সেই নীল মেয়েটি

ইয়ামেন এর ছবি
লিখেছেন ইয়ামেন [অতিথি] (তারিখ: শুক্র, ১১/১০/২০১৯ - ১২:৪৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

২৯ বছর বয়স্ক ইরানী যুবতী সাহার খোদায়ারী। দারুন রকমের ফুটবল পাগল। ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দল এস্তেঘালের বিশাল ভক্ত। এত বড় ভক্ত যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ছদ্মনাম হলো 'ব্লু গার্ল' (নীল হলো এস্তেঘালের জার্সির রঙ)।

সাহারের স্বপ্ন ছিল তেহরানের আজাদী জাতীয় স্টেডিয়ামের তার প্রাণপ্রিয় দলের একটা হলেও খেলা দেখবে। সমস্যা হলো ইরানের ক্ষমতাসীন পুরুষতান্ত্রিক কাঠমোল্লারা ১৯৭৯ সালের শাহ-বিরোধী আন্দোলনের পর থেকে মেয়েদের জন্য স্টেডিয়ামে গিয়ে ফুটবল দেখা নিষিদ্ধ করে রেখেছে। কয়েক দশক ধরে এই লিঙ্গবাদী বৈষম্যর উপর আলোকপাত করেও কাঠমোল্লাদের মন টলাতে পারেনি ইরানের নারীবাদী এক্টিভিস্টরা। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার কাছেও এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে বেশ কয়েকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা বরাবর নিষ্ক্রিয় থেকেছে।

সাহার খোদায়ারী, 'ব্লু গার্ল' (সূত্রঃ টুইটার)

কিন্তু সাহার এইবার বদ্ধপরিকর। খেলা সে দেখবেই। মার্চ মাসে এস্তেঘালের এক আমিরাতি দলের সাথে খেলা ছিল আজাদী স্টেডিয়ামে। পুরুষের ছদ্মবেশে সাহার খেলা দেখতে ঢুকার চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে ধরা পড়ে যায় সে। পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হলে তিনদিন জেল খেতে তারপর মুক্তি পায়, তবে আদালতে গিয়ে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। ছয় মাস পরে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বিচারের দিন ধার্য করা হয়। বিচারের দিন আদালতে গিয়ে সাহার শুনতে পায় যে তাকে ছয় মাসের জেল খাটার সাজা দেয়া হবে। পরিবারের ভাষ্যমতে মেয়েটি আগে থেকেই বিষণ্ণতায় ভুগতো। শুধুমাত্র নিজের প্রিয় দলের খেলা দেখতে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করার অপরাধে এমন গুরু দণ্ড সইতে হবে শুনে পুরোপুরিই ভেঙ্গে পড়ে সে। আদালতের প্রাঙ্গনেই নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থেকে অবশেষে সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সাহার

সাহারের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়ানো শুরু করলে শুধু ইরান নয়, পৃথিবীজুড়ে মানুষ ক্রোধে ফেটে পড়ে। 'ব্লুগার্ল' হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ইরানের কাঠমোল্লাদের সমালোচনায় মুখর হয়ে যায় সামাজিক গণমাধ্যম, বিশেষ করে টুইটার। এমনকি ইরানের জাতীয় পুরুষ দলের খেলোয়াড়রাও এতে অংশ নেয়া শুরু করে। সাবেক অধিনায়ক আন্দ্রানিক তেইম্যুরিয়ান আশা ব্যক্ত করেন যে অদূর ভবিষ্যতে ইরানের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়ামের নাম 'সাহার' রাখা হবে। এই বিক্ষোভ এতোটা বেগ পায় যে ফিফা, যারা কিনা এতদিন ধরে এই ইস্যুতে হস্তক্ষেপ না করার জন্য এক্টিভিস্টদের তোপের মুখে ছিল, তারাও নড়েচড়ে উঠে। এবার তারাও ঘোষণা দেয় যে ভবিষ্যতে ইরানে অনুষ্ঠিতব্য সব ফুটবল ম্যাচে মেয়েদের দেখতে যাওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে

এই বিষয়ে ইরানী সরকার প্রথমে যথারীতি কর্ণপাত করতে অপারগ হলেও শেষ পর্যন্ত প্রবল চাপের মুখে পিছপা হতে বাধ্য হয়। ঘোষণা দেয়া হয় যে অক্টোবরের ১০ তারিখে ইরানের সাথে ক্যাম্বোডিয়ার ম্যাচে অবশেষে মেয়েদের আজাদী স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে দেয়া হবে। যদিও ৭৮,০০০ এর স্টেডিয়ামে মাত্র ৩,৫০০ টিকেট মেয়েদের জন্য বরাদ্দ করা হয়, তাও আবার পুরুষদের থেকে আলাদা শুধু মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত এক অংশে। তারপরেও, ইরানের মত মৌলবাদী রক্ষণশীল দেশে এ নারী স্বাধীনতার জন্য বিশাল এক জয় বৈকি!

আজ অক্টোবরের ১০ তারিখ। কয়েক ঘন্টা আগে আজাদী স্টেডিয়ামে ইরান ক্যাম্বোডিয়ার খেলা শেষ হলো। ১৪-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে ইরান। স্টেডিয়াম ছিল লোকে লোকারণ্য। তবে একটি ছোট সংরক্ষিত কোনে মানুষ ছিল কম, কিন্তু উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না।

সেখানে সাহার ছিল না।

সেখানে কয়েক হাজার হাস্যোজ্জল উৎসবমুখর নীল মেয়ে ছিল।

আসছে দিনগুলোতে এই নীল মেয়েরা দ্বিগুণ থেকে দ্বিগুণত্বর হোক।

আজাদী স্টেডিয়ামে ইরান ক্যাম্বোডিয়া ম্যাচ দেখছে ইরানী মেয়েরা (সূত্রঃ গেটি ইমেজেস)


মন্তব্য

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।