জনপ্রতিনিধি সঙ্কট

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৯/১০/২০০৮ - ৪:০২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ফুটবল খেলার মাঠগুলোর পাশে কেন যেন সবসময় বদমেজাজী লোকজনের বাড়ি থাকে। আর তাদের বাড়িতেই হঠাৎ হঠাৎ পাঁচিল টপকে বল গিয়ে পড়ে।

তো এমনি এক বেমক্কা শট মেরে জনৈক বদমেজাজীর চৌহদ্দিতে বল পাঠিয়ে দিয়ে আমরা মহামুশকিলে পড়লাম। কী করা যায়? আমরা এখন আর ছোট নই, রীতিমতো ধাড়ি, বিয়েশাদি করা ছেলেপেলেও আছে আমাদের মধ্যে দুয়েকজন, এই বয়সে কে যাবে ঐ ঝাড়ি খেয়ে বল আনতে? মান অপমান বোধ তো সবারই আছে।

একজন প্রস্তাব দিলো, একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করা হোক খেলোয়াড়দের মাঝ থেকে। কিন্তু প্রার্থী হতে আগ্রহী পাওয়া গেলো না কাউকেই। সবাই একটু উদাস, আনমনা, বল-না-পেলে-খেলবো-না-কিন্তু-বলও-আনতে- যাবো-না ভাব চেহারায়।

শেষমেশ সবাই দেখি আমার দিকেই একমন টেরিয়ে তাকাচ্ছে। আমি অস্বস্তিতে পড়ে যাই, বলি, কী, কী দেখিস আমার দিকে এরকম ড্যাবড্যাব করে? বাড়িতে বাপভাই নাই?

সবাই গুজগুজ করতে থাকে। হুমম, হিমুটার গায়ের চামড়া অত্যন্ত পুরু মনে হচ্ছে। দুইচারটা তিক্ত কথা শুনলেও ওর কিছু এসে যাবে না। জনপ্রতিনিধি হবার জন্য আদর্শ। বলতে না বলতেই হ্যাঁ-না ভোটাভুটি শুরু হয়ে যায়, ব্যাপক ভোটে জিতে আমি জয়ী হই। আমার বিপক্ষে না ভোট দিয়েছে দুইজন, তাদের মধ্যে একজন আমার সত্যিকারের বন্ধু, আরেকজন বলের ভবিষ্যৎ ভেবে আমাকে না ভোট দিয়েছে, তার ধারণা আমি বল আনতে গেলে ঐ বলটা বটি দিয়ে কুচিয়ে ফেরত দেয়া হতে পারে, রাস্তার পোলাপানকে নাকি ঐভাবেই বল ফেরত দেয়া দস্তুর।

কী আর করা, বিষাদগ্রস্ত মনে দাঁড়াই সবার সামনে। আমাকে শপথ পাঠ করায় সকলে মিলে, যেভাবেই হোক বল হাসিল করতে হবে, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও। ঐ বাসার বুড়া মালিকের ঐতিহ্য আছে বল ও বলপ্রার্থীদের যুগপৎ আটকে রেখে বেওয়ারিশ মাল হিসেবে পুলিশে সোপর্দ করার, তাছাড়া ঐ বাড়িতে লেলিয়ে দেয়ার জন্য অভ্যস্ত কুত্তা আছে, আছে লাইসেন্স করা শটগান, জব্বারের বলী খেলায় কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট দারোয়ানসহ আরো অনেক প্রতিকূলতা, সর্বোপরি বাড়ির সিংহদরোজায় কোন ঘন্টা নেই, সেটার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক পেড়ে অভ্যন্তরস্থ লোকজনের মনোযোগ ও কুকুরের অমনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে। তবে একটি সুন্দরী ও যৌনাবেদনময়ী তরুণীও সে বাড়িতে থাকে, হতে পারে সে কাজের বুয়া কিন্তু তাতে কি, সুন্দরী ও যৌনাবেদনময়ী তো, আমি বল উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় তাকে কয়েক ঝলক দেখে ফেলতে পারি, চাই কি মুরোদে কুলালে তাকে পটিয়ে বার করে এনে নন্দন পার্কেও নিয়ে যেতে পারি নাকি।

আমি বিরসমুখে শুনি।

শপথ পাঠ করানোর পর সবাই হুড়ো দেয় আমাকে, কই, যা!

আমি দূর অস্ত বাড়ির দরজার দিকে তাকাই। তারপর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। নাহ, প্রতিনিধি যখন আমাকে নির্বাচিত করাই হয়েছে, প্রতিনিধিসুলভ আচরণই আমাকে করতে হবে। তাছাড়া শাস্ত্রে আছে, দূত অবধ্য, আমার কী ভয়?

আমি কেশে গলা পরিষ্কার করি, তারপর রাজনের দিকে ফিরে বলি, "তোর মোটরসাইকেলটা দে আমাকে!"

রাজন অতিশয় কঞ্জুস, সে সব কিছুই বাঁচিয়ে চলে, গালি পর্যন্ত গুনে দেয়, আর ওর কয়েক হাতফেরতা মোটরসাইকেলটার মতো মহার্ঘ্য জিনিস হস্তান্তর করবে আমার মতো জনপ্রতিনিধির কাছে, এ আশা করা অন্যায়। তাই ও যখন ফুঁসে উঠে প্রত্যাখ্যান করে, আমি অবাক হই না।

"মোটরসাইকেল লাগবে কেন তোর?" রাজন ওর ময়লা দাঁতগুলি খিঁচায়।

"কত দূরে বাড়িটা দেখেছিস?" আমি কপালের নিচে হাত রেখে সেই দিল্লির মতোই দূরবর্তী বাড়িটার আগাপাস্তলা খুঁটিয়ে দেখি। "পায়ে হেঁটে যাই কিভাবে? বাহন লাগবে না?"

অন্যরা একে অন্যের দিকে তাকায়। একজন দুর্বল যুক্তি দাঁড় করায়, "কী বলিস? এক শট মেরে বল ফেলে দিলাম, আর তুই বলছিস দূর? ঐ তো দেখা যায় ---!"

আমি উদাস হাসি। বলি, "ওরে, আসমানের চাঁদও তো দেখা যায়! কোনদিন চাঁদে না বল পাঠিয়ে দিস এক শট মেরে। তাছাড়া বেশি কিছু চাইনি আমি। আইনপ্রণেতা জনপ্রতিনিধিদের মতো বিনাশুল্কে গাড়ি তো চাইনি। স্রেফ মোটরসাইকেল, তাও পুরানা! ভেবে দ্যাখ, মোটরসাইকেলে চড়ে গেলে একটা মানসম্মান থাকে, হয়তো চাওয়ার আগেই বল দিয়ে দেবে!"

সবাই নিমরাজি হয়, একা রাজনটা গজগজ করতে থাকে। আমি ওকে আশ্বস্ত করি, "আরে ভাই এমপিদের মতো বেচে দিবো না তোর মোটরসাইকেল! খালি যাবো আর আসবো! এটুকু মেনে নিতে তোর হোগা জ্বলে?"

রাজন দাঁত কিড়মিড় করে চাবিটা দেয় আমার হাতে।

আমি তবুও আনমনে কী যেন ভাবি। ওরা হুড়ো দেয়, "যা এবার! দাঁড়িয়ে আছিস কেন খাম্বার মতো?"

আমি শিবলির দিকে তাকাই। "দোস্ত তোর ক্যামেরাঅলা মোবাইলটা দে!"

শিবলি সিঁটিয়ে যায়, "যা ভাগ! মোবাইল দিয়ে তুই কী করবি?"

আমি অভিমান করি। "মোবাইল দিয়ে কী করবো মানে? ফুটানগি দেখাবো, আবার কী? তাছাড়া ওরা ... ওরা যদি সত্যি সত্যি কুত্তা ছেড়ে দেয়, শটগান দিয়ে গুলি করে, দারোয়ান দিয়ে প্যাঁদায়, ওগুলোর একটা প্রমাণ লাগবে না? তাই ক্যামেরাঅলা মোবাইল। তাছাড়া আটকে রাখলে আমিই পুলিশের ছোটবোনকে ফোন করবো, তোরা তো জরিনাকে চিনিসই ... ঐ যে ডিআইজির ছোট বোন ...।"

শিবলি রাজি হয় না, ওর এতো শখের মোবাইল।

আমি রাগ করি। "আরে ভাই আমি তো সাংসদদের মতো কোটি কোটি টাকা ফোনবিল বাকি রাখার আব্দার করি নাই! বড়জোর পাঁচসাত টাকা বিল উঠবে! তা-ও তোরা এমন করিস? মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বল উদ্ধার করতে যাচ্ছি, তবু তোরা কান্টামি করিস বাল!"

বাকিরা গুজগুজ করে, শিবলি মুখ গোঁজ করে ওর ঝাক্কাস মোবাইল সেটটা বাড়িয়ে দেয়।

আমি সেটাও পকেটস্থ করে দাঁড়িয়ে থাকি। তারপর আরো কিছু নিখাদ যুক্তির প্রকোপে রাশেদের সানগ্লাস, মাহমুদের ব্রেসলেট আর মুন্নার গলার মোটাসোটা চেনটাও বাগাই। ওরা দাঁড়িয়ে থাকে আশা নিয়ে।

সবকিছু নিয়ে রওনা হতে যাবো, এমন সময় ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে তেলেভাজার শব্দ আর ঘ্রাণ যথাক্রমে কানে ও নাকে ভেসে আসে। গুনগুন করি, ভেসে আসে সুদূর পুরির সুরভী হায় সন্ধ্যায় ...। সবাই অগ্নিদৃষ্টি হানে আমার দিকে।

আমি অসহায় হয়ে পড়ি। "আরে বাবা কয়েকটা ডাল পুরি আর কয়েককাপ চা-ই তো খাওয়াবি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মতো কোটি টাকার বাজার তো আর করে দিতে বলছি না। এই সামান্য কাজটুকু করে দিবি না তোরা?"

এরপর সবাই ফুঁসে ওঠে। বলে, বল নাকি আর লাগবে না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, খেলা ডিসমিস। একে একে যে যার মালসামানা ফিরিয়ে নিতে উদ্যত হয়। আমার একটু মন খারাপ হয়, বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি যে জনপ্রতিনিধিদের কিছু কিছু সুবিধা দিতে হয়, নইলে কাজ উদ্ধার হয় না, কিন্তু ওরা যেন কেমন, এদেশে বাস করেও এই নিকষিত সত্য কথা মানতে চায় না।

আমাদের খেলা ভেস্তে যায় সেদিনের মতো।



পুনশ্চঃ বহু আগে অন্যত্র প্রকাশিত। তবে পরিস্থিতি পাল্টায় নাই, তাই এখনও প্রযোজ্য।


মন্তব্য

অভিজিৎ এর ছবি

এটা কি কনভার্ট করা হয়েছে অন্য কোন ফন্ট থেকে? কয়েকটা শব্দ ছ্যাদরাইয়া গেছে। আমার যেমন বর্ণসফট থেকে কনভার্টের পর হয় হরহামেশাই...।



পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)


পান্ডুলিপি পোড়ে না। -- বুলগাকভ (মাস্টার এন্ড মার্গেরিটা)

হিমু এর ছবি

আপনি কমেন্ট করতে করতেই সংশোধিত, বস। আবার পড়েন চোখ টিপি


হাঁটুপানির জলদস্যু

অমিত আহমেদ এর ছবি
প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

আমিও তাই ভাবছিলাম, বলের দরকার নাই।

সংসারে এক সন্ন্যাসী এর ছবি

লেখাটা পুরোপুরিই হিমুয়িত। দুর্দান্ত!

‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍মনে পড়লো অনেক আগে পড়া একটা কৌতুক:

- রবি ঠাকুর কি ফুটবল খেলতেন?
- হ্যাঁ। কারণ তাঁর একটি কবিতায় আছে, "বল দাও মোরে বল দাও"।

পরে আমি ভেবে দেখেছি, তিনি বর্ষার রাতেও ফুটবল খেলতেন। ওই যে একটা গান আছে না তাঁর: "আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে কী এনেছিস, বল?" দেঁতো হাসি

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
টাকা দিয়ে যা কেনা যায় না, তার পেছনেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় কেনু, কেনু, কেনু? চিন্তিত

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

গড়াগড়ি দিয়া হাসি

হিমু এর ছবি
কনফুসিয়াস এর ছবি

দুর্দান্ত!

-----------------------------------
... করি বাংলায় চিৎকার ...

-----------------------------------
বই,আর্ট, নানা কিছু এবং বইদ্বীপ

ভাঙ্গা মানুষ [অতিথি] এর ছবি

আহা, আমি আরো মনে করলাম, কাহিনী নন্দন পার্ক পর্যন্ত গড়াবে!!

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

মাইর যে দেয়নাই তাই তো রক্ষা... পাব্লিকের মাইর দুনিয়ার বাইর...
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

রণদীপম বসু এর ছবি

এইখানেই যদি গল্প শেষ হয়, তাইলে আমি মানি না।
বল উদ্ধার না হইয়া গল্প শেষ হয় কেমনে ? এইসব স্বেচ্ছাচারিতা চলবে না ! চলবে না !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

অতন্দ্র প্রহরী এর ছবি

খুবই চমৎকার একটা লেখা।
_______________
বোকা মানুষ মন খারাপ

ভূঁতের বাচ্চা এর ছবি

ঐ বাড়ির বুড়ার চরিত্র বিবেচনায় আমার মনেহয় আপনিই চিলেন উপযুক্ত ব্যক্তি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবার মতন আরকি। এক ত্যাদোড় দিয়ে আরেক ত্যাদোড় ঘায়েল বলতে পারেন। হেঃ হেঃ।

--------------------------------------------------------

রানা মেহের এর ছবি

অতি চমতকার
-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।