পুরোনো লেখা ০১: স্মৃতির শহর

অমিত এর ছবি
লিখেছেন অমিত (তারিখ: বুধ, ২৪/০৩/২০১০ - ১২:৫৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

(আমি ব্লগ লিখি নাই তেমন। অনেক আগে দুই তিনটা লিখেছিলাম। একসময় মুছেও দেই সেন্টু খেয়ে। পুরোপুরি খাই না, ব্যাকাপ রাখি কিছু। সেগুলোরই রিপোস্ট।)

কয়েক সপ্তাহ আগের একটা ছোট ঘটনা।সেদিন আমার ছিল ফিল্ডওয়ার্ক। লান্চের পর ফ্লাস্কের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফিটুকু বালির উপর ফেলে চলে আসতে যাব, হঠাত কি মনে হলে,ফেলে দেওয়া কফিটার দিকে তাকালাম। দেখলাম, যে জায়গায় কফিটা পড়ল,সেখানেই সেটা আটকে থাকল না।আশেপাশের জায়গাটাও ভিজে উঠতে থাকে ধীরে ধীরে, পুরোটা একবারে না।
খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার।
কিন্তু সেদিন আমার এই ব্যাপারটা দেখে মনে হল, এটাই হয়ত একজন মানুষের সাথে তার শহরের সম্পর্ক।বালিটা হল শহর আর ঐ তরল ব্যাপারটা হল সময়।সময় আর বয়স বাড়তে থাকে একই লয়ে, বাড়তে থাকে স্মৃতি আর এই স্মৃতিই ধারণ করে শহরটাকে।
হয়ত এভাবেই একটা শহর আমার শহর হয়ে ওঠে।
এই স্মৃতির অধিকারেই আমি বলতে পারি যে দিস ইস মাই হোম।
আমার জন্ম যে শহরটায় তার নাম ঢাকা। এখানেই বড় হয়ে ওঠা। আমার যত শিক্ষা, স্বপ্ন, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা তার মোটামুটি ৯৫ ভাগেই বলা যায় এ শহরটার অবস্থান কোন না কোন ভাবে আছে।
জনপদ হিসাবে ঢাকার ইতিহাস ৫০০ বছরের বেশি। ঠিক এই ধরণের জায়গাই আমার ভাল লাগে। ছিমছাম, ঝকঝকে তকতকে প্ল্যানড সিটির থেকে এরকম সমৃদ্ধ ইতিহাসময়, সময়ের প্রয়োজনে বেড়ে ওঠা শহরের মধ্যে মানুষের অদম্য, বিদ্রোহী সত্তার যে ইমেজ আমি দেখতে পাই, সেটাই আমি উপভোগ করি প্রচন্ডভাবে।
জানা অজানা কত মানুষের কত গল্প এই মাটি , ইট, পাথরের জঙ্গলে।সময় যেন কিছু কিছু জায়গায় পাথর হয়ে আটকে থাকে।হাত দিয়ে হয়তোবা অতীতকে ছোয়া যায়।এখনও ইউনিভার্সিটি এলাকায় গেলে চোখের সমানে ভেসে ওঠে ১৯৭১, ১৯৫২ এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন।৬০,৭০, ৮০র দশকের বিদ্রোহী তারুণ্য। শহীদ মিনারের রক্তের আর বারুদের গন্ধ হয়ত আজও পাওয়া যায় ২১শে ফেব্রুয়ারিতে।
পুরোন ঢাকার অলিতে গলিতে গভীর রাতে কান পাতলে হয়ত এখনও কোনও বীর মোগল সেনাপতির ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনতে পাব।হয়ত খুব ভোর বেলা ভিক্টোরিয়া পার্কে গেলে এখনও দেখতে পাব অকূতোভয় কোনও সিপাহি মাথা উচু করে ফাঁসির মন্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,গত ১৫০ বছর ধরেও তার মুক্তি হয় নি।নতুন ঢাকার খোপ খোপ সোনার খাঁচা আর শপিং মল গুলোতে পণ্য নয়,পাওয়া যায় সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত এলিট শ্রেণীর প্রামাণ্য ইতিহাস।
এইসব অসংখ্য ছোট বড় ইতিহাসের দালানের ভিড়ে আমার ছোট ছোট স্মৃতির কুড়েঘরগুলো কুয়াশায় হারিয়ে যায় নি এখনও।
আজিমপুর টিএন্ডটি কলোনির খেলার মাঠের পায়ের চিহ্নগুলা আমি জানি এখনও ধুলোয় মিশে যায় নি।সন্ধাবেলায় ঢাকা ভার্সিটির ভিসির বাসার সামনের বিশাল গাছটার মাথায় এখনও একই ভাবে অন্ধকার নেমে আসে।মধ্যদূপুরে পলাশীর মোড়ে একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে এখনও একই ভাবে রিকশার অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়।ভার্সিটির আড্ডা, বেলী রোডের আড্ডা, অ্যালিয়স ফ্রঁসেজের আড্ডা,জার্মান কালচারাল সেন্টারের ছাদের আড্ডা অথবা ক্যাফে ম্যাংগোর আড্ডায় কন্ঠস্বর কমে নি একজনেরও।শেষরাতে বুড়িগঙ্গা ব্রীজ থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত এখনও নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে যায় কয়েকজন যুবক। যে ঘুম আমরা ঘুমাতে পারিনি, সেই নির্ঘুম রাতের নেশা এখনও হাতছানি দিয়ে যায় কারও কারও জানালায়, আমি জানি।
এভাবেই আমি আজকাল বাস করি আমার স্মৃতির শহরে, অন্য অনেকের মধ্যে।


মন্তব্য

সিরাত এর ছবি

দারুউউউন লাগলো রে ভাই। আপনি আরো লেখেন না কেন?

এসএফ কেমন লাগে সেই তুলনায়? চোখ টিপি

যাযাবর ব্যাকপ্যাকার এর ছবি

সামান্য কথায় অসামান্য!
চলুক

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।