পোল্যান্ডের চিঠি - ৩ --- ভিয়েলিচ্‌কা!!

সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি
লিখেছেন সুবিনয় মুস্তফী (তারিখ: মঙ্গল, ২৯/০১/২০০৮ - ৩:০৩পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

auto২৭ তারিখ, রবিবার, সকাল ৯.৩০। বাস এই মাত্র হাইওয়েতে উঠলো। ক্রাকোভ থেকে আউশউইৎস কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে যাবার কোচে বসে আছি। মাত্র ৯ য‌লোতি ভাড়া। মনটা বেশ ভালো লাগছে - হোস্টেল থেকে বলেছিল ওরা আউশউইৎস ট্রিপের সমস্ত বন্দোবস্ত করে দিতে পারবে। কিন্তু গতকাল পিয়েরোগি খাবার পরে নিজে নিজেই চলে গিয়েছিলাম ভিয়েলিচকার লবন-খনিতে মানুষকে জিজ্ঞেস করে করে। পরে সেখানে পৌঁছে বুঝেছি যে ঠিক কাজই করেছি, হোস্টেলের থেকে ট্রিপ বুকিং দিলে আমার পাক্কা দ্বিগুণ টাকা চলে যেতো। এবং তা একেবারেই বেহুদা, কারন ওরা যা দেখাবে আমিও ঠিক তাই দেখলাম। গ্রুপ ট্যুর, অর্গানাইজড ট্যুর এই জাতীয় জিনিসগুলো এই জন্যে সব সময় এড়িয়ে চলি - বিদেশে এডভেঞ্চারের ব্যাপারটা আর থাকে না, সবকিছু নিরাপদ বাব্‌লের মধ্যে থেকেই করে দেয় ওরা।

কাল রাতে লেখা অর্ধেক শেষ করে ঘুমিয়েছিলাম। আজ সাত-সকালে উঠে বিবিসি খুলে দেখলাম ওবামা জিতেছে সাউথ ক্যারোলাইনায়। এখন ফেব্রুয়ারীর পাঁচ তারিখে সুপার-ডুপার মঙ্গলবারে কেমন দেখাতে পারে হিলারির বিরুদ্ধে সেটাই প্রশ্ন। খুব একটা আশা নেই। হিলারি আর বিল দুজনই খুব নোংরামি করলো এবারের রেসে। তবে প্রেসিডেন্ট কেনেডির মেয়ে স্বয়ং বলেছে যে ওবামা তার নিহত বাবার কথা মনে করিয়ে দেয়। বড়-সড় অনুমোদন পেলো একটা। দেখা যাক কি হয়...

*

মর্ত্যের বুকে নরক ছিল আউশউইৎস - আজ সকালের আবহাওয়াটাও আমার এই গন্তব্যের আমেজের সাথে মিলে গেছে। কনকনে ঠান্ডা বাইরে। মেঘলা, ছাই বরণ আকাশ বাতাস। রাতে বৃষ্টি পড়েছে, ক্রাকোভ-এর রাস্তা-ঘাট ভেজা স্যাঁতসেতে। সব নির্জন। রবিবার সকালে গীর্জার ঘন্টাধ্বনি আর ট্রামের বেল ছাড়া আর তেমন কোন শব্দ পাওয়া গেল না। কোচ স্টেশনে হেঁটে এলাম। আজকে ক্যামেরার সেটিং শাদা-কালোতে দিয়ে রাখাই উত্তম হবে।

মাটির নীচে লবন খনি Wieliczka

গতকাল বিকালে যেই স্থানটা দেখে আসলাম, সেই ভিয়েলিচকার কথা না বললেই না। হলফ করে বলতে পারি যে আমার সারা জীবনে এমন ইউনিক প্রকৃতির জায়গা আর কোথাও দেখিনি। ক্রাকোভ থেকে আধ-ঘন্টা দূরে, প্রাইভেট মিনিবাসে করে যেতে হয়।

ভিয়েলিচকা (Wieliczka) মাটির নীচে এক বিশাল লবনের খনি। প্রায় এক হাজার বছর ধরে এই খনি থেকে লবন উত্তোলন করা হচ্ছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খনির ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পেয়েছে - সুড়ঙ্গ কেটে কেটে মাটির নীচে এখন প্রায় সাড়ে তিনশো মিটার মানে এক হাজার ফুট গভীরতায় তা চলে গেছে। (এক হাজার ফুট মানে ৯০-৯৫ তলার কম হবে না।) সব মিলিয়ে মোট সুড়ঙ্গ আছে ৩০০ কিলোমিটার, নয়টি বিভিন্ন লেভেলে। আমরা গতকাল মাত্র ১৫০ মিটার পর্যন্ত নেমেছি, আর মাটির নীচে দুই ঘন্টার ঘোরাঘুরিতে আমরা বোধ হয় তিন কিলোমিটারের মত পথ হেঁটেছি। মানে পুরো খনি কমপ্লেক্সের ১% মাত্র।

autoভিয়েলিচকায় পৌঁছানোর পরে তাদের রিসেপশনে গ্রুপ জড়ো করা হয়। আমি টিকেট কেটে ৩০ জনের মত একটা গ্রুপের সাথে ভিড়ে গেলাম। সেখান থেকে একটা লোহার দরজার ওপাশে কাঠের সিঁড়িঘর। খুব সরু আর নীচু - উচ্চতা আর প্রস্থে ৬ ফুট বাই ৬ ফুটের বেশী হবে না। কাঠের সিঁড়ি, দেয়ালও তৈরী কাঠের গুড়ি দিয়ে। টিমটিমে হলদে আলো।

আমরা নামা শুরু করলাম। নামছি তো নামছি। নীচে একবার তাকিয়ে ভিমড়ি খেলাম - সিঁড়ির শেষ দেখা যায় না। নামছি তো নামছি। আমার সামনে এক ছেলে ঠাট্টা করে বললো - এটা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অস্ট্রেলিয়ার মাটি ফুঁড়ে বেরুবে আবার। নামছি তো নামছি। নামা শেষ হয় না কেন?! প্রায় ১০০ মিটার গভীরতায় নেমে অবশেষে আমরা থামলাম। মনে হয় প্রায় ৩০-৩৫ তলার মতো নেমেছি প্রথম ধাক্কায় সিঁড়ি বেয়ে। অনবরত ৮-১০ মিনিট, হিসাব হারিয়ে ফেলেছি।

autoবিরাট একটা গুহার ভেতরে নেমে এলাম। ভুতুড়ে অন্ধকার - একটু পর পর স্বল্প পাওয়ারের হলদে বালব দিয়ে সেই অন্ধকার নিবারণের ব্যর্থ-প্রায় প্রয়াস। মাটির এত নীচে এই গুহা মানুষেরই সৃষ্টি - আস্ত পাথর খোদাই করে করে বানানো হয়েছে। গুহার দেয়াল নিরেট রক-সল্ট (rock-salt) দিয়ে তৈরী। বিস্ময়ের বিস্ময় - নিকোলাস কোপার্নিকাস, বিখ্যাত পোলিশ বিজ্ঞানী, তার একটা লাইফসাইজ মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ঠিক গুহার মাঝখানে! এবং পুরো মূর্তিটা রক-সল্ট কেটে তৈরী করা হয়েছে! ভিয়েলিচকার এই রক-সল্ট জিনিসটা কালচে সবুজ রং এর। তাই গুহার ঘুটঘুটে দেয়াল কালচে সবুজ, আর শ্রদ্ধেয় কোপার্নিকাস, যিনি হাতে একটি গোলক ধরে আছেন, তিনিও কালচে সবুজ পাথরের।

গুহা আর সুড়ঙ্গের গোলক ধাঁধা

এখান থেকেই শুরু। এর পরের দুটো ঘন্টা আমরা একের পর এক সুড়ঙ্গ অতিক্রম করলাম, সবই সেই বেসিক আদলের - কাঠের গুড়ির দেয়াল, উপরে নীচে আর দুই সাইডে বেশী স্পেস নেই, একটু পর পর বালবের ফিকে আলো, আর সুড়ঙ্গের শেষে একের পর এক গুহা। কোন কোন গুহা বিশালাকৃতির, ৩০-৪০ ফুট উঁচু। আবার কোন কোন গুহা একেবারেই ছোট। প্রতিটি গুহাতেই কোন না কোন মূর্তি বা নিদর্শন আছে। এবং মূর্তি বা নিদর্শন সে যাই হোক না, সবই লবন-পাথর থেকে খোদাই করা হয়েছে।

autoমাঝে মাঝে গুহা বা সুড়ঙ্গের কালচে দেয়াল ফুঁড়ে ফুঁড়ে শাদা রঙ্গের এক পাথুরে বস্তু দেখা যায়। শ্যাওলার আকারে বা ফাঙ্গাসের মতো দেয়ালের গায়ে সেঁটে আছে। গাইড বললো এটা লবন, দেয়াল ফেটে বের হয়ে এসেছে। সত্যিই তাই! আঙ্গুলে একটু লালা লাগিয়ে এই শাদা পাথুরে শ্যাওলাটা যখন চেখে দেখলাম, দেখি একেবারে নিরেট লবন! কি তাজ্জব!!

বিভিন্ন গুহায় কি কি দেখলাম, সংক্ষেপে বলি। নামী-দামী রাজাদের মূর্তি আছে বেশ কয়েকটা গুহায় - যেমন একটাতে দেখলাম মধ্যযুগের পরাক্রমশালী পোলিশ রাজা কাসিমির (Kazimierz)-এর একটা ভয়ংকর আবক্ষ মূর্তি (একদম প্রথম ছবিটা)।

পোলিশরা ধর্মপ্রাণ আগেই দেখেছি, কিন্তু খনি-শ্রমিকরা গড়ের থেকেও বেশী ধার্মিক। হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেই কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তাদের করতে হয়, সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস বা ভরসা বোধ হয় তাদের আরো বেশী দরকার। এই খনি কমপ্লেক্স খুঁড়তে গিয়ে যুগে যুগে অনেক শ্রমিকের অকালে প্রাণ গেছে।

এই সব কারনে তিন-চারটে চ্যাপেল গোছের গুহাও আছে ভিয়েলিচকায়। (চ্যাপেল = ছোট প্রার্থনার ঘর।) এর মধ্যে দুটো আমরা দেখতে পেলাম - তার ভেতরে যীশুর লাইফ-সাইজ মূর্তি, যথারীতি কালো-সবুজ রক-সল্ট দিয়ে তৈরী। সাথে মাতা মেরীর মূর্তিও আছে। খনি-শ্রমিকরা এখানে প্রতি রবিবার নিয়মিত প্রার্থনা করে বলে শুনলাম।

আর্টিফিশিয়াল আন্ডারগ্রাউন্ড লেক আছে কয়েকটা। মানুষই খোদাই করে সেটা লবনাক্ত পানি দিয়ে ভরাট করে লেক তৈরী করেছে। লবনাক্ততার কারনে সেই পানির রং একদম ঘোলাটে সবুজ। এমন একটা লেক-ওয়ালা গুহায় প্রবেশ করে দেখি একেবারে কোন আলো নেই। নিকষ আঁধারে আমরা একটু হাবা-গোবার মতো দাঁড়িয়ে আছি - হঠাৎ কি আশ্চর্য! - অন্ধকার চিড়ে ভেসে এলো শোপিন-এর সঙ্গীত!! ফ্রেডেরিক শোপিন (Frederic Chopin) পোল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত ক্লাসিকাল পিয়ানিস্ট ও কম্পোজার - পোল্যান্ড বিশ্বের দরবারে যেই গুটিকয়েক সন্তানদের নিয়ে অনায়াসে বড়াই করতে পারে, শোপিন তাদের অন্যতম। সেই শোপিনের বাজনাই কোথা থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে উড়ে এসেছে। আস্তে আস্তে মিউজিকের ছন্দে ছন্দে আলোও চলে এলো - সঙ্গীত আর আলো, এই দুইয়ে মিলে সবুজ লেক-কে ভাসিয়ে দিলো। সব মিলিয়ে আশ্চর্য এক আবহের সৃষ্টি।

জার্মান কানেকশান

গাইড বললো যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসী বাহিনী এই ভিয়েলিচকার ভেতরে অস্ত্র নির্মান কারখানা বসিয়েছিলো। আইডিয়া খারাপ না - মাটির এত নীচে লুকানো কারখানা মিত্র-বাহিনীর স্পাই প্লেনের পক্ষে ধরা নিশ্চয়ই অসম্ভব ছিলো। আর যদি কোনভাবে জানতেও পারতো যে এখানে অস্ত্রের কারখানা আছে, তাহলে কিই বা করতে পারতো? আকাশ থেকে যত শক্তিশালী বোমাই পড়ুক না কেন, মাটির নীচে সিকি মাইল কি তা ভেদ করতে পারবে? মনে হয় না।

জার্মান কানেকশান এখানেই শেষ না। মহাকবি গ্যেটের একটা বড় মূর্তি দেখলাম একটা গুহায়। ১৭৯০ সালে ভিয়েলিচকা পরিদর্শন করতে গ্যেটে এখানে এসেছিলেন । তিনি সেই সময় তৎকালীন ভাইমার (Weimar) সরকারের খনি-মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। যা শুনলাম এটা একটা অফিশিয়াল সফরই ছিল তার জন্যে। (খনি ঘুইরাই মাগনা মূর্তি পাইয়া গেলো...)

ঘোড়া কাহিনী

autoযুগের পর যুগ এই খনিতে মানুষের পাশাপাশি ঘোড়াও কাজ করেছে। পাথর-বোঝাই কার্ট টানা, লিফট ওঠা-নামা করানো থেকে আরো অনেক কিছু করতে হতো ঘোড়াদের। মানুষ তাও সকালবেলা খনিতে নেমে সারাদিন শিফট শেষ করে রাতের বেলা বাড়ি ফিরে যেতে পারতো। বেচারা ঘোড়াদের অত ফ্রিডম ছিল না। একবার মাটির তলায় নামলে পাক্কা এক বছর তারা খনিতেই থাকতো। খনির নাড়িভুড়ির মধ্যেই তাদের আস্তাবল ছিল, খাওয়া-দাওয়া ঘুম সব খনির ভেতরে। অবশ্য সুবিধার ব্যাপার হলো যে খনির ভেতরে সব সময় একই আবহাওয়া বিরাজ করে। হাজার ফুট উপরে মর্ত্যমান পৃথিবীতে হাঁড়-কাপানো শীত এলো নাকি চান্দি-গরম করা গ্রীষ্ম, সেটা ব্যাপার না। মাটির নীচে চিরকালই ১৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা। তাই ঘোড়াদের অন্তত এই দিক থেকে খুব বেশী কষ্ট হতো না বলেই আশা করা যায়।

পুরো এক বছর খাটুনির পরে তাদের আবার মাটির উপরে ফেরত নিয়ে যাওয়া হতো। পৃথিবীর বুকে ফিরে এসে তাদের এডজাস্টমেন্টে সমস্যা হতো কি না, গাইড এই বিষয়ে ঠিক পরিষ্কার বলতে পারলো না। কৌতুহল জাগানোর মত ব্যাপার বটে... যাকগে, শেষ ঘোড়াটা ভিয়েলিচকা ছেড়ে চলে গেছে ২০০১ সালে। খনি এখনও সচল - তবে ঘোড়ার ব্যবহার শেষ হয়ে গেছে। অনুমান করি যে বৈদ্যুতিক শক্তিতে চালিত যন্ত্র দিয়ে এখন সেই ঘোড়াদের কাজগুলো করানো হয়।

সেইন্ট কিংগা'র চ্যাপেল

autoতবে নিঃসন্দেহে ভিয়েলিচকা লবন-খনির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সেইন্ট কিংগা'র চ্যাপেল। চমৎকার দর্শনীয় এই চ্যাপেল গুহাটা। ছবি দেখে কিছুটা আন্দাজ পেতে পারেন গুহার সাইজ ও চেহারা সম্পর্কে। আসলে চ্যাপেলটা একটা বিশালাকৃতির হলঘরের মতোই। বলা বাহুল্য যে মেঝে থেকে ছাদ পুরোটাই রক-সল্টের তৈরী। কিন্তু এই হলঘরটা স্পেশাল, কারন এর সুচারু ডিজাইন আর তাক-লাগানো স্থাপত্যগুলোর জন্যে। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলেই প্রথমে আছে প্রয়াত পোপ জন পলের একটা লাইফ-সাইজ মূর্তি। এবং সবগুলো দেয়ালে খ্রীস্টধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় খোদাই করে চিত্রায়িত করা হয়েছে। তাজ্জব হয়ে গেলাম যখন দেখলাম যে লিওনার্দোর সুবিখ্যাত পেইন্টিং দ্য লাস্ট সাপার-ও দেয়ালে খোদাই করা আছে। অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যে শিল্পী এই লবনের দেয়ালে তুলে দিয়েছেন যীশু আর তার বারোজন শিষ্যের দৃশ্যটি। একেবারে অবিকল করেই খোদাই করা হয়েছে।

autoএই হলঘরে শুনলাম কিছু সৌখিন লোক তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানও সম্পন্ন করে। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্যে বিশেষ এপ্লিকেশন জমা দিয়ে হলঘর ভাড়া নেওয়া যায়। খারাপ না বুদ্ধি - বেশ স্মরণীয় অভিজ্ঞতাই হবে। আমার শুরুতে মনে হয়েছিলো যে বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানের জন্যে এই পরিবেশটা একটু বেশীই অন্ধকার। আলো তো একেবারে অপ্রতুল। কিন্তু আমার জানার ভূল থাকতে পারে - হয়তো লাইটিং বসিয়ে এটাকেই সেনাকুঞ্জের মতো বানিয়ে ফেলা সম্ভব!!

*

সব দেখা-টেখা শেষ করে ফেরত যাবার লিফটের কাছে চলে এলাম আমরা, পাক্কা দুই ঘন্টা পরে। খুব খুব বেশী রকম দারুন লাগলো এই ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। জাতিসংঘের যে সাংস্কৃতিক অঙ্গ-সংগঠন ইউনেস্কো, তাদের একটা লিস্ট আছে, বিশ্ব জুড়ে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক এবং man-made নিদর্শনের তালিকা এটা। UNESCO World Heritage Site-এর লিস্টে অন্তর্ভুক্ত এই জায়গাগুলো মানব সভ্যতার ঐতিহ্যের জন্যে গুরুত্ববহ। পোল্যান্ডে আছে প্রায় ডজন খানেক সাইট, এবং ভিয়েলিচকার এই বিস্ময়কর লবন-খনি সেই এক ডজনের অন্যতম।

autoফেরত যাবার লিফট এক টানে উঠে গেলো। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে হাজার ফুট পথ পরিক্রম করে আমাদের আবার নামিয়ে দিল ধরণীর বুকে। যেই বন্ধুর কল্যাণে অতি প্রয়োজনীয় ক্যামেরাটি ধার পেয়েছিলাম, তার জন্যে সবুজ রক-সল্টের তৈরী একটা ছোট গিফট আইটেম কিনে ভিয়েলিচকা থেকে বেরুলাম। বাইরে ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। মিনিবাস ধরে আবার ফিরে এলাম ক্রাকোভ-এ। ঠান্ডা হাঁড় কাপিয়ে দিয়ে গেলো।

(সময়মত এই লেখা শেষ হয়ে এলো। আউশউইৎসের বধ্যভূমির কাছে চলে এসেছি। কি দেখবো জানি না। তবে সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল এখানে আসার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সংঘটিত Jewish Holocaust, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকজনক অধ্যায় যেখানে রচিত হয়েছিলো, সেখান থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরে চলে এসেছি।)


মন্তব্য

রেজওয়ান এর ছবি

বেশ জীবন্ত ভ্রমনকাহিনী হচ্ছে। আউশভিতজের বর্ণনা পড়ার জন্যে আগ্রহী হয়ে বসে থাকলাম।

পৃথিবী কথা বলছে আপনি কি শুনছেন?

সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি

রেজওয়ান ভাই, আরো কিছু ছবি যোগ করলাম এই পোস্টে। আউশভিৎস-এ গিয়ে আমি মোটামুটি বোবা হয়ে গেলাম। কালকে সারাদিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এই নিয়ে হয়তো বড় পোস্ট দেওয়া হবে না। এমন জায়গাও আছে দুনিয়ায়... অবশ্যই যান যদি পারেন, এবং সারাদিন টাইম নিয়ে যান। ক্রাকোভ থেকে ৯০ মিনিট। ছবি তুলেছি অনেক, বিশেষ করে আউশভিৎসের annex বির্কেনাউ ডেথ ক্যাম্পে তুষারঝড়ে পড়ে গিয়েছিলাম। কয়েকটা ছবি দেবো সামনে।
-------------------------
হাজার বছর ব্লগর ব্লগর

হিমু এর ছবি
রেজওয়ান এর ছবি

আমার অবশ্য জাক্সেনহাউজেন (Sachsenhausen) কন্সেন্ট্রশন ক্যাম্প দেখা আছে। বার্লিনের অদুরে ওরানিয়েনবুর্গের এই ক্যাম্পটিকে বলা হয় সব ক্যাম্পের মডেল। এটিকে অনুকরন করেই অন্যগুলি করা হয়েছিল। এটি অবশ্যই এক বিভৎস রকমের অনূভুতি। সিনেমায় দেখা আর সচক্ষে দেখার মধ্যে অনেক তফাৎ। আউশভিতজে যাবারও ইচ্ছে আছে।

পৃথিবী কথা বলছে আপনি কি শুনছেন?

মুহম্মদ জুবায়ের এর ছবি

অসাধারণ লাগছে প্রতিটি পর্ব। দম বন্ধ করে বসে থাকছি পরের পর্বের অপেক্ষায়।

-----------------------------------------------
ছি ছি এত্তা জঞ্জাল!

সুমন চৌধুরী এর ছবি

গুল্লি হইতাছে। পড়তাছি....



ঋণম্ কৃত্বাহ ঘৃতম্ পীবেৎ যাবৎ জীবেৎ সুখম্ জীবেৎ

বিপ্লব রহমান এর ছবি

খুব সিনেমাটিক বর্ণনা। পরের পর্বের অপেক্ষায়--


আমাদের চিন্তাই আমাদের আগামী: গৌতম বুদ্ধ


একটা ঘাড় ভাঙা ঘোড়া, উঠে দাঁড়ালো
একটা পাখ ভাঙা পাখি, উড়াল দিলো...

কারুবাসনা এর ছবি

ভোট দিসি।

আরেকটু ইনফরম্যাল এক্সপেকটেড।


----------------------
বিড়ালে ইঁদুরে হলে মিল, মুদির কিন্তু মুশকিল ।


----------------------
বিড়ালে ইঁদুরে হলে মিল, মুদির কিন্তু মুশকিল ।

সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি

জেংকুইয়ে! (পোলিশ ধন্যবাদ)। কিন্তু আরেকটু ইনফর্মাল মানে কি রকম...?

আগের কমেন্টারদেরও ধন্যবাদ।
-------------------------
হাজার বছর ব্লগর ব্লগর

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।