পওয়ানা

বর্ণদূত এর ছবি
লিখেছেন বর্ণদূত [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ২১/১০/২০০৮ - ১২:১৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মূল : জ্যঁ মারি গুস্তাভ ল্য ক্লেজিও
ইংরেজি অনুবাদ : খ্রিস্টপি ব্রুনস্কি

ন্যানটুকেট থেকে জন :
সেই অনেককাল আগের কথা। এতো আগে যখন সবেমাত্র শুরু হয়েছে, সেই তখন, যখন সমুদ্রের ওপর কেউ ছিল না, শুধুমাত্র পাখি আর সূর্যালোক ছাড়া। সেই ছোট্টবেলা থেকে আমি সেখানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, ঠিক সেখানে, যেখানে সবকিছুর শুরু এবং সবকিছুর শেষ। ন্যানটুকেট এর প্রায় সবাই ঘোরগ্রস্তের মতো সংগোপনে এই গল্প বলত, যেন এটি কোনও গুপ্তধন। তারা বলত ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়িয়ে সমুদ্রে একটি গোপন স্থান রয়েছে যেখানে তিমিরা যায় শিশুতিমির জন্ম দিতে, বৃদ্ধা তিমিরা যায় মৃত্যুকালে। সেখানে সেই বিশাল অগভীর জলাধারে তারা হাজারে হাজারে জড়ো হয়, অল্প বয়সী থেকে শুরু করে সবচেয়ে বৃদ্ধতিমিও হাজির হয় সেখানে। পুরুষ তিমিরা তাদের ঘিরে এক চক্রবুহ্য সৃষ্টি করে যেন হত্যাকারী কোনও তিমি ও হাঙ্গর প্রবেশ করতে না পারে। সমুদ্র তখন বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে, তিমিদের নাসরন্ধ্র দিয়ে রেরিয়ে আসা বাতাসে আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে, সেই সঙ্গে পাখিদের সম্মিলিত কান্নায় হাপরের আওয়াজ ওঠে।
মোটামুটি এই হচ্ছে গল্প। তারা সবাই এই গল্পই বলে, যেন তারা প্রত্যেকেই প্রত্য করেছে সেই গোপন স্থান। এবং ন্যানটুকেট এর জেটিতে দাঁড়িয়ে আমিও এসব কথা শুনি আর স্মরণ করার চেষ্টা করি, হয়তো আমিও সেখানে ছিলাম।
এখন এসবকিছুই শূন্যে মিলিয়ে গেছে। আমার স্মরণ হয়, আমি একাই এই স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি, সবকিছুর মধ্যে পৃথিবীতে যা সুন্দর তা অসম্পন্ন, ধবংসপ্রাপ্ত। ন্যানটুকেট এ আমি আর কখনোই ফিরে যেতে পারিনি। সেই সমুদ্রতরঙ্গের স্বপ্নমাখা গল্প কী এখনো টিকে আছে?
সেই বিশাল বাষ্পচালিত জাহাজ, উঁচু মাস্তুল যেখান থেকে সমুদ্রে নজর রাখা যায়, জাহাজের সঙ্গে সংযুক্ত লঞ্চগুলো যেন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে উন্মুখ, হার্পুনগুলো তৈরি তাদের কাজে।
এবং রক্তরাঙা সমুদ্র, পাখিবোঝাই কালো আকাশ। ন্যানটুকেট সম্পর্কিত আমার দূরবর্তী স্মৃতিরা সমুদ্রে রক্তের গন্ধবাহী, শীতের শেষ সেখারকার বন্দর ধূসর হয়ে ওঠে, যখন পৃথিবীর অন্যপ্রান্ত হতে অতিকায় তিমিরা ফিরে আসে তাদের সঙ্গীদের মৃত্যুতে কাতরতা জানায়। তখন জেটিতে ধারলো অস্ত্র দিয়ে কাটাকুটি চলে, কালো রক্তের বাষ্প ওঠে জেটিতে, সেই জলাধারে, তীব্র আর ঝাঁঝালো গন্ধ উঠে আসে গভীর থেকে।
মাত্র ৮ বছর বয়স থেকেই আমি সেখানে ঘোরাঘুরি করতাম। আমার অ্যাঙ্কল স্যামুয়েল সেখানে কাজ করতো। সরু নালাগুলো পরিস্কার করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। আমাকে তিনিই প্রথম সেই বিশাল প্রাণীর মুণ্ডু দেখান, চামরা দিয়ে ঢাকা তাদের ছোট্ট চোখ, চামরা সরিয়ে দিলে নিষ্পলক নীলচে সাদা দৃষ্টিহীন চোখ। আমার শ্বাস-প্রশ্বাসে রক্ত আর মৃত্যুর গন্ধ এসে ঝাপটা দেয়, কল্পনা করি এই নিশ্চল দেহগুলো সচল ছিল, পানিতে বিস্ময় জাগিয়ে ঢেউ তুলে ছুটে যেত। আমার অ্যাঙ্কল স্যামুয়েল শেখাতেন, আর্কটিকের তিমি থেকে সাধারণ তিমির পার্থক্য। তিমিদের প্রজাতি বিভাজন। দেখাতেন কোন্ পথে তিমিরা তীব্র বেগে পানি ছিটিয়ে বের করে দেয়। আর্কটিক অঞ্চলের তিমিদের থাকে দুটি নির্গমন পথ আর নীল তিমিদের একটি, যখন নীল তিমি পানি বের করে দেয় তখন তা গাছের আকৃতি নেয়। এসবই আমি শিখেছি ন্যানটুকেট এর জেটিতে, পাখির কান্না আর ধারালো অস্ত্রের ছন্দোময় তাল শুনতে শুনতে। সেখানেই আমি প্রথম একটি হাঙ্গরের পেট চিঁড়তে দেখেছি।
এখন অনেক অনেক বছর পর এইসব স্মৃতি পুন্টা-বুন্ডায়, এনসেন্দ্রা সমুদ্র তীরে আবারও জেগে উঠেছে। আমি সমুদ্রের গর্জন শুনি, বাতাসের গতি-প্রকৃতি ল্ক্ষ্য করি, সমুদ্রতট, ভীষণ মোলায়েম, আকাশ, এবং আমি মনে করতে থাকি যে, এটা ন্যানটুকেট এর সেই সমুদ্র, এই ধূসর আর বন্য সমুদ্র যা মানুষকে নির্দয় আর নির্মম করে তুলতে পারে।
আমার স্মরণ হয় যে, যখন আমার বয়স ১০ তখন আমি এবং ন্যানটুকেটের ছেলেরা মিলে বৃদ্ধ জন নাটিকের কাছ থেকে একটি নৌকা ধার করি এবং তা ল্যাগুনের বাইরে নিয়ে যাই। কিন্তু সরু পথের কারণে তা আর চালাতে পারছিলাম না। আমরা পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামের কাছে আটকে যাই, অন্যপাশে সমুদ্রের গর্জন শুনতে থাকি। আমরা বিচে নেমে আসি, দৌড়াতে থাকি, যতক্ষণ না সমুদ্র দেখা যায়। সময়টা ছিল জুন মাসের শেষ দিক। আমি ভালোভাবেই মনে করতে পারি যে, যেখানে সমুদ্র আর আকাশ মিশে গেছে সেই দিগন্ত রেখার দিকে তাকিয়ে আমরা আমাদের নৌকার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। আকাশ মেঘহীন, সমুদ্র ফেনামুখে তার ঢেউ নিয়ে আছড়ে পড়ছিল। দীর্ঘক্ষণ আমরা অপেক্ষায় থেকেছি যতক্ষণ না আঁধার নেমে আসে। বাতাস আর সমুদ্রে আমার চোখ জ্বলে যাচ্ছিল তবু অপেক্ষা। অতঃপর আমরা ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে ন্যানটুকেট এ ফিরে আসি, ফিরে আসি শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কাকে মাথায় নিয়ে। আজ এতোদিন পরও সেই ঘটনা মনে পড়লে যে হৃদকম্পন জেগে ওঠে, সেই দিনের সেই মুহূর্ত থেকে তা একচুলও এদিক-সেদিক হয়নি।
সেই ঘটনার পরের কথা। আমরা কখনো কখনো বৃদ্ধ নাটিককে দেখতে জেটিতে যেতাম। তিনি আমাদের অনেক আগেকার গল্প বলতেন, যখন ইন্ডিয়ানরাই ছিল এই অঞ্চলের বাসিন্দা। তিনি ইন্ডিয়ানদের তিমি শিকারের গল্প বলতেন। বলতেন ন্যানটুকেটের শিকারীদের গল্প। একদল তিমি দেখা গেলে কীভাবে শিকারীরা 'পওয়ান' বলে চিতকার দিয়ে সেই সংবাদ পরস্পরকে জানাতো, তিনি তা অভিনয় করে দেখাতেন। ন্যানটুকেটের সব শিকারীদের গল্প বলতেন নাটিক। একে একে এই শিকারীরা মৃত্যুবরণ করেন। কেউ অসুস্থ হয়ে, কেউ অতিমাত্রায় মদ্যপানের কারণে, কেউ বা বেডফোর্ড কিংবা বোস্টনের নাইটক্লাবে। তারা তীব্র শীতে, বিশাল পওয়ানা শিকার করতে গিয়ে ইত্যাদি নানাবিধ কারণে মারা গেছে। বৃদ্ধ জন নাটিকই শুধুমাত্র এসব স্মরণ করতে পারতেন। কথা বলা শেষ হলে নাটিক দেয়ালে পিঠ দিয়ে অনুপযোগী নৌকার মতো নিশ্চল বসে থাকতেন। তার মুখে আঁধার ঘনাতো, চোখের তারায় দীর্ঘক্ষণ কোনও দৃষ্টি ঝিলিক দিয়ে উঠতো না। নিরব থেকে নিরবতর হয়ে যেতেন। তার হ্যাটের নিচ দিয়ে পাকা চুল দৃশ্যমান হতো। একদিন তিনি দেখালেন কীভাবে ল্যক্ষবস্তুর ওপর হার্পুন ছুঁড়তে হয়। হাতে হার্পুন নিয়ে তিনি জাহাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, প্রস্তুতি নিলেন হার্পুন ছুঁড়ে দেয়ার জন্য। পাশ দিয়ে যাওয়া অন্য জেলে বা নাবিকরা তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে থাকে। কেননা তিনি অন্ধ। কিন্তু তখন আমি কল্পনা করতে থাকি কীভাবে গভীরে থাকা অতিকায় তিমির রক্তস্রোতে সমুদ্রের পানি রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে।
রক্তই এখন আমি দেখতে পাচ্ছি এখানে, কোনও ব্যর্থতা ছাড়াই, এনসেন্দ্রার নীল সমুদ্রে। পুন্টা-বুন্ডায় জলদস্যুদের কেবিন এখনও রয়েছে। শুকনো পাথরের তৈরি দেয়াল, যার ওপর পাম গাছের শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত। মৃদু বাতাস বইছে, পাথরে পাথরে ঠোক্কর খেয়ে বাতাস তৈরি করছে সুর, যেন চুপি চুপি বলছে, অনেক অনেককাল আগের কথা, যখন সমুদ্র খুঁজে পেল এক মানব, পৃথিবীর প্রথম মানব। এখন আমি আমি বৃদ্ধদের একজন, নতুন শতাব্দীর শুরুতে সেই বৃদ্ধ নাটিকের মতো।
এটি জলদস্যুদের একটি পুরনো কেবিন যেখানে আমি আশ্রয় নিয়েছি। সমুদ্রে যখন বাতাস বয়, উপকূলজুড়ে কুয়াশা নেমে আসে এবং তুলা তুলা মেঘে ঢেকে যায় বিচের আকাশ, তখন আমি কিছুই দেখি না, কিন্তু তখন চোখে ভাসে মৃত তিমিদের হাড়-গোর। বাতাসের গর্জন ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না।
এখন আমি বালুময় সমদ্রতটে হাঁটি আর স্মরণ করি, একসময় এটা কী ছিল। যেন মনে হয় আমি জলদস্যুদের কোনও শহরের কোলাহল শুনতে পাচ্ছি, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে নাবিকদের চিতকার।
প্রথমবার নদীমোহনায় তাকে দেখি, যেখানে বারবণিতারা পাম গাছের কুঁড়ে ঘরে তাদের বসতি স্থাপন করেছে। আমি নারীর হাসি এবং তার দ্রুততালে হাঁটার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। এই কেবিনটিও পাম কাঠের তৈরি। এখন আমি নদীমোহনার মুখে তাকাই। আমি সেখানে হেঁটে যাই যেখানে সমুদ্রের ঢেউ এসে আঁছড়ে পড়ে, আমার খোলা পা ভিজিয়ে দেয় নোনা জল। আমার পায়ের ছাপ ছাড়া আর কোনও পায়ের ছাপ নেই। কোথায় সেই নারীদের কুটির? জানি না। বহুকাল আগেকার মানবের পদচ্ছাপ মুছে দিয়েছে বাতাস, শুধুমাত্র রয়ে গেছে মৃত বিশাল তিমিদের হাড়।
আমি হাঁটি যেখানে একদা নদী ছিল। এখন কিছুই নেই, না পাখি। শুধু মনে হয় আমি এখনও শুনতে পাই নাবিকদের কোলাহল। অন্ধকারে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে যেন তাদের ফিরে আসার প্রত্যাশা করছি। কিংবা কখনও পুন্টা-বুন্ডায় কুয়াশা নেমে এলে যেন আমি দেখতে পাই সব জাহাজ সমুদ্রে সেই তিমিদের গোপন স্থানের দিকে যাচ্ছে, আর তিমিদের ধীর ছায়া কেন্দ্র করে উড়ে উড়ে ঘুরছে পাখি।

চার্লস মেলভিল স্ক্যামন :
আমি চার্লস মেলভিল স্ক্যামন। আমি স্মরণ করতে পারি ১৮৬৫ সালের ১ জানুয়ারির কথা, যখন লিয়োনোরে পুন্টা-বুন্ডা ত্যাগ করেছিল, তাকে দক্ষিণে পাঠানো হয়েছিল। আমি নাবিকদের সম্পর্কে কোনও ব্যাখ্যা দিতে যাচ্ছি না, কিন্তু থমাস, আমার ফোর্থ মেট, কার্ডরুমে সেকেন্ড ক্যাপ্টেন রয়েসর সঙ্গে আমার কথোপকথন শুনে ফেলে। আমরা সেই গোপন স্থানের কথা আলোচনা করছিলাম, যেখানে নারী তিমিরা শিশুতিমির জন্ম দিতে যায়। রয়স এ ধরনের গুপ্ত স্থানের কথা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করে যেখানে তিমিরা ক্ষণকালের জন্য যায়। এটিকে সে আমাজোনিয়ায় হাতিরা মৃত্যুকালে যেখানে যায়, সেই সমাধির গল্পের মতোই ধরে নিয়েছে।
এই গল্প দ্রুতই নাবিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই গোপন, তিমিদের সেই আস্তানার খোঁজে যাওয়ার জন্য এটিই যথেষ্ঠ ছিল। আমরা দক্ষিণে যাত্রা করি সেই গোপন আস্তানা খুঁজে বের করার জন্য। কয়েকদিন লিয়োনোরে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল চষে বেড়ায়। কিন্তু পানিতে কোনও তিমির হদিস নেই, এবং নাবিকরা ইতোমধ্যে বলতে শুরু করেছে যে, এনসেন্দ্রার পানি ত্যাগ করে আমাদের এখানে আসা ঠিক হয়নি। এ সিজনটা আমরা ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে গেলাম।
কোনও এক রবিবারে পূর্বদিকের হাওয়া গেল থেমে। আমি ব্রিজেই ছিলাম, এতো গরম ছিল যে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। ভীষণ ক্লান্ত ছিলাম, কেননা আগের রাতে আমি ঘুমাইনি। সমুদ্র ছিল শান্ত। আমি একটি ছোট্ট টেলিস্কোপ দিয়ে উপকূল বরাবর দৃষ্টি দিচ্ছিলাম। কাজের জন্য ডেক এ থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। সাবান দিয়ে ডেক ধোয়া হচ্ছিল। যারা ধোয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল তাদের মধ্যে একজন, শিশুই হবে, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার প্রতি আমি কোনও মনোযোগ দিইনি। দিবাস্বপ্ন আমি খুইয়ে ফেলেছিলাম, কিংবা হতে পারে আমার পরিকল্পনা হজম করার ফলে অন্যদের থেকে আমি দূরে সরে গিয়েছিলাম। উপকূল এখনও অন্ধকার, পরিস্কার আকাশের পরিপ্রেক্ষিতে যা অবাস্তব, অসম্ভব মনে হয়।
সমুদ্র এখনও বিষণ্ণ, ম্রিয়মান। এমন কী যে গাঙচিলগুলো পুন্টা-বুন্ডা ছেড়ে আসার সময় লিয়োনোরেকে অনুসরণ করেছে সেগুলোও আর নেই। জাহাজটি একাকী নিঃসঙ্গ। শুধুমাত্র যন্ত্রধ্বনি ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই কোথাও।
সেই শিশুটি তখনও সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে, তবে এখন সে আমার পাশে।
'নাম কী তোমার?'
সে তার নামের প্রথম অংশ বলে। একজন সাধারণ ডেক ধোয়া কর্মচারীর নামের শেষাংশ মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়। শুধুমাত্র নামে প্রথম অংশ আর জন্মস্থানের নাম।
'জন, ন্যানটুকেট থেকে।'
'তুমি ন্যানটুকেট থেকে এসেছো?'
আমি তাকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে অতঃপর উপকূলের দিকে তাকাই। ‌'এই মানচিত্রটি আমাদের কোনও কাজে আসছে না,' আমি বলি। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে, সেই গুপ্তস্থানে যাওয়ার পথ এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয় এখন। অবশ্যই কাছাকাছি কোথাও রয়েছে সেই পথেও নিশানা। আমি দক্ষিণ-পূর্বদিকে পাহাড়ের দিকে তাকাই। সূর্য ইতোমধ্যে সামর্থ্যরে সবটুকু ঢেলে তাপ বিকোচ্ছে। আমি বলি, 'তো তুমি সেই ন্যানটুকেট থেকে এসেছো।'
'জ্বি, স্যার?'
'এখান থেকে অনেক দূর। এটা কী তোমার প্রথম যাত্রা?'
'জ্বি, স্যার। আমি ন্যানটুকেট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি।'
'তুমি এখানে কীভাবে এলে?'
'আমি জানতে পারি, ঐ কোম্পানি প্রশান্ত মহাসাগরে যাত্রা করবে।'
শিশুটির চেহারা ঝলমল করে ওঠে। জানি না কেন, আমি বলি,'আমি স্বর্ণের সন্ধানে এসেছি। তবে কিছুই পাইনি, সেকারণে শিকারের জন্য এই জাহাজ ভাড়া করেছি। তুমি কী জানো কিছু রূপালি মাছ আমাদের ধনী করে দিতে পারে?'
শিশুটিকে কেমন অদ্ভুত দেখায়। কিন্তু আমি তাকে বুঝতে ভুল করি। 'অনেক ধনী। তুমি ঘোষণা দিয়ে দিতে পারো, যে প্রথম সেই পথ দেখবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে।'
আমি ঘুরে সমুদ্ররেখা পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। এখন জাহাজের সব নাবিক ডেকের ওপর। তারা প্রত্যেকেই জানে কেন আমরা পুন্টা-বুন্ডা ত্যাগ করেছি, কেন আমরা একাকী নিঃসঙ্গ হয়ে দক্ষিণে যাত্রা করেছি। আমরা প্রথমবারের মতো প্রাচীন পৈশাচিক মাছের গোপন আস্তানার রহস্য উন্মোচন করতে যাচ্ছি, যেখানে নারী তিমিরা তাদের শিশুতিমির জন্ম দিতে যায়। আমরা দ্রুতই অনেক ধনী হয়ে উঠবো, ফলে সম্ভবত সেই গুপ্তস্থান আবিষ্কারের এটাই সর্বশেষ অভিযান। কেউই এ বিষয়টি সম্পর্কে কোনও কথা বলছে না। রহস্যময় কারণে আমরা সবাই এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, শঙ্কিত যাত্রায় আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। লিয়োনোরে পুন্টা-বুন্ডা ছেড়ে এসেছে প্রায় সপ্তাখানেক হল। আর দক্ষিণে যাওয়ার পরিকল্পনা করি আমি, যেন বাতাসের সুবিধা নিতে পারি। ধীরে ধীরে সমুদ্র পরিস্কার হয়ে আসে। ডলফিন চলছে আগে আগে। অনতিদূরেই তিমির কালো ছায়া যেনবা দেখতে পাবো।
সমুদ্র হঠাত করেই কিছুটা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে, খুব নিবিড়ভাবে শুনতে চাইলে মনে হবে যেন পানির ঝরনার শব্দ।
সূর্য দিগন্তে নেমেছে। রাত ঘনায়মান। সেই শব্দের উতসের দূরত্ব বোঝার চেষ্টা করি এবং আনুমাণিক পঁয়ত্রিশ ফুট দূরত্ব বিবেচনা করে জাহাজ ডানে রাখতে বলি। একটি লঞ্চ নিয়ে ল্যাগুনে প্রবেশের সেই পথ সনাক্তের নির্দেশ দেই। নিরাপত্তার খাতিরে আমরা অপেক্ষা করি, কিন্তু লক্ষেরও এতো কাছে এসে এখনি যেতে না পারলে রাতে কেউ যাত্রা করতে রাজি হলো না। আমি রয়সকে চার্জ থেকে সরিয়ে দিই। কিছু সমস্যা হয়েছিল। সে যাক। দেখছিলাম লালচে-বাদামি পাহাড়ের রুক্ষতা, লবণ আর ল্যাগুনের গভীর কালো জল। সবকিছু দেখে একটি পথ বলেই মনে হলো যার শেষে কোনও বিস্ময়কর জগত অপেক্ষা করে। কিংবদন্তি হওয়ার ডাক আমার দিকে, এখানের পিশাচমতস্য লঞ্চ আক্রমণ করে, তাদের অতিকায় দেহ দিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। তাদের লেজ দিয়ে পানিতে তীব্র আঘাত হানে যেন কোনও মানুষ জীবিত তীরে ফিরে যেতে না পারে। রাত আমাদের সেখানে প্রবেশ থেকে বিরত রাখে।
সেই রাতের কথা আমি কখনো ভুলবো না। ঘুমিয়েছি সেখানে, যেস্থান সম্পর্কে কিছু জানি না, এমন কী লিয়োনোরের বাতি ছাড়াই কাটিয়েছি রাত। মাঝে-মধ্যেই আমরা ল্যাগুনের চ্যানেলে কিছু অদ্ভুত শব্দ পাচ্ছিলাম। চাঁদ জেগে উঠল, ল্যাগুনের পানি শান্ত। আমি ঘুমের অতলে তলিয়ে যাই। স্বপ্ন দেখছি, যা কখনোই দেখিনি, সেই গুপ্তস্থান আবিষ্কার করেছি আমি।
ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগে আমরা সবাই জেগে উঠি। একজন ইন্ডিয়ান কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে চিতকার করে ওঠে ‌'পওয়ানা!' যা আমরা সবাই প্রত্যাশা করেছি। সে ছিল লঞ্চের পাশে, বিচে দাঁড়িয়ে ল্যাগুনের দিকে তাকিয়ে। আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সেই মুহূর্তে কেউই নিশ্চয়তা দিতে পারতো না আমরা স্বপ্ন দেখছি কি না। আমি এখন সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি, যার জন্য দীর্ঘকাল আমি জোড় গলায় কথা বলেছি, ন্যানটুকেটের নাবিকেরা যে স্থানের কথা বলতো, যেখানে শীতল জলের তিমিরা এসে জড়ো হয়।
(সংক্ষেপিত)


মন্তব্য

তুলিরেখা [অতিথি] এর ছবি

বর্ণদূত,
অসাধারণ গল্প। সুন্দর অনুবাদ। আরেকটু জানতে ইচ্ছা করে। লেখক কে? তিনি কোথাকার লোক? গল্পটা কি পরিস্থিতিতে লেখা হয়েছিলো?

বর্ণদূত এর ছবি

ধন্যবাদ। আপনি আমার ব্লগের প্রথম লেখাটি পড়লেই জানতে পারবেন। লেখক সাহিত্যে এবারের নোবেল বিজয়ী। ভালো থাকুন।

s-s এর ছবি

অনুবাদটি একটু ক্লান্তিকর ।
সেটি কি মূল লেখার জন্য ই কি'ন জানিনা। ক্লেজিও র জীবনী পড়লাম নোবেল উত্তর ডামাডোলে, লেখা পড়ার আগ্রহ ছিলো, কিন্তু এই লেখার পর তাতে ভাঁটা পড়লো একটু। আপনার কেমন লেগেছে মৌলিক রচনা?

জীবন জীবন্ত হোক, তুচ্ছ অমরতা

পলাশ দত্ত [অতিথি] এর ছবি

প্রথম আলোর গত শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকীতে মশিউল আলমের অনুবাদের একটা গল্প ছাপা হয়েছে লে ক্লেজিওর। সেটা প'ড়ে দেখতে পারেন।

বর্ণদূত এর ছবি

তার লেখা আমার ভালোই লেগেছে। অন্যদের থেকে বেশকিছু বিষয়েই পৃথক তিনি। তাছাড়া তার ভাষাশৈলী আমাকে আকৃষ্ট করেছে। হতে পারে আমার অনুবাদ ঝরঝরে নয়, তাই আপনার ভালো লাগেনি। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

অতিথি লেখক এর ছবি

বন্ধু,
আমার কাছে ভালো লেগেছে। কোথাও কোথাও একটু মনে হয়ে গ্যাছে, যে- এটি অনুবাদ (সেটা অবশ্য সমস্যাও না তেমন কোনো)। অবশ্য সামগ্রিকভাবে সেই প্যাটার্নটি দূর-অদেখা বিষয় নিয়ে বিদেশী গল্পের হিসেবে বেশ মানিয়ে গ্যাছে, মানে মানিয়ে যাওয়ার মতো রূপে রাখতে পেরেছো তুমি। তাই, আমিও অস্বাভাবিক মানিয়ে নিয়েছি নিজেকেও। সাবলাইম অনুভূতি বেশ পজিটিভ। ক্ল্যাসিক ক্ল্যাসিক চেহারাটা পাওয়া গ্যাছে।
গুড জব, অ্যাজ ইউজ্যুয়াল! হাসি

_ সাইফুল আকবর খান

বর্ণদূত এর ছবি

অনুবাদ যদি অনুবাদ মনে হয়, সেটা তো ভালো কথা না। তারমানে সমস্যা আছে। আমি অবশ্যই এরপর থেকে আরো সতর্ক হবো। তোমাকে অসঙখ্য ধন্যবাদ।
ভালো থেকো।

অতিথি লেখক এর ছবি

না রে ভাই, সমস্যা না।
অনুবাদ জেনেই যেহেতু পড়া হচ্ছে, একদমই অনুবাদ মনে না হওয়াটাই বরং বেশি কঠিন! এইটুকু প্রি-অকুপেশন থেকে আমরা পাঠক হিসেবেও অতো তো বের হতে পারি না নিশ্চয়ই, সাধারণত।
অবশ্যই অনেক ভালো হয়েছে ভাষান্তর বা রূপান্তর। ভাবান্তর তো কাম্যও না। মানে, ভাষা চেঞ্জ-এর ফাঁদে মুডও চেঞ্জ না হয়ে যাওয়াটাই তো ভালো, না? আর বললামই তো, ওইটার সাথে মিলিয়ে সেই দূর 'তিমিনামা'-কে (মুজিব ভাইয়ের থেকে ধার ক'রে বললাম) আমাদের কাছে নামিয়ে আনার কাজটার এইটুকু আধো-অধরা ক্ল্যাসিক বর্ণগন্ধ তো দরকারই ছিল।
সো, ফাইনালি হয়তো কোনো সমস্যাই না, বরং বলি বৈশিষ্ট্য। হাসি

_ সাইফুল আকবর খান

মুজিব মেহদী এর ছবি

একটা দুঃসাহসিক তিমিনামা যেন। পাঠক হিসেবে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।
বর্ণদূতে রং আছে বেশ।
..................................................................................
দেশ সমস্যা অনুসারে
ভিন্ন বিধান হতে পারে
লালন বলে তাই জানিলে
পাপ পুণ্যের নাই বালাই।

... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
কচুরিপানার নিচে জেগে থাকে ক্রন্দনশীলা সব নদী

রানা মেহের এর ছবি

লেখাটা চমতকার লেগেছে বর্ণদূত
আমার তো অনুবাদকে অনুবাদ মনে করতেই ভালো লাগে
সেটা সমস্যা হবে কেন?

কলকাতার অনুবাদ ভালো লাগেনা
তাদের অতিরিক্ত দেশী করার প্রবনতার জন্য।
আপনাকে ধন্যবাদ এখানে আঙ্কল স্যামুয়েল
'স্যামুয়েল আঙ্কল' অথবা স্যাম চাচা হয়ে যাননি বলে

তবে চার্লস মেলভিলে এর বর্ণনা একটু ঝুলে গেছে।
আপনি কি পুরো অনুবাদটা একদিনে করেছিলেন?
-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

বর্ণদূত এর ছবি

রানা মেহের, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি ঠিকই ধরেছেন। অনুবাদটা একদিনে করা। তবে আমি সেটাকে কোনো অজুহাত হিসেবে দাড় করাতে ইচ্ছুক নই। ভালো থাকুন।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।