গণতন্ত্রের ইতিবৃত্ত - ২

স্বাধীন এর ছবি
লিখেছেন স্বাধীন (তারিখ: বুধ, ২৩/০৬/২০১০ - ৪:২৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আগের পর্ব

গণতন্ত্রের সমালোচনাঃ

এই পর্বে থাকছে নৈরাজ্যবাদ* (Anarchism) ও অভিভাবকতন্ত্র (Guardianship) এই দু’য়ের পক্ষ হতে গণতন্ত্রের সমালোচনা এবং সেগুলোকে খন্ডন করে লেখকের দেওয়া যুক্তি। এই দু’টি মতবাদ থেকে গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী সমালোচনাগুলো এসেছে।

নৈরাজ্যবাদীদের পক্ষ থেকেঃ

নৈরাজ্যবাদীদের চিন্তার মূলে হচ্ছে - যেহেতু রাষ্ট্র মাত্রেই বলপ্রয়োগকারী এবং যেকোন ধরনেরর বলপ্রয়োগ যেহেতু কাম্য নহে তাই রাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করা উচিত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দিয়ে। রাষ্ট্রবিহীন সমাজ হচ্ছে সহজ দৃষ্টিতে নৈরাজ্যবাদীদের মূলমন্ত্র। নৈরাজ্যবাদীদের মাঝেও আবার নানান ভাগ রয়েছে। যেমন অনেকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রহীন অবস্থায় না গিয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ের রাষ্ট্রের কথা বলে, যেখানে রাষ্ট্রের কাজ হবে খুবই সীমাবদ্ধ। যেহেতু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও বল প্রয়োগ থাকবে তাই নৈরাজ্যবাদীদের মতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও কাম্য নয়। নৈরাজ্যবাদীদের আপত্তি মুলত বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা থেকে। যেহেতু গণতন্ত্র মানে হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন তাই গণতন্ত্রের আরেক মানে হচ্ছে সংখ্যালঘুর উপর সংখ্যাগুরুর বলপ্রয়োগ। বলপ্রয়োগ সরাসরি না হলেও আইন এবং শাসন যন্ত্রে সংখ্যাগুরুর মতামতের মাধ্যমে সেটা হয়ে থাকবে।

লেখক এখানে নৈরাজ্যবাদীদের যুক্তির জবাব দিয়েছেন এভাবে যে বল প্রয়োগ কোথায় থাকবে না? এমনকি যে রাষ্ট্রবিহীন সমাজ সেখানেও কি বল প্রয়োগ থাকবে না? ধরুন কোন রাষ্ট্র নেই, কিন্তু সমাজের কিছু লোক অন্যের ক্রমাগত ক্ষতি করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান সেই সব লোককে জোরপূর্বক আইনের ভীতি দেখানো অথবা জেলে দেওয়া। তার মানে এই দাঁড়ায় যে একদম রাষ্ট্রবিহীন সমাজেও বল প্রয়োগ থাকবে। এখন যদি বল প্রয়োগ অবধারিতই হয় তবে সেটা সংখ্যালঘুর শাসন না হয়ে সংখ্যাগুরুর শাসন হলেই বল প্রয়োগ সর্বনিম্ন হবে এবং তাই শাসন হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হওয়াই যুক্তিযুক্ত। যদিও নৈরাজ্যবাদীদের বলপ্রয়োগের যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য নয় তারপরেও গণতন্ত্রের ফলে যে সংখ্যালঘুদের উপর বল প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়ে যায় সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যেন সংখ্যালঘুদের অধিকারও নিশ্চিত থাকে। পরবর্তীতে আমরা এটাই দেখবো যে প্রতিনিধিমূলক পদ্ধতি এবং সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থার দ্বারা সংখ্যালঘুদের উপর বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাকে অনেকাংশে কমিয়ে দেওয়া হয়।

অভিভাবকতন্ত্রের পক্ষ থেকেঃ

গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি আসে অভিভাবকতন্ত্রের দিক হতে যে সাধারণ মানুষ নিজেরা নিজেদেরকে শাসনের জন্য পুরোপুরি যোগ্য নয় । এই দাবীর সর্বপ্রথম যে রূপকার তিনি হলে প্লেটো। তিনি তার “রিপাব্লিক” গ্রন্থে বলেছিলেন দার্শনিক রাজার কথা। পরবর্তীতে এরিষ্টটল থেকে শুরু করে বহুজনই ঘুরেফিরে এর কাছাকাছি বক্তব্য প্রদান করেন। সেই দিক দিয়ে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে অভিভাবকতন্ত্র। এর মূল কথা হল যে শাসন যন্ত্র এমন একটি জটিল যন্ত্র যেটা পরিচালনার জন্য যোগ্য মানুষের প্রয়োজন। কেউ বলেন একমাত্র দার্শনিকদেরই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের শাসক, কারো মতে প্রতিভাবানদের, কেউ বলেন প্রকৌশলীবিদ, চিকিৎসাবিদ বা পেশাজীবিদের, কেউ বা বলেন মনোবিজ্ঞানীদের। আসল বক্তব্য হল যে সাধারণ মানুষেরা নিজেদের চিন্তা নিয়েই ব্যস্ত থাকে সব সময়। যে কারণে তারা কখনোই সার্বিক বা সকলের ভালোর জন্যে কাজ করবে না। অন্য কথায় গণতন্ত্রের দ্বারা সঠিক পথে রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালিত হবে না। তাই শাসন যন্ত্র পরিচালনার ভার থাকা উচিৎ যোগ্য অভিভাবকদের হাতে। বহুজনের (Democracy) শাসন নাকি কতিপয় যোগ্যজনের শাসন এই বিতর্ক বহু পুরনো বিতর্ক। আসুন দেখি লেখক কী বলেন এই বিষয়ে।

লেখক এখানেও তাঁর যুক্তি তুলে ধরেছেন, উদাহরণ দিয়েছেন, কেন গণতন্ত্র অভিভাবকতন্ত্র হতে উত্তম সব সময়। মূল যুক্তিটি হল যে যোগ্য ব্যক্তিরা অবশ্যই সাধারণ মানুষের তুলনায় উন্নত (বা অধিকতর) জ্ঞান রাখেন কিন্তু কখনই উন্নতর নৈতিকতা ধারণ করেন না। এখন পরবর্তীতে লেখক দেখাচ্ছেন যে শাসন যন্ত্রের ক্ষেত্রে উন্নত জ্ঞানের যেমন প্রয়োজন আছে তেমনি রয়েছে উন্নত নৈতিকতারও প্রয়োজন। এবং একমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই এই উন্নত নৈতিকতার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব। কিভাবে, একটি ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

ধরুনঃ আমেরিকার পারমাণবিক বোমার ব্যবহার সম্পর্কে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। এখন অবশ্যই পারমাণবিক বোমার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিষদ জ্ঞান একজন সাধারন মানুষের তুলনায় একজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী বেশি রাখবেন। কিন্তু যখনই প্রশ্ন আসবে বোমার ব্যবহার সম্পর্কে, কোন কোন অবস্থায় বোমা ব্যবহার করা হবে অথবা কোন কোন স্থানে বোমাটি ব্যবহার করা হবে, কিংবা আদৌ মানুষের উপর ব্যবহার করা হবে কি না, এই ধরণের সিদ্ধান্তগুলো যখন আসবে সেগুলো কোন কারিগরী বিষয় নয়, সম্পূর্ণ নীতিগত বিষয়। এবং এই ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মানুষের সাথে একজন দার্শনিক, কিংবা প্রতিভাবান কিংবা ট্যাকনোক্র্যাটদের তেমন কোন পার্থক্য নেই। তাই লেখকের প্রথম যুক্তি হচ্ছে যেহেতু নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সকল মানুষের নৈতিকতা কাছাকাছি, কারোরটা খুব বেশি উন্নত নয়, তাই তাঁদের (অভিভাবকদের অথবা যোগ্যদের) এমন কোন অধিকার নেই যে জনগণের পক্ষ হয়ে তারা তাঁদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন জনগণের উপর, যদি না তাঁরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়। অর্থাৎ একমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই নীতিগত সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব, কতিপয় যোগ্য লোকের দ্বারা নয়।

এবার দ্বিতীয় যুক্তিটি হল, অভিভাবকতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে। যোগ্য লোকের শাসন, যদি সেটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির আওতায় না থাকে, তার প্রধান সমস্যা হচ্ছে যদি কোন কারণে সাধারণ মানুষের সাথে অভিভাবকদের মতের মিল না হয় তখন তাঁরা বল প্রয়োগের মাধ্যমে সেটাকে সাধারণের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। অভিভাবকগণ সেক্ষেত্রে জনগণের অনুভূতিকে বুঝতে সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হন এবং তখন সেটা সংঘাতের সৃষ্টি করে। কিন্তু যদি অভিভাবকগণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হতেন তবে এই সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতো। কারণ হয় অভিভাবকগণ জনগণের অনুভূতিকে মূল্যায়ন করতো অথবা জনগণ তাঁদেরকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অপসারণ করতো। উদাহরণ হিসেবে আমরা ইতিহাসের দিকে যদি দেখি, লেনিনের ভ্যানগার্ড কিংবা চার্চের শাসন কিংবা মুসলিম খলিফাদের শাসন এক প্রকার অভিভাবকতন্ত্রই ছিল, কিন্তু তাতে সাধারণ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে সামান্যই। পরিশেষে, এই আলোচনা থেকে এটি আমরা পাই যে, হ্যাঁ যদি জনগণ শাসন যন্ত্রের যোগ্য না হয়ে থাকে তবে যোগ্য লোকদেরই শাসনে আসা উচিত, কিন্তু তাদেরকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে, অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নয়।

আগামী পর্বে থাকছে গণতন্ত্রের কিছু তত্ত্বীয় বিষয়াবলী।

* Anarchism এর বাংলা অনুবাদ সবখানেই লেখা হয় নৈরাজ্যবাদ, তাই আমিও এটাই ব্যবহার করছি, যদিও আমার কাছে এই অনুবাদটি যথার্থ মনে হয় না। আমার মতে এর যথার্থ হতে পারে রাষ্ট্রহীনতাবাদ বা রাষ্ট্রহীনতন্ত্র, এই জাতীয় কিছু। কারণ Anarchy এর মানে আসলে হচ্ছে শাসকবিহীন (no ruler or absence of government)। নৈরাজ্য কেমন যেন নেগেটিভ অর্থ বহন করে।


মন্তব্য

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

এবারের পর্বের বিষয়বস্তু আমার অত্যন্ত আগ্রহের। এবিষয়টা নিয়ে আলাপে যে ব্যাপারটা অবধারিতভাবে উঠে আসে - তা হলো নৈরাজ্যবাদ বা রাষ্ট্রহীনতাবাদ। গণতন্ত্র সম্পর্কে আমার আপত্তিগুলো অনেকটাই এই মতবাদের সাথে মেলে।

লেখকের অভিভাবকতন্ত্রের যুক্তি খণ্ডনে ফ্যালাসি আছে বলে আমার মনে হচ্ছে। অার এ সংক্রান্ত দর্শনের মূলে লেখক যান নি। কনভেনশনাল ধ্যান-ধারণার আসে পাশে তিনি বিচরণ করেছেন।

অভিভাবকতন্ত্রের যুক্তিখণ্ডনে তিনি শুরু করেছেন উন্নত নৈতিকতা নিয়ে, কিন্তু শেষ করেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠের মত-প্রাধান্যে। ব্যাপারটা দেখে মনে হচ্ছে, তিনি দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করেন নি। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের মত আর উন্নত নৈতিকতাকে অবশ্যই সবাই এক করে দেখেন না। ফলে, উন্নত নৈতিকতার কথা দিয়ে শুরু করেও তিনি একরকম উন্নত নৈতিকতার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। আর এই যুক্তিখণ্ডনে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের গুরুত্ব, সেটা বজায় রাখতে অভিভাবকতন্ত্রের ব্যর্থতার কথা ও গণতন্ত্রের সাফল্যের উদাহরণের কথা তোলাটা একধরনের সার্কুলার লজিক বলে মনে হল। কেননা, গণতন্ত্রের মূল মন্ত্রই হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত-প্রাধান্য। আর অভিভাবকতন্ত্রের মূলমন্ত্র হলো যোগ্যলোকের শাসন। ফলে এটাই স্বাভাবিক যে যোগ্য-শাসনের বিচারে তুলনামূলকভাবে অভিভাবকতন্ত্র সফল হবে আর সংখ্যাগরিষ্ঠের মত-প্রাধান্যে গণতন্ত্র। কিন্তু যে বিষয়ে এটা তিনি তুলেছিলেন, "একমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই এই উন্নত নৈতিকতার বিষয়টি নিশ্চয়তা করা সম্ভব", এটাকে সেটার স্বপক্ষের যুক্তি বলে মনে হলো না। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত প্রাধান্য পায় বটে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই যে "উন্নত নৈতিকতা" সেটা তিনি দেখাতে পারলেন না, একরকম এড়িয়ে গেলেন। ফলে যেটা হলো, ওনার বক্তব্যে এটা একরকম অনুমিত রয়ে গেল। যে অনুমানটা অবশ্যই সত্য নয়। ফলে, গণতন্ত্রে যে "এই উন্নত নৈতিকতার বিষয়টি নিশ্চয়তা করা সম্ভব" সেটার স্বপক্ষে সত্যিকার অর্থে কোনো যুক্তি পাওয়া গেল না।

বরং অভিভাবকতন্ত্রের পক্ষে একটা যুক্তি পাওয়া যাচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অনেক ভুল, অনৈতিক মতকে অভিভাবকতন্ত্রে এড়ানো সম্ভব। আর নৈতিকতার বিষয়েও এক্সপার্ট বা যোগ্যলোক থাকার কথা। তাদের মতের চেয়ে সাধারণ জনগণের নৈতিকতা বোধ উন্নত কিনা, সেটা আলোচনা লেখক করেন নি।

তবে, এই যে নৈতিকতার মত আপেক্ষিক বিষয়ে যুক্তি অস্পষ্ট হয়ে গেল, এটা ইঙ্গিত করে বিষয়টি নিয়ে আরো গভীর দার্শনিক আলোচনার প্রতি। যে বিষয়কে লেখাটি এড়িয়ে গেছে, সেটা হলো সরকারের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। বলা হচ্ছে common good বা সার্বিক ভালোর কথা। তুলনা করা হচ্ছে বিভিন্ন তন্ত্রের মধ্যে। কিন্তু সংজ্ঞায়িত করা হয় নি সার্বিক ভালো কি। সংজ্ঞায়িত করা হয় নি সরকারের লক্ষ্য কোনটা। সামাজিক বিজ্ঞানে সেটা সচরাচর দেখা যায় কিনা সেটা নিয়েও অামার সন্দেহ অাছে। ফলে এর জন্যে লেখককে অনেক বেশি দোষ দেয়া যায় না। কিন্তু সেটা করাটাই যুক্তিসঙ্গত।

কেননা, আমরা তন্ত্রের তুলনা করছি, এবং একটা অবজেক্টিভ তুলনা তখনই করা সম্ভব যখন সেটা একটা নির্দিষ্ট পরিমাপের (measure) সাপেক্ষে করা হবে। তা না হলে, অভিভাবকতন্ত্রের পক্ষে যিনি যুক্তি দেবেন, তিনি সরকারের লক্ষ্যকে এমন অনুমান করে নেবেন যেন অভিভাবকতন্ত্রকে একটা উন্নত সরকার মনে হয়, আবার গণতন্ত্রবাদীরাও তাদের যুক্তিতে সার্বিক ভালোর সংজ্ঞাকে নিজেদের মত পরিবর্তন করে নেবেন। সেটাই দেখা গেছে লেখকের অভিভাবকতন্ত্রের যুক্তিখণ্ডনে। ফলে বস্তুনিষ্ঠ (objective) তুলনার জন্য লক্ষ্য, সার্বিক ভালো, এই বিষয়গুলোর নির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা জরুরি। এগুলোর নির্দিষ্ট সংজ্ঞা না দিয়ে বিভিন্ন তন্ত্রের তুলনা করতে গেলে কেবল বলা যায় X-তন্ত্র A বিষয়ে ভালো আর Yতন্ত্র B বিষয়ে। বলা যায় না X-তন্ত্রই সবচেয়ে উপযোগী সরকার ব্যবস্থা এবং Y, Z তন্ত্রের চেয়ে সার্বিকভাবে ভালো।

অবশ্য শ্রেষ্ঠ তন্ত্রকে নির্ণয় করা যদি আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য না হয়, সেক্ষেত্রে এটা সমস্যা নয়। তারপরেও, সার্বিক ভালোর সংজ্ঞা নিয়ে কাজ করা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব‍্যাপার হবার কথা। এটা একটা গণনাগত দৃষ্টিভঙ্গি। একটা সর্বজন স্বীকৃত সার্বিক ভালোর সংজ্ঞায় উপনীত হওয়া গেলে, সেটার সাপেক্ষে বিভিন্ন তন্ত্রের তখন পরিমানগত (quantitative) তুলনা সম্ভব। কোন তন্ত্র "সার্বিক ভালো" এই অবজেক্টিভ ফাংশনকে অপটিমাইজ করে, সেটা বের করা সম্ভব। এবং হতেই পারে যে সেটা একটা হাইব্রিড ব্যবস্থা হবে।

লেখক অবজেক্টিভ ফাংশনকে অপটিমাইজ করার ব্যাপারটাকে কিছুটা ব্যবহার করেছেন এই লাইনে -

যদি বল প্রয়োগ অবধারিতই হয় তবে সেটা সংখ্যালঘুর শাসন না হয়ে সংখ্যাগুরুর শাসন হলেই বল প্রয়োগ সর্বনিম্ন হবে

অর্থাৎ লেখক দাবী করছেন "বল প্রয়োগ করার ঘটনা" এই অবজেক্টিভ ফাংশনকে মিনিমাইজ করে গণতন্ত্র। তবে, তিনি এটা ব্যাখ্যা করেন নি, নৈরাজ্যবাদের যে দৃষ্টিভঙ্গিটি সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি সীমাবদ্ধ রাষ্ট্রের কথা বলে, সেই ব্যবস্থা কার্যকর না অকার্যকর। লেখক উল্লেখ করেছেন কোনো সরকার না থাকলে শক্তিমানের সুযোগ থাকে দুর্বলের উপর বল-প্রয়োগের, যেটাকে কমিয়ে আনা যায় আইন-শৃঙ্খলা প্রয়োগ করে। তবে, আইন-শৃঙ্খলা প্রয়োগ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের উপর আবার সার্বিকভাবে বল-প্রয়োগ করতে হয়। এখানে ভারসাম্য আনতে গেলে একটা সর্বনিম্ন পর্যায়ের সীমাবদ্ধ রাষ্ট্রের কথাই আমার মনে পড়ে। তবে, quantitatively বের করা গেলে অবশ্যই উত্তম হত।

আমার মতে, সার্বিক ভালোর সর্বজন-স্বীকৃত সংজ্ঞা তৈরী অসম্ভব। এটা একটা চির-অমীমাংসিত বিষয়। ফলে আমি নিজে পছন্দ করি সরকারের লক্ষ্যকে পরোক্ষভাবে নির্ধারণ করতে। অর্থাৎ কি কি সরকারের করা উচিত, সেটা বের করার চেয়ে আমি জোর দেই কি কি সরকার কখনো করতে পারে না। সেগুলোকে "সরকারের লক্ষ্য" নামক অবজেক্টিভ ফাংশনে বসাতে চাই। যেমন, নাগরিকের স্বাধীনতা লংঘন, এটা সরকার কোনো অবস্থাতেই করতে পারে না। এটা আমার তালিকায় থাকে সবার উপরে। এবং, বিষয়টা আরো গভীর দর্শনের দিকে তখন ইঙ্গিত করে। স্বাধীনতার সংজ্ঞায়ন। এটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সময় পেলে এটা নিয়ে কিছু কাজ করি। গোছাতে পারলে এটা নিয়ে একটা লেখা দেবার ইচ্ছা আছে।

লেখাটি এই দার্শনিক আলোচনার সূত্রপাত করলো, এটা একটা খুব ভালো দিক। আপনার সাথে এই আলোচনা বার বার হবে বলেই আমার মনে হয় হাসি । নৈরাজ্যবাদ নিয়ে কিছু আলোচনা থাকলে আরো ভালো হতো। সামনের তত্ত্বালোচনা পর্বের প্রতি আগ্রহ থাকলো।

সিরাত এর ছবি

এ্যানার্কিজম না বলে লিবারটারিয়ানিজম বলা যায়। আমার রান্ড বনাম থোরুর এ্যাপ্রোচ নিয়ে একটা লেখা দেয়ার ইচ্ছা আছে। একটু ভয়, একটু প্রস্তুতি আর জ্ঞানের অভাব, এসব ফালতু চলকের কারণে দেয়া হচ্ছে না। দিয়ে দিবো সামনে।

স্বাধীন এর ছবি

দিয়ে দাও। এক পর্যায়ে যেয়ে কিন্তু সকল মতবাদ প্রায় কাছাকাছি হয়ে যায়। মিনিমাম রাষ্ট্র বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রায় কাছাকাছি কথাই কি বলে না?

সিরাত এর ছবি

বলে, তবে পার্থক্য হল:

১। কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলে (benign বনাম রান্ডের মারমুখো)। চোখ টিপি
২। 'প্রতিপক্ষকে' কতটা গাল দেয়। চোখ টিপি

আসলে আর সব কিছুর মতই এটাও না ব্যক্তির ব্যাপার। একটা মৌলিকভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জিনিসকে সমষ্টিক করতে গেলে গোলমাল তো হবেই, আর তাতেই যত তর্ক।

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

একটা মৌলিকভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জিনিসকে সমষ্টিক করতে গেলে গোলমাল তো হবেই, আর তাতেই যত তর্ক

অত্যন্ত ম‍্যাচু‍্যর্ড একটা সত‍্যকথা বললেন।

স্বাধীন এর ছবি

ধন্যবাদ সুবিশাল মন্তব্যের জন্য। নৈরাজ্যবাদ নিয়ে আগ্রহ তোমার আছে সেটা জানি, আমারো আগ্রহ আছে এই বিষয়ে জানার। সময় করে লিখে ফেলো।

তুমি ঠিকই ধরেছো, লেখক মোটামুটি একটি লজিকের উপর ভিক্তি করেই এগিয়েছে সেটা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত বলপ্রয়োগকে মিনিমাইজ করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নৈতিকতাকে একত্র করে নৈতিকতাকে ম্যাক্সিমাইজ করে। যেহেতু গণতন্ত্রের মূলে রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত এবং অভিভাবকতন্ত্রের মূলে রয়েছে সংখ্যালঘুর মতামত তাই লেখক গণতন্ত্রকেই উত্তম ধরেছেন। তবে লেখক কিন্তু এক সাথে অভিভাবকতন্ত্রকে বাদ দিয়ে দেননি, যেটা পরবর্তীতে লেখায় আবারো আসবে। লেখক যেটা বলেছেন তা হল অভিভাবকদের হাতে পুরো ক্ষমতা না দিয়ে, ক্ষমতাকে জনগণের হাতেই রাখতে (গণতন্ত্র) এবং অভিভাবকদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাঝেই রাখতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই জিনিসটিকে সমর্থন করি।

এখানে আমি একটি বিষয় লিখিনি সময়ের অভাবে, এখন মনে হচ্ছে কিছুটা তুলে ধরি। লেখক শুরুতে গণতন্ত্রের কিছু বেসিক তুলেছিলেন। তার মধ্যে একটি হল গণের মাঝে একধরণের হোমোজিনিটি (Homogeneity ) থাকা উচিত। যদি গণের সকল সদস্য হোমজিনিয়াস হয় বুদ্ধিগত ভাবে, অর্থনৈতিকগত ভাবে, সামাজিকভাবে, রাজনৈতিক ভাবে তবেই জনগণের পক্ষে সার্বিক ভালোর জন্য কাজ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে যেহেতু তা নয়, তাই বর্তমান গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সার্বিক ভালোর লক্ষ্যে কাজ করতে সক্ষম হয় না, এটা লেখক স্বীকার করেছেন। এ সীমাবদ্ধতা কীভাবে দূর করা যায় সে বিষয়েও আলোচনা করেছেন। এই বিষয়গুলো পরবর্তী লেখায় আসবে।

আবারো ধন্যবাদ জানাই মন্তব্যের জন্য।

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

আপনার জবাব মোক্ষম! সতি‍্যই হোমোজিনিটি ছাড়া সার্বিক ভালোকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। গণতন্ত্র আর অভিভাবকতন্ত্রের হাইব্রিড বেশ শক্ত ক‍্যান্ডিডেট, মানতে হবে।

সিরাত এর ছবি

আলোচনা জোস লাগলো!

সচল জাহিদ এর ছবি

পড়ছি। ফেইসবুকে শেয়ার দিলাম।

----------------------------------------------------------------------------
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।


এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
বিশ্ব পানি দিবসব্যক্তিগত ব্লগ। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।

স্বাধীন এর ছবি

ধন্যবাদ পড়ার জন্য এবং শেয়ার করার জন্য। তবে যেভাবে লিখেছো অবশ্য পাঠ্য তাতে ভয় পাইছি মন খারাপ

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

চলুক
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।