ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন এবং কিছু প্রাসঙ্গিক কথাঃ

বিদিত লাল দে এর ছবি
লিখেছেন বিদিত লাল দে [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ১৫/০৯/২০১৫ - ১:৪৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন এবং কিছু প্রাসঙ্গিক কথাঃ
বিদিত লাল দে
গত বেশ কিছু দিনের টানা আন্দোলনের পরে সরকার অবশেষে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর হতে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট (VAT)প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে নাগরিক জীবনে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। আন্দোলনরত ছাত্র ছাত্রীরা অবরোধ শেষ করে তাদের ক্লাসরুমে ফিরে যাবেন – এটাই প্রত্যাশা। একটি সঙ্ঘাতময় এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির হাত থেকে সাধারন জনগন আর বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীরা পরিত্রাণ পেতে পেরেছেন। সব বিচারে এক ধরনের মধুরেণু সমাপয়েত। আমি অর্থনীতিবিদ নই – তাই এজন্য সরকারের কত লোকসান হল সেটা বলতে পারছি না – কেউ এতে খুব একটা বিচলিত বলেও মনে হচ্ছে না। কিন্তু গত কয়েকদিনে আমি সামাজিক মাধ্যমে এবং পত্র পত্রিকায় কিছু ভ্রান্ত ধারনা দেখতে পেয়েছি। তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক দুই দিকে থেকেই এই ধারনাগুলো একদিকে যেমন ভুল অন্যদিকে দুর্বল যুক্তি-বিশ্লেষণে দুষ্ট। এখানে সেই বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করছিঃ
১) গত ৭ দিনে একটি কথা প্রচার করা হয়েছে – তা হল “শিক্ষা পণ্য নয়”; টিন-এজ সোশাল মিডিয়া এক্টিভিস্ট থেকে শুরু করে আমার সাবেক শিক্ষক, যিনি বর্তমানে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদে আছেন সবাই এক বাক্যে ফেসবুক কাঁপিয়ে দিলেন একথা দিয়ে – “Education is not a product”। বাংলাতে এটি যতটাই বৈপ্লবিক ইংরেজীতে এটা ততটাই অবৈজ্ঞানিক। মার্কেটিং-এর ছাত্র, গবেষক এবং শিক্ষক হিসেবে আমার জানা মতে – a product is a package of benefits offered to a group of customers to satisfy certain needs and wants and one must not forget that services are also products (Kotler et al. 2012; Branssington and Pettitt, 2006). সার্ভিসকে আমরা বাংলাতে বলি ‘সেবা’। বাংলাতে ‘সেবা’ শব্দটির মধ্যে একটি মহতী ভাব আছে আর এটি শুনলেই মনে হয় যেন কেউ বদান্যতা করে কিছু করছেন। কিন্তু মার্কেটিং-এ সার্ভিসকে বলা হচ্ছেঃ services involve processes, acts, deeds or a combination of these that may or may not result to tangible outcomes and do not lead to transfer of ownership (Wilson et al. 2012). একি সাথে এটি মনে করা হয় যে সার্ভিস এক ধরনের প্রোডাক্ট। প্রোডাক্ট বা পন্য দুই ধরনের হতে পারে goods oriented products (tangible) এবং service oriented products (intangible) এখন দেখা যাক শিক্ষা বা এডুকেশন কি প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের মাঝে পড়ে কি না। শিক্ষা অবশ্যই ‘package of benefits’. মার্কেটিং-এ needs/wants –এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে। “need is the state of felt deprivation” আর “wants are the more specific forms of needs”. শিক্ষা প্রদান করা হয় কিছু ‘needs and wants’ কে মেটাবার জন্য। ব্যাষ্টিক এবং সামষ্টিক উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের কিছু চিহ্নিত বা লুকায়িত প্রয়োজন আছে – যেমন কেউ ভাল চাকরি চায়, কেউ জীবনে প্রতিষ্ঠা চায় কেউ বা ডিগ্রী চায়। এই প্রয়োজনগুলোই ‘needs’। তাই আমরা বলি “I need a good higher education degree that will enable me to get a good job” আবার আমরা যখন needs তথা প্রয়োজনগুলোকে উপলব্ধি করতে পারি তখন তা মেটাবার জন্য মাধ্যম খুঁজি আর তাই বলি “I want to do BBA in NSU”. এবার ‘শিক্ষা’র স্থানে ‘তৃষ্ণা’ আর NSU-র স্থানে ‘coca-cola’ বসিয়ে দেখুন খাপে খাপে মিলে যাবে।
শিক্ষা হল এক ধরনের সার্ভিস – কারন এখানে processes, acts and deeds আছে। এখানে শিক্ষা সমাপণীতে tangible outcome হিসাবে সার্টিফিকেট পাওয়া যেতে পারে, আবার তা নাও হতে পারে। সর্বোপরি এতে মোলিক অবদানের (যেমনঃ জ্ঞান) মালিকানার পরিবর্তন হয় না। একই ভাবে চিকিতসা, আইনী সেবা, হিসাবরক্ষণ সেবা সবই সার্ভিস তথা প্রোডাক্ট তথা পণ্য।
প্রায় সব মার্কেটিং-এর বইয়েই উচ্চ শিক্ষাকে প্রডাক্ট বা সার্ভিস হিসাবে চিহ্নিত করা আছে। অথচ মজার ব্যপার হল – এত বিবিএ ছাত্র, এত মার্কেটিং শিক্ষক এই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে – তারা কেউই এ বিষয়ে মুখ খুলল না। বরং একটি বিবৃতিতে বলা হল “We do not believe education is a product” – তারা সবাই কি ফাঁপা জ্ঞান নিয়ে আছেন নাকি ‘ভ্যাট দিব না’ এই যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে একেবারে শিক্ষার প্রায়োগিকে এবং তাত্ত্বিক কিছু বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ফেললেন!!
যেই দেশে ৬ বছরের শিশুর ভিকারুন্নেসা স্কুল বা আইডিয়াল স্কুলের ভর্তির জন্য হাজার হাজার টাকার কোচিং করানো হয়, যেই দেশে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং সেন্টারের রমরমা ব্যবসা হয় সেই দেশে শিক্ষাকে পণ্য মনে না করাটা বড় ধরনের আহাম্মকি অথবা ভন্ডামি ছাড়া আর কিছু না।
২) দ্বিতীয় অসঙ্গতি যেটা চোখে পড়েছে তা হলঃ “শিক্ষা অধিকার কি না” এবং শিক্ষা অবৈতনিক হওয়া উচিত কি না। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা অবশ্যই অধিকার এবং এজন্য শিক্ষা প্রদান অবৈতিনিক হওয়াই উচিত। উন্নত বিশ্বের সব দেশে তাই নিয়ম। মুষ্টিমেয় ধনী পরিবার বাদ দিলে ৯৫% শতাংশ পরিবারের ছেলে মেয়েরা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ সব উন্নত দেশে সরকারের খরচে লেখাপড়া করে। এবং সেই শিক্ষার মান অনেক উন্নত। ৫ বছরের শিশুও স্কুলে ৭ ঘন্টা কাটায়। স্থানীয় সরকার স্কুলে যাবার বয়সী শিশুকে যেকোনভাবে স্কুলে ভর্তি করাতে বাধ্য থাকে। অর্থ্যাত শুধু শিক্ষা না মানস্মমত শিক্ষাও শিশুর অধিকার। মজার ব্যাপার হল ফেসবুকে যারা “শিক্ষা অধিকার” বলে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবী জানিয়েছেন তারা আমাদের দেশের প্রাথমিক/মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংলিশ মিডিয়াম এবং বেসরকারী স্কুলে (ডোনেশন প্রথা)শিক্ষার অধিকাররের উপর যে ব্যাভিচার হচ্ছে সে বিষয়ে নীরব থাকেন বা থেকেছেন। এটা কেউ বোঝেন না যে “উচ্চ শিক্ষা সবার জন্য নয়” – যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াতে উচ্চ শিক্ষা অনেক ব্যয়বহুল। ইউরোপের কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোতে উচ্চ শিক্ষা অবৈতনিক। কিন্তু সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয় মেধার পরিচয় দিয়ে। তাই ঘুরে ফিরে একটি কথাই দাঁড়ায় – উচ্চ শিক্ষা কারো জন্মগত অধিকার নয়।
৩) বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এবং পরিচালনা নীতিঃ আমার জানামতে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুনাফালাভী প্রতিষ্ঠান নয়। কিন্তু আমরা সবাই জানি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনার পেছনে আছেন ব্যবসায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। এতে কোন ক্ষতি নেই। উদ্যোক্তাদের ধর্মই হচ্ছে লাভজনক ব্যবসার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা। তারা তাই করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হল তারা সেখানে থেমে নেই বা থেমে থাকেন নি। আমি জানি বেশ কয়েকটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এখনও তাদের নিজস্ব জমি/দালানে সরে যান নি। এখনো ভাড়া করা বনানী, গুলশান আর ধানমন্ডীর বাড়িতেই চলছে কোচিং সেন্টার ধরনের শিক্ষাদান পদ্ধতি। বিবিএ আর কম্পিউটার সায়েন্সের আবর্তেই আটকে রয়েছে শতকরা ৯০ শতাংশ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া – গত বিশ বছরেও মৌলিক বিষয় যেমন গণিত, সমাজবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা ইত্যাদি - তে ডিগ্রী দেবার প্রচেষ্টা দেখা যায় না। কারন এটি বাজারমুখী শিক্ষাদান পদ্ধতি। বাজারে বিবিএ বিক্রি হয়, বাজারে কম্পিউটার সায়েন্স বিক্রি হয় তাই এর বাইরে কিছু চালু করা হলে সেটি বিকোবে না। (তারপরেও কি বলবেন শিক্ষা পণ্য নয়?)
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার বিষয়ে আমার তেমন প্রত্যাশা নেই। কারন বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার মানও হতাশাজনক। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর পাঠদানের অতিরিক্ত চাপ থাকে তাই তাদের পক্ষে মানসম্মত গবেষণা করা অনেক কঠিন। কিন্তু মালিকপক্ষ আর ব্যবস্থাপনা পরিষদের মাঝেও শিক্ষকদের গবেষণার মান বাড়ানোর বা উৎসাহ প্রদানের খুব একটা ইচ্ছা নেই। পিএইচডি ছাড়াই পরিপূর্ণ অধ্যাপক হয়ে গেছেন – এমন উদাহরণও দেখা যায় প্রায়শই।
এই তিনটি পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে বোঝা যায় উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আমাদের ধারনা যেমন ভ্রান্ত তেমনি উচ্চ শিক্ষার প্রচার এবং প্রসারের প্রক্রিয়াতে শুভংকরের ফাঁকিগুলো আমরা নজরে আনছি না বা দেখেও না দেখার ভান করছি। কিন্তু এরকম একটি অসঙ্গতিসম্পন্ন প্রেক্ষাপটে অপেক্ষাকৃত একটি ক্ষুদ্রতর এবং কম গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় নিয়ে এক ধরনের শাহবাগ/তাহরির স্কোয়ার ধরনের আন্দোলন শুরু করার বা শুরু হবার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ আছে।
যাই হোক এই ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনটি আপাত দৃষ্টে সফল – কারন সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করেছেন। কিন্তু সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট যদি উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্য, মান এবং এর সুষ্ঠু পরিবেশের চেয়ে আমাদের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তখন আবার আমার আগের কথা বলতে হবে – উচ্চশিক্ষা সবার জন্য নয়।

Brassington, F. and Pettitt, S. (2006), Principles of Marketing, 4th edition, Pearson Education, London.
Kotler, P., Keller, K.L., Brady, M., Goodman, M. and Hansen, T. (2012), Marketing Management, 2nd edition, Pearson Pretince Hall, London.
Wilson, A., Zeithaml, V., Bitner, M.J. and Gremler, D.D. (2012), Services Marketing, Integrating Customer Focus Across the Frim, 2nd European Edition, McGraw-Hill, Slough.


মন্তব্য

হাসিব এর ছবি

শিক্ষার তুলনা টানতে আপনি কেন বারবার শুধু চারটি ঞলিবারেল দেশের তুলনা টানছেন? পৃথিবীতে আরো দেশ আছে। ইওরোপে অল্প ব‍্যতিক্রম বাদ দিয়ে সবধরণের শিক্ষা হেভিলি সাবসিডাইজড। ওখানে বিশ্ববিদ‍্যালয়ে পড়ার শিক্ষাগত যোগ‍্যতা থাকলে সে বিশ্ববিদ‍্যালয়ে পড়তে পারে। যদি তার সেই যোগ‍্যতা না থাকে তাহলে সে তার যোগ‍্যতা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা (যেমন, কারিগরি শিক্ষা) নিতে পারে। সেখানেও সে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সহযোগিতা পায়। অতএব, যদি কেউ ইচ্ছা করে স্কুলের পরে সে উচ্চশিক্ষা, সেটা যে ধরণের প্রতিষ্ঠানেই হোক, রাষ্ট্রের সাহায‍্য নেবার সুযোগ তার থাকে।

আপনি যেভাবে যুক্তি সাজিয়েছেন সেটা হলো যেহেতু কয়েকটা ঞলিবারেল দেশে উচ্চশিক্ষা খরুচে এবং ইউরোপে বিশ্ববিদ‍্যালয়ে পড়তে যোগ‍্যতা লাগে অতএব উচ্চশিক্ষা অধিকার নয়। এটা খুব দুর্বল পদ্ধতি কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার ব‍্যাপারে।

মূল বিষয়টা হলো উচ্চশিক্ষা বিষয়ে রাষ্ট্রের দর্শন কী। যদি রাষ্ট্র মনে করে সে তার নাগরিকদের বিকশিত হবার পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করবে সরকারি অানুকূল‍্যে সেক্ষেত্রে আপনি যেই দাবিটা করলে উচ্চশিক্ষা অধিকার নয় সেটা টেকে না। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম‍্য প্রকট। এই অর্থনৈতিক ব‍্যবস্থায় একজন দরিদ্র সাধারণ মানের ছাত্র তার অবস্থা উন্নয়নের জন‍্য বেশি কোন সুযোগ পায় না। রাষ্ট্রিয় আনুকূল‍্যে সে উচ্চশিক্ষায় নিজেকে ঋদ্ধ করতে পারলে নিজের অবস্থা থেকে সে নিজেকে টেনে তুলতে পারতো। এই সুযোগ দরিদ্র লোকেরা না পেতে থাকলে একটা সময় দেখা যাবে শুধু ধনীরাই ধনী থেকে যাচ্ছে এবং দরিদ্ররা বৈধ রাস্তায় তাদের আর্থিক উন্নতির রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অবৈধ রাস্তায় নিজেকে ওপরে তোলার চেষ্টা করছে। যে চারটি ঞলিবারেল দেশগুলোর কথা বললেন সেখানে কালোদের অবস্থা এই দুষ্টচক্রের ভেতরে। তারা তাদের সামাজিক পর্যায়েই ঘুরপাক খাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

অতিথি  এর ছবি

চলুক

Bidit  এর ছবি

উচ্চ শিক্ষা অবৈতনিক হবে কি না সেটা আমার বক্তব্যের মূল কথা ছিল না - উচ্চ শিক্ষা সবার জন্মগত অধিকার কি না - সেটাই আমি আলোচনা করতে চেয়েছি । "ওখানে বিশ্ববিদ‍্যালয়ে পড়ার শিক্ষাগত যোগ‍্যতা থাকলে সে বিশ্ববিদ‍্যালয়ে পড়তে পারে। যদি তার সেই যোগ‍্যতা না থাকে তাহলে সে তার যোগ‍্যতা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা (যেমন, কারিগরি শিক্ষা) নিতে পারে।" আমি একমত -আপনিও মেনে নিলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষা সবার জন্য নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে অবৈতনিক শিক্ষা/ভর্তুকির পক্ষে। কিন্তু একই সাথে মনে করি উচ্চ শিক্ষা সবার জন্য নয়। ভর্তুকি তখনি দেয়া সম্ভব যখন প্রতিযোগিতামূলকভাবে মেধাবীদের স্থান দেয়া হচ্ছে।

"এই সুযোগ দরিদ্র লোকেরা না পেতে থাকলে একটা সময় দেখা যাবে শুধু ধনীরাই ধনী থেকে যাচ্ছে এবং দরিদ্ররা বৈধ রাস্তায় তাদের আর্থিক উন্নতির রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অবৈধ রাস্তায় নিজেকে ওপরে তোলার চেষ্টা করছে। যে চারটি ঞলিবারেল দেশগুলোর কথা বললেন সেখানে কালোদের অবস্থা এই দুষ্টচক্রের ভেতরে। তারা তাদের সামাজিক পর্যায়েই ঘুরপাক খাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।" - অনেক জটিল বিষয় - সমস্যাটা অনেক গভীর। আমি কালো-বাদামী-সাদা সব ধরনের গরীব ছাত্রদের পড়িয়েছি - সেটা নিয়ে অন্য সময় কথা বলা যাবে। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ - ভাল থাকবেন!

হাসিব এর ছবি

আপনি উচ্চশিক্ষা সবার জন‍্য নয় - এভাবে বলতে আগ্রহী। আমি সেভাবে বলতে আগ্রহী না। আমি বলি যার যার যোগ‍্যতা অনুযায়ী সকলেই উচ্চশিক্ষা নিয়ে নিজেকে বিকশিত করার অধিকার রাখে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে অবৈতনিক শিক্ষা/ভর্তুকির পক্ষে। কিন্তু একই সাথে মনে করি উচ্চ শিক্ষা সবার জন্য নয়। ভর্তুকি তখনি দেয়া সম্ভব যখন প্রতিযোগিতামূলকভাবে মেধাবীদের স্থান দেয়া হচ্ছে।

বুঝলাম না। উচ্চশিক্ষায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে যারা যার মেধা অনুযায়ী ছাত্ররা ভর্তি হয়। প্রাইভেট ইউনিগুলোতেও (সবগুলো নয় স্বীকার করছি) একধরণের ফিল্টারিং হয়। পলিটেকনিকে ভর্তি হতেও প্রতিযোগিতার মধ‍্য দিয়ে যেতে হয়। এখানে কোথায় এবং কারা প্রতিযোগিতামূলকভাবে মেধাবীদের স্থান দেয় না?

মার্কেটিং-এর ছাত্র, গবেষক এবং শিক্ষক

আমি কালো-বাদামী-সাদা সব ধরনের গরীব ছাত্রদের পড়িয়েছি

আপনি ধারণা করি ব্লগ বিষয়ে বেশি ধারণা রাখেন না। এখানে কে কী সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো লেখক কী বলছেন এবং সেজন‍্য কী আর্গুমেন্ট পেশ করছেন।

Bidit  এর ছবি

দুঃখিত - আপনার ব্লগের বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে খুব একটা ধারনা আছে বলে মনে হয় না - না হলে পলিটেকনিক আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে প্রতিযোগিতামূলক‍ বলতেন না।

হাসিব এর ছবি

ওসব জায়গায় এ‍্যাডমিশন টেস্ট হয় না? নাকি গেলেই টাকা দিয়ে ভর্তি এরকম ব‍্যাপার?

অতিথি  এর ছবি

বাংলাদেশের যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা থাকলেই ভর্তি হওয়া যায়। তবে খুব ভালোগুলোতে এ্যাডমিশন টেস্টে টিকতে না পারলে অনেক বেশি টাকা দিতে হয়।

হাসিব এর ছবি

ধরা যাক, আমি বিষয়টা এভাবে বললাম যে মামা-চাচা-খালু থাকলে বাংলাদেশে চাকুরি পেতে সহজ। অনেক জায়গায় প্রার্থী যোগ‍্য না থাকলেও আত্মীয় স্বজনের জোরে চাকুরিতে ঢুকে যাওয়া যায়।

এবার আপনার কমেন্ট,

বাংলাদেশের যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা থাকলেই ভর্তি হওয়া যায়। তবে খুব ভালোগুলোতে এ্যাডমিশন টেস্টে টিকতে না পারলে অনেক বেশি টাকা দিতে হয়।

এই দুটো উদাহরণই সিস্টেম করাপ্ট এই দিকটা নির্দেশ করে। প্রাইভেট ইউনিতেও ভর্তিপরীক্ষা দিতে হয়, পলিটেকনিকেও দিতে হয়। হতে পারে সেখানকার সিস্টেম বাইপাস করাটা সহজতর। তবে সিস্টেম একটা আছে সেটা অগ্রাহ‍্য করা যাবে না এতে।

সচল জাহিদ এর ছবি

সচলে স্বাগতম বিদিত দা। কানাডার কথা বলতে পারি, এখানে উচ্চ শিক্ষা বেশ ব্যায় সাপেক্ষ তবে সরকারের কাছ থেকে অনেক সুবিধে পাওয়া যায় যদি উচ্চ শিক্ষার পরিকল্পনা বা ইচ্ছা থাকেঃ

১) এখানে RESP বা Registered Education Savings Plans নামে একটি বিষয় আছে। আপনি আপনার সন্তান জন্মের পর থেকেই একটি একাউন্ট খুলতে পারেন এবং সেখানে প্রতিমাসে আপনার সাধ্যমত টাকা জমাতে পারেন। আপনার জমার উপর নির্ভর করে সরকারও সেখানে বেশ প্রতিমাসে টাকা রাখবে। আপনার সন্তান যখন ইউনিভার্সিটিতে যাবে তখন সুদে আসলে সব টাকা তুলতে পারবে। যদি ইউনিভার্সিটিতে না যায় তাহলে সরকার তার কন্ট্রিবিউশন নিয়ে নিবে।

২) আপনি ছাত্রজীবনে টিউশন ফির জন্য সরকারের কাছ থেকে ঋন পেতে পারেন। আপনার/আপনার পরিবারের আর্থিক অবস্থার উপর নির্ভর করে সেই ঋনের একটি বড় অংশ অনুদান হিসেবে আসতে পারে। আপনি ছাত্রজীবন শেষ করলে সেই ঋনের সুদ শুরু হবে, তার আগে নয়।

৩) ছাত্র অবস্থায় দেয়া টিউশন ফির একটা বড় অংশ চাকুরী জীবনের শুরুতে ট্যাক্স ক্রেডিট হিসেবে দাবী করা যায়।

আরো সুবিধে আছে, এই কয়েকটা প্রধান। আমার মূল বক্তব্য হচ্ছে বাংলাদেশে এই সুবিধে গুলি নিয়ে এসে টিউশন ফি বাড়াক তাহলে মানুষের অভিযোগ কমবে।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
বিশ্ব পানি দিবসব্যক্তিগত ব্লগ। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

Bidit  এর ছবি

ধন্যবাদ জাহিদ !

হ্যা, আমি এই সুবিধাগুলোর বেপারে অবগত আছি। দুইটি বিষয় এখানে দেখতে হবে - যতই স্টুডেন্ট লোন আর স্বল্প কিস্তির কথা বলা হোক - টাকাটা ছাত্রদের পকেট থেকেই যাচ্ছে - সেটা আজ হোক আর কাল হোক। আমাদের ব্যাঙকিং খাত এখনো স্বল্প সুদে লোন দিতে আগ্রহী নয়। লোন পরিশোধের বিষযেও অনেক কিন্তু, যদি আছে! তাই এইধরনের সুবিধার প্রায়োগিক দিকটি অনেক জটিল।
আমি ব্যক্তিগতভাবে অবৈতনিক শিক্ষা/ভর্তুকির পক্ষে। কিন্তু একই সাথে মনে করি উচ্চ শিক্ষা সবার জন্য নয়। ভর্তুকি তখনি দেয়া সম্ভব যখন প্রতিযোগিতামূলকভাবে মেধাবীদের স্থান দেয়া হচ্ছে। সরকারের পয়সাতে তুমি বুয়েটে বা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেই সুযোগ পেয়েছি সেজন্য আমাদের মেধাকে প্রমান করতে হয়েছে। সরকার একই সুবিধা দেশের সকলের জন্য দিতে পারবে না - এটা বাস্তবতা।
আমাদের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। কারিগরী শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। যুক্তরাজ্যে অনেক ছেলে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না, কিন্তু কারিগরী শিক্ষার পরে ভালো চাকরি করে - এরা আমাদের মত পিএইচডি দের চেয়েও বেশি আয় করে। - বিদিত

Touhid Kawsar এর ছবি

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তাদের শিক্ষক, কর্মচারীর বেতন ভাতা পরিশোধের পর উদ্দৃত্ত অর্থ কি করে? ডিরেক্টরদের ডিভিডেন্টে চলে যায় প্রায় সবটুকুই আমার ধারনা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আসলেই এটা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু না। মঞ্জুরী কমিশন অথবা শিক্ষা মন্ত্রনালয় সরাসরি একটা ব্যপারে বাধ্যবাধকতা আনতে পারে তা হল উদ্দৃত্ত অর্থ বা মুনাফা গবেষনা খাতে পুনর্বিনিয়োগ। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য, গবেষনার মাধ্যমে নতুন কিছু আবিষ্কার, অর্জিত হবে বলে মনে করি।

হাসিব এর ছবি

উদ্ধৃত্ত অর্থ কীভাবে ডিফাইন করা যাবে? ইউনিভার্সিটি বলতে পারে তারা অমুক প্রকল্প (সেটা ইউনির ক্লাসরুম বিল্ডিং হতে পারে, শিক্ষক কর্মকর্তাদের অফিস বিল্ডিঙও হত পারে) বাস্তবায়নের জন‍্য টাকা জমাচ্ছে। এটা মানলে উদ্ধৃত অর্থ আসলে উদ্ধৃত নয়।

Touhid Kawsar এর ছবি

হাসিব, বেশ ভালই বলেছেন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মালিকরা যদি ব্যাবসায়ী মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে না পারে তবে কোনো অর্থই উদ্দৃত্ত হিসেবে দেখাবে না। আয়কর রিটার্ন জমা দেবার সময় অনেক ফাক ফোকর গলে ঠিকই বেরিয়ে যাবে। আমি জানি না এটা কতটা বাস্তব সম্মত প্রস্তাব হবে, যদি সরকার তাদেরকে বাধ্য করে যে গবেষনা খাতে প্রতিবছর মোট আয়ের একটি নির্দিষ্ট পরিমান ব্যয় করতেই হবে এবং পরিচালনা পর্ষদ নির্দিষ্ট ভাতার বাইরে কোনো আর্থিক সুবিধা ভোগ করবে না। তবে সবার আগে প্রতিটা প্রতিষ্ঠানকেই অনুর্ধ ৫ বছরের মধ্যে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাবার বাধ্যবাধকতা জোরদার করা উচিৎ।

চরম উদাস এর ছবি

সচলে স্বাগতম। লেখা ভালো লাগছে চলুক

মেঘলা মানুষ এর ছবি

আমি মূর্খ মানুষ। তাও, কিছু কিছু বিষয় আমাদে খোঁচায়। এগুলো ছোটবেলায় আমার এক চাচার মুখে শুনেছিলাম।

তিনি একটা বায়িং হাউস চালান। তার ওখানে যারা কাজ করেন তার সবাই স্নাতক পর্যন্ত পড়েছেন। কিন্তু, চাচার কথা হল এই কাজ করার জন্য উচ্চমাধ্যমিক ডিগ্রিই হয়ত যথেষ্ঠ হত, বাকি সময়টা এই লোকগুলো বাস্তব জগতে কাজ করে অভিজ্ঞতা যোগাড় করতে পারতেন। কিন্তু, আমাদের সামাজিক বিচারের মানদন্ডে স্নাতক ডিগ্রি থাকাটা একরম জরুরি প্রয়োজন হিসেবে দেখা হয়। উদাহরণ, হিসেবে তিনি অনেক কম্পানিতে রিসেপসনিস্ট পদে নিয়েগের জন্য যে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হত সেগুলোর কথা বলতেন। তার ভাষায় রিসেপসনে কাজ সামলানোর জন্য স্নাতক ডিগ্রি একটা বাহুল্য।

আমি নিজের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাও শেয়ার করি। আমেরিকায় যখন পড়তে আসি তখন চারদিকে শুধু Back to School এর শ্লোগান। সরকার থেকে প্রচুর লোন ছাড়া হয়েছিল। আমি ঠিক জানি না, তবে সম্ভবত একটা গোষ্ঠী এই লোন ম্যানেজমেন্ট করে ভালো পয়সা পেতে পারত। চারদিকে তখন এমন একটা বার্তা দেয়া হত যে, তুমি হাইস্কুল (আমাদের ১২ ক্লাসের সমমান) পাশ করে কাজ করছ, কিন্তু তুমি যদি কলেজে (আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সমমান) যাও, তাহলে তোমার বেতন বাড়বে, তুমি বেশি বেতনের চাকরি পাবে। আর এই ধার খুব স‌হজেই শোধ করে ফেলতে পারবে।

পরবর্তীতে অনেকেরই স্টুডেন্ট লোনের হরর গল্প পড়েছি অনলাইনে। অনেকেই লোন নিয়ে পড়ার পর আশানুরূপ বেতনের চাকরি পায়নি, বরং ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ সফল হয়েছে এটাও সত্যি।

আমাদের দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তুলনামূলক কম খরচে পড়ার যে ব্যবস্থা আছে -সেটা কেন জনপ্রিয় হচ্ছে না -সেটও ভাবার বিষয়।

শুভেচ্ছা হাসি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।