ইর্মগার্ড ফুর্খনারঃ গণহত্যার সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার দায়

ইয়ামেন এর ছবি
লিখেছেন ইয়ামেন [অতিথি] (তারিখ: বুধ, ২১/১২/২০২২ - ৫:৩৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ইর্মগার্ড ফুর্খনার নামক জার্মানকে দেখে আর দশজন সাধারণ বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গ নারীর থেকে আলাদা কিছু মনে হয় না। কিন্তু ফুর্খনার সাধারণ নন। আজ ৯৭ বছর বয়স্ক ফুর্খনারকে উত্তর জার্মানির এক আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৪৩-১৯৪৫ সালের মাঝে ফুর্খনার ষ্টুটহফ নামক নাৎসি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে টাইপিস্ট হিসেবে কাজ করতেন ক্যাম্প কম্যান্ডার পাউল ভেয়ার্নার-হপের অধীনে। আর সব নাৎসি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতই ষ্টুটহফেও ইহুদি কয়েদীদের উপর গণহত্যা চালানো হয়েছিল। মামলার শুনানিতে উঠে আসে শুধুমাত্র ১৯৪৪ সালের জুন থেকে অক্টোবরের মাঝেই প্রায় ৪৮,০০০ হাজার ইহুদিদের এই ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়, গ্যাস চেম্বার ব্যবহার করে ইহুদি নিধন তরান্বিত করার প্ল্যানের অংশ হিসেবে। ক্যাম্প কম্যান্ডার ভেয়ার্নার-হপের অফিসের টাইপিস্ট হিসেবে এইসব কয়েদীদের নথিপত্র এবং অন্যান্য রসদ সামলানোর দায়িত্বে ভূমিকা রাখতেন ফুর্খনার।

শুনানিতে আরো উঠে আসে ফুর্খনারের অফিসে ছিল বিশাল এক জানালা, যা দিয়ে ষ্টুটহফ ক্যাম্পে কয়েদীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন, অত্যাচার, সবই দেখা যেতো। ক্যাম্পে যে ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে গণহারে খুন করা হচ্ছে, সে বিষয়েও তিনি স্বাভাবিকভাবেই ওয়াকিবহাল ছিলেন। তারপরেও ষ্টুটহফ ক্যাম্পের পতন পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এবং মূলত এজন্যই মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার দায়ে ফুর্খনারকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এই মামলা এবং রায়ে আগ্রোহদ্দীপক জিনিস আছে কয়েকটি।

প্রথমত, নাৎসি হলোকস্ট-জনিত মামলায় কোন নারীকে বিচারে আনার বিষয়টা বেশ বিরল। ফুর্খনার হলেন বিগত কয়েক দশকে প্রথম নারী নাৎসি যার হলোকস্ট আইনের আওতায় বিচার করা হলো। দ্বিতীয়ত, ফুর্খনারের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে ইহুদি গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ নাই, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গণহত্যায় সহযোগিতা করার। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে সর্বমোট প্রায় দশ হাজারের উপর কয়েদী হত্যায় পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেন ফুর্খনার। রায় ঘোষণার সময় প্রধান বিচারক ডমিনিক গ্রস বলেন, 'ঘটনাস্থলের এত সন্নিকটে থেকেও গ্যাস চেম্বারের ধোয়া বা মানুষ পোড়ার গন্ধ ফুর্খনার পান নাই, এটা অকল্পনীয়। তিনি যে কোন সময় চাকরিতে ইস্তফা দিতে পারতেন, কিন্তু দেন নাই।' মামলার অন্যতম সাক্ষী জোসেফ সলোমনভিচ ছয় বছর বয়সে এই ক্যাম্পে পরিবারের সাথে বন্দী ছিলেন, নিজে বেঁচে গেলেও ১৯৪৪ সালের জুন মাসে বাবাকে হারান নাৎসিদের লিথ্যাল ইঞ্জেকশনে। তিনি সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেন, 'ফুর্খনার অবশ্যই দোষী, শুধু অফিসে বসে আমার বাবার মৃত্যুর সার্টিফিকেটে সীল মেরে প্রত্যয়িত করার দায়িত্বে থাকলেও।'

গণহত্যার সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত থাকলেও বিচারের আওতায় এনে অন্তত প্রতীকী শাস্তি (৯৭ বছর বয়স্ক ফুর্খনারের আসলেই দুই বছর হাজতবাস করার সম্ভাবনা ক্ষীণ) দেয়ার ব্যাবস্থা করার প্রচলনটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। আজ যে কারণে ফুর্খনারের বিচার হলো, এটার নেপথ্যের কাহিনী জানতে হলে আমাদের যেতে হবে ২০১১ সালে। সে বছর নাৎসি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্প গার্ড জোসেফ ডেমিয়ানিয়ুককে বিচারে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়
ডেমিয়ানিয়ুকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ছিল না। কিন্তু প্রসিকিউশনের যুক্তি ছিল যে শুধু প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষভাবে গণহত্যার সাথে জড়িত থাকলেও দায় এড়ানো সম্ভব না, এবং কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্প গার্ড হিসেবে ডেমিয়ানিয়ুক অবশ্যই অন্তত পরোক্ষভাবে হলেও হলোকস্টের সাথে জড়িত ছিল। আদালত সেই যুক্তিতে সায় দেন, এবং সেই লিগ্যাল প্রিসিডেন্স ব্যবহার করেই পরবর্তীতে বেশ কিছু নাৎসি সদস্যদের বিচার করা হয়েছে। ফুর্খনারের বিচারও হয়েছে সেই প্রিসিডেন্সের ভিত্তিতেই। প্রত্যক্ষভাবে তিনিও গণহত্যায় অংশ নেন নাই। কিন্তু কম্যান্ডারের অফিসে কাজ করা, কয়েদীদের নথিপত্র সামলানো, এসবে পরোক্ষ সংযোগটা পরিস্কারভাবেই চলে আসে। তাই তার চাকরির সময়ে ষ্টুটহফে ঘটিত গণহত্যার দায় খুব কম করে হলেও কিছুটা তার উপর বর্তায়।

নাৎসি হলোকস্টের সাথে একাত্তরের গণহত্যা কি তুলনীয়? আমি মনে করি অবশ্যই। পরিসরে না হলেও ভয়াবহতায় এবং নৃশংসতায় হয়তো বলা যেতে পারে হলোকস্টকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানী মিলিটারি আর রাজাকার-আলবরদের কর্মকাণ্ড। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের ট্রাইব্যুনাল কাজ করে যাচ্ছে এক দশকের বেশী সময় ধরে। এর মধ্যে আমরা সবচেয়ে পরিচিত এবং কুখ্যাত বেশ কিছু রাজাকারকে বিচারের আওতায় আসতে দেখেছি, তাদের বিরুদ্ধে আদালতের দেয়া রায় (মৃত্যুদণ্ড হোক, বা আমৃত্যু কারাদণ্ড) কার্যকর হতে দেখেছি। কিন্তু কাদের মোল্লা, সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী, কামারুজ্জামান, মীর কাশেম, আলী আহসান মুজাহিদ প্রমুখদের ফাঁসিতে ঝোলা, বা সাঈদী গোলাম আজমদের আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগের মাঝে আমরা অনেক সময়েই ভুলে যাই সেসব মানুষদের কথা, যারা পরোক্ষভাবে হলেও গণহত্যার সাথে জড়িত ছিল। এরা নিজেরা অবশ্যই পাকিস্তানী মিলিটারি এবং আল-বদরদের সাথে রাস্তায় নেমে মানুষ খুন করে নাই, ধর্ষণ করে নাই। কিন্তু হয়তো পাশের বাসার মেয়েটিকে মিলিটারির হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে একটু বাড়তি খাতির পাওয়ার আশায়, পাড়ার কোন বাসা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সহায়তা পায়, তাদের লিস্টি ধরিয়ে দিয়েছে শান্তি কমিটির কাছে, বা নিদেনপক্ষে শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে নিজের চোখের সামনে হত্যাযজ্ঞ ঘটিত হতে দেখেও বিচলিত হয় নাই, নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে নাই, আর দশটা সাধারণ দিনের মতই নিজের জীবনযাপন করে গেছে, কারণ 'ইয়ে সাব গন্ডগোল কা দিন হ্যাঁয়, ইয়ে সাব হতা হি হ্যাঁয়।'

আমি জানি এসকল মানুষরা হয়তো বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় পরে, এবং এদের সংখ্যা এতই বেশী, যে এদের কোন প্রকার বিচারের করাটা একটা প্রায় অসম্ভব কাজ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপর ভরসা এমনিতেই শূন্যর কোঠায়, এখনও না মুক্তিযোদ্ধা না রাজাকারের তালিকা, কোনটাই ঠিকমত প্রকাশ করতে পারলো না, মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বেদের মেয়ে জোসনার মত 'আসি আসি' বলে ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন বেশ কয়েক বছর ধরেই। অন্তত চিহ্নিত শান্তি কমিটির সদস্যদের মধ্যে কে কিভাবে পরোক্ষভাবে হলেও একাত্তরের গণহত্যায় জড়িত ছিল, সেই তালিকা এনারা প্রকাশ করতে পারবেন, সেই আশা নিতান্তই দুরাশা। কিন্তু ইর্মগার্ড ফুর্খনার, জোসেফ ডেমিয়ানিয়ুকদের বিচারের খবর যখন পড়ি, খুব ইচ্ছা করে যদি আমাদের দেশেও এমন কিছু করা যেতো। কারণ শুধু সবচেয়ে নৃশংস এবং কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেই একটা গণহত্যার নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। যেই বীরাঙ্গনা আজও দুঃখ কষ্টের মাঝে বেঁচে আছেন, তিনি শুধু কোন পাকিস্তানী অফিসার বা আল-বদর কম্যান্ডার তাঁর উপর অত্যাচার করেছিল, তাকেই অভিশাপ দেন না, অভিশাপ দেন সেই লোকটাকেও, যে তাকে মিলিটারির হাতে তুলে দিয়েছিল। যেই সন্তানটা তার বাবাকে হারিয়েছে পাকিস্তানী ফায়ারিং স্কোয়াডে, সে শুধু রাইফেল তাক করা খুনি পাকিস্তানী জোয়ানদের কথা চিন্তা করেই প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলেন না, সেই প্রতিবেশী চাচার কথা চিন্তা করেও ক্রোধে ফেটে পড়েন, যে স্থানীয় আল-বদর ক্যাম্পে তার বাবার গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের টাকা পাঠানোর কথা ফাঁস করে দিয়েছিল।

একাত্তরের ফুর্খনার এবং ডেমিয়ানিয়ুকদের কয়েকজনকে হলেও চিহ্নিত করা হোক, প্রতীকী হলেও বিচারের সম্মুখীন করা হোক। কারণ গণহত্যার দায় এরাও কোনভাবেই এড়াতে পারে না। Fiat justitia ruat caelum, জয় বাংলা।


মন্তব্য

বানান ঠিক করুন এর ছবি

ফুর্চনার > ফুর্খনার
নাজি > নাৎসি
পল ওয়ার্নার > পাউল-ভেয়ার্নার
স্টুটহফ > ষ্টুটহফ
ডেমাঞ্জুক > দেমিয়ানিয়ুক


ধন্যবাদ।

ইয়ামেন এর ছবি

ধন্যবাদ। বানানগুলো ঠিক করে দিয়েছি। এ ছাড়া লেখা নিয়ে কিছু বলার থাকলে সেটাও বলুন।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।