কৃত্রিম জীবের দুচার কথা

দিগন্ত এর ছবি
লিখেছেন দিগন্ত (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৮/১১/২০০৭ - ৭:০৯অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

[ক্রেগ ভেন্টর জেনেটিক্সের জগতে এক পরিচিত নাম। বেসরকারী উদ্যোগে তিনিই প্রথম মানুষের জিনোম শৃঙ্খলা লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি হলেন ক্রেগ ভেন্টর ইন্সটিটিউট-এর প্রতিষ্ঠাতা, যা জেনেটিক্সের গবেষণায় অগ্রণী এক সংস্থা। ২০০৫ সালে তিনি সিন্থেটিক জিনোমিক্স বলে একটি কোম্পানীও প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য - ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে জীবন তৈরী করবেন। নিচের লেখাটা তাঁর একটি বক্তৃতা অবলম্বনে লেখা।]

জেনেটিক কোড হল জীবনের ব্লুপ্রিন্ট। প্রতি জীবকোষে এই কোডই নির্ধারণ করে কোষের কার্যকারিতা - কোষ কোন কোন প্রোটিন তৈরী করবে, কিভাবে করবে। জেনেটিক কোড নিয়ে গবেষণায় মূলত দুটো ভাগ করা যায়। ধাপদুটোকে সাধারণভাবে বলা যায়, একটা জেনেটিক কোড পড়তে শেখা আরেকটা লিখতে শেখা। পড়তে শেখা বলতে জীবের জিনোমে বেসিক ব্লকগুলোর শৃঙ্খলা লিপিবদ্ধ করা। আর লিখতে শেখা বলতে সেই লিপিবদ্ধ শৃঙ্খলা থেকে পৃথকভাবে জীবকোষ তৈরী করা।

প্রায় এক দশক আগে প্রথম যখন আমরা একটি ভাইরাসের জিনোম পড়তে পেরেছিলাম তখন সেটা আমাদের ১৩ বছর পরিশ্রমের ফসল ছিল। আজ আমরা একই কাজ মাত্র ২ থেকে ৮ ঘন্টায় করে দেখাতে পারি। এর পরেও অনেক উদ্ভিদ, সাধারণ প্রাণী এমনকি মানুষের জিনোমও আমরা পড়তে পেরেছি। এ বছরের শেষে আমরা মনে করি আরো তিন থেকে পাঁচটি জীবের জিনোম পড়তে পারব। পরিবেশবাদী একটি সংস্থা এ বছরের মধ্যে ১৩০টি জিনোম পড়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

কিন্তু এতো প্রকৃতির অসীম সৃষ্টির খুবই সামান্য কয়েকটির কথা। পৃথিবীর সকল জীবের সামগ্রিক ওজনের অর্ধেকই আসবে জীবাণুদের থেকে - আর আমাদের আপাত প্রাণীজগত তার হাজার ভাগের একভাগ মাত্র। সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে মুখভর্তি জল নিলে তার প্রতি মিলিলিটারে যে কয়েক লাখ জীবাণু আর ভাইরাস থাকে তাদের সম্পর্কে আমরা কতটা জানি? এজন্য আমি কয়েকজন উদ্যোগী তরুণ বিজ্ঞানী নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম সমুদ্রে। আমাদের লক্ষ্য ছিল জাহাজে চড়ে পৃথিবী ভ্রমণ করা আর প্রতি ২০০ মাইল দূরে সমুদ্রের জলের স্যাম্পলিং করে যথাসম্ভব নতুন জীবাণু আর ভাইরাসের সন্ধান করা। জাহাজটাকে জাহাজ না বলে একটা ৯২ ফুট লম্বা ইয়ট বলা ভাল। আমরা বারমুডা থেকে শুরু করে একে একে গেলাম পানামা খাল দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে, সেখা থেকে গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে ঘুরে এলাম দেশে। পথে সংগ্রহ করলাম সমুদ্রের জল, যা থেকে ফিলটার করে বের করা হবে নতুন নতুন প্রজাতির জীবাণু আর পড়া হবে তাদের জিনোম - আমাদের ল্যাবরেটরিতে। আমার মনে আছে সারাগোসা সাগরে পাওয়া ১ ব্যারেল জল থেকে পাওয়া গেল প্রায় ১৩ লক্ষ নতুন জিন আর ৫০,০০০ নতুন প্রজাতির সন্ধান। স্লোন ফাউন্ডেশনের প্রচেষ্টায় এখন একইরকমভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের বাতাসের মধ্যেও একইভাবে নতুন প্রজাতির সন্ধান শুরু করা হয়েছে।

তবে আমরা যতটা আশা করেছিলাম ফলাফল তার থেকে আমাদের বেশীই অবাক করেছে। আমরা ভেবেছিলাম উষ্ণতার পার্থক্যের জন্য প্রজাতির মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যাবে। আমাদের ধারণায় ছিল যে চোখের কোষে অবস্থিত ভিসুয়াল পিগমেন্ট বা আলোক সংবেদনশীল রঞ্জক প্রকৃতিতে খুবই কম প্রজাতিতে পাওয়া যায়। অথচ, সমুদ্রের উপরিভাগে অবস্থিত অধিকাংশ জীবাণুরই এই সংবেদনশীল রঞ্জক থাকে। তারা এই রঞ্জক ব্যবহার করে সূ্যালোক শোষণ করে, এমনকি, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ অবধি করে। আরো পাওয়া গেল এই জীবাণুদের মধ্যে রঙ সচেতন রঞ্জকের উপস্থিতি। নীল জলে মাঝ-সমুদ্রে বসবাসকারী জীবাণুরা নীল রঙ সংবেদনশীল, আর কোরাল রিফের জীবাণুরা স্বাভাবিকভাবেই চেনে সবুজ রঙ।

এবারে আসা যাক কৃত্রিম জীবনের কথায়। সবথেকে সরল জীবন ভাইরাস পরীক্ষাগারে তৈরী করা সম্ভব হয়েছে অনেকদিন হল। আমাদের সহকারী এক বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টায় এখন মাত্র দু-সপ্তাহে যথেষ্ট জটিল প্রকৃতির ভাইরাস তৈরী করা সম্ভব হচ্ছে, এখনো অবধি পোলিও ভাইরাস সহ দশ হাজার প্রজাতির ভাইরাস তৈরী করা গেছে এই পদ্ধতিতে। মোটামুটিভাবে, এখন যেসব ভাইরাসের জিনোম পড়া গেছে, তাদের কৃত্রিম উপায়ে তৈরী করাও সম্ভব। কিন্তু, নিজেদের পরিকল্পনামত ভাইরাস তৈরী করতে এখনো এক দশক লাগবে। তবে আশার কথা, আগামী দু-বছরের মধ্যে প্রোক্যারিওটিক কোষ আর দশ বছরের মধ্যে আমাদের শরীরের অংশ ইউক্যারিওটিক কোষ বানানো সম্ভব হবে।

জীবকোষ বানানোর পদ্ধতিও বেশ মজার। প্রথমে টুকরো টুকরো অবস্থায় বেস-পেয়ারগুলো তৈরী করা হয় - এগুলো আসলে কিছু রাসায়নিক ছাড়া কিছুই না। সেগুলোকরে জুড়ে তৈরী করা হয় সমগ্র একটি ক্রমোজোম। এই টুকরো জুড়ে গোটা ক্রোমোজম বানানোর কৌশল প্রকৃতি থেকেই শেখা। কয়েকটি বিশেষ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন বিকিরণের মধ্যেও বেঁচে থাকতে সক্ষম। প্রথমে বিকিরণে এদের ক্রোমোজোম টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও বারো থেকে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেআবার এরা তাকে জোড়া লাগাতে সক্ষম। এহেন অদ্ভুত ক্ষমতাধারী ব্যাকটেরিয়াকেই কাজে লাগানো হয় গোটা ক্রোমোজম বানানোর জন্য। বানানো গোটা ক্রোমোজম এর পরে স্থান করে নেয় পুরোনো একটি জীবকোষে, যার মধ্যেকার ক্রোমোজম আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংক্ষেপে এই পদ্ধতিই হল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং।

আমার বিশ্বাস জিনোম পড়া ও কৃত্রিম জীব সৃষ্টি মানুষের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে চলেছে। অনেক এমন জীবাণু পাওয়া গেছে যারা কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অনেকে বেঁচে থাকে জলের স্ফুটনাঙ্কে। পরিবেশের কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা কার্বন-মণো-অক্সাইড নিয়ে অনেকে অন্যান্য বায়ো-পলিমার উতপাদন করে যা তেলের পরিবর্তে ব্যবহার হতে পারে। নরওয়েতে মিথেন থেকে হাইড্রোজেন নিষ্কাশনেও এরকমই এক কৃত্রিম জীবাণু ব্যবহৃত হবে। ভবিষ্যতে রোবট নিজে থেকেই কৃত্রিম জীবাণু তৈরী করতে পারবে। ওষুধ আর রাসায়নিক শিল্পেও ব্যবহার হবে কৃত্রিম জীবাণু, কারণ এরা সহজেই জটিল থেকে জটিলতর রাসায়নিক উতপাদন করতে পারে, অতি সহজে ও কম খরচে। আরো মজার ব্যাপার, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রয়োগে সাইনোব্যাকটেরিয়ার ফটো-সিন্থেসিসে পরিবর্তন এনে উপজাত হিসাবে হাইড্রোজেন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে হাইড্রোজেন যদি জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয় তাহলে এই জীবাণুর ভূমিকা বাড়বে, সাথে আসবে আরো নতুন নতুন জীবাণু। এভাবেই আশা করা যাচ্ছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে আমাদের খাদ্য, শক্তি বা রাসায়নিক শিল্পে অপরিহার্য হয়ে যাবে।

কিন্তু এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও সমস্যার শেষ নেই। ১৯৯৯ সালে আমাদের প্রকল্প শুরুর আগে প্রায় দেড় বছর আমরা শুধু এথিকাল রিভিউতেই সময় দিয়েছি। সেও এক মজার ব্যাপার। বিভিন্ন ধর্মগুরুরা এসে তাদের ধর্মগ্রন্থ পড়ে সিদ্ধান্ত নেবার চেষ্টা করলেন যে কৃত্রিম জীবন তৈরী করা ধর্মীয় বিধিসংক্রান্ত কিনা। তারা তাদের ধর্মগ্রন্থে এর বিরোধী কিছু না পাওয়ায় আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। এর পরেও সমস্যা হল বায়ো-টেররিসম। কৃত্রিম জীবাণু বা ভাইরাস যে টেররিস্টদের কাজে ব্যবহার হবে না তা কে বলতে পারে? আর তা হলে পরিণতি হবে ভয়ানক। কিন্তু আমরা এখনো ততটা এগোতে পেরেছি বলে মনে হয়না। তাই আমি আশাবাদী, তার আগেই আমরা এর প্রতিরোধ করার উপায় বের করে ফেলতে পারব। আমি আপাতত স্লোন ফাউণ্ডেশনের সাহায্যে একটি প্রকল্পের সাথে যুক্ত আছি, যাতে এই সমস্যার প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায় খতিয়ে দেখছি।

তবুও বলে রাখা ভাল, বিজ্ঞান একটি পদ্ধতি মাত্র - ব্যবহারকারী মানুষ। যদি মানুষ একে ভুল পথে ব্যবহার করতে চায়, বিজ্ঞানের নিজস্ব সত্ত্বা তাকে আটকাতে পারে না। তাই মানুষের সমস্যা মানুষকেই মোকাবিলা করতে হবে। এ বিষয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং আর এটম বোমার খুব একটা তফাত নেই, ব্যবহার যেমন হবে আমাদের ভবিষ্যতও তেমনই এগোবে।

পুরো টক শো দেখতে হলে দেখুন এখানে


মন্তব্য

হিমু এর ছবি
দিগন্ত এর ছবি

আমার টক টা শুনে মনে হল পৃথিবীতে সত্যি কিছু মৌলিক কাজ হচ্ছে এখনও।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

মাহবুবুল হক এর ছবি

আপনি এত জটিল এবং তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে এত প্রাঞ্জল বাংলায় লিখেছেন যে শুধু বিষয়ের তারিফ নয় আপনার লেখারও প্রশংসা করতে হয়।

--------------------------------------------------------
দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে/ লিখি কথা ।
আমি যে বেকার, পেয়েছি লেখার/ স্বাধীনতা ।।

দিগন্ত এর ছবি

ধন্যবাদ সকলকে।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

ভাগশেষ এর ছবি

আপনার লেখার কল্যাণে অনেক কিছু জানতে পারলাম। আপনাকে ধন্যবাদ।

অনিন্দ্য রহমান এর ছবি

এইরকম একটা আলোচনাই সকাল থেকে খুঁজতেসিলাম।
________________________________________
Any day now, any day now,
I shall be released.


রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক

অতিথি লেখক এর ছবি

অসাধারণ একটা লেখা। অনুবাদ যে এত প্রাঞ্জল হতে পারে না দেখলে বিশ্বাস ই করতাম না।

বানানো গোটা ক্রোমোজম এর পরে স্থান করে নেয় পুরোনো একটি জীবকোষে, যার মধ্যেকার ক্রোমোজম আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংক্ষেপে এই পদ্ধতিই হল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং।

আমি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে আমি বুঝতাম যে ডিএনএ প্যালেন্ড্রমিক সিকোয়েন্স কাটাকাটি করে সেটাকে আবার কোষে চালান দেয়া।একদম নতুন ডি এন এ তৈরি করাও কি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মধ্যে পড়ে?
বায়ো-এথিইক্স নিয়ে কোন সর্বজনগ্রাহ্য নীতিমালা আছে কি?
আপনার সাথে যোগাযোগের একটা উপায় বাতলাবেন?
পথিক রহমান

দ্রোহী এর ছবি

আমিও জানতাম জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে মূলত জেনেটিক স্ট্রাকচারের মডিফিকেশনকেই বোঝায়।

কে জানে হয়তো নতুন আবিষ্কারটির সুবাদে অচিরেই নতুন কোন শব্দ পাবো!

আজ সকালে বক্তৃতাটি দেখার পর বায়োএথিক্স নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করছিলাম। বায়োএথিক্সের সাধারণ নীতিমালার জন্য এই পেপারটা দেখতে পারেন।

এছাড়াও http://www.bioethics.gov সাইটটিতে ২০০১-২০০৯ সময়ের মধ্যে প্রকাশিত একগাদা পেপার পাবেন।

দিগন্ত এর ছবি

মডিফিকেশন ও রিপ্লেসমেন্ট - দুইই জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। রিপ্লেসমেন্ট করা হয় সাধারনত তাই ওটাই খবরে আসে।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।


পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন, মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে । পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...।

দ্রোহী এর ছবি

আজ সকালেই বক্তৃতাটি শুনেছি।

লেখা প্রাঞ্জল হয়েছে।

স্পর্শ এর ছবি

দারুণ লেখা! এতদিন পরেহলেও চোখে যে পড়ল সে জন্য ভাগ্যবান মনে করছি নিজেকে। হাসি


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।