যে যায় সে যায়

ফারুক ওয়াসিফ এর ছবি
লিখেছেন ফারুক ওয়াসিফ (তারিখ: রবি, ২৩/০৩/২০০৮ - ১১:৪৯অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কাওরান বাজারের সামনের ফুটপাথে গুমুতের গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে তার মরণসংবাদ শুনলাম। মৃতুই বলতে চাইছিলাম কিন্তু জ ফলাটা কিছুতেই পড়ছিল না। রাতভর দুঃস্বপ্ন দেখেছি। কোন শীতের দেশ যেন। আবছায়া।
সকাল থেকেই চাপা চাপা ভাব_আকাশেও। এ ক'দিন ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে রাতে। সকালটা মেঘলা আর বাতাসভাসা। কোনো কিছুর সঙ্গে কোনো কিছুর সম্পর্ক নাই তবু আলফ্রেড হেঁটে আসছে ওদিক থেকে। আলফ্রেডের সঙ্গে এভাবে তো মাসে একবার দেখা হয়। ওই বলল, শহীদুল জহির মারা গেছে। ঠিক এরকম দিনে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মৃতুসঙবাদও শুনেছিলাম। রাগটা হলো সেই কারণেই। প্রথমবার শুনে বিষণ্ণতা ভর করেছিল। দুঃখ হচ্ছিল। মানুষটার কথাও মনে হচ্ছিল। এবার তাই রাগ হলো। এক দুঃখ বারবার ভাল লাগে না।
শোনার পর দুটো একটা কথাবার্তার পর আর কথা নাই। দুজন মিলে রাস্তা থেকে সরে সিগারেট ধরিয়ে তাকিয়ে আছি। দেখি মাহবুব মোর্শেদ যায়। ওই আরেকজন লেখক। মরণশীল। ওও জানে দেখি শহীদুল জহির আর নাই।
আরো অনেকেই খবরটা পেয়েছে এ শহরে। আরো কিছু লোক কাল জানবে। কিন্তু খুব কম লোকই জানবে একজন লেখক মারা গেছেন আজ। কিন্তু তাতে কী? এদেশে মৃততু এত নজরপাওয়া ব্যাপার নয়। এবং খুব কম লোকই জানবে লোকটা কে ছিল এবং কী ছিল তার বাঁচবার কাজ।
সময়টা এমন যখন চারপাশের জীবনতরঙ্গের একটা আঁচ পাওয়া জরুরি হয়ে ওঠে। এবং কম লোকই তা করে। জীবন বেশিরভাগের জন্যই একটা সুবিধামতো সিস্টেম গড়ে তুলে বা সেরকম কোনোটার ওপর ভর করে চালিয়ে যাওয়া। এর মধ্যেও কেউ কেউ পুরোটা মিলে কী হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করে। শহীদুল জহির এই কাজে বেশ এগিয়েছিলেন। অসমাপ্ত গানের বেদনার মতো এই মৃততু তাই বেদনা দেয়। একটা বড় ক্ষতি। কিন্তু এই বড় ক্ষতির বোধ কোথাও দেখা যায় না। সেরকম কিছু নাই বলেই হয়তো লিখে রাখছি যে, আজ আমরা আরো কিছু হারালাম ও হারলাম।
অনেক লোকের মধ্যে শোক চাপা রেখে ঘোরা কঠিন। এজন্যই বোধহয় মানুষ ব্যক্তিগত শোকে একা হয় আর সমবেত শোকে অনেকের মধ্যে যায়। শোকও একটা উৎসব। আমাদের মৃততু তে শোক ষোল আনা, অন্য কিছু নাই।
একা একা থাকতো লোকটা। কোনো সভা বা সাহিত্য পাড়ায় তাকে কখনো দেখা যেত না। এমনকি সাক্ষাতকারও দিত না। দুদক থেকে যে সব সচিব উপসচিবের সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছিল। তাতে সবচেয়ে কমের হিসাব ছিল দুজনের। একজন ডিসি আরেকজন একজন উপসচিবের। দুজনই অকৃতদার। আর আমাদের এই লেখকও ছিলেন অকৃতদার এবং উপসচিব। একা অবস্থাতেই নিজের কাছেও অকষ্মাৎ অপ্রস্তুত অবস্থায় শেষ হল তাঁর। একা একা বাড়ী থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে যেতে গিয়ে পড়ে যান। এর বেশি কিছু নাই। বাকি সব তার বইয়ে লেখা। কে যেন বলেছে না, কবিরে পাবে না জীবনচরিতে। কিন্তু কথাকারের কথা কি আর তার বইয়ে লেখা থাকে!
কে বলে মানুষকে তার কাজের মধ্যে পাওয়া যায়। যে মানুষটা ছিল তাকে আর কোনোভাবেই পাওয়া যায় না। পৃথিবী থেকে যে বস্তুস্বরূপ চলে যায় তা মায়াবি। তার না থাকায় তাকে আর পাওয়া যায় না। মৃততু ও জীবনের এই কুহক শহীদুলের গল্পে গল্পে খেলা করে। সেও সেইসব কুহকের কোনো একটির মধ্যে হারিয়ে গেছে। কিছুতেই আর পাবে না তারে। যে যায় সে যায়।
তাকে নিয়ে আলোচনা করবে লোকে। কিন্তু আমার ক্রোধ এখানেই যে, কেন এদেশে দরকারি লোকগুলো আগেই মারা যাবে। মৃতুতু কি নিরপেক্ষ ভাবতে পারি না। এখানে সবকিছুর বিপরীতে আলাদা কিছু করতে চাওয়ার চাপ এত বেশি যে তাতেই আয়ু ক্ষয় হয়ে যায়। লেখক ও বিপ্লবীকে এখানে একা একা বাঁচতে হয়। নিঃসার সমাজে স্পন্দন হয়ে ওঠা বহু সুখক্ষয়কর কাজ। মৃততু এখানে তাই করুণ রাগিনী ছাড়া আর কিছু নয়। লোকখ্যাতি, তা লোকেরা নিজেদের জন্য দেয়। দরকার হলে। লেখকের বাঁচা লেখক একাই বাঁচে। তখন তাকে একটা কল্পলোক তৈরি করে তার মধ্যে ডুব দিতে হয়। সেখানে সে বাস্তব বানায়। ওই বাস্তবতার সুড়ঙ্গ দিয়ে সে এই বাস্তবতার খোঁজ নেয়। শহীদুলের কল্প তাই কল্প নয়। জীবনের ভেতর কুহক ও ফাঁদ তৈরি করে তাতেও যা টিকে থাকে সেই বাস্তবতা অতি কঠিন। কল্পের ভেতরও যাকে সত্যি মনে হয়, তার থেকে সত্যি আর কী আছে! এই সত্যের ভারও তাকে একা একাই বয়ে যেতে হয়। তার অবসান যেন একটি বাতি নিভে যাওয়া। এক দাগ নীচে নেমে যায় পারদের দাগ। আর চারদিকে কেমন হিম হয়ে আসে। মৃততু শীতের মতো। জীবিতদেরও তা কিছুটা ছুঁয়ে যায়। হঠাৎ ভোরের বাতাসে যেরকম হিম ভেসে আসে।


মন্তব্য

আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

শুধু দীর্ঘশ্বাস ---

রাহা এর ছবি

তিনিও চলে গেলেন!!!!!

..হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দার জলে...

পরিবর্তনশীল এর ছবি

যারা রয়ে যায়...তাদের অসহায় করে দিয়ে যায়

---------------------------------
ছেঁড়া স্যান্ডেল

সুমন সুপান্থ এর ছবি

আশ্চর্য ! যে ক'বার মন্তব্য করলাম আপনার লেখায় ; ততোবার-ই মৃত্যুই বিষয় , গল্পের ! এইবারেরটা এমনই , দূর হাওয়ায় পাওয়া এই বেদনাবার্তা শুনে , আকাশে থাকালে দ্যাখি , কাল রাতে ও পূর্ণিমা ছিলো !! তাঁর কথা লিখবো বলে-ই বসেছিলাম । আপনার লেখা পড়ে , আর লিখতে ও পারছি না !

---------------------------------------------------------
নীল সার্ট নেই বলে কেউ আমাকে নাবিক বলেনি !
অথচ সমুদ্রে-ই ছিলাম আমি

---------------------------------------------------------
তুমি এসো অন্যদিন,অন্য লোক লিখবে সব
আমি তো সংসারবদ্ধ, আমি তো জীবিকাবদ্ধ শব !

ফারুক ওয়াসিফ এর ছবি

হ্যাঁ বোধহয় আমি একটু বেশিই বিষন্ন কথাবার্তা লিখছি। কী করা যাবে ভগ্নদূতের পেশা। পরেরটা হাসি হাসি লেখা লিখব নিশ্চয়।
::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
মনে হয় তবু স্বপ্ন থেকে জেগে
মানুষের মুখচ্ছবি দেখি বাতি জ্বেলে

হাঁটাপথে আমরা এসেছি তোমার কিনারে। হে সভ্যতা! আমরা সাতভাই হাঁটার নীচে চোখ ফেলে ফেলে খুঁজতে এসেছি চম্পাকে। মাতৃকাচিহ্ন কপালে নিয়ে আমরা এসেছি এই বিপাকে_পরিণামে।

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

আপনার বেদনা আমাকেও ছুঁয়ে গেল।

====
চিত্ত থাকুক সমুন্নত, উচ্চ থাকুক শির

ধুসর গোধূলি এর ছবি
মাহবুব লীলেন এর ছবি

তার লেখাগুলোর কী হবে?

সুলতানা পারভীন শিমুল এর ছবি

আপনার লেখা পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল।

...........................

সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন

...........................

একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা

শেখ জলিল এর ছবি

শহীদুল জহির-এর অল্প কয়েকটি গল্প পড়েছিলাম। তখনই আকৃষ্ট হয়েছিলাম তাঁর লেখায়। টিভি চ্যানেলে তাঁর গল্প অবলম্বনে নাটক 'কোথায় পাবো তারে' বেশ সাড়া ফেলেছিলো।
..তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে খুব খারাপ লাগছিলো সেদিন।

যতবার তাকে পাই মৃত্যুর শীতল ঢেউ এসে থামে বুকে
আমার জীবন নিয়ে সে থাকে আনন্দ ও স্পর্শের সুখে!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।