নভেরা’র শিল্প সত্ত্বা দর্শন

কর্ণজয় এর ছবি
লিখেছেন কর্ণজয় (তারিখ: রবি, ২০/১১/২০১৬ - ২:০৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


প্রাক দর্শন-----------------------
ভাস্কর নভেরা আহমেদ। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাস্কর্য চর্চার পথিকৃৎ এই শিল্পীর জন্ম বৃটিশ ভারতে। ১৯৪৭’র দেশভাগ যখন হয়- তিনি তখন বালিকা। মুসলমানদের মধ্যে ছবি আঁকাই তখন ধর্মবিরুদ্ধ মনে করা হতো। ভাস্কর্যের কথাতো ভাবাই যেত না। ভাস্কর্য মানেই মূর্তি, পৌত্তলিকতার নিদর্শন। এরকম এক সমাজে একজন নারী হয়েও নভেরা আহমেদ কীভাবে এই অঞ্চলের আধূনিক ভাস্কর্য ইতিহাসের প্রথম পথিকৃৎ হয়ে উঠলেন, তা এ অঞ্চলের শিল্পচর্চার সামাজিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান বিষয় হতে পারে।
উপন্যাসকে সমাজের দর্পন বলা হয়। সে হিসেবে হাসনাত আবদুল হাই এর ‘নভেরা’ উপন্যাসটিকেও ঐ সময়ের সামাজিক ইতিহাসের একটি দলিল বলা যেতে পারে। কিন্তু এই উপন্যাস এবং বিভিন্ন সময়ে নভেরাকে নিয়ে যত শিল্প আলোচনা হয়েছে- তাতে তার সৃজন ও শিল্পভাবনার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বাধীন জীবন যাপনের কথাই আলোচিত হয়েছে বেশি। তার কাজ নিয়ে যতটুকু বিশ্লেষণ হয়েছে, বাংলার প্রথম মুসলমান নারী ভাস্কর হিসেবে তা খুবই অপ্রতুল। সমাজ ও শিল্পীমনের মিথস্ক্রিয়া নিয়ে উৎসুক সমাজ গবেষক বা শিল্পবোদ্ধাদের জন্য নভেরা আহমেদের অজ্ঞাতবাসী রহস্যময় জীবন আরও রত্নতূল্য ঐশ্বর্য সাজিয়ে রেখেছে। ‘অজ্ঞাতবাসী’ শব্দটি আমরা এই কারণে ব্যবহার করেছি, নভেরা আহমেদের জীবনের বড় অংশটাই কেটেছে তার পরিবার, সমাজ ও দেশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এক নির্বাসিত অবস্থায়। বিলেত থেকে ভাস্কর্যকলা শিখে আসার পর মাত্র কয়েক বছর তিনি দেশে ছিলেন। তারপরই সমস্ত চেনা জগৎ থেকে হঠাৎ হারিয়ে গেলেন। অনেকেই প্রবাসে যান। প্রবাসী জীবন মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু নভেরার যাওয়াটা হারিয়ে যাওয়ার মতোই। তিনি সেখানে এমন এক জগৎ তৈরি করলেন যা ছিল তার স্বদেশ, আত্মীয়-বন্ধু-পরিজনের স্পর্শের বাইরে। এমনকী পরিবার, সেখান থেকেও। দেশ ছাড়ার পর অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় তিনি বেঁচে ছিলেন। এতটা সময় তিনি পরিবারের, বন্ধুদের কারও সাথে দেখা করেন নি। দেশ যেন তার কাছে হয়ে উঠেছিল দূরের কোন গ্রহ, যেখানে কখনও পা ফেলে হাঁটা হবে না।
স্বদেশ থেকে নির্বাসনে থাকলেও আসলে নভেরা কি স্বদেশ বিচ্ছিন্ন ছিলেন? অথবা তার কাছে স্বদেশের সংজ্ঞা কী রকম, তাও একটি কৌতূহলদীপ্তক আবিষ্কার হতে পারে। একজন শিল্পী কীভাবে স্বদেশকে অনুভব করেন, তাকে বহন করেন, এমনকি তিনি যখন তাকে পরিত্যাগ করেন, স্বদেশের স্মৃতি জীবন থেকে লুকিয়ে রাখেন তখনও দেশ মনে কীভাবে খেলা করে, কীসের ছলে প্রকাশিত হয় তাও শিল্প আলোচনায় একটি সংযোজনা হতে পারে। ফরাসী দেশে নভেরার শেষ জীবন যারা দেখেছেন, তারা এই অন্বেষনে আলো ফেলতে পারেন। আমাদের এই আলোচনার সীমাবদ্ধ পরিসরে অবশ্য এর উত্তর অনুসন্ধানের সূযোগ নেই। নভেরা আহমেদের কাজের প্রারম্ভিক পর্বে আমরা দৃষ্টি ফেলতে চাই- যে সময়টায় তিনি ধূমকেতুর মতো উদয় হয়েছিলেন, তারপর সব পেছনে ফেলে ছুটে গিয়েছিলেন, চোখের বাইরে।
নভেরার শিল্প ভাবনা কেমন ছিল? এর উন্মেষ পর্বটি আমরা খুঁজে দেখতে চাই- যা তাকে এই দেশের পথিকৃৎ ভাস্কর হিসেবে তৈরি করেছে। সেই সময়ের সমাজ এবং নিজের স্বাধীনচেতা ব্যক্তি মানসের নিরন্তর সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা শিল্পভাবনার সহস্রমুখিনতার সন্ধান এই আলোচনায় তুলে আনা সম্ভব হবে না, কিন্তু নভেরার শিল্পভাবনার উৎস বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করা গেলেÑ তবেই এই আলোচনা স্বার্থক হবে।
এই রচনা আমাদের কাছে ছিল নভেরা আহমেদকে বুঝবার, দেখবার, অনুধাবন করার জন্য একটি অনুসন্ধানের মত। একসঙ্গে পা ফেলে পথ আবিষ্কার করে করে এগিয়ে চলার মতো। এই পথে হাঁটতে হাঁটতে কখনও প্রধান হয়ে এসেছে শিল্প তত্ত্বের জিজ্ঞাসা, কখনও নৃবিজ্ঞানের চোখ দিয়ে উঠে এসেছে সামাজিক প্রেক্ষিৎ আবার কখনও মন সমীক্ষনের প্রয়োগে অনুভব করার চেষ্টা করা হয়েছে শিল্পীর মনকে। আর এর অভিজ্ঞতার সারাৎসার এই আলোচনা, যা আপনারা পড়ছেন। এই পাঠের মধ্য দিয়ে যদি মধ্যে নভেরাকে আবিষ্কার করার জন্য এতটুকু আগ্রহ জন্ম হয়, তবেই আমরা নভেরাকে আরেকভাবে দেখতে পারবো।
কেননা, আগ্রহ থেকেই সকল কিছুর জন্ম হয়।


শৈশব দর্শন……….
কারও শৈশবকে বোঝা গেলে, মানুষটির মনের ভেতর বাহির ধরা যায়। কেননা বলা হয়ে থাকে, মানুষ মৃত্যু পর্যন্ত শৈশবকে বহন করে চলে। তাই নভেরাকে আমরা বুঝতে গেলে, তার শৈশবের ছবি সম্পর্কে একটা ধারণা থাকা প্রয়োজন। নভেরা আহমেদকে নিয়ে আলোচনার এটি একটি সীমাবদ্ধতা, তার কোন কথা নেই। অন্যদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে খন্ড খন্ড যতটুকু তথ্য পাওয়া যায় তা খন্ডিত এবং ব্যক্তিগত বোধে সীমাবদ্ধ। সমস্ত কিছুর মতো, নভেরা আহমেদের জন্ম নিয়েও মতান্তর আছে। একটি ভাষ্য অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৩৫ সালে, পিতৃ-আলয়ে, চট্টগ্রামে। এবং অন্য ভাষ্য মতে তার জন্ম চট্টগ্রামে নয়, বাবার চাকুরীরর সূত্রে কলকাতায়, ১৯৩৯ সালে। বিভ্রান্তি আছে তার সংসার জীবন নিয়েও। কুমিল্লায় আসার পর তার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু স্বামী তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রন করার কথা বলায় বাসর রাতেই স্বামীর ঘর ছেড়ে এসেছিলেন- এমন জনশ্রুতিও আছে।
মানুষ পরিবেশের মধ্যে বড় হয়। আর যে কোন মানুষ সবচেয়ে বেশি শেখে, তার চারপাশ থেকে। পরিবার, সমাজ থেকে। নভেরা আহমেদ যখন বড় হচ্ছেন, তার চারপাশে যুদ্ধের আবহ। নিজের সমাজ আর দূরের পৃথিবীর মূল্যবোধগুলো রক্ত আর মৃত্যুর বিভীষিকায় থৈ থৈ। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস, আস্থা, সম্প্রীতি যে গোটা মানবজাতির অভিন্ন স্বত্ত্বাকে লালন করে, তা গভীর নৈরাশ্যের অন্ধকারে ডুবে গেছে। আর নিজের বাড়ির আঙিনায় হেঁটে বেড়াচ্ছে মনন্তর। দূর্ভিক্ষে আক্রান্ত কঙ্কালসার মানুষের মিছিল। হাত তুলে ভাত নয়, এতটুকু ভাতের ফ্যান চাইতে চাইতে ক্ষুধার্ত মানুষেরা মিছিল করে এসে ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে। জয়নুল আবেদীনের তুলির আঁচড়ে মনন্তরের যে দৃশ্য আমাদের চোখে ভেসে ওঠে- সেই দৃশ্য, নভেরার শৈশব।
আর চারপাশে অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব আর ঘৃণা। হিন্দু আর মুসলমান, যারা একই ভাষায় কথা বলে, হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করে এসেছে প্রতিবেশির মতো- ভাইয়ের মতো। যারা এতদিন একে অন্যের আশ্রয় হয়েছে, সহায় হয়েছেÑ তারাই ধর্মের নামে একে অন্যের জন্য হয়ে উঠেছে ভয় আর হুমকি। প্রত্যেকের মধ্যেই যেন এক হন্তারক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আবার আছে প্রতিরোধ। মনের মধ্যে জ্বলজ্বল করে জ্বলে স্বাধীনতার স্বপ্ন। মিছিল নামে- ভারত ছাড়ো। কিন্তু ইংরেজরা চলে গেলে কেমন স্বাধীনতা আসবে তার প্রশ্নে নিজেরাই একে অন্যের শত্রু। দাঙ্গার আগুনে জ্বলে উঠছে জনপদ, খুন হয়ে পড়ে থাকা লাশ, সর্বস্বান্ত মানুষের কান্নায় ভারি বাতাস আর জমে থাকা আতঙ্ক, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
এ সব বাস্তবতাই নভেরার শৈশবকে তৈরি করেছে।
হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে অবিরাম দাঙ্গা আর লড়াইয়ের মধ্যে ভারতবর্ষ এক থাকতে পারলো না। মুসলমানদের জন্য স্বাধীন আবাসভ’মি হিসেবে পাকিস্তান এবং ভারত দুটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। স্বাধীনতা এলো, কিন্তু স্বস্তি এলো না। কোটি মানুষেরও বেশি মানুষ পিতৃপুরুষের ভিটামাটি, সম্পদ ফেলে উদ্বাস্তু হয়ে নিরাপত্তা আর সৌভাগ্যের অন্বেষনে নতুন দেশে পাড়ি জমালেন। ভারতের মুসলমানদের একটা বড় অংশ পাকিস্তানে আসলেন। আর একই ভাবে পাকিস্তানের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিরাট এক অংশ দলে দলে চলে গেলেন ভারতে। এটি মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক অভিবাসন। শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এর চাইতে বড় অভিবাসনের দেখা মেলে।
বালিকা নভেরারও এই অভিবাসনের অভিজ্ঞতা হলো, নিজের জীবনে।
হয়ত একটু হয়তো বেশি, তবু এতটুকু অনুমান করা যায় চারপাশে ঘটে চলা দাঙ্গা, অবিশ্বাস, ঘৃণা, হত্যা, মৃত্যু এবং এর মধ্য দিয়ে ঘটে চলা অবিরাম দেশান্তর নভেরার জীবনে কোন না কোন ছাপ ফেলেছিল। নভেরার ভাবনার জগৎে এর প্রভাব কেমন ছিল?
আমরা নভেরার জীবনে সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধকে তোয়াক্কা না করে নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে সবেচেয়ে গুরুত্ব দেয়ার যে স্বাধীনচেতা মনোভাব দেখি। মানবতার মৃত্যু ঘটানো সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি বিতৃষ্ণা কি তার এই মনোভাবের একটি উৎস হতে পারে?

আমরা ভাবতে পারি একটা বালিকার কথা। যে কলকাতার বিখ্যাত লরেটো স্কুলে পড়ে। নৃত্যগুরু সাধনা বোসের কাছে নৃত্যকলা শিখছে একনিষ্ঠ শিষ্যর মত। বাড়িতেও একটা সাংস্কৃতিক আবহ। মা মাটি দিয়ে নানা রকম পুতুল বানাচ্ছেন। প্রতিবেশি, বন্ধুদের অনেকেই হিন্দু। তাদের কোলে, ছায়ায় বড় হয়েছে সে। দেশভাগের কারণে তাকে ছেড়ে আসতে হয়েছিল, তার চেনা পরিবেশকে- যে পরিবেশে সে বেড়ে উঠছিল। তাকে ছেড়ে আসতে হয়েছিল, স্বজন-প্রতিবেশী, এক সাথে বড় হয়ে ওঠা বন্ধুত্ব, গুরুতূল্য শিক্ষক। নিজের স্মৃতি ফেলে তাকে চলে আসতে হয়েছিল অনেকখানি ভিন্ন একটা পরিবেশে। যদিও এই যাওয়া দেশান্তর নয়, বরং তারা ফিরে এসেছিলেন নিজেদেরই ভূমিতে। তার বাবা ছিলেন সরকারী চাকুরে। দেশভাগের পর তিনি বদলী নিয়ে চলে আসলেন পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লায়। ১৯৫০ সালে অবসর নেয়ার পর সেখান থেকে চট্টগ্রামে, পৈতৃক শহরে... তখনদিনে শৈশব কৈশোর পার হয়ে নভেরা তারুণ্যে পা দিয়েছেন। এই যে চলে আসা, বেঁচে থাকার এক পৃথিবী থেকে আরেক পৃথিবীতে- এটা কি আগামীতে তার প্রস্থানের মনভূমি তৈরি করেছিল?
এ সময় নভেরার যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তার ছিল স্বাধীন পাখির মত জীবন। ছেলেদের মতো একটা মেয়ে একা একা ঘুরছে, শহরের সৃষ্টিশীল আড্ডাগুলোতে হাজির হচ্ছেন প্রজাপতির মত। সবার নজর কেড়ে নিয়ে আবার উড়ে যাচ্ছেন। তার চলন বলন, বৈষ্ণবীর রুদ্রাক্ষের মালা গলায়, শাড়ি পড়ার ঢং- সময়কে ছাপিয়ে তার মধ্যে আগামী ফ্যাশনের একটা উষ্ণতা। তাকে নিয়ে শহর জুড়ে গল্প গুজব জমে ওঠে। নানা কথা. মুখ থেকে মুখে ঘুরে বেড়ায় আড্ডায় মুখরোচক স্ক্যান্ডালের পানপাত্র হয়ে। সবকিছু পেছনে ফেলে নভেরা চলে গেলেন লন্ডনে- ভাস্কর্যকলায় পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে।
লন্ডনে পড়া শেষ করে তিনি দেশে ফিরলেন, তখন ১৯৫৪ বা ৫৫। ৬০ সাল পর্যন্ত কাজ করলেন। তারপর সব সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেলেন লাহোরে। এটা ছিল তার অজ্ঞাতযাত্রার শুরু। সেখান থেকে বোম্বে গেলেন বৈজয়ন্তিমালার কাছে আবার নাচ শিখতে। তারপর লন্ডন হয়ে প্যারিসে। আমৃত্যু সেখানে বসত গড়লেন। প্রবাসে এমন অনেকেরই ঘটে। কিন্তু নভেরার কাছে এ যেন প্রবাস নয়, ভিন কোন গ্রহে নির্বাসনের মতো। স্বদেশ-স্বজনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
কেন? আমরা তা জানি না। কিছু কিছু কথা শোনা যায়, উড়ো কথার মতো- যার কোন প্রামাণ্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না। কেন একজন শিল্পী এভাবে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে পারেন? আমরা কল্পনা করতে পারি, যতদিন না আগামীর কোন গবেষক এই রহস্যের উন্মোচন করেন। কিন্তু আমরাতো জানিই শিল্পীর মন এবং চিন্তা- তার কাজের ভেতর ইঙ্গিত রেখে যায়। নভেরার কাজের মধ্যে কি এমন কোন ইঙ্গিত, এমন কোন সূত্র লুকিয়ে আছে- যার মধ্যে তার স্বেচ্ছা নির্বাসনের কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে?
শিল্পীর কাজ কী? এ নিয়ে বিস্তর কথা আছে। তার কোনটা তাত্ত্বিক, কোনটা অভিজ্ঞতা প্রসূত। অনুভূতির ভেতর থেকে উঠে আসা। তবে সকল আলোচনা একটা জায়গায় একমত হয়। শিল্প হচ্ছে শিল্পীর প্রকাশ। শিল্পীর জীবন দর্শন। এ কারণেই শিল্পীর জীবন আর কর্ম আলাদা নয়। নভেরা আহমেদের জীবন সম্পর্কে আমাদের তথ্য খুব কম আছে। এই সীমাবদ্ধতা আমাদের আরেকটি সুযোগ করে দিয়েছে। সেটি হলো, আমরা কাজের মধ্য দিয়ে তার জীবনকে আবিষ্কার করা। এ যেন সেই প্রতœতাত্ত্বিক ঐশ্বর্য সন্ধানে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে ইতিহাস তুলে আনা অভিযানের মতো...


শিল্প দর্শন
---------------------------
শিল্প শিল্পীর মনের, চিন্তার এবং উপলব্ধির প্রকাশ। জীবন এবং সংসারকে তিনি কীভাবে দেখেন শিল্পীর সৃজন আসলে তারই ছন্দোবদ্ধ রূপ। নন্দনতত্বের একটি বড় আলোচনা- শিল্পের উদ্দেশ্য কী এই প্রশ্নকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। কেউ বলছেন, শিল্প জীবনের জন্য। আবার কেউ বলছেন, শিল্পের দায় শিল্পের প্রতিই। তার দায় আর কারও প্রতি নয়। এটি একটি গোলকধাঁধাঁ, শিল্প যার উত্তরের দায় বোধ করে না। কারণ, শিল্পের জন্ম শিল্পীর জীবনের ভেতরে। মনোবিজ্ঞান বলে, কল্পনার বীজ বাস্তবতার মাটিতেই থাকে। তাই কোন শিল্পই জীবনকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। বরঞ্চ তাকে বলা যেতে পারে জীবনের জমাট অভিজ্ঞতা, যা সুন্দরের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়। এই দৃষ্টিকোন থেকে কোন শিল্পই শিল্পের প্রতিও দায় এড়াতে পারে না। কেননা তার লক্ষ্যই সুন্দর হয়ে ওঠা।

নভেরা আহমেদের কাজগুলো দেখলে প্রথমেই মনে হয়, একটা সহজ সুন্দর ভাব ফুঁটে আছে। বুনো ঝোপে ফুঁটে থাকা ফুলের মতো, গরুর ডাকের মতো, অলস দুপুরে রাখাল বালকের ভেসে আসা বাঁশির সুরের মতো- সবকিছুতে চিরকালীন একটা মায়া জড়িয়ে আছে। প্রকৃতিকে যেমন মনে হয় বিরাজমান, যেমন আছে তেমনটাই স্বাভাবিক, ছন্দময়- নভেরা আহমেদের কাজগুলো ওরকম মনে হয়। বাইরের আবরন ছাপিয়ে ভেতরের সৌন্দর্য ফুঁটে বের হচ্ছে।
আমরা আগেই বলেছি, মূলত আমাদের আলোচনার ভিত্তি হবে নভেরার প্রথম দিককার কাজগুলো, ১৯৫৫ থেকে ৬০ সালের আগ পর্যন্ত তিনি ঢাকাতে যে কাজগুলো করেছিলেন। ১০০টির মতো কাজ এ সময় তিনি করেছিলেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে ৩৪টি কাজ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহশালায় আছে। এ সময়ের কাজগুলোর প্রতীক এবং অনুষঙ্গগুলো নভেরা বেছে নিয়েছেন- আবহমান বাঙালীর চিরায়ত জীবন ধারা থেকে। তিনি একে উপস্থাপন করেছেন আদিম ঐতিহ্যের পরম্পরার মধ্যে।
তার কাজগুলোতে বারবার ঘুরে আসে গরু, কৃষিপ্রধান বাঙালী জীবনে মাতৃকার প্রতীক। সে কৃষকের জীবিকার উপায় শুধু নয়- মানবশিশুও তার দুগ্ধ পান করে বেড়ে ওঠে। নভেরার কাজে বারবার ঘুরে আসে পরিবার, সমাজবদ্ধ মানুষের যুথবদ্ধতার প্রথম একক। বাবা, মা আর সন্তানের প্রেম বন্ধন- তার কাজে উঁকি দেয় বাঁশরী হাতে রাখাল বালক, সুরপ্রিয় বাঙালী জীবনের যে ছন্দ তার চিহ্ন হয়ে। আমরা দেখতে পাই নারী, মাতৃত্বের প্রতীক শুধু নয়- তার অন্তর্গত চেতনা এবং স্বাধীনতাবোধে আকাশ ছুঁতে চাচ্ছে।
এই নারী, স্বাধীন বোধে বিকাশমান এই মার্তৃকা বর্তমান নয়, উঠে এসেছে ইতিহাসেরও আগে থেকে- জীবনের প্রথম স্পন্দন থেকে। যখন থেকে গর্ভধারণ করে। যখন থেকে প্রাণের আধার হিসেবে কাজ করে। সনাতন দর্শনে এই জগৎ প্রকৃতি ও পুরুষ, এই দুইয়ের সমষ্টি। প্রকৃতি নারী। প্রকৃতিতে পুরুষের সান্নিধ্যে জগৎে সৃষ্টি এবং লয়ের ঘটনা ঘটে। জন্ম হয় মায়া। নভেরার কাজগুলো দেখলে একটা মায়ার জন্ম হয়। এই মায়া যেন আমাদের মধ্যে ছিল। এখন নয়। সেই জন্ম-জন্মান্তরের আগে থেকে।
এই যে যেমন, বসে থাকা নারী (Seated woman) ভাস্কর্যটি লক্ষ্য করলে আমরা এটি বুঝতে পারবো। নারীমূর্তিটি বসে আছে, কিন্তু দেহটি উঠে গেছে ওপরে, সটান কিন্তু খুব স্বাভাবিক। বৃক্ষ যেমন সোজা হয়ে থাকে থাকে, তেমন। মুখটি আনত হয়ে আছে। কেন? ভাস্কর্যটির নিচের অংশে যেভাবে তিনি বসে আছেন, হাতটি যেভাবে পায়ের সাথে মিলে ভাস্কর্যটির পুরো অবয়বের মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরি করেছে। এই শূন্যতা কোন শূন্যতার বোধ তৈরি করে না। বরং অনুভব করি এই শূন্যতা একটা গর্ভ ছাড়া কিছুই নয় যার মধ্য দিয়ে প্রাণ জন্ম নেয়। তখন নারী আর একক ব্যক্তি নারী থাকেন না। প্রকৃতি হয়ে ওঠে। প্রকৃতি সমস্ত সৃষ্টিকে যে মায়ায় বেঁধে রাখে, ভাস্কর্যটির আনত মুখ সেই মায়াকে আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করে। ভাস্কর্যটির মধ্যে একটা আবছা মনুমেন্টের ছায়া আছে, যা সৌধের মতো প্রকৃতির এই পরম ধর্মকে ঘোষণা করতে দাঁড়িয়ে আছে।
‘দাঁড়িয়ে থাকা নারী (Standing Woman)’ সিরিজের একটি কাজে কাজে আমরা এই অনুভবকেই দেখতে পাই। চিরায়ত লোক শিল্পের টেপা পুতুলের আদলে তৈরি করা এই ভাস্কর্যটিতে একটি নারীর চিরন্তন রূপ ফুঁটে ওঠে। সে দাঁড়িয়ে আছে, মাথা উঁচু করে তাকিয়ে আছে- কিন্তু এই তাকানোতে কোন উদ্ধত ভাব নেই। আছে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস। হাতদুটো পেটের ওপর আড়াআড়ি করে রাখা। একটু আলতো করে। একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে তার হাতদুটো একটির পর আরেক রাখা। দুই হাতের করতল দুই কনুইয়ের ভেতরে ঢোকানো নয়। যেমন ভঙ্গিতে আমরা অলসভাবে দাঁড়াই। সে এমনভাবে হাতদুটো রেখেছে যেন সে গর্ভ রক্ষা করছে। এ হলো সেই চিরন্তনী নারী, মাতৃকারূপিনী। এই ভাস্কর্যটির মধ্যে আমরা নভেরা আহমেদের মনের গড়নটি বুঝতে পারবো। ‘নভেরা’ উপন্যাস থেকে এ বিষয়ে নভেরাকে নিয়ে একটি তথ্য উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে।
বৃটিশ মিউজিয়ামের সংগ্রহশালা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম। মানুষের ইতিহাসের পরম্পরাগুলোর সূত্র এবং বৈচিত্র্যে সুবিশাল। গ্রীক, রোমান, মিশরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে নানা শিল্পকলার নিদর্শনে পূর্ণ। এই সুবিশাল সংগ্রহশালা দেখতে গিয়ে নভেরাকে সবচেয়ে বেশি আন্দোলিত করেছিল সাইক্লাডিক দ্বীপের সমাধিতে পাওয়া একটি মার্বেল পাথরের নারী মূর্তি। সহজ, সরল আর সংক্ষিপ্ত প্রকাশভঙ্গি। শরীরকে নিখুঁতভাবে ফুঁটিয়ে তোলার চেষ্টা নেই। শুধু দেহের একটা আদলমাত্র। পেটের ওপর হাতদুটো পড়ে আছে। খুব সহজ আর সংক্ষিপ্ত আদলটির মধ্যে লুকিয়ে আছে শিল্পের আদি গড়ন। দেহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরন নয়, শুধুমাত্র আদল। কিন্তু অভিব্যক্তিময়। একটা সহজ, সরল, সংক্ষিপ্ত একটা আদলের মধ্যে এই অভিব্যক্তি আসে কোথা থেকে? এখানেই শিল্পের রহস্য। এই অভিব্যক্তি আসলে আসে জীবন থেকে। যখন শিল্পী এবং শিল্প অভিন্ন অস্তিত্বে এক হয়ে যায়। তখন শিল্পই শিল্পীর জীবন হয়ে ওঠে। তখন তার উপাদান (Elements), আকার (Form), বিন্যাস (Composition), রঙ সবকিছুই কথা বলে ওঠে। এই প্রসঙ্গে আমরা মনে করতে পারি শিল্প সমালোচক হার্বাড রিডের কথা। হার্বাড রিড ‘Sculpture & Drawing বইয়ে বলেছিলেন,
‘সুন্দর দেখানোটা ভাস্কর্য’র উদ্দেশ্য নয়। সৌন্দর্য এবং অভিব্যক্তির মাঝখানে আলাদা আর একটা কিছু আছে। এটা ইন্দ্রিয়কে প্রথমে তৃপ্ত করে ঠিকই, কিন্তু সেখানেই থেমে থাকে না। তার মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক ভাবের (Spiritual) জন্ম হয়, যা অনুভূতির গভীরে স্পর্শ করে আত্মাকে জাগিয়ে তোলে। সবকিছু হয়ে ওঠে গতিশীল আর গভীর। অনুভূতি দিয়ে ধরা যায় না এমন জায়গায় সে আমাদের দিয়ে যায়। বাস্তবের অনুকরণ কোন শিল্প নয়। বাস্তব থেকে পালানো যদি জীবন থেকে পালানো হয়, তবে এই পালিয়ে যাওয়া আমাদের আরেক বাস্তবতায় নিয়ে আসে।’
হার্বাড রিডের এই শিল্প ব্যখ্যায় নভেরা খুব প্রাণিত হয়েছিলেন। ‘নভেরা’ উপন্যাসে এর সুন্দর বর্ণনা আছে। লন্ডন বাসের প্রথম দিকে একদিন নভেরার ঘনিষ্টতম বন্ধু ভাস্কর হামিদুল হক তাকে বিখ্যাত ভাস্কর হেনরী মুরের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন মুর বাসায় ছিলেন না। মুরের পাশেই থাকতেন হার্বাড রিড। হামিদুল নভেরাকে নিয়ে তার ওখানে গেলেন। কিন্তু তাকেও তারা পেলেন না। বিফল মনোরথ হয়ে তারা বাসায় ফেরার পর হামিদুল হক রিডের বই থেকে ঐ কথাটুকু পড়ে শোনালে নভেরা ‘ইউরেকা- ইউরেকা- পেয়েছি- পেয়েছি’ বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন।
কি পেয়েছিলেন নভেরা হার্বাড রিডের এই কটি বাক্য থেকে?
শিল্প জিজ্ঞাসার মধ্যে ঘুরতে থাকা অনুসন্ধানী শিল্পীর নিজের শিল্পসৃজনের পথটিকে খুঁজে পেয়েছিলেন, সেটি?
না কি, তার চেয়ে গভীর কিছু?
যাপিত জীবনের বাস্তবতা থেকে পালিয়ে অন্য এক বাস্তবতা তৈরি যে শিল্পকলার একটি রাস্তা হতে পারে, এটা জেনে নভেরা এত উল্লসিত হয়েছিলেন কেন? তিনি সবসময়েই স্বাধীন জীবন যাপন করেছেন। কোন কিছু তাকে তার ইচ্ছের বাইরে যেতে বাধ্য করতে পারেনি। আর সে সময় লন্ডনে তিনি ছিলেন, আক্ষরিক অর্থেই স্বাধিীন। এবং তার সামনে যে জীবন, সেটাও ছিল তার নিজেরই নির্বাচিত। তাহলে, কেন তার হারিয়ে যাওয়ার আকাঙ্খা?
তাহলে কি এ কোন শিল্পীমনের চিরন্তন ত্ষ্ণৃা, যে পুনরাবৃত্তির জগৎ থেকে পালিয়ে নিজের কোন জগৎকে তৈরি করতে চায়?
যুক্তি বলবে, প্রবল জানার তৃষ্ণা, দেখার ত্ষ্ণৃা থেকে মানুষ নিত্য নতুন জায়গায় আসে ঠিকই কিন্তু পালিয়ে বা লুকিয়ে অথবা হারিয়ে যাওয়ার সাথে এর কোন যোগ নেই। । কিন্তু নভেরা স্বেচ্ছায় হারিয়ে গেছেন। আমরা জানি, তিনি প্যারিসে শেষ জীবন অতিবাহিত করেন। কিন্তু প্যারিস কিংবা অন্য যে কোন শহরেই হোক, তিনি চলে গিয়েছিলেন তার সমস্ত অতীতকে ফেলে।
তার আসল গন্তব্য কোথায় ছিল? যে গন্তব্য দেশ ও কালের সীমানার উর্দ্ধে, তার কল্পনার অন্য বাস্তবতায়।
কেমন ছিল তা?
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংগৃহিত অসংখ্য শিল্পনিদর্শনের মধ্যে থাকতেও ঐ সাদামাটা মূর্তিটিই নভেরাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষন করেছিল। কিন্তু কেন? এর সাথে কি শৈশবের সেই মায়ের বানানো মাটির পুতুলগুলো, নিজের পুতুল গড়া ভাঙার খেলার কোন যোগ আছে? তবে কি এই আদল তাকে এক ঐতিহ্যের পথ দেখচ্ছিল, যা তাকে নিয়ে যাচ্ছিল স্মৃতিরও অতীতে, আমাদের জন্মের আঁধার আদি মাতৃকার কাছে? তিনি কি তখন সেই মূর্তির অবয়বের অমসৃনতার মধ্যে অনুভব করছিলেন- একটি ভাষা, যে ভাষায় তিনি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছেন আগামীর জন্য? হতে পারে। তার কাজগুলো খুব খেয়াল করলে মনে হয়, খুব সম্ভব।
ঐতিহ্য, আসলে একটি পরম্পরা। যোগসূত্র। ঐতিহ্য পুরনোকে ধরে রাখলেও এটি পুরনো নয়। এর লক্ষ্য আগামী। এর জন্ম মাটিতে, দৃষ্টি আকাশে। ঐতিহ্যের জন্ম মাটিতে বলে, এর প্রতীকগুলো আসে যুথবদ্ধ মানুষের জীবন এবং আচার থেকে। নভেরার প্রতীক জন্ম নিয়েছে বাংলার আবহমান জীবন থেকে। তার সিমেন্টে করা কম্পোজিশন নামে একটা ম্যূরাল আছে। লৌকিক বাংলার রূপকে তিনি বের করে নিয়ে এসেছেন। আমাদের টেপা পুতুলের আকৃতিতে উঠে এসেছে হাতি, ঘোড়া, আর মানুষ। আকাশে একটা চিকন চাঁদ উঠেছে। একটা মাছ, নদীকেও মনের মধ্যে জাগিয়ে তুলছে। জ্যামিতিক ছাচটা একটা মনো-স্থানিক ভূগোল তৈরি করে, যা মানচিত্রের বাইরে আবহমানকাল ধরে বয়ে চলা জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। কাজটির গড়ন, অল্প রিলিফ, বলতে গেলে দেয়াল চিত্রের মতো সমতল- পোড়া মাটির লালের মধ্যে সাদার ব্যবহার আদিম স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। কিন্তু এর জ্যামিতিক গঠন- আমাদের বোঝায়, এই স্মৃতি কেবল ইতিহাসের মধ্যে নয়, এ আগামীর মধ্য দিয়ে এর অভিযাত্রা।
‘পরিবার (Family)’ নামের কাজটিতে সমসাময়িক শিল্পরীতির প্রয়োগ দেখা যায়। পরিবার এবং বন্ধন নভেরার এই প্রাথমিক কাজে বারবার ফিরে এসেছে। এই বন্ধনের এবং প্রেমের অনভূতিকে মূর্ত করার জন্য তিনি তার ইউরোপের শিক্ষাকে প্রয়োগ করেছেন। ইউরোপে এসে ত্রিমাত্রিকতার স্বরূপকে নভেরা আরও ভালভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। ভাস্কর্য- দ্বি মাত্রিক নয়। ত্রি মাত্রিক। ঘুরে ঘুরে দশদিক থেকে অবলোকন করতে হয়। এর ত্রিমাত্রিকতা একেক দৃষ্টিকোন থেকে একেক রকম অনুভূতি তৈরি করে। নতুন নতুন অর্থ তৈরি করে। একটি ভাল ভাস্কর্য’র এই গুণ থাকে। এটি যতবার দেখা হয়, ততবারই এটি নতুন নতুন অর্থ তৈরি করতে পারবে। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোন। কখনই শেষ হবে না।
ভারতীয় ভাস্কর্য ঐতিহ্যে এই ত্রিমাত্রিকতা অনুপস্থিত। ভারতবর্ষে ভাস্কর্য চর্চা বলতে টেরাকোটা, বা দেয়াল গাত্রের দ্বি মাত্রায় রিলিফ ওয়ার্কের মাধ্যমে একটা ত্রিমাত্রিক বিভ্রম তৈরি করা হয়। ধর্মীয় মন্দিরের গাত্রে খোদিত কাহিনীচিত্র কিংবা পূজা মন্ডপের প্রতিমার মায়া ভরা মূর্তিগুলোও দ্বিমাত্রিক। দেখতে হয় সামনে থেকে। পেছন দিকটা বন্ধ। ঘুরে ঘুরে দেখা যায় না।
নভেরা ইউরোপের শিক্ষার সাথে ভারতীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় করলেন। শিল্প সমালোচকদের অনেকেই নভেরার ওপর হেনরী মুরের প্রভাবের কথা বলেছেন। ‘প্রভাব’ শব্দটি পাশ্চাত্য শিল্পভাষা থেকে আহরিত। ভারতীয় ঐতিহ্যে একে বলে পরম্পরা। গুরুর শিক্ষা ধারণ করে শিষ্য আপনার জীবন পথে হাঁটতে শুরু করে। হেঁটে যাওয়া মানেই দেখা। আর ভারতীয় দর্শনে ‘দেখা’-ই জ্ঞান। তার অর্জিত জ্ঞান সে দিয়ে যাবে তার শিষ্যকে। সে তার শিষ্যকে। এভাবেই জ্ঞান প্রবাহিত হয়। কাল থেকে কালে। এই দর্শনে মানুষ কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। মানুষ পারে সৃজন করতে। শূন্য মাঠে ফসল ফলানোর মতো। ভারতীয় লোককবির কণ্ঠে সেই সুর বেজে ওঠে, ‘মন তুমি কৃষিকাজ জানো না...’
মনের কৃষিকাজ, ভারতীয় দর্শনের এই বিশেষ ভাবধারা নভেরাকে বুঝতে পারার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। কারণ দেশ থেকে- স্বজন থেকে দূরে চলে গেলেও তিনি এই দর্শন থেকে চলে যাননি। তিনি ইউরোপ থেকে এসে এসে বিভিন্ন বৌদ্ধ তীর্থস্থান পরিভ্রমন করেছেন। তার কাজেও আমরা দেখতে পাই বুদ্ধের শান্ত সমাহিত ভাব। সর্বব্যাপী নিরবতার গভীর উচ্চারন। এদিক থেকে তার চলে যাওয়াÑ এক ধরণের বৌদ্ধিক সন্ন্যাস ব্রতের মত। যা তাকে মায়ায় বেঁধে রাখে- তার থেকে নির্বানের উপায়। গৌতম বুদ্ধ যেমন সংসারকে মায়া জ্ঞান করে তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন সত্যকে আবিষ্কার করবেন বলে, তেমন। নভেরার ক্ষেত্রে বিষয়টা তূল্য হতে পারে। তিনি চারপাশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। মুক্তি লাভের মতোন। এমনকী মৃত্যুর পর কীভাবে সমাহিত হবেন এই শেষ বিশ্বাসের সামাজিক কাঠামো থেকেও তিনি মুক্ত হতে পেরেছিলেন। তিনি তার সমাহিত বা শেষকৃত্য কোন রীতিতে হবে সে ভার তার শেষ জীবনের সঙ্গীর ওপর ছেড়ে দিয়ে পৃথিবী থেকে চলে যান। এটা কী মৃত্যুর আগেই প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার মতন কিছু? হতে পারে।

কারণ তিনি তার কাজগুলোকে দেখতেন প্রকৃতির অংশ হিসেবে। বিচ্ছিন্ন সৃষ্টি হিসেবে নয়। তিনি চাইতেন তার কাজগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে, যেভাবে একটা গাছ বড় হয় সেও জলে ভিজবে, রোদে পুড়বে। দিন ও রাত্রির আলো আর ছায়াময় অন্ধকারে মিশে গিয়ে নিত্য নতুন নতুন রূপে দেখা দেবে। সৃষ্টির মালিকানা থাকে। সৃজনের নয়। আমরা নভেরাকে দেখি তিনি চলে যাচ্ছেন নিভৃত থেকে নিভৃতে, তার কাজগুলো পড়ে থাকছে ঘাস, ফুল, লতার মত প্রকৃতির সন্তান হয়ে। গায়ে কালের আঁচড় লাগছে, সমকালীনতার মধ্যে প্রাগৈতিহাসিকতার চিহ্নের মতো।
এভাবে তিনি সময়ের প্রবাহমানতার একটা কালিক সমন্বয় করে গেছেন। সমন্বয় করে গেছেন ভারতীয় ভাস্কর্যকলার দ্বিমাত্রিকতার সাথে ইউরোপীয় ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য চেতনার। আমরা নভেরার ওপর হেনরী মুরের প্রভাব বা পরম্পরার প্রসঙ্গতে আবার ফিরে আসি। নভেরার অনেকগুলো ভাস্কর্যতে- একটা গোলাকৃতির শূন্য ফাকা জায়গা দেখা যায়। এই ধরণটি তার শিক্ষক হেনরী মুরের কাজের একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য। এই মিলের জন্যই নভেরার ওপর হেনরী মুরের প্রভাবের কথা বলা হয়। কিন্তু প্রত্যেক শিল্পীই গুরু শিক্ষাকে প্রয়োগ করেন নিজ চেতনার মধ্য দিয়ে। আমরা যৌক্তিক অনুমান পদ্ধতি ব্যবহার করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারি, নভেরা এই শূন্যতাকে কেন আর কোন অর্থে ব্যবহার করেছিলেন।
নভেরা সবসময় ঐতিহ্যকে মেনে এসেছেন। ভাস্কর হিসেবে নভেরা নিজের দেশে ফিরে এসে নিজেদের আদি বৈশিষ্ট্যকে ভুলে শুধুমাত্র ইউরোপীয় আঙ্গিকে কাজ করতে তার মন সায় দেয়ার কথা নয়। তিনি ভারতীয় ভাস্কর্য চর্চায় দ্বিমাত্রিক আদলের যে ঐতিহ্য তার মধ্যে ত্রিমাত্রিকতার বোধকে যুক্ত করলেন। আর এর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেন এই গোলাকৃতির একটি গহ্বর। যা শূন্যতা থেকে অবয়ব ফুঁড়ে শূন্যতায় বিলীন হয়ে যায়। এটি দ্বিমাত্রিক অভিব্যক্তিতে অন্য একটি মাত্রা যোগ করে। যা পুরো কাজটায় ত্রিমাত্রিক একটা আবহ তৈরি করে। কিন্তু এই ত্রিমাত্রিকতা তৈরিই কি নভেরার কাছে এই শূন্যতা প্রয়োগের একমাত্র কারণ ছিল?
এই আলোচনায় এই গোলাকৃতি গহ্বরটিকে ‘শূন্যতা’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই ‘শূন্যতা’র ব্যবহারের অর্থ অসীমভাবে দেখা যায়। মনো-দৈহিক বা বস্তুগত এবং চেতনাগত বিবেচনায় ‘শূন্য’ ভারতীয় দর্শনে সৃষ্টিতত্ত্বের মূল ভিত্তি। সাংখ্যদের ‘শূন্যবাদ’ আড়াই হাজার বছর আগে ইউরোপে শিক্ষক সক্রেটিসের সমসাময়িক ভারতবর্ষে অবতাররূপী গুরু গৌতম বুদ্ধের দর্শনের মধ্যে বিকাশ লাভ করে। এই দর্শনে- শূন্য হতে সব কিছু শুরু হয়। সমস্ত কিছু যার মধ্যে বিলীন হয়। শূন্যতা আসলে এই জগৎ সংসারের পূর্ণত্ব। ব্রহ্মান্ডের মতো। কোন অবয়ব যখন এই শূন্যতাকে ধারন করে, তখন সে ব্রহ্মান্ডকেই ধারন করে। লোকায়ত আত্মদর্শনে নিজের মধ্যে নিরঞ্জন বা পরমেশ্বরকে আবিষ্কার করাই সজ্ঞানতার পূর্ণ অবস্থা। এ অবস্থায় সমগ্রতাকে ধারণ করে মানুষ নিজেকে দেখতে পায়। সে ত্রিকালবিহারী হয়। এটাই আবহমানতা।
লোকায়ত দর্শন নানাভাবে আলোচনায় বারবার ফিরে আসার কারণটা হচ্ছে, এই দর্শন নভেরা গ্রহণ করেছিলেন। একটি ভাস্কর্যকে ঘিরে বারবার ঘুরতে থাকলে যেমন অন্তহীন অর্থময়তা তৈরি হয়, লোকায়ত দর্শন বুঝতে পারলে নভেরার কাজগুলোর ভেতরের অন্তর্নিহিত অর্থগুলো আমাদের কাছে প্রকাশিত হতে শুরু করবে।
নভেরা যে ভাবনা থেকে শূন্যতা যোগ করেছেন তার কাজেÑ সে ভাবনার মধ্যে কোথাও কি মাতৃত্বের যোগ আছে? এটা কি কোন গর্ভচিহ্ন যেখানে জন্মের অবিরাম খেলা সংগঠিত হয়ে আসছে? নভেরার কিছু কাজে এই শূন্যতা কোন অব্যক্ত চেতনার ধারকের মত দাঁড়িয়ে আছে। মাতৃত্ব নভেরার কাজের ভেতরে প্রকাশিত স্বত্ত্বা যা বারবার ফিরে এসেছে। পরিবারের আবহে, জননীর রূপে, নারীর বেশে এই মাতৃত্বকে আমরা অনুভব করি।
আমরা এই শূন্যতার কথা বলছিলাম ‘পরিবার’ বা দঋধসরষু' নামের একটি ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে। মাটির ধূসর রঙ আর সাদা রঙের ব্যবহারে এই পরিবারটিকে আবিষ্কার করতে গিয়ে আমরা দেখি, কী আশ্চর্যভাবে পরিবারের সদস্যরা একের মধ্যে আরেকজন বিলীন হয়ে এক হয়ে গেছে। যেন একটি দেহ। দুই সন্তানের ছোটটি কোলে, মাথাটা কাঁধে বিন্দুর মত মিশে আছে। আর বড়টি, পরিবারের পা হয়ে বেড়ে উঠছে। পরিবারের চিরন্তন অভিযাত্রায় নিজেকে প্রস্তুত করছে, মাথাটা একটু কাৎ করা, যেন সামনের দিকে দৃষ্টি মেলে আছে। এই ভাস্কর্য’র সবচেয়ে চিন্তনীয় অংশটি হচ্ছে বাবা ও মায়ের উপস্থাপনা। পুরো পরিবারটি একটি দেহকান্ড হিসেবে দেখিয়েছেন নভেরা, এবং তার মধ্যে বাবা ও মাকে প্রতিস্থাপন করেছেন একের মধ্যে আরেকজন হিসেবে। শূন্যতা এবং মাটি রঙকে ব্যবহার করে বাবা ও মায়ের অস্তিত্বকে যেভাবে মূর্ত করেছেন তা আদিম চিরায়ত বন্ধনের আগামী যাত্রার সংকল্প হিসেবে আমরা আবিষ্কার করতে পারি।
তার একটি কম্পোজিশনে এই পরিবার কীভাবে এক এবং একে অন্যের ভেতরে লীন হয়ে আছে, সেই বন্ধনের গতিময়তার মূর্তি আঁকা আছে। সন্তান, বাবা ও মা- প্রত্যেকে প্রত্যেকেকে জড়িয়ে ধরে আছেন। তারা মিলে একটা বৃত্ত রচনা করছেন, আর ঘূর্ণির মতো তা ঘুরতে ঘুরতে এই জগৎ-সংসার পরিভ্রমন করছে। এই ঘূর্ণির ওপরের দিকটিতে বাবা ও মা উন্মিলীত হয়ে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। দৃষ্টি নিচের দিকে, যেন খেয়াল রাখছেন। সেখানে তার সন্তান জগৎ সংসারের এই আশ্চর্য্য খেলায় অবাক-বিহ্বল দাঁড়িয়ে। প্রকৃতির এক অনবদ্য ছবি।
এই আকাশ আসলে চেতনার উর্দ্ধমুখিনতা। জীবনের দিকে দৃষ্টি রেখে। পরিবার নিয়ে তার বেশ কেয়েকটি কম্পোজিশনে একটা উর্দ্ধমুখিনতার ছন্দ দেখতে পাওয়া যায়। বৌদ্ধিক নির্বানের দিকে যাত্রার মতোন। প্রেম, সম্পর্ক- দেশ কালের বাইরে মহাবৈশ্বিক বোধে জীবন্ত। তার নারী এই জীবনবোধে বলিয়ান। একটি কম্পোজিশনে দেখা যায়, মনে হবে দাড়িয়ে আছে, কিন্তু আসলে সে আছে বসে।

তার কাজগুলো যেন একটি কাজেরই প্রকাশ। এটাই শিল্পীর বোধ। তার কাজের সবচেয়ে মজার দিকটি হচ্ছে তার ভারসাম্য। এই ভারসাম্য প্রকৃতির মত সহজ। যে কারণে তার কাজগুলো তার বস্তুর আকারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অসীমকে স্পর্শ করে। হাজার বছরের অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়ে বুদ্ধ মূর্তি হয়ে হাজার বছরের পথে হেঁটে যায়। নভেরার কাজগুলো যেন নভেরার নয়- প্রাগৈতিহাসিক কালে যুথবদ্ধ মানুষের শিল্প চৈতন্যের পরাম্পরা হয়ে বয়ে চলেছে আগামীর পানে- প্রকৃতির মত হয়ে।

শিল্প চৈতন্য। চৈতন্য বলতে আমরা কী বুঝি? সজ্ঞানতা। সজ্ঞানতা হচ্ছে মানুষের অতীত এবং আগামীর মধ্যে মানুষ যে বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে তাকে স্বচ্ছভাবে দেখতে পারা। সজ্ঞানতার মধ্য দিয়ে, মানুষ আপনাকে চিনতে পারে, সে একা নয়। সে প্রকৃতির অবিচ্ছিন্ন প্রবাহমানতার অংশ। শিল্প চৈতন্যের জন্মও এখানে। শিল্পী নিজেকে এই প্রবাহের কোন অংশে নিজেকে কীভাবে দেখতে পাচ্ছেন তা ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে নিজেকে যুক্ত করার প্রয়াসের মধ্যেই শিল্পের জন্ম। তাই একজন শিল্পীর কাজের মধ্যে শিল্পী লুকিয়ে থাকেন। এই শিল্পীকে আমরা যত বুঝতে পারবো তার সৃজন আমাদের সাথে তত কথা বলে উঠবে।
নভেরার কাজের এদেশে বেশিরভাগ কাজেই সিমেন্ট ব্যবহার করেছেন। কাজের প্রক্রিয়ার সাথে সিমেন্টের সাথে আমাদের গৃহস্থালী ঐতিহ্যের মাটি লেপার একটি মিল আছে। নিকোনো একটা অনুভূতি, বাড়ির শীতল মেঝের মত- আপন। নভেরার মা মাটির পুতুল তৈরি করতেন, আমরা এটুকু জেনেছি। আমরা চাইলে অনুভব করতে পারি বালিকার এক জোড়া কৌতূহলী চোখ- মাকে দেখছে। মায়ের হাতের খেলায় তাল তাল মাটি কী সুন্দর অবয়ব পেয়ে যাচ্ছে। কৌতূহলে, সে নিজেও মাটি হাতে নিয়েছে- ছোট ছোট হাতে কাঁদার মত নরম মাটি দিয়ে আকৃতি দিচ্ছে।
যে কোন শিল্প সৃজনের মূল কাজটিই এই আকৃতি দেয়ার মধ্যে। আমার ভাবনাকে আমি আকৃতি দিতে পারি, এই বোধটিই একজনকে শিল্প চেতনার সৃজন প্রয়াসের দিকে নিয়ে যায়। আকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ আকৃতি হলো দেহের মতন। আত্মার প্রকাশ যেমন দেহের মধ্য দিয়ে সঞ্চারিত হয়, আকৃতির মধ্য দিয়েও শিল্পের প্রাণ প্রকাশিত হয়। আমরা সেই সময়টা অনুভব করার চেষ্টা করলে আমরা দেখতে পাবো, একটা শিশু আপন মনে খেলা করতে করতে আকৃতি গড়ছে, ভাঙছে, গড়ছে। যে শিশুর মধ্যে স্রষ্টাকে অনুভব করে কাজী নজরুল ইসলাম লিখে উঠেছিলেন, খেলিছো এক বিরাট শিশু বিশ্ব লয়ে...
নভেরার ভাস্কর হয়ে ওঠায় শৈশবের অভিজ্ঞতা এতটুকু হলেও প্রভাব ফেলেছিল, তা মনোবিজ্ঞানের আলোকে বলা যায়। তার শৈশবের আরেকটি তথ্য আমরা পাই। তিনি নাচতেন। নৃত্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য শরীরের মধ্যে গতি প্রবাহিত হয়। নৃত্যরতা গতিকে যদি হঠাৎ স্থির করে দেয়া হয়, তবে সেই নিশ্চল শরীরের মধ্যেও প্রবাহমান গতি ফুঁটে ওঠে। ভাস্কর্য সৃজনে নিশ্চলতার মধ্যে গতির সঞ্চারে নৃত্যকলার ছন্দের ব্যবহার ভাস্কর্যকলায় সুপ্রাচীন।
হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘নভেরা’ উপন্যাসটিতে নভেরার শিল্পভাবনা যতটুকু উঠে এসেছে তাতে নৃত্য ও ভাস্কর্যকলার নিবিড় সম্পর্কের উল্লেখ আছে। তিনি ঢাকারে পর্ব ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, প্রথমে লাহোর- লাহোর থেকে বোম্বে। বোম্বে গিয়ে তিনি বৈজয়ন্তীমালার কাছে নাচ শিখতে গিয়ে এক দূর্ঘটনায় পড়ে পায়ে আঘাত পান। এই দূর্ঘটনায় তার এক পাও কেটে ফেলতে হয়েছিল, এমন কথাও শোনা যায়। এই বৈজয়ন্তীমালার কাছে নাচ শেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, গল্প ও চিত্রনাট্যকার ইসমত চুগতাই এবং তার স্বামী চিত্র পরিচালক শাহিদ লতিফ। নভেরা যখন তাকে বৈজয়ন্তীমালার কাছে নাচ শেখার জন্য নিয়ে যেতে বলেছিলেন তখন ইসমত চুগতাই খুব অবাক হয়েছিলেন। ভাস্কর্য’র সাথে নাচের কী সম্পর্ক তিনি বুঝতে পারছেন না। উপন্যাসের ভাষা থেকে, “নাচের অঙ্গভঙ্গি ফ্রিজ করে দিলেই চমৎকার স্কাল্পচার সৃষ্টি হতে পারে। হাতের মুদ্রা, চোখের চাউনি, পায়ের বিস্তার সবকিছুই স্কাল্পচারের থিম। অজন্তায় আছে, ইলোরায় আছে, খাজুরাহোর মন্দিরে আছে। ভারতীয় ভাস্কর্য ঐতিহ্যে নর্তকীর রূপায়ণ খুব জনপ্রিয়।”

নভেরার নাচ শিখতে গিয়ে দূর্ঘটনার পর বোম্বে থেকে আবার লাহোর চলে যান। তারপর আবার ইউরোপ। ইউরোপ এমন কোন দূরের নয়, কিন্তু নভেরার ইউরোপ যেন আলোকবর্ষ দূরের গল্প। এ দূরত্ব সম্পর্ক থেকে। প্রেম থেকে।
কিন্ত তার এই চলে যাওয়াটা কেন? একটা আবছা দুঃখের কাহিনী আমরা জানতে পারি। একটা অসুখ হয়েছিল নভেরার। এ অসুখের কারণে তার মা হওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আমরা কি কল্পনা করতে পারি, যিনি মাতৃত্বের রূপকে ধরার চেষ্টা করেছেন, জীবন প্রবাহ একটি ছন্দোময় পরিবারের মধ্য দিয়ে অবলোকন করেছেন- তিনিই মা হতে পারবেন না!
একি তার সেই অন্য বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যাওয়া অন্য আরেক বাস্তবতার গল্প?
কিন্তু তিনি কোথায় গিয়েছিলেন পালিয়ে? কেমন ছিল সেই বাস্তবতা?
মানুষ শৈশবকে চিরটাকাল বহন করে। সেই শৈশবে তার সব ছেড়ে চলে নতুন পৃথিবীতে আসা যায়, সে অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা কি তাকে এভাবে হারিয়ে যাওয়ার পথে নিয়ে গিয়েছিল?
নভেরা সাহসী ছিলেন। তিনি বাস্তবতা সৃজন করতেন। সেই নারীর মতো যে উঠে দাঁড়ায়। নভেরার একটি ভাস্কর্য্য আছে। ‘দাঁড়িয়ে থাকা নারী (ঝঞঅঘউওঘএ ডঙগঅঘ)’ সিরিজের আরেকটি কাজে দেখা যাচ্ছে গলাটি স্বাভাবিকের চাইতে উঁচু। মনের ভেতরের নিজেকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা শরীরে চলে এসেছে। তার আরেকটি কাজ আছে এই সিরিজেরই। সাদা সিমেন্টের কাজটিতে মায়ের আঁচলের মত ধরিত্রী সন্তানকে আঁচলে জড়িয়ে রেখেছে। সে আঁচলটাই যেন একটা জীবনতরী, মহা জগৎ পাড়ি দিয়ে অনন্তের পানে তাদের নিয়ে ছুটে চলেছে। সে নৌকোর ওপওে তিনটি তিনটি অবয়ব দাঁড়িয়ে। আর কেউ যদি আঁচলটির মধ্যে মাতৃত্বের রূপকে খুঁজে পান, খুব দোষ দেয়া যাবে না।
এই যে দাঁড়ানো- কেমনভাবে দাঁড়ানো?
একি নতুন বাস্তবতা তৈরির গল্প? যেখানে জৈবিক মাতৃত্ব থেকে অন্য এক ধ্যানমগ্ন প্রাকৃতিক মাতৃত্বে পৌঁছোনোর পথ খুলে যায়। মুক্তির আলোর মতো। ঝঞঅঘউওঘএ ঋঊগঅখঊ নামে সাদা সিমেন্টের নারীটার দিকে আমরা যদি ভাল করে তাকাই, দেখবো অবয়বহীন একটা শরীর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে, ধ্যানমগ্ন। যেন মুক্তির প্রার্থনায় প্রকৃতির সাথে বিলীন হতে চাইছে। যা তার জীবনকে চিহ্নিত করে।
হয়তো এরকম নয়, কিন্তু আমরা যদি প্রশ্ন করতে শিখি, বারবার নানাভাবে, একটি ভাস্কর্য’র চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে অবিরাম অর্থ খোঁজার মত, এর অন্তর্নিহিত রূপগুলো আমাদের সামনে নানা অর্থ নিয়ে উঠে আসবে। আর তখনই আমরা নভেরাকে আবিষ্কার করবো, ঐতিহ্যের অবিরাম উৎস হিসেবে- আগামীর জন্য।


মন্তব্য

হাসিব এর ছবি

বাংলার প্রথম মুসলমান নারী ভাস্কর হিসেবে তা খুবই অপ্রতুল

ভাস্কর্য মানে কি স্কাল্পচার? সেটা হলে প্রথম মুসলমান ভাস্কর নভেরা নন। ছোট মাটির পুতুল নভেরার মাও বানাতেন।

এটি মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক অভিবাসন। শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এর চাইতে বড় অভিবাসনের দেখা মেলে।

দ্বিতীয় বাক্যটা প্রথম বাক্যকে খারিজ করে কিন্তু।

অন্যদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে খন্ড খন্ড যতটুকু তথ্য পাওয়া যায় তা খন্ডিত এবং ব্যক্তিগত বোধে সীমাবদ্ধ। সমস্ত কিছুর মতো, নভেরা আহমেদের জন্ম নিয়েও মতান্তর আছে। একটি ভাষ্য অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৩৫ সালে, পিতৃ-আলয়ে, চট্টগ্রামে। এবং অন্য ভাষ্য মতে তার জন্ম চট্টগ্রামে নয়, বাবার চাকুরীরর সূত্রে কলকাতায়, ১৯৩৯ সালে।
...

বালিকা নভেরারও এই অভিবাসনের অভিজ্ঞতা হলো, নিজের জীবনে।

প্রথম অংশটি পড়ে মনে হচ্ছে নভেরার জন্ম কোথায় তা নিয়ে মতবিরোধ আছে। পরে পড়ে বুঝতে পারলাম নভেরা কলকাতায় বেড়ে উঠছিলেন। চট্টগ্রাম যদি জন্মস্থান হয় তাহলে কিন্তু নভেরা অভিবাসিত এরকমটা বলা যায় না।

পরিবার, দাঁড়িয়ে থাকা নারী এগুলোর ছবি যোগ করে দিতে পারলে খুব ভাল হয়।

ভারতীয় ভাস্কর্য ঐতিহ্যে এই ত্রিমাত্রিকতা অনুপস্থিত।

আমি এই অংশটা বুঝতে পারিনি। ভাস্কর্য যদি স্কাল্পচার হয় তাহলে আমার সীমিত জ্ঞান বলে ভাস্কর্য আর চিত্রকলার মধ্যে পার্থক্য মাত্রায়। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে ভাস্কর্য হচ্ছে বলেই জানতাম। এর সবচেয়ে বড় সংগ্রহ বরেন্দ্র মিউজিয়াম। আমি কোথায় বুঝতে ভুল করছি?

এই দর্শনে মানুষ কিছু সৃষ্টি করতে পারে না।

এটা কিন্তু খুব গুরুতর স্টেটমেন্ট হল হাসি

সোহেল ইমাম এর ছবি

শিল্পী নভেরার কিছু শিল্পকর্মের ছবি সংযুক্ত হলে খুব ভালো হতো। পড়তে পড়তে শিল্পকর্ম গুলো এক পলক দেখার জন্য মন ছটফট করছিল।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA