ধূমায়ুধ

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: রবি, ০৩/০৩/২০১৯ - ৪:৫৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বুধো আচমকা থমকে গিয়ে নাকটা ওপরে ওঁচাতেই তার মস্ত শিংদুটো সিধুর পাঁজর থেকে বিঘৎখানেক দূরে এসে থিতু হলো। সিধু পেছনে হেলে বসে বুধোর পিঠে কম্বলের ওপর চাপানো কাঠের আসনটার শিং এক হাতে শক্ত করে ধরলো। বুধো আচমকা ঘুরে ছুট লাগাতে পারে; তখন ছিটকে পড়লে সিধু জখম তো হবেই, বুধোর পায়ের নিচে পড়লে মৃত্যুও অসম্ভব নয়।

সিধুর হাঁটুর নিচে বুধোর প্রকাণ্ড ফুসফুস কয়েকবার ফুলে ফুলে উঠলো, নাক দিয়ে ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে দু'পা পিছিয়ে এলো বুধো। লক্ষণ ভালো নয়। ধনুকটা খাপ থেকে টেনে বের করে হাতে নিলো সিধু। বৈরী গন্ধ পেয়েছে বুধো, কিন্তু পালাবে না সে। তার মানে দাঁড়ায়, গন্ধটা শ্বাপদের নয়।

অনুরুদ্র থোণ্ডুপ অবশ্য আশ্বাস দিয়েছিলেন সিধুকে, এ তল্লাটে বাঘ নেই। ডোরাবাঘা গুলবাঘা হুঁড়ল নেকড়ে কিছুই না। সিধু ভালুকের কথা শুধিয়েছিলো, থোণ্ডুপ স্বভাবসুলভ ঠাণ্ডা হেসে বলেছিলেন, ভালুক তো মধু খায়। জাম খায়।

সিধু মনে মনে বলেছিলো, তোমার মাথা খায়, কিন্তু কথা বাড়ায়নি। রৌশনমঠের কাছে তার মোট দেনা বাহাত্তর মাসের সেবা, শোধ হয়েছে মাত্র আট মাস। চৌষট্টি মাসের এই জগদ্দল দেনার ঘুড়ির নাটাই এখন থোণ্ডুপের হাতে। সিধু বেয়াড়াপনা করলে থোণ্ডুপও মাস গুণতে বেয়াড়াপনা করবেন, সেটা শুরুতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি।

সহৃদয়, উদারচিত্ত অনুরুদ্র রাবতেনের কথা মনে পড়ে গেলো সিধুর, কিন্তু শোকরোমন্থনের সময় এটা নয়। বুধোর খুর পথের মাটি আঁচড়ালো দু'বার, সিধু আর ঝুঁকি না বাড়িয়ে ঊরুতে বাঁধা তূণ থেকে চারটি শর মুঠোয় নিয়ে লাফিয়ে মোষটার পিঠ ছাড়লো। বুধো এগোবে না, পিছুও হটবে না, তার মাথাটা এরই মাঝে নেমে এসেছে বুকে, সুতীক্ষ্ন ধনুরাকৃতির শিং দুটো সদর্প সড়কির মতো চেয়ে আছে সামনের দিকে। মানুষের ঘ্রাণ পেয়েছে বুধো। শুধুই মানুষ?

পথ বেঁকে গেছে সামনে, দূর থেকে ক্ষীণ হ্রেষা ভেসে এলো। সিধু আড়চোখে একবার নিজের গলায় জড়ানো বেগুনি উত্তরীয়টা দেখে নিলো। নিরানুপ পাহাড়ে মানুষের বাস নেই, ঘোড়া হাঁকাতে পারে একমাত্র সেনাছাউনির লোকজন, যাদের কাছে বুধোকে রেখে সিধু বাকিটা পথ পায়ে হেঁটে এগোবে। কিন্তু অনুরুদ্র থোণ্ডুপের যোগানো দিশানটা যদি ঠিক থাকে, আরো একদিন পথ চললে ছাউনিতে পৌঁছানোর কথা সিধুর। কিন্তু অনুরুদ্র থোণ্ডুপ কবেই বা ঠিক দলিল যুগিয়েছেন সিধুকে?

ছিলায় একটা তির পরিয়ে বাকিগুলোয় মুঠোয় রেখে সিধু টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বুধোকে আশ্বাস দিলো, "র বুধো, র।" বুধো বিশেষ পাত্তা দিলো না তাকে, তার মস্ত শরীর টানটান হয়ে আছে। বিরঙ্গী পারের মহিষ বুধো, এক পলের মাঝে প্রলয়ঙ্কর বেগ তুলতে পারে তার চারটি পা, সংঘর্ষের পাল্লা লড়লে মস্ত পশ্চিমা ঘোড়াকেও ছেড়ে কথা কইবে না সে। কিন্তু পশ্চিমা ঘোড়ার মতো প্রশিক্ষণ বুধোর ঝোলায় নেই, মাঝপথে ভড়কে গিয়ে সে উল্টোদিকে ছুট লাগাতে পারে, যদি না সিধু তার সওয়ার হয়ে থাকে।

হ্রেষা ফের ভেসে এলো, এবার আরেকটু কাছ থেকে, সিধু কাঁধ নেড়ে পেশীগুলো খেলিয়ে নিলো একটু। কাঠের বর্মটা বুধোর পিঠে বাঁধা ঝোলায় আছে, কিন্তু বর্ম পরে তির চালাতে গেলে ক্ষিপ্রতার সাথে আপোষ করতে হয়। যদি অচেনা অপরপক্ষ বৈরী হয়, আর একাধিক তিরন্দাজ যদি থাকে তাদের মাঝে, আগুয়ান তিরের সামনে তার একমাত্র ঢাল বুধো।

অনুরুদ্র রাবতেনের সদয় মুখখানা ফের মনে পড়ে গেলো তার। অভিযানে পাঠানোর আগে রাবতেন সস্নেহে ছোট একটা প্রার্থনা করতেন সিধুর মঙ্গল চেয়ে। থোণ্ডুপের মাঝে তেমন সহৃদয়তার চিহ্নমাত্র নেই। রাবতেনের জায়গাটা থোণ্ডুপ পেয়েছে, এর মাঝেই প্রলয়ের ইঙ্গিত আছে। রাজমঠ থেকে এসব কলকাঠি যারা নাড়ে, তারা কেমন পাঁঠা, এ থেকেই বোঝা যায়। বৃদ্ধ রাবতেনের জায়গাটা যুবক থোণ্ডুপকে দেওয়ার একটাই কারণ থাকতে পারে, রাজমঠ আরো মারমুখো হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কি রাজারই অভিলাষ, নাকি রাজানুরুদ্রের খেয়াল, সিধুর জানার উপায় আপাতত নেই।

বাঁকের ওপাশে একটা ঘোড়া দু'বার অস্থির স্বরে ডেকে উঠলো, সিধু শরীরের প্রস্থ পথের দিকে ফিরিয়ে তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে একটা হাত বুধোর পাঁজরে রাখলো। "র, বুধো, র।" বুধো ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে মাথাটা ঝাঁকালো শুধু।

এবার মনুষ্যকণ্ঠ ভেসে এলো সাবলীল সজ্জিৎ ভাষায়, "স্বস্তি! কে যায়?" গাছের ডাল ছেড়ে একঝাঁক টিয়া ডানা ঝটপটিয়ে উত্তরে উড়াল দিলো সে হাঁক শুনে।

সিধু এবার এগিয়ে গিয়ে বুধোর নাকের হাড় ফুটো করে পরানো কড়াটা নিজের মুঠোয় নিলো। বুধো ব্যাপারটা পছন্দ করে না, কিন্তু কড়ায় সিধুর হাত পড়লে ছাগশাবকের মতোই অসহায় হয়ে পড়ে সে। ঘোঁৎকার তুলে একবার খরখরে জিভ বের করে সিধুর কব্জিটা চেটে নিলো সে, তার বারোমণী শরীরজোড়া পেশী শিথিল হয়ে এলো।

"সোয়াস্তি!" পাল্টা হাঁকলো সিধু। সজ্জিৎ ভাষায় তার দখল কমজোরি, লৌকিৎ দিয়েই কাজ চলে যায় তার। "রঙ্গারিডির রাজমঠের লোক আমি! মশায়ের পরিচয় কী? ক'জন আসছেন?"

খানিক নীরবতার পর হাঁক ভেসে এলো, "খুশকিনার সেনানী আমি! একা চলছি।" আবারও খানিক থেমে হাঁক ছাড়লো খুশকিনার সেনানী, "রৌশন রুদ্র রক্ষে!"

সিধুর ভুরু কুঁচকে উঠলো। খানিকটা বিদ্রুপ কি মেশানো ছিলো রুদ্রবচনে? খুশকিনায় রৌশনিদের তেমন দাপট নেই, কিন্তু রাজশক্তির তরফ থেকে কোনো বিরাগও নেই। বুধোর নাকের কড়া ছেড়ে দিয়ে হাতে ধরা তিরগুলো জুৎ করে ধরলো সে। "রৌশন রুদ্র রক্ষে! গগন না বিদারে!" রৌশন রুদ্র কাকে কতক্ষণ রক্ষা করেন কে জানে? আর দুই আগন্তুকের মুখোমুখি সাক্ষাতে একবার পরিস্থিতি টকে গেলে গগন বিদীর্ণ হওয়া বিপলের ব্যাপার।

এবার বাঁক ঘুরে খুশকিনার সেনানী এগিয়ে এলো। ঘোড়া থেকে নেমে সেটার পাশাপাশি হেঁটে আসছে সে; এক হাতে নিঃশর ধনুক, আরেক মুঠোয় ঘোড়ার লাগাম। ধনুকটা দীর্ঘ, দ্বিবঙ্কিম, খয়েরি চামড়া মুড়ে সেলাই করা। সেনানীর পরনে সবুজ উর্দি, কোমরে কমলা কোমরবন্ধ, পায়ে ধুলোমাখা জুতো, মাথায় ঊষ্ণীষ নেই, মাথাভরা উশকোখুশকো খয়েরি চুল। সিধুর ভুরু খানিকটা কুঁচকে উঠলো লোকটার চেহারা দেখে। খুশকিনার লোক মোটামুটি ফর্সা, সেখানকার বাঈজিদের গোলাপি ত্বকের সুনামে রঙ্গারিডির নানা সরাই-শুঁড়িখানা গুলজার; কিন্তু এ সেনানী লালচে তামাটে চামড়ার লোক। সিধুর সতর্ক চোখ লোকটার তূণ খুঁজলো, কিন্তু মুখোমুখি দর্শনে ঘোড়া বা আরোহী, কারো গায়েই তূণ বাঁধা দেখা যাচ্ছে না।

ঘোড়াটা অস্থির হ্রেষা তুললো বুধোকে দেখে, বা শুঁকে। ঘোড়াটাকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে বুধোর মারমুখো ভাব এখন অনেকটা কমে এসেছে, কিন্তু একবার পিলেকাঁপানো নিনাদ ছাড়লো সেও। খুশকিনি সেনানী ধনুক মাথার ওপর তুলে ফের বললো, "স্বস্তি, দূত মহাশয়!" সিধুর বেগুনি উত্তরীয় থেকে চোখ সরিয়ে পাকা চোখে তার তূণ-তির-ধনুক মেপে নিলো সে। "অস্ত্র সংবরো বন্ধু!" লৌকিৎ বুলিতে বললো সে, বিচিত্র একটা টান আছে তাতে।

সিধু ডান হাতের শরগুলো তূণে গুঁজে রাখলো। "একা তুমি, বন্ধু? ঠিক তো?"

সেনানীর মুখে হাসি ফুটলো, কিন্তু তাতে আশ্বাসদানের চেষ্টা নেই। "সেরকমই জানি।" নিজের ধনুক ঘোড়ার পিঠে বাঁধা খাপে পুরলো সে, চোখ বুধোর ওপর। "বিচিত্র বাহন তোমার। রঙ্গীরাজের পয়সার টানাটানি চলছে নাকি? গরুতে চাপিয়ে দূত ঠেলছেন যে?"

"মহিষ।" সেনানীর ঘোড়াটা দেখে নিলো সিধু। ঘোড়া সম্পর্কে সে জানে কম; জন্তুটা যে তটস্থ হয়ে আছে, তা টের পেতে অবশ্য অশ্ববৈদ্য হতে হয় না। বুধোর পিঠ চাপড়ে কড়া ধমক দিলো সে, "র বুধো!"

বুধো সন্তর্পণে এক পা এগিয়ে বাতাস শুঁকলো, তার হিজলঢাকা-দীঘিরজলের-মতো কালো দুটি চোখ ঘোড়া থেকে সরে সেনানীর দিকে ফিরলো, শিং দুটো একবার ধীর লয়ে নাড়লো সে। জলমহিষের চোখ তেমন সরেস নয়, বুধোর পৃথিবী গন্ধ-শব্দ-স্পর্শে শাসিত। সিধু সতর্কতায় ঢিল না দিয়ে বললো, "থামো বন্ধু। ওখানেই দাঁড়াও। নাম কী তোমার? এত দূরে একা কী করো? যাচ্ছো কোথায়?"

সেনানী লাগাম মুঠো থেকে না সরিয়েই ঠেস দিলো ঘোড়ায় গায়ে। জন্তুটার নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে তখনও, বুধোর উপস্থিতি ত্রস্ত করে তুলেছে তাকে। "খোবরাৎ ডেকো আমায়। আর যদি জিভে সজ্জিৎ কুলায়, শুভব্রত।" মাটিতে থুথু ফেলে কোমরবন্ধে আঙুল রাখলো খোবরাৎ। "অন্তপালের মুষ্ঠিক আমি, যাচ্ছি নিরানুপের গোড়ায় সেনাফাঁড়িতে।" সিধুকে খুঁটিয়ে দেখছে সে নিরুদ্বিগ্ন চোখে। "জরুরি কাজ আছে।" একটা হাত এবার কবির লড়াইয়ের ঢঙে সিধুর দিকে মেলে ধরলো সে।

সিধু উত্তর দেওয়ার আগে সময় নিলো। আর কোনো সাড়াশব্দ নেই আশেপাশে। সাবধানে বুধোর গায়ে বাঁধা খাপে ধনুকটা পুরে ছিলার তিরটা তূণে গুঁজলো সে। "সিধু আমার নাম।" দু'পা এগোলো সে। "নিরানুপ পাহাড়ের পুবদিক রঙ্গারিডিতে পড়েছে। ওখানে খুশকিনার সেনাফাঁড়ি গজালো কবে?" মুষ্ঠিক, মানে কুড়িজন সৈন্যের কর্তা খোবরাৎ। লোকটার স্পর্ধা কম নয়, সিধুকে তুমি ডেকে যাচ্ছে। এই বেগুনি উত্তরীয় দেখলে রঙ্গীর পুব তীর থেকে বিরঙ্গীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত সবখানে বড় বড় সেনাকর্তারা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এ তাচ্ছিল্যের কারণ কী?

খোবরাৎ কাঁধ ঝাঁকালো, "খুশকিনার সেনাফাঁড়িতে যাচ্ছি, এমনটা তো বলিনি।" ঘাড় কাত করলো সে। "রঙ্গীরাজের উড়ুনি ঝুলছে তোমার গলায়। কিছু মনে করো না বন্ধু... কিন্তু এমন উড়ুনি যাদের গলায় ঝোলে, তারা সঙ্গে পাইক-চাকর হাতি-ঘোড়া নিয়ে চলে।" চোখ কুঁচকে বুধোকে আরেকবার দেখে নিলো সে। "এ জিনিস তুমি বাগালে কী করে?"

সিধু খোবরাতের ঘোড়াটাকে মন দিয়ে দেখার ভান করলো। "নিরানুপের ফাঁড়ি উল্টোদিকে, সে কথা জানো?"

খোবরাৎ স্পষ্টই অপ্রস্তুত হলো সিধুর কথা শুনে। সরু পথের দু'পাশে হেলে পড়া গাছের আড়ালে আকাশের দিকে চট করে একবার চেয়ে ভুরু কোঁচকালো সে, "মোটেও না। আরো একদিন পুবদিকে এগোলে...।"

সিধু কথা না বাড়িয়ে বুধোর আসনে বাঁধা পৈঠায় পা রাখলো। "এ পথ সামনে দু'ভাগ হয়েছে। ঈশানে এগোলে ফাঁড়ি পড়বে। ওখানেই যাচ্ছি আমি।"

খোবরাৎ ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইলো সিধুর দিকে। "দিশান আছে তোমার কাছে?" অনিশ্চিত কণ্ঠে শুধালো সে।

সিধু জবাব না দিয়ে বুধোর পাঁজরে গোড়ালি দিয়ে চাপ দিলো। বুধো ঘোঁৎকার তুলে শিং দোলাতেই ঘোড়াটা চমকে উঠে পিছিয়ে গিয়ে পথ থেকে নেমে ঝোপ ঘেষে দাঁড়ালো, খোবরাৎ টাল হারিয়ে সরে দাঁড়ালো পথ ছেড়ে। সিধু তাকে পাশ কাটিয়ে বুধোকে উল্টোবাগে ঘোরালো। "যেদিকে যাচ্ছো, ওদিকে কাঠুরেদের গাঁ ছয় প্রহরের পথ। ডোবা পাবে দু'প্রহর চললে। তোমার মশক কই?"

খোবরাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘোড়াটাকে টেনে হিঁচড়ে ফের পথে এনে তাতে চাপলো। "আমারও ভুল হতে পারে বৈকি।" গলা খাঁকরালো সে।

সিধু নীরবে বুধোকে এক পাশে সরিয়ে খোবরাৎকে আগে চলার ইঙ্গিত করলো। লোকটা বিদেশি, বেয়াড়া, এবং দিশিকানা। কিন্তু সশস্ত্র। ওকে সঙ্গে নেওয়া বিপজ্জনক, কিন্তু পেছনে রেখে যাওয়া অস্বস্তিকর।

খোবরাৎ সিধুকে পাশ কাটানোর সময় বুধোর পর্যাণসজ্জা মন দিয়ে দেখে নিয়ে ঘোড়ার পেটে জুতো ঠুকলো।

সিধু স্বল্পবিত্ত মানুষ, কিন্তু বুধোর পর্যাণ বাবদ কিপ্টামি করেনি সে। উঁচুদেশের পশমের খোলে খড় পুরে বোনা কম্বলে তেলমাজা কাঁঠাল কাঠের আসন বসানো, তাতে চামড়ার পাকানো দড়িতে কাঠের পৈঠা বাঁধা। বুধোর মুখে লাগাম নেই, কিন্তু কপালে কম্বলমোড়া পুরু কাঠের ফলক ঘাড় আর চোয়ালের সাথে বাঁধা। পাকা অশ্বারোহী পর্যাণ দেখেই টের পাবে, এর আরোহী লড়াইয়ের জন্যে তৈরি।

খোবরাৎ পাশ কাটানোর সময় ঘোড়ার দুমচির সাথে বাঁধা ফাঁকা তূণটা দেখতে পেলো সিধু। জিজ্ঞাসাটা হাওয়ায় ফুরিয়ে যেতে দিলো না সে, "তোমার মশক কই?"

খোবরাৎ ঘাড় ঘোরালো না, "সে এক লম্বা গল্প, বন্ধু সিধু। ...তা ফাঁড়িটা এখান থেকে কতদূরে যেন বললে?"

সিধুর ভুরু কুঁচকে উঠলো। "আট প্রহর। ঘোড়া ছোটালে চার প্রহর।"

খোবরাৎ নাক টানলো। "একসাথেই যাই তাহলে, কী বলো?" ঘোড়াটা তার পায়ের ইশারায় ছটফটিয়ে উঠে একটু দুলকি চালে এগোনো শুরু করলো। "তা কী কাজে এমন একাবোকা হয়ে ফাঁড়িতে যাচ্ছো তুমি? নাকি আরও লোক আছে সাথে?"

সিধু কথা বাড়ালো না। খোবরাৎ ঘাড় ফিরিয়ে হাসলো একবার। "তুমি কিন্তু এখনও বললে না, ঐ উড়ুনি কেমন করে পেলে?"

মঠের কাজে বেরিয়ে শুরুর দিকে এ প্রশ্নটা রঙ্গারিডির সৈন্যদের মুখে উচ্চারিত হতে না শুনলেও চোখে বহুবার দেখেছে সিধু। শুরুর দিকে বারবার আটক হয়েছে সে, চড়থাপ্পড় খেয়েছে, উত্তরীয়ের সঙ্গে যোগানো পাঞ্জা দশ কর্তা শতবার মিলিয়ে দেখেছে। রাবতেনের পরামর্শে সিধু তারপর এক ফাঁড়ি থেকে জনাচারেক সৈন্য হুকুম দিয়ে চেয়ে নিয়েছে পরের ফাঁড়িতে এ বিড়ম্বনা এড়াতে। বিরঙ্গী পারের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ কোনো হান্তুলের গায়ে এ উত্তরীয় মানায় না এখনও। গত চৌদ্দ বছরে বিভিন্ন নগরে-পট্টনে-বন্দরে-ফাঁড়িতে সিধুর মুখ রঙ্গীসেনা চিনে নিয়েছে ক্রমশ, কিন্তু তাদের চোখমুখ থেকে অভ্যাসে বড়জোর সন্দেহটা আবছা হয়েছে, অস্বস্তিটা নয়। হান্তুলরা বিরঙ্গীর পশ্চিম পারে থাকবে, জঙ্গল কেটে জমি চৌরস করবে, শূকর পোড়াবে আর ন্যাংটো নাচবে। রঙ্গীরাজের মসলিন কেন ঐ কেলে ভূতগুলোর একজনের গলায় চড়বে?

সিধু শিস বাজিয়ে বুধোকে গতি বাড়ানোর সঙ্কেত দিলো। "রাজমঠের লোক আমি।"

খোবরাৎ সিধুকে অপাঙ্গে আরেকবার দেখে নিয়ে হাসলো। "ফাঁড়ির ঠোলাদের কি আজকাল রাজমঠ থেকে লোক পাঠিয়ে রুদ্রগান শোনাতে হয়? তারা নিজেরা কাজ চালাতে পারে না?"

সিধু ভুরু কোঁচকালো। খোবরাৎ বেশ নিশ্চিন্তে আছে, তার বা তার ঘোড়াটার মাঝে জঙ্গল নিয়ে কোনো উৎকণ্ঠা দেখা যাচ্ছে না। নিরানুপের গোড়ায় জঙ্গলটা হয়তো নিরাপদই, কে জানে? কিন্তু কাঠুরেদের গাঁয়ে থেমে রসদ তোলার সময় তারা শুকনোমুখে জানিয়েছে, ফাঁড়ির পথ তারা বছরপাঁচেক ধরে আর মাড়াচ্ছে না, তেমাথা পর্যন্তই তাদের আনাগোনা। গ্রামবুড়ো সিধুর প্রশ্নের জবাবে মাথা চুলকে শুধু বলেছে, গেরো আছে। গেরো কী নিয়ে, সে আলাপ করলে নাকি অমঙ্গল হবে।

অনুরুদ্র থোণ্ডুপ জানিয়েছেন, নিরানুপ পাহাড়ে ধূমায়ুধ আছে। ধূমায়ুধ কী, সে প্রশ্নের জবাবে স্বভাবসুলভ স্নিগ্ধ হেসেছেন। ওটাই জেনে এসো, বলেছেন তিনি।

ধূমায়ুধ যা-ই হোক না কেন, গত পাঁচ বছরে চারটি পৃথক সেনাদল নিখোঁজ হয়েছে নিরানুপে। সব মিলিয়ে কুড়িদুয়েক সৈন্য। দ্বিতীয় দল গেছে প্রথম দলকে খুঁজতে, তৃতীয়টি দ্বিতীয়টির সন্ধানে, এভাবে একে একে চারটি দল উবে গেছে বেমালুম। পঞ্চম দলটি সংখ্যায় ভারি, দু'জন অভিজ্ঞ বিংশীর নেতৃত্বে এক কুড়ি পাহাড়ি সৈন্য বছরখানেক ধরে বার্তা পাঠিয়ে যাচ্ছে ফাঁড়ি থেকে। সন্দেহজনক কিছুই পায়নি তারা, কিন্তু আগের দলগুলোরও কোনো পাত্তা নেই।

ধূমায়ুধের পাল্লায় পড়লো কি তারা? এমন বিদঘুটে প্রশ্নগুলোর উত্তর টোকানোর কাজ থোণ্ডুপ যেন বেছে বেছে সিধুর জন্যেই আলাদা করে রাখেন।

"আপনিও সঙ্গে চলুন না, প্রভু।" সিধু নিরাবেগ মুখে সেধেছে থোণ্ডুপকে। থোণ্ডুপ বাছুরপিলানো গাভীর মতো পরিতৃপ্ত হেসে বলেছেন, "যেতুম। কিন্তু কতো জরুরি কাজ হাতে। রৌশন রুদ্র রপ্তে!" তারপর চামারের মতো পল-প্রহর গুণেগেঁথে সিধুর দেনার খাতায় দুটো দিন কম কেটেছেন।

উত্তর মিলবে না, এমন অনুমান মাথায় নিয়েই বিদায়ের আগে শুধিয়েছিলো সিধু, নিরানুপে সৈন্যদের প্রথম দলটা গিয়েছিলো কেন?

থোণ্ডুপ জবাবে কিছুক্ষণ স্মিতমুখে চেয়ে থেকেছেন সিধুর দিকে। তাঁর অভিব্যক্তিতে ঢোল পিটিয়ে বলা ছিলো উত্তরটা, রঙ্গীরাজের সেনা কোথায় কেন যায় সেটা নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই। পুঁথির পাটার বাঁধন খোলার আগে জানালা দিয়ে এক ঝলক আকাশটা দেখে নিয়েছেন অনুরুদ্র, অস্ফুটে বলেছেন, বেলা ঢলে গেলো।

সিধুর মনের সতর্ক অংশ কড়া নাড়লো স্মৃতিমগ্ন পড়শীর দোরে। খোবরাৎ চঞ্চল ভঙ্গিতে বারকয়েক আকাশ দেখে নিলো। পাতার বারণ টপকে রোদের যে কঞ্চিগুলো বুনো পথকে আশ্বাস দিয়ে চলছিলো, সেগুলো হারিয়ে গেছে হঠাৎ। দূরে গুমগুম শব্দ শুনে বুধো মাথা দুলিয়ে সানন্দ হাঁক ছাড়লো একবার। চলার পথে গা ডোবানোর মতো ডোবা খুব বেশি পায়নি বেচারা। থোণ্ডুপও সতর্ক করেছিলেন, নিরানুপ শুকনো দেশ।

খোবরাতের ঘোড়া গুটি গুটি পায়ে হাঁটছে, বুধো সেটাকে ধরে ফেললো পলদুয়েকের মাঝে। খোবরাৎ ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দু'হাত পাতাঢাকা আকাশের দিকে তুলে গমগমে গলায় কী যেন বলে উঠলো। সিধু সজ্জিৎ এমনিতেই কম বোঝে, শ্লোকের শব্দগুলো আরো দুর্বোধ্য ঠেকলো তার কাছে। খোবরাতের কণ্ঠে আকুতি অবশ্য স্পষ্ট। আকাশের কাছে কী চাইছে সে, কে জানে? রঙ্গী নদীর খাত থেকে দু'দিনের দূরত্ব পেরোতেই গ্রাম আর পান্থপালিতে রৌশনিদের উপস্থিতি তেমন আর চোখে পড়েনি সিধুর, সেখানে গগনিয়াই বেশি। ঊষর খুশকিনায় নাকি প্রায় সকলেই গগনপূজারী।

খোবরাতের হাত দুটো এসে কপালে ঠেকলো। সিধুর কানে "সূর্য-চন্দ্র-বজ্র-বৃষ্টি-জাদু" অংশটুকু চেনা ঠেকলো। খোবরাৎ হাত নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেঁকে উঠলো, "গগন না বিদারে!" গাছপালা থেকে এক ঝাঁক পাখি নানা স্বরে চেঁচিয়ে উড়ে গেলো সামনে।

পথ আরো ছায়াচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে, বুধো সোৎসাহে হঠাৎ জোর কদমে চলা শুরু করেছে, ঠাণ্ডা কাদার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দূরের আকাশ হাতছানি দিচ্ছে মোষটাকে। সিধু মৃদু গলায় বললো, "সামনে চলো বন্ধু।"

খোবরাৎ সিধুকে আড়চোখে বেশ মন দিয়ে মেপে পাশে চলতে লাগলো। "এদিকে পথঘাট সব তোমার চেনা? আগে এসেছো?"

সিধু নীরবে মাথা নাড়লো। খুশকিনার একাকী সেনানী নিরানুপে বিনা মশকে ফাঁকা তূণ নিয়ে কী করছে, সে কথা জানা দরকার। কিন্তু খোবরাৎ শুরু থেকে উল্টে সিধুকেই জেরা করে যাচ্ছে সমানে।

খুশকিনার সাথে রঙ্গারিডির সম্পর্ক অম্লমধুর, যেমনটা সব পড়শীর মাঝে থাকে। সিধু ছেলেবেলায় মঠে পরপর দু'বছর যুদ্ধের প্রস্তুতি দেখেছে, যুবাবয়সে রাবতেনের গোপন বার্তা নিয়ে দু'বার পশ্চিম সীমান্তে যাতায়াত করতে হয়েছে তাকে। ভূমৌলি পর্বত থেকে রঙ্গী পৃথিবীর আধেক আশীর্বাদ বয়ে এনে যেন বিলিয়ে দিয়েছে রঙ্গারিডির পশ্চিম থেকে দক্ষিণে; মাটি সেখানে বছরভর যেন সোনা ফলায়, দীঘিগুলো চঞ্চল থাকে আকাশ নিয়ে মাছের কৌতূহলে, ওলানে অঢেল দুধ বয়ে ক্লান্ত মোষ আর ছাগল নিরুদ্বেগ চরে বেড়ায় ঘেসো জমিতে। ওদিকে খুশকিনা শুষ্ক মালভূমি, রুক্ষ জমিতে শস্যের চেয়ে ঘাস আর ঘাসের চেয়ে পাথর বেশি, মেঘ সে দেশ ডিঙিয়ে ছোটে ভূমৌলির অন্তিম কোল বরাবর। অনাবৃষ্টির প্রকোপ বাড়লে খুশকিনা থেকে দুরন্ত পশ্চিমা ঘোড়ার পাল হাঁকিয়ে খুশকিনারা অগ্রহায়ণে হানা দেয় রঙ্গীরাঙা গ্রামগুলোয়, মরাই আর গোয়াল ভেঙে ফাঁকা করে নিয়ে যায় নির্বিচারে। কখনও যায়নি সিধু, ফাঁড়ির আধবুড়ো সৈন্যদের মুখে তৃপ্ত-তিক্ত স্মৃতিচারণে খুশকিনাকে সে টুকরো টুকরো রণাঙ্গন ধরে চেনে, বণিকদের চওড়া হাসির ফাঁকে সে পরিচিতি দুয়েকটা নগর আর হাটের ছবির ভারে রঙিন। খুশকিনা পাঁড় গগনিয়াদের দেশ, সেখানে সৈন্যরা গাণ্ডু-কিন্তু-লড়াকু, বণিকরা ঠকবাজ-কিন্তু-আড্ডাকুশল, বাঈজিরা গোলাপি-কিন্তু-সাশ্রয়ী, রাহাজানের দল ভুখাটে-কিন্তু-নির্মম, বাতাস সেখানে ধূলার বাহন, আকাশ সেখানে পূজিত, চাঁদ-সুরুজ-বাজ-বরখা-জাদু সেখানে আকাশের পুত্রকন্যা।

কিন্তু নিরানুপে খুশকিনিদের চাওয়ার কিছু কি আছে?

খোবরাৎ গলা খাঁকরালো, "তা মঠী ভাই, দুই ঢোঁক পানি পিলাতে পারো?"

সিধু বুধোর আসনে ঝোলানো মশকটা খুলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরলো খোবরাতের দিকে। "মশক ছাড়া তুমি এ পথে চলছো কেন?"

খোবরাতের ঢোঁকের মাপ আঁশটে রকমের বড়, তৃতীয় দফায় পানিটুকু গালের ভেতরে নেড়েচেড়ে গিললো সে। "আহ! কী মিঠা! বুক ভরে গেলো।" মশক সিধুর হাতে ফিরিয়ে দিলো সে। "সে এক লম্বা গল্প ভাইটি।" আকাশটা ফের দেখে নিলো সে। "আজ সাঁঝ নামার আগে তো ফাঁড়িতে পৌঁছানোর উপায় নেই মনে হচ্ছে। মাঝপথে মাথা গোঁজার মতো আছে কিছু?"

কাঠুরেদের গাঁ থেকে নিরানুপের গোড়া পর্যন্ত দু'খানা গুমটি আছে, তার একটিতে সিধু গত রাত কাটিয়েছে একঘর কাঠুরের সাথে। থোণ্ডুপের কেতাবে নিরানুপের জঙ্গলে বাঘটাঘ নেই, কিন্তু গুমটিগুলো পুরু গুঁড়িতে গড়া, বুধোরও সাধ্য নেই সেগুলো ধসানোর। কীসের ভয়ে এমন মজবুত আস্তানা গড়া হয়েছে, সে প্রশ্নের জবাবে শুধু গলা খাঁকরেছে কাঠুরেরা। কাঠুরেদের গাঁয়ে গ্রামবুড়ো সিধুর প্রশ্নে মাথা দুলিয়েছে, পাহাড়মুখো পথে বাঘ নেই, তবে সাপ আর বিচ্ছু আছে। ঠাট্টাচ্ছলে শুধিয়েছে সিধু, মাঝপথে গেরো নেই তো? গ্রামবুড়ো উপস্থিত বাকি মুরুব্বিদের সাথে সঙৎ ঠুকে ফ্যাকাসে মুখে চুপ করে গেছে। গেরোর প্রশ্নে এমন নীরবতা আরো বড় গেরো। থোণ্ডুপ যেমন তাড়ির লোটায় চুমুক দিয়ে হঠাৎ জানিয়েছিলেন, নিরানুপে শকুনও নেই, কিন্তু কেন নেই সে প্রশ্নের উত্তরে মৌনীবাবা হয়ে বসেছিলেন দণ্ডআধেক।

"একটা গুমটি পড়বে পথে।" সিধু বুধোকে একটু পিছিয়ে আনলো, খোবরাতের খুব কাছ ঘেঁষে চলতে ভরসা পাচ্ছে না সে। খুশকিনিরা কি নিরানুপে কোনো পাকা ঘাঁটি গাড়তে চায়? কিন্তু ওখান থেকে রঙ্গারিডিতে হামলা করা আর মাথার পেছনে হাত ঘুরিয়ে ভাত খাওয়া সমান নিরর্থক। একটু মিষ্টি করে বললে রঙ্গীরাজ হয়তো নিরানুপ পাহাড় খুশকিনারাজকে উপহারই দেবেন। লোকে ওখানে যায় না, থাকে না, আলাপ পর্যন্ত করতে চায় না গেরোর ভয়ে, এমন পাহাড়ে মশকভিখিরি খোবরাৎ কী চায়? "আসার পথে শকুন দেখেছো?"

খোবরাৎ একটু যেন চমকে উঠলো কথাটা শুনে। "শকুন? কই, না তো।" মাথা ঘুরিয়ে আকাশটা চতুর্দিক দেখে নিলো সে। "পুঁচকে পুঁচকে গাণ্ডু পাখি দিয়ে এ মুল্লুক বোঝাই। আর ওদের বিষ্ঠা দিয়ে পথ ঢাকা। শকুনফকুন দেখিনি।" বাঁকা হাসলো সে। "কেন বলো তো? খিদে পেয়েছে?"

সিধু বিদ্রুপটা হজম করে নিলো। খুশকিনিদের খানাপিনায় অনেক বাছবিচার আছে, তারা এটা খায় না সেটা ছোঁয় না, রঙ্গালদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে তারা নাকি অনেক তামাশা-টিটকিরি মারে। রঙ্গালরা আবার তেমনটা করে হান্তুলদের নিয়ে। খোবরাতের চোখে সিধু হয়তো নির্বিচার সর্বভূক, যে খিদে পেলে খাওয়ার জন্যে শকুন খোঁজে। তবে লোকটা পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সামনে রঙ্গীসেনার ফাঁড়িতে একলা হাজিরা দিতে এসে রাজমঠের চিহ্নধারীর সাথে এমন আচরণ কি স্বাভাবিক? নাকি সিধু রৌশনি বলেই ঝাল ঝাড়ছে খোবরাৎ? শুভব্রত শুধু নামেই, কাজের বেলায় লোকটা পাজি।

"তা এদিকে ডোবা-ঝিরি কিছু পড়বে তো?" ঘোড়াটা দু'বার কাতর স্বরে ডেকে ওঠায় শুধালো খোবরাৎ। "বাহুল মশায় অবশ্য আমাকে পইপই করে বলেছিলেন উট নিয়ে বেরোতে। বলেছিলেন, ঘোড়াটা তেষ্টায় ভুগবে। এই গাণ্ডু পাহাড়ের নামই তো নিরানুপ।" সিধুকে আড়চোখে দেখে নিলো সে। "মানে বুঝলে তো? যেখানে জলা নেই।"

নিরানুপের গোড়ায় একটা ক্ষীণতোয়া ঝিরি নাকি আছে, সেটার পারেই ফাঁড়ি। নিরানুপে বৃষ্টিপাত কম হয় না, কিন্তু বসতি উসকানোর মতো কোনো নদী নামেনি সেখান থেকে। এত পানি তাহলে যায় কোথায়? ওখানেই বরং মস্ত এক জলা থাকার কথা।

চিন্তাটা সিধুকে চমকে দিলো। তেমন কিছুর সন্ধানেই কি অগ্রচারী সৈন্যরা ফাঁড়ি গেড়েছিলো ওখানে? খুশকিনিরাও কি জলের আঁচ পেয়েই হাজির হলো তবে?

কিন্তু জলা থাকলে কি বন্দী ঝোড়সওয়ারের[১] পেট থেকে সে কথা অনুরুদ্র রাবতেন বের করে ছাড়তেন না? ধূমায়ুধের কথা তো তার ভাষ্যেই জানা গেছে।
[১] "ঝঞ্ঝারোহী" দ্রষ্টব্য।

দূরের আকাশ বাঈজির নথের মতো বিজলির ঝিলিকে রেঙে উঠলো এক বিপলের জন্যে। বুধোর ফুল্ল আস্ফালনের সাথে তাল মিলিয়ে ঘোড়াটা আঁতকে উঠলো, কয়েক বিপল পর আবছা দগড় ভেসে এলো। খোবরাৎ নড়েচড়ে বসে অস্ফুটে বললো, "গগন না বিদারে!"

শেষ কবে জাদুপাত হয়েছিলো রঙ্গারিডিতে? মনের সন্দেহকাতর টুকরোটা খোবরাতের দিকে ফিরিয়ে বাকিটুকু সম্বল করে স্মৃতির পুশকুনিতে চকিতে ডুব দিলো সিধু। মঠগুলোয় বিরাট সাড়া পড়ে জাদুপাতের পর, ভিনমঠের অনুরুদ্ররাও স্যাঙাৎদের নিয়ে উজিয়ে চলে আসেন পরিস্থিতি সামলাতে। বাল্যে এমন অতিথিদের ফরমায়েশ খেটেছে সিধু, কিন্তু নিজ চোখে জাদুপাত তখনও দেখেনি সে। রাবতেন একবার সিধুসহ আরো ক'জন কূটকর্মী আর নিরীহ সেবক সঙ্গে নিয়ে আরেক মঠে অতিথি হয়েছিলেন, সেবারই জীবনে প্রথম তুষার দেখেছিলো সিধু। বিরঙ্গীর অববাহিকা বর্ষাঘন জঙ্গুলে জায়গা, বন কেটে এখানে সেখানে গড়ে ওঠা গাঁগুলোর ভরসায় কয়েকটা মঠ সেখানে কাজ চালিয়ে যায়, তারই একটির আওতায় এক ছোটো জেলেপাড়ার ডোবা জমে ক্ষীরের মতো হলদেটে হয়ে উঠেছিলো, তার ওপর দিয়ে টলতে টলতে পার হওয়ার ফাঁকে তুষার ঝরিয়ে যাচ্ছিলো জলক্ষরণে হয়রান মেঘের পাল। ছ'মাস ধরে এমনটা চলেছিলো। অনুরুদ্রদের কড়া বারণ সত্ত্বেও শিশুর দল হুল্লোড় করেছে ডোবার ওপর, জীবনে প্রথম আর হয়তো শেষবারের মতো পেঁজা তুষার হাতে নিয়ে উল্লাস করেছে ছেলেবুড়ো সবাই। সিধু রাবতেনের সাথে দাঁড়িয়ে ডোবার এক পারে দাঁড়িয়ে বরফে জমাট এক মস্ত রাঙা পাঙ্গাশের সর্পিল ভঙ্গিমা দেখতে পেয়েছে। স্থানীয় অনুরুদ্র লোকবল তৈরি রেখেছিলেন, জাদুর প্রকোপ কাটার কয়েক প্রহরের মাঝে পুরো ডোবা পাথর-কাদায় বুঁজিয়ে দেন তিনি। সিধু তারপরও রাবতেনের হুকুমে ধনুক নিয়ে ডোবার শবদশা পাহারা দিয়েছে কয়েকদিন। তৃতীয় রাতে কাদা ফুঁড়ে সেই পাঙ্গাশটাকে বেরিয়ে আসতে দেখেছে সে, দৈর্ঘ্যে তখন সেটা সিধুকে ছুঁইছুঁই। সিধু তির ছোড়ার পর স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে, মাছটা বলে উঠেছে, "একটু ওম দে!" রাবতেনও তৈরি ছিলেন লোকবল নিয়ে, প্রসবের পরপর জেলেপাড়ার এক নারীর কোল থেকে একটি শিশুকে এনে সে ডোবায় পোঁতার ব্যবস্থা করেন তিনি, সেটির সারা গা আঁশে ঢাকা ছিলো, ভূমিষ্ঠ হয়েই ওম চাইছিলো সে-ও।

খুশকিনিরা যখন পূজ্য গগনকে বিদারণে বিরত থাকার আবদার জানায়, সেটা তারা বজ্রের ভয়ে করে না, অনেক রক্তে হাত রাঙিয়ে সেটা জানে সিধু। একটা সময় নাকি পৃথিবী কাঁপতো আকাশ রাঙিয়ে বয়ে যাওয়া জাদুস্রোতের ভারে, অহরহ জাদুপাতে জগতের নিয়ম ছিন্ন হতো। এখন জাদুপাত কালেভদ্রে ঘটে, কিন্তু তার চরিত্র পাল্টায়নি। কে জানে, খুশকিনার আকাশে হয়তো বৃষ্টির চেয়ে জাদুই সস্তা?

মাঝদুপুরের আকাশ মেঘলা বলে সূর্যের খানিক পেছনে সর্পিল শবল জাদুস্রোত চোখে পড়ছে না এখন, কিন্তু দিনে-রাতে কয়েকবার আকাশে অক্লান্ত চক্কর কাটে সেটা। কখন তা থেকে এক পশলা নেমে আসে, কোনো ঠিক নেই।

তেমাথায় পৌঁছে বুধো হঠাৎ ছটফটিয়ে উঠে থমকে দাঁড়ালো, নাক তুলে বাতাস শুঁকছে সে। সিধু খোবরাৎকে ডেকে থামিয়ে ধনুকটা খাপ থেকে খুলে হাতে নিলো। খোবরাৎ পলখানেক অপেক্ষা করে বিরক্ত কণ্ঠে শুধালো, "কী শোঁকো?"

ক্ষীণ গন্ধটা সিধুর নাকেও এসেছে। "পোড়া গন্ধ পাচ্ছো না?"

খোবরাৎ সশব্দে বাতাস শুঁকে মুখ কোঁচকালো। "না। তোমার আর তোমার মহিষের বোঁটকা গন্ধ পাচ্ছি শুধু।"

সিধু তেমাথাটা খুঁটিয়ে দেখে নিলো। বাঁয়ে একটা ঢালু পথ নেমে গেছে খুশকিনার সীমান্তের দিকে, সামনে আরেকটা ঢালু পথ উঠে গেছে ফাঁড়ি বরাবর, একটা খাড়া টিলা এ দু'টিকে পরস্পরের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে। এতক্ষণ পায়ের নিচে পথ মোটামুটি ন্যাড়া ছিলো, কিন্তু তেমাথায় এসে ভাগ হওয়া দুই বাহুতে পথ ঘেসো; মনে হচ্ছে কাঠুরেরা দুটোর একটাও আর খুব বেশি ব্যবহার করে না। কিন্তু বাতাসে লাকড়ি-পোড়া গন্ধের রেশ ভাসছে, যদিও ধোঁয়া চোখে পড়ছে না কোথাও।

খুশকিনামুখী পথের দিকে ইশারা করলো সিধু, "ওদিকে গুমটি কতদূর?"

খোবরাৎ মাটিতে থুথু ফেললো। "দিনতিনেক হবে। আমি দু'রাত খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়েছি। পিঁপড়া এসে কামড়ে টিকরের আদ্ধেকটা নিয়ে গেছে।" পেছন চুলকালো সে। "আরেকটু শুঁকে নেবে, নাকি এগোবো আমরা?"

হয়তো ঘেসো পথ দেখেই পথ ভুল করেছে ব্যাটা, বুধোর পেছনে মৃদু চাপড় মেরে ভাবলো সিধু। "কী কাজে এসেছো তুমি?"

খোবরাতের হাসি-হাসি ভাবটা মুছে গেলো মুখ থেকে। "সেটা ফাঁড়ির কর্তারা শুনবে।" খনখনে গলায় বললো সে।

বেগুনি উত্তরীয়টার কোনো দামই দিচ্ছে না মুষ্ঠিক, ভাবলো সিধু। ফাঁড়ির বিংশী তো কোন ছার, শেষ যে সেনাঘাঁটি পেছনে ফেলে এসেছে সিধু, তার ঘাঁটিয়াল হাজারি পর্যন্ত সব কাজ ফেলে ছুটে এসেছেন সিধুর কাছে। যতদূর তাকে জানানো যায়, ততদূর জানানোর পর সঙ্গে এক কুড়ি সৈন্য দিতে চেয়েছিলেন তিনি, সিধু মানা করেছে। হাজারির পরামর্শেই পথের শেষ ধাপে গলায় উড়ুনি ঝুলিয়ে চলছে সিধু, নইলে এ জিনিস নির্জন পথে ঝুলি থেকে বের করে না সে। "ফাঁড়ির সৈন্যরা একটু... বাড়তি হুঁশিয়ার।" চট করে যোগ করেছেন হাজারি। সিধু তার না বলা কথা বুঝে নিয়েছে, এ অঞ্চলে মোষের পিঠে কোনো হান্তুলকে দেখলে হয়তো কোনো কিছু না শুধিয়েই তির ছুড়ে বসবে ওরা। কাঠুরে-গাঁয়ের গ্রামবুড়োও তেমাথা টপকে বুধোর শিঙে কাঠি বেঁধে সাদা নিশান উড়িয়ে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছে।

"তা তোমার তিরগুলো কোথায় খরচ করলে?" খোবরাতের পেছন পেছন চললো সিধু। কেন যেন মনে হচ্ছে তার, একা আসেনি লোকটা। বাতাস অবশ্য নিচ থেকে পথ বেয়ে ওপরে বইছে, কেউ পিছু নিলে বুধো ঠিক টের পাবে। "নাকি ওটাও লম্বা গল্প?"

খোবরাৎ পথের ওপর নুয়ে আসা গাছের ডাল ঠেলে সরালো, চারখানা প্রকাণ্ড প্রাণীর সাক্ষাৎ পেয়ে সামনে গাছের ডাল ছেড়ে উড়াল দিলো পাখির ঝাঁক। পথটা দুই পাহাড়ের মাঝে সিঁথি বেয়ে ওপরে উঠেছে, গাছপালা-ঝোপঝাড় সন্ধ্যার আগাম বিজ্ঞাপন হয়ে ঝুঁকে আছে পথের ওপর। "শুনলে হাসবে না তো?"

সিধু একপাশে হেলে গাছের ডাল এড়ালো। "না।"

খোবরাৎ মাথা চুলকালো। "সঙ্গে রসদ ফুরিয়ে গেস্লো। কয়দিন আর হাবিজাবি খেয়ে টেকা যায়? এ তল্লাটে না আছে খরগোশ, না আছে বনমোরগ, ঘুঘু-ময়ূর-তিতির কিচ্ছু নাই। পরশু একটা ছোটো ছাগল দেখলাম পাহাড়ের ওপর। লুকিয়ে তির ছুড়তে গাছে চড়তে গেছি, মাঝডালে পা হড়কে তূণের সব তির খাদে পড়ে গেলো।"

খোবরাতের কথা আর আচরণে কী যেন একটা আছে, স্বস্তি পাচ্ছে না সিধু। গল্পটা খুব আষাঢ়ে কিছু নয়, কিন্তু খোবরাতের বলার ভঙ্গিতে একটা লোকঠকানো অতিচালাকি আছে। "আর মশক?"

খোবরাৎ এবার ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁ করে চাইলো সিধুর দিকে। "দুই ঢোঁক পানি চেয়ে গিললাম বলে সেই তখন থেকে মশক মশক করে খেপেছো তুমি? বাপরে বাপ! থাকোই তো পানির দেশে! তোমাদের মঠে জীবে দয়া নিয়ে শেখায় না কিছু?"

সিধু মৃদু হাসলো। "নিরানুপের পশ্চিম দিকটায় গেছো কখনো?"

আচমকা এ প্রশ্নে খোবরাৎ অপ্রস্তুত হলো, নতুন আলোয় যেন সিধুকে দেখতে পেলো সে। "নিরানুপের পশ্চিম দিক খাড়া আর শুকনো। ওখানে ভূত আর দানো ছাড়া কেউ যায় না। কেন?"

সিধু মনে মনে নিরানুপ পাহাড়ে প্রকাণ্ড এক হ্রদ কল্পনা করছিলো, কিন্তু কোনো পর্বতই অনন্তকাল ধরে বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পারে না। একদিন না একদিন কোনো না কোনো দিক থেকে সে জল নদী হয়ে নিচে নামবেই। নিরানুপের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু কোনদিকে? নিরানুপ উত্তর, দক্ষিণ আর পশ্চিমে খাড়া, তার ঢালু দিকটা পুবে রঙ্গারিডির প্রান্তে। যদি সত্যই জলের ভাণ্ডার থাকে ওখানে, রাজা নির্ঘাত বসতি গড়ার হুকুম দেবেন। তিনি খাজনার কাঙাল, খুশকিনার রাজার মতোই। কিন্তু এমন কিছুর আভাস থোণ্ডুপ সিধুকে দেননি। আর পাঁচ বছর ধরে পাঁচটা সৈন্যদল ঘাঁটি গেড়ে আছে এখানে, ‌এর উত্তর এতোদিনে মিলে যাওয়ার কথা।

হয়তো মিলে গেছেও, কে জানে?

পথটা গাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় এসে নিচে নেমে গেছে ফের, খোলা আকাশের নিচে এসে সামনের দৃশ্যটা দেখে সিধু চমকে উঠলো। দূরে পর্বতের নানা চূড়া সারি সারি উঠে মিলিয়ে গেছে, শেষ বিকেলের আকাশ রঙিন মেঘের দখলে। এ পাহাড়টা ডিঙালে নিচে পথ আর ঝিরির সঙ্গমে ফাঁড়িটা পড়ার কথা। যদিও ওপর থেকে কিছু দেখার উপায় নেই, গাছপালায় সব ঢাকা। আধবেলা লেগে যাবে নামতে।

দিগন্ত ঝলসে উঠলো বজ্রের দাপটে, খোবরাৎ ঘোড়া থামিয়ে কাতর স্বরে বিড়বিড়িয়ে উঠলো, "গগন না বিদারে!"

সিধু বুধোকে তাড়া দিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। মেঘের নিচে পাহাড়চূড়ায় দাঁড়ালে বাজ মাথায় এসে পড়বে। "রৌশন রুদ্র রঞ্জে!" খোবরাতের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যেই গলা চড়ালো সে। কেন যেন তার মনে হচ্ছে, লোকটা রৌশনিদের ওপর চটা।

সিধুর অনুমানকে তৎক্ষণাৎ অনুমোদন দিয়ে নাক টেনে ঘোড়া সামনে বাড়ালো খোবরাৎ। "তোমরা রৌশনিরা যে সব হাত্তালি তোমাদের ঐ রুদ্র রাজাকে দাও, এটা কি ঠিক? সে ব্যাটা মরেছে কয়শ বছর হলো? এখনও সে আকাশ রাঙায় নাকি?"

পাহাড় থেকে নিচে নামার পথ সরল নয়, পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকেবেঁকে নেমেছে। বেশ খানিকটা নিচে গুমটি ঘরটার আশপাশে উঁচু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, ন্যাড়া অংশটা পাহাড়ের গায়ে ছত্রাকের মতো ফুটে আছে। পথ সরু বলে সিধু খোবরাৎকে আগে যাওয়ার ইশারা করলো, "হাততালি কাকে দিলে ঠিক হবে?"

খোবরাৎ ঝাঁঝিয়ে উঠলো, "গগনবুড়োকে।"

সিধু কাঁধ ঝাঁকালো। "তা দাও না তুমি যতো খুশি।"

খোবরাৎ আতঙ্কিত ঘোড়াটার গলার পাশে হাত বুলিয়ে আশ্বাস দিলো, সরু পাহাড়ি পথে নামার অভ্যাস বোধহয় নেই ওটার। "তোমাদের বণিকরা খুশকিনায় আসে, সঙ্গে কতোগুলো ন্যাড়ামুণ্ডিকে নিয়ে আসে। আমাদের কোলখুশকিনের হাটে মঠ-ফঠ খোলার ধান্ধা করছিলো ব্যাটারা। হাটবারে লোক উপচে পড়ে, তখন লঙ্গর খোলে ব্যাটারা। রুদ্র রাজার আজগুবি গপ্পো পুরোটা শুনলে পরে এক শানকি করে কাচ্চি আর এক খোরা দই খেতে দেয়। লোকজন প্রথমটায় যেতো না, পরে দেখি গগনবুড়োর চত্বর ফাঁকা, সবাই গিয়ে লঙ্গরে বসে হেলেদুলে রুদ্রের নামে গজল শুনছে...।"

"ভজন।" শুধরে দিলো সিধু। চারণমঠীরা জানে, আমলোকের মনে ঢুকতে হয় পেটের খিড়কি গলে।

"ঐ একই কথা। আমাদের চোখের সামনে কোলখুশকিনের আদ্ধেক লোক মজে যাচ্ছিলো এসবে। উপরিক হুজুর পর্যন্ত ভেট পেয়ে পটে গেস্লেন। শেষে আমাদের বাহুল মশায় একদিন এসে বললেন, য়্যাই তোরা সব ঘোড়া জোত। তারপর পুরো ঘাঁটির চারশো ঘোড়া একসঙ্গে গিয়ে ঐ বাটপারি লঙ্গরখানা ভেঙে জ্বালিয়ে খাক করে দিয়ে এলাম।"

সিধু মৃদু গলায় বললো, "ঘোড়া থেকে নেমে ওটাকে লাগাম ধরে হাঁটাও। তোমার ঘোড়া এ সরু পথে পিঠে সওয়ারি ধরে এগোতে পারবে না।"

খোবরাৎ বিরক্ত মুখে সন্তর্পণে ঘোড়া থেকে নেমে এগোতে লাগলো লাগাম ধরে। "তোমার ঐ হতচ্ছাড়া মোষটা এসব পথে চলে কী করে? আমি তো জানতাম মোষ জলার জীব।"

বুধো জলার জীব বলেই সংকীর্ণ পথে হুঁশিয়ার হয়ে চলতে জানে। সিধু প্রসঙ্গ পাল্টালো না, "তোমাদের চত্বরে গরীব-দুঃখীকে মাগনা খাওয়ানো হয় না?"

খোবরাৎ খেঁকিয়ে উঠলো, "না। মাগনা খেতে পেলে কাজ করবে কে? তোমরা রৌশনিরা এক বেলা ভোজ দিয়েই যদি ভাবো, আমাদের পটিয়ে কাবু করবে, খুব ভুল করবে। বুঝলে?"

সিধু সামনে পথের দশা দেখে নিজেও নেমে এলো বুধোর পিঠ ছেড়ে। শৈশবে মঠে ঠাঁই পেয়ে শুরুতে কিছুই বোঝেনি সে, অভ্যাসবশে হান্তুলদের রীতিমাফিক মঠের বাইরে বুড়ো বটগাছে মাথা ঠেকাতো। সেবকরা সিধুকে বেদম ঠ্যাঙাতেন সেজন্যে। একদিন রাবতেন ব্যাপারটা দেখে সিধুকে ডেকে বলেছিলেন, শুধু এই বটগাছটা নয়, সমস্ত পৃথিবীটাই ছায়া দিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে; ওটাই রুদ্রের শিক্ষা।

এক সন্ধ্যার সুন্দর আকাশের জন্যে কারো না কারো কাছে কৃতজ্ঞ থাকাটাই জরুরি, গগনিয়ারা তাদের গগনবুড়োর কাছে আর রৌশনিরা তাদের দীক্ষাগুরুর কাছে তা হয়, তো হোক না। কিন্তু সমস্যাটা বাঁধে, যখন সে কৃতজ্ঞতার মূল্য কোনো মঠের কাছে সেবায় কিংবা কোনো গগনচত্বরের কাছে নগদে শোধ করার চাপ থাকে, তিক্ত মনে ভাবলো সিধু।

আরেকটু নিচে নেমে দিগন্তের দিকে চাইলো সিধু, দানোর দাঁতের মতো পাহাড়সারি অতলমুখী সূর্যকে গিলে খেয়েছে এরই মাঝে। ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে আছে পথে, পলখানেকের মাঝে আঁধার নেমে আসবে। গুমটিঘরটা এখনও অনেকটা দূরে। এতক্ষণ পথে সন্ধ্যাচারী পাখি আর পোকার কূজন, ঢাল বেয়ে নামার পর সেটা ক্রমশ কমে আসছে, টের পেলো সে।

অদূরে খোবরাতের ঘোড়াটা একটা মর্মান্তিক হোঁচট খেয়ে আতঙ্কে ডুকরে উঠলো, খোবরাৎও লাগামের টানে পথের পাশে খাদের অগভীর ধাপে পিছলে পড়ে হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠলো। ঘোড়াটা টাল সামলে নিয়ে পাহাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কাঁপছে, টের পেলো সিধু। ভাগ্যিস ঘুরে দাঁড়ানোর জায়গা নেই ওটার, পেছনে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে বুধোর লেজ টেনে ধরে ভাবলো সিধু।

খোবরাৎ মাটি-পাথর খামচে উঠে এলো ফের, বিড়বিড়িয়ে গাল বকে যাচ্ছে সে। সিধু আশ্বাস দিলো তাকে, "এমন হয়ই। ওটাকে আগে যেতে দাও।"

খোবরাৎ চাপা গলায় গর্জে উঠলো, "জ্ঞান ঝেড়ো না হে রৌশনি! পাহাড়ি দেশের লোক আমি, ঘোড়ার ওপর খাই-ঘুমাই।" ঘোড়াটার লাগাম ধরে টেনেও বিফল হলো সে, একচুল নড়তে নারাজ সেটা।

সিধুকে সাবধান হওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়েই ধমকে উঠলো বুধো, "গাঁআঁআঁআঁআঁ!" ঘোড়াটা ছটফটিয়ে উঠে খোবরাৎকে প্রায় ঠেলে সামনে নিয়ে পথের সংকীর্ণ ঢালু জায়গাটা হাঁচড়ে-পাঁচড়ে এগিয়ে গেলো, খুশকিনি মুষ্ঠিক ছিটকে খাড়া ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো হাত বিশেক নিচে পথের পরবর্তী উৎরাইয়ে।

সিধু বুধোর লেজ ধরে রেখে হাঁকলো, "ঠিক আছো তুমি?"

খানিক নীরবতার পর নিচ থেকে খোবরাতের গালি ভেসে এলো, "গাণ্ডু শালা গুয়ের পোকা!"

ঘোড়াটা বুধোর ভয়ে হুড়মুড়িয়ে এগোচ্ছে, তার পিছু পিছু সিধু সাবধানে পথের বাঁক পাড়ি দিলো। খোবরাৎ পথের ঢালে বসে কাঁপছিলো, সিধু কাছে যেতেই তড়পে উঠলো সে, "তোমার কি আক্কেল-পছন্দ কিছু নাই...?"

সিধু নিচু গলায় বললো, "বাকিটা পথ একদম চুপ থেকে আমি যা বলি, সেটা করো। আঁধার পুরোটা নামার আগে গুমটিতে পৌঁছতে হবে।" ঘোড়া আঁধারে ভালোই দেখতে পায়, সৈন্যদের মুখে শুনেছে সিধু, কিন্তু এ পথ মানুষের জন্যে দুপুরের পর থেকেই ঝুঁকিয়াল।

খোবরাৎ থমকে গেলো। ঘোড়াটা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে চললো, বুধোর সামনে নীরবে চলতে লাগলো খোবরাৎ। গুমটির সামনে পৌঁছে হাঁপ ছাড়লো সিধু। পাহাড়ের কোলে মোটামুটি সমতল এক অংশে ঘরটা গড়া, চারদিকে প্রায় হাত পঞ্চাশেক জায়গা গাছ কেটে ফাঁকা করা হয়েছে, গুঁড়িগুলো এখনও রয়ে গেছে সেখানে। বুধো পরপর দু'বার গভীর হাঁক ছাড়লো, জলের গন্ধ পেয়েছে সে।

খোবরাৎ ঘোড়াটাকে টেনে-হিঁচড়ে একটা গুঁড়ির সাথে বেঁধে গটমটিয়ে ফিরে এলো সিধুর কাছে। "তখন তোমার মোষটা লেলিয়ে দিয়ে ভালো করোনি তুমি।"

সিধু শান্ত মুখে খোবরাতের কাঁধে হাত রাখলো, "মাথা ঠাণ্ডা করো বন্ধু। ভিনদেশে এসে এতো তড়পালে চলবে?"

খোবরাৎ আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, সিধু থামিয়ে দিলো তাকে, "পানি খুঁজতে হবে, আগুন ধরাতে হবে। কাল ফাঁড়িতে পৌঁছে নাহয় আমার বিচার কোরো। হাত লাগাও এখন, লাকড়ি আনো কিছু।"

বুধো এরই মাঝে শুঁকে শুঁকে কুয়ো খুঁজে বের করেছে, সিধু এগিয়ে গেলো সেদিকে। জলের একটা ক্ষীণ খাত মাটি ধুয়ে পাহাড়ের গায়ে পাথর ন্যাংটো করেছে, তারই ওপর এক জায়গায় গর্ত খুঁড়ে চুন-পাথরে পড়া পরিপাটি কুয়ো; সৈন্যদের কাজ, দেখেই বোঝা যায়। কুয়োর মুখ মস্ত কাঠের চাবড়ায় ঢাকা, সেটার ওপর জমে থাকা কাদা আর পাতা দেখে সিধুর ভুরু কুঁচকে উঠলো। এ কুয়ো থেকে কেউ জল তোলেনি বহুদিন হয়ে গেলো। চাবড়া ধরে টানার কষ্টে গেলো না সিধু, বেরিয়ে থাকা অংশে টোকা দিয়ে বুধোকে ডাকলো সে, "ঠ্যাল বুধো, ঠ্যাল! হুরররর!"

বালকের হাত থেকে হাওয়াই-মিঠাই কেড়ে নেওয়ার মতো অবলীলায় এক ধাক্কায় চাবড়ার আদ্ধেকটা সরিয়ে বুধো তুষ্ট হাঁক ছাড়লো। পাথরের গায়ে পোঁতা গজালে দড়ি আর কাঠের বালতি ঝুলছে, সিধু এক বালতি পানি তুলে এনে শুঁকলো সাবধানে। কুয়ো ভরে উঠলে বাড়তি পানি খাত বেয়ে গড়িয়ে নেমে যায়, তাই জমাট জলের পচা গন্ধ নেই। এক আঁজলা পানি বুধোর নাকের সামনে ধরলো সে, বুধো সন্তর্পণে খানিক শুঁকে তার মস্ত জিভে চেটে নিলো পানিটুকু। সিধু মশক ভরে নিয়ে বালতির বাকি পানিটুকু দিয়ে মাথা-ঘাড়-মুখ ভিজিয়ে নিলো।

খোবরাৎ খানিক দূরে লাকড়ি টোকানোর ফাঁকে গান ধরেছে, শুনতে পেলো সে। লৌকিৎ বুলি রঙ্গীর কূল ছেড়ে পাহাড়ি খুশকিনার গভীরে অনেকখানি ভোল পাল্টেছে, কিন্তু তারপরও বোধগম্য।

মন ঘোড়ে চড় রঙ্গ বরাবর জঙ্গের বহরে
ধানের ভাণ্ডার ক্ষীর বানাবি দুদুর নহরে
মন ঘোড়ে চড় রঙ্গ বরাবর জঙ্গের বহরে

রঙ্গ লদের দুই কিনারে
ছলাৎ ছলাৎ কলসী লাড়ে
বান্দরমুখী লেড়কি যত পুন্নো-চন্দরে
মন ঘোড়ে চড় রঙ্গ বরাবর জঙ্গের বহরে

ঘোড়াকে পিলানোর জন্যে কুয়ো থেকে খানিক দূরে কাঠের খাদা উল্টে রাখা, সিধু বিরসমুখে এগিয়ে গিয়ে সেটা টেনে সোজা করলো বুধোর জন্যে। খুশকিনিরা শুধু ধান আর গো-মহিষই লোটে না, কয়েক বছর পরপর হানা দিয়ে রঙ্গাল কিশোরীদেরও পাইকারি হারে তুলে নিয়ে যায়। অনুরুদ্র রাবতেন একবার বলেছিলেন, খুশকিনায় কন্যাশিশু জন্মায় কম। চারণমঠীদের জন্যে সেবার হুকুম পাঠিয়েছিলেন তিনি সিধুকে দিয়ে, কোলখুশকিনে হাটবারে সংকর মানুষ ক'জন দেখা যায় তা গুণতে। উত্তরটাও সিধুই বয়ে নিয়ে গিয়েছিলো রাবতেনের কাছে। শূন্য।

বালতি ভরা জল খাদায় ঢালতে গিয়ে বুধোর হাবভাব দেখে সতর্ক হয়ে উঠলো সিধু, বুধো খাদাটা শুঁকছে আর শিং নাড়ছে। কয়েক পা পিছিয়ে এসে গোঁ-গোঁ করে উঠলো সে। সাপ-বিচ্ছু কিছু আছে নাকি?

বালতি নামিয়ে আশপাশ থেকে কয়েকটা কুটো কুড়িয়ে জামার ভেতরের কোটর থেকে চকমকি আর অয়স বের করলো সিধু। একটা মোটা ডালে আগুনটা ভালোমতো ধরে ওঠার পর খাদার কাছে এগিয়ে গেলো সে। খাদার অসূর্যম্পশ্য ভেতর দিকটা ছত্রাকে থিকথিক করছে। এটা ক'মাস ধরে উল্টে পড়ে ছিলো, কে জানে? ফাঁড়ির সৈন্যরা এখানে থামে না কেন?

আচমকা একটা সম্ভাবনা মাথায় খেলতেই সিধু আগুন নামিয়ে চোখ মুদে অন্ধকার সইয়ে নিয়ে চারপাশটা দ্রুত দেখে নিলো একবার। ফাঁড়ি থেকে একজন বা দু'জন সৈন্য মালের বাড়তি ঘোড়াসহ কাঠুরেদের গাঁয়ে তিন-চার চাঁদ পরপর হাজির হয়ে রসদ তোলে। গ্রামবুড়ো তিন পূর্ণিমা আগে ফাঁড়ির মাল বুঝিয়ে দিয়েছে। এ পর্যন্ত কোনো অস্বাভাবিক সমাচার ঘাঁটির হাজারির কাছে পৌঁছেনি। কিন্তু এ গুমটিতে অন্তত ছ'মাস ধরে জল তোলেনি কেউ। সৈন্যরা কি তবে এড়িয়ে চলছে এটাকে? কেন?

গুমটির চারপাশে গাছ কেটে সাফ করা, খোলা আকাশে পাহাড়ের ফাঁকে উঁকি দিয়েছে গাভিন চাঁদ। সিধু অস্বস্তিভরে খোলা আকাশটা দেখলো। কিছু একটা গড়বড় আছে এখানে। এতখানি জায়গা ফাঁকা রাখতে কম করে হলেও তিন কুড়ি গাছ কাটতে হয়েছে। রঙ্গারিডির ভাতঘুমসুখী সৈন্যরা নিশ্চয়ই খামোকা এত পরিশ্রমে যায়নি। কিন্তু কারণটা যদি গুরুতরই হবে, সেটা ঘাঁটির হাজারির কাছে পৌঁছেনি কেন? ঘাঁটির হরফদার সিধুর সামনেই দলিল খুলে আদ্যোপান্ত পড়ে শুনিয়েছে, কোনো বার্তায় বিচলিত হওয়ার মতো কিছু নেই।

বুধো বালতি থেকে পানি চাটা শুরু করতেই সিধুর ভাবনার চটকা ভেঙে গেলো, সে ধমকে থামালো মোষটাকে। "র বুধো। র। র।" জলের খাতের ভাটিতে একটা পাথুরে গর্ত পেয়ে সেটায় পানিটুকু ঢেলে দিলো সে। বুধো চকচক করে জিভে পানি তুলতে লাগলো, সিধু আরো কয়েক বালতি ঢেলে অন্তিম দানে খোবরাতের জন্যে জল তুললো কুয়ো থেকে।

খোবরাৎ গুনগুনিয়ে দু'হাত ভরে কীসব যেন নিয়ে এগিয়ে এলো সিধুর দিকে, "রঙ্গ লদের ভাটির দেসেএএএ, লেড়কি নাচে হেসে হেসেএএএএ, হো তার দাবনা দিখি ভাবনা জাগে সোব সোয়ারির অন্তরে, মন ঘোড়ে চড় রঙ্গ বরাবর জঙ্গের বহরে... কী হে বিধু ভায়া, পানি পেলে? এই দ্যাখো, কী পেয়ে গেলাম।" হাতে ধরা জিনিসগুলো মাটিতে ধুপধাপ নামিয়ে রাখলো সে। "কুত্তাকাঁঠাল!"

সিধু মশালটা বাগিয়ে ফলগুলো দেখে নিলো এক নজর। ছোটো ছোটো বুনো কাঁঠাল, বেশ সৌরভ ছড়িয়েছে, বুধো পানি গেলা ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে সোৎসাহ হাঁক ছাড়লো। সিধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধালো, "বিধু নয়, সিধু নাম আমার। লাকড়ি পেলে না?"

খোবরাৎ সিধুর হাত থেকে বালতিটা নিয়ে কোঁৎ-কোঁৎ করে পেট ভরে পানি গিলে বাকিটা দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলো। "এখানে আগুন জ্বালা কি ঠিক হবে? ফাঁড়ি থেকে দেখতে পেয়ে যদি রাতবিরাতে তোমাদের বেরসিক সৈন্যরা এসে টিকর ফুঁড়ে দেয়?"

সিধু পায়ের কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কুটো টোকানোর ফাঁকে বললো, "সেজন্যেই এ উড়ুনি গলায় পরে আছি।"

খোবরাৎ বললো, "বেশ, দাও তাহলে মশালটা। লাকড়ির অভাব এ তল্লাটে নেই। তবে কাঁঠালের আছে। তোমার মোষটা যেন মুখ না দেয়, দেখো।"

সিধু কয়েকটা কুটোয় আগুন ধরিয়ে মশালটা খোবরাতের দিকে বাড়িয়ে ধরলো। খোবরাৎ নতুন করে কোঁচা গুটিয়ে মশাল হাতে বেশ উৎফুল্ল ভঙ্গিতে একদিকে এগিয়ে গেলো গাইতে গাইতে, "রঙ্গ লদের ঢেউ দেখিতে, লাই জরুরৎ সিথায় যাইতে, কলস লিয়ে অলস লেড়কি সি ঢেউ তুলে কমরে, মন ঘোড়ে চড় রঙ্গ বরাবর... আইসসালা উষ্টা খায়ে পাও টুটা রে! গাণ্ডু পাহাড়!" সশব্দে গলা খাঁকরে থুথু ফেললো সে।

সিধু চকমকি দিয়ে কুটো ধরানোর ফাঁকে মাটিতে পড়ে থাকা ডাল কোল ভরে কুড়িয়ে ফিরে এলো খোবরাৎ। "ফাঁড়িটা কত দূরে বলো তো? কোনো আগুন-টাগুন তো চোখে পড়ছে না।"

সিধু সরু ডাল দিয়ে খোকা-আগুনের বন্দোবস্ত করতে করতে কাঁধ ঝাঁকালো। "হয়তো পাহাড়ের আড়ালে পড়েছে ফাঁড়ি। খুব কাছে নয়। এখানে গুমটি বানিয়েছে যখন, তার মানে ফাঁড়ি থেকে উঠে এদ্দূর পৌঁছাতেই বেলা ঢলে যায়।"

খোবরাৎ একটা কঞ্চি দিয়ে খুঁচিয়ে কুত্তাকাঁঠালের ছাল ফুটো করতে লাগলো, "ভালো। রাতবিরাতে তারা এসে হাঙ্গামা না বাঁধালেই বাঁচি।" উর্দির পেছনে হাত মুছে একটা কোষ মুখে পুরে বিচিটা থুক করে মাটিতে ফেললো সে। "আহ! দারুণ স্বাদ! অনেকদিন বাদে ভালো খাবার পড়ছে পেটে।"

সিধু শুধালো, "তোমার রসদ তো কিছুই দেখছি না সাথে? কী খেলে এ ক'দিন?"

খোবরাৎ গপাগপ কাঁঠালের কোষ মুখে ঢোকাতে লাগলো, "চিঁড়া-গুড়-শুঁটকি। চিঁড়া-গুড় ফুরিয়েছে দিনচারেক আগেই, শুঁটকি এখনও আছে খানিকটা। বের করি দাঁড়াও।" কাঁঠালের ছাল বুধোর দিকে ছুড়ে মেরে উঠে দাঁড়ালো সে। "আগুন ধরেছে ঠিকমতো? কয়েকটা মোটা ডাল আনি তবে।"

সিধু চুপচাপ দুটো মোটা ডালের টুকরো গুঁজলো আগুনে। খোবরাৎ কয়েকদফায় সেরদশেক লাকড়ি কুড়িয়ে আগুনের পাশে রেখে তার ঘোড়ার কাছে ফিরে গেলো। বুধো এগিয়ে এসে লুব্ধ ভঙ্গিতে কাঁঠাল শুঁকছিলো, সিধু তার গালে মৃদু চাপড় দিয়ে মানা করায় ঘোঁৎকার তুলে নালা টপকে আরেকদিকে সরে গেলো সে ঘাসের খোঁজে। সকালে দানা পেয়েছে সে, এতক্ষণে হজম হয়ে গেছে সব।

খোবরাৎ ছোটো এক পাতার মোড়ক হাতে ফিরে এলো। "বনশুয়োরের শুঁটকি।" সিধুর দিকে মোড়কটা ছুড়ে দিলো সে। "নুন দিয়ে শুকোনো, না রাঁধলেও চলে।"

সিধু পাতার মোড়ক খুলে শুঁটকির আঁটিটা বের করে শুঁকলো। শুকনো মাংসের নিজস্ব বোঁটকা গন্ধের সাথে মৃদু সুবাসও এলো তার নাকে। আঁটি থেকে সাবধানে এক ফালি খুলে দাঁতে কেটে চিবালো সে। খোবরাৎ সিধুর সন্দিহান চেহারাটা দেখে বিরক্ত মুখে বললো, "কুয়ারা কোরো না। তোমরা রঙ্গীরা কী খাও, একেবারে হেঁশেলে ঢুকে দেখে এসেছি আমরা। সাপচচ্চড়িখেকোরা শুঁটকি নিয়ে ঢং করলে সাজে? এদিকে দাও!"

খোবরাৎকে সোৎসাহে শুঁটকির এক পুরো ফালি চিবিয়ে খেতে দেখে সিধু আরেকটা কামড় দিলো শুঁটকিতে, এবার একটু বড় করে। মাংসটা দড়ির মতো শক্ত আর নোনতা, স্বাদটা শুরুতে ধরা যায় না, কিন্তু একটু নরম হয়ে আসার পর মন্দ লাগলো না তার কাছে। "রঙ্গারিডিতে লোকে সাপ খায় না। বানমাছ দেখেছো হয়তো।"

খোবরাৎ ভুরু কোঁচকালো, "সে আবার কী? পষ্ট দেখলাম লম্বা লম্বা... আরে ধুর, ঐ হোলো। খেতে চাও আরেকটু?" সিধুর দিকে ফের মোড়কটা বাড়িয়ে ধরলো সে, সিধু নির্বিকার মুখে আরো দু'ফালি বের করে নিলো। "তুমিই বা রসদ ছাড়া চলছো কেন?"

সিধু কাঁধ ঝাঁকালো। "গ্রাম থেকে দু'রাত দূরে ফাঁড়ি, রসদ বেশি লাগে না তো। ম্যাড়া পিঠা আছে আমার সাথে, রোসো।" ঘাড় ফিরিয়ে বুধোর দিকে ফিরে শিস বাজালো সে। বুধো ঘাস পেয়েছে খানিক দূরে, গাঁ-গাঁ করে হেঁকে উঠলো সে, তারপর দুলকি চালে ছুটে এলো সিধুর কাছে। সিধু বুধোর আসনের সাথে বাঁধা ঝুলি খুলে বেতের একটা চোং বের করে আনলো। খোবরাৎ নাকমুখ কুঁচকে একটা পিঠা সিধুর বাড়িয়ে ধরা হাত থেকে নিয়ে সাবধানে কামড় বসালো।

"কী এটা?" এক কামড় খেয়ে বিরসমুখে শুধালো খোবরাৎ। "কাঠের গুঁড়ো দিয়ে বানানো নাকি?" কচমচিয়ে পিঠাটা কয়েক কামড়ে শেষ করে হাত বাড়ালো সে ফের।

সিধু বুধোকে বিদায় করে দিয়ে চোংটা এগিয়ে দিলো খোবরাতের দিকে। সঙ্গে হাঁড়ি থাকলে পানি গরম করে শুঁটকিটুকু দিয়ে ভর্তা বানানো যেতো, ভাবলো সে। খোবরাৎ আরো কয়েকটা পিঠা রূদ্ধশ্বাসে শেষ করে শুঁটকির ফালিতে কামড় বসালো। "এ ক'টা দিন পাখির খোরাক ডুমুর-ফুমুর খেয়ে পেটটা গরম হয়ে ছিলো। বাহুল মশায় বহুত চুতিয়া কিসিমের লোক। পথ তো ভুল বাতলেছেই, দুটো বাড়তি রূপাও দেয়নি যে বেশি করে খানাদানা সঙ্গে নেবো।" আরেকটা কুত্তাকাঁঠাল হাতে তুলে নিলো সে। "ফুরানোর আগেই কাঁঠাল দুই কোয়া খেয়ে নাও ভায়া। আমি আর পাড়তে যাবো না, বলে দিলাম।"

সিধু কাঁঠালের ছাল ছাড়াতে ছাড়াতে হঠাৎ শুধালো, "খুশকিনায় জাদু পড়ে কেমন?"

খোবরাৎ কাঁঠাল চিবানো বন্ধ করে একটু অস্বস্তিভরে বললো, "মমম... পড়ে মাঝেমধ্যে এখানে-সেখানে। কেন?"

সিধু একটা কোষ মুখে দিলো। "কেমন জাদু সেগুলো?"

প্রসঙ্গটা খোবরাৎকে অস্বস্তিতে ফেলেছে কোনো কারণে, সে জবাব দেওয়ার আগে সময় নিলো, "ভালো কিছু নয়।" গলা খাঁকরালো সে। "কোলখুশকিনের এক মাঠে বছরকয়েক আগে একবার জাদু পড়লো। গগনখুড়োরা এসে বাহুল মশায়কে চোখরাঙানি দিলো, কেউ যাতে না যায় ওখানে। রাত জেগে মশার কামড় খেয়ে মাসখানেক পাহারা দিলাম। এরমধ্যে এক চিমসা বুড়ি গাই কোন ফাঁকে গিয়ে ঐ মাঠের ঘাস খেয়ে বসেছে। তারপর সে রোজ কুড়ি সের করে দুধ দিতে দিতে হপ্তাদুয়েকের মধ্যে মরে গেলো।" কাঁঠালের বিচি আগুনে ছুড়ে মারলো সে।

সিধু কাঁঠাল খেয়ে চললো, "আর ঐ দুধ? সেটা কে খেলো?"

খোবরাৎ নাক টানলো, "গগনখুড়োরা কতোগুলো বেড়াল ধরে খাঁচায় ঢুকিয়ে ওগুলোকে খেতে দিয়েছে। দুধ খেয়ে বেড়ালের কিছু হয়নি দেখে বাকিটা তারা নিজেরা সাবড়ে দিয়েছে।" আগুন থেকে খানিকটা ছাই খুঁচিয়ে বের করে কষমাখা হাতে ঘষতে লাগলো সে। "তোমাদের ওদিকে কেমন জাদু পড়ে?"

বিস্তারিত বলতে চায় না সিধু, সে-ও ছাই মাখতে লাগলো হাতে, "কয়েক বছর পরপর পড়ে, কিন্তু খবর সব কানে আসে না।" থোণ্ডুপকে রাজমঠের কড়া কিছু কাজের ভার দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু জাদুপাত দেখভালের ব্যাপারটা সম্ভবত আরো পাকা কেউ দেখছেন এখন। সিধুর ডাক পড়ে না ওদিকে।

খোবরাৎ ঢেঁকুর তুলে উঠে দাঁড়িয়ে হাত ঝাড়লো, "একটু লম্বা হওয়ার ব্যবস্থা দেখা দরকার।"

সিধু হাত ধোয়ার জন্যে কুয়োর দিকে এগিয়েছিলো, কয়েক পা যাওয়ার পর তার ঘাড়ের কাছটা শিরশির করে উঠলো। কয়েক বিপল তার সতর্ক মন চাপা পড়েছিলো প্রশ্নের নিচে, সে অবকাশেই খোবরাৎ প্রায় নিঃসাড়ে এগিয়ে এসে সিধুকে কুস্তির প্যাঁচে কোমরে ঠেকিয়ে তুলে আছড়ে ফেললো মাটিতে। সিধুর বাহু সারা শরীরের ভর নিয়ে একটা নুড়ির ওপর গিয়ে পড়লো, যন্ত্রণায় তার চোখে জল চলে এলো।

খোবরাৎ নিপুণ প্যাঁচে সিধুর বাম কব্জি মুচড়ে ধরেছে দু'হাতে, সিধুর ডান হাত তার এক পায়ের নিচে। হাতের মোচড়টা সিধুর কনুইয়ে ভাঁজের উল্টোদিকে চাপ ফেলেছে, নড়তে গিয়ে ককিয়ে উঠলো সিধু।

"নড়বি না।" খোবরাতের কণ্ঠ নিচু আর শীতল। "তড়পালে হাত ভেঙে দেবো। ঠিকাছে?"

সিধুর ডান গাল ঠেসে আছে মাটিতে, সে চাপা গলায় বললো, "কী হচ্ছে এসব?"

খোবরাৎ সিধুর কনুইতে চাপ বাড়ালো। "ওটাই খুলে বল আমাকে। তুই ব্যাটা জংলি কালাপাঁঠা রঙ্গীরাজার ওড়না পেলি কোত্থেকে? কাকে ভুকিয়ে লুট করেছিস এটা? এ তল্লাটে কী করিস?"

সিধু লম্বা একটা শ্বাস নিলো। "আমার সাথে রাজমঠের পাঞ্জা আছে...।" চাপ বাড়তেই যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে থেমে গেলো সে।

"পাঞ্জা তোর পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দেবো শালা আটবিক!" হিংস্র কণ্ঠে বললো খোবরাৎ। "তোর মতো কালাপাঁঠাদের ফৌজে পর্যন্ত নেয় না রঙ্গালরা, আর তুই আমায় রাজমঠ দেখাস?" মাটিতে থুতু ফেললো সে। "হাত ভাঙার আগে আর একবার মাত্র শুধাচ্ছি। কম কথায় বল।"

সিধু কথা না বাড়িয়ে ছোট করে উচ্চগ্রামে স্পষ্ট স্বরে বললো, "ধূমায়ুধ।"

খোবরাৎ চাপটা বাড়াতে শুরু করায় সিধুর শরীর শক্ত হয়ে উঠছিলো, কিন্তু তাকে ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেলো মুষ্ঠিক। লাথির আশঙ্কায় সিধু ডান হাত দিয়ে মাথাটা ঢাকলো, কিন্তু খোবরাৎ আরো পিছিয়ে দাঁড়িয়ে অস্ফুটে খিস্তি করলো শুধু।

সিধু উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ খোবরাৎকে চুপচাপ কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে কুয়োর দিকে এগিয়ে গেলো। এক বালতি জল তোলার পর খোবরাৎ থপথপিয়ে নিরাপদ দূরত্বে এসে দাঁড়ালো কুয়োর উল্টোদিকে। সিধু হাত ধোয়ার ফাঁকে শুধালো, "কী জানো এ নিয়ে?"

খোবরাৎ গলা খাঁকরালো। "খুব কম।" সিধুর হাত থেকে বালতিটা নিয়ে চুপচাপ পানি তুললো সে। "তোমরা কতদূর জানো?"

সিধু খোবরাৎকে পিছলে যেতে দিতে নারাজ, "এখন মুখ খুললে পরে কম কথায় পার পাবে।"

খোবরাৎ সিধুকে আবছায়ায় মেপে নিয়ে বললো, "ঘোড়াটাকে পানি খাইয়ে আসি তাহলে। তুমি ঘরটা একটু নেড়েচেড়ে দ্যাখো।"

সিধু বাহু ডলতে ডলতে খোবরাতের দিকে চোখ রেখে একটা শুকনো ডালে কুটো পেঁচিয়ে মশাল বানাতে লাগলো। খোবরাৎ পাথুরে গর্তে ঘোড়ার জন্যে পানি ঢালতে লাগলো নীরবে।

মশালে আগুনটা ধরে ওঠার পর গুমটি ঘরের দিকে পা বাড়ালো সিধু। নামেই গুমটি, ঘরগুলো বেশ বড়, জনাআষ্টেক লোক সবাহন মাথা গুঁজতে পারবে রাতে। ঘরের দেয়াল মাঝারি গুঁড়ি পুঁতে গড়া, তবে নিশ্ছিদ্র নয়, ছাদওয়ালা খাঁচা ভাবলে ভুল হবে না। দরজাটা বেশ চওড়া, কপাটদুটো বাইরের দিকে খোলে, সাবধানে টেনে খুলে ভেতরে মশাল তাক করলো সে। ঘোড়া বেঁধে রাখার জন্যে ঘরের এক পাশে মাটিতে মোটা গুঁড়ি পোঁতা, অন্য পাশে উঁচু মাচান বাঁধা। এ তল্লাটে মাটিতে শোয়ার নানা বিপদ, মাচান বাঁধলেও খুব একটা পরিত্রাণ মেলে না। কাঠুরেদের গাঁয়ের আশেপাশে গিরিপুদিনার ঝোপ দেখে এসেছে সিধু; সন্ধ্যায় ঘরের ভেতরে মালসার আগুনে সেগুলোর ডালপাতা পুড়িয়ে ধোঁয়া দেয় ওরা, মশামাছিবিচ্ছুমাকড় পালায় তাতে। হাঁক ছেড়ে খোবরাৎকে ডাকলো সিধু, "একটু আগুন নিয়ে দ্যাখো, আশেপাশে কোথাও পুদিনার ঝোপ আছে কি না।"

ঘোড়াটা শুধু ছটফটিয়ে চিঁহিহিহি ডেকে উঠলো, খোবরাৎ সাড়া দিলো না।

সিধু মশাল বাগিয়ে পুরোটা ঘর একবার দেখে নিলো। অস্বাভাবিক কিছু নেই, এক কোণে ঘন ঝুল জমে আছে, সোঁদা গন্ধ ভেসে আছে বাতাসে, মেঝেতে দৃশ্যমান কোনো গর্ত নেই। ইঁদুর নেই এ তল্লাটে, গ্রামবুড়ো জানিয়েছিলো গোমড়ামুখে। ধানইঁদুরের কাবাবের কদর আছে রঙ্গী নদীর পশ্চিমে, বিরঙ্গীর পুবেও; মাঝের মস্ত দেশটা জুড়ে রঙ্গালরা নাক সিঁটকায় যদিও। কাঠুরেরা মাঝেমধ্যে জাল পেতে টিয়া ধরে ইঁদুরের কাজ চালিয়ে নেয় এদিকটায়।

খোবরাৎ খানিক বাদে একগাদা ডালপাতা আর নিভন্ত মশাল নিয়ে ঘরে ঢুকলো। "ধোঁয়া দিলে পিঁপড়া যাবে?"

সিধু কাঁধ ঝাঁকালো। খোবরাৎ পুদিনার ডালগুলো মেঝেতে ছুড়ে থুতু ফেললো, "জন্তুগুলো বাইরে থাকুক, নাকি?"

সিধু মাচানের নিচে ডালগুলোকে স্তুপ করে আগুন ধরিয়ে দিলো, সাদা ধোঁয়া বেরুতে শুরু করলো খানিক বাদেই। "অচেনা জায়গা। ভেতরেই থাকুক।"

খোবরাৎ ঘরের ভেতরে পায়চারি করতে লাগলো, "তোমরা ধূমায়ুধের খবর পেলে কী করে?"

সিধু মাচান থেকে দূরে সরে এলো, "ঝোড়সওয়ার আটক হয়েছিলো রঙ্গপট্টনে।" খুশকিনার লোকে ভিন্ন কোনো সূত্র থেকে এ খবর পেয়েছে, সে আশঙ্কা নেই তার। খোবরাৎ অসন্তুষ্ট ঘোঁৎকার তুললো, "তোমরা এমন করো বলেই ওরা আর কাউকে বিশ্বাস করে না।"

সিধু জবাব না দিয়ে মশাল খোবরাতের দিকে তুলে ভুরু কোঁচকালো। ঝোড়সওয়াররা কোথাও নিরাপদ নয়। যখন খুশি ঘূর্ণিবায় তুলে উড়তে পারে, এমন মানুষ নাগালে পেলে কোনো রাজশক্তিই তাকে ছাড়তে চাইবে না। রাজমঠ অবশ্য যে কোনো জাদুর ব্যাপারেই অভিন্ন নীতি ধরে রেখেছে: হয় সেটা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, নইলে নষ্ট করতে হবে। ঝোড়সওয়াররা গত কয়েকশ বছরে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে বটে, কিন্তু রঙ্গারিডি এড়িয়ে এ তল্লাটে চলাও মুশকিল।

খোবরাৎ হাতের আঙুল মটকে বললো, "আমি সামান্য সৈনিক, ওপরতলায় কী রটেছে আমি জানি না। কিন্তু খোদ রাজার হুকুম গেছে কোলখুশকিনে, নিরানুপে লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিতে হবে, ধূমায়ুধ কী। বাহুল মশায় আগেও লোক পাঠিয়েছিলেন, তারা তোমাদের ঘাঁটির খোঁজ নিয়ে ফিরেছে। তো এবার আমার ঘাড়ে ভার পড়েছে, ধূমায়ুধের পাত্তা লাগাতে হবে...।"

আঁধারে ঢিল ছুড়লো সিধু, "নিরানুপে জলের খোঁজ দিয়েছে ঝোড়সওয়ার।"

খোবরাৎ একটু যেন চমকে উঠলো, "য়্যাঁ? নিরানুপে জল? ...তা জানি না। ধূমায়ুধ আছে ওখানে, তার দাপটে মানুষ টিকতে পারবে না, এটুকুই জানি আমি।" মাথা চুলকালো সে। "এখন এই ধূমায়ুধ কেমন জন্তু, সেটা আর বলেনি আঞ্চোৎটা। বখশিশ নিয়ে ভেগেছে।"

খুশকিনায় জাদুর কদর আছে, জানে সিধু; কিন্তু খুশকিনারাজ কি জলজ্যান্ত ঝোড়সওয়ার নাগালে পেয়ে তাকে বখশিশ নিয়ে সটকাতে দেওয়ার মতো উদার? রঙ্গপট্টনে আটক ঝোড়সওয়ারই কি কয়েক বছর পর অভিন্ন তথ্য খুশকিনার রাজার কানে তুললো, নাকি এ ভিন্ন লোক?

[চা-বিরতি, গল্প এখানেই চলবে]


মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

পড়ছি। লেখার সাথে অলংকরণ ভাল লাগছে।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

হিমু এর ছবি
ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

চরিত্র, ভাষা, পরিভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ - সব মিলিয়ে একটি নতুন জগত তৈরি করা অসম্ভব পর্যায়ের একটি কাজ। একটি গল্প, তা যত বড়ই হোক, তার পক্ষে একটি নতুন জগত ধারণ করা কঠিন। তাছাড়া এতে নির্মাতা ও তাঁর সহযোগীদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ণের সুযোগও থাকে না। গল্পটি যদি প্রবেশক হয় তাহলে ঠিক আছে।

আশির দশকের একেবারে গোড়ায় বাটেভি-তে রবিবার সকালে স্পাইডার ম্যান আর সুপার ম্যানের কার্টুন দেখাতো। 'সুপার হিরো' শব্দটি তখনো আমাদের অপরিচিত। কার্টুনগুলো দেখার সময় সম্ভবত দর্শকদের কারো মনে কখনো আসেনি তিন দশক পরে এই কার্টুন চরিত্রগুলো (সাথে আরও অনেক চরিত্র) কি বিপুল বিস্ময়কর জগতের পসরা আর কল্পনাতীত পরিমাণ অর্থের বাণিজ্য নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াবে!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

চরিত্র, ভাষা, পরিভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ - সব মিলিয়ে একটি নতুন জগত তৈরি করা অসম্ভব পর্যায়ের একটি কাজ।

তাহলে এটাকে দুই দিয়ে গুণ করুন।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আমার ধারণা আছে। অনেক দিন নিজে এমন কিছু করার কথা ভেবেছি। ভেবে ভেবে বুঝেছি এই কর্ম আমার না। বাংলা ভাষায় এরকম কাজ ছুটকা ছাটকা কিছু হয়তো হয়েছে (এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না) কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি।

গল্পটা শেষ হোক, তখন আরও কিছু বলবো।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

আমি বলতে চেয়েছি, একটার জায়গায় দুটো পৃথক নতুন জগৎ-সজ্জার কথা চিন্তা করুন তাহলে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

লেখা যেহেতু আপনার সুতরাং চিন্তাভাবনা আর সিদ্ধান্তের দায়িত্বও আপনার। কিন্তু আমার মনে হয় একসাথে দুটো জগৎ নির্মাণের সিদ্ধান্ত বিপদজনক। প্রথমত, এতে দুটো জগতের ব্যাপারে মোটামুটি সমান গভীর চিন্তা-প্রচেষ্টা দেয়া সম্ভব না। দ্বিতীয়ত, এতে একটার টেমপ্লেট আরেকটাতে অনিচ্ছায় হলেও ব্যবহৃত হয়ে যাবার আশঙ্কা থাকে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

তা ঠিক। একটা গড়তেই বছরপাঁচেক লেগে গেলো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

তা লাগার কথা। আউটপুটটা সেই মাপের হলে সব ক্ষতি পুষিয়ে যাবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সোহেল ইমাম এর ছবি

অনেকদিন পর উঁকি দিয়ে আপনার গল্পটা পড়ে মনে হলো ঠকিনি। আশা করছি লেখাটা আরো অনেক গুলো পর্ব যাবে।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

হিমু এর ছবি

লেখাটা এই পোস্টেই বাড়বে। পর্ব তো আসবেই, শুরুটাই শেষ হয়নি এখনও।

খেকশিয়াল এর ছবি

বেড়ে হয়েছে, চলুক চলুক!

-----------------------------------------------
'..দ্রিমুই য্রখ্রন ত্রখ্রন স্রবট্রাত্রেই দ্রিমু!'

হিমু এর ছবি

ওরে জাস্টিনতুম্বাড়লেখ, তোমার গপ্পোখান ছাড়ো না ক্যান?

অবনীল এর ছবি

কিংবা আরেকটু বাঙালীয়ানা করে নাম দেওয়া যায় - যতীন তুম্বাড়লেখ ।
ধূমায়ূধ মানে কি ধুম্র সৃষ্টিকারী যুধ? দেখা যাক চা পানের বিরতীর পর আন্দাজ ঠিক হয় কিনা।

ফ্যান্টাসীর একটা ভালো বাংলা দেখলাম এখানে - কল্পনা ।

___________________________________
ঈশ্বরের মত, ভবঘুরে স্বপ্নগুলো।

হিমু এর ছবি

ফ্যান্টাসির সুন্দর বাংলা আছে তো, রূপকথা। কিন্তু আমাদের দেশে রূপকথা ফেইরি টেইলস উপঘরানার জায়গাটা খেয়ে বসে আছে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

একটু দেখুন তো,

লোককথা = Fable
উপকথা = Folk Tale
রূপকথা = Fairy Tale (?)
কিস্‌সা/কিচ্ছা = ?
পাঁচালী = ?
চারণ = Epic (মহাকাব্য?)
কল্পগল্প = Fantasy
কীংবদন্তী = Legend


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

চারণকাব‍্য আর এপিক বোধহয় সবসময় সমার্থক না। চারণকবি (minstrel) ভ্রাম‍্যমান গীতিকবি।

প্রায় সব গল্পই "কল্পগল্প", কিন্তু সব কল্পনা কি ফ‍্যান্টাসির আওতায় পড়বে? "অদ্ভুত" শব্দটা ফ‍্যান্টাসির যথার্থ বাংলা, কিন্তু এটাকে যখন-তখন যেখানে-সেখানে ব‍্যবহারে এর দ‍্যোতনাটাই মৃগেল করে দিয়েছি আমরা।

পাঁচালি গোড়ায় ছিলো কথ‍্য ইরোটিকা (পাঞ্চালিকা), পরে সেটা পুতুলনাট‍্য বোঝানো শুরু করেছে। মাপেটস, সেজামি স্ট্রিট আর মিঠু-মন্টি খাঁটি পাঁচালি।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

সব পাঁচালী কথ্য ইরোটিকা ছিল না। উদাহরণ, লক্ষ্মীর পাঁচালী। বিশেষ কোন ঘটনার কাব্যিক বর্ণনার সাথে বিশেষ কারো স্তুতি, বন্দনা, আবাহন, ব্রতকথা, মন্ত্র ইত্যাদির এক বা একাধিকের সমন্বয়ে পুরনো পাঁচালীগুলো হতো। পরে নাগরিক পাঁচালীগুলো জনআগ্রহ আছে এমনসব বিষয়কে ভক্তি, করুণ, রুদ্র বা আদি রস যোগে পরিবেশন করা হতো। নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপা পাঁচালীর বইয়ের যথেষ্ট কাটতিও ছিল।

প্রায় সব গল্পই "কল্পগল্প", কিন্তু সব কল্পনা কি ফ‍্যান্টাসির আওতায় পড়বে?

- অবশ্যই না। একটাকে 'গল্প' আর আরেকটাকে 'কল্পগল্প' বলে নিপাতনে সিদ্ধ করে নিলে হয়।

'অদ্ভূত'-এর ব্যবহার পরিবেশ, প্রেক্ষিত ও ভাব অনুযায়ী পালটায়। কোন কোন শব্দের ক্ষেত্রে এরূপ বিচিত্র ব্যবহার হতে পারে। এটা মৃগেলায়ণ নয়।

'চারণকাব্য' আর 'মহাকাব্য' অবশ্যই এক না। Epic আসলে মহাকাব্য। চারণকবি = minstrel বা troubadour ঠিক, তাহলে চারণকাব্যের এক শব্দে ইংলিশ প্রতিশব্দ কী হয়?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

Ballad।

অদ্ভুতকে (হ্রস্ব উ কার হবে) একটা সার্থক মোচড় দিয়েছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, "অদ্ভূতুড়ে" গ্রন্থমালা দিয়ে। কল্পগল্প একটা ভালো বিকল্প, কিন্তু তারপরও চোখকান খোলা রাখি।

সায়েন্স ফিকশনকে তাহলে গল্পবিজ্ঞান (ঘনাদা আর বিজ্ঞানী সফদর আলীর গল্পগুলো) আর সায়েন্স ফ্যান্টাসিকে (শঙ্কুর গল্পগুলো) কল্পবিজ্ঞান বলা যায়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

Ballad => একেবারে ষণ্ডচক্ষু!

অদ্ভুত/অদ্ভূত > হ্রস্ব উ-কার নাকি দীর্ঘ ঊ-কার তা নিয়ে আমার মধ্যে সন্দেহ কাজ করে। একটু ভেঙে দেখান।

আমাদের ছোটবেলায় 'মুক্তধারা' যেসব সায়েন্স ফিকশন বের করেছিল (যথা, কপোট্রনিক সুখ দুঃখ, ছোট মামা দি গ্রেট, স্বাতীর কীর্তি, সূর্যপুত্রের গুপ্তধন ইত্যাদি) সেগুলোকে তারা 'বৈজ্ঞানিক কল্পউপন্যাস' শিরোনামে শ্রেণী বিভক্ত করতো। পরে এই নামটা কী করে যেন হারিয়ে গেলো।

সফদার আলী > গল্পবিজ্ঞান > বৈজ্ঞানিক গল্প
ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু > কল্পবিজ্ঞান > বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

আপনি এই ভাংচুর মারপিট কিলাকিলির বদভ্যাসটা ছাড়েঞ্ছে।

এই দ্যাখেন:

তারপর দ্যাখেন কী এই চিজ:

ছবি কৃতজ্ঞতা: রাজশাহীভ্রমণপিশাচ এক সচল।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ঢাকায় ভাংচুরের ভিন্ন ভার্সান প্রচলিত আছে, তবে তাকে ভাংচুর বলে না।

পুনশ্চঃ প্রকৃতি-প্রত্যয় ভুলে যাবার ফলে এই দুরবস্থা হয়েছে। আবার বইখাতা নিয়ে বসবো সেই উপায় নেই। অনেক বইও আর পাওয়া যায় না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অবনীল এর ছবি

গড়াগড়ি দিয়া হাসি

___________________________________
ঈশ্বরের মত, ভবঘুরে স্বপ্নগুলো।

হিমু এর ছবি

"মানুষকে অন্য একটা জগতে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে যায়, এমন ব্যক্তি" অর্থে একটা সুন্দর শব্দ খুঁজে পেলাম, সাম্পরায়ণ (তৎসম, পুংলিঙ্গ)। এখানে অন্য জগৎ বলতে পরলোক বা ভবিষ্যৎ বোঝায়, আমরা চাইলে রূঢ়ার্থে ফ্যান্টাসির কল্পজগৎ নির্দেশ করে ফ্যান্টাসিলেখককে সাম্পরায়ণ বলতে পারি।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

বাংলা ভাষায় ভবিষ্যতের অনেক কল্পকাহিনী লেখা হলেও সুদূর অতীতের কল্পকাহিনী তেমন লেখা হয়েছে মনে পড়ে না। এই কাহিনীর সুত্রপাতটা অভিনব, সেই সাথে অলংকরণটা পাঠককে গল্পের সেই কল্পজগতটাকে দেখার চোখে একটা রঙ দিয়েছে। চমৎকার একটা সম্ভাবনার সুত্রপাত দেখতে পাচ্ছি। কীবোর্ড চালু থাকুক শেষ পর্যন্ত। চা বিরতি শেষ হবার অপেক্ষায়।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

হিমু এর ছবি

মহারাজ তিষ্ঠ, গল্প আর কয়েক পেয়ালা অবশিষ্ট।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

একদম শুরুতে একটা মানচিত্র যোগ করুন। মানচিত্রে দেশ, নদী, পাহাড় ইত্যাদি ছাড়াও কোন দেশের লোক কারা, দেখতে কেমন, কী পরে সেসবও যোগ করুন। কিছু শব্দের জন্য নির্ঘন্ট লাগবে, তবে সেটা গল্প শেষ হবার পরে করলেও চলবে।

পুনশ্চঃ হঠাৎ খেয়াল হলো এখনো পর্যন্ত (৩/২১ সকাল, বাংলাদেশ সময়) এটা একেবারে নারীবর্জিত গল্প। ঢ্যাঙা রায়বাবুর গল্পের মতো। দিন কি এভাবেই যাবে?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু এর ছবি

পুনশ্চের উত্তর জানতে হলে তো আগে বাকিটা পড়তে হবে। তারপর ধরেন গিয়ে সিধুর পরবর্তী-পূর্ববর্তী গল্পগুলোও পড়তে হবে। এভাবে কেটে যাবে বছরত্রিশেক। তারপর নাহয় একটা সিদ্ধান্তে আসা যাবে।

মানচিত্রের ব্যাপারে বেশ কিছু চিন্তা জমে গেছে, একটা আলাদা লেখা বা লেখামালা নামাবো এ বছরের শেষে। তবে আপনি যেমনটা চাচ্ছেন, সেরকম কে-কী-খায়-পরে দিলে জিনিসটা গোড়াতেই ছাত্রসখার মতো হয়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা থাকে। সবচে বড় কথা আমার আঁকার হাত এখনও নিতান্ত কাঁচা। আরেকটু পাকার পর আইক্যা ফাডায়ালাম।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আর বছরত্রিশেক তো বাঁচবো না, অত বাঁচার খায়েশও নেই। সুতরাং সিধুদের ব্যাপার-স্যাপার ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়াই আমার পক্ষে শ্রেয়। কপালে থাকলে দেখতে পাবো, না থাকলে নাই।

আপাতত দেশ, পাহাড়, নদীওয়ালা একটা মানচিত্র যোগ করুন। তাতে পড়ার সময় কোন দিক দিয়ে কী আসলো সেটা বুঝতে সুবিধা হবে। পাকা হাতের নকশাবিদরা তো মানচিত্র এঁকে দেবেন না তাই আপনার কাঁচা হাতের মানচিত্রেই পাঠকের কাজ চলবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।