তিন দার্শনিক কবি: লুক্রেতিউস, ১

শিক্ষানবিস এর ছবি
লিখেছেন শিক্ষানবিস (তারিখ: বুধ, ১৬/০৫/২০১৮ - ৭:০১অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

লুক্রেতিউসের ‘দে রেরুম নাতুরা’ (‘বিশ্বপ্রকৃতি’) লেখার কারণ আমরা যত ভালো জানি, ততটা পরিষ্কার ভাবে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কবিতার পূর্বসূত্র জানি বলে মনে হয় না। অবশ্য ‘বিশ্বপ্রকৃতি’র কারণ ব্যক্তি লুক্রেতিউস না; যদি হতেন, আমাদের খবরই ছিল, কেননা ব্যক্তি লুক্রেতিউস সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। সন্ত জেরোম (৩৪৭–৪২০) রোমান ইতিহাসবিদ সুয়েতোনিউসের (৬৯–১২২) উপর নির্ভর করে একটা ইতিহাসপঞ্জি লিখেছিলেন যাতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বছরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দেয়া আছে। ৯৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পাতায় তিনি লিখেছেন: “তিতুস লুক্রেতিউস, কবি, জন্ম নেন। তিনি একটা প্রেমোদক খেয়ে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন, মস্তিষ্কবিকৃতির অবসরে কয়েকটা বই লিখেছিলেন যা পরবর্তীতে সিসেরো সংশোধন করেন, এবং পরিশেষে চুয়াল্লিশ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেছিলেন।”

এই প্রেমোদকের কথাটা সত্যি বলে মানতে কষ্ট হয়; এবং উন্মাদনা ও আত্মহত্যার যে-কাহিনী তার উপর চাপানো হয়েছে সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ, কারণ একজন ধার্মিক খ্রিস্টানের মুখে একজন নাস্তিক এপিকুরিয়ানের এই বেহাল দশার বর্ণনা, সত্য হওয়ার পক্ষে বড্ড বেশি নিখুঁত। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, লুক্রেতিউসের নিজের কবিতাই এ-গালগল্পের গায়ে রঙ চড়াতে পারে, কারণ তার কবিতায় আছে প্রেমের প্রতি এক অদ্ভুত বিদ্বেষ, এবং এক ধরনের সর্বব্যাপী বিষণ্ণতা। এমন একটা কবিতা যিনি লিখেছেন, তিনি যে আসলেই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রেমরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন, এবং প্রেমাবেগের তীব্রতা যে তাকে উন্মাদ করে এক সময় আত্মহত্যার কাছাকাছিও নিয়ে যেতে পারে, সেটা একেবারেই অসম্ভব না। কিন্তু সন্ত জেরোম যেহেতু নির্ভরযোগ্য সূত্র নন, সেহেতু তিনি এখানে সত্য ঘটনা বলছেন, না-কি খ্রিস্টান-কপোলকল্পিত একটা মিথ আওড়াচ্ছেন, সে-নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

ব্যক্তি লুক্রেতিউস সম্পর্কে কিছু জানি না বলে আক্ষেপের কিছু নাই, কারণ তার কবিতা তার ব্যক্তিসত্তার সেই অংশটা ঠিকই টিকিয়ে রেখেছে, যে-অংশটাই হয়ত তিনি নিজে টিকিয়ে রাখতে চাইতেন। দৃঢ়-প্রত্যয়ীরা গণসত্যের জয়গান গায়, এবং নিজেকে উপেক্ষা করে। এই স্তরে পৌঁছাতে হলে লাগে বোধ নামক ব্যতিক্রমী মেধাটি, যা সবার থাকে না; কারণ বোধ হচ্ছে যে-কোনো জিনিসকে তার আসল রূপে দেখতে পারার ক্ষমতা। বোধে একবার পৌঁছে যাওয়ার পর ব্যক্তিসত্তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়, অনেকটা দালানের ভারামাচা’র মতো। দালান দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর আমরা আর চাই না, ভারামাচা দিয়ে তার সৌন্দর্য নষ্ট হোক, আমরা শুধু স্থপতির চূড়ান্ত কাজটাই দেখতে চাই; একজন শিল্পীর কাজও তেমনই, যদি তিনি আসলেই অন্যের জন্য লিখে থাকেন, এবং আত্মমগ্ন ফুলবাবু না হয়ে থাকেন। একজন প্রকৃতিবাদী শুধু তার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিশনটাই ভবিষ্যৎকে দিতে চান, যেসব ব্যাক্তিগত দৈব-দুর্বিপাক সে-ভিশনের পিছনে কাজ করেছে সেগুলো না। এই সব ব্যক্তিঘটনা যতই আকর্ষণীয় হোক, আমরা সেগুলো নিজেদের জীবনে ফলাতে পারব না; বরং নিজের জীবন দিয়ে যে-ভিশনটা কবি তৈরি করেছেন শুধু সেটাই আমাদের মনে ঢুকতে পারে, আমাদের ব্যক্তিসত্তার অংশ হতে পারে।

সুতরাং লুক্রেতিউস আর তার কবিতা যেহেতু এক এবং অভিন্ন, তিনি যেহেতু নিজের দর্শনের মধ্যেই নিজেকে বিলীন করে দিয়ে গেছেন, সেহেতু তিনি যে-বিশ্বদর্শনের কথা বলেছেন, মানুষের মনে সে-দর্শনের উৎপত্তির ইতিহাসই তার কবিতার পূর্বসূত্র। আর এই ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা কঠিন না; এর অনেকগুলো যুগই আমাদের কাছে সুপরিচিত; কিন্তু বাসি খবর হওয়ার কারণেই এতে বুদ্ধিবৃত্তিক দুঃসাহসের যে-গল্প প্রচ্ছন্ন আছে সেটা আমরা অনেক সময় খেয়াল করি না। বাস্তবতার প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা কল্পজগতের এক বিশাল অর্জন—আমার মতে যেকোনো নাটকীয় বা নৈতিক পুরাণের চেয়েও বড়ো। এই ধারণা মহৎ কবিতার জন্ম দিতে পারে, এবং একদিন হয়ত শুধু এই ধারণাই হবে কাব্যের অনুপ্রেরণা।

বলা হয়, জেনোফানিস আকাশের গোলকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, “সর্ব এক”। যুক্তির দিক দিয়ে যা স্বতঃসত্য, কল্পনার দিক দিয়ে তা-ই হতে পারে বিশাল আবিষ্কার, কারণ হয়ত আগে কেউ সেই স্বতঃসত্যের অন্তর্নিহিত উপমাটা ধরতে পারেনি। এখানে সবকিছুর ঐক্য যৌক্তিক দিক থেকে স্বতঃসিদ্ধ, বা হয়ত একটা নিষ্ফলা নীরস সত্য। কারণ এমনকি সম্ভাব্য সবচেয়ে বিসদৃশ ও সম্পর্কশূন্য বিশ্বকেও একটা সমাহার বা সমবায় হতে হবে, এবং যেকোনো সমাহারই এক অর্থে একটি একতা, একটি ঐক্য। কিন্তু তারপরও তার কল্পনাশক্তি দেখে বিস্মিত হতে হয় যিনি, দিগন্তের এপাড় থেকে ওপাড় পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে গোটা বাস্তবতাকে সেরকম একটা সমাহার হিসেবে চিন্তা করতে পেরেছেন; যিনি ভেবেছেন, মানুষ বা অন্য যেকোনো প্রাণীর অনেক অংশ থাকলেও যেহেতু তাকে একটি মাত্র সত্তা হিসেবে দেখা হয়, সেহেতু গোটা বিশ্বকেও, গোটা সর্বকেও একটি ঐক্যবদ্ধ সত্তা বলা যায়। (যা-ভেবেই হয়ত রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “আমারে ফিরায়ে লহ সেই সর্ব-মাঝে, যেথা হতে অহরহ অঙ্কুরিছে মুকুলিছে মুঞ্জরিছে প্রাণ শতেক সহস্ররূপে, গুঞ্জরিছে গান শতলক্ষ সুরে . . . ।”) কোনো সন্দেহ নেই, অতীতের তলহীন কুয়া ধরে পড়তে থাকলে আরও অনেক নিচেও এমন মানুষ পাওয়া যাবে যারা এই ঐক্য, এই সার্বিকতা পূর্ণাঙ্গতা সর্বাঙ্গীণতা উপলব্ধি করেছে। বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বাহকদের উপর মানুষ অনাদিকাল থেকেই ঐক্য আরোপ করেছে, অনেক অংশ দিয়ে গঠিত গাড়িকে ডেকেছে রথ, আট কুঠুরি নয় দরজার সত্তাকে নাম দিয়ে মানুষ। এই চিন্তাকে একটু বর্ধিত করেই একদিন মানুষ গোটা বাস্তবতার উপর ঐক্য আরোপ করেছে, তাকে চিৎকার করে ডেকে উঠেছে “বিশ্ব”। এভাবেই তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক দর্শনের মূল সমস্যা, এবং এই চিন্তার মধ্যেই তার সমাধানটাও নিহিত আছে। কারণ সবকিছু আসলেই এক সর্বজনীন সূত্রে গাঁথা, এটা বোঝার পরই মানুষ সেই সুতাটা খুঁজতে শুরু করতে পেরেছে।

“সর্ব এক” বলে কেঁদে উঠতে পারা, বাস্তবতার সবকিছু মিলে একটা একক দৃশ্য তৈরি করেছে বুঝতে পারা, প্রাকৃতিক দর্শনের পথে যাত্রার প্রথম ধাপ। কিন্তু আর কয়েকটা পদক্ষেপ নিলেই বোঝা যায়, সবকিছুর ঐক্যের আরও গভীর ও রহস্যময় একটা অর্থ আছে। যেমন, যে-রহস্যটা প্রথমেই একজন কবিকে বিমোহিত করে তা হলো, প্রকৃতির সবকিছু মারা যায়, বিলুপ্ত হয়, কিন্তু তাদের মৃত্যুর পরও শূন্যতার জয় হয় না, কারণ তাদের জায়গায় নতুন জিনিসের জন্ম হয়। সবদিকেই মৃত্যুর করাল থাবা, কিন্তু প্রকৃতি তারপরও সদা নবীন, সবসময় পরিপূর্ণ। এবং মৃতদের জায়গায় যেসব নতুন জিনিস জন্ম নেয় তারা দেখতে অনেকটা মৃতদের মতোই হয়—সদ্যমৃতের সাথে নবজাতকের মিল থাকে। সর্বজনীন অস্থিতিশীলতার সাথে সর্বব্যাপী একঘেয়েমির কোনো বিরোধ নেই এখানে; যে-কারণে এক দিকে হেরাক্লিতোস বিলাপ করে বলতে পারেন, সবকিছু নিরন্তর পরিবর্তনশীল, এবং আরেক দিকে হিব্রু বাইবেলের লেখকরা এই সত্য পুরোপুরি মেনে নিয়েও বলতে পারেন, সূর্যের তলে নতুন কিছু নেই।

পরিবৃত্তি ও পুনরাবৃত্তি’র এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা একইসাথে আবেগপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিক, এবং এই অভিজ্ঞতা থেকেই অল্প কিছুদিনের মধ্যে এমন একটি ধারণার জন্ম হয়েছিল, যাকে মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। এই ধারণাটিই লুক্রেতিউসের প্রধান অনুপ্রেরণা। ধারণাটি হচ্ছে, আমরা নিজেরা এবং আমাদের আশপাশের সবকিছু একটি চিরন্তন সারবস্তুর সাময়িক রূপভেদ মাত্র। এই সারবস্তুদের পরিমাণ ও মূল বৈশিষ্ট্য সবসময় একই থাকলেও, তারা সবসময় পুনর্বণ্টিত পুনর্মিশ্রিত হতে থাকে, আর এই পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে তৈরি জিনিসগুলোই আমাদের ইন্দ্রিয়বোধ্য জগৎ তৈরি করে, যেসব জিনিস সবসময় যাওয়া আসার মধ্যে থাকে। সবকিছু ধুলা, এবং ধুলাতেই সবাই ফিরে যাবে; কিন্তু ধুলাটা নিজে থেকে যাবে চির-উর্বর, প্রতিনিয়ত জন্ম দিয়ে যাবে অনিন্দ্য সুন্দর মূর্তি আর রূপ। সারবস্তুর এই ধারণা বিশ্বের ঐক্যের বোধকে এক নতুন মাত্রা দেয়; এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, সবকিছু সব সময় একে অপরের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে, এবং সবার একটি অভিন্ন ভিত্তি আছে, যা থেকেই ধারাবাহিকভাবে সবকিছুর সৃষ্টিস্থিতি ঘটে, এবং মৃত্যুর পর যার মধ্যেই আবার সবাই বিলীন হয়।

এই অপ্রতিরোধ্য পরিবর্তন, সময়ের এই জয়ঢাক, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই গীতিকাব্য, করুণকাব্য, আর ধর্মীয় ধ্যানের সবচেয়ে আদরের বিষয়বস্তু ছিল। সর্বজনীন পরিবৃত্তি আর জীবনের অসারতা বোঝার মাধ্যমেই সব একনিষ্ঠ অনুধ্যান শুরু হয়। সব সুন্দর, মার্জিত, কোমল দর্শনের পূর্বশর্তও এটাই। এই বোধ না আসা পর্যন্ত সবকিছু থেকে যায় বর্বর, তা সে নীতিদর্শনই হোক আর গীতিকাব্যই হোক। কারণ তার আগ পর্যন্ত মানুষ কোনোকিছুর মায়া ত্যাগ করা শিখতে পারে না, ভিতরের নাবালক জন্তুটার স্বজ্ঞাজাত আত্মমগ্নতা ও আশাবাদিতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। এবং তার নিজের সত্তা ও বিশ্বাসের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে কল্পনার পাখা মেলতে পারে না।

সুতরাং সারবস্তু আবিষ্কার করতে পারা যুক্তিজীবনের এক বিশাল অর্জন, তা সেই সারবস্তুর ধারণা যতই নেতিবাচক হোক না কেন, যতই তাকে শুধুমাত্র ক্ষণচারী জিনিসপত্রের অস্থিতিশীলতা ও অসারতা ব্যাখ্যার কাজে লাগানো হোক না কেন। ভারতীয় দর্শন ও কাব্যে ঠিক এভাবেই সারবস্তুকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, গ্রিক পদার্থবিজ্ঞান এবং লুক্রেতিউসের কাব্য আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। লুক্রেতিউস ও গ্রিকরা সর্বজনীন পরিবৃত্তি আর জীবনের অসারতা দেখার পরেও, প্রকৃতির আপাত বাহ্যরূপের পিছনে একটা মহামহিম বুদ্ধিগ্রাহ্য প্রক্রিয়া বা বিবর্তন আবিষ্কার করেছে। সুতরাং ভ্রম বা মায়ার চাদর জড়িয়েও প্রকৃতি হয়ে উঠেছে চিত্তাকর্ষক। পদার্থবিজ্ঞান জমকালো রহস্যের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছে বৈজ্ঞানিক।

যে কবি বা দার্শনিক বাস্তবতার ভিত্তি বা সবকিছুর সুখদুখমাখা নিয়ত পরিবর্তনের কারণ আবিষ্কারের পথে নামেন তার জন্য এই বিষয়বস্তু অনেক বেশি সমৃদ্ধ। এই বোধ ইউরোপীয়দের জন্য যা করেছে, কোনো ভারতীয় মরমি, বা কোনো দেশের কোনো বুদ্ধিবিমুখ মানুষের জন্য তা করতে পারেনি; আর তা হলো, এই পরিবর্তন-লীলার উপর প্রভাব বিস্তার, তার পরবর্তী চালের ভবিষ্যদ্বাণী, এবং প্রায়োগিক প্রকৌশলের মাধ্যমে তার উপর উপর্যুপরি আরো পরিবর্তন আরোপ। বাহ্যরূপের গোপন ঝর্ণামুখ যে আবিষ্কার করে তার সামনে খুলে যায় আরেকটা ইতিবাচক বিশ্ব: প্রকৃতির ব্যস্ত কর্মশালা, যার অদ্ভুত কর্মকৌশল আমাদের জীবন রক্ষা করছে, সার্বক্ষণিক অভিযোজনের মাধ্যমে সবাইকে লালন করছে। এই কর্মকৌশলের অবিরাম অগ্রযাত্রা একদিকে যেমন প্রাণ সৃষ্টি ও লালন করে, তেমনি আবার মাঝে মাঝে জীবনধারণ অসম্ভব করে তোলে, অনেক প্রজাতিকে নির্বংশ করে। মায়া ও মায়ামুক্তির কবিরা মানুষের জীবনকে আশ্রয় করে অনাদিকাল থেকে যেসব শোকগাথা রচনা করে এসেছেন সেগুলোর যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাকৃতিক সারবস্তুকে বোধগম্য করে তোলা এই সত্যের মাধ্যমে। এই সত্যের মধ্যে একটা বিষণ্ণতা আছে, কিন্তু সত্য বলেই তা যুক্তিমনকে তুষ্ট বা উচ্চকিত করতে পারে, যে-মন সত্যের জন্যই সত্যকে ছুঁতে চায়, তা সেটা দুঃখ বা সান্ত্বনা যাই দিক না কেন, এবং অসাধ্যের বদলে সাধ্য সুখের পিছনে ছুটতে চায়।

প্রাচীন গ্রিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছিল: বিশ্ব এক, তা একটি সারবস্তু দিয়ে গঠিত, যে-সারবস্তু প্রাকৃতিক, সব স্থানে ছড়ানো, সদা গতিশীল। এরই নাম পদার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পদার্থের আসল প্রকৃতি কী, এবং তা থেকে কীভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাহ্যরূপগুলো গঠিত হয়? এখানে আমরা শুধু লুক্রেতিউসের দেয়া উত্তরটিই আলোচনা করব; যে-উত্তরটি তিনি তার সর্বগুরু এপিকুরোসের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন, যিনি আবার তা নিয়েছিলেন ডেমোক্রিটাসের কাছ থেকে। ডেমোক্রিটাস এক-সারবস্তু দিয়ে গোটা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যার তত্ত্বগুলোকে আরো অনেক উন্নত করেছিলেন। তার আগে কেউ কেউ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যেকোনো একটা বস্তুকে সবকিছুর সারবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করত, কেউ নিতো পানি, কেউ বাতাস, কেউ আগুন, আর কেউ মাটি। আনাক্সাগোরাসের মতো কেউ কেউ চারটাকেই একসাথে সারবস্তু ডাকত। ডেমোক্রিটাস ভাবলেন, সর্বজনীন সারবস্তুর মধ্যে এমন কোনো বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে না, যা দৃশ্যমান বাহ্যবস্তুর কোনোটাতে আছে কোনোটাতে নেই; সারবস্তু দিয়েই যেহেতু সব বাহ্যবস্তু গঠিত, সেহেতু সব বাহ্যবস্তুর মধ্যেই সারবস্তুর মৌলিক গুণাবলি থাকতে হবে। সুতরাং সারবস্তু কেবলই পদার্থ, নির্দিষ্ট কোনো পদার্থ নয়। আর তার কাছে পদার্থের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যাপ্তি, মূর্ততা, কাঠিন্য; মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে, সবচেয়ে কম ঘনত্বের ইথারের মধ্যে এমন সব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা পাওয়া যাবে যাদের শুধু এই বৈশিষ্ট্যগুলোই আছে। বস্তুর অন্য সব গুণ কেবলই আমাদের মনের আরোপিত বাহ্যরূপ। মন জন্মসূত্রেই বিশাল মিথস্রষ্টা মিথবিদ, তার কাজই নিজের অনুভূতিকে প্রকৃতির উপর আরোপ করা। আলো, রং, স্বাদ, উষ্ণতা, সৌন্দর্য, উৎকর্ষ, সবকিছুই আরোপিত প্রথা; একমাত্র স্থান আর পদার্থই বাস্তব। পদার্থ যতটা বাস্তব, শূন্যস্থানও ততটাই বাস্তব। সুতরাং পদার্থের পরমাণু কখনো রূপ পরিবর্তন না করলেও, প্রকৃতিতে সত্যিকারের রূপান্তর ঘটতে পারে, কারণ বাস্তব শূন্যস্থানের মধ্যে পরমাণুর অবস্থান বিন্যাস বণ্টন পাল্টাতে পারে।

ডেমোক্রিটাসের সারবস্তু পরিবর্তনশীল বাহ্যবস্তুর একটা পরিমাপযোগ্য ভিত্তি উপহার দিতে পেরেছিল, ভারতীয়দের অকেজো সারবস্তু যা পারেনি; কারণ ডেমোক্রিটাসেরটা শূন্যের মধ্যে অসমভাবে বিন্যস্ত এবং সদাগতিশীল। প্রত্যেক বাহ্যবস্তু, তা যত ক্ষণিকেরই হোক না কেন, এই সারবস্তুর কোনো না কোনো নিখুঁত বিন্যাসের ফলাফল; এই বিন্যাসের সাথেই তার জন্ম, এই বিন্যাসের সাথেই তার মরণ। সুতরাং এই সারবস্তু পুরোপুরি ভৌত, আধিভৌত নয়। এটা কোনো দ্বান্দ্বিক শব্দ নয় বরং একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান, একটা ভবিষ্যদ্বাণী, কারণ একজন পর্যবেক্ষক বস্তুর গহীনে উঁকি দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করলে ঠিক কী দেখতে পাবে, তাই সে আগেভাগে জানিয়ে দেয়। বস্তুবাদ কোনো আধিবিদ্যক সিস্টেম নয়, বরং রসায়ন ও শারীরবৃত্তের একটি হাইপোথিসিস; সে বলতে চায়, সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে জানা যাবে যে, সব পদার্থ সমসত্ত্ব, এবং সমবেগে চলমান।

পদার্থ যদিও সমসত্ত্ব, যেসব পরম কণা বা পরমাণু দিয়ে তারা গঠিত সেগুলো বহুবৈচিত্র্যময়, এবং তাদের হরেক রকমের বিন্যাসের মাধ্যমেই বিশ্বের হরেক রকমের বস্তু গঠিত হয়। আমজনতা (এবং এরিস্টটল) গতিকে যেমন অপ্রাকৃতিক মনে করে, গতি সে-রকম না। গতির জন্য কোনো আধিভৌতিক কারণের দরকার নেই, বরং গতিই বিশ্বের সবচেয়ে প্রাকৃতিক অনাদি-অনন্ত নিয়তি, পরমাণুর অন্তর্নিহিত স্বভাব। গতিশীল পরমাণুর ধাক্কাধাক্কিতে তৈরি ঘূর্ণাবর্ত থেকেই নক্ষত্রজগৎ গঠিত হয়েছে, যাদেরকে আমরা বিশ্ব ডাকি। স্থান সীমাহীন, এবং তার মধ্যে বিশ্বের সংখ্যাও অসীম।

ডেমোক্রিটাসের দর্শন গতি ব্যাখ্যা করে যান্ত্রিকতাবাদ দিয়ে, গঠন ব্যাখ্যা করে পরমাণুবাদ দিয়ে, আর গাঠনিক সারবস্তু ব্যাখ্যা করে বস্তুবাদ দিয়ে। এই দর্শন অন্তর্দৃষ্টি, পদ্ধতির সুষ্ঠুতা, ও বোধগম্যতার দিক দিয়ে যত বিস্ময়কর, সরলতার দিক দিয়ে ততই দুঃসাহসিক। একমাত্র সবচেয়ে নিশ্চিতমনা যুক্তিবাদী, সবচেয়ে দৃঢ়চেতা নবীই, এটা পুরোপুরি গ্রহণের স্পর্ধা দেখাতে পারে। কিন্তু সময়ে এই দর্শনই প্রমাণিত হয়েছে। আজকের বিজ্ঞানের চিত্র দেখলে ডেমোক্রিটাস তার সেই বিখ্যাত শ্লেষাত্মক দ্ব্যর্থক হাসিটা হাসতেন, এক দিকে আমাদের বিজ্ঞান তার দর্শন প্রকল্পের একাংশ প্রমাণ করতে পেরেছে দেখে বিজয়ের হাসি হাসতেন, আরেক দিকে বাস্তবতার বাকিটুকু বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের বোকামো দেখে বিদ্রুপের হাসি হাসতেন।

লুক্রেতিউসের কবিতায় এমন দুটো প্রবচন আছে যা দিয়ে আজকের যুগেও একজন প্রকৃতিবাদীকে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। একটি হচ্ছে:

“আমাদের ব্যবহারে লাগবে বলে দেহের কিছু জন্মে না;
বরঞ্চ জন্মই সাথে করে নিয়ে আসে তার ব্যবহার।” [৪. ৮৩৪–৫]

এই কথা এরিস্টটলের পরম-কারণকে নাকচ করে দেয়, যা করতে পারাটা বৈজ্ঞানিক প্রগতির পূর্বশর্ত। অন্য প্রবচনটি হচ্ছে:

“এক জিনিসে স্পষ্ট হবে আরেক জিনিস, অন্ধ রাত্রি
তোমার চোখ বন্ধ করার আগে দেখবে বিশ্বের পরম
প্রকৃতি: এমনই আলো জ্বালবে একের উপর আরেকে।” [১. ১১১৫–৭]

অর্থাৎ প্রকৃতি নিজেই নিজের মানদণ্ড, তাকে দিয়েই তাকে মাপতে হবে, বুঝতে হবে; অথচ সেই প্রকৃতিকেই যদি আমাদের অপ্রাকৃতিক লাগে, তাহলে আর কোনো আশা নেই।

ডেমোক্রিটাসের নীতিদর্শন, যৎসামান্য নিদর্শনের উপর ভিত্তি করে যতটুকু বোঝা যায়, তাতে কেবলই বর্ণনামূলক ও ব্যঙ্গাত্মক মনে হয়। তাঁকে বলা যায় অভিজাত পর্যবেক্ষক, যিনি ঘৃণাভরে মানুষের বোকামো দেখেন। প্রকৃতি যেন আমাদের সবাইকে দেখে হাসছে; প্রাজ্ঞ ব্যক্তি বা ঋষি নিজের ভাগ্য বুঝতে পারেন বলে এই বোকাস্রোতের কিছুটা উপরে উঠে আসতে পারেন। সব জীব যার যার দৃষ্টিতে সর্বোত্তম সুখের পিছনেই ছোটে; কিন্তু তারা ভয়ংকর রকমের অদূরদর্শী; দার্শনিক তার দূরদৃষ্টি দিয়ে সর্বোত্তম সুখটা আসলেই দেখতে পান, এবং তার কাজ শুধু সেটার পিছনেই ছোটা। এই বন্ধুর বিশ্বে সর্বোত্তম সুখ নিহিত আছে শুধুমাত্র সংযম আর মায়াত্যাগের মধ্যে। বেশি কিছু আশা না করলে হতাশার সম্ভাবনাও কম। বোকা-বনে না যাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু খুব কঠিন।

ডেমোক্রিটাসের এই নীতিপদ্ধতি এপিকুরোস গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টির প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল বলে না। বরং এপিকুরোস ছিলেন প্রাচীন যুগের হার্বার্ট স্পেন্সার, প্রাকৃতিক দর্শনে যার সব জ্ঞানই অন্যের হাত ঘুরে আসা; তার জ্ঞান বিশ্বকোষের জ্ঞান। একইসাথে একঘেয়ে-আনুপুঙ্খিক অস্পষ্ট-অসংগত ভাবে তিনি বিজ্ঞানের তথ্য জড়ো করেছেন, এবং করতে গিয়ে তার চোখ প্রকৃতির দিকে ছিল না, বরং ছিল এমন এক অন্তর্বিশ্বাসের দিকে যা তিনি গ্রহণ করেছিলেন নৈতিকতার স্বার্থে, যাকে তিনি মোক্ষের জন্য অপরিহার্য মনে করতেন, এবং যেকোনো মূল্যে যেকোনো অস্ত্র দিয়ে হলেও রক্ষা করতেন। এই ব্যাপারটা খুব শিক্ষণীয় যে, যেসব নৈতিক কারণে সাধারণত বস্তুবাদকে বাতিল করা হয়, সেই একই নৈতিক কারণে এখানে বস্তুবাদকে সজোরে আঁকড়ে ধরা হচ্ছে।

এপিকুরোস তার প্রমোদোদ্যানে ভোগবিলাসে নিমজ্জিত থাকতেন বলে এক উদ্ভট মিথ প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে, তাই অবাক লাগলেও এটা জেনে নিতে হবে যে, তিনি আসলে ছিলেন একজন খাঁটি সন্ত, তপস্বী, ঋষি। মানুষের কর্মযজ্ঞ তাকে ব্যথিত করত। তৎকালীন এথেন্স—আমাদের অনেকের ঈর্ষার বস্তু—রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যেও তার পুরাতন শৌর্য পুরোটাই রক্ষা করেছিল, কিন্তু এপিকুরোসের তার কোনোকিছুই ভালো লাগত না। নাট্যমঞ্চ, বারান্দা, জিমনেসিয়াম, এবং বাজার, সবকিছুই তার কাছে ছিল অসার গাধামির আসর। নিজের নির্জন বাগানে গুটিকয়েক বন্ধু আর শিষ্য নিয়ে তিনি খুঁজতেন শান্তির পথ; চলতেন খুব সংযমের সাথে; কথা বলতেন অমায়িকভাবে; হিতোপদেশ দিতেন সম্পদ সমৃদ্ধি উচ্চাভিলাস আর অতি-আবেগের বিরুদ্ধে। স্বাধীনেচ্ছাকে গভীরভাবে সমর্থন করতেন, কারণ কেবল এই ইচ্ছার বলেই তিনি জনস্রোতে গা না ভাসিয়ে, নিজের জন্য একটা আলাদা জগৎ বানিয়ে নিতে পারেন। তিনি অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করতেন না, কারণ তা মনকে অশান্ত করে তুলতে পারে, এবং অনেক অবান্তর জিনিসকে সবচেয়ে আবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। কোনো পরজীবন নেই, তাই এসব গালগল্প দিয়ে প্রাজ্ঞ-জীবন যাপনের শিল্পকে কুৎসিত বিকৃত করা যাবে না।

সবকিছু প্রকৃতির বিধান অনুসারে চলে; দেবদেবীরা বহুদূরে খাঁটি এপিকুরিয়ান-দের মতো চিরশান্তিতে থাকেন, মর্ত্যের তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে কখনো মাথা ঘামান না। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাদের যে-অবস্থাকে বলেছেন “পরমানন্দময় নির্লিপ্ততা” তা কোনো অপ্সরাও ভাঙতে পারে না। তারপরও তাঁদের মন্দিরে যাওয়াটা আনন্দের। এখানে দেবদেবী যেন স্বর্গ আর মর্ত্যের মাঝামাঝি অবস্থান করেন, নীরবে, অপার সৌন্দর্যে, মানুষের রূপ ধারণ করে। তাদের মূর্তি অসুখী, ভুলো মানুষকে সুখের কথা মনে করিয়ে দেয়, সমাজের হুড়দঙ্গল থেকে এক মুহূর্তের জন্য ছুটি নিয়ে তারা তাদের আত্মাপাত্রে একটু সুধা ঢালে, তারপর আবার ফিরে যায় সমাজঙ্গলে। এই সব পুণ্য তরুবীথি আর আত্মার অভয়ারণ্যে ঘুরে দার্শনিকও শক্তি সঞ্চয় করেন, তারপর নিজের বাগানে ফিরে যান নতুন প্রজ্ঞায়, নিজের নিঃসঙ্গতায় আরো সুখ খুঁজে পান, এবং বাকি বিশ্বের দিকে আরো বন্ধুত্বপূর্ণ, আরো নির্লিপ্ত চোখে তাকান। তাই সন্ত জেরোমও সাক্ষ্য দেন, এপিকুরোসের জীবন ছিল “ভেষজপাতা, ফলমূল, আর সংযমে পরিপূর্ণ।” তার জীবন জুড়ে যেন ছিল এক মৃত্যুশোকের নিস্তব্ধতা। তার দর্শন অধঃযাত্রার দর্শন, নাকচ করার দর্শন, ভবলোক থেকে পলায়নের দর্শন।

এরকম সন্ন্যাসমনা একজন মানুষ কখনোই নিছক বিজ্ঞানের খাতিরে বিজ্ঞানে আগ্রহী হতে পারেন না, বিজ্ঞান তিনি ব্যবহার করতে পারেন কেবল নিজের বিশ্বাসের প্রয়োজনে, বা বিপক্ষের যুক্তি খণ্ডনে। এপিকুরোস তাই সক্রেটিসের গণ্ডি অতিক্রম করে এমন একটা প্রকৃতিদর্শন খোঁজেন যা তার নীতিদর্শনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। তখন প্রকৃতিদর্শনের সংখ্যা ছিল অগণ্য, কিন্তু তার কাছে ডেমোক্রিটাসেরটা সবচেয়ে যুৎসই ও ন্যায়ানুগ মনে হয়েছিল। এই দর্শনই সবচেয়ে ভালোভাবে মানুষকে উন্মাদনা থেকে বাঁচায়, যা উপভোগ সম্ভব তা উপভোগের যোগ্য করে তোলে। এই প্রায়োগিক দিকের কথা মাথায় ছিল বলেই তিনি ডেমোক্রিটাসের পুরো দর্শনটা গ্রহণ করেননি। এমনকি, তাতে একটা বড়ো পরিবর্তনও আনতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরমাণুর গতি পুরোপুরি নিয়মিত ও যান্ত্রিক হলে সমস্যা ছিল। কাকতালকে সুযোগ দিতে হবে, যাতে ভাগ্য দূর করা যায়। ভাগ্য একটা ভয়ংকর ধারণা। মানুষ কুসংস্কারের বশে ভাগ্যকে অভ্যঞ্জন করত। সে-তুলনায় কাকতাল অনেক বিনয়ী, রাস্তার আট দশটা মানুষের মনের বেশি কাছাকাছি। পরমাণুগুলোকে যদি তাদের সরল গতিপথ থেকে মাঝেমধ্যে এদিকে ওদিকে কাকতালীয়ভাবে একটু বিচ্যুত হতে দেয়া হয়, তাহলেই ভবিষ্যৎ হয়ে যাবে অনিশ্চিত, আর স্বাধীনেচ্ছা ফিরে পাবে তার স্বীয়শক্তি। সুতরাং এপিকুরোস ঘোষণা করলেন, পরমাণু সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়; আর এই চ্যুতি যে প্রকৃতির গঠন ও বিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রাখে তা প্রমাণ করার জন্য যুক্তির জোয়ার বওয়ানো হলো। বলা হলো, আগের তত্ত্বানুসারে পরমাণু যেখানে শুধু সমান্তরালে সরলরেখা বরাবর নিচের দিকে প্রবাহিত হতো, সেখানে এখন বিচ্যুতির কারণে সরল-প্রপাতের জায়গায় জায়গায় ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হতে পারে, এবং এসব ঘূর্ণী থেকেই তৈরি হয় সব বস্তু। যুক্তিতর্কে না ঢুকে আমরা বরং সামনে আগাই।

অন্য যেকোনো প্রকৃতিদর্শনের মতোই বস্তুবাদ কোনো আদেশ বা উপদেশ দিতে পারে না। তার কাজ শুধুমাত্র বিশ্বকে বর্ণনা করা, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা আর বিবেকও বস্তুর উপর ভিত্তি করে বর্ণনা করা। বস্তুবাদীও যেহেতু মানুষ, সেহেতু তারও নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকবেই, এমনকি বিবেকও থাকবে; কিন্তু তার অনুশাসন বা বিধিবিধান তার বিজ্ঞানের যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে আসবে না, বরং আসবে উত্তরাধিকার ও অভিজ্ঞতা দিয়ে গঠিত মানুষিক স্বজ্ঞা থেকে। এ-কারণে যেকোনো নীতিব্যবস্থাই বস্তুবাদের সাথে সহাবস্থান করতে পারে; কারণ বস্তুবাদ কোনো একটা জিনিসকে (যেমন অমরত্ব) অসম্ভব ঘোষণা করলেও, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণা করতে পারে না। কিন্তু বস্তুবাদ পুরোপুরি গ্রহণ করার মতো মানসিকতা যার আছে, সে যা-অসম্ভব তার পিছনে ছুটতে চাইবে বলে মনে হয় না। সুতরাং বস্তুবাদের সাথে এক ধরনের সাদাসিধা নৈতিকতার যুক্তিগত যোগ না থাকলেও, মনস্তাত্ত্বিক যোগ আছে।

বস্তুবাদী প্রধানত একজন পর্যবেক্ষক, এমনকি হয়ত নৈতিকতার জগতেও; অর্থাৎ বিশ্বের নিরন্তর পথচলা তার মধ্যে যেসব আবেগ তৈরি করে সেগুলো ছাড়া তার আর কোনো নৈতিকতা নেই। তিনি যদি সত্যিকার অর্থেই সবলচিত্ত আর নির্বিকার হয়ে থাকেন, তবে জীবনকে ভালোবাসবেন; অনেকটা যেমন আমরা সবাই প্রাণশক্তি ভালোবাসি; নিখুঁত প্রাণশক্তির খোঁজ না পেলেও, অন্তত শিশুমারের পাখায় বা শঙ্খচিলের ডানায় প্রাণের ছটা দেখে অভিভূত হই। সুতরাং বলিষ্ঠ বস্তুবাদের সাথে যে-মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতিটার সামঞ্জস্য থাকতে পারে তা আমার মতে এই: সবকিছুর চলার ছন্দের প্রতি সহানুভূতি, উত্তাল ঢেউয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ, ঢেউ আবার মিলিয়ে যাওয়ার আগে ক্ষণিকের জন্য তার শাদা ফেনা দেখে আনন্দ। প্রকৃতি ভালো থেকে মন্দকে আলাদা করে না, কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমী করে। সে তাকেই ভালো বলে যা তার নিজের জীবনের অনুরূপ, যা তার প্রাণশক্তি বাড়ায়, এবং যার নিজেরও সম্ভবত এক ধরনের প্রাণশক্তি আছে। আধুনিক দর্শনের সবচেয়ে বড়ো প্রকৃতিবাদী স্পিনোজার নৈতিক অনুভূতিও এমনই ছিল; এবং আমরা দেখব, সন্ন্যাসী এপিকুরোসের প্রতি সৎ থেকেও, লুক্রেতিউস তার কাব্যিক পরমানন্দের টানে এদিকেই গিয়েছিলেন।

কিন্তু এই মহামিলনের পথে বড়ো সমস্যাটা মনে রাখতে হবে: বস্তুবাদী শুধু নিজের জীবন ভালোবাসলেই প্রকৃতির জীবনকে ভালোবাসতে পারে; কিন্তু নিজের জীবন ঘৃণা করলে প্রকৃতির জীবন তাকে তুষ্ট করবে কীভাবে? এপিকুরোস মোটের উপর জীবন ঘৃণা করতেন। তার নীতিদর্শন—যাকে সুখবাদ বলা হয়—শুধু এমন কিছু ছোটো ছোটো আনন্দের অনুমতি দেয় যাতে কোনো উত্তেজনা নেই, ঝুঁকি নেই। এই আদর্শ নিঃসন্দেহে পরিমিত, এমনকি নির্মল নিষ্পাপ, কিন্তু কোনোভাবেই প্রাণবন্ত না। এপিকুরোস যুদ্ধ কোরবানি আর দুঃখদুর্দশার প্রতি তীব্র ঘৃণা, এবং দয়া মায়া সৌহার্দ্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। কিন্তু একজন সত্যিকারের প্রকৃতিবাদী এই ধরনের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেবে না। স্পিনোজা বলেন, করুণা আর অনুশোচনা পুরোপুরি অনর্থক, এমনকি অশুভ; যা একজন মানুষের শক্তি ও আনন্দ বাড়ায় তাই তার ভালোত্বও বাড়ায়। প্রকৃতিবাদী এক ধরনের শক্তিমত্তায় আস্থা রাখবে, যেমন রেখেছিলেন ফ্রিডরিশ নীচে; তার মধ্যে এক রকম শ্লেষ বা কটাক্ষের প্রবণতা থাকবে, যেমন ছিল ডেমোক্রিটাসের হাসিতে। কিছু একটা অর্জনের জন্য তাকে যা-কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব সে রাখবে না; সে হবে নিজের অর্জনের আনন্দে বিমোহিত এক সাম্রাজ্যবাদী। এক কথায়, একটি যৌবনবতী যুগে বা কোনো আগ্রাসীর মনে বস্তুবাদী নীতিদর্শনের মূলরঙ হবে আভিজাত্যপূর্ণ, কল্পনাপ্রবণ; কিন্তু অবক্ষয়ের যুগে বা কোনো মোক্ষমুখর আত্মার জন্য তা হবে, এপিকুরোসের মতোই, মনুষ্যত্ববাদী, লাজুক ইন্দ্রিয়বিলাসী।

লুক্রেতিউসের প্রকৃতিকাব্যের মূল উপাদানগুলোর পূর্বসূত্র আমরা জেনে গেছি। কিন্তু স্বয়ং লুক্রেতিউসের জিনিয়াসের কথা বাকি রয়ে গেছে। এই প্রতিভার সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব হচ্ছে, তার আলোচ্য-বস্তুর মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, তার নৈর্ব্যক্তিকতা। আমরা যেন বস্তু নিয়ে একজন কবির কবিতা পড়ছি না, বরং বস্তুর আত্মগীতি শুনছি; বিশ্ব নিজেই তার গুণ গাইছে। বস্তুর মধ্যেই যে কাব্য থাকতে পারে—তাদেরকে আমরা যে-প্রতীক দিয়ে প্রকাশ করি তার মধ্যে না, স্বয়ং বস্তুরই জীবন আর পথচলাতে—সেটা লুক্রেতিউস চিরকালের জন্য মানুষকে প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।

অবশ্যই প্রকৃতির মধ্যে যে-কাব্য দেখা যায় তার একমাত্র কারণ এই অপূর্ব দৃশ্য আমাদের মধ্যে যে-আবেগ তৈরি করে সেটা; প্রকৃতি নিজে যতই রোমান্টিক বা মহামহিম হোক না কেন, তা দেখে উদ্বেলিত হওয়ার জন্য যে-রোমান্টিকতা ও মহামহিমা লাগে সেটা আমাদের মধ্যে না থাকলে, প্রকৃতি হতো শুধুই ধুলি আর ছাই। কিন্তু আমাদের আবেগ তো অকপটও হতে পারে; প্রকৃতির অনাদি-অনন্ত-নির্মল রূপ আর কর্মও তো আবেগের মূল বিষয়বস্তু হতে পারে। এই বিশাল বাস্তবতা যেইখানে আমাদের ব্যক্তিসত্তার জন্য প্রাসঙ্গিক, যেখানে সে আমাদের আত্মবিলাসিতা’র বস্তু, স্বার্থপরের মতো শুধু সেখানেই পড়ে থাকতে হবে কেন? হবে না! প্রকৃতি আমাদের মধ্যে যে-স্বজ্ঞাশক্তি জাগায়, আমাদেরকে যে-বোধের দিকে ধাবিত করে, তার মধ্যেই পাওয়া যাবে প্রকৃতি-কাব্যের সন্ধান। খামখেয়ালি মেজাজ বা শ্বাসরুদ্ধকর স্বপ্নের চেয়ে স্বজ্ঞা আর বোধের মতো বৃত্তিগুলোই আত্মার রশি বেশি টানটান করে ধরতে পারে, তার শক্তি ও সঙ্গীত পুরোটা বের করে আনতে পারে। প্রকৃতিবাদ পর্যবেক্ষণের দর্শন, এবং কল্পনার মাধ্যমে সেই পর্যবেক্ষণকে প্রসারিত করার দর্শন; প্রকৃতির সব শব্দ ও দৃশ্য তার মধ্যে প্রবেশ করে তাকে এক ধরনের স্পষ্টতা, তীক্ষ্ণতা, আর জবরদস্তির ক্ষমতা দেয়। একইসাথে প্রকৃতিবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন; সে বাহ্যরূপের অন্তরালে সারবস্তু খোঁজে, পরিবর্তনের পিছনে ধারাবাহিকতা খোঁজে, নিয়তির পিছনে নীতি খোঁজে। ঐ সব দৃশ্য-শব্দকে সে এমন এক গুপ্ত পটভূমির সাথে যুক্ত করে, যা তাদের আচার-আচরণ ব্যাখ্যা করতে পারে। এদিক থেকে দেখলে, প্রকৃতির একইসাথে পৃষ্ঠ ও গভীরতা আছে—বল আর আবশ্যকতার পাশাপাশি আছে আবেদনময়ী বৈচিত্র্য। এই অন্তর্দৃষ্টির মহামহিমার সামনে সব তুচ্ছ হেত্বাভাসকে সস্তা ও কৃত্রিম মনে হয়। শিশুসুলভ মনে যে-পৌরাণিক কাহিনীই কাব্যের একমাত্র উৎস, তাকে এর তুলনায় মনে হয় বাজে রেটরিক। প্রকৃতিবাদী কবি রূপকথার দেশ পরিত্যাগ করেন, কারণ তিনি আবিষ্কার করেছেন প্রকৃতি, ইতিহাস, যারা মানুষের সত্যিকারের অনুরাগের বস্তু। তার কল্পনা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে; এর আনন্দ কর্তৃত্ব করাতে, খেলা করাতে নয়।

বাস্তবতার উপর কাব্যিক কর্তৃত্ব বিস্তারে সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছেন দুই জন কবি: মানুষের বাস্তবতার ক্ষেত্রে শেকস্‌পিয়ার, আর প্রকৃতির বাস্তবতার ক্ষেত্রে লুক্রেতিউস। তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রাণবন্ত, খুঁটিনাটির দিকে তার অক্লান্ত মনোযোগ, তথ্য জড়ো করা আর শ্রেণিবিন্যস্ত করার ক্ষেত্রে তিনি কোনো ছাড় দিতে রাজি নন। একমাত্র সত্যই তার বাহন। তিনি চান আমরা বিনয়ের সাথে তথ্যের স্রোতে অবগাহন করি, একের পর এক প্রমাণের জোয়ারে ভেসে যাই, বিশ্বপ্রকৃতির একক বার্তার বৃষ্টিতে গা ভেজাই।

কিন্তু ধরা যাক, লুক্রেতিউস যে-বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে কবিতা লিখেছেন, তার পুরোটাই ভুল, এবং ভুল তো আসলেই হতে পারে। খুঁটিনাটি ভুলের কথা বলছি না, ধরা যাক তার ভিত্তিটাই ভুল—ধরা যাক, কোনো শূন্যস্থান নেই, সারবস্তু নেই, এমনকি কোনো প্রকৃতিও নেই। সেক্ষেত্রে তার কবিতা আমাদের জীবন ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জন্য আর প্রাসঙ্গিক থাকবে না, কিন্তু তারপরও তার কল্পলোকের বিশালতা ম্লান হবে না। তারপরও তার বর্ণনার মতো একটা বিশ্ব কল্পনা করা সম্ভব হবে। সেরকম একটা বিশ্বের বাসিন্দারা তাদের মধ্যে প্রথম ডেমোক্রিটাস বা লুক্রেতিউসের জন্ম হলে তাদেরকে কীভাবে গ্রহণ করত, সেটা আমরা অনুভব করতে পারব। কেমন লাগবে তাদের, যখন মিথের চাদর ফেলে দার্শনিক উঠে দাঁড়াবেন, এবং তাদের অন্ধত্ব আর উন্মাদনা দূর করবেন? ভবিষ্যৎ কতটা স্পষ্ট হয়ে যাবে, অতীত কতটা বোধগম্য হয়ে যাবে, চির-উর্বর পরমাণুদের অসচেতন সমবেত নৃত্য কতটা বিস্ময়কর লাগবে! তারাভরা রাতে নক্ষত্রের মেলা দেখতে আমাদের যেমন লাগে, প্রকৃতির প্রত্যেক কোণাকাঞ্চি তাদের কাছে তেমন লাগবে; তাদের তারামণ্ডলেরও জায়গায় জায়গায় খেলা করবে জীবনের সাময়িক হাসি। এমন একটা জগৎ থাকলে, তার বাসিন্দাদের কাছে তার একটা কাব্যও থাকত, আর এই কাব্য হতো প্রকৃতিবাদের কাব্য। লুক্রেতিউস নিজেকে সে-রকম একটা জগতের অধিবাসী ভেবেছেন, সেই জগতের গান শুনতে পেয়েছেন, এবং লিখে রেখে গেছেন।

[চলবে]

This is a translation of George Santayana's Three Philosophical Poets, Lucretius.

<< ভূমিকা


মন্তব্য

সোহেল ইমাম এর ছবি

মূল রচনাটা পড়িনি কিন্তু অনুবাদটা মুগ্ধতা নিয়ে পড়লাম। চলুক

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

শিক্ষানবিস এর ছবি

ধন্যবাদ।

কর্ণজয় এর ছবি

দর্শনের ভাষায় সহজ সংহতি আনা কঠিন, লেখাটায় সেটা আছে। টেনে নিয়ে যায়। একবার পড়লাম। আরেকবার পড়লে আরেকটু স্পষ্ট হবে ।।
ভাল লাগলো

শিক্ষানবিস এর ছবি

প্লেটো পড়তে শুরু করার পর থেকেই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে দর্শনসাহিত্য, যেখানে দর্শন আর সাহিত্যের মিলন, বিশেষ করে দর্শন আর কবিতার মিলন। দর্শনের মূল জিনিসটা এমনিতেই আগাগোড়া কাব্যিক। বিশ শতকের দর্শনসাহিত্যের ভালো নিদর্শন আপাতত খুঁজে পাইতেসি জর্জ সান্টায়ানা আর পিয়ের হাদো’র (Hadot) মধ্যে।

এক লহমা এর ছবি

সান্তায়ানার মতের বা দার্শনিকতার সাথে কোথাও একমত, কোথাও নই। কিন্তু আপনার অনুবাদ পড়তে ভাল লাগছে। পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

শিক্ষানবিস এর ছবি

আমিও সান্টায়ানার সবকিছুর সাথে একমত না, তবে একপ্রাণ বলা যায়। সান্টায়ানার সাথে আমার মতের মিল হবে না অনেক জায়গাতেই, কিন্তু প্রাণের মিল হবে প্রায় সবখানে। ধন্যবাদ পড়ার জন্য। পরের পর্ব এসে গেছে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA