অবয়ব

রংতুলি এর ছবি
লিখেছেন রংতুলি [অতিথি] (তারিখ: শুক্র, ২৩/০১/২০১৫ - ১১:৫১অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

লম্বা শীতনিদ্রার পর স্কুল শুরু হলো ঢিমাতালে। উত্তরাঞ্চলের জানুয়ারির শীত মানে সত্যিকারের হাড় ফুটো করা ঠাণ্ডা। ক্লাশে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি কম, যদিও স্কুল চলে নিয়মমাফিক। নাহরিনের বাসা থেকে স্কুল ঘন্টাখানেক হাঁটা পথ। মিনিট দশেক পেরুলে অবশ্য বড় মসজিদ মোড়ে রিক্সা, অটোরিক্সা মেলে সহজেই। নাহরিন হেঁটে যেতেই পছন্দ করে। হাঁটা তার দীর্ঘদিনের অভ্যেস, প্রয়োজনও।

পার্থিব/অপার্থিব

চার বোনের মাঝে নাহরিন সেজো। বড় আপু দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তাদের সাথে থাকছে প্রায় তিন বছর। অল্প বয়সে আপুর বিয়ে দেয়া হয়েছিল কাঁচা টাকাওয়ালা উঠতি এক ট্রাক ব্যবসায়ীর সাথে। শকুন-চোখের লোকটাকে ওরা চারবোন শুরু থেকেই ঘৃণা করতো, যদিও বড়জনের কোন উপায় থাকে না। লোকটা তার ভাড়ায় খাটানো ট্রাকগুলোর বাইরে যা চিনতো তা হলো - মদ আর নারী। বৌ-ছেলেমেয়ে কোথায় কোন চুলোয় তাতে তার কিছু আসে যায় না।

আর দশটা শর্টকাটে বিশ্বাসী ব্যবসায়ীর মতো সেও বিয়ে করেছিল পরহেজগার ভাগ্যবতী বৌ পাওয়ার আশায়। যে বৌ ঘরে ইবাদত বন্দেগী’র জোরে বাইরে তার করে বেড়ানো পাপ কাটাবে, আর ভাগ্যের যাদু চাকা ঘুরিয়ে অর্থ সম্পদের বন্যা বইয়ে দিবে। কিন্তু বিয়ের পর যখন দেখলো তেমন কিছুই ঘটছে না, উপরন্তু পরপর তিন তিনটে অ্যাকসিডেন্ট, এক ট্রাকের ইঞ্জিন জ্বলে ড্রাইভার মরল, তখন তার বুঝতে বাকী রইলো না কপালে অপয়া, খনসকাট বৌ জুটেছে। তার নিয়ত ছিল সাফ, প্রতিটা লোকসানের সুদ সমেত উসুল নেয়া শুরু করে সে আপুর হাড়মাংসের উপর দিয়ে, এবং অবশেষে বাস্তবেই ঈমানের জোরের চেয়ে গায়ের জোর বেশী প্রমাণিত হয়! অসীম ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে চার বছরের একটা আগামাথাহীন বিবাহিত জীবন কাটানোর পর দু'টি দুঃখী ছেলেমেয়ে নিয়ে আপু ফিরে আসে।

মা কিভাবে এতোগুলো মানুষের পাতে ভাত বেড়ে দেয় তা ওরা কেউ জানতে চায় না, ভয়ে। শুধু নিয়মমতো মাসের প্রথমে পাওয়া বেতনের টাকার পুরোটা মার হাতে তুলে দিতে পারলে নাহরিনের ভেতর থেকে থেকে আসা দম আটকানো স্রোতের তোড় কিছুটা কমে। মফঃস্বলের এক আধ-সরকারী স্কুলের বেতনই বা কত!

তবুও খুব অল্পসময়ের জন্যে মায়ের কপালে বলিরেখা হয়ে ফুটে থাকা স্থায়ী উদ্বিগ্নতার ছাপ একটু শিথিল দেখে সে। মা কখনো বলে - তুই কিছু রাখলে পারিস। বাইরে যাস, তোরও খরচ থাকে!

- না না, আমার আবার কি খরচ! নাহরিন অবাক হবার ভান করে।

মা কথা বাড়ায় না। হাতে ধরা টাকা ক’টার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে’র সামনে তখন পুরো একটা মাস, একটা সংসার, আর কতগুলো মুখ।

পাশের ঘরে বাবাকে হঠাৎই বহুবার পড়ে ফেলা বাসি খবরের কাগজের পাতা উল্টাতে ব্যস্ত শোনায়। দু’চোখে বেড়ে যাওয়া ছানির কারণে আজকাল কাগজ ছেনে খবর বের করতে বুঝি তাকে বেশ বেগ পেতে হয়!

বাবা বহুকাল আগে কখনো স্টেশন রোডে বইয়ের দোকান চালাতো, কি এক কারণে দোকানটা বেচে দেয়, শুরু করে বাড়ির সামনের ছোট ঘরটায় হোমিওপ্যাথী চিকিৎসা। সেখানেও সুবিধা করে উঠতে পারেনি। শহরের একেবারে শেষ মাথায় নামযশহীন বাবার কাছে রোগী বলতে আসতো কেবল আসেপাশের চেনা মানুষগুলো। তাদের ছেলেপুলের সর্দি-কাশি, পেটের ব্যথায় দশ টাকা পুরিয়া ওষুধ নিয়ে যাবার পথে বাবা নিজেই সংকোচ বশতঃ কখনো টাকাটা নিতো না, তো কখনো তাদেরও যেচে দেয়ার গরজ থাকতো না।

চার মেয়ের পর মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তানটি যখন জন্মাবার তিনদিনের মাথায় মরণ খিঁচুনিতে চলে যায়, সেই থেকে বাবা’র হোমিওপ্যাথী চিকিৎসার পাট চুকে। বাইরের ঘরটি’র সাইনবোর্ড খুলে সেখানে সারাদিন খবরের কাগজে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকাই বাবার একমাত্র কাজ হয়ে পড়ে। খবরের কাগজ মারফত জগতের যাবতীয় বিষয়ের খোঁজ রাখলেও নিজ ঘরে সংসারের চাকা কিভাবে ঘুরছে সে ব্যাপারে তিনি থেকে গেছেন বরাবর উদাসীন। হয়ত একে একে কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে যাওয়ার অপরাধে এটা ছিল মার প্রতি তার মৌন বিদ্রূপ! তবে ওদের চারবোনের দিন অতটা খারাপ কাটেনি। সন্ধ্যেবেলায় চুলোয় ভাত চাপেনি দেখে জানতে চায়নি কেন ভাত নেই, বরং তারা চারজন এমন ভাব করে শুয়ে পড়েছে যেন ঠিক তখনই ঘুমে ওদের চোখ ভেঙে আসছে, ক্ষুধার কথা মনেই নেই। জীবনে পার্থিব সুখ, প্রাপ্তি ও প্রাচুর্যের দেখা যারা পায় না, তারা হয়ত এভাবেই দুঃখ আড়াল করতে শেখে, অপার্থিব কোনো ক্ষমতাবলে।

লিটুদের টিয়া পাখি

নাহরিন হাঁটে, হাঁটাই ভাল।

কতকিছু দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। কতকিছু আপনমনে সময় নিয়ে ভাবা যায়। লিটুদের বাড়িটা রঙ করানো হচ্ছে। লিটু ওদের চারবোনের খেলার সাথী। তারা একসাথে বড় হয়েছে। একসাথে ছুটে বেড়িয়েছে, ঘুড়ি উড়িয়েছে, গাছে চড়েছে, চিকন কঞ্চির মাথায় আঠা লাগিয়ে ফড়িং ধরেছে... ছোট্ট নিরিবিলি শহরটার পথ-ঘাট, মাঠ-পুকুর চষে বেড়িয়েছে, এমন কি মা’র চোখ ফাঁকি দিয়ে শহরের ধারঘেঁষা পুনর্ভবা নদীর তীরে বালির ঘর তুলে তাতে ঘরকন্না খেলে, নয়তো নদীর টলমলে পানির তল থেকে আঁকিবুঁকি নকশা কেটে চলা জ্যান্ত ঝিনুক তুলে তার খাঁজে লুকোনো মুক্ত খুঁজে দুপুর পার করেছে। লিটু-কে একদিন হঠাৎ করেই বোর্ডিংএ পাঠানো হলো, এরপর তাদের সম্পর্ক যেন রূপকথা গল্প হয়ে থেকে যায়। ছুটিতে হটাৎ-মটাত যখন লিটু আসতো, তখন সে অনেক দূরের মানুষ। কি যে সুন্দর লাগতো তাকে দেখতে! সাহেবের মতো চালচলন, ঝকঝকে পোশাক, পরিপাটি চুল। লিটুর পাশে নিজেকে যাচ্ছেতাই লাগতো তার। লজ্জায় ওর সামনে যেত না। কে জানে লিটুও ওকে লজ্জা পেত কিনা! লিটু এখন কানাডা থাকে। শুনেছে তার বিয়ে উপলক্ষেই এ আয়োজন।

চুন, রঙ আর স্পিরিটের গন্ধ ভেসে আসে নাহরিনের কাছে। লিটুদের বাড়ির সামনে কোমর সমান পাঁচিল, উপর দিক দিয়ে খোলা যায় এমন ছোট্ট একটা গেট। নাহরিন উঁকি দিয়ে দেখে ভেতরটা, এতো সকালে এবাড়ির কেউ ওঠেনি। লিটুদের একটা পাখি আছে। টিয়াপাখি। বিয়ের তোড়ে পাখিটার কথা বুঝি ওরা ভুলে গেছে। ঠান্ডায় খোলা আকাশের নিচে খাঁচাসুদ্ধ ফেলে রাখা হয়েছে তাকে। ঘাড়ের কাছের ঘন রোম ফুলিয়ে তাতে মুখ গুঁজে ঝিমোয় পাখিটা। নাহরিন মনে করার চেষ্টা করে শেষ কবে তাকে মাথার ওপরের আকাশটার দিকে বুনো চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখেছে! খাঁচার পাখির বুকে কত যে ভাষাহীন অভিমান জমা থাকে, কে জানে!

... এবং খাঁচা

ডাবগাছ মসজিদের উল্টো দিকে নাহরিনের পথ যেখানে ছোট বড় চারটি পথের মিলন রেখায় এসে মিশে, তার এক কোণে শহরমুখো বড় রাস্তাটার ধার ঘেঁষে মাটির চুলোয় খড়ি-কাঠে’র আগুনে ধোঁয়া’য় তাল তুলে গরম গরম ভাপা পিঠে তৈরি হচ্ছে। চুলো’র গা ঘেঁষে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে তিনটে ছাগলের বাচ্চা। দু’টাকায় সকালের নাশতা সেরে নেয়ার পাশাপাশি ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া শীর্ণকায় হাতগুলো সেঁকে নিচ্ছে খুব ভোরে ক্ষেত থেকে সবজি বোঝাই ভাঁড় নিয়ে আসা মানুষগুলো। চুলোটাকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটলা দেখে – ‘আগুন প্রাণের উৎস’ বাক্যটির যথার্থতা খুব সহজে টের পাওয়া যায়।

-আসসালামু আলাইকুম আপা। জুবুথুবু শীতের পোশাকে আপাদমস্তক ঢাকা রামিসা। কখন নাহরিনের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, চমকে দেবে বলে। রামিসা নাহরিনের বাকী পথটুকু’র সঙ্গী।

-ওয়ালাইকুম সালাম রামিসা। কেমন আছ তুমি?

-মারে মা যা ঠাণ্ডা আপা!

রামিসার সরল স্বীকারোক্তিতে হাসি ফোটে তার মুখে।

-আপা, আমাকে কেমন দেখায়?

শিশুরা অদ্ভুত! ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে এরা বড়দের মনযোগ চায়। নাহরিন তাকায় রামিসার দিকে। ফুলের মতো একটি মেয়ে। সকালের আলোর মতো স্নিগ্ধ আর মন ভাল করা মুখ। তবে আজ কি জানি কি একটা নেই, ও হ্যাঁ! ওর বেনীদু’টো।

-শীতের ভয়ে বেণী লুকিয়ে রেখেছো বুঝি!

-আম্মা আমাকে হিজাব পরায় দিসে তো! আজকে থেকে আমার বেণী এর মধ্যেই থাকবে! এই, এত্তোগুলা সেফটিপিন দিয়ে খুব টাইট করে আটকে দিসে, টানলেও খুলবে না! হি হি হি... রামিসা’র বলার ধরণ দেখে মনে হয় যেন পৃথিবীর অন্যতম সেরা কমিকের কোনো ঘটনা বর্ণনা করছে সে।

-আপা জানেন হিজাব না পরলে কি হয়?

-না।

-ইমাঃ! আপনি জানেন না! গুনাহ হয়, অনেএএএক!

-ও। নাহরিন ছোট্ট করে শ্বাস ছাড়ে। বয়স কত হবে রামিসার, ছয় নাকি সাত?

রামিসা ক্লাস ওয়ানে পড়ে। এরই মধ্যে ওর ক্লাসে তাকে নিয়ে চারটি শিশু এখন হিজাব নামের এ বিশেষ পোশাক পরছে। প্রতিদিন এ সংখ্যা বাড়ছে। উপরের ক্লাসগুলোতে এ সংখ্যা আরো বেশী।

নাহরিন নিজের স্কুলজীবনে স্মৃতি ঘাটে, ফিরে যায় রামিসার বয়সে। নাহ! অনেক খুঁজেও তার ক্লাসে হিজাব পরা কোনো সহপাঠীকে সে দেখতে পায় না। অনেক পরে কিশোরীকালের কথা ভাবে, সেখানেও কেউ নেই। কামরুন নামের বোরখা পরা মেয়েটার কথা তার মনে পড়ে। হ্যাঁ, কামরুন বোরখা পরত, কিন্তু সে অনেক পরে! কত পরে? ক্লাস এইট বা নাইন? নাহরিন মনে করতে পারে না।

একটা পরিবর্তন সে দেখতে পায়। পরিবর্তনটা অন্যরকম, ঠিক স্বাভাবিক না। মালদাহপট্টি মোড়ে থান কাপড়ের দোকানগুলোর মাঝে বছর দু’য়েক আগেও ‘ওড়নাঘর’ নামে কেবলমাত্র একটি ওড়নার দোকান ছিল। আজ তার গায়ে গা লাগিয়ে একে একে পশরা সাজিয়ে বসেছে বাহারি রঙের স্কার্ফ আর হিজাবের দোকানগুলো। নানাবয়সি মেয়ে সেখানে সারাদিন ভুট হয়ে পোশাকের সাথে ম্যাচিং হিজাব অথবা স্কার্ফ নামের বিশেষ বস্ত্রখণ্ড খুঁজতে থাকে। আচ্ছা, এগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ কি?

চিরচেনা শহরটাতে নিজেকে আগন্তুক লাগে তার। পথ-ঘাট, ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে মানুষগুলোও কেমন ভোল পালটেছে। অনেক ভেবেও বুঝে ওঠে না সে আকস্মিক এই পরিবর্তনের অর্থ কি? ফ্যাশন না সচেতনতা? ভাল না খারাপ?

রামিসার বয়সে ছেলেদের সে ঈর্ষা করতো, ঈর্ষা করতো ছেলে বলে তারা বেশী বেশী সুযোগসুবিধা পায় বলে। সুযোগসুবিধা বলতে তার ঐ অতটুকুন মন শুধু একটা জিনিসই বুঝত – স্বাধীনতা। যখন তখন ছুটে বেড়ানোর স্বাধীনতা। জাদুময় জগতটার পরতে পরতে লুকানো অফুরন্ত ঐশ্বর্য খুঁজে ফেরার চিরন্তন স্বাধীনতা। নারী হিসেবে নিজের ভিন্ন সত্তার উপলব্ধি তার এসেছিল অনেক পরে। নিজে মেয়ে হওয়ায় যে বাধাগুলোর সাথে সে পেরে ওঠেনি, তার পরের সারির কেউ এসে তা অবলীলায় পার করে যাবে – এই প্রত্যাশা করেছে মনেপ্রাণে। স্বপ্ন দেখেছে পরিবর্তনের। অবরুদ্ধ অসম সমাজ পরিবর্তনের। যেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্যহীনতা, সমতার শিক্ষা পাবে শিশুরা মুক্ত পরিবেশে পরিবার, স্কুল ও সমাজ থেকে, পাপপূণ্যের সীমারেখায় অবরুদ্ধ হয়ে নয়।

নাহরিনের নিজেকে লিটুদের বাড়ির পাখিটার মত লাগে। চারপাশের দূর্ভেদ্য খাঁচা ভাঙার শক্তি তার নেই, তাই অদৃশ্য কিছু ঝাপসা পালক সে গজিয়ে নিয়েছে তার অনুভূতিপ্রবণ ইন্দ্রিয়গুলোর চারপাশে যার ভেতরে মুখ গুঁজে সে থাকতে চায়। যেমন সাহস হয় না মায়ের সংসার চালানোর গূঢ় রহস্য উদঘাটনের। সে জানে বাবা তার চারপাশে এই পালক গজিয়েছে আরো আগে, পুরনো নিউজপেপারের আড়ালে আসলে সে তার পরাজিত মুখ লুকোতে চায়। সে জানে বাবা তার ছানিপড়া চোখে প্রায় কিছুই দেখে না। নাহরিন রামিসা’র মতো শিশুদের প্রাণচঞ্চলতা হারিয়ে যেতে দেখে, যেন কোত্থেকে উটকো এক ভারিক্কী এসে ভুতের মতো ভর করে তাদের উপর। শিশুর সহজাত উদ্দীপনাগুলো মিইয়ে, হ্যারিকেনের বদ্ধ শিখার মত স্থির, প্রাণহীন হয়ে তারা জ্বলছে...

খাঁচাভাঙ্গার দিন

সেদিনটাও হতে পারতো নাহরিনের জীবনে আর দশটা দিনের মতো একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন, পালকে মুখ গুঁজে থাকা একটা দিন। কিন্তু অপার্থিব কোনো শক্তিবলেই বুঝি সেদিন সব বদলে গেল। নাহরিন বাড়ি ফেরে স্কুল ছুটির অনেক পরে। বাচ্চাদের পরের দিনের হোমওয়ার্কের খাতাগুলো রেডি করে ক্লাসের টুকিটাকি আয়োজন সেরে সব গুছিয়ে নাহরিনের ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে যায়। কখনো কখনো প্রায় সন্ধ্যা। সেদিনও নাহরিন ফিরছিল তার প্রতিদিনের চেনা পথ দিয়ে।

আসরের ওয়াক্ত। শুভ্র পোশাকে প্রৌঢ় প্রায় এক লোক নামাজের জন্যেই হবে যাচ্ছিল মসজিদের ভেতর, কিন্তু নাহরিনকে দেখে থেমে যায় সে। ভেতরে যাওয়া বাদ দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে তাকে। লোকটার চাহনি নাহরিনের ভেতরে অস্বস্তি ধরায়। নিজেকে প্রবোধ দেয়ার জন্যেই তাকায় লোকটার দিকে। নাহ! কোনো সন্দেহ নাই। লালসা উপচে পড়া শকুন চাহনি। যে চাহনি রোজ তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায় কখনো সহকর্মীর চোখ হয়ে, কখনো পাড়ার বখাটের ছেলের চোখ হয়ে, চলতি পথে, দোকানপাটে চেনা অচেনা অসংখ্য চোখ হয়ে।

নাহরিনের দৃষ্টি লোকটার সাদা পোশাক ভেদ করে ভেতরের কদর্য আবর্জনার স্তূপ অব্দি পৌঁছে যাওয়ায় লোকটা হকচকিয়ে যায়।

-এই... এই মেয়ে মাথায় কাপড় দেও! ধমকে ওঠে সে।

নাহরিন কিছু বলে না। কয়েক পা এগিয়ে যায়।

-ছিঃ! আস্তাগফেরুল্লাহ! তাকে শুনাতে গলার স্বর সপ্তমে চড়ায় লোকটা।

শেষের শব্দটায় মাথায় দপ করে আগুন ধরে যায় তার। লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিদ্যুদ্বেগে ঘুরে ঠিক ওর মুখোমুখি দাঁড়ায় সে, সোজা কুৎসিত চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে - কেন, আমার মাথায় কাপড় নাই দেখে কি মসজিদের সামনে দাঁড়িয়েও আপনার ওজু নষ্ট হয়ে গেল?

নাহরিনের অপ্রত্যাশিত আচরণে লোক্টা তব্দা খেয়ে যায়, বহু কষ্টে টেনে টেনে বলে - বাঃরে বাঃ!... শেষ জামানা! ভাল কথা বললে...

-ভাল কথা বলার আগে তোর শকুন চোখ দু’টা উপড়ে নেই, আয়! স্পষ্ট আর তীক্ষ্ণ শোনায় নাহরিনের কণ্ঠ।

লোকটার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়। দ্রুত চোখ বুলিয়ে চারপাশটা দেখে নেয় সে, এ বেলা মোড়টাতে তেমন ভিড় থাকে না, কাছেপিঠে কেউ লক্ষ্য করছে না তাকে। কথা না বাড়িয়ে লাখি খাওয়া কুকুরের মত কু কু করতে করতে ভেতরে পালিয়ে বাঁচে সে।

এই এক ঘটনায় আচমকাই মহা পরিবর্তন ঘটে যায় নাহরিনের ভেতর। সে এখন ছোট্টবেলার দুরন্ত নাহরিন, সাদা ফিতেয় দুই বেণী নিয়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে এই পথ দিয়েই যে স্কুল থেকে ফিরতো। আর তার এক পা ছুঁতো মাটি, আরেক পা ছুঁতো স্বপ্নের আকাশ। আজকের এই দুপুর গড়ানো বিকেলটাও অন্যরকম, ঠিক ছেলেবেলার মত। যখন মা’র আলিশের ফাঁকে তারা চার বোন হারিয়ে যেত তেপান্তরের রহস্যপূরীতে, মণিমাণিক্যের খোঁজে।

লিটুদের বাড়ির সামনে এসে আবার থামে সে। বহুদিনের জড়ানো আড়ষ্টতার বেড়ি আজ আলগা হয়ে গেছে আপনা থেকে। লোহার ছোট গেটটা একটানে খুলে ফেলে, তাকায় পাখিটার দিকে। সেই একই জায়গায় পড়ে আছে সেটা, এগিয়ে যায় সেদিক। পাখিটা চেয়ে আছে, তার চোখে কি কোনো স্বপ্ন, কোনো আকুতি ছায়া ফেলে...


মন্তব্য

মজিবুর রহমান  এর ছবি

অসম্ভব সুন্দর গল্প, সেই ভালো লাগার কথা ভাল করে বলাও আমার পক্ষে অসম্ভব !!! গুরু গুরু

মজিবুর রহমান

রংতুলি এর ছবি

সেকি, আপনার মতো ভাষার যাদুকর ভাষা হারালে চলবে! আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- হাসি

মেঘলা মানুষ এর ছবি

সাবলীল লেগেছে গল্পটা।
গতরাতে 'পার্সেপোলিস' দেখলাম। সেখানেও কয়েকটা ডায়লগ ছিল এই 'স্পর্শকাতর' বিষয় নিয়ে।

আরও গল্প আসুক, শুভেচ্ছা হাসি

রংতুলি এর ছবি

ধন্যবাদ মেঘলা মানুষ!

এটা আসলে ঠিক গল্প না। বহুদিন পর নিজের প্রিয় শহরে শান্তিতে কিছুদিন থাকব বলে গিয়ে যে অসামঞ্জস্যগুলো দেখে ধাক্কা খেয়েছি কিছুটা প্রকাশ ছিল সেসবের। আসলে এই স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লিখার ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু যখন ছোটবেলার প্রিয় বন্ধুটির কাছ থেকে শুনতে হয় মাথায় কাপড় না দেয়ায় তাকে রাস্তায় লাঞ্চিত করা হয়। যে কিনা কেবল প্রাপ্তবয়স্কই না, পেশায় শিক্ষকও। তখন অক্ষম ক্ষোভ কোথায় প্রকাশ করব বুঝে উঠতে পারি না।

কিছু করতে পারি না বলেই লিখার চেষ্টা করি, যদিও আমার আর গল্পের টিয়াপাখিটার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নাই। হাসি

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

আপনি তো চমৎকার লেখেন। কেমন একটা বিষণ্ন সময়। এখন কোনো আনন্দ করতেও ভাল লাগে না। এখন কোনো আনন্দের লেখাও কলমে আসে না। মনের ভেতরে ঢুকে যেয়ে শব্দরাজি আর্তনাদই বাড়িয়ে দিল। তবু সব মিলিয়ে ভাল থাকুন।

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

রংতুলি এর ছবি

জেনে আপ্লূত হলাম! হাসি

সময়টা অদ্ভুদ, যেন উল্টোদিকে হাঁটা শুরু করেছে। সব দেখে কেমন দমবন্ধ হয়ে আসে। আফসোস, গল্পে যেমন ইচ্ছে মাফিক কলম চালানো যায়, বস্তবটাও যদি তেমন হতো!

অতিথি লেখক এর ছবি

বেশ লেখা-স্বপ্ন স্বপ্ন বিষয় আছে একটা, খাঁচাভাঙার মতোই স্বপ্নময় বিষয়

রংতুলি এর ছবি

মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ আতিথি লেখক। হাসি

ধুসর জলছবি এর ছবি

তোমার অসামন্জস্য লাগার অনুভূতিটা ধরতে পারছি। মন খারাপ
লেখা ভাল লাগলো হাসি :-)

রংতুলি এর ছবি

সে অনুভূতি ধরতে পেরেছো জেনে নিশ্চিত হলাম, যাক! আমি একা না।
মন্তব্য পেয়ে খুশি হলাম! হাসি

মরুদ্যান এর ছবি

চলুক

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে

রংতুলি এর ছবি

ধন্যবাদ মরুদ্যান। হাসি

এক লহমা এর ছবি

সুন্দর গল্পটা পড়া হয়নি যখন প্রকাশিত হয়েছিল।
সত্যি, দিনগুলো কেমন উল্টবাগে হাঁটা শুরু করেছে!

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

রংতুলি এর ছবি

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ এক লহমা। সারাজীবন মেয়েদের প্রতি অবজ্ঞা দেখে দেখে বড় হলাম, আজকাল হিজাবের ঢল দেখে আরো দমবন্ধ লাগে। অন্তত শিশুগুলোকে এসবের বাইরে রাখা প্রয়োজন। মন খারাপ

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।