শব্দগল্পদ্রুম ০৯

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: রবি, ২১/০৭/২০১৯ - ১১:০৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

শব্দ সম্পর্কে আমাদের সবার মনের দরজার ভেতরের কপাটে নিজস্ব (অনবশ্য স্বকীয়) একটা রায় পেরেক মারা আছে। যখন আমরা একটা অচেনা শব্দ (যেমন এর আগের বাক্যে অনবশ্য (= not necessarily, অনাবশ্যকের সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবে না) পড়ি বা শুনি, মনের দরজা লাগিয়ে ঐ রায়টা আমরা একবার পড়ে নিই। প্রতিটি শব্দ আমাদের প্রতি জনের সে রায়ের জোরে বাঁচে, বন্দী থাকে, সমাহিত হয়, পুনর্জীবন পায়।

লোক ভিন্ন তো চোখ ভিন্ন, তাই শব্দগুলো সমাজের একেক জায়গায় একেক মাত্রায় সমাদর পায়। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জ্ঞানী হবেন, এমন আশা সমাজে প্রচলিত; তাঁদের শব্দসম্ভারও তাই হবে প্রস্থবিপুল আর গভীরতাসংকুল, তাঁদের এক একটি বাক্য হবে চিন্তার একেবারে ঠিক ছটায় (Shade) রাঙানো সব শব্দে বলীয়ান। রিকশাওয়ালা মূর্খ হবে, এমন আশাও সমাজে কম প্রচলিত নয়, তাই তাদের সাথে যোগাযোগের জন্যে দশ-বারোটা শব্দেই আমাদের কাজ চলে যায়। কিন্তু আমাদের জীবনের বড় অংশ যদি রিকশাওয়ালার সাথে আলাপেই কেটে যায়, যে কুয়োর মাপে আমরা যে যার আকাশ দেখি, সেটার ব্যাসও বারো শব্দে গিয়ে ঠেকবে। আমরা তখন হয়তো ইতিহাসবিদের মুখে ত্রয়োদশ শব্দটি শুনে কিংবা দার্শনিকের লেখায় চতুর্দশ শব্দটি পড়ে তৃপ্ত বিদ্রুপ নিয়ে মনের-দোরের-ভেতর-কপাটে আঁটা রায়টা সামনে আনবো।

ভাষার মূল কাজ বোধগম্য যোগাযোগ (যোগ আর অযোগ, দুই-ই) প্রতিষ্ঠা, এই অজুহাতে অনেকে বাংলা ভাষাকে সহজ, সরল, অনায়াসোচ্চার্য, যুক্তাক্ষরবিবর্জিত, মোটের ওপর বালকবোধ্য রাখতে চান। ভাষার মূল কাজ কি শুধু অশিক্ষিত রিকশাওয়ালা বা স্বল্পশিক্ষিত বালকবালিকার সাথে যোগাযোগ করা? দু'জন শিক্ষিত মানুষের মাঝে শীলিত আলোচনার ৯৯% সুযোগ যদি একটা ভাষায় না থাকে, সে ভাষার শিক্ষিতদের কাছ থেকে উত্তর চাওয়া প্রয়োজন।

পড়ছিলাম জেমস লিপ্টনের অ্যান এগযালটেশন অফ লার্কস। ইংরেজি ভাষার এক অনন্য(?) বৈশিষ্ট্য নিয়ে লিপ্টন ইতিহাস আর সুকুমারের কথা ধার করে বললে "রাশি রাশি গদ্যপদ্যদর্শনসাহিত্য" ঘেঁটে বইখানা লিখেছেন। সমাহারবাচক শব্দ, ইংরেজিতে যাকে বলে Terms of Venery। সুরসিক লিপ্টন এ বিষয়ে প্রথম আলোচনাগ্রন্থ রচনার দাবি করে সবিনয়ে শব্দগুলোর পরিচয়বাচক নাম রাখার স্বাধীনতা চেয়ে নিয়ে এদের Venereal Terms বলেছেন; বলাই বাহুল্য, তাঁর আনন্দ ভিনিরিয়াল (=যৌনসঙ্গম বা যৌনাকাঙ্খা সংক্রান্ত; বিশেষণ) শব্দটির প্রচলিত অর্থের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে যমক (Pun) সৃষ্টিতে। পাঠকের সাথে এক মধুর প্রতারণা করে তিনি বইটির উপনাম রেখেছেন, ওয়েলকাম টু দ্য ভিনিরিয়াল গেইম। ভিনিরিয়াল গেইম এখানে যৌনক্রীড়া নয়, বরং শব্দ তৈরির খেলা।

ভেনেরি শব্দটি দিয়ে শুধু যৌনসম্ভোগ বোঝায় না, এর আদি অর্থ শিকার। প্রেমের দেবী ভিনাস যে মূল থেকে, ভেনেরির ভেনও সেখান থেকেই। শিকার এখানে আমলোকের পশুবধ নয়, বরং কামনা করা, আর সে কারণেই তাড়া করা। সামন্ত ইংরেজ সমাজে রইসঘরের ছেলেপুলের জীবনে শিকারের এক বড়সড় ভূমিকা ছিলো, এবং তার পুরোটাই বনে সীমিত ছিলো না। শিকার করে লাভ কী, যদি এ নিয়ে একটু ফুটানিই না মারা যায়? ইংরেজের বনে বড়সড় শিকার খুব একটা মিলতো না, হরিণ-নেকড়ে-শূকর ছাড়া তার শখের বলি হতো শশারু (=Hare) - গোরখুদিনি (=Badger) - তুষারনকুল (=Marten) ইত্যাদি বিবরচারী আর শাখাচারী জন্তু, আর এর বাইরে পাখি। কিন্তু এক রইস যখন অন্য রইসের সাথে ভোজে বসে শিকার নিয়ে আলাপ করতো, নিজের জিঘাংসাযজ্ঞের মেধ পশুটির আকারের হ্রস্বতা সে পুষিয়ে দিতো নিজের বাকচাতুর্যের দৈর্ঘ্যে।

কয়েকটা নেকড়ের সমাহারকে কী বলবেন আপনি? নেকড়ের পাল। বাংলায় পাল গরুরও হয়, ছাগলেরও হয়, ভেড়ারও হয়। আবার যে কোনো পাখি বা মাছের সমাহারকে আমরা বলি ঝাঁক। গাছের ক্ষেত্রে বলি -রাজি, -সারি, -দল, -বীথি। এখানেই (হয়তো) আমাদের ভিনিরিয়াল গেইম খতম। সমাহারবাচকতাকে এর বেশি আমরা ঘেঁটে দেখিনি, সম্ভবত ইংরেজি ছাড়া আর কোনো ভাষাতেই আমাদের চেয়ে বেশি ঘাঁটা হয়নি (জার্মানে হয়নি সেটা জোর দিয়ে বলতে পারি, যতদূর জানি ফরাসি বা হিসপানিতেও নেই)। ওদিকে পঞ্চদশ শতকে আধখানা দ্বীপের কিছু লোক এই সমাহারবাচক শব্দের উদ্ভাবনে খুঁজে নিয়েছে এক স্বতন্ত্র আমোদ। ইংরেজিতে প্রায় প্রতিটি পরিচিত প্রাণীর জন্যে আলাদা সমাহারবাচক শব্দ বা ভিনিরিয়াল টার্ম আছে। ব্যাপারটা পঞ্চদশ শতকেই বিরাট সাড়া পেয়েছিলো, এবং চর্চাটা পরবর্তী পাঁচশো বছরে থেমে থাকেনি, কখনও ক্ষীণ কখনও বেগবতী ধারায় বয়ে চলেছে। একগাদা নেকড়ে তাই আ রুট অফ উল্ভস, একপাল গোরখুদিনি ওদিকে আ সেট (Cete) অফ ব্যাজারস, একঝাঁক পাতিকাক আ মার্ডার অফ ক্রোওজ, একঝাঁক দাঁড়কাক আবার অ্যান আনকাইন্ডনেস অফ রেইভেন্স।

১৪৫০ সালেই অন্যের-পাছার-চামড়া-ভেজে-তেল-বের-করা এই আংরেজ সামন্তরা নিজেদের মাঝে ফুটানির সুবিধার্থে দলিল প্রকাশ করে নিয়েছিলো, দ্য এগারটন ম্যানুস্ক্রিপ্ট। ১৪৮৬ সালে প্রকাশিত হয় দ্য বুক অফ সেইন্ট অ্যালবানস, যেখানে এমন আরো শ'খানেক সম্প্রসারিত সমাহারবাচক শব্দ ঠাঁই পায়। এ শব্দগুলো সামন্ত সমাজে শুধু আমোদের জন্যেই টিকে থাকেনি, এক ধরনের সাংস্কৃতিক লিটমাস (Shibboleth যাকে বলে) হিসেবে এগুলো কাজ করতো। শার্লক হোমস থেকে হাত ধুয়ে ফেলে আর্থার কোনান ডয়েল লিখেছিলেন এক বড়সড় ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস, স্যার নাইজেল, যার পটভূমি চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি, সামন্ত সমাজের কিছু চরিত্র ঘিরে। তরুণ স্যার নাইজেল সেখানে এক প্রাজ্ঞ অশ্ববীর (=Knight) স্যার জন বাটসথর্নের কাছ থেকে তালিম নিতে গিয়ে সমাহারবাচক শব্দের ওপর ভাইভা দেন কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে। স্যার জনের উদ্বেগ কল্পিত নয়, বরং দলিলসমর্থিত, এসব সমাহারবাচক শব্দ ভুলে গেলে, বা তারচেও ভয়ানক, গুলিয়ে ফেললে, রইসসমাজে স্যার নাইজেল মুখ দেখাতে পারবে না। দ্য বুক অফ সেইন্ট অ্যালবানসের রহস্যময়ী লেখিকা ডেইম জুলিয়ানা বার্নার্স (যাকে পরবর্তী গবেষকরা কাল্পনিক চরিত্র ভেবেছেন) একই সুরে বলেছেন, এসব না জেনে সুসংস্কৃত পরিসরে গেলে চৌধ্রিবাড়ির ছেলেদের নাক কাটা যাবে, লোকে তাদের ক্ষ্যাত ভাববে।

হয়তো এই ভয়েই ইংরেজ রইস সমাজে শব্দগুলো টিকে গেছে চর্চাটার সাথে। অসংস্কৃত বলে নাম রটুক, কেউ চায় না। ইংরেজ যখন বাকি দুনিয়াটাকে নিংড়াতে দেশ ছেড়ে বেরিয়েছে, এই চর্চাটাকে সে সঙ্গে রেখে পুষ্ট করেছে। ইংরেজিতে তাই অ্যান অবস্টিনেয়সি অফ বাফলোয, আ ব্লোট অফ হিপোয, আ বাস্ক অফ ক্রোকোডাইলসের মতো সমাহারবাচক শব্দ যোগ হয়েছে। ব্যাপারটা এখন এমন পর্যায়ে গেছে, নানা অবস্থার জন্যে নানা শব্দ আছে; যেমন পেঙ্গুইন যখন ডাঙায় থাকে, তখন তাদের সমাহারকে বলা হয় আ ওয়্যাডল অফ পেঙ্গুইন্স, যখন পানিতে সাঁতরায় তখন আ র‍্যাফ্ট অফ পেঙ্গুইন্স। নেকড়ের দল যখন শিকারে বেরোয়, তখন সেটা রুট ; "ঘরে" বসে থাকলে আবার ডেন অফ উল্ভস, সাধারণভাবে বললে প্যাক অফ উল্ভস।

যারা পরীক্ষার জন্যে শব্দ মুখস্থ করে, তাদের জন্যে এ এক বিষম আপদ। যাদের পরীক্ষার তাড়া নেই, তাদের জন্যে এ এক খেলা তো বটেই। বিশেষ করে সমাহারবাচকতা যখন শুধু শিকার আর প্রাণীর গণ্ডিতে আটকা পড়ে নেই, বরং নানা পেশা, চরিত্র, বস্তু, এমনকি ধারণার জন্যেও পুরোদমে চালু হয়ে গেছে। একদল হৃদবদ্যি? আ ফ্লাটার অফ কার্ডিওলজিস্টস। একদল অস্থির বদ্যি? আ ব্রেইস অফ অর্থোপেডিস্টস। একদল শরীরবদ্যি? A Corps of Anatomists.

লিপ্টন সমাহারবাচকতার এই রংমাতাল ভুলভুলাইয়ার মাঝে গভীর আক্কেল, সরসতা, আর কবিত্বের খোঁজ পেয়েছেন। এ শুধু শব্দ নিয়ে খেলাই নয় (কোর অফ অ্যানাটমিস্টের ক্ষেত্রে শুধু বানানের একটা e গাপ করে দিয়ে শারীরতত্ত্বের সাথে মৃতদেহ বা Corpse এর ছবিটা পাশাপাশি রেখে দেখানো খুব, খুব, খুব কঠিন কাজ; মেনজা সোসাইটি থেকে এ শব্দটা প্রস্তাব করা হয়েছিলো), বরং একটা শব্দের ধারণাকে ভিন্ন আর একটি মাত্র শব্দের কখনও উচ্চারিত রূপ, কখনও লিখিত রূপ, কখনও বা আবার দুটোর সমন্বয়ে শুষে নেওয়া। রবার্ট ফ্রস্ট একেই কবিতা বলেছিলেন। যখন পেঙ্গুইন নিয়ে কথা হবে ইংরেজিতে, ওয়্যাডল বললেই পাঠক ডাঙায় থপথপিয়ে স্বকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে যাওয়া পেঙ্গুইনের পাল (নাকি ঝাঁক?) বুঝে নেবেন, পরের অনুচ্ছেদে শুধু র‍্যাফ্ট শব্দটিই তাঁকে বুঝিয়ে ছাড়বে, এবার পেঙ্গুইনরা জলে নেমেছে।

লিপ্টনের বইটি শুধু পাঁচশো বছর ধরে প্রণীত এ শব্দ থেকে বাছা বাছা কয়েকশ শব্দের সংকলনই শুধু নয়, বরং এমন আরও শব্দ প্রণয়নের জন্যে পাঠকের কাছে লেখা দারুণ সুললিত বাক্যে ছাওয়া শব্দবিপ্লবের ইশতেহার। কিছু শব্দ পড়ে তিনি নিজেই ধন্ধে পড়ে আরো গবেষণা করেছেন (যেমন আ সাটলটি অফ সার্জেন্টস; সার্জেন্টদের নাম সাধারণত সূক্ষ্ম আকারইঙ্গিতের জন্যে ফাটে না, এমন সার্জেন্টের দেখা লিপ্টন পাননি জীবনে। অনেক ধুলো ঘেঁটে শেষমেশ তিনি জেনেছেন, পাঁচশো বছর আগে আইনজীবীদের উপাধি ছিলো সার্জেন্ট।), কিছু শব্দের মাঝে পুরনো ইংল্যাণ্ডে কোনো বিশেষ প্রাণী বা পেশাকে কী চোখে দেখা হতো, সেটার আভাস পেয়েছেন (যেমন আ স্কাল্ক অফ ফক্সেস দিয়ে শেয়ালের পাল বা আ স্কাল্ক অফ থিভস দিয়ে চোরের পাল বোঝানো হয়; কিন্তু দ্য বুক অফ সেইন্ট অ্যালবান্সে আ স্কাল্ক অফ ফ্রায়ার্স বলে ভুক্তি আছে। আরো আছে আ সুপারফ্লুয়িটি অফ নান্স। ক্যাথোলিকদের সাথে একটা গিয়ানজামের আভাস একেবারে উদোম হয়ে ফুটে আছে অ্যান অ্যাবোমিনেব‌্ল সাইট অফ মঙ্ক্সে)। সেইসাথে একটু একটু করে সুতো টেনে আর ছেড়ে তিনি পাঠকঘুড়িকে এমন এক দমকা বাতাসে উড়িয়েছেন, যার স্বাদ পেলে এমন আরো শব্দ প্রণয়নই স্বাভাবিক জীবনচর্চার অংশ বলে মনে হয়। লিপ্টন নিজে সমাহারবাচক শব্দের এক সোৎসাহ চর্চক, নিজের এবং অন্যের প্রণীত শব্দ একটি নতুন অধ্যায়ে জুড়ে তিনি পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন কৈশোরের টম সয়্যার পাঠের দিনগুলোতে; যেখানে টম বাগানের বেড়া রং করতে গিয়ে টের পায়, দর্শক বেশিক্ষণ দর্শক থাকে না, সে নিজেও আত্মহারা হয়ে পলি খালার বেড়ায় রঙের বালতি আর তুলি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এ চর্চার নানা পথ আছে, কোনটি ধরে কেন যাওয়া উচিত নয়, তা নিয়েও খানিক লিখেছেন তিনি। তাঁর মতে, হাস্যকৌতুক সমাহারবাচক শব্দের একমাত্র উপাদান বা চালিকাশক্তি নয়, এতে যোগ হতে হবে কবিত্বের উদ্ভাসনী আলো। যার সমাহার আমরা বোঝাতে চাই, তার সমাহৃত রূপটি যেন সে আলোয় নতুন চোখে দেখা যায়। নইলে এ শুধু চুটকি হবে, কবিতা হবে না। ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতাকে বলেছিলেন আবেগের প্রশান্ত স্মৃতিচারণ (emotions recollected in tranquillity), তার খানিকটা ছাপও যেন শব্দ প্রণয়নে এসে পড়ে। আ লিয়ার অফ বয়েয বা আ গিগ‌্ল অফ গার্লসের ওপর স্থানকালাতিক্রমী এক আলো এসে পাত্রসমাহারের চরিত্রের আঁটি ভেঙে শাঁসটা যেন খুলে ধরেছে। আ ফ্রস্ট অফ ডাউয়েজার্স কিংবা আ ড্যাশ অফ কমিউটার্সে ঐ ছোট্ট দুটো শব্দের মাঝেই কী ভীষণ গল্প অরিগামির মতো ভাঁজ করে রাখা, একবার ভাবুন? পোয়েট শব্দটাই এসেছে গ্রিক পোয়েসিস থেকে, যার অর্থ আগে ছিলো না এমন কিছু সৃষ্টি করা। লিপ্টন এটা উল্লেখ করতে ভুলে গেলেও পরোক্ষে এমনটাই বলতে চেয়েছেন। সেইসাথে আর সব ভাষায় যা দেখা যায় না, তা কেন ইংরেজিতে হলো, তার খোঁজও তিনি নিয়েছেন। তাঁর মতে, ইংরেজের সম্বল ভাষার নতুনত্বের প্রতি এক শিশুসুলভ আনন্দকাঙাল খোলা মন। আমিও মনে করি, নতুন শব্দ গড়ে বর্তমান ইংরেজি ভাষার পুষ্টি যাঁরা অতীতে যুগিয়েছেন (মিল্টন সবচে বেশি, এমনকি শেক্সপিয়ারের চেয়েও), তারা মনের প্রাপ্তবয়স্ক অংশটির সামর্থ্য তুলে দিয়েছেন মনের নতুনসুখী শিশু অংশের হাতে। ভাষাকে অল্প কিছু ছোট শব্দে বেঁধে বালকোপযোগী করার চেষ্টা বালকরা করে না, নিজের-শিং-ভেঙে-বাছুরের-দুঃখ-কমাতে-চাওয়া ধেড়েরাই করে। কৌতূহল যেখানে ভাড়াটে খুনীর হাতে মারা পড়ে, সৃজনশীলতা সে পাড়ায় যায় না।

লিপ্টন বইটা লেখা শুরু করেছিলেন ১৯৬৮ সালে, সমকালীন সমাজের ভাষাচর্চা নিয়ে খেদ ছিলো তাঁর মনে, তিনি Antilexic বলে ঝাল ঝেড়েছেন এর ওপর। আবার কয়েক বছর পর বইয়ের পরবর্তী সংস্করণের আগে পাঠকের কাছ থেকে চমৎকার সব নতুন সমাহারবাচক শব্দ পেয়ে উল্লাস আর উচ্ছ্বাস ঢেলেছেন কলমে। তাঁর খেদের খানিকটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

Our language, one of our most precious natural resources in the English-speaking countries, is also a dwindling one that deserves at least as much protection as our woodlands, streams and whooping cranes. We don’t write letters, we make long-distance calls; we don’t read, we are talked to, in the resolutely twelve-year-old vocabulary of radio and television. Under the banner of Timesaving we are offered only the abbreviated, the abridged, the aborted. Our Noble Eightfold Path consists entirely of shortcuts.

লিপ্টনের বইটিতে যে সারবার্তা আছে আমাদের জন্যে, তা হচ্ছে, ভাষার সৃজন প্রক্রিয়া থেমে নেই, এটা খুব বড়জোর আমাদের চোখের আড়ালে, মন্থরগতিতে হয়ে আসছে। ভাষা একটা জড়, অভিধানের-কয়েকশ-পৃষ্ঠায়-বন্দী ব্যাপার না। ভাষা একটা বিপুল চলমান কবিতা, অভিধান তার হঠাৎ-ছবি (snapshot)। অভিধানপ্রণেতা শব্দ তৈরি করেন না, সংগ্রহ করেন। শব্দ তবে কে তৈরি করে? করেন কবি, কারণ আক্কেল-সরসতা-কৌতূহল-নতুনআলোকপাতের তিনিই চূড়ান্ত Chimera। তাঁর মনের ভেতরের দরজায় শব্দ নিয়ে কোনো রায় সাঁটা নেই, একটা খাঁ-খাঁ শূন্যতা আঁকা আছে। প্রত্যেক সফল কবিতাই তাই মন্থর মাতৃহননের উচ্চাশা নিয়ে সে শূন্যতাযোনি। পর্বের শেষ কথাটা আমাদের আংরেজিকাতর বাস্তবতার ছোট্ট প্রতিফলন করে আংরেজিতেই শুরু করি, Everybody wants to be a poet because there are so few of them। বাংলা ভাষা কতটা সমৃদ্ধ, সে বিচারের রায় কবিরা লিখে চলুন।

দ্রষ্টব্য:
লিপ্টনের বইটা হাতে পড়ার কয়েক বছর আগে একটা বড় উপন্যাসের অংশ হিসেবে কয়েকটি সমাহারবাচক শব্দ প্রণয়ন করেছিলাম, তার একটি উল্লেখ করতে চাই। সামুদ্রিক ডলফিনের পাল (নাকি ঝাঁক?) বোঝাতে আমি "মন্থন" লিখেছি (উদাহরণ: এক মন্থন সায়রশুশুক লাফাতে লাফাতে চলে গেলো... ইত্যাদি)। ইংরেজির অনুকরণের অভিযোগ যদি কেউ করেন, তর্ক করতে পারবো, অস্বীকার করতে পারবো না। লেখকের কাজ শব্দ দিয়ে ছবি আঁকা, তার উদাহরণ অন্য কোনো ভাষায় থাকলেই কী (আর না থাকলেই কী)?


মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

(লগাতেই হল)

কি অপার আনন্দ যে পেলাম লেখাটা পড়ে!

(আজও হিমুর এই সব লেখা পাই - আহা!)

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

হিমু এর ছবি
সত্যপীর এর ছবি

দারুণ হইছে, কয়েকবার পড়লাম। আরো ছাড়েন।

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি
জিপসি সালেহ এর ছবি

প্রথমেই বলে রাখি, আমি আপনার এই নূতন শব্দ তৈরির খেলার একজন ভক্ত। ছোট্ট একটা ব্যাপারে একটু খটকা, তাই জানতে চাওয়ার জন্যই এ লেখা। কপাট, কবাট শব্দের মানে দরজার পাল্লা। তাহলে আপনার লেখায় মনের দরজার ভেতরের কপাটে না লিখে, মনের দরজার ভেতরের পাল্লায় লেখাটা কি ঠিক হত না ? অথবা দোরের-ভেতর-কপাটে বদলে দোরের-ভেতর পাল্লায় বা শুধু ভেতর-কপাটে। আপনার লেেখার ভুল ধরার প্রয়াস আমার নয়, সে সামর্থ্যও আমার নেই। কেবলি জানতে চাওয়া।

হিমু এর ছবি

আসলে এই "খেলা"টা "আমার" না। এটা সম্ভবত প্রজাতি হিসেবে আধুনিক মানুষের মৌলিক, গুরুত্বপূর্ণ, এবং দীর্ঘমেয়াদী চর্চাগুলোর একটি। মানুষ আজ প্রাণী হিসেবে এ জায়গায় এসেছে কারণ সে নানা প্রপঞ্চকে আলাদা শব্দ/প্রতীক দিয়ে নিজে চিনতে আর অন্যকে চেনাতে পেরেছে। কিন্তু এই "খেলা"র লয় আমাদের প্রত্যক্ষ জীবন আর সংস্কৃতিতে এত মন্দ (অন্য সংস্কৃতিতে ততটা নয়), আমরা এর অস্তিত্বকে হয় অস্বীকার করি বা ব্যক্তিবিশেষের অদ্ভুত আচরণ (ইডিওসিনক্রেসি) ভেবে আরামে থাকি। এই "খেলা" আমাদের উপনিবিষ্ট অতীতে যদি পুরোদমে খেলা হত, বা চর্চাটা জারি থাকতো, তাহলে আজকে হয়তো বাংলায় শব্দের ঘাটতি বেড়ে এমন পর্বতপ্রমাণ হতো না। এই ঘাটতির আকারটাই আমাদের এমন নিরুদ্যম আর আত্মসমর্পণমুখী করে দেয় যে এটা পূরণের চেষ্টার চেয়ে পূরণের চেষ্টাকে বিদ্রুপ করাটা সহজ মনে হয়।

কপাট/কবাট মানে পাল্লা (Valveও হতে পারে), নির্দিষ্টভাবে দরজার পাল্লা না। জানালারও কপাট হয়, বা সিন্দুকের।

আমার লেখায় ভুল থাকতেই পারে, খুঁজে পেলে নির্দ্বিধায় ধরিয়ে দিন। ধন্যবাদ।

জিপসি সালেহ এর ছবি

আপনাকেও ধন্যবাদ। জানর কোন শেষ নেই। বিপুলা পৃথিবী।

স্পর্শ এর ছবি

আপনার এই ধারার লেখাগুলো খুব আগ্রহভরে পড়ি। ভাষাকে কি চরম হেলাফেলায় ব্যবহার করতে দেখি আজকাল। টিভি নাটকের নতুন ভাষারীতি নিয়ে কোনো বিতর্কে জড়িয়েছেন কখনও? এটাই নাকি নতুন বাংলা ভাষা! ভাষার চিরপরিবর্তনশীলতার সাথে এই ফারুকীয় ভাষা কিভাবে মেলাবেন?

snapshot এর বাংলা 'ক্ষণচিত্র' হলে মনে হয় ভাল শোনায়।


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

অনেক দিন ধরে এই জবাবটা খুঁজছিলাম, কেন বাংলা ভাষার অতি সহজীকরনের জোয়ারে গা ভাসানো সমীচীন নয়, এতদিনে পেয়ে গেলাম। অজস্র ধন্যবাদ!

আমার একটি প্রস্তাব- আলোচনা পুস্তকে না হলেও আলোচনার সূত্রপাত যেহেতু এখানে করেছেনই, আসুন বাংলা সমাহার বাচক শব্দরাজির একটি তালিকা আমরা প্রনয়ন করি। হতে পারে বাংলা সমাহার বাচক শব্দের তালিকাটি নেহাতই সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অসাধারন কিছু শব্দ সমাহার এখানেও হয়ত দেখা যেতে পারে, যেমন-

- এক পাটি জুতা
- দুই পাটি দাঁত

- এক মুঠোফোন
- দুই মুঠো ভাত

হিমু এর ছবি

এগুলো মনে হয় ঠিক সমাহারবাচক নয়, বরং পরিমাণবাচক। জুতার পাটির কথা উঠবেই কারণ এখানে পাটি মানে "যুগলের একটি"। যেখানে দুইয়ের অধিকের প্রসঙ্গ আছে, সেখানে পাটি শব্দটা সচরাচর ওঠে না, দেখবেন। সমাহারবাচকের মূল কথা হচ্ছে আপনি "এক সমাহারবাচক" বলে "বহু" বোঝাতে পারেন, যেটা পরিমাণবাচক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। জুতা খুলে ঢুকতে হয় এমন জায়গার দোরগোড়ায় প্রচুর জুতা পড়ে থাকে, সেটাকে কি "এক পাটি" জুতা বলা যাবে? কোথাও যদি পথের ওপর প্রচুর পরিমাণ ভাত পড়ে থাকে, তাকে কি "এক মুঠো" ভাত বলা যাবে? যদি না যায়, তাহলে পাটি বা মুঠো এখানে সমাহারবাচক নয়।

এখন আবার চিন্তা করে দেখুন সমাহারবাচক আর কী কী শব্দ আছে। নতুন কিছু মাথায় এলে সেটাও যোগ করুন। জুতার ক্ষেত্রে যেটা মাথায় এলো, "মঞ্চ"... এক মঞ্চ জুতা। আর ভাতের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে এটা অগণ্য বিশেষ্য, এর ক্ষেত্রে সমাহারবাচক সম্ভবত হয় না বা মানায় না। তারপরও গায়ের জোরে বলা যায় "আকাল"... এক আকাল ভাত?

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

এক আকাল ভাত? সর্বনাশ! বহুকাল পর বহু কষ্টে ভাতের আকালটা এদেশ থেকে বিদায় নিয়েছে, একে আবার নতুন করে প্রাত্যহিকতার সাথে এভাবে জড়িয়ে ফেলা কি ঠিক হবে?

আমি আসলে নতুন সমাহার বাচক শব্দের সৃষ্টির আগে বিদ্যমান শব্দগুলোর একটি তালিকাটা করে নেয়ার কথা বলছিলাম, তাহলে নতুন শব্দ সৃজনে সুবিধা হতে পারে।

হিমু এর ছবি

আপনি ভুল পথে আগাচ্ছিলেন।

কতগুলো হুদাকে একসাথে A Bunch of Hudas বলা যেতে পারে কি?

কর্ণজয় এর ছবি

বহুকাল আগে কবি ও প্রাবন্ধিক তরুণ সান্যালের কথা মনে পড়ে গেল আপনার লেখা পড়তে পড়তে।
ইউরোপীয় ভাষা ও বাংলা ভাষার তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বলতে গিয়ে বলছিলেন,
ইংরেজী শব্দ বা অন্য শব্দ এগুলো হলো যে ..আমরা যে দৃশ্যমান পৃথিবী দেখি

গাছ, ফুল, লতা পাতা হাত পা বিশেষ্য - এই বিশেষ্য গুলোকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে ইংরেজী ভাষা, ফরাসী জার্মান,
আর বাংলা ভাষাটা আদতে ক্রিয়াকে বেশি মর্যাদা দিয়েছে। আমাদের ভাষায় ব্যাকরণগতভাবে কৃদন্ত শব্দের বাহুল্য আছে আর ওদের তদ্ধিতান্ত শব্দের বাহুল্য আছে।

চিন্তার দিকটা হলো সভ্যতার।
- একটা স্তরে যখন প্রকৃতিগতভাবে মানুষ ছিল – তখন বিশেষ্যর ভূমিকাই বেশি ছিল।
যখন সে আরও বিকষিত হয়েছে তখন তার নানা কাজ এসছে, একশন এসছে, ভার্ব এসছে,
ফলে ক্রিয়া ভিত্তিক জগতের যে ভাষাগত নির্মান, যে স্ফেয়ার -
সেই অর্থে বাংলা ভাষাটা ইউরোপীয় ভাষা থেকে অনেক এডভান্সড।
ব্যাকরণে দূর্বল- তাই অনেক কিছুই বুঝি না।

আপনার লেখাটা ভাল লেগেছে।।। চিন্তা জুগিয়েছে।

হিমু এর ছবি
মন মাঝি এর ছবি

আমি "Disclaimer" শব্দটার একটা সুন্দর লাগসই বাংলা খুঁজছি। আপনি আমি অবশ্য দুইটা শব্দ টেনটেটিভ্‌লি কয়েন করেছি - ১। দায়বর্জনবিবৃতি, ২। দায়-অস্বীকৃতি । কিন্তু দু'টার কোনোটাই পুরোপুরি মনোমত হচ্ছে না। দুটাই শুনতে একটু বে্ধড়ক মনে হচ্ছে না কি? আরও সুন্দর আর লাগসই কোনো আইডিয়া দিতে পারবেন? এক জায়গায় ব্যবহার করতে চাচ্ছি।

****************************************

হিমু এর ছবি

আইনী ব্যাপারস্যাপার হলে, বেধড়ক হওয়াই ভালো। "দায়বর্জনবিবৃতি" শুনে বা পড়ে দায় চাপাতে বেয়াকুল গোষ্ঠী ক্ষান্ত মেরে যাবে।

আর যে মহলে বুদ্ধি-সরসতার তর্কাতীত কদর আছে, সেখানে চটুল ভাষায় ডিসক্লেইম করাকে "দায়-না করা" বলা যেতে পারে, বায়নার সাথে ছন্দ মিলিয়ে। "আমি শুরুতেই দায়-না করতে চাই..." এভাবে বলা যায় হয়তো। তখন লিখিত ডিসক্লেইমারকে দায়নাটীকা আর উচ্চারিত ডিসক্লেইমারকে দায়নাবাণী বলা যাবে।

এক লহমা এর ছবি

পুরোপুরি সহমত। হাসি

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

মন মাঝি এর ছবি

হা হা হা.... আসলেই! আপনি এমনভাবে বললেন যে এখন "দায়বর্জনবিবৃতি" শব্দটা ভাবলেই আমি একটা রক্তচক্ষু বা কোনো বক্সারের গ্লাভ্‌স পরা উদ্যত মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখতে পাচ্ছে কল্পনায়!! আইনি কাজে হয়তো কাজে লাগবে।

তবে "দায়নাটীকা"-টা আমার দারুন লেগেছে! আমার প্রয়োজন পূরণে একদম পার্ফেক্ট। সুন্দর এবং লাগসই। ধন্যবাদ। চলুক

****************************************

এক লহমা এর ছবি

নিদায়জ্ঞাপণ এবং নিদায়িকা এই দুটো কেমন হয়?

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

মন মাঝি এর ছবি

নিদায়িকা-টা চমৎকার!

****************************************

হিমু এর ছবি

নির্দায় হবে না বস? মানে তৎসম কাঠামো রেখে "নিঃ" (ইংরেজি un-, de- বা জার্মান ent- অর্থে) ব্যবহার করলে নির্দয়ের মতো নির্দায় বলা যায়। আবার বাংলা নি- উপসর্গ বসালে নিলাজের মতো নিদায় হয়, কিন্তু সেটার সাথে আবার তৎসমের আদলে -য়িকাই বসাতে হচ্ছে। নির্দায়িকা বললে হিংস্র বেত্রলোলুপা সহকারী প্রধান শিক্ষিকাদের তিরস্কারের হাত থেকে বাঁচা যাবে। গ্রিক -dis ("বিপরীত") এর সাথেও বোধহয় "নিঃ" ভালো যায়।

এক লহমা এর ছবি

বৈয়াকরণের হিসাব মত অবশ‍্যই নির্দায় হবে। কিন্তু আমার যে শিল্পের সাধে নিপাতনে সিদ্ধ করতে ইচ্ছে হল! হাসি

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

মন মাঝি এর ছবি

তাহলে "Disclaimer" -এর তিনটা বাংলা পেলাম আমরা (আমার ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী)। উপরে হাসি

দায়বর্জনবিবৃতিঃ আইনি বা দাপ্তরিক ব্যাপার-স্যাপার থাকলে, খটোমটো বা পাঠকের দৃষ্টি-আকর্ষনকারী রক্তচক্ষু সাবধাণবাণীর মতো শব্দের প্রয়োজন থাকলে এটা ব্যবহার করা যেতে পারে হয়তো

দায়নাটীকাঃ এটাও অফিসিয়াল-আনঅফিশিয়াল-সেমিঅফিশিয়াল সবক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে ব্যক্তিগত, আন-অফিশিয়াল লেখাতে, অনলাইন বা অফলাইন সামাজিক যোগাযোগ ও প্রচারমাধ্যমে যেখানে ভাষা ব্যবহারে স্বাধীণতা/ক্রিয়েটিভিটির কোনো সুযোগ আছে এবং কাউকে রক্তচক্ষু দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই সেখানে এর চমৎকার ব্যবহার হতে পারে।

নিদায়িকাঃ* এটাও ২য়টা যেসব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে সেসব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যেসব মহলে বুদ্ধি-সরসতা বা নতুনত্বের কদরে বিরুদ্ধতা বা অন্তত তর্কের বিপদ আছে বলে আগে থেকেই জানা আছে, তাদের বেলায় বা তাদের জন্য উদ্দিষ্ট লেখায় বিপদ এড়াতে "সিরিয়াস" ভাইব দিতে চাইলে তুলনামূলকভাবে সামান্য সহজবোধ্য (?) বিধায় এটা ব্যবহার করা যেতে পারে হয়তো

দায়নাটীকা এবং নিদায়িকা - দুটাই আমার খুব পছন্দ হয়েছে। "Disclaimer" শব্দটা বাংলা ভাষায় আমার মাঝে-মধ্যেই
ব্যবহার করতে হয়। আমি ঠিক করেছি এখন থেকে এই দু'টি শব্দই প্রসঙ্গ-ভেদে ইন্টারচেঞ্জেবলি** ব্যবহার করবো। আর দায়বর্জনবিবৃতিটা থাকলো রক্তচক্ষু প্রদর্শনের প্রয়োজনে! হাসি হাসি

----------------------------------

আমি আমার মতামত দিলাম শুধু, আপনাদের কি মনে হয়? সহমত হলে আপনারাও এই শব্দগুলি এডপ্ট*** করুন না আপনাদের লেখায় (যদি ও যখন প্রয়োজন হয়)।
----------------------------------

* নিদায়িকা নাকি নির্দায়িকা হওয়া উচিত আমি জানি না। ব্যকরন তেমন বুঝি না। তবে ধ্বণিমাধুর্যের বিচারে নিদায়িকাটাই আমার কাছে সুন্দর লাগছে বেশি।
** "ইন্টারচেঞ্জেবলি"-র এক শব্দে সুন্দর ও লাগসই বাংলা কি হবে??
*** এইরকম প্রসঙ্গে এই শব্দটার সুন্দর ও লাগসই বাংলা কি হবে?

****************************************

হিমু এর ছবি

** পরস্পরবিকল্পে
*** আপন করে নেওয়া। রাবীন্দ্রিক গাম্ভীর্য আনতে চাইলে, স্বীকরণ

"সিরিয়াস" এর জুৎসই বাংলা অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম। আভিধানিক বাংলা গম্ভীর, কিন্তু গম্ভীরকে আমরা রসবঞ্চিত গোমড়াপনা দিয়ে হজম করে ফেলেছি। সিরিয়াস বিষয়ও রসসিক্ত হতে পারে, এটা অনেক সংস্কৃতিতেই অস্বীকার করা হয়। বাংলাদেশে এই অস্বীকারকাণ্ড আরো বেশি হয় বলে লোকে কোনো সিরিয়াস বিষয়েই সরস আলাপ করতে পারে না। অনেক খুঁজেপেতে ভেবেচিন্তে যেটা পেলাম, সেটা হচ্ছে "অলঘু"। কালিদাস সম্ভবত মৈনাক পর্বতকে ত্র্যম্বকের অট্টহাসির সাথে তুলনা দিয়েছিলেন। সিরিয়াসনেস আর সরসতার সম্পর্কটা পরবর্তী কয়েকশ বছরে অর্ধপণ্ডিতরা হজম করে ফেললো।

মন মাঝি এর ছবি

আপনার মন্তব্যটা পড়ে আমিও ভাবার চেষ্টা করলাম বাংলায় সিরিয়াস বিষয়ে সরসভাবে লেখেন বা বলেন এমন কারও কথা মনে পড়ে কিনা। আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম অনেক ভেবেও এই মুহূর্তে অন্তত তেমন কোন ননফিকশন লেখক বা সুবক্তার নাম মনে পড়লো না! এটা হয়তো আমারই পড়াশোনার সীমাবদ্ধতা, কি জানি!! ফিকশন লেখক অনেকে আছেন, যেমন আমার প্রিয় লেখক রাজশেখর বসু/পরশুরাম এবং মুজতবা আলীই আছেন। কিন্তু এদের কোনো ননফিকশন পড়েছি বলে মনে পড়ছে না। মুজতবা আলী ব্যক্তিজীবনেও তুখোড় সরস আড্ডাবাজ বলে খ্যাতিমান ছিলেন, কিন্তু সেটা ভিন্ন জিনিস এবং আমি সেটা দেখিওনি। বেশ খানিকটা হতাশই হলাম। তবে অনেক ভাবতে ভাবতে পরে বর্তমানকালের একজনের কথা মনে পড়ল। ইনি লিখেন বটে তবে কেমন লেখক আমি জানি না কারন পড়ি নাই -- কিন্তু দারুন বাগ্মী মানুষ। অত্যন্ত সিরিয়াস ও গভীর বিষয়ও একই সাথে প্রখর যুক্তি আর প্রচন্ড সরসতা বা উইটের সাথে উপস্থাপন করতে পারেন। ইদানিংকালে আমার খুব প্রিয় একজন বক্তা। তবে ইনি বয়সে তরুন বলে আর সেইসাথে সরসতার মাত্রাটা অনেক সময় একটু বেশি থাকে বলে অনেকে তাকে আবার অগভীর চটুলতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। জ্ঞানী মানুষের বদলে তাকে একজন নিছক এন্টারটেইনার মনে করেন। কিন্তু আমার ভাল লাগে। যতটুকু দেখেছি, রসসঞ্চারের কারনে তার যুক্তিতর্কে কোনো হাল্কামি আমার চোখে অন্তত পড়েনি। ইনি ইদানিংকালে পশ্চিম বাংলার এবং ইউটিউবে বহুল পরিচিত একটি নাম -- চন্দ্রিল ভট্টাচার্য। লিঙ্ক দিলাম, আপনার মতামত জানতে আগ্রহ বোধ করছি। হাসি

****************************************

হিমু এর ছবি

চন্দ্রিল ভট্টাচার্য সরস বক্তাদের মধ্যে পড়েন, তবে তাঁর "প্রখর যুক্তি" বা "প্রচণ্ড সরসতা" আমার চোখে পড়েনি। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের বাংলাভাষীদের মধ্যে গুছিয়ে অনেকক্ষণ একটি বিষয় নিয়ে কথা বলার প্রবণতা এখন এতই তলানির দিকে যে দু'চারজন যাদের আমরা এখানে ওখানে সেখানে পাই তাদেরই প্রখর প্রচণ্ড প্রকাণ্ড মনে হয়। যুক্তির প্রখরতা বা সরসতার প্রচণ্ডতার প্রসঙ্গ বাদ দিলে চন্দ্রিলের বাগ্মিতা প্রশংসনীয়, এমনটা বাংলাভাষীদের মধ্যেই এখন বিরল।

জ্ঞানী মানুষের বদলে তাকে একজন নিছক এন্টারটেইনার মনে করেন।

আমার মনে হয়, আমাদের সমস্যা এখানেই। একজন জ্ঞানী মানুষ একবার আমাদের বিনোদন দিয়ে বসলে আমরা তাঁর জ্ঞানকে তাচ্ছিল্য করতে লেগে যাই। মোল্লারা যেমন বোরখা ছাড়া বাকি সবকিছুকেই বিকিনিজ্ঞান করে, আমরাও তেমনি নিকষিত গোমড়াপনা ছাড়া বাকি সবকিছুকেই ক্লাস-নাইনে-উঠতে-অপারগোচিত ভাঁড়ামির পায়রাখোপে গুঁজে দিই। শ্রোতা-পাঠকের এমন সামষ্টিক আচরণ বাকি জ্ঞানীরা একবার দেখে ফেললে তারা কে কারচে বেশি গোমড়াপনা করতে পারে, সে মহিষদৌড়ে নেমে যায়। সমস্যা হচ্ছে ওরকম কাঠবডি জ্ঞানও কারো হজম হয় না। এভাবে জ্ঞান বিনোদন সবদিক দিয়ে আমরা, কাঁচা ভাষায় বললে, মারা খেয়ে যাই।

তাসনীম এর ছবি

সিরিয়াসের বাংলা ভারিক্কি কেমন শোনায়?

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

মন মাঝি এর ছবি

Snapshot-এর বাংলা ক্ষণচিত্র বা ক্ষণছবি হতে পারে। ক্ষণছবিটা আমার পছন্দের - এটা আমি সচলেই আমার একটা লেখায় অনেকবার ব্যবহার করেছি।

****************************************

মন মাঝি এর ছবি

অনেকদিন আগে ভয়েস অফ আমেরিকার একটা অনুষ্ঠানে শুনেছিলাম গোলাপফুলের সমাহারকে নাকি ইংরেজিতে "A murder of roses" বলে। আমার কাছে এটা দারুন লাগে। কিন্তু গুগলে অনেক খুঁজেও কোনো রেফারেন্স পেলাম না। ফ্রেজটা পেয়েছি, কিন্তু এর মানে কি সেটা পাইনি।

****************************************

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।