ফোটো ফেস্টিভ্যাল ছিল ক'দিন আগে। সেখানেই শুনেছিলাম ক্যানন ফোটো ম্যারাথন বলে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে যাচ্ছে ১লা নভেম্বর। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ ছিল, কিন্তু আলসেমী করে ডেডলাইন মিস করলাম। অবশ্য ওয়েবসাইট ঘাটতেই মনটা ভালো হয়ে গেল, জানা গেল ইভেন্টের দিন সকালেও নাম লেখানো যাবে এবং ক্যানন ক্যামেরাওয়ালাদের জন্য নিবন্ধনের ১৫ রিঙ্গিত মার্জনা করা হয়েছে। আহ! মিস হল না তাহলে, হাপ ছেড়ে আমি প্রতিযোগিতার ওয়েবসাইট গুঁতিয়ে যেতে থাকি।

ফোটো ম্যারাথন দিনব্যপী প্রতিযোগিতা। সকাল আটটায় শুরু হবে, শেষ রাত আটটায়। তিনটা পিটস্টপ, টাইমস স্কয়ার মল, প্যাভেলিয়ন মেগামল, আর সুরিয়া কেএলসিসি মল। প্রত্যেক পিটস্টপে একটা করে থিম দেওয়া হবে। প্রত্যেক থিমের উপরে একটা করে ছবি জমা দিতে হবে সন্ধ্যা ছটার মধ্যে। প্রতিযোগিতা হবে ডিজিটাল কমপ্যাক্ট ও ডিজিটাল এসএলআর - এই দুই গ্রুপে। ফোটো ম্যারাথন মালেসিয়ার আগে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড আর ফিলিপিন্সে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। মালেসিয়ার জন্য ঠিক করা হয়েছে ১ তারিখ। হাজির হতে হবে সকাল ৭টায়। আমার জন্য কাজটা দুঃসাধ্য। তারপরেও ৭টা বাইশে ঘুম থেকে উঠে ৭টা ৫৫তে ভেনুতে পৌছে গেলাম। পৌছালাম বটে, কিন্তু চোখে তখনও ঘুম। মাশীদ আমাকে পয়সা খরচ করে একটা ক্যামেরার ব্যাগ কিনে দিয়েছিল। গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে দেখি সেটা ছিড়ে গেছে। ফোটোগ্রাফার্স জ্যাকেট ছিল, গায়ে সেটাই চাপিয়ে নিলাম। তিনটা লেন্স, একটা স্পীডলাইট আর ক্যামেরা মিলে কেজি তিনেক হবার কথা। তারসাথে ক্রান্তীয় গরম! কপালে খারাবি আছে টের পেলাম।


রেজিস্ট্রেশন করলেই একটা ক্যানন মার্কা লাল টি-শার্ট আর ক্যাপ ধরিয়ে দিচ্ছে আয়োজকরা। প্রায় হাজার খানেক ছেলেবুড়ো হাজির হয়েছে টাইম্স স্কয়ারে বিভিন্ন রকম ক্যামেরা আর সরঞ্জাম সাথে নিয়ে। লাল টি-শার্ট পড়ে তারা যখন সারাটা দিন কেএল এর গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের বিভিন্ন জায়গায় জটলা করে করে ছবি তুললো তখন দেখার মতো সব দৃশ্য হল!
টাইম্স স্কয়ার থেকে অভিযান শুরু হল ১ম থিম হাতে নিয়ে। Indulge Metropolitan হল থিম। এখন এই থিম মিলিয়ে ছবি তুলতে হবে। এটা তুলি, সেটা তুলি, কিন্তু ঠিক থিমের সাথে যায় না। এগারটার দিকে পৌছালাম ২য় পিটস্টপে, সেখানে থিম দেওয়া হল Mess in Rules, থিমের চেয়ে তখন ক্ষুধা-পিপাসা বড়। এক লিটার পানি খেয়েছি ইতোমধ্যে, সেটা ঘাম দিয়ে কখন বের হয়ে গেল টের পাইনি। প্যাভালিয়নের লোয়ার গ্রাউন্ডে একটা ফুড কোর্ট আছে, দৌড়ালাম তার কোরিয়ান দোকানে। কিমচি রাইস আর আইস লেমন টি দিয়ে ব্রাঞ্চ সারলাম। পেটের সুখ মেটাতেই শরীরটা ভারী হয়ে গেল। একবার ভাবলাম কি দরকার রোদে পুড়ে ছবি তোলার, বাড়ি গিয়ে ঘুমাই। বাড়ি যাওয়া হল না অবশ্য, ৩০০ মিলিমিটারের জুম লেন্সটা লাগিয়ে আবার বের হলাম। প্যাভালিয়ন থেকে বের হতেই বেশ কিছু "চলে" মার্কা শটের জোগাড় হল। তারপর হাটতে হাটতে আবার কেএলসিসি, টুইন টাওয়ার। চড়া রোদে মেজাজ খিঁচে গেছে, পথে আরো এক লিটার পানি খাওয়া হয়ে গেছে। কোনমতে পিটস্টপ ৩-এ পৌছে থিম পেলাম Goes Green!
মনে মনে ক্যানেনর গুষ্টি উদ্ধার করে বসলাম তরমুজের রস খেতে। চড়া রোদে ভারি ক্যামেরা নিয়ে ফোটো তুলতে ভালো লাগে না, আর টেম্পারেচার যদি ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তাহলে তো কথাই নেই! ক্যামেরা নিয়ে ছায়ায় দাড়িয়ে ইতিউতি করছি। হঠাৎ গাছের উপরে দেখি কালো একটা পাখি। একটু পরে আবিস্কার করলাম প্রায় ডজন খানেক ছেলেমেয়ে কালো পাখি জটলা করছে আশেপাশের গাছে। ম্যারাথন বাদ দিয়ে পাখির ছবি তুলতে শুরু করেদিলাম। পাখির নাম এশিয়ান গ্লোসি স্টারলিং। এই পাখির বান্দরের স্বভাব, কিন্তু গলা মিষ্টি। পাখি নিয়ে ক্যাটেগরি থাকলে একটা ছবি নিশ্চয়ই উতরে যেত। পাখি পর্ব শেষ হল বেলা দেড়টায়। ম্যারাথন নিয়ে মহাবিরক্ত তখন। রোদে দৌড়াদৌড়ি করতে মোটেও ইচ্ছে করছে না। তাই টেলিফোটো নিয়ে বেঞ্চিতে বসে ফোটোশিকারের ধান্দা আটলাম। বেশী সুবিধা হল না তাতে। ধারে পাশে তখনও অনেক লাল টি-শার্টধারী। লোকজন নানা কসরত করে ছবি তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। লোকজনের গ্যাজেট-গিয়ার দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়, অধিকাংশ লোকের লেন্সের মাথায় একটা পাতলা লাল রঙ এর ব্যান্ড। L লেন্স, ক্যাননের সবচে' ভালো আর দামী লেন্সগুলোর চিহ্ন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টাইম্স স্কয়ারে হাটা দেই। ট্যাক্সি পাওয়া দুস্কর এসময়। গাড়িটা পার্ক করা পিটস্টপ ১-এ। গরমে আর পা চলেনা, রক্ষা পেলাম মনোরেলের কল্যাণে।
টাইম্স স্কয়ারে শ'খানেক পিসি আর ল্যাপটপ সাজানো, লাইন ধরে দাড়ানো সবাই, এই কম্পিউটার গুলো ব্যবহার করেই ছবি আপলোড করতে হবে। আপলোড করেই দৌড় দিলাম গাড়ির দিকে। ক্যামেরা ঘাড়ে করে আর ঘোরা সম্ভব নয়।
পাঁচটার দিকে জুঙ এর সেমিনার হল বিয়ের ছবি তোলা নিয়ে। বিদেশে বিয়ের ছবি তোলার জন্য বহুপয়সা খরচ করার চল আছে। ওয়েডিং ফোটোগ্রাফারদের কদরও সেরকম। মালেশিয়াতে জুঙ শীর্ষস্থানীয় আলোকচিত্রীদের অন্যতম যে কিনা শুধু বিয়ের ছবি তুলেই কাটায়।
এর আগেও বেশ কিছু ওয়েডিং ফোটোগ্রাফারের কাজ দেখেছি। এরা বিয়ের ছবি তোলেনা, বরং বিয়ের গল্পটা ছবিতে সাজায়, অসামান্য মুহুর্তগুলো অসামান্যভাবে ধরে রাখে আলোছায়ায়। তাই জুঙ এর ছবিতে দেখা যায় একটা সবুজ ঘাসের ডগায় ঝোলে বিয়ের আঙটি দুটো, বরকনের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাড়ির বেড়ালটা, কিংবা সেই ভিয়েতনামী দাদীর খুশির হাসি যার এর একটা দাঁত সোনায় বাধানো। জুঙ এর ছবি অসাধারন হলেও বক্তা হিসেবে সে বিরক্তিকর। হাজার খানেক লোকের ভীড়ে আমি গভীরাগ্রহে ঘুমিয়ে পড়লাম তাই অনায়াসে!
ফলাফল দিতে দিতে রাত সাড়ে নটা বেজে গেল। ততোক্ষনে সবাই প্রচন্ড শ্রান্ত, অধৈর্য্য ও বিরক্ত। তালিকাতে নিজের নাম দেখার আশা করিনি। কিন্তু দু একটা ছবি দেখে মনে হল, ছবি ততো খারাপ ছিল না। গ্র্যান্ডপ্রাইজ ছিল একটা ৪০ডি আর সাথে নিউজিল্যান্ডে ফোটো ক্লিনিকে যোগ দেবার সুযোগ। আক্ষেপ একটু করা যেত, কিন্তু আমি তখন ব্যস্ত চঙ ওয়েই-কে দেখতে! ক্যানেনর কনসুমার ইমেজিং এর বিপনন প্রধান!! এরকম পাখির মতো মেয়েটা হোমরা চোমরা মার্কেটিং ম্যানেজার চিন্তা করতেই বুকের বাঁ দিকে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়। বিয়ে না করলে মেয়েটাকে বাহকুতে খাবার প্রস্তাব দেওয়া যেত.. আহা!..
সাড়ে দশটার দিকে বাড়ি ফিরে আর নড়াচড়া করার শক্তি ছিল না। ঠিক করেছি সামনের বছরে আর যোগ দেব না ফোটো ম্যারাথনে!
উপভোগ্য বিষয়গুলো যখন যন্ত্রনার পর্যায়ে চলে যায় তখন সে তল্লাটে না যাওয়াই ভালো, যতোই সেখানে মিস চঙ এর ভুবনমোহিনী হাসি দেখবার সুযোগ থাকুক..

থিম-১ এর জন্য আমার সাবমিশন...

এশিয়ান গ্লোসি স্টারলিং এর জুটি
মন্তব্য
ছবিগুলি ভালো হইছে, বিশেষ করে থীম ওয়ানেরটা ... উপর থেকে দুই নাম্বারটাও খারাপ না
বিয়ের ফটোর ক্ষেত্রে এই মহিলার কাজ আমার বেশ ভাল্লাগে ... মহিলা এক এক দিনের জন্য মনে হয় এক হাজার ডলার করে নেয়
দেখি নিজের বিয়েতে কোন আইডিয়া কাজে লাগানো যায় কিনা
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
- তোমার থিম ওয়ান দেইখা তো মনে হয়, "হালার বহা-টহা ঠিক নাই"
___________
চাপা মারা চলিবে
কিন্তু চাপায় মারা বিপজ্জনক
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকাণ্ড । বিএসএফ ক্রনিক্যালস ব্লগ
বাল অফিস থেকে ছবি গুলা দেখা যাচ্ছে না। বাড়িত গিয়া কমেন্টামুনে।
--------------------------------------------
<ঘ্যাচাত, ঘ্যাচাত, ঘ্যাচাত> - আমার সিগনেচার
--------------------------------------------
বানান ভুল হইতেই পারে........
ভালো লাগল বিষয়টা জেনে। আমাদের দেশেও এরকম কিছু একটা হলে মন্দ নয়।
প্রথমন ছবিটাতো সুন্দর লাগছে। আমি অবশ্য থিম জাতীয় জিনিস ঠিক বুঝতে পারিনা। তাই থিমের সাথে গেছে কিনা তা বলতে পারছিনা।
স্টার্লিংএরটা খুবই চমৎকার হয়েছে।
ছবি আমি তেমন বুঝিনা ... ভালই তো লাগল।
--------------------------------------------------------

নতুন মন্তব্য করুন