ঘোরতর ঘামগন্ধে ধুকছে ক্যাপিটাল

শেখ নজরুল এর ছবি
লিখেছেন শেখ নজরুল [অতিথি] (তারিখ: সোম, ২৯/০৩/২০১০ - ১০:৪৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

গ্রীষ্মের শুরুতেই বিদ্যুৎ সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। শহরবাসীর অবস্থা তো নাকাল! ঘোরতর ঘামগন্ধে ধুকছে ক্যাপিটাল। পূর্ণগ্রীষ্মে এ গন্ধ যে আরো তীব্র হবে তা নিয়ে কেউ কিছু ভাবছেন না! বলছেন না কেউ প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত পরিচালন। চারদলীয় জোট সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রায় সাত বছরে কাজই ছিলো এই গণ্ধ কিভাবে বাড়ানো যায়! তাই তারা বিদ্যুত উতপাদনে মন দেননি। বিদ্যুৎখাত ছিল সর্বোচ্চ অবহেলিত। তার মানে এও নয় যে, বর্তমানে উন্নতির লক্ষণ আছে। বরং এই খাতকে নিয়ে দুর্নীতির চরম অভিযোগও প্রাসঙ্গিক। গুটিকতক দূর্নীতিবাজের গর্হিত কাজ মোট জনগোষ্ঠির শতকরা হিসেবে নেয়া কষ্টসাধ্য। কষ্ট অসাধ্য বিষয়টি বাধ্য হয়ে ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকেই। বর্তমান সরকার বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতোমধ্যে যথাযত পদক্ষেপ নিয়েছেন কিন্তু তা থেকে তাৎণিক প্রাপ্তির প্রকৃত ফলাফল আমাদের অনেকটাই অজানা। কারণ বিদ্যুতের তাৎণিক উৎপাদন বৃদ্ধি খুব ত্বরিৎ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ ক বছর লেগে যেতে পারে। তাহলে এখন কী করবে জনগণ? বিদ্যুৎ সমস্যার সঙ্গে ধাতস্থ হবে? যে ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের সার্বিক অগ্রগতি নির্ভরশীল তার জন্য কী বিশেষ বিবেচনা আছে সরকারের? বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিজস্ব বোধে গুরুত্বসহকারে ভাবা দরকার।

সূত্র মতে, সরাদেশে বর্তমান বিদ্যুতের চাহিদা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কিন্তু গড়ে উৎপাদন হচ্ছে ৩৩০০ মেগাওয়াট। কী সমন্বয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে তার প্রকৃত ধারণা না থাকলেও এক ঘন্টা পর পর বিদ্যুতের আগমন-নির্গমন অনেকটাই মুখস্ত। এই যখন অবস্থা তখন বর্তমান উৎপাদনে ব্যবহৃত ইউনিটগুলোর কোনটি কোন কারণে বন্ধ হয়ে গেলে লোডশেডিং ও লোড লাইটিং এর অবস্থা কী দাঁড়াবে? দেশকে নিয়ে এমনিতে ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। বিনা কারণে শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করার হীন চক্রান্তকারীরা আলো-অন্ধকারে সমানভাবে জেগে আছে। তাই বর্তমান সরকারকে বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোতে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। এখানে দেশদ্রোহীদের নাশকতার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

বর্তমান সরকার দিন বদলের যে অঙ্গীকার নিয়ে জনমনে আশার সঞ্চার করেছে তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রেখে যে কোন বাধা অতিক্রম করা সময়ের দাবী। সেই দাবীর মুখে বিদ্যুৎ যেন আলোর বিচ্ছুরণে ফেটে পড়তে পারে সেজন্য বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। কার্যকর ও সময়োপযোগি ব্যবস্থা গ্রহণে লোডশেডিংয়ের অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত শিল্পকারখানা; বিশেষকরে পোশাক শিল্পে বিদ্যুৎ গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি।

পাশাপাশি সরকারী-বেসরকারী অফিসসমূহে বিদ্যুৎ খরচ শিল্পখাতের চেয়ে কম নয়। সে ক্ষেত্রে এই দু’টি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সমন্বয়সাধন জরুরী। সরকারী অফিসের বর্তমান সময়সীমা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫ টা; অন্যদিকে সকাল ৭/৮ টায় গার্মেন্টস শিল্পের কাজ শুরু হয়ে যায় এবং রাত আটটার পরেও এই কাজে নিয়োজিত শ্রমিকের একটি বড় অংশ নিয়োজিত থাকে। ফলে বর্তমানে প্রচলিত সাপ্তাহিক ছুটি ও অফিসের সময়সীমা সমন্বয়সাধনপূর্বক পুণনির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারনে সরকারী অফিসেও রাত ৯/১০টা পর্যন্ত কাজ করার দৃশ্য অপরিচিত নয়। এ ক্ষেত্রে সচিবালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরসমূহের কাজের সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। সচিবালয় থেকে অধিকাংশ দফতরের দূরত্ব বেশি হওয়ায় নির্ধারিত-অনির্ধারিত সভা, তদবীর, নির্দেশনার কাজে সেখানে যাওয়া-আসায় অফিস সময়ের অনেকটাই শেষ হয়ে যায়। ফলে দফতরে ফিরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে প্রায় প্রতিদিনই অতিরিক্ত সময়ে কাজের প্রয়োজন হয়। তবে সবাইকে নয় কিছু কর্মচারীকে। ফলে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা লক্ষ্যণীয় তা হলো, যে সব ফ্যান, টিউব কিংবা এসি এক রুমে ৫/৭ জন মিলে অফিসসময়ে ব্যবহার করছে তা অনেকক্ষেত্রে একজনের জন্য ব্যবহৃত হয়। বেসরকারী কিংবা বিদেশী সংস্থাগুলোতে সাধারণত সকল পর্যয়ের কর্মকর্তার জন্য একটি বিস্তৃত পরিসর ব্যবহার করা হয়। যেখানে অফিস প্রধান থেকে অন্যান্য অধস্তন কর্মকর্তাদের একত্র অবস্থান সুবিন্যাস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিকেন্দ্রিকরণ করা সম্ভব হয়।

সরকারী অফিসসমূহে এক এক পদমর্যাদার কর্মকর্তার এক এক অফিসকক্ষ থাকার কারণে কেন্দ্রিভূত ব্যবহারে অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিরূপ আবহাওয়ায় বাংলাদেশেও উষ্ণতার প্রভাব লক্ষ্যনীয়। তাই এসি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়তো সম্ভব নয়; তবে বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যে সম্ভব তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবার বিষয় হচ্ছে, অফিসের নির্ধারিত সময় খুব যৌক্তিক কারণ ছাড়া বাড়ানো যাবে না। সচিবালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরসমূহের সমস্ত কাজ নির্ধারিত সময়েই সম্পাদন করতে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং উৎপন্ন এ বিষয় দুটি ভিন্ন হলেও কোনভাবেই তা সাংঘর্ষিক নয়। উৎপন্ন সময়সাপে বিষয় তবে সিদ্ধান্ত দেয়া বা নেয়া একটি তাৎণিক বিষয়।

আমাদের পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে গেল বাজেট প্রণয়নের সময় নিজস্ব কিছু আর্থিক ঘাটতির কারণে বড় বড় হোটেল এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোক সজ্জা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আমাদের দেশেও এ রকম কিছু সদ্ধান্ত নেয়া জরুরী। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কিছু না কিছু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের পদক বিতরণ, কথায় কথায় সংবর্ধনা প্রদানের নামে ব্যবসার বিষয়টি বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং তাতে বিদ্যুতের একটি মোটা অংশ ব্যবহার হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, আর্থিক ফরমালিটিসসহ অন্যান্য বিষয়গুলো সম্পন্নের পরেই তারা শহরের যে কোন হলে এসব অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। তাহলে বার থাকবে কেন? যেখানে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সময় নির্ধারণ করা হয় সেখানে উল্লেখিত বিষয়টি কোন গুরুত্বের পর্যায়েই পড়ে না। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান এ ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। ফলে এ জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে অনুমতি নেয়াসহ গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু নীতিমালা গ্রহণ প্রয়োজন। এত এত সংবর্ধনা কিংবা পদক বিতরণের সত্যিই কী প্রয়োজন আছে? অন্তত যতদিন বিদ্যুৎ বিতারণের উন্নতি না করা যায়। প্রতি ধর্মই তো কৃচ্ছতা সাধন করতে বলেছে। সুতরাং তা মানতে অসুবিধা কোথায়?

বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেমন ঘাটতি আছে তেমনি আছে বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি। যে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিদ্যুতের সিস্টেমলস কমানো সম্ভব তার জন্য জরুরী পদক্ষেপ নিতে বাধা কোথায়? প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার কথা বহুদিন ধরে শুনে আসছি। যদি সার্বিক বিতরণে প্রিপেইড ব্যবস্থা চালু করা যায় তবে বিদ্যুৎ চুরি, অপচয়ের হার অনেকাংশে কমে আসবে। বিদ্যুৎ ঘাটতির বর্তমান অবস্থার উন্নতী হতে বাধ্য। যা দিয়ে বর্তমান ঘাটতির একটি বড় অংশ পুরণ করা সম্ভব।


মন্তব্য

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

চলুক

সময়োপযোগী পোস্ট। সরকারকে শুধু একদিকে নজর নয়, সবদিকেই নজর দিতে হবে। বিশেষত যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক মামলা নিয়ে যেন সরকারের সব মহল জড়িয়ে না পড়ে। নিজেদের কাজও ঠিকঠাক মতো চালিয়ে নিতে হবে।

শেখ নজরুল এর ছবি

সবদিকে খেয়াল না রাখলে পস্তাতে হবে। বিষয়টি নিশ্চয় শেখ হাসিনার সরকার অনুধাবন করবেন। ধন্যবাদ আপনাকে।

শেখ নজরুল

শেখ নজরুল

নহক এর ছবি

এখন তো দু ' ঘন্টা থাকেনা একবার গেলে ।

ভাল লেখা । কিন্তু লাভ কি ? পত্রিকায় এরকম লেখা অনেক বের হইছে আর হবে । কিন্তু সরকার খালি ঘড়ির কাটা নিয়া টানাটানি করে । ধুর্ ।

ভাই তাড়াতাড়ি হাসিনা নানিরে কেউ হাচল বানান ।

শেখ নজরুল এর ছবি

আপনার কথাই ঠিক। সত্যিই তো লিখে কোন লাভ হচ্ছে না।
শেখ নজরুল

শেখ নজরুল

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

আব্বা আমার কথা শুনে খারাপই লাগে। গ্যাস নাই, বিদ্যুৎ নাই - শুনলেই খুব কষ্ট লাগে।

====
চিত্ত থাকুক সমুন্নত, উচ্চ থাকুক শির

শেখ নজরুল এর ছবি

জ্বি মুর্শেদ ভাই। তবু ভালো থাকবেন।

শেখ নজরুল

শেখ নজরুল

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।