এ ও সে ও: ১৩ : চিঠির শব্দ

কর্ণজয় এর ছবি
লিখেছেন কর্ণজয় (তারিখ: সোম, ০৯/০৪/২০১২ - ২:১৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ভুলে থাকার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। একটু পরপরই মনে হচ্ছে - অসম্ভবভাবে কোথাও হারিয়ে যাই। যেখানে গেলে আর কেউ কখনও খুঁজে পাবে না। প্রসুনের ডায়াগ্রামটার কথা মনে হয়।
ও ছিল আমার বন্ধু। কোন নিয়মে ওকে বাঁধা যেত না । হটাৎ করেই একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে জানা গেল - হার্টে খুব বড়রকমের সমস্যা বাধিয়ে ফেলেছে সে । ডাক্তাররা অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষা করে বললেন - অপারেশন লাগবে। প্রথমে রাজী ছিলো না, শেষ পর্যন্ত অবশ্য রাজী হলো। হৃদপিন্ডে অনেকগুলো রিং ঝুলিয়ে শেষপর্যন্ত ও বাড়ি ফিরে এলো। সাথে কড়া নির্দেশ। অমলের মত তাকেও অনেককিছু সারাজীবন মেনে চলতে হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বাড়ি ফেরার পর থেকেই ডাক্তাররা পইপই করে যেগুলো মানা করে দিয়েছিলেন, সেগুলোই আরো বেশি করতে শুরু করে। ‘কেন এরকম করছিস?’ - শাসন করলে পকেট থেকে একটা ডায়াগ্রাম বের করে দেখাতো। অত্যন্ত জটিল একটা ডায়াগ্রাম। জ্যামিতির মত। কেউই বুঝতে পারতো না। খুব সিরিয়াসলি সে ডায়াগ্রামটার আকিবুকিগুলো বোঝানো শুরু করে। ডায়গ্রামটা না বুঝলেও কথাগুলো বোঝা যেত।
মানুষের আয়ু কতদিন? যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন? না? মানুষ আসলে ততদিন বাঁচে যতদিন সে চায়। কেন বাঁচবে? কোন একটা কাজ শেষ করার জন্য। যেই কাজটা থেকে মানুষ কিছু পাবে। শুধু নিজে পাবে না- মানুষ পাবে। কাজটা শেষ না করা পর্যন্ত সে আয়ু পাবে। এখানেই মানুষ। এখানেই স্পিরিচুয়ালিটি। আমি সহজে মরবো না। এতগুলো রিং নিয়ে আমি ভাল আছি না? সুস্থ আছি না?
ওর কাজটা কি ছিল, বলে নি কখনও। শেষপর্যন্ত প্রসূন খুব বেশিদিন বাঁচে নি। ঘুমের মধ্যে টুপ করে মরে গিয়েছিল। ও কি ওর কাজটা শেষ করতে পেরেছিল? জানি না।
কিন্তু আমি কোন স্পিরিচুয়ালিটি খুঁজে পাই না। কোথাও না। কোন বিশ্বাস - সেও না।
অন্ধকার নামে। অন্ধকার। অন্ধকার।
আমি অন্ধকারে বসে একটা সিগারেট জ্বালাই। একা। আগুন আর আমি।
আমি এখন এভাবেই ভাল থাকি। আর কোন ভাল থাকার উপায় আমার জানা নেই। পৃথিবীটাকে আর ভাল লাগে না। নিজের জন্য কষ্ট হয়। বুকের কাছটা একটু ফুলে যায়। নিঃশ্বাস নেয়াটাও কঠিন মনে হয়।
প্রত্যেকের জীবন একটি কিছুর জন্য। কারো কাছে এটা সৃষ্টিকর্তা, কারো কাছে মতাদর্শ, কারো কাছে এটা দেশ, কারো কাছে এটা মা, কারো কাছে এটা প্রেমিকা । এটাই তার বিশ্বাস, তার ঈশ্বর।*১
আমার কোন ঈশ্বর নেই। বিশ্বাস নেই। ঝুমি নেই, ফ্রিদা নেই, মা চলে গেছে।
দেশ?
মহাকাশে সেই অলৌকিক সিনেমার মত এই সময়ে আমাদের দেশটাকে নিয়ে একটা সিনেমা বানানোর কথা মনে হয়। ভাবি, কেমন হবে সিনেমাটা?
সিনেমা। আমি ভাবি আবার। সিনেমার জন্য একটা গল্প দরকার। যে গল্পের একজন নায়ক থাকবে। নায়ক মানেই যোদ্ধা। চারপাশের সব বাধা বিপত্তি সে অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে। বীরের মত। ভাবি আমি। ভীরু কাপুরুষরা নায়ক হয় না। তার চেহারাটা কল্পনা করার চেষ্টা করি। অনেক চেহারাই ভাসে, কোনটাই মনের মত হয় না। সিনেমার নায়কের মধ্যে মধ্যে এমন কিছু থাকতে হবে যেন সে প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। বীরশ্রেষ্ঠদের কথা ভাবি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাত সাতটা প্রতীক। সাত আকাশের তারা। সাত টুকরো আলো। সেই আলো আমাদের পথ দেখায়। সেই পথ ধরে আমি এই সময়ের আলো খুজতে বের হই।। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। অন্ধকার অন্ধকারই থেকে যাচ্ছে। কোথাও একটা সমস্যা হচ্ছে, টের পাই। আবার শুরু থেকে ভাবতে চেষ্টা করি।
বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিচ্ছেন।
‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোল...’। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে কৃষক, জেলে, মজুর, ছাত্র, শিক্ষক, চাকুরে সুখী গৃহকোণ ফেলে যুদ্ধে গেল। গুলির মুখে দাড়ালো। মারা গেল। যুদ্ধটাকে এগিয়ে নিয়ে গেল। দেশটা দেশ হলো।
এখানেই গোলমালটা লাগে।
এই সাত বীরশ্রেষ্ঠের সবার বুকে সামরিক বাহিনীর তকমা আটা।
যুদ্ধের ছবি ভেসে আসে। রাইফেল কাধে হেটে যাচ্ছে সাধারন মানুষগুলো, ক্ষেত থেকে উঠে আসা চাষাভুষো মানুষগুলো, ক্লাশ ফেলে গ্রেনেড হাতে ছাত্রগুলো। ওরা কোথায় গেল?
ভারী গোলমেলে লাগে। রহস্যময়। কালো সানগ্লাসে মোড়া চোখের মত। সেই চোখে চোখ রাখলেও কিচ্ছু টের পাওয়া যায় না। না ঘৃণা। না ভালবাসা।
একটা সানগ্লাস লাফিয়ে ওঠে।
গ্রাম থেকে গ্রাম। সানগ্লাসটা ছুটে বেড়াচ্ছে। জিয়াউর রহমানের চোখে সারাক্ষন সানগ্লাসটা সেটে আছে। তার হাত ধরে বাংলাদেশের সময়টা অন্যযুগে পা রেখেছিল। ভারী অন্যরকম সময়ে। সানগ্লাস সময়। আমি একদিন সানগ্লাস পড়ে দেখেছিলাম। রঙগুলো আলাদা করা যায় না। রক্তের লাল, ঘাসের সবুজ। সবকিছু একরকম লাগে।
একজন সৈনিকের জীবনে জীবন এবং মৃত্যু সমান। সে জীবন দেয়। জীবন নেয়। এইজন্য রক্তও তার কাছে সবুজ ঘাসের মত লাগে। এইজন্যই তারা এত রক্তের ভার সইতে পারেন।
জিয়াউর রহমানের জীবনটাই রক্তের পথ বেয়ে হেটে চলার মত। তার ডাক নামটা মনে হয়। খুব সুন্দর একটা নাম। কমল। পদ্ম। পদ্মটার রঙটা লাল মনে হয়। লাল পদ্ম। রক্ত কমল। ইতিহাসে অভ্যূত্থানের ভেতর দিয়েই তার জন্ম। অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে তার মৃত্যু।
সিনেমার মত।
২৮ মার্চ। ১৯৭৫। সন্ধ্যা নামছে। লনের আলোগুলো জ্বলে উঠলো এক এক করে। তাতে কোণে কোণে রঙ্গন ফুলের ঝাড় গাছগুলোর মধ্যে জেকে বসা অন্ধকার আরও ঘন হয়ে ওঠে। নরম গালিচার মত সবুজ ঘাসের উপর একটা টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার পেতে রাখা। অনেকক্ষন হলো কর্ণেল এখানে একা একা বসে আছেন। তিনি যখন এসেছেন তখনও দিনের আলো ছিল। এখন অন্ধকার। ভালোই হয়েছে। যে বিষয়টা নিয়ে কথা - তার জন্য অন্ধকারই ভালো। কর্ণেল ভাবলেন।
আজকের মিটিংটার জন্য তিনি অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সঙ্গে নিভৃতে আলাপের সুযোগটা কিছুতেই করে উঠতে পারছিলেন না। জিয়াউর রহমান আজকে সময় দিয়েছেন, এখন যতই অপেক্ষা করতে হোক - এটা কোন সময়ই নয়। তার মধ্যে কোন তাড়া নেই।
তাদের পরিকল্পনার একটি বড় অংশই জিয়াউর রহমানকে ঘিরে। জিয়াউর রহমান যদি তাদের পরিকল্পনায় সম্মতি দেন তাহলে তাহলে সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। জিয়ার ছবি কর্ণেল কল্পনা করলেন। সানগ্লাস চোখে জিয়াউর রহমানের মূর্তিটাকে সন্ধ্যার মতই রহস্যময় লাগে। এ পারফেক্ট সোলজার। তাদের মতই। না, তাদের চয়েজে কোন ভুল নেই - কর্ণেল চিন্তা করলেন। সিনিয়ার অফিসারদের মধ্যে একমাত্র তিনিই প্রেসিডেন্টের প্রতি ভেতর থেকে অনুগত নন। তারা যেই পরিকল্পনা করেছেন তাতে একজন সিনিয়রকে সামনে আনতেই হবে। জিয়াই পারফেক্ট। কর্ণেলের আবার মনে হলো। ঘড়ির দিকে তাকালেন কর্ণেল। একটু রিলাক্স হওয়ার জন্য চিন্তাটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইলেন তিনি। জিয়াউর রহমান যখন আসবেন তখন কি সানগ্লাসটা তার চোখে থাকবে? নাকি থাকবে না। অন্ধকার নেমে এসেছে, এই সময়ে কারো চোখেই সানগ্লাস চোখে থাকার কথা না- কিন্তু কর্ণেলের মনে হলো জিয়াউর রহমানের চোখে সানগ্লাসটা থাকবে। মনে মনে বাজী ধরলেন তিনি। আজকে রাতে তাদের আবার একসাথে জরুরী মিটিং-এ বসার কথা। সেখানে সেনা বাহিনী উপ প্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে তার আজকের কথাবার্তা নিয়ে আলাপ আলোচনা হবে। জিয়ার চোখে যদি সানগ্লাস থাকে - এক্সট্রা দুটো বোতল মিটিং এর জন্য বরাদ্দ করলেন। আর যদি জিয়া খালি চোখে আসেন - তাহলে কোন হার্ড ড্রিঙ্কসই থাকবে না। কর্ণেল মনে মনে ঠিক করলেন। পানীয় ছাড়া মিটিংএ অন্যরা আপত্তি করবে, কিন্তু তারপরও - এটা একটা বাজী। চুক্তির মতই। মেনে চলতেই হবে। তার কথার উপর কেউ না করবে না। এসব ভাবতে ভাবতে একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলেন কর্নেল - চোখের সামনে হটাৎ একটা ছায়ামূর্তি দেখে চমকে উঠলেন। জিয়াউর রহমান। নিঃশব্দে এসে কখন যে দাড়িয়েছেন তিনি টেরই পান নি। কর্ণেল দাড়িয়ে পড়লেন।
: স্যার।
এতক্ষনে তিনি খেয়াল করলেন এই অন্ধকারেও জিয়াউর রহমানের চোখে সানগ্লাস ঝুলছে। প্রথম বাজীতে তিনি জেতায় বুকটা একটু হালকা হয়ে উঠলো। তার কাছে মনে হলো, সবকিছু ঠিকঠাক মতই চলবে।
: বসো। জিয়াউর রহমান বসতে বসতে কর্ণেলকে বললেন।
: স্যার, কর্ণেল আবার জিয়াকে বললেন।
সন্ধ্যার অন্ধকার এখন রাতের দিকে। জিয়াউর রহমানের ঠিক পেছনে লনের আলো। তাকে ছায়ার মত দেখায়। রহস্যময়। এই অন্ধকারেও বোঝা যায় একদৃষ্টিতে তিনি তার দিকে তাকিয়ে আছেন। কর্ণেল হটাৎ একটা অস্বোস্তি বোধ করেন। তিনি কি ঠিক জায়গায় এসেছেন? এক মূহূর্তের জন্য চিন্তাটা তাকে পেয়ে বসে। অস্বোস্তি হয় ঠিকই কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করেন না। আসলে সিদ্ধান্ত নিয়েই এখানে তিনি এসেছেন। নতুন করে ভাবার কিছু নেই। তিনি বলেই ফেললেন।
: স্যার দেশের অবস্থাতো দেখছেন। এখনই কিছু একটা করার সময়।
জিয়াউর রহমান কোন কথা বলেন না। সানগ্লাসের আড়াল থেকে তিনি কর্ণেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
: আমাদেরতো কিছু একটা করতে হবে।
: আমাদের? জিয়াউর রহমানের বলার উচ্চারনে কর্ণেল বুঝলেন জিয়াউর রহমান পরিচয় জানতে চাইছেন। কর্ণেল একটু সময় নেন। জিয়াউর রহমান নিরবে কর্ণেলের পরের কখাগুলোর জন্য অপেক্ষা করেন।
: সেনাবাহিনীর। ক্ষমতার পরিবর্তন আনার জন্য আমরা জুনিয়র অফিসাররা কাজ করছি। এতে আমরা আপনার সমর্থন চাই।
জিয়াউর রহমান কর্ণেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। অন্ধকারের মধ্যে সানগ্লাস চোখে জিয়াকে এই গ্রহের মনে হয় না। কর্ণেল সেই অন্ধকারের ভেতর চকচকে অন্ধকারে ঢাকা চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে শেষ শব্দদুটো আবার বললেন।
: আপনার সমর্থন।
জিয়াউর রহমান উঠে দাড়ালেন। কর্ণেল মনে মনে একটু ভয় পেয়ে গেলেন। একটু পরেই জিয়াউর রহমানকে লনের কোনায় রঙ্গন ঝোপের দিকে এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসতে দেখে বুঝলেন জিয়াউর রহমান চিন্তা করছেন। কর্ণেল দাড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। জিয়াউর রহমান এক দুই তিন বার লনের এ মাথা থেকে ও মাথা হেটে টেবিলের কাছে আসলেন। কর্ণেলের দিকে গম্ভীর গলায় বললেন
: আমি সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে এই ঘটনায় জড়িত হতে পারি না। যদি বিষয়টা এমন হয় জুনিয়র অফিসার হিসেবে এটা করতে চাও, go ahead।
কর্ণেল সৈয়দ ফারুক রহমান ফিরে আসলেন।
তার মাথায় অনেক চিন্তা আকিবুকি কাটে। জিয়াউর রহমান তাদের পরিকল্পনায় প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু সরাসরি অংশ নিতে রাজী হন নি। তিনি বুঝতে পারলেন রাজনৈতিক কোন সমর্থন ছাড়া শুধু সামরিক বাহিনীর পক্ষে তাদের পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করা যাবে না। কর্ণেলকে অবশ্য এ নিয়ে তেমন চিন্তাও করতে হয় নি। খন্দকার মোশতাক আহমেদ যে এ ব্যাপারে এক পা দিয়েই রেখেছেন তা তারা আগেই জানতেন।
খন্দকার মোশতাক আহমেদের সাথে শেখ মুজিবর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুজনের রাজনৈতিক জীবনের একেবারে শুরু থেকেই। এই দুজনের রাজনীতি শুরু হয় প্রায় একই সময়ে মুসলীম লীগের সাথে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলেনে যুক্ত হলেও এই দুইজনের মন মানসিকতা এক রকম ছিল না। মুসলিম লীগ করলেও শেখ মুজিব ছিলেন মনের দিক দিয়ে অনেকটা অসাম্প্রদায়িক। ৪৭ সালে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে খূনোখুনি বেঁধে গেল তিনি দাঙ্গা ঠেকানোর জন্যও মাঠে নেমে পড়েছিলেন। অন্যদিকে খন্দকার মোশতাক হিন্দুদের সহ্যই করতে পারতেন না। মুসলিম লীগের রাজনীতিতে পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যত নেতা হিসেবে দুজনের সম্ভাবনাও শুরুর দিকে ছিল সমানে সমান। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদের উন্মেষের যুগে বাঙ্গালীদের মধ্যে যখন অসাম্প্রদায়িক চেতনা শক্তিশালী হতে লাগলো খন্দকার মোশতাক আহমেদ নেতৃত্বের দৌড়ে শেখ মুজিবের পেছনে পড়ে যেতে লাগলেন। মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ যখন গঠন করা হলো তখন পর্যন্ত এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। কিন্তু আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি যখন বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ করার ব্যাপারে শেখ মুজিবের সঙ্গে বিরোধিতা করে খন্দকার মোশতাক দল থেকে বেরিয়েও গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি মুজিবের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে আবার দলে ফিরে এসেছিলেন ঠিকই কিন্তু মনে মনে তিনি কখনই এটাকে অপমান হিসেবে সারাজীবন বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন। সময়ের সাথে সাথে শেখ মুজিবর রহমান শুধু আওয়ামী লীগের নয়, বাঙ্গালীর একমাত্র নেতা হয়ে উঠলেন। আর খন্দকার মোশতাক আহমেদ পড়ে থাকলেন তারই একজন কর্মী হিসেবে। এটা মেনে নেয়া মোশতাকের পক্ষে খুব যন্ত্রনাকর ছিল। অন্যদিকে শেখ মুজিব তার এই পরাজিত এক সময়ের পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে সবসময়ই নিজের কাছে রেখেছেন, অনুগ্রহ দেখিয়েছেন, প্রশ্রয় দিয়েছেন। কিন্তু খন্দকার মোশতাকের কাছে শেখ মুজিবের এই প্রশ্রয় ছিল যন্ত্রণার মত। কখনও কখনও মোশতাকের মনে হতো শেখ মুজিব তাকে অনুগ্রহ দেখিয়ে নিজের বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করেন। অপমানিত মনে করলেও এর থেকে বেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মত সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল না। এছাড়া তার নিজের ব্যক্তিত্বটা খুইয়ে ফেলেছিলেন আগেই। পরাজিতের ঘৃণা নিয়েই তিনি শেখ মুজিবের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মুজিবের প্রতি তার এই তীব্র ঘৃণা এবং পাকিস্তানপন্থী ভাবাদর্শের কারনে মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে ধ্বংশ করার যে কোন কাজে নিজ থেকেই জড়িয়ে পড়বেন এটা স্বাভাবিকই ছিল। এছাড়া তার দূর্বল ব্যক্তিত্বের কারনে তাকে ইচ্ছেমত নিয়ন্ত্রন করা যাবে। কর্নেল অগাষ্টের প্রথম সপ্তাহে খন্দকার মোশতাকের সাথে দেখা করলেন।
অগাষ্টের ১৩ অথবা ১৪ তারিখে এটা ঘটতে পারে। কর্ণেল মোশতাক আহমেদকে বললেন। মোশতাক দাড়িয়ে কর্ণেলের হাত জড়িয়ে ধরলেন। কর্ণেলের মনে হলো একটা ইদুরের সাথে তিনি করমর্দন করলেন। সবকিছু ঠিকঠাক করে তিনি যখন বেরিয়ে আসলেন তার চিন্তার পথ জুড়ে অনেক রক্ত কমল ফুটতে শুরু করেছে।
ক্রিং। ক্রিং। ক্রিং ক্রিং।
১৫ অগাস্ট সকালে জিয়াউর রহমানের বাসায় ফোন বেজে উঠলো। অফিস থেকে ফোনটা এসছে। জিয়াউর রহমান ফোনটা ধরলেন।
: বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হয়েছেন, অন্যপ্রান্ত থেকে উত্তেজিত কণ্ঠ ভেসে আসে।
: উপরাষ্ট্রপতি আছেন, তাকে খবর দিন..., জিয়াউর রহমান স্বাভাবিক ঢঙে কথাগুলো বললেন।
কর্ণেল ফারুক রহমান, কর্ণেল রশিদ, মেজর ডালিমদের ছত্রছায়ায় খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসলেন। ৩০ বছরের অক্ষমতার যন্ত্রনা যে ঘৃণা এবং অপমানের জন্ম দিয়েছিল মোশতাক আহমেদ বিশ্বাসঘাতকতা আর রক্তের দাগের বিনিময়ে তার হাত থেকে মুক্তি পেলেন। খন্দকার মোশতাক আহমেদ সংসদ ডাকলেন। আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ সাংসদেরা সংসদে গিয়ে মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সমর্থন দিলেন। তখনও বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত লাশ ৩২ নাম্বার ধানমন্ডির বাড়ির সিড়িতে পড়ে আছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের চার প্রধান নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, মনসুর আলীসহ অল্প কয়েকজন নেতা এই অভ্যূত্থানকে সমর্থন করলেন না। তাদেরকে জেলে নেয়া হলো। শুধূ একাত্তর সালের একজন বীর যোদ্ধা বাঘা কাদের সিদ্দিকী এই সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিলেন।
নভেম্বর মাসের শুরুতে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যূত্থান ঘটলো। খন্দকার মোশতাক ক্ষমতাচ্যূত হলেন। তবে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার ঠিক আগ মূহূর্তে মোশতাক আহমেদ তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, মনসুর আলীকে জেলখানার ভেতরে হত্যা করার ব্যবস্থা করলেন যেন পরবর্তীতে তারা গণতান্ত্রিক কোন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে না পারেন। খালেদ মোশাররফ ক্ষমতায় গিয়ে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করলেন।
৭ নভেম্বর। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের ছক অনুযায়ী কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যূত্থান সংগঠিত হলো। খালেদ মোশাররফ নিহত হলেন। জিয়াউর রহমান মুক্ত হলেন। তাকে দিয়ে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে দেশে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ তৈরীর পরিকল্পনায় বাঁধা হয়ে দাড়ালেন জিয়া নিজেই। মুক্ত হয়েই তিনি পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রন নিজের হাতে তুলে নিলেন। অভ্যূত্থানের নায়ক কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নিজের ক্ষমতার পথকে পাকাপোক্ত করলেন।
অভ্যূত্থান আর অভ্যূত্থানের গল্পে সেনাবাহিনী আর বিমানবাহিনীতে মৃত্যুর মিছিল শুরু হলো।
দেশ কীভাবে চলবে তার রূপরেখা সংবিধানে আছে। দেশেটাকে নিজের মত ভাবতে গিয়ে সংবিধানের চার মুল স্তম্ভ তার মাথায় ছটফট করে। সংবিধানকে নিজের মত করে পরিবর্তন করতে একটা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
I make politics difficult for polititians, এই কথা বলে জিয়াউর নিজেই রাজনীতিবীদ হিসেবে আবির্ভূত হলেন। ভারতবিরোধিতাকে ভিত্তি করে নতুন রাজনৈতিক দলের সূচনা করলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর সমর্থনে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত দক্ষিনপন্থী অংশের পুনর্জাগরণ ঘটলো।
‘বাংলার হিন্দু - বাংলার খৃষ্টান - বাংলার বৌদ্ধ - বাংলার মুসলমান - আমরা সবাই বাঙালী।’ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী জাতি ইসলামের নামে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক আদর্শের মৃত্যু ঘটিয়ে ‘বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ’ এবং ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি মূলস্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। জিয়াউর রহমান এই দুটি স্তম্ভেরই পরিবর্তন করলেন। তিনি বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদ আর ধর্ম নিরপেক্ষতার পরিবর্তে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। সংবিধানের একটি মূলস্তম্ভ ছিল ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আমাদের আনুগত্য এবং বিশ্বাস’।
সংগ্রাম। এই শব্দটার মধ্যে একটা সুদীর্ঘ ব্যাপার আছে। এ অঞ্চলের মানুষ তার মুক্তির জন্য সবসময়েই লড়াই করে এসেছে। সেই বৃটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়ের কেন্দ্রই ছিল এই ভুমি। বৃটিশ বিরোধী লড়াই। সূর্যসেন, প্রীতিলতা। ভাষা আন্দোলন। ৫২। রফিক, বরকত. সালাম, জব্বার। গণঅভূত্থান। ৬৯। আসাদ। ৭০। বাঙ্গালীর আত্ম পরিচয় প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামের ইতিহাসে সেনাবাহিনী মানেই মানুষের উল্টোপক্ষ। এই ইতিহাসের পাতায় জিয়াউর রহমান মানুষের আশা এবং আকাঙ্খার বিপরীত শক্তির প্রতিনিধি। তিনি ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অফিসার।এই দেশের মানুষের পক্ষে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ৭১ এর মার্চে। সেই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে। তিনি এই দেশের ইতিহাসকে সেই সময়ের ফ্রেমে বন্দী করলেন। সংবিধানে ‘সংগ্রাম’ শব্দটি মুছে দিয়ে তিনি ‘যুদ্ধ’ শব্দটি যোগ করলেন। দেশের মূলনীতি হলো ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি আমাদের আনুগত্য এবং বিশ্বাস’।
অতীতের সবকিছু ছেটে ফেলে আমাদের ইতিহাস ১৯৭১ থেকে শুরু হলো। এর আগে কিছু রইলো না। না শেকড়, না ঐতিহ্য।
মনের ভেতরে বিভ্রান্তির তিরতিরানী ওঠে। আনুভাই এর মধ্যে উঁকি দিয়েই যায়।
আমগো হিস্টরী কেম্যুন ছোট হয়্যা গ্যাছে- এই যে সাওতাল বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ,- কয়বছর আগের কাহিনী মিঞা .. এখনও খুজলে ঐ সময় বাইচ্যা থাকা লোক খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু মনে হয়না কত হাজার বছরের কাহিনী।
কেন মনে হয় হাজার বছরের কাহিনী? সাধারন মানুষের গল্প বলে? মাথাটা এলোমেলো লাগে। কেন সাধারন মানুষের গল্প ভুলে যাই আমরা? ভাবি আমি। পৃথিবীর কত গল্পে সাধারন মানুষের বীরত্বের গল্প থাকে। আমাদের এখানে থাকে না কেন? এর একটা প্রেক্ষাপট আছে নিশ্চয়। সেটা টানা যেতে পারে কি? তাহলে গল্পটা শুরু করা যায় আরো আগে থেকে।
সেই পকিস্তান পর্ব থেকে।
৪৭ এর পর দেশ ভাগের পর দুটি দেশ ভারত আর পাকিস্তান- দুটো রাষ্ট্র হলো, দুজনে চললো উল্টো দুটো পথে। দুটো দেশের সামনেই পড়ে ছিল বন্ধুর পথ, রুক্ষ কর্কশ যুদ্ধ। কিন্তু এই উত্তপ্ত বারুদ মেশানো একই আকাশের নিচে যেন বিসদৃশ দুই ভুমি পাশাপাশি পড়ে আছে।
১৯৬০ সালের দিকে ভারতের সাথে চীনের সীমিত আকারে সংঘর্ষ বেধে গেল। পৃথিবীর সবচেয়ে দুই বৃহৎ জনগোষ্ঠী পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের এই ঘনঘটার ভেতরে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর জেনারেল থিমাইয়া বিদেশমন্ত্রী কৃষ্ণমেননের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে এসেছেন। বিদেশ মন্ত্রী কৃষ্ণমেনন ডাকসাইটে কূটনীতিবীদ, বিদেশ মন্ত্রনালয়ের আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বও সামলেছেন। চিন্তার দিক থেকে তিনি সমাজতন্ত্রী , সে কারণে সমাজতান্ত্রিক চীনের সাথে যুদ্ধ কৌশলের ব্যাপারে তিনি সমাঝোতামূলক ভূমিকা পালন করছেন- সামরিক বাহিনী কৃষ্ণমেননের এই অবস্থান পছন্দ করছে না। তারা যুদ্ধের পুরো দায়িত্ব গ্রহণ করতে চায়। কৃষ্ণমেননের কারণে এটা পারা যাচ্ছে না- তিনি তাদের লক্ষ্যে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছেন। প্রভাবশালী জেনারেল থিমাইয়া ক্রুদ্ধসামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কৃষ্ণমেননকে অপসারনের দাবী জানালেন। প্রধানমন্ত্রী শান্তভঙ্গীতে জেনারেলের কথা শুনলেন। থিমাইয়ার কথা শেষ হলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন ব্যাপারটা কৃষ্ণমেননের, তিনি যেমন করে ভাল মনে করেন সেভাবেই তার দায়িত্ব পালন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে ঝুপ করে নীরবতার পর্দা এক মুহূর্তের জন্য নেমে এলো। প্রধানমন্ত্রী থিমাইয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। থিমাইয়া অস্বোস্তি আর অসন্তোষ এর যুগলবন্দী রচনা করলেন
আমি রিজাইন করবো। তিনি থাকলে ..
প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তাকে থামিয়ে দিলেন।
In our system the Army General can never resign. Ether he dismissed or retired. তুমি কোনটা চাও?
সামরিক বাহিনীর উপর রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রন এভাবে একটা ব্যবস্থা হিসেবে ভারতে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। জেনারেল থিমাইয়ার সাথে নেহেরুর বৈঠকে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক শক্তি মূল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে তখই সমান্তরাল রাষ্ট্র পাকিস্তানে জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জার হাত ধরে জংলী সামরিকতন্ত্র কর্তৃত্বপরায়নতার উন্মাদনায় জেঁকে বসেছে। জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা ১৯৫৮ সালে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে প্রথম সামরিক আইন জারী করলেন। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি বললেন
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা এতই নীচে নেমে গেছে যে, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমানের গোলযোগপূর্ণ অভ্যন্তরীন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। .. আমি নিশ্চিত যে নির্বাচনে প্রধানত ব্যক্তিগত, আঞ্চলিক ও গোষ্ঠীগত ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। নির্বাচনে জয়ী হলে তারা পুনরায় গণতন্ত্রের দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির প্রয়োগ করবেন ...
রাষ্ট্রব্যবস্থাটাই একটা জনসাধারনের শিয়রে রাত হয়ে নামে। বুট আর অস্ত্রের ঘুমপাড়ানী ধমকে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। ঘুমের নিস্ক্রিয়তার মধ্যে ডুবে যেতে যেতে সে স্বপ্ন দেখে - সে হেঁটে যাচ্ছে। তার একটা গান গাইতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু গান গাওয়ার জন্য মুখ খোলার আগেই খাকি পোষাকে একটা হাত তার মুখ চেপে ধরে। হুঙ্কার, প্রতিশ্র“তি আর আতংকের অঝোর বৃষ্টিধারায় সে ভেসে যেতে থাকে। সে চিৎকার করে ওঠে কিন্তু ঘুমের শীতল আবরন ফুঁড়ে তার সকল কথা কেবল নৈঃশব্দে মিলিয়ে যায়।
৬১ সালের সেই নৈঃশব্দের অন্ধকার ফুঁড়ে একটা ট্রেন রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়ে যায়। সেই ট্রেনের একটি সেকেন্ড ক্লাশ ফাকা কামরায় উঠে বসেছেন তরুন অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ। বিদেশ থেকে ইতিহাসের উপর উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে সদ্য পাকিস্তানে ফিরেছেন। এখন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে বাড়ি থেকে রাজশাহী যাচ্ছেন। রওনা দেবার আগে তার স্ত্রী তাকে পই পই করে মানা করে দিয়েছেন দেশে সামরিক শাষন চলছে, দেশ নিয়ে- রাজনীতি নিয়ে তিনি যেন কোন কথা না বলেন। কথা, চিন্তা এদেশে এখন নিঃশ্বাসের মতো। নিজের ভেতরে টেনে নিতে হয়, অক্সিজেনের মতো। দেহের ভেতরেই পুড়িয়ে তা নিঃশেষ করে ফেলতে হয় - যেন কোনভাবে প্রস্বাসের সাথে বাইরে বেরিয়ে না আসে। তাহলেই জরুরী আইনের ভয়ঙ্কর সব ফাঁদে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে। তিনি চুপচাপ বইয়ের পাতায় সময়গুলো নিবদ্ধ করেন। রাজশাহী যাবার পথে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট পড়ে - সেখানে নেমে ফেরীতে নদী পার হয়ে আর একটি ট্রেনে চেপে সেই রাজশাহী। নদী পার হয়ে নতুন ট্রেনে উঠে বসতেই সালাউদ্দিন আহমেদ দেখলেন দুটো সাধারন চাষাভুষো মানুষ তার কামরায় উঠেছে। সালাউদ্দিন আহমেদ পড়–য়া লোক, বই এর পাতায় আবার ডুবে যান। চোখ মানুষের ইচ্ছাধীন, কিন্তু কান নয়। বই এর অক্ষর ছাপিয়ে দুটো মানুষের কথাবার্তা সালাউদ্দিনের কানে ভেসে আসে।
তুই এটা কি করলি। এ্যা -তুই কি করলি এটা। তুই হলি আমার বাড়ির দারোয়ান। আমরা পয়সা দিয়ে রেখেছি বাড়ি পাহারা দিতে, আর তুই কিনা বাড়ির দারোয়ান হয়ে সুযোগ বুঝে বাড়ির মালিক হয়ে গেলি।
সালাউদ্দিন আহমেদ প্রথমে বুঝতে পারেন না কি নিয়ে কথা বলছে লোকগুলো। কোন একটা পরিবারের সর্বশ্বান্ত হবার গল্প হবে হয়তো। তাদের কথাবার্তাগুলো শুনতে মজাই লাগে। তিনি কানখাড়া করে রাখেন - তাদের টুকটাক কথায় এতক্ষণে সালাউদ্দিন বুঝতে পারেন- তারা আসলে আর্মি সম্পর্কে বলছে। তিনি আবার বই এর পাতায় চোখ দিলেও তার আর পড়ায় মন বসে না। ইতিহাসের বিক্ষিপ্ত চিন্তা তার মনকে ব্যথাতুর করে ফেলে। পাকিস্তানের রাজনীতির এই ঘোর অবস্থা একদিনে আসে নি। গোড়াতেই এর বীজ মাটিতে পড়েছিল। কায়েদে আযম থেকেই এর শুরু।
গভর্নর জেনারেল হয়ে পাকিস্তানের গণতন্ত্র ধ্বংস করলেন জিন্নাহ সাহেব নিজেই। পার্লামেন্টারী সিস্টেমে একটা কথা আছে - - king reigns but doesn’t rule. He is the head of state … like a symbolic head.. প্রধানমন্ত্রী এক ধরনের সম্মিলিত দায়িত্ব নিয়ে প্রধান নির্বাহী হয়ে রাষ্ট্রীয় শাষনকার্য পরিচালনা করবেন । জিন্নাহ সাহেব মুসলমানদের আত্মার কণ্ঠস্বর হয়েও যখন গভর্নর জেনারেল হয়ে গেলেন - সব ক্ষমতা নিয়ে নিলেন নিজের হাতে সেটা ছিল এক নক্ষত্রের পতনের মত। হৃদয়ের রাজ্য থেকে জাগতিক রাজ্যের প্রলোভনে ডুবে যাওয়ার করুন কাহিনী পুরো জাতিকে যে বিভ্রান্তির অতলান্তে নিয়ে গেল পুরো দেশ সেই গোলকধাধা থেকে আর বের হয়ে আসতে পারলো না। ইস্কান্দার মীর্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান - থেকে জিয়া, এরশাদ। পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ। একই রাস্তা। একই শব্দ। একই প্রতিশ্র“তি। একই প্রতারণা। একই হুঙ্কার।
কেন এমন হলো? চিন্তারা উড়াউড়ি করে। এলোমেলো। টলোমলো।
বঙ্গবন্ধুর সময়ে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি দেয়া হয়েছির। তিনি কেন একজন সাধারন মানুষকেও বীরশ্রেষ্ঠ করলেন না?
বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো মনে পরে। তিনি মা হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি পিতার শাষন হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি কোমল হয়ে গিয়েছিলেন। তাহলে কি তিনি পাকিস্তান পর্বের সামরিক বাহিনীর দূর্দান্ত প্রতাপের স্মৃতিটা নতুন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে দেখেছিলেন? সেই প্রতাপের আঁচে ভয় পেয়েছিলেন, যেমন করে মায়েরা ভয় পান। কিন্তু ৭১ এর মায়েরা অন্যরকম ছিল। তাজউদ্দিন আহমেদের হাতে ভাতের থালায় বুলেটের দৃশ্যটা মাথায় আসে।
কিছু বুঝতে পারি না। গোলমেলে লাগে। চিন্তাগুলো জট পাকিয়ে যায়। মা শব্দটাই হারিয়ে যায়। আমাদের দেশে ‘মা’ - অতিপ্রাচীনকাল থেকেই পরম পূজনীয়, সন্মানীয় একটি বিষয়। ‘মা’ শব্দটি উচ্চারন করার সময় আমরা নিজেকে শুদ্ধ করে নেই। মা। মাগি। মাগি মানে পরম প্রার্থনার ধন। মা এবং মাগি শব্দদুটিকে আমরা গালি করে ফেলি। রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠি - ‘তোর মায়েরে...’
কোন দেশ এটা?
কিছুতেই নিজের দেশটাকে খুঁজে পাই না। অলৌকিক সিনেমাটা মাথার ভেতরে জন্ম দিতে পারি না। আমি শূন্যে ঝুলে থাকি।
ইসমাইল এসে দরজায় ঠকঠক করে।
ইসমাইলকে আমি দেখিনি। আমার জন্মেরও অনেক অনেক আগে সেই ১৯৪৭ সালে ইসমাইল মারা যায়।
ইসমাইলের সাথে আমার পরিচয় একজন দেশান্তরী কবির মাধ্যমে। অচেনা এই মানুষটিকে আমি প্রথম দেখি বাংলা একাডেমীর সামনের রাস্তায়। শামসুর রাহমানের সঙ্গে। হেটে হেটে যাচ্ছেন আর কথা বলছেন। তার হাতে একটা চারাগাছ, বাচ্চার মত দুহাত দিয়ে ধরে আছেন। কথার লোভে আমি তাদের পিছু ধরি।
: বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে কিছু বলুন না।
: বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে আপনার কিছুই বলার নেই?
: আছে। কিন্তু বলার মত কিছু না।
: তাই বলুন।
: ভাল।
: এটাতো কোন কথা হলো না। আপনি আর একটু ভেঙে বলুন।
: বাংলাদেশের কবিতা আমি পছন্দ করি, আমার ভাল লাগে। এই কারনে আমি সমালোচনা করে বলতে পারবো না। লোকে যাকে ভালবাসে তার ভালমন্দ তফাৎ করতে পারে না।
: আপনি তফাৎ করতে পারবেন না, এটা হতেই পারে না।
তিনি কিছুতেই বলবেন না। বারবার প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু শামসুর রাহমানও নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত মনে প্রসঙ্গটা এড়াতেই বলে উঠলেন
: তোমাদের কবিতা ম্যাচিউরিটি পাচ্ছে।
শামসুর রাহমান তার কথাটা মানতে পারেনি। একটু কষ্ট পেয়েছেন বলে মনে হলো। নিঃশব্দে পাশাপাশি কিছুক্ষন হাটলেন। তাহলে আমি আসি তরুণদা - বিদায় নিয়ে একটা রিকশা ডেকে উল্টো দিকে চলে গেলেন শামসুর রাহমান। তিনি একা একা হাটতে লাগলেন। আমি তার পেছন পেছন। এমন সময় বৃষ্টি এলো। প্রথমে ফোটায় ফোটায়। তারপর মুশলধারে। পাশেই একটা ছাপড়া দোকান দেয়াল উজিয়ে ঝাপ তুলে দাড়িয়ে আছে। বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচতে দুজনেই সেই ঝাপির নিচে দাড়ালাম। তার সাথে এইভাবে আলাপের শুরু।
কবি তরুন স্যান্যালের জন্ম এই দেশে। এখন নিবাস গড়েছেন কলকাতায়।
তিনি বাংলাদেশে এসেছেন এই চারাগাছটি নিয়ে যেতে, হাতের চারাগাছটি দেখিয়ে তিনি বললেন। চারাগাছ! আমি অবাক হই। তিনি হাসেন। ‘জন্মভূমি থেকে এই চারাগাছটি নিয়ে যাচ্ছি। জানালার পাশে লাগাবো। জানালার পাশে বড় হবে। জন্মভূমির ছায়া দেবে।
বুড়ো বয়সে কী থাকতে হয় জানো? একটা জানালা - এক টুকরো আকাশ আর একটা গাছ। তাহলে মনে হবে- তুমি কিছুই হারাওনি।
তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন। তিনি যেন তার জানালার পাশে বসে আছেন। সেই জন্মভূমির চারাগাছটি যেন বড় হয়ে একটা গাছ হয়ে গেছে। তারই ঝিরিঝিরি সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে তিনি কথা বলছেন।
আমি কলকাতা শহরের কথা ভাবি। রানুর এখনকার শহর। কবি আর রানু একই শহরে থাকেন। কবিকে খুব আপন মনে হয়। বৃষ্টি থেমে যায়। আমি তার পিছু ছাড়ি না। তার সাথে সাথে হাঁটতে হাঁটতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেই। নিঃশ্বাসের সাথে তার শরীর থেকে সেই বাতাসে ভেসে আসছিল রানুর কলকাতা শহরের সুবাস। আমার মনে হচ্ছিল আমি রানুর কাছে আছি। তিনি হাঁটতে হাঁটতে তার স্মৃতির গল্প বলছেন আর আমি রানুর কথা ভাবছি। রানুর কথা ভাবতে ভাবতে তার গল্পগুলো ভাল করে শোনাই হয় নি। কিন্তু কি আশ্চর্য্য। তার প্রতিটি শব্দ- একজন মানুষ সুন্দর করে যেভাবে বলে- নিজস্ব ঢঙে একটু জড়িয়ে, উচ্চারণটা নিজের মত করে, নিজের মত করে শব্দগুলো সাজানো, একটু পুনরাবৃত্তি, একটু অগোছালো ...আমার মগজের ভেতর থেকে বেজে উঠছে। আমি না শুনলেও মন ঠিকই জমা করে রেখে দিয়েছে। এখন সুযোগ পেয়ে লাফ দিয়ে উঠে আসছে। আমি চোখ বন্ধ করে দেখতে পারছি সৌম্য দর্শন মানুষটাকে। হাঁটছেন আর বলছেন -
১৯৪৭ সাল।
আমি তখন নওগাঁর ট্রেনিং স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ি। তখন নওগাঁ জেলা হয়নি। রাজশাহীর মধ্যে পড়ে। বয়স কত হবে আমার তখন- ১৪ কিংবা ১৫ বছর হবে। একেবারে বাচ্চা ছেলে বলা যাবে না। আমাদের ক্লাসে ইসমাইল নামে এক ছেলে পড়তো - পুরো নাম ইসমাইল চৌধুরী। মুসলিম ছেলে। তার বাবা ছিলেন কোর্টের মোক্তার। তারা যেই বাড়িতে থাকতো সেটা এখনও মনে পড়ছে। সেখানে থাকতেই দেশটা ভাগ হলো। তো, ভাগ হবার সময়ে মিছিল টিছিল হলো। পতাকা মিছিল। তো পাকিস্তানের ফ্ল্যাগটা যে কীরকম তাও লোকে ঠিক মতো জানে না। একটা সাদা কাগজ কেটে চাঁদ তারা তৈরী করে - সেটা একটা বড় সবুজ কাগজের উপর লাগিয়ে সেটাই মিছিলের পতাকা। সবাই যে যে রকমভাবে বানালো - সেই পতাকাটাই তারা ভাবছে ফ্ল্যাগ। আর জাতীয় সঙ্গীত যে কোনটা- তার কোন কিছুই জানে না। স্বাধীনতার পতাকা নিয়ে নিয়ে মিছিল টিছিল হলো ঠিকই - কিন্তু কেউ সাম্প্রদায়িকতার শ্লোগান দেয় নি। পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেছে, কায়েদে আজম জিন্দাবাদ বলেছে, মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই বলেছে । ১৯৪৭ সালের ১৪ই অগাষ্ট এই ঘটনাটা ঘটল।
কিন্তু আমার বন্ধু ইসমাইল এই মিছিলে ছিল না। উপরন্তু তাকে দুই তিন দিন পাওয়াই যায় নি। তো তার বাবা মা আমাদের কয়েক বন্ধুকে ডেকে নিয়ে বললেন - তোমরা কি ওকে দেখেছো? আমরা এখানে ওখানে ওর খোঁজ করলাম- কেউই কিছু বলতে পারলো না।
এর পরে ওর খোজ পাওয়া গেল- উকিল পাড়ার একটা বড় কামরাঙ্গা গাছের উপরে। কামরাঙা গাছটার বড় ডালে দড়ি বেঁধে আত্মহত্যা করেছিল ইসমাইল। শুধুমাত্র পঁচা গন্ধতে কাক এবং শকুন নামছিল বলে লোকজন গিয়ে দেখল একটা মৃতদেহ ঝুলছে। সে ইসমাইল। দেশভাগ আর ইসমাইলের মৃত্যু কেন?
জানতে পারা গেল - তার বাবাকে ইসমাইল একটা চিঠি লিখে রেখে গেছে।
সেই চিঠি থেকে জানতে পারলাম ইসমাইল তার বাবা মায়ের ছেলে নয়। সে ছিল হিন্দু ঘরের সন্তান। সেই বহু আগে - সে যখন জন্মেছিল, তার জন্মাবার কয়েকমাসের মধ্যে তার বাবা মা দুজনেই পদ্মার নোনা ইলিশ খেয়ে কলেরায় মারা যান। তার বাচ্চাটাকে রক্ষা করার কেউ ছিল না। যাকে ইসমাইল বাবা বলেছে তিনি বাচ্চাটাকে নিয়ে ইসমাইলের আত্মীয় পরিজন অনেকের কাছে গেছেন। কিন্তু বাচ্চাটাকে কেউই রাখে নি। তখন বাচ্চাটিকে এরাই বড় করেছে। নাম দিয়েছে ইসমাইল- কিন্তু যেটা বলে সুন্নত এ খতনা সেটা দেন নি। ইসমাইল বড় হলো, তখনও তাকে তার পালক বাবা মারা কেউ কিছু বলে নি।
কিন্তু দেশ যখন ভাগ হয়েছে - তখন তার বাবা ইসমাইলকে ঘটনাটা বলেন। তার আসল বাবা ছিলেন তার সহকর্মী। তো ঘটনাটটা ঘটে তখনই। ইসমাইল তখন চিঠিটাতে লিখেছে - ‘তোমরা ঘটনাটা আগে বলনি কেন? বা তোমরা আমাকে মুসলমান করনি কেন? আমি যে দেশে জন্মেছি - যাদের বাবা মা জেনে বড় হয়েছি - সে দেশটাও আমার নয়। সেই বাবা মাও আমার নয়। শুনেছি আমার আত্মীয় পরিজনরা ঐ দেশে চলে যাবে। ঐ দেশমানে হিন্দুস্তান। তাদের আমি আত্মীয় পরিজন বলে ভাবি না। সেই মাটির দেশ আমার নয়। কোনটা আমার দেশ আমি জানি না।
এই টানাপোড়েনে ১৪ - ১৫ বছরের ছেলেটা আত্মঘাতি হয়েছে।
তরুন স্যান্যালের বন্ধু ইসমাইল গাছের ডাল থেকে আমার দিকে উঁকি মারে। আমারই মতন দেখতে ও। ওর দিকে তাকিয়ে মনে হয়- বড় কামরাঙা গাছের ডালে ইসমাইলের মত আসলে আমি ঝুলে আছি। আমার মনে পড়ে লাস্টবেঞ্চিও ইসমাইলের মত ঝুলছিল। ওরও পকেটে একটা চিঠি ছিল। আর সঙ্গে একটা চিরকুট।
চিঠিটা লাস্টবেঞ্চির নিজের চিঠি না। জার্মানীর নাট্যকার হাইনরিখ ফন ক্লাইস্টের লেখা চিঠি। তারও শখ ছিল কবি হবে, কবির মতো জীবন কাটাবে। কিন্তু সেটা আর হলো না দেখে একদিন ইংল্যান্ডগামী জাহাজে উঠে পড়েছিলেন। ইংল্যান্ড যাবার জন্য নয়, সমুদ্রের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়তে। মৃত্যুর দিন সকাল বেলা জাহাজে বসে তিনি তার বোনের কাছে যে চিঠিটা লিখেছিলেন।
“আসল কথা এই যে - এই পৃথিবীর সঙ্গে আমি ঠিক খাপ খাওয়াতে পারলাম না। আমার আর কিছুই করার নেই। আমিতো এভাবে বাঁচতে পারি না। আমি এবার মৃত্যুর মধ্যে ঝাপ দিচ্ছি। লক্ষ্মী মেয়ে, শান্ত হও। আমি যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যুর মতো সুন্দর মৃত্যুবরণ করব। আমার সামনে সমুদ্র - আর সমুদ্রের মধ্যেই আমার মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে। আমিও সুন্দরতম সমাধির জন্য অপেক্ষা করে আছি। এবার বিদায়, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোমার মৃত্যুও যেন এই রকমই হয় - এর অর্ধেক আনন্দ ও সুখের মৃত্যু। এর চেয়ে বেশি আন্তরিক ইচ্ছা ছাড়া আর কী করব?”
আর ছোট্ট চিরকুটে সে লিখেছিল - ঐ ভাল রেজাল্ট, বাবার প্রাচুর্যপূর্ণ জীবনের উত্তরাধিকার আমার ভেতরে এক লোভী মানুষের জš§ দিচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম আমার কবিতাগুলো একে একে মরে যাচ্ছে। আমি কবিতাবিহীন জীবন কাটাতে চাই না।
আমি চললাম।
আবার আমার মাথায় মৃত্যু ঘোরাঘুরি করে। মরে যাওয়া গোল্ডফিশের ঠোটের কোনে লেগে থাকা হাসিটা উঁকি মারে। হালিমা খালার কথা মনে হয়।
মায়ের দিকের দূর সম্পর্কের বোন হালিমা খাতুন। লাশ ধুয়ানোর কাজ করেন। এক ছেলে আছে, শহরে গিয়ে বাসা বেধেছে। মায়ের সাথে কোন যোগাযোগ নাই। জীবিকার আর উপায় না পেয়ে এই কাজ শুরু করেছিলেন এক যুগ আগে। এখন এই করেই তার পেট চলে। নানী মারা গেলে হালিমা খালাকে দেখেছিলাম নানীর চোখজোড়া সুরমা দিয়ে রাঙানোর সময় বিড় বিড় করে কথা বলতে। হালিমা খালাকেই বুঝি কথাটা বলা যায়।
: এই যে মরামানুষ গোসল দাও - তোমার ভয় লাগে না?
হালিমা খালা এমনভাবে কথাটা বলেন। ফিসফিসিয়ে, কিন্তু প্রশান্ত একটা ভাব গলার স্বরে মিশে থাকে। যেন এটা এমন এক অভিজ্ঞতার গোপন বিনিময় যা অন্যরা কখনই নাগাল পাবে না।
: একটা মানুষ তার ঘরে ফিরে যাবে তারে একটু সাজায়ে দি, একটু ভাল করে যেন ফিরতে পারে। সবাইরে তো ঐ ঘরে ফিরতে হইবো।
: কক্ষনও ভয় লাগে না?
: শুরুতে লাগছিল। তখন তো বুঝি নাই।
: কী বুঝো নাই?
: আমরা বলি লাশ। আমরা ভাবি ওদের জান নাই। আসলে কিন্তু ওদেরও জান আছে। ওরাও কথা বলে। প্রথম প্রথম ভয়ে ভয়ে শক্ত হইয়্যা থাকতাম। চোখ বন্ধ কইর‌্যা কুনোমতে শরীর ধুয়াইয়্যা দিতাম। একদিন এক বাড়ির ছোট বউ, মুখ দেইখ্যা মনে হইলো খুব ছটফটে মেয়ে আছিল। দুইদিনের জ্বরে মইর‌্যা গেল। ওর শরীলটা ধুয়াইয়্যা উইঠ্যা যাইতেছি, মেয়েটা হটাৎ বলে উঠলো- খালা, চোখে সুরমা লাগাই দিবা না? এমনিভাবে যাবো?
তাইতো রে মা। আমি ওরে বললাম। সেদিন থেইক্যা আমার মন খুইল্যা গেল। এটা খুব যতেœর কাজ। যতœ না নিলে ওরা মন খারাপ করে।
: সবাই মন খারাপ করে?
: সবাই করে। বাড়ি ফিরছে না।
মৃত্যু তবে কি বাড়ি ফেরা? কবরের নৈঃশব্দের ভেতরে একটা স্বান্তনা মৃদু আলোড়ন তোলে। পৃথিবীর সব অবিচারের মৃত্যর মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটবে।
একটা ঘোরের মত মৃত্যু গুনগুন করে।
ইসমাইল আর লাস্টবেঞ্চির পকেটের চিঠিগুলো খালি গুনগুন করে। লাস্টবেঞ্চি শব্দ করে ডাকে। সেই ডাক থেকে ফেরানোর জন্য কোন মুখ ভাসে না। কোন টান জাগে না। কেউ আমাকে বেঁচে থাকতে বলে না।
লাস্টবেঞ্চি আর ইসমাইল ওরা প্রত্যেকেই চিঠি পকেটে পুরে চলে গেছে। আমি হারিয়ে গেলে আমার পকেটে কি একটা চিঠি থাকবে? কী চিঠি লিখবো আমি? কাকে? পৃথিবীকে? পৃথিবীর সাথে আমার সম্পর্কটা অভিমানের। অভিমানটা বেড়ে উঠতে থাকে। আমি চিঠির কথা ভাবতে থাকি। ভাবনাগুলো ঐ চিঠির ডাকটাকে আরো জোরালো করে।


মন্তব্য

ইয়াসির এর ছবি

আগ্রহ নিয়ে পড়ছি, সব বুঝতে পারছি এমন নয়
ইটা রাইখ্যা গেলাম... রেখে গেলাম, পড়া শেষ হলে আবার জানাবো

সত্যপীর এর ছবি

সানগ্লাস সময়। আমি একদিন সানগ্লাস পড়ে দেখেছিলাম। রঙগুলো আলাদা করা যায় না। রক্তের লাল, ঘাসের সবুজ। সবকিছু একরকম লাগে।
একজন সৈনিকের জীবনে জীবন এবং মৃত্যু সমান। সে জীবন দেয়। জীবন নেয়। এইজন্য রক্তও তার কাছে সবুজ ঘাসের মত লাগে। এইজন্যই তারা এত রক্তের ভার সইতে পারেন।

চলুক চলুক

অসাধারন ভাই আপনার লিখাগুলো।

..................................................................
#Banshibir.

সজল এর ছবি

অভিভূত হয়ে পড়লাম। আপনার বাকি লেখাগুলোও পড়ে ফেলতে হবে সময় করে।

---
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

তারেক অণু এর ছবি

অসাধারণ হয়েছে, আপনার কথনভঙ্গী খুব অন্য ধরনের, ছুয়ে যায়, গল্পের অনেক গুলো সমান্তরাল ধারার মাঝে শক্তিশালী স্রোতটা ঠিকই পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। চমৎকার।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।