নিজেরাই করে নিলো।আমি এই কৃষিভিত্তিক প্রয়াসকেই টেকসই উন্নয়নের প্রথম ধাপ বলে মনে করি।আমাদের মত প্রান্তিক অর্থনীতিতে কেউ যদি শিল্প বিপ্লব অথবা অতি অধুনা তথ্য প্রযুক্তি বিপ্লবের রুপকথা শোনাতে আসে-তবে তা নিতান্ত হঠকারিতা ছাড়া কিছুই নয়।

এই তথাকথিত রক্তচোষা,সুদখোর গ্রামীণ ব্যাংকের ইক্যুইটি'র শতকরা ৯৪ ভাগের অংশীদারই কিন্তু এর ঋণগ্রহীতারা।এই ব্যাংক আজ পর্যন্ত প্রান্তিক জনগণের কাছে প্রায় ২৯হাজার কোটি টাকার ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে,যার সিংহভাগই আদায়ী ঋণ।১৯৯৮ সাল থেকে এই ব্যাংক কোনপ্রকার বৈদেশিক অর্থসাহায্য গ্রহণ করেনি,সম্পূর্ণ নিজস্ব সঞ্চয়ের উপর নির্ভরশীল।তাই,কম সুদে টাকা এনে বেশি সুদে প্রান্তিক মানুষ কে গছিয়ে দেবার অপবাদও ধোপে টিকবেনা।আর গ্রামীণ ব্যাংকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে,ঋণগ্রহীতার প্রায় ৯৭শতাংশই নারী।সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য।একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নে এই প্রভাব কি সোশ্যাল রিফর্মের ঈঙ্গিত দেয়না?আজকের গ্রামবাংলায় পারিবারিক অর্থনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের শহুরে নারীবাদীদের চোখের আড়ালে নীরবেই ঘটে গেছে।আর টোটাল ডেভেলপমেন্টের জন্য পলিটিক্যাল কমিটমেন্টের দরকার আছে বলে আমি অন্ততঃ মনে করিনা,পলিটিক্যাল অ্যাওয়ারনেস ই যথেষ্ট।

যাইহোক,অনেক ভারী ভারী কথা লিখে ফেললাম।সারমর্ম হলো যে,আমি ডক্টর ইউনুস এর পক্ষে আছি,কারণ উনার প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ তত্ত্ব আমার দেশের অনেক মানুষকে স্বপ্ন দ্যাখার সাহস দিয়েছ।আমি এই স্বপ্নের পক্ষে,এই সাহসের পক্ষে।রাস্ট্র যখন এইসব মানুষের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছিল,তখন এই ভদ্রলোক ই ব্যক্তি উদ্যোগে নিজের তত্ত্বের বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছিলেন।বড় বড় বুলিতে উনার কাজের সমালোচনা করার পূর্বে নিদেনপক্ষে চিন্তা করা উচিত যে,এর চেয়ে ভালো কি বিকল্প আমরা আমাদের কোমরভাঙ্গা মানুষদের দিতে পেরেছি?ডুবন্ত মানুষগুলোকে এই ভদ্রলোকের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প শুধু আঁকড়ে ধরার জন্য খড়কুটো দেয়নি,বরং ময়নাদ্বীপের তীরে পৌঁছে দিয়েছে।এখন আমাদের সেই ময়নাদ্বীপকে সবুজ করে তোলার পালা..আমরা কোমর সোজা করে দাঁড়াচ্ছিমাত্র,একদিন নিশ্চয়ই ঋজু হবো।

আমি দেশ কে নিয়ে স্বপ্নদ্যাখার দুঃসাহস অনেকদিন করিনাই..ডক্টর ইউনুস এর নোবেল পুরষ্কার পাবার দিনে সারাদিন ই চোখে যেন কি পড়ছিল আর মনে হচ্ছিলো যে,এইবার বোধহয় একটু সাহস করা যায়..গ্রামে গ্রামে স্বাবলম্বী মানুষের দল আমাকে স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নদ্যাখায়..অন্ধকারে মঙ্গলদীপ জ্বেলে যাবার জন্য ফতুয়া পরা ভদ্রলোক কে ধন্যবাদ!


মন্তব্য

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।