প্রজাপতি তত্ত্ব: এইমাত্র যে নিঃশ্বাসটা ফেললেন, এই ছোট্ট নিঃশ্বাসটার জন্য জগতটা কীভাবেই না পাল্টে গেল।।।

কর্ণজয় এর ছবি
লিখেছেন কর্ণজয় (তারিখ: শনি, ০৬/০১/২০১৮ - ২:৪৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

লর্ড ক্লাইভকে ঘৃণা করলেও আমার নিজের জীবনের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ না করে পারি না। সে না থাকলে আমার এই পৃথিবী দেখা হতো না।
লর্ড ক্লাইভ যদি পলাশীর প্রান্তরে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে জয়লাভ না করতেন তাহলে ভারতে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হতো না। আর ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ১৯০ বছরের সংগ্রামের প্রয়োজন হতো না।
আর তাই যদি ঘটতো, তাহলে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভারত আর পাকিস্তানের জন্ম হতো না। যদি পাকিস্তানের জন্ম না হতো তবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এক মুসলমান যুবক মোজাম্মেল হোসেনের ঢাকা আসা হতো না। আর ঢাকা না আসা হলে তার খুলনার মেয়ে শিরিণ আক্তারের সাথে বিয়ে হতো না। তাদের বিয়ে না হলে, মোজাম্মেলের বন্ধু আজমত বন্ধুর বিয়ে খেতে আসতো না। আর সেই বিয়ে খেতে না আসলে আজমতের সাথে শিরিণ আক্তারের বোন শিরিণ জাহানের দেখা হতো না। দেখা না হলে বিয়ের প্রশ্নই নেই। কিন্তু সেই বিয়েটা না হলে আমার জন্ম হতো না। আমি থাকতাম না।
এজন্যই আমি যে এসেছি, আমি যে আছি এই জন্য লর্ড ক্লাইভের প্রতি ঋণ অনুভব না করে পারি না। এভাবেই আমি লর্ড ক্লাইভের সাথে আমি সম্পর্কিত। শুধু আমি নয় সবাই। সবকিছুর সঙ্গে।
এখন যে ডোনাল্ট ট্রাম্প টুইটটি করে খুশি হয়ে উঠলেন, এর সাথে আফ্রিকার হুতু জাতির এক পূর্বপুরুষের গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। এই ঘটণার সাথে সম্পর্ক আছে এক আরব বণিকেরও। ও একদিন একটি খেজুর খেয়েছিল। তারই result প্রেসিডেন্ট ট্রামের জন্ম। তার জন্ম না হলে- এই টুইটটি কে টুইট করতো।

এটা কোন মনগড়া কথা নয়। একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রয়োগ করে এই সম্পর্কগুলো পাওয়া গেছে। তত্ত্বটার নাম- প্রজাপতি তত্ত্ব।
প্রজাপতি তত্ত্ব অনুসারে, এই যে কিছুদিন আগে যে ভয়াবহ সুনামীটা হলো এটার কারণ লুকিয়ে আছে এখন থেকে লক্ষ বছর আগের এক নীল সন্ধ্যায়। মেক্সিকোর পাহাড়ী মায়াবুনো ঝোপে একটা প্রজাপতি হঠাৎ একটা নীল ফুল থেকে আরেকটা লাল ফুলে উড়ে গিয়েছিল। তার ডানার কাপনে বাতাসে একটা মৃদু কম্পন তৈরি হয়েছিল। সেই কম্পন তৈরি করেছিল আরেক কম্পন, সেই কম্পন আরেক কম্পনের সাথে মিলে তৈরি করেছিল আরেক কম্পন। সেই কম্পন থেকে আরও কম্পন। কম্পনের ধারায় ঘনিয়ে এলো এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়। শেষ যে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়টা আপনাকে কষ্ট দিয়েছিল সেটি। ভাবতে পারেন এই ঘূর্ণিঝড়টার কারণ আড়াই হাজার বছর আগের একটা প্রজাপতি। তাও শুধু এক ফুল থেকে আরেক ফূলে উড়ে গিয়েছিল। সেও এখানে না। মেক্সিকোতে।

যে কথায় ছিলাম।
এইমাত্র আপনি যে নিঃশ্বাস ফেললেন আপনি জানেন সেটাও বাতাসে কম্পন তৈরি করবে। কম্পন মানে বাতাসে ঢেউ। একটা ঢেউ তৈরি করবে আরেক ঢেউ। সেই ঢেউয়ের সাথে মিলে অন্য ঢেউ অন্য আরেকটা ঢেউ হয়ে যাবে। নিঃশ্বাস একটি ক্রিয়া আর প্রত্যেক ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে। আপনার নিঃশ্বাস যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, সেই প্রতিক্রিয়া ক্রিয়া হয়ে আবার প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে, তাতে যা ঘটবে তার ফলে যা হবে,,আর তার ফলে যা হবে তার কথাই বলছি।
যে ঘটণার কথা বলছি সেটা অবশ্য এখনকার নয়। কয়েক বছর কিংবা কয়েকশ বছরেরও নয়। আড়াই হাজার পরের কথা। তখন শুধু মানুষই পৃথিবীতে থাকে না। মহাকাশের বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের সভ্যতার সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ হয়েছে। তারাও এখানে আসে। মানুষও সেখানে যায়। তো আপনার নিঃশ্বাসটা আড়াই হাজার পরে ছোট্ট একটা দমকা হাওয়া তুললো। সেই দমকা হাওয়াটা এসে পড়লো পৃথিবীর এক শ্যামল মেয়ের ওপর, চুলগুলো হাওয়ায় দোল খেয়ে উঠলো আর ঠিক তখনই তাকে দেখে ভাল লেগে যাবে আকাশগঙ্গার এক যুবক অমরের। না এটা এমনই এক নিছক এক প্রেমের গল্প, এরকম হাজারো গল্প তৈরি হয় প্রতি মুহূর্তে। এই প্রেমটিও তেমনই একটা সাধারণ প্রেম। ওরা দুজন দুজনকে ভালবাসে। এক হয়। যেমন করে সব ভালবাসা এক হতে চায়। কিন্তু তারপরও সেই ভালবাসাটা ঠিক স্বাভাবিক ছিল না। কারণ তখনই ভালবাসার জন্য কাওকে দরকার ছিল না। প্রাণের বিকাশের জন্য ভালবাসা দরকার ছিল না। বিজ্ঞান সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। তখন আর কেউ চায় নি, ভালবেসে বন্দি হতে। কিন্তু ওরা বন্দী হয়েছিল। দুজন দুজনকে ভালবেসেছিল। যেটা তখন সারা মহাবিশ্বজুড়ে পুরনো ভালবাসার গল্পগুলোকে খানিকটা ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সেটাই সব ছিল না। তখনও বোঝা যায় নি ওদের এই প্রেমটা কেন এত এত গুরুত্বপূর্ণ। যা আপনার নিঃশ্বাস থেকে তৈরি হয়েছিল।
আপনার নিঃশ্বাসটার গুরুত্ব বোঝা যাবে আরও দেড় হাজার পর, মানে আজ থেকে চার হাজার বছর পর। পৃথিবীর মেয়ে আর আকাশগঙ্গার ছেলেটার তেরটি সন্তান হয়, যাদের উত্তরসন্তানদের মধ্যে তিনজনের নাম আগামী পৃথিবীতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ওঠে। এদের একজন ছিলেন মহা জাগতিক চারণ কবি, যিনি মহাবিশ্বে হারিয়ে যাওয়া আবেগকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তারও অনেক পরে আরেকজন উত্তরপুরুষ এখন থেকে প্রায় তেরো হাজার বছর পরে তাদের আরেকজন উত্তরসন্তান পাথরের প্রাণ আছে সেটা আবিষ্কার করেন। আপনি এই মহান চারণ কবি এবং আবিষ্কারকের জন্য নিজেকে গর্বিত ভাবতে পারেন। আপনি ঠিক তখন এই নিঃশ্বাসটি না ফেললে এদের জন্ম হতো না।
কিন্তু আমি আসলে তৃতীয়জনের কথাটি জানানোর জন্য আপনার কাছে এসেছি। এই তৃতীয়জন সারা ব্রহ্মাণ্ডকে ধাঁধাঁয় ফেলে দিয়েছিলেন। এটা আজ থেকে প্রায় সাইত্রিশ হাজার বছর পরের কথা। তখন গোটা বিশ্বের সবকিছু একটা ব্যবস্থার মধ্যে চলে এসেছে। মহা বিশ্বের সভ্যতায় জড়বস্তু বলে কিছু নেই সুনীল আকাশ, ধূসর মাটি, ঝিরিঝিরি নদী, প্রবাহমান বাতাস কোন কিছুই প্রাণহীন জড় নয়- সবকিছুই প্রাণময় । জীবন্ত। মানুষ বাতাসের সাথে কথা বলতে বলতে হেঁটে যায়। নদীর সাথে এপোয়েনমেন্ট করে। তখন মানুষের খাওয়ার কষ্ট নিই, থাকার চিন্তা নেই, সব কাজ রোবট করে দেয়। এমনই কি প্রেমও। পৃথিবীর সকল মানুষ আর প্রাণীরা মিলে তখন একটি কাজই করছে। অভিজ্ঞতাপুঞ্জ তৈরিতে নিজেকে ঢেলে দিয়েছে। অভিজ্ঞতাপুঞ্জ হচ্ছে মানুষের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা। একটা বিরাট শূন্যতাকে মানুষ তৈরি করেছে যার মধ্যে মানুষ আর সব প্রাণীদের অভিজ্ঞতা জমা হচ্ছে। এমনকি একান্ত ব্যক্তিগতও যা কিছু তা নিজের নয়। যাই বলি, ভাবি, যাপন করি তার সবই সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মধ্যে জমা হচ্ছে। এই যে ইন্টারনেট, মেল, টুইটার, ফেসবুক দিয়ে আমরা যত কথা বলছি, যা লিখছি, সব থেকে যাচ্ছে। এমনকী ইনবক্সে আমরা যে গোপন কথাগুলো আমাদের বলে ভাবি- যেগুলো মুছে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি- আর কোন চিহ্ন রইলো না। কিন্তু আমরা জানতেও পারি না সেকথা শুধু আমাদের ছিল না। আমরা মুছে ফেললে তা শুধু আমাদের কাছ থেকেই মুছে যায়,। আগামীতে ব্যবহারের জন্য অভিজ্ঞতাপুঞ্জে থেকে যায়। যা হোক, এসব এখনকার আমাদের সময়ের গল্প মানুষ যখন নিজের সবকিছু ইন্টারনেটের হাতে তুলে দিলো। আমরা বলছি বহু হাজার বছর পরের কথা। প্রায় ২০ হাজার। এখন ২০ হাজার অনেক শোনালেও মানুষের আয়ু তখন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আরও অনেক বেশি, প্রায় অমরত্বের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে। সে সময় সবাই একটা অভিন্ন সিস্টেমের অংশ। মহাবিশ্বের প্রতিটা প্রাণী পরষ্পরের সাথে আবদ্ধ। চাইলেও এই বন্ধন ছিন্ন করা যাবে না। কারণ এর মধ্য দিয়েই মানুষ ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চরমতা উপভোগ করেও সবাইকে নিজের জীবনের সকল অভিজ্ঞতা দান করছে। এটাই তার সামাজিক কাজ, ব্যবসা, পেশা যাই বলা হোক তা। তো ২০ হাজার বছর পরে একজন সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেল। সিস্টেম কিছুতেই বের করতে পারলো না, সে কোথায় পালিয়েছে। তার পালানো, গোটা সিস্টেমকে নিয়েই প্রশ্ন তুললো- যার ওপর দাঁড়িয়ে সভ্যতা গড়ে উঠেছে তাই হুমকির মধ্যে পড়ে গেল। কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না।
আপনার খারাপ লাগছে? আপনার নিঃশ্বাসের ফলে জন্ম নেয়া এক তরুণী হারিয়ে গেলে।
কোথায় গেল সে? কী করছে ও এখন?
সে আসলে অতীতগমন রথ আবিষ্কার করেছিল। যাতে চড়ে সে অতীতে আসতে পারে। সে আসলে অতীতের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল বলে তাকে আর কেউ খুঁজে পায় নি।
যে হারায় সবার কাছ থেকে হারায়। নিজের কাছ থেকে নয়। নিজ থেকে হারানোর জন্য কোথাও যেতে হয় না। সবার মধ্যে থেকেই একজন নিজেকে হারিয়ে ফেলে। তাই সেই মেয়েটি হারিয়ে গেলেও সে আসলে নিজের কাছে ফিরে আসছিল। তার শেকড়ের কাছে। সে আসলে আসছে আপনার কাছে, যার নিঃশ্বাস থেকে তার জন্ম। যে কোন সময়ই এখানে পৌঁছে যাবে। প্রস্তুত হোন।
আমি জানলাম কেমন করে?
আপনার সেই নিঃশ্বাস ফেলা থেকেই। জানেনতো, পৃথিবীর সব কিছুর সাথে সবকিছুর যোগ আছে। আমরা শুধু দেখতে পাই না, এই যা..


মন্তব্য

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

যে হারায় সবার কাছ থেকে হারায়। নিজের কাছ থেকে নয়। নিজ থেকে হারানোর জন্য কোথাও যেতে হয় না। সবার মধ্যে থেকেই একজন নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

মাহবুব লীলেন এর ছবি

খাইছে। এইটা তো সকল মঙ্গোলিয়ান চেঙ্গিসখানের বংশ; সেইরকম গল্প

অতিথি লেখক এর ছবি

the butterfly effect... অল্প কথায় মোটামুটি বলেছেন ভালোই।।

_rob_inn_

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA