ইচ্ছেঘুড়ি (পর্ব-৬)

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি
লিখেছেন সুলতানা সাদিয়া [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ০৯/০৫/২০১৭ - ৮:১৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ঘটনাটা অনির যতবার মনে পড়ছে ততবার মজা লাগছে। কাঁথার ওম উপভোগ করতে করতে অনি মাঝে মাঝে আজমাইনের চেহারাটা মনে করে হাসছে। অনির আজ আনন্দের সীমা নেই। আজমাইন আজ বেশ একটা শিক্ষা পেয়েছে। অবশ্য এটার পুরো কৃতিত্ব সেই মেয়েটার। তবে রুমন যদি আজ সেই মেয়েটার কাছে আজমাইনকে দিয়ে মাফ না চাওয়াতো তাহলে আজ নির্ঘাত বিষয়টা মা-বাবা অবধি গড়াতো। আজমাইনের সবকিছুতেই সবজান্তা ভাব। অথচ রুমন কত কি জানে, গাদি গাদি বই পড়ে ও। অথচ রুমনের ভেতর জাহির করা বিষয়টা নেই। রুমনের সাথে যখনই দেখা হয়, তখনই ওর হাতে কোনো না কোনো বই দেখা যায়। আজ রুমনের হাতে ছিল ‘সুকুমার রায়ের ছোটদের শ্রেষ্ঠ গল্প’। সেই বই নিয়েই প্রথম ঝামেলার শুরু। হাফিজ স্যারের বাসাটা চৌরাস্তার কাছে, সবুজ কানন স্কুলের উত্তর পাশে। প্রতিদিন যে যার সিট বুঝে বসে যখন হুল্লোড় শুরু করে তখন রুমন নিজের জন্য নিরিবিলি একটা জায়গা তৈরি করে ফেলে স্যার না আসা পর্যন্ত গল্পের বই খুলে বসে থাকে। আজ রুমনের হাতের বই দেখে আজমাইন ঠোঁটে চুকচুক আওয়াজ করেছে,
-ওরে রুমন, তুই এখনো এইসব পড়িস? যত্তসব ফাউল!
রুমন সহজে রাগ করে না। আজমাইনের কটাক্ষে রুমন শান্তভাবেই উত্তর দিয়েছিল।
-আমি সবই পড়িরে। শার্লক হোমস, সেবার ক্লাসিক থেকে সুকুমার, জাফর ইকবাল। এক এক বইয়ের একই স্বাদ।

কিন্তু আজমাইন স্যারের কাছে পড়ার সময় থেকে ফিরতি রাস্তাটুকুতে পুরোটা সময় আজমাইনের পিছনে লেগে রইল। বই নিয়ে ক্ষেপাতে ক্ষেপাতে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটা মেয়ের গায়ে আজমাইনের লাগলো ধাক্কা। মেয়েটা বকা দিতেই আজমাইন একটা বাজে ইঙ্গিত করে মেয়েটাকে চোখ মেরে দিলো। মেয়েটা তখন ঠিক তোড়া দিদির মতো তেড়ে এসে আজমাইনকে চড় লাগিয়ে দিলো। অনি, রুমন, ধীমান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মেয়েটা এক পর্যায়ে আজমাইনের হাত ধরে টানাটানি শুরু করেছিল। ওকে নাকি ওর বাবা-মার কাছে নিয়ে দিয়ে আসবে। মেয়েটাকে চেনে না ওরা কেউই। মনে হয় কলেজে পড়ে। কী দৃঢ় মুখটা! তোড়াদি রেগে গেলে ঠিক ওরকম লাগে। অনি ভয়ে কিছু বলতে পারছিল না। হঠাৎ রুমন বললো, আপু মাফ করে দেন। রুমন হাতে ধরে আজমাইনকে নিয়ে মেয়েটার কাছে মাফ চাওয়ালো। মেয়েটা যাবার আগে আজমাইনের গাল ছুঁয়ে বলে গেলো, তোর বোনকে দেখে রাখিস। আজমাইনের চেহারাটা দেখার মতো হয়েছিল। শুধু ও কেনো, ওরা সবাই ঘাবড়ে গিয়েছিল।

মেয়েদের ছেলেরা চোখ মেরেছে আর সেই দলে অনি ছিল শুনলে বাবা-মা নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেতো। বাবা অবশ্য অন্যরকম। শুনে নিজেই খানিক চোখ নাচিয়ে অনিকে ক্ষেপাতো। কিন্তু মা! মাতো খুব কষ্ট পেতো। মায়ের কষ্ট অনির সহ্য হয় না। কিন্তু মায়ের কষ্ট দেখতে পেলেও অনির আজকাল মাকে জড়িয়ে ধরে দুটো কথা বলতে কেমন বাঁধে। তাই অনি চেষ্টা করে মায়ের কষ্টের সময়য়টাতে পারতপক্ষে মায়ের কাছাকাছি না থাকতে আর মায়ের কষ্টের উৎস না হতে। তবু মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা ঘটে যাতে অনির হাত থাকে না। আজ যেমন ঘটল।
রোজ আজমাইন, ধীমান, সবুজ, রাজনদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে অনি। ওরা ফেরার সময় অযথাই দেরি করতে চায়। কিন্তু রাস্তায় ফালতু সময় নষ্ট করতে অনির ভাল লাগে না। বিশেষ করে আজমাইনকে একটু পাত্তা দিলেই অবস্থা খারাপ।

সেদিন তো ফেরার সময় গার্লস স্কুলের ছুটির অপেক্ষায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েই পড়লো। এক দল মেয়ে যাচ্ছে আর সেসময় আজমাইন শীষ দিয়ে উঠলো। মেয়েদের ভিড়ে শম্পাও ছিল। শম্পা অনিকে দেখে কী অবাক চোখে যে তাকাচ্ছিল। লজ্জায় অনি দ্বিতীয়বার ওর দিকে মাথা তুলে তাকাতে পারেনি। পরে আজমাইনকে দিব্যি দিয়েছে অনি, রাস্তায় যদি কোনোদিন মেয়েদের দেখে শীস দেয় তবে ওর সাথে জীবনের ছাড়াছাড়ি। আজমাইন হাসছিল আর বলছিল,
-আরে দোস্ত, তুই রেগে যাস ক্যান? যা কথা দিলাম তোর সামনে আর শীস দিমু না।
অনি রেগে গিয়েছিল,
-তার মানে আমি সাথে না থাকলে তুই এমন করবি?

আজমাইন একটা ফিঁচকে হাসি হাসছিল দেখে রাগে অনির গা জ্বলে যাচ্ছিল। আজমাইন বরাবরই এমন। তবু অনিরা কেউই ওর বন্ধুত্বের আকর্ষণ ছাড়তে পারে না।
বাড়ি ফিরে অনি চুপচাপ নিজের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়েছে। অনেকক্ষণ হলো মা ডেকেই চলছে। কিন্তু এখন কাঁথার নিচে ঢুকে যাবার পর এখন ওর পক্ষে বের হওয়া মুশকিল। উঠতে হবে। বড়দিকে বিশ্বাস নেই, মার চ্যালা একটা। হুটহাট রুমে ঢুকে অনির হাত ধরে টানাটানি শুরু করবে। নামেই শুধু বড়দি। বয়সে একটুও বড় হয়নি অনির বড়দি মানে তোড়া। মা আর বড়দির তাড়ার ভয়ে অনির ইচ্ছে করছে, ঘরের দরজা আটকে বসে থাকতে। কিন্তু মা যেদিন ওকে আলাদা ঘর দিয়েছেন সেদিন একটা শর্তও দিয়েছেন, অনি কলেজে না ওঠা পর্যন্ত ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করতে পারবে না। অনির একটু উসখুস লাগছে সেই মেয়েটা আবার বড়দির বান্ধবী নয়তো! অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওকে বিছানা ছাড়তে হয়। সন্ধ্যার সময় শোয়া মা পছন্দ করে না। সন্ধ্যাবাতি দেবার সময় বাড়ির সদস্যদের খুঁজে চলে মা।

অনি দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে প্রার্থনারত মায়ের মুখটিই যেনো ঠাকুরঘরের সুন্দরের মূল অনুষঙ্গ। মা অনিকে দেখে হাসেন। ধীর পায়ে মা কাছে আসতেই অনি মাথা নিচু করে। অনি লম্বায় মাকে ছাড়িয়ে গেছে। মা এবার শব্দ করে হেসে ফেলে,
-বাবাইটা বড় হয়ে গেলরে!

মা কাছে এসে দাঁড়াতেই অনির নাকে হাসনাহেনার গন্ধ লাগে। অনির খুব ভাল লাগে মিষ্টি গন্ধটা। ওদের বাড়ির মেইন গেটের পাশেই বিশাল হাসনাহেনা গাছ। বিকাল হতেই ফুলের ঝাঁক বিছানো গাছের চারপাশ সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যায়। কিন্তু অনি জানে এটা সেই ফুলের সুগন্ধি না। মা ঠাকুরঘর থেকে বের হতেই রোজ এই গন্ধটা পায় অনি আর ওর তক্ষুণি ইচ্ছে করে ছুটে যেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে প্রাণ ভরে গন্ধটা নেয়। কিন্তু কি একটা সংকোচ অনিকে আটকে দেয়। উহু অনি বড় হচ্ছে তো!

মা পূজার থালাটা ঠাকুরঘরে রেখে অনির জন্য নাস্তা আনতে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। সন্ধ্যায় পড়তে বসার আগে একটা কিছু ভারি নাস্তা খায় ওরা দুই ভাইবোন। মা দুটা বাটিতে দুধ সেমাই আর একটা থালায় গোটা কয়েক লুচি এনে বলে, দিদিকে ডেকে নে।

এখন মায়ের অনেক কাজ অনি জানে। তবু কেনো যেনো ওর ইচ্ছে করে মা অনির চুলগুলো আলতো করে নেড়ে দিক আর বলুক, বাবাই, সবটা খাবি কিন্তু! মা কিছু বলে না। উলটো রান্না ঘরের সারতে সারতে বলে,
-মোড়ের দোকান থেকে একটা আটার প্যাকেট এনে দিস তো বাবাই। আর শোন পরীক্ষার বেশি দেরি নেই, রাস্তায় ধীমানের দেখা পেলে চট করে আড্ডায় বসে যাসনে আবার!

মায়ের গলায় শাসনের বদলে প্রশ্রয়ের সুর শুনেও অনির ভেতরটা কেমন করে। মা কি বদলে গেছে নাকি অনি শাসনের মতো কাজ করে না জানে বলেই মার গলায় ভিন্নতা। বড়দি সেদিন বলছিল, আমাদের অনিমেষ চক্রবর্তী বাবার মাথা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, সেই সাথে কেমন বুঝদার আর ভাবুক হয়ে উঠেছে! অনিও টের পেয়েছে আজকাল যে কোনো কিছুই ওকে বড্ড ভাবায়।

আর তা ভাবতে ভাবতে অনির ছটফটানি বন্ধ হয়ে যায়। সবার মতো অনিও বোঝে যে ও বড় হচ্ছে। বড় হচ্ছে বলেই তো ছুটে যেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারছে না, মামণি তোমার শরীরের হাসনাহেনার গন্ধ আমি খুব ভালবাসি। মামণি তোমার হাতের আদরটুকুর জন্য আমার মনটা কেমন করে, তোমার বাপটুর তোমার হাতের কানমলা খেতে ইচ্ছে করে রোজ। মামণি এমন বড় হতে আমার ইচ্ছে করে না! আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতে অনির নাস্তা শেষ হয়ে যায়। বড়দিকে ডাকার কথা ওর মনে থাকে না। দরজার কাছে যেতেই মা পিছু ডাকে,
-দাঁড়া বাবাই, পুজোর ফুলটা কপালে ছুঁয়ে দেই, আরে আমি তো তোর নাগালই পাই না! কয়দিন পরে তো তুই আকাশ ফুঁড়ে বেরুবিরে!

মা হাসে, সে হাসিতেও ফুলের সুবাস। অনির কান্না পায়। কিন্তু এখন অনি জানে কি করে চোখের জল লুকোতে হয়। মা অনির কপালে ফুল ছুঁয়ে দেয়, ও ঠাকুর আমার বাবাইকে নিরাপদে রেখো। মা আর ফুলের ছোঁয়ায় অনির খানিক আগের অভিমান মিলিয়ে যায়।
(চলবে)


মন্তব্য

সোহেল ইমাম এর ছবি

অনেকদিন পর আবার আকাশে ইচ্ছেঘুড়ি উড়লো। ভালো লাগলো, কলম থামাবেননা চলুক।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

পাঠক  এর ছবি

গল্পের আগের পর্বগুলোতে অনি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এই পর্বে ওর ঘরে ফিরে আসার ব্যাপারটা কি বাদ পড়ে গেল? ঠিক বুঝতে পারছি না!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA