ঈশ্বরের ভাঁড়

শিক্ষানবিস এর ছবি
লিখেছেন শিক্ষানবিস (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৪/০৮/২০১৬ - ৮:১৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বাৎস্যায়নের 'কামসূত্র' আসলে একটা সাত অঙ্কের নাটক। নাটকের প্রধান চরিত্র 'নায়ক' এবং 'নায়িকা'। নায়কের আবার তিন সহচর: 'পীঠমর্দ' (লম্পট), 'বিট' (চ্যালা), ও 'বিদূষক' (ভাঁড়)। বাৎস্যায়ন এক্ষেত্রে বেশ গতানুগতিক; সংস্কৃত প্রায় নাটকেই এই পাঁচটি চরিত্র পাওয়া যেত। এবং আমাদের যুগের নাটক-সিনেমাতেও এদেরকে দেখা যায়। কিন্তু প্রাচীন যুগের তুলনায় আমাদের যুগে ভাঁড়দের ভাবমূর্তি অনেক খারাপ। এমনকি মধ্যযুগেও ভাঁড়ামোর ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট ছিল। যেমন, ত্রয়োদশ শতকের ইসলামজগতে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। আধুনিক কমেডিয়ানরা ঠিক মধ্যযুগীয় ভাঁড়দের সমতুল্য নন, কমেডিয়ানরা ভাঁড়দের চেয়ে অনেক বেশি sane। এককালে ভাঁড়দের insanity সমাজের অন্তর্নিহিত insanity সম্পর্কে মানুষকে সচেতন রাখত। কিন্তু আধুনিক যুগে মানসিক চিকিৎসা নামক যন্ত্র সমাজের সব রকমের বিড়ম্বনা বা insanityকে ঝেটিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে গেছে। সমাজের দৃষ্টিকটু সবকিছুকে দরজা-জানালাবিহীন কারাগারে আবদ্ধ করার পর সমাজের সবকিছুই এখন যেন কেমন sane মনে হয়। "অসুস্থ"দেরকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার পর আমরা হাত পা ছড়িয়ে নিশ্চিন্ত মনে ভাবতে পারি যে, এখন সমাজে যা-কিছু অবশিষ্ট আছে সব নিশ্চয়ই খুব "সুস্থ"।

অতিভাঁড়দের পাশাপাশি সমাজে আগে আরেক ধরনের মানুষ ছিল যারা বর্তমানে থাকলে নিশ্চিত "পাগলা গারদে" নিক্ষিপ্ত হতেন। এরা হলেন ঋষি, সাধু, সন্ন্যাসী, বা সন্ত। বর্তমানে সম্ভবত এমন অনেকেও আছেন যারা টাইম মেশিনে করে অতীতে ফিরে গিয়ে কয়েক ডজন ধর্মপ্রচারককে পাগলা গারদে পুরতে পারলে তবেই শান্তি পেতেন। ভাঁড় এবং ঋষিদের আলোচনা একসাথে করাটা অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু উদগ্র অধ্যাত্মবোধ এবং উদগ্র রসবোধের মধ্যে আসলেই একটা মিল আছে। গভীর প্রজ্ঞার একটা বড় বৈশিষ্ট্য রসবোধ, যাকে আধুনিক-আধুনিকারা 'সেন্স অফ হিউমার' বলেন (যদিও আমি নিশ্চিত, আধুনিককুলের সেন্স অফ হিউমারের সাথে ঋষিদের রসবোধের বড় পার্থক্য আছে)। এই রসবোধের কথা মাথায় রেখেই সম্ভবত ইতালির চলচ্চিত্রকারকুল শিরোমণি রোবের্তো রোসেলিনি ও ফেদেরিকো ফেলিনি আসিসি'র ফ্রান্সিসকে নিয়ে করা সিনেমাটার নাম রেখেছিলেন 'Francesco, giullare di Dio' (১৯৫০), অর্থাৎ 'ফ্রাঞ্চেস্কো, ঈশ্বরের ভাঁড়'। এর ইংরেজি নাম অবশ্য রাখা হয়েছে 'The Flowers of St. Francis'; ফ্রাঞ্চেস্কো'র (১১৮২-১২২৬) মৃত্যুর পর তার জীবনের গল্প নিয়ে যে বইটা প্রকাশিত হয়েছিল তার নাম 'Fioretti' ('The Little Flowers')। সিনেমাটা রোসেলিনি ও ফেলিনি একসাথে লিখেছেন, আর পরিচালনা করেছেন রোসেলিনি একা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির ভগ্নদশা দেখে শিল্পীরা এক নতুন ধরনের সিনেমার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারা ক্যামেরা, পোশাকসজ্জা, কারুকার্য, অভিনয়ভঙ্গি ইত্যাদি সব মুখোশ ঝেড়ে ফেলে একেবারে কাঁচা বাস্তবতার চিত্র ধারণ করা শুরু করেছিলেন। এ-থেকেই জন্ম নিয়েছিল 'ইতালীয় নব্য-বাস্তবতা' নামক চলচ্চিত্র আন্দোলনটি যা ফ্রান্সের নবতরঙ্গ থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের প্রথমতরঙ্গ পর্যন্ত সবকিছুকেই ভয়ানকভাবে প্রভাবিত করেছিল। রোসেলিনি'র 'Roma città aperta' (১৯৪৫) এই আন্দোলনকে প্রথম আন্তর্জাতিক পরিচয় দিয়েছিল। বিশ্বখ্যাত রোসেলিনি ১৯৪৯ সালে ইতালির এক দূরদ্বীপে 'Stromboli' সিনেমার শুটিং করছিলেন। সিনেমার নায়িকা হিসেবে নিয়েছিলেন ততদিনে হলিউড স্টারে পরিণত হওয়া সুইডিশ অভিনেত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যানকে। ইনগ্রিড ও রোসেলিনি দু'জনেই তখন বিবাহিত ছিলেন, কিন্তু 'স্ত্রোম্বোলি'র শুটিঙের সময় একে অপরের প্রেমে পড়ে যান। এটা হলিউডে এত বড় স্ক্যান্ডালের জন্ম দিয়েছিল যে স্বয়ং মার্কিন সিনেটে "নৈতিকতার বিরুদ্ধে অপরাধ" (যেন "মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের" কাছাকাছি) করার জন্য এই দু'জনকে ধিক্কার জানানো হয়ে। অথচ আয়রনিটা হচ্ছে এই "অনৈতিক" কর্ম সাধনের সময়ই রোসেলিনি তার জীবনের সবচেয়ে ধর্মপ্রবণ সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখছিলেন। রোসেলিনি কি উদগ্র প্রেমবোধ, উদগ্র অধ্যাত্মবোধ, এবং উদগ্র রসবোধ একসাথে গুলিয়ে ফেলেছিলেন? বাৎস্যায়নের মতো তিনিও কি দাবি করতে পারতেন 'ফ্রাঞ্চেস্কো' সিনেমাটা তিনি "সর্বোচ্চ কৌমার্য ও ধ্যানের সাথে" রচনা করেছেন? আমার মনে হয় আসলেই পারতেন। কারণ যে তিন ধরনের উদগ্রতার কথা বললাম, সেগুলো কারো কারো জীবনে mutually exclusive না-ও হতে পারে।

'নব্য-বাস্তবতা' আন্দোলনের জনক যে বাস্তবতার প্রতি মোহাচ্ছন্ন হবেন সেটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু রোসেলিনির আচ্ছন্নতাটা তারপরও বাড়াবাড়ি রকমের। তিনি বুঝেছেন যে বাস্তবতার অনেক স্তর আছে, এবং স্তরগুলো নির্ধারিত হয় সময় দিয়ে। অতীতের বাস্তবতা হচ্ছে ইতিহাস। বিশ্বযুদ্ধের পর রোসেলিনি প্রথমেই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে আশ্রয় করে তিনটি সিনেমা বানান: 'Rome, Open City', 'Paisan', এবং 'Germany, Year Zero'। প্রথম দুটি সিনেমা দেখে মুগ্ধ হয়ে ইনগ্রিড ১৯৪৮ সালে রোসেলিনিকে একটা চিঠিতে লিখেন, "If you need a Swedish actress who speaks English very well, who has not forgotten her German, who is not very understandable in French, and who in Italian knows only 'ti amo', I am ready to come and make a film with you." ইনগ্রিডের সরল-চিঠির পর রোসেলিনি বাস্তবতার প্রতি তার আনুগত্য ত্যাগ করে 'স্ত্রোম্বোলি'তে একজন হলিউড স্টারকে নিয়ে আসেন। এই সিনেমায় ইনগ্রিডের চরিত্র খানিকটা অবাস্তব দেখালেও সার্বিকভাবে এটাও বাস্তবতারই চিত্র, তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে প্রথম যুগান্তকারী সিনেমা 'Bicycle Thieves' এর আগের বছরই মুক্তি পেয়েছিল, বানিয়েছিলেন ভিত্তোরিও দে সিকা। ঐতিহাসিক আর বর্তমান বাস্তবতার কষ্টের চাপে পিষ্ট হয়ে রোসেলিনি আধ্যাত্মিক সরলতার মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ খুঁজেন। 'ফ্রাঞ্চেস্কো'র মধ্য দিয়ে বাস্তবতার তৃতীয় আরেকটি স্তর চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেন। এই স্তরের নাম দেয়া যায় কালহীন স্তর, বা সময়াতীত স্তর। ঐতিহাসিক ও বর্তমান বাস্তবতার ঘটনাক্ষেত্র হচ্ছে মানুষের বাহ্যিক আচরণ, কিন্তু এই কালহীন স্তরের ঘটনাক্ষেত্র মানুষের মন।

একজন মরমি'র মনের চিত্র ধারণ করা কিভাবে সম্ভব? রোসেলিনি সরলতার সূত্র অনুসরণ করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানীদের সাথে সুন্দরের একটা ভয়ানক প্রেম আছে। কোপার্নিকাস থেকে শুরু করে পল ডিরাক পর্যন্ত সবাই সরলতরকে সুন্দরতর বলেছেন, এবং জীবনভর সরল-সুন্দরের পিছনে ধেয়েছেন। রোসেলিনি হয়ত ভেবেছেন, সরলতমের সন্ধান পাওয়াটাই গভীরতম প্রজ্ঞা। বিজ্ঞানী এবং মরমি দুই ধরনের মানুষই হয়ত সরল-সুন্দরের সন্ধান করেন। ফ্রাঞ্চেস্কো'র চেয়ে সরল মন বোধহয় পাশ্চাত্যের আর কোনো ঋষির ছিল না। আর সেই সরলতম মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার সরল কাজগুলোতে। রোসেলিনি এই সরলতা একেবারে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছেন। মানুষ সাধারণত একটা সমস্যার সম্ভাব্য সবচেয়ে সরল সমাধানটা মানে না। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমস্যার সম্ভাব্য সরলতম সমাধান হতে পারত, মানুষ মেরো না। কিন্তু মানুষ সেটা মানবে কেন? দেশে দেশে যে এত যুদ্ধ তার একটা সমাধান হতে পারত দেশ-প্রধা বা সীমান্ত উঠিয়ে দেয়া। কিন্তু এর চেয়ে অসম্ভব কাজ মানুষের জন্য আর কিছু হতে পারে না। এর বিপরীতে ফ্রাঞ্চেস্কো'র মতো সাধুরা সত্যিকার অর্থেই সবচেয়ে সরল কাজটি করেন। যিশুও শূলে চড়া মেনে নিয়ে সবচেয়ে সরল কাজটিই করেছিলেন। রোসেলিনি সিনেমাটা শুরুই করেছেন একটা বিশাল সরলতার-ধাক্কা দিয়ে।

ফ্রাঞ্চেস্কো এবং তার কয়েকজন অনুসারী যখন সম্ভাব্য সরলতম জীবন, অর্থাৎ দারিদ্র্যের জীবন বেছে নেয় তখন তাদের কাজকর্ম মানুষের কাছে ভয়ানক অদ্ভুত ঠেকে। দস্তয়েভস্কি'র 'ইডিয়ট' যাদের পড়া আছে তারা সরল-সুন্দর-শুভ জীবনের অদ্ভুতত্ব বেশি ভাল বুঝবেন। ফ্রাঞ্চেস্কোকে সবাই পাগল-ছাগল বলে। আজকের যুগে হলে বলত, একে মানসিক হাসপাতালে পাঠাও। ফ্রাঞ্চেস্কো তার অনুসারীদেরকে নিয়ে রোমে পোপের সাথে দেখা করতে গেলে পোপ Innocentius III তাদেরকে আশীর্বাদ করেন এবং ধর্মপ্রচারের অনুমতি দেন। ফ্রাঞ্চেস্কোরা তাদের ধর্ম প্রচারে নতুন উদ্যম পায়। অন্যের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উপকারে লাগাটাই তাদের ধর্ম। ফেরার পথে সাগরেদরা ফ্রাঞ্চেস্কোকে জিজ্ঞাসা করে কেন তারা তাকে অনুসরণ করবে। উত্তরে ফ্রাঞ্চেস্কো বলে, কারণ তার চেয়ে পাপী এবং নীচ কোনো জীব নেই, এবং তারপরও ঈশ্বর তাকেই নির্বাচনের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন যে ঈশ্বরই সকল গুণের উৎস। ফ্রাঞ্চেস্কোর শূন্যপাত্রটা ঈশ্বর সর্বক্ষণ গুণের সুরা দিয়ে ভরে রাখেন। প্রচণ্ড বৃষ্টির মাঝে হাঁটতে হাঁটতে ফ্রাঞ্চেস্কোরা তাদের পুরনো কুটিরে ফিরে আসে। এসে দেখে এক লোক তাদের আস্তানায় নিজের বাড়ি বানিয়েছে। লোকটি লাঠির ভয় দেখিয়ে তাদেরকে বেরিয়ে যেতে বলে। ফ্রাঞ্চেস্কো হাসিমুখে সাগরেদদের নিয়ে বেরিয়ে আসেন। বলেন, আমাদের যাত্রা শুভ হল, কারণ শুরুতেই আমরা একজন মানুষের উপকারে লাগতে পারলাম। এর চেয়ে সরল সমাধান আর কী হতে পারে!

'The Little Flowers of St. Francis' এবং 'The Life of Brother Ginepro'—এই বই দুটোতে ফ্রাঞ্চেস্কো ও তার সঙ্গীদের সম্পর্কে যেসব গল্প আছে সেগুলো থেকেই রোসেলিনি ও ফেলিনি কয়েকটি নির্বাচন করেছেন। গল্পগুলোর একটা যেন আরেকটার চেয়ে বেশি ইডিয়টিক। রোসেলিনি যেন ইচ্ছা করে একটা গল্প দিয়ে আরেকটা গল্পের ইডিয়টত্বকে হার মানানোর খেলায় মেতেছেন। এবং একইসাথে দস্তয়েভস্কিকেও হার মানানোর দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। রোসেলিনি এখানে নিজেকে হাবা দাবি করেছেন, এবং হাবাত্বের জয়গান গেয়েছেন। এর একমাত্র কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানুষ শক্তিমত্তা, ক্ষমতা, বুদ্ধি, তীক্ষ্ণতা, চাতুর্য, অহঙের বিধ্বংসী খেলায় মেতেছিল। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার সবচেয়ে বড় গুণ তার সুতীব্র আত্মবিশ্বাস ও অহংকার। এই অহংকারের বশেই ফ্রিডরিশ নীচা ঋষিদের নমনীয়তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু রোসেলিনি এই শক্তিমত্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। রোসেলিনির 'ফ্রাঞ্চেস্কো'কে জাতীয়তাবাদের ঘৃণ্য আস্ফালনের বিরুদ্ধে একটা একরোখা, একগুয়ে, হাবাগোবা বিদ্রোহ হিসেবে দেখতে হবে। তিনি যেন রবীন্দ্রনাথের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চেয়েছেন, দেখো
"… বীভৎস আহার
বীভৎস ক্ষুধারে করে নির্দয় নিলাজ—
তখন গর্জিয়া নামে তব রুদ্র বাজ।
ছুটিয়াছে জাতিপ্রেম মৃত্যুর সন্ধানে
বাহি স্বার্থতরী, গুপ্ত পর্বতের পানে।"

মধ্যযুগকে গালিগালাজ করতে করতে আধুনিক যুগ ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে। আধুনিকতার অহংকে ধূলায় ধূলিসাৎ করে তাই রোসেলিনি মধ্যযুগের শুভবার্তা নির্লজ্জের মতো প্রচার করেছেন। ষাটের দশকে নিজের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য তিনি বলেছিলেন,
"It was important for me then to affirm everything that stood against slyness and cunning. In other words, I believed then and still believe that simplicity is a very powerful weapon."
তবে মধ্যযুগের বর্বরতাকেও তিনি অস্বীকার করেননি। মধ্যযুগে অতুলনীয় বর্বরতার মধ্যেও যে ফ্রাঞ্চেস্কো ফুল ফোটাতে পেরেছিলেন সেটাই রোসেলিনির বিস্ময়, তার আশার প্রদীপ:
"If we want to go back to the historical moment, we must remember that these were cruel and violent centuries, and yet in those centuries of violence appeared Saint Francis of Assisi and Saint Catherine of Siena."

আগেই বলেছি রোসেলিনি এখানে ঐতিহাসিক বাস্তবতা নিয়ে কাজ করতে চাননি। চেয়েছেন কালহীন বাস্তবতাটাকে ফুটিয়ে তুলতে। কাজটা খুবই কঠিন, প্রায় অসম্ভব। তবে তিনি অসাধ্য প্রায় সাধন করে ছেড়েছেন। ফ্রাঞ্চেস্কো'র জীবন ফুটিয়ে তুললে কাজটা খুবই ঐতিহাসিক হয়ে যেত। এবং ইতিহাসের মধ্যে ফ্রাঞ্চেস্কোর আধ্যাত্মিকতা খুঁজে পাওয়া যেত না। এর বদলে রোসেলিনি চেষ্টা করেছেন অধ্যাত্মবোধে সিক্ত একটা পরিবেশ তৈরি করতে। ফ্রাঞ্চেস্কো এই পরিবেশের ভিত্তি, পটভূমি, কিন্তু পুরোভূমিতে তাকে খুব কমই দেখা যায়। রোসেলিনি ইচ্ছা করে ব্যক্তি ফ্রাঞ্চেস্কোকে গৌণ করে তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক অর্ডারটিকে মুখ্য করেছেন। এমনকি সিনেমায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ফ্রাঞ্চেস্কোর শিষ্য ব্রাদার জিনেপ্রো'র উপর। জিনেপ্রোকে কেন বেছে নিয়েছেন তা বুঝতে কোন সমস্যা হয় না। এই ছোট্ট ফ্রান্সিস্কান অর্ডারের সবচেয়ে বেকুব, সবচেয়ে হাবা, সবচেয়ে পাগল, মানসিকভাবে সবচেয়ে "অসুস্থ" তপস্বী হলেন জিনেপ্রো। জিনেপ্রো বদ্ধ উন্মাদ। এটাকেও একটা আয়রনি বলতে হবে যে নিরেট বাস্তবতাবাদী সিনেমা হলেও এতে যে পরিবেশটা তৈরি করা হয়েছে তা পুরোদস্তুর অবাস্তব। এটা যেন পৃথিবীই নয়। কালহীন বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে গিয়েই এই স্থানহীন পরিবেশ তৈরি করতে হয়েছে। পরিবেশটা যেন শূন্যের মাঝে ভাসছে, এবং স্থানকালের যুক্তির অতীত সব মিরাকলের জন্ম দিচ্ছে।

ফ্রাঞ্চেস্কোদের উপর যে দৈব উন্মাদনা ভর করেছিল তার প্রতি সৎ থাকতে গিয়ে রোসেলিনি আখ্যানধর্মী সিনেমার ব্যাকরণ ভেঙেছেন। এই সিনেমায় কোনো কাহিনী বা আখ্যান নেই। ছোট ছোট গল্প জোড়া লাগিয়ে সিনেমাটা বানানো হয়েছে, কিন্তু এক গল্পের সাথে আরেকটার কোনো সম্পর্ক নেই, এবং এগুলোকে গল্প বললে গল্পের অবমাননা করা হয়। বরং বলা উচিত অনেকগুলো ছোট ছোট কবিতা জোড়া লাগিয়ে একটা সামগ্রিক অতীন্দ্রিয় সত্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। কবিতার সাথে গল্প বা উপন্যাসের বড় পার্থক্য হচ্ছে কবিতা একটি মুহূর্তের মধ্যে গোটা সত্যকে (বা একটি অনুভূতিকে) আঁকড়ে ধরে। আর গল্প-উপন্যাস একটি সত্যকে গোটা কাহিনীর মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দেয়। 'ফ্রাঞ্চেস্কো'র একেকটা অংশকে তাহলে আমরা একেকটা দৃশ্যকাব্য বলতে পারি। প্রতিটা দৃশ্যকাব্যের কাহিনী অসম্পূর্ণ, প্রতিবার যেন পরিচালক আমাদেরকে একটা অন্ধগলির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। এই তলহীন দৃশ্যকাব্যের অনুভূতিটা আমার মনে হয় মরমিদের মর্মের সাথে খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমি নিজে যেহেতু কখনো মরমি বা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করিনি সেহেতু নিশ্চিত বলতে পারছি না। কিন্তু কবিদের মরমি হওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টার কাহিনী পড়ে পড়ে কিছুটা অনুমান করতে পারছি। আর তাছাড়া মরমিদের অনুভূতির ছিটেফোঁটা তো সব মানুষের মধ্যেই মাঝে মধ্যে ভর করে। মানুষ কখনো কখনো একটা সূর্যোদয় দেখে, বা পাহাড়ের উপর থেকে প্রকৃতির দৃশ্য দেখেও এক সেকেন্ডের জন্য মরমে পৌঁছে যেতে পারে, কিন্তু সেটা খুবই ক্ষণস্থায়ী এবং অকেজো মরম; আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যা বলে আর কি।

আসলে সিনেমাটা দেখে আমি ভয়াবহ রকমের আচ্ছন্ন হয়েছিলাম। কিন্তু কেন এতটা আচ্ছন্ন হলাম তা বুঝতে পারিনি। অনেক ভেবেও কূল কিনারা করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন সমালোচকের লেখার দিকে হাত বাড়ালাম। এবং তাতে আসলেই কিছুটা লাভ হয়েছে। আমার অবচেতনের যে-অনুভূতিগুলো মিলিত হয়ে চেতনের বিস্ময়, ঘোর, ও বিহ্বলতার জন্ম দিয়েছিল, সে-অনুভূতিগুলোই যেন অন্যের লেখায় কিছুটা আবিষ্কার করতে পারলাম।

যেমন, সমালোচকরা দাবি করছেন রোসেলিনির এই সিনেমায় বাস্তবতা ও স্টাইলের একটা অদ্ভুত সমন্বয় সাধন করা হয়েছে, যা কেবল মধ্যযুগীয় শিল্পেই পাওয়া যেত। দান্তের 'ডিভাইন কমেডি'-তে এরকম সমন্বয় দেখা যায়, এবং 'ফ্রাঞ্চেস্কো'র সাত বছর পর ইংমার বারিমানের 'The Seventh Seal' সিনেমাও একই ধরনের সমন্বয় সাধনে সফল হয়েছিল। সিনেমার বাস্তব অংশটা হচ্ছে চরিত্রগুলোর চালচলন, আচার-ব্যবহার। কিন্তু তারা যে-পরিবেশে স্থাপিত সেটা অতিমাত্রায় স্টাইলবদ্ধ। সিনেমা শুরু হয় বৃষ্টির মধ্যে, এবং অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টি চলে। একটা দৃশ্যে ফ্রাঞ্চেস্কো মাটিতে শুয়ে তার সঙ্গীদেরকে তাকে পদদলিত করতে বলেন, যাতে তার সব অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। এই দৃশ্যটার স্টাইলের সাথে Giottoর 'সন্ত ফ্রাঞ্চেস্কোর মৃত্যু' ছবির স্টাইলের অনেক মিল আছে। বাস্তব চরিত্রগুলোকে অবাস্তব স্টাইলের পটভূমির সাথে মিশিয়ে দেয়ার জন্য রোসেলিনি প্রতিটা দৃশ্যকে 'ফ্ল্যাট' করেছেন, মানে দৃশ্যের মধ্য থেকে ত্রিমাত্রিক perspective উঠিয়ে নিয়েছেন। এর ফলে চরিত্রগুলো তাদের স্টাইলায়িত প্রতিবেশের সাথে মিশে গেছে। মধ্যযুগীয় চিত্রশিল্পের একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই সমতলতা, বা দ্বিমাত্রিকতা। তবে দ্বিমাত্রিকতা একটা বড় উদ্দেশ্য সাধন করত, সেটা হলো প্রতীকীত্ব। দ্বিমাত্রিক চিত্র একসাথে একটি একক ইউনিট হিসেবে একটি বড় প্রতীক হিসেবে কাজ করতে পারে। মধ্যযুগীয় শিল্প অতিমাত্রায় প্রতীকী। মধ্যযুগের চিত্র কোনো বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একটা বিশাল সত্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। রোসেলিনিও তাই করতে চেয়েছেন।

সিনেমাতে ফ্রাঞ্চেস্কোর সম্প্রদায় একটা স্টাইলবদ্ধ দ্বিমাত্রিক জগতে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে একটি সম্ভাব্য স্বপ্নভূমির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। এরকম সম্প্রদায় পাশ্চাত্যে কেবল মধ্যযুগেই তৈরি হতে পারত। ধর্মের একটা বড় দায়িত্ব ছিল মানুষের বিশ্বদর্শন (worldview) ও মূল্যবোধের (ethos) মধ্যে সমন্বয় সাধন। বিশ্বের উৎপত্তি ও গঠন সম্পর্কে মানুষ যে-রকম ধারণা পোষণ করে সেই ধারণা দিয়েই তাদের সামাজিক মূল্যবোধ নির্ধারণ করাটা ছিল ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য। এরকম বিশ্বদর্শনসিদ্ধ মূল্যবোধ, এবং মূল্যবোধস্নিগ্ধ বিশ্বদর্শন দিয়ে তৈরি স্বপ্নভূমিই ফ্রান্সিস্কানদের স্বর্গভূমি। 'ফ্রাঞ্চেস্কো' সিনেমার মাধ্যমে রোসেলিনি সেই স্বর্গেরই একটা দ্বিমাত্রিক প্রতীক তৈরি করতে চেয়েছেন। বর্তমান যুগে ধর্মের বদলে অন্য কিছুকে হয়ত এই স্বর্গ তৈরি করতে হবে। কারণ বর্তমানে বিশ্বদর্শন নির্ধারণের কাজটা বিজ্ঞানীরা করছেন। আর মূল্যবোধ নির্ধারণের কাজটা কেউই করছেন না। দার্শনিকরা বিশ্বদর্শনসিদ্ধ মূল্যবোধ তৈরির কাজ করতে পারতেন, কিন্তু আমাদের সমাজে দার্শনিকরা পুরোমাত্রায় একঘরে। সমাজজীবনে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। রোসেলিনি হয়ত এজন্যই একটা মধ্যযুগীয় প্রতীককে পুনর্জীবন দেয়া গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।

একদিক থেকে চিন্তা করলে এই গোটা সিনেমাটাকেই ফ্রাঞ্চেস্কোর ধর্মের একটা রূপক হিসেবে দেখা যায়। ধর্ম বিশ্বদর্শন ও মূল্যবোধের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। আর এই সিনেমায় বাস্তবতা ও স্টাইলের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। এখানে বাস্তবতাটা হচ্ছে বিশ্বদর্শন। চরিত্রগুলো পুরোপুরি বাস্তব, এবং তাদের চালচলন ও কাজকর্ম দিয়ে সিনেমাটার বিশ্বদর্শন তৈরি হয়। আর চরিত্রগুলো যে-পরিবেশে স্থাপিত সেই পরিবেশটা অবাস্তব বা স্টাইলবদ্ধ। রোসেলিনি স্টাইলের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর প্রতীকী তাৎপর্যকে অর্থ দিয়েছেন, মানে মূল্যবোধ তৈরি করেছেন। মূল্যবোধ স্টাইলের মতোই একটা অদৃশ্য জিনিস। আর বিশ্বদর্শন সরাসরি বাস্তবতার প্রতিনিধি, মানে তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান একটা জিনিস। ফ্রাঞ্চেস্কোরা বিশ্বদর্শন ও মূল্যবোধের সমন্বয়ে একটা পরিপূর্ণ ধর্ম যাপন করতেন। একইভাবে এই সিনেমায় বাস্তবতা ও স্টাইল একত্রিত করে ফ্রাঞ্চেস্কো'র মনোজগতের একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করা হয়েছে।

এই সিনেমার প্রতিটা দৃশ্যকাব্যই প্রতীকী। প্রতিটা দৃশ্যের ঘটনা ইডিয়টিক, কিন্তু ঠিক সে-কারণেই আবার প্রচণ্ড প্রতীকী। একটি দৃশ্যকাব্যে দেখা যায় একজন সঙ্গী অনেকদিন রোজা রাখার কারণে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে গেছেন, এবং জিনেপ্রো'র কাছে একটা শূকরের ঠ্যাং খেতে চাচ্ছেন। রান্নার দায়িত্বে নিয়োজিত জিনেপ্রো সোজা একটা ছুরি হাতে জঙ্গলে বেরিয়ে পড়েন শূকরের সন্ধানে। খুঁজতে না খুঁজতেই একদল শূকর পেয়ে সেটাকে ঈশ্বরের উপহার মনে করেন। তারপর একটা শূকরকে অনেক বলে কয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে সে যদি তাকে একটা ঠ্যাং দেয় তাহলে সবারই উপকার হবে। শূকরের কোনো কষ্ট হবে না কারণ কাজটা সে একজন অসুস্থ ঈশ্বরসেবকের জন্য করছে। শূকর আদৌ বুঝল কি-না কে জানে। কিন্তু সেটা মুখ্য ব্যাপার না। মুখ্য হচ্ছে সরলতার প্রতি পরমবিশ্বাসের প্রতীকী গুরুত্বটা।

আরেকটি দৃশ্যকাব্যে ফ্রান্সিস্কানদের প্রথম নারীদলের প্রধান সিস্টার কিয়ারা দলবলসহ তাদের কুটিরে বেড়াতে আসেন। এ-উপলক্ষ্যে ফ্রাঞ্চেস্কোর সঙ্গীরা পুরো এলাকাটি ফুলে ভরিয়ে দেয়। নারী ও পুরুষের সাক্ষাৎকে উপলক্ষ্য করে এ-দৃশ্যকাব্যে একটি পবিত্রতার প্রতীক তৈরি করা হয়। নারী-পুরুষ একত্রিত হওয়ার পরই যেন স্বর্গ ফুলশোভিত হয়ে উঠে। সিস্টার কিয়ারা এবং অন্যদের সামনে জিনেপ্রো শয়তান দমনের এক অদ্ভুত কায়দা শোনায়। শয়তান তাকে কুপথে চালিত করতে এলে সে যে পথ অবলম্বন করে তারচেয়ে সরল আর কিছু হতে পারে না। সে আক্ষরিক অর্থেই হৃদয়ের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর শয়তান অনেক কড়া নাড়লেও সে দরজা খুলে না। শয়তান একসময় ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়।

ফ্রান্সিস্কানদের সরল-সুন্দর স্বর্গভূমি একসময় জটিল-অসুন্দর পৃথিবীর সম্মুখীন হয়। জিনেপ্রো একবার পনের দিনের রান্না একবারে করে ফেলে যাতে এরপর সেই পনের দিন সে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে বের হতে পারে। বের হওয়ার পর সে Nicolaio নামক এক স্বৈরাচারের সম্মুখীন হয়। নিকোলায়ো'র দলবল তাকে ইচ্ছামত অবমাননা করে, তাকে দিয়ে ফুটবল খেলে। ফ্রাঞ্চেস্কোদের আস্তানা যতটা সরল, নিরিবিলি, ও সুন্দর ছিল, নিকোলায়োর সেনানিবাস ঠিক ততটাই বিশৃঙ্খল, উচ্ছৃঙ্খল, শব্দময়। এই প্রথমবার ফ্রাঞ্চেস্কোর দ্বিমাত্রিক প্রতীকী জগতের সাথে পৃথিবীর ত্রিমাত্রিক বাস্তব জগতের দেখা হয়। নিকোলায়ো জিনেপ্রোকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও জিনেপ্রো তার হাবাগোবাত্ব বজায় রাখে। এক পাদ্রির সহায়তায় সে মৃত্যু থেকে রক্ষা পায়। তাকে স্বয়ং নিকোলায়ো'র তাবুতে আনা হয়। নিকোলায়ো জিনেপ্রোর মুখভঙ্গি দেখে স্তম্ভিত, বিব্রত, বিস্মিত, হতবিহ্বল ইত্যাদি আরো কতকিছু হয় তা পুরোপুরি বর্ণনা করা সম্ভব না। দু'জনের সাক্ষাৎটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দৃশ্য। শেষ পর্যন্ত জিনেপ্রোরই জয় হয়। রোসেলিনি শেষ পর্যন্ত আশাবাদিই। সরলতা আর জটিলতার উপমা এই দৃশ্যকাব্যের এক জায়গায় সবচেয়ে সরলভাবে ফুটে উঠেছিল। একখণ্ড কাপড় পরা জিনেপ্রোর সামনে দাঁড়িয়েছিল এক বিশাল লোহার পোশাক পরা নিকোলায়ো—সে পোশাক খুলতে পুরো এক বাহিনী লোক লাগে।

রোসেলিনি নিজে ধার্মিক নন। কোনো প্রতিষ্ঠিত ধর্ম তিনি পালন করতেন না। কিন্তু ইতালিতে ধর্মীয় সাধুদেরকে নিয়ে সর্বোৎকৃষ্ট ২টা সিনেমার ২টাই বানিয়েছেন নির্ধর্মীরা। একটা এটা, এবং অন্যটা পিয়ের পাওলো পাসোলিনি'র 'The Gospel According to St. Matthew' (১৯৬৪)। এ-থেকে একটা জিনিস বুঝা যায় যে ধর্মের মধ্যে কিছু জিনিস আছে যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সম্পদ। ঠিক যেমন নির্ধর্মের মধ্যেও এমন কিছু উপাদান আছে যা ধার্মিকের জন্যও সম্পদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর রোসেলিনি একটা আধ্যাত্মিক সংকটে ভুগছিলেন। কাকে বিশ্বাস করবেন বুঝে পাচ্ছিলেন না। এজন্যই সবচেয়ে সরল অপশনটা আবার ঘুরে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু এই সিনেমা বানানোর পর থেকে রোসেলিনি শৈল্পিক দিক দিয়ে দিন দিন আরো বেশি মধ্যযুগ-বিমুখ হতে থাকবেন। মধ্যযুগের দ্বিমাত্রিক সরলতা ও প্রতীকীত্ব থেকে বেরিয়ে এসে রেনেসাঁস একটা বাস্তবতাবাদ ও মানবতাবাদের আন্দোলন শুরু করেছিল। রেনেসাঁস মানবতাবাদীরা বিশ্বকে দ্বিমাত্রিক প্রতীকের বদলে ত্রিমাত্রিক বাস্তবতা দিয়ে দেখার চল শুরু করেছিলেন। রোসেলিনিও দিন দিন মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁসের দিকে এসেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ইতালীয় রেনেসাঁসের স্রষ্টাদেরকে নিয়ে একটা ৩ পর্বের সিনেমা বানিয়েছিলেন। তার ১৯৫০ সালের সরলতা জটিল হতে হতে ১৯৭৩ সালে পরিপূর্ণ জটিল রূপ ধারণ করেছে। কিন্তু সরলতা আর জটিলতা দুটোই তিনি সমান সমৃদ্ধভাবে চলমান-চিত্রে ধারণ করার চেষ্টা করে গেছেন।


— — — — —
কৃতজ্ঞতা: Peter Brunette এই রিভিউটা না লিখলে আমার এই প্রবন্ধটা লেখা হতো না।

প্রাসঙ্গিক পাঠ:
- 'The Little Flowers of St. Francis of Assisi',
- দস্তয়েভস্কি'র 'The Idiot',
- Clifford Geertz-এর 'Religion as a Cultural System',
- Peter Brunette-এর 'Roberto Rossellini',
- Michel Foucault-র 'Madness and Civilization'।


মন্তব্য

সত্যপীর এর ছবি

ভারি চমৎকার।

..................................................................
#Banshibir.

শিক্ষানবিস এর ছবি

ধন্যবাদ।

মাহবুব লীলেন এর ছবি

পড়তে পড়তে তো নিজেই মরমিবাদে আক্রান্ত হযে যাচ্ছিলাম...

০২
লেখাটা একটা দুর্ধর্ষ বিষণ্নতা...

শিক্ষানবিস এর ছবি

এতটা বিষন্নতা হয়ে যাবে ভাবিনি অবশ্য। কিন্তু মনে হচ্ছে হতেই পারে।

তাহসিন রেজা এর ছবি

অসাধারণ একটি প্রবন্ধ। মাঝেমাঝেই এমন লিখুন না, আমরা পড়ি।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

শিক্ষানবিস এর ছবি

ধন্যবাদ। পড়ার লোক থাকলে লেখাও নিশ্চয়ই চলবে। হাসি

কর্ণজয় এর ছবি

ভালো লাগলো। অনেক। জাতকের একটা গল্প মনে পড়লো।
দুই বন্ধূ যাচ্ছিলো। একবন্ধূ গেলো নটি বাড়ি। অন্যজন গেলো ধর্মশালায়। যে নটি বাড়ি গেল সে নটিবাড়ীর প্রসাধনীতে পরিপূর্ণ জীবনর মধ্যে গিয়ে ভঅবতে শূরু করলেঅ,সেই বন্ধূর সৌভাগ্যের কথা যে ধর্মশঅলায় ঈশ্বরের বাণী শোনার সৌভাগ্য অর্জন করছে। আর ধর্মশালঅয় সেই বন্ধু ঈশ্বরের বাণী শুনতে শূনতে ভাবছিল বন্ধূর কথা। আহা! কী আনন্দই না ও করছে।।
নটিবাড়ি যাওয়া বন্ধূর কপালে জুটলো ধর্মপালনের পূণ্য পুরষ্কার আর ধর্মশালায় যাওয়া বন্ধূর কপালে জুটলো নটীবাড়ি গমনের পাপ।।।

শিক্ষানবিস এর ছবি

খুবই আকর্ষণীয় গল্প। এই বিচারব‍্যবস্থাটা আমার মনে হয় মানুষের মনের সরলতার প্রতিধ্বনি। মনকে শরীরের এত উপরে স্থান দিতে সরলমনারাই সবচেয়ে ভাল পারে। আরো বিস্ময়কর হচ্ছে মানুষ কত সহজে মন এবং দেহ দুটোকে সম্পূর্ণ আলাদা ২টা সত্তা ভাবছে এখানে। দেহ দিয়ে কিছুই নির্ধারিত হল না, হল মন দিয়ে, ভাবখানা এমন যেন তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন। যেন দেহের তাড়নার কথা ভেবে মনকে ক্ষমা করা যায় না, যেন মনের উদারতার কথা ভেবে দেহকে প্রশ্রয় দেয়া যায় না। হাইলি ইন্টারেস্টিং।

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

দারুণ একটা আলোচনা। যদিও বই এবং সিনেমাগুলোর অধিকাংশই পড়া এবং দেখা নেই। যেগুলো পড়া হয়েছে সেগুলোও অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে। এজন্য লেখাটার অনেক কিছুই স্পষ্ট বুঝতে পারি নি। কিন্তু সেই বুঝতে না পারার অংশটুকুও দারুণ। পুরোপুরি না বুঝতে পেরেও অনেকদিন পর একটা লেখা পড়ে দারুণ একটা ভালোলাগা কাজ করল। আপনি যে পাঠ আর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়ে লেখাটা লিখেছেন সেই জায়গাটাতে পৌছানোর একটা আগ্রহ তৈরি হলো প্রচণ্ডভাবে।

আমি কোনোদিন আধ্যাত্মিকতা ব্যাপারটাকে বুঝতে পারিনি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তো নেইই, আধ্যাত্মিকতার ব্যাপারে অন্যের অভিজ্ঞতাকেও অস্বীকার করার একটি প্রবণতা আছে আমার মধ্যে। কিন্তু আবার এটাও তো দেখা গেল, ইতালিতে ধর্মীয় সাধুদেরকে নিয়ে সর্বোৎকৃষ্ট ২টা সিনেমার ২টাই বানিয়েছেন নির্ধর্মীরা। আধ্যাত্মিকতাকে স্বীকার না করেও তাই আধ্যাত্মিকতার অনুভূতিকে বুঝতে পারা বা স্বীকার করা যে অসম্ভব নাও হতে পারে এটা একটা ভালো উপলব্ধি।

এরকম লেখা আরো লিখলে আগ্রহ নিয়ে পড়ব।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

শিক্ষানবিস এর ছবি

আমিও এ-ধরনের জিনিস নিয়ে ইদানিং বেশি লিখছি, কারণ আমার উদ্দেশ‍্য এটা দেখানো যে বিজ্ঞান (শুধু প্রাকৃতিক-বিজ্ঞান) ও ধর্মের মধ‍্যকার বিরোধকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে যে দ্বন্দ্বটা তৈরিটা হচ্ছে তা সবখানে এতটা প্রকট না। শিল্পের জগতে ধর্মী ও নির্ধর্মী অবাধে মেলামেশা করে, এমনকি সামাজিক ও মানবিক বিজ্ঞানের জগতেও তাদের মধ‍্যে কোনো সুস্পষ্ট বিভাজনরেখা নেই। যুক্তি বনাম ধর্ম—মানুষের মনটা এই প্রকট বৈপরীত‍্যের কবলে পড়তে চায় না। মানুষের মধ‍্যে যুক্তি বোঝার ক্ষমতা যতটা, সেই যুক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার ক্ষমতাও ততটাই। মানুষের সাথে একটা গ্রহের তুলনা দিলেই ব‍্যাপারটা বোঝা যায়। পৃথিবী পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মেনে সূর্যের চারদিকে ঘুরতেই থাকবে, তার আর কিছু করার নেই, সে যুক্তির দাস। কিন্তু মানুষ কারো দাস নয়। আধ‍্যাত্মিকতা ধরাছোঁয়ার অতীত জানার পরও মানুষ তার দিকে হাত বাড়ায়। প্রকৃতি যোগ‍্যতমের উদ্বর্তনের নীতি মেনে চলে বোঝার পরও মানুষ অযোগ‍্যতমের জয়গান গায়।

আমার মনে হয় Rossellini, Pasolini, বা Ingmar Bergman-এর মতো নির্ধর্মী চলচ্চিত্রকাররা ধর্মীয় ভাব নিয়ে চমৎকার সিনেমা বানাতে পেরেছেন কারণ: (১) তারা নিজেরাও ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে অনেক ভাবতেন, অবিশ্বাস করার জন‍্যই ভাবতেন, (২) তারা ধর্মের বহিরাবরণটা না দেখে ভিতরটা দেখেছেন, এবং সেটা দেখলে বোঝা যায় ধর্মের আচার-প্রথা-বহিরাবরণ-ঈশ্বরবিশ্বাস ইত‍্যাদি সব ঝেড়ে ফেললেও তার মূলভাবটা বজায় থাকে। এই মূলভাব নিয়েই তারা কাজ করেছেন, এবং এই ভাব বোঝার জন‍্য ধার্মিক না হলেও চলে।

পুনশ্চঃ ধর্মীয় ভাব নিয়ে বিশ্বাসী ধার্মিকরাও চমৎকার সিনেমা বানিয়েছেন। যেমন, Carl Dreyer-এর Ordet দেখতে পারেন।

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

চমৎকার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

চমৎকার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

প্রায় অফটপিক মন্তব্য,

ইনগ্রিড বার্গম্যানের নামের সুইডিশ উচ্চারণ ইংরিড বারিমান দেঁতো হাসি

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA