এপার, ওপার...

ফারুক হাসান এর ছবি
লিখেছেন ফারুক হাসান (তারিখ: শুক্র, ১৯/১০/২০০৭ - ১:২৮পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১.
গভীর রাতে শীতের বিছানা ভিজিয়ে ঘুম ভেঙ্গে দেখি আমার পাশে অজানা-অচেনা এক লোক শুয়ে আছে। মাথার পাশে টেবিলে রাখা টিমটিমে দোয়াতের আলোয় আরো দেখি- লোকটার গা ঘেষে শুয়ে আছে হাতেম কাকা। তারও পাশে আরেকজন অচেনা মানুষ।
এই গভীর রাতে পাঁচ-ছ ' বছর বয়সী আমার বালক মন হঠাত এক গভীর ভয়ে আচ্ছন্ন হয় যায়।
ভাত খাইয়ে, হিসু করিয়ে মাথায় মাফলার বেঁধে মা আমাকে শুইয়ে দিয়ে গিয়েছিল লেপের তলায়, দোয়াতটা মাথার কাছে রেখে। ফুফাতো ভাই খোরশেদ পড়ছিলো। খেয়ে দেয়ে তার শুতে আসবার তখনও অনেকটা দেরি। যাবার আগে মা বলল, 'তুই ঘুমা। পরে এসে আবার বাইরে নিয়ে যাবো।'
বাইরে মানে বাথরুম করতে যাওয়া। মাঝখানে একবার হিসু না করে আসলে বিছানা ভিজাবো নির্ঘাত। শীতের রাতে এই কান্ড করলে ভেজা লেপ-কাঁথা নিয়ে আর ঘুম হবে না।
মা আর আসে নি।
মনে হচ্ছে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। খোরশেদ ভাইকেও দেখছি না। হয়তো তাকে জমিতে পানি দেয় যে মেশিন, সেই ঘরে শুতে হয়েছে। চারদিক শুনশান। দোয়াতের পলতে শুকিয়ে গেছে, তেল শেষ। যে কোনো মুহুর্তে নিভে যেতে পারে। ভেজা শরীর নিয়ে, ভেজা লেপ গায়ে দিয়ে আমি ঠকঠক করে কাঁপতে থাকি। শীতে, তার চেয়ে বেশি ভয়ে।
মাঝখানে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, হাতেম কাকা মুখ ভর্তি চূড়ান্ত রকমের দাড়ি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন।
'কিরে, দিছিস তো বিছানায় মুইতা।' হাতেম কাকা হাসেন।
আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠি। 'কাকা, কখন আসলেন?'
'রাইতে আইছি।'
হাতেম কাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়েন, রাজনীতি করেন। যখন পলিটিক্সে গ্যান্জাম লাগে, হয়তো মারামারি কিংবা থানাপুলিশ, তখন মাঝে মাঝে গভীর রাতে বন্ধু -বান্ধব নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। কাকাকে আমার ভাল লাগে। তার বন্ধুদেরকেও। সবাই এত মজা করে! আবার লুকিয়ে থাকে। দাদার ভয়ে।
দাদা পলিটিক্সের প-ও সহ্য করেন না। ধর্মপ্রাণ, গম্ভীর দাদা যখন শুনেন যে হাতেম কাকা ঢাকা থেকে এসেছে, তখন তার কপালে চিন্তার রেখা ফোটে, ওজনদার একটা 'হুম' মেরে থমকে যান।

দাদী গোপনে বাইরের ঘরে খাবার পাঠায়। হাতেম কাকা তার বন্ধুদের নিয়ে সারাক্ষণ ওই ঘরে শুয়ে বসে থাকে, বিড়ি ফুঁকে আর মাঝে মাঝে দুনিয়া কাঁপানো হাসির ঢেউ তোলে। আমি গিয়ে বসে থাকি। ঝর্ণা আর রোকেয়া ফুফু দরজার আড়ালে দাড়িয়ে সেই হাসি শোনে, তারাওহাসে মিটিমিটি ।

প্রতি ঈদে দাদার বাড়ি যাওয়া একদম ধরাবাধা। সেবার ঈদে আমার বড় চাচাও দিনাজপুর থেকে আসেন। বড় চাচী এত বকবক করেন যে, দাদা পর্যন্ত বলেন, 'ও শান্তার মা, তুমি এত কথা যে কও!'
চাচী দাদার পাতে ভুড়ুঙ্গা মাছের মাথা তুলে দিতে দিতে মুখটিপে হাসেন আর বলেন, 'কী করবো আব্বাজান, কথা না কইলে কি ভালো লাগে?'
ঈদের আগের দিন রাতে আমার মা-চাচী মিলে ঘুমন্ত হাতেম কাকার গোঁফ কেটে ফেলার বুদ্ধি আঁটেন। হাতেম কাকা অপারেশনের ঠিক আগ মুহুর্তে কুচক্রীদের ধরে ফেললেও রফা হয়, দাড়ি-গোঁফের একটা ছবি তুলে রেখে তারপর কাটা হবে।
সেবার ঈদে আর সব জামা কাপড়ের পাশে হাতেম কাকা আমাকে দুইটা বই উপহার দেন। বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে লেখা ভবেশ রায়ের ছোটোদের বই। বানান করে করে আমি সেই বই পড়ি, আর আমার ফুফুরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়।

২.
মাঝে মাঝেই দাদা এসে আমাকে গ্রামে নিয়ে যান।তখন মা মৃদু নালিশ করার চেষ্ঠা করেন বাবার কাছে। ছেলের পড়াশোনা আছে, খাওয়া দাওয়ার কি হবে, এইসব। দাদা পাত্তা দেন না। দাদার হাত ধরে লঞ্চে করে যমুনা পার হই। তারপর হেটে এই গ্রাম ঐ গ্রাম করে এক সময় বাড়ির কাছে চলে আসি। দাদা হাটতে হাটতে আমাকে বলেন, 'ক তো, কোনটা আমাদের বাড়ি?'
আমি আঙ্গুল তুলে তখনও অনেক দূরে, ধান ক্ষেতের বিশাল চরার ওপারে আমাদের পাশের বাড়ির মোহনদের দেবদারু গাছ দেখিয়ে বলি,'ঐ যে, দাদা'।
মাগরিবের ওয়াক্ত পার হয়ে যায়। দাদা আমাকে এক গ্রামের মসজিদের কলপারে দাড় করিয়ে রেখে নামাজ পড়তে যান। আমি কালো চাদরের মত নামতে থাকা অন্ধকারে একা দাড়িয়ে থাকি; মসজিদের দেউরির কয়েকটা পোরা ইট, তিন-চার জোড়া স্যান্ডেল, এক জোড়া খড়ম আর একটা ভাঙ্গা বদনা আমাকে সাহস জোগায়- পাশের একটা কবরস্থানের আগরবাতির ধোয়ার মত ধুমায়মান ভয় এসে লাগে, ওপাশের একটা ঝোপে হয়তো লুকিয়ে থাকা পেত্নীর আবির্ভাব হতে হতেও হয়না। অবশেষে এক সময় দাদার নামাজ পড়া শেষ হয়, এক সময় আমরা বাড়ি পৌছি।
দাদী আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হন। বলেন, 'আইছস!'। রাতেই পিঠা বানান। মুঠো পিঠা, দুধের পিঠা, মাঝে মাঝে কুলি পিঠা। সকালে উঠে দেখি, দাদা কোরাণ শরীফ পড়ছেন, বিশাল উঠোনের ওপাশে তখন কামলারা গোয়ালঘর থেকে গরু বের করছে, খোরশেদ ভাই সাত সকালে গোসল করে টুপি, পান্জাবি, লুঙ্গি পড়ে হাতে বই নিয়ে বাংলাবাজার মাদ্রাসায় পড়তে যাচ্ছে। গোলাপ কাকার ঘরে পড়াশোনার তোড়জোড়।
কিছুক্ষণ পর দাদা সকালের নাস্তা করেন। যবের ছাতু, গুড় আর দুধ। আমি বসে যাই, 'দাদা, আমিও ছাতু খামু!'
গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত দাদার ছাতু ছাড়া চলে না। দাদা নিজে যবের চাষ করেন, দাদী নিজের হাতে সেই যব ঢেকিতে পিষে ছাতু বানান। বছরে একবার।
বিকালে দাদা তার বড় নাতীকে নিয়ে ঘুরতে বের হন। 'এই জমিতে হাল দেওন লাগবো, ঐ জমিতে ধান ভালো হইছে, আর ওইটাতে পাট। এইবার এই ক্ষেতে মরিচ লাগামু, ঐ যে পরপর কয়টা ধানি জমি, সব কয়টা আমাদের।'- এই সব কথা হয়, দাদা বলেন, আমি শুনি।
রাতেও দাদার সাথে শুতে হয়। প্রতিরাতে দাদার গল্প শুনি। কাদের জ্বিলানীর গল্প, শেখ সাদীর গল্প।
একদিন আব্বা আমাকে নিতে আসেন। মা পাঠিয়েছেন।
এদিকে দাদী বলেন, ও হাসমত, তোর পোলা থাক না আর কয় দিন। দাদা কিছু বলেন না।
আব্বা যমুনার এপার-ওপার দু'পারে ছেলের জন্য বিছিয়ে থাকা স্নেহের কোন পারে ছেলেকে নিয়ে ভিড়াবেন, তা ভাবেন।
একদিন আমি আবার যমুনা পেরোই।

৩.
সুঠামদেহী গোলাপ কাকা একবার একাই এক চোর ধরে ফেললেন। ভাইদের মধ্যে সবার ছোটো গোলাপ কাকা দারুণ ভলিবল খেলোয়াড়, গায়ে ভীষণ শক্তি, সব কাজে পাঁকা। চোর এসেছিলো তিনজন। দক্ষিণদুয়ারি ঘরভর্তি তখন শুকনা মরিচের পালা আর পাট। সেই পাট কিংবা মরিচ চুরি করতেই এসেছিলো তারা। গোলাপ কাকার আফসোস, বাকী দুটাকে ধরা গেল না।
পাশ টাশ করে গোলাপ কাকা সাবইন্সপেক্টরের চাকরিতে ইন্টারভিউ দিলেন। আব্বা ছুটলেন কাকে কত ঘুষ দিলে ছোটোভাইয়ের চাকরী নিশ্চিত হবে তা বের করতে। ফজলি আম গাছের বড় ডালে বিশাল দড়ি বেধে গোলাপ কাকা প্র্যাকটিস শুরু করলেন। মিনিটে দুইবার উঠেন, নামেন।
কিন্তু চাকরিটা হয় না।

হাতেম কাকা পাশের কলেজে চাকরী পেয়ে গেলে তার বিয়ে নিয়ে তোড়জোড় শুরু হলো। হাজার খানেক মেয়ে দেখে ঠিক হলো, ছাতারকান্দি গ্রামে বিয়ে হবে। বর্ষাকাল বলে নৌকা করে বরযাত্রা। নৌকায় বরবেশে হাতেম কাকা আসন গেড়ে বসেন, গোলাপ কাকার উপর পুরা ভ্রমণের দায়িত্ব, আব্বা-বড় চাচা দাদার সাথে। জনা পঞ্চাশেক বরযাত্রী। আর একটা ডাউস ব্যাগ, সবাই বলে বউয়ের জন্য লেদার, আর পাশে মিস্টির হাড়ি যার দায়িত্ব খোরশেদ ভাইয়ের উপর। আমাকে সারা রাস্তায় কাকার সাথে থাকতে হয়। নৌকার গলুইয়ে বসে আমার খুব আনন্দ হয়, একটা বিয়ে চারদিকে কেমন অদ্ভুত আনন্দরেণু ছড়িয়ে দেয়! আশেপাশের ছোটো ছোটো দ্বীপের মত বাড়িগুলো থেকে বউ-ঝি-মেয়ের দল উত্সুক নয়নে বরযাত্রা দেখে। কোনো কোনো পুরুষ গলা বাড়িয়ে জিঙ্গাসা করে,'কোন গ্রামে বিয়া গো?'
নৌকা থেকে জবাব যায়, 'ছাতারকান্দি, ছাতারকান্দি।'
বিয়ে বাড়িতে একটা কান্ড হয়। খোরশেদ ভাই আমাকে নিয়ে ভেতর বাড়িতে মিস্টির হাড়ি দিতে যান। হাতেম কাকার হবুশ্বাশুড়ি তার মেয়ের হবুশ্বাশুড়ির কাছে থেকে আসা প্রথম প্যাকেটটা খুলতেই মিস্টির বদলে একটা কোলা ব্যাঙ্ লাফ দিয়ে পড়ে।

আগে পরে ঝর্ণা ফুফু, রোকেয়া ফুফু সবার একে একে বিয়ে হয়ে যায়। খোরশেদ ভাইয়ের আর মৌলানা হয়ে উঠা হয় না। গোলাপ কাকা সরকারি স্কুলে শিক্ষকের চাকরীতে ঢুকেন। তার বেতের ভয়ে ক্লাসের সব ছাত্র জড়োসড়ো হতে থাকে। আমার বার্ষিক পরীক্ষার নম্বর বছর বছর ২০১, ৩৪৫, ৩৯৮ ঘুরে প্রাইমারি বৃত্তির যোগ্যতা অর্জন করে ।

তখন ছুটি কম। তবু নিয়ম করে প্রতি ঈদে দাদার বাড়ি যাওয়া হয়। যমুনার এপার ওপার করি বর্ষায়, শীতে, আম কাঠালের ছুটিতে।
তারপরও মাঝে মাঝে দাদা এসে মাকে বলে, 'ফেরদৌসি, ওরে নিয়া যাই। থাকুক কয়দিন খামারপাড়া আইসা।'
মা যুক্তি দেখায়, ওর স্কুল তো খোলা, সরকারি স্কুল, ছুটি তো নাই।
এভাবেই আমার ছেলেবেলা বছরের পর বছর আদর-মমতা-স্নেহের এক নদী হয়ে বয়ে চলে। আর সেই স্নেহনদীর দুই পারে থাকে দুই বাড়ি। একবার দাদার কূল ভেঙ্গে মা এপারে আমার জন্য মাতৃবাত্সল্যের ঘর বাধে, তারপর দাদা এসে আমাকে ওপারের গল্প শোনায়, জোর করে ওপারের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়, সেও রক্তঘটিত কি এক বাত্সল্যের বলে।

আমি কেবল এপার-ওপার করি।

(সচলায়তন ইবুক 'ফেলে আসা ছেলে বেলা'য় প্রথম প্রকাশিত)


মন্তব্য

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।