৯৯.৯৪ এবং এক কিংবদন্তী

সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি
লিখেছেন সুবিনয় মুস্তফী (তারিখ: বিষ্যুদ, ২৮/০৮/২০০৮ - ৫:৫২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

auto২০০১ সালের ফেব্রুয়ারীর একটা ঘটনা বলি। সুদূর টেক্সাসে আমি তখন, হিম শীতল সকালে ক্লাসে যাচ্ছি। ক্লাস শুরুর আরো কিছু বাকি, তাই কম্পিউটার ল্যাবে ঢুকলাম টাইম পাস করতে, উদ্দেশ্য কিছুক্ষণ নেট নাড়াচাড়া করবো। স্বভাবমত বিবিসি নিউজে ঢুকলাম দিনের হেডলাইন দেখার জন্যে।

এবং হেডলাইন দেখেই প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম। ক্লাসে গেলাম বিমর্ষ মনে, সারাদিন কাটলো এক বিষাদগ্রস্ত ঘোরের মধ্যে। তারপরে প্রায় দুই-তিনদিন একই অবস্থায় কাটলো। ইন্টারনেট ঘুরে, মেসেজবোর্ড পড়ে বুঝলাম এমন শোকাচ্ছন্ন অনুভূতি শুধু আমার না, তখন আরো হাজারো মানুষের মনে হয়েছিলো।

৯২ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তীতুল্য ক্রিকেটার স্যার ডন ব্র্যাডম্যান মারা গিয়েছিলেন সেদিন। তার জীবনাবসানের সাথে সাথে ক্রিকেটের স্বর্ণযুগেরও অবসান ঘটে।

আমার বয়স যখন সবে দশ, তখন থেকেই এই মানুষটাকে দেবতা বলে মানতাম আমি। স্কুল কলেজ পার হয়ে ভার্সিটিতে পড়ছি, তখনও তিনি বেঁচে আছেন। চাকরির পাট চুকিয়ে বিদেশ চলে যাচ্ছি, কমার্শিয়াল ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি, তখনও ব্র্যাডম্যান জীবিত।

হয়তো দেবতার মতই চিরঞ্জীবি হবেন তিনি। মনে মনে চাইছিলাম, প্রার্থনা করছিলাম যে জীবনের শেষ সেঞ্চুরিটা যেন তিনি করতে পারেন। কিন্তু the Great Umpire in the Sky তা হতে দেননি। আঙ্গুল উঁচিয়ে সেই আম্পায়ার ব্র্যাডম্যান-কে আউট ঘোষণা করেন, সেঞ্চুরি থেকে মাত্র সাত ঘর দূরে।

*

সনাতনী ধারার ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ডন ব্র্যাডম্যান বরাবরি ছিলেন অদেখা সেই স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ স্মৃতিচিহ্ন। বক্সিং-এ যেমন আলী, ফুটবলে যেমন পেলে, বাস্কেটবলে যেমন জর্ডান, গলফে যেমন উড্‌স - ক্রিকেটে বোধ করি ব্র্যাডম্যানের মর্যাদা তার থেকেও বেশী। বিনা বিতর্কে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হিসাবে তিনি স্বীকৃত। নিজের জীবদ্দশাতেই প্রবাদপুরুষ। আমার মত যারা তার খেলা জীবনে দেখেনি, তারাও তাকে ভালোবাসতেন প্রচন্ড।

৯৯.৯৪ ছিল তার ব্যাটিং গড়। ক্রিকেটের সবচেয়ে বিখ্যাত সংখ্যা এটি। প্রথম সারির টেস্ট ব্যাটসম্যানদের জন্যে ৫০-কে ধরা হয় একটি মিনিমাম গ্রহণযোগ্য গড়। হাতে-গোণা মাত্র পাঁচজন এই গড়কে ষাটের উপরে নিতে পেরেছেন - অস্ট্রেলিয়ার মাইক হাসি, সাউথ আফ্রিকার গ্রেয়াম পোলক প্রমুখ। কিন্তু এরা কেউই ব্র্যাডম্যানের সমসংখ্যক টেস্ট খেলেননি।

ওদিকে টানা বিশ বছর ধরে টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন, অথচ ক্যারিয়ার শেষ করেছেন প্রায় ১০০ গড় নিয়ে - এরকম নজীর একজনই আছেন। এবং ভবিষ্যতেও একজনই থাকবেন। তিনি ব্র্যাডম্যান। চল্লিশ বছর বয়সে জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসে যদি আর মাত্র চারটি রান করতে পারতেন, তাইলে ঠিকই ১০০ গড় হতে পারতো তার। কিন্তু ওভাল মাঠে হলিসের বলে তিনি বোল্ড হয়ে গেলেন শূন্য রানে! নিউজরিলে ধরা আছে সেই অন্তিম বেদনা-মধুর মুহুর্ত।

তাঁর সর্বশেষ টেস্ট ইনিংস

ডাল-ভাত খাওয়ার মত সেঞ্চুরি মারতেন তিনি। মাত্র ৫২টি টেস্টে তার সেঞ্চুরির সংখ্যা ছিল ২৯ - তিন যুগ পরে গাভাস্কার সেই রেকর্ড ভাংতে সক্ষম হন, তবে আরো অনেক বেশী টেস্ট খেলে। এর মধ্যে ডাবল সেঞ্চুরিই ১২টি, যার কাছে আর কেউ নেই, ব্রায়ান লারা করেছেন নয়টি। ব্র্যাডম্যানের তুমুল স্কোরিং-কে ঠেকাতেই ইংল্যান্ডের অধিনায়ক জার্ডিন উদ্ভাবন করেন বিতর্কিত বডিলাইন বোলিং, যা ১৯৩২-৩৩ সালে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে প্রায় কূটনীতিক ক্রাইসিস সৃষ্টি করতে নিয়েছিল।

বডিলাইন টিভি সিরিজ থেকে একটি ক্লিপ

*

ক্যারিয়ার শেষে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিলেক্টর এবং এডমিনিস্ট্রেটর হিসাবে অনেকদিন ক্রিকেটের সাথে জড়িত ছিলেন। বই লিখেন তার জীবন ও ক্রিকেট দর্শন নিয়ে। সেই লেখনীও তার চরিত্রের প্রতিফলন - নম্র, বিনয়ী, একেবারেই সজ্জন। তার ব্যাটিং-এর মতই সহজ-সরল এবং প্র্যাক্টিকাল।

সেই মহামতি ব্র্যাডম্যানের আজ ছিল জন্মশতবার্ষিকী। আজ পর্যন্ত অস্ট্রেলীয় জাতি তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ট্রেলিয়ানের মর্যাদা দিয়ে থাকে। বিংশ শতাব্দীর সায়াহ্নে উইসডেন একটি জরিপ চালায় - শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটার কারা? ১০০জন ক্রিকেট লেখক ও খেলোয়াড়ের এই জরিপে একমাত্র ব্র্যাডম্যানই ১০০তে ১০০টি ভোট পান! (আর বাকি চারজন ছিলেন সোবার্স, জ্যাক হব্‌স, ভিভ রিচার্ডস এবং শেন ওয়ার্ন।)

আর বর্তমানের খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনি টেন্ডুলকারকে নিজের ব্যাটিং স্টাইলের সবচেয়ে আপন মনে করতেন। তার ৯০তম জন্মদিনে তিনি দুজন বিশেষ অতিথিকে দাওয়াত দিয়েছিলেন - একজন ওয়ার্ন, আরেকজন শচীন। সেই শচীনও বলেছেন আজকে ব্র্যাডম্যানের কথা - Impossible is 99.94

শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে উইকিপিডিয়া আজকে তাদের প্রথম পাতার প্রধাণ ফীচার আর্টিকেল হিসাবে রেখেছিলো ব্র্যাডম্যানের উপর নিবন্ধটি। আরো পড়ুন ক্রিকিনফোতে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ক্রিকেট লেখক গিডিওন হেই-এর মূল্যায়ন

তাঁর সেরা কিছু ইনিংস

*

ব্র্যাডম্যান নামের খ্যাতির বিড়ম্বনার সাক্ষাৎ ভুক্তভোগী ছিল তার ছেলে জন। এক সময় এই জন তার নাম বদলে ব্র্যাডসেন রেখেছিল। কারন একটাই - তার পিতার খ্যাতির কারনে অস্ট্রেলিয়াতে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। তবে সুখের কথা এই যে পরবর্তীতে জন আবার ব্র্যাডম্যান নামটি ফেরত নেয়!


মন্তব্য

অমিত আহমেদ এর ছবি

ক্রিকেটের মহানায়ককে শ্রদ্ধা।


ওয়েবসাইট | ব্লগস্পট | ফেসবুক | ইমেইল

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

আমিও শ্রদ্ধা জানাই। লেখা বেশ ভাল্লাগছে।

====
চিত্ত থাকুক সমুন্নত, উচ্চ থাকুক শির

কীর্তিনাশা এর ছবি

ব্র্যাডম্যাকে শ্রদ্ধা আর আপনাকে ধন্যবাদ।

-------------------------------
আকালের স্রোতে ভেসে চলি নিশাচর।

-------------------------------
আকালের স্রোতে ভেসে চলি নিশাচর।

সুমন চৌধুরী এর ছবি

ব্র্যাডম্যান চিরদিনের হিরো।

বডিলাইন সিরিজটা ডাউনলোড করার চেষ্টা করছিলাম। কোথাও পাইনি। কোন লিঙ্কটিঙ্ক পাইলে জানাইয়েন....



অজ্ঞাতবাস

শাহান এর ছবি

এই লেখাটা আমার চোখ এড়ায় গেল কিভাবে??

মহানায়কের জন্য দাঁড়িয়ে সম্মান । একটা মানুষের খেলা না দেখেও একের পর এক প্রজন্ম তার ভক্ত । ৯৯.৯৪ আসলেই অসম্ভব ।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।