হুমায়ূন আহমেদের চোখ- ১

কর্ণজয় এর ছবি
লিখেছেন কর্ণজয় (তারিখ: শনি, ০৭/০৭/২০১৮ - ১২:৩৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


আজব নাম্বারের ফোন কল

অবিশ্বাস্য। কিন্তু অবিশ্বাস্য অনেক কিছুই এই পৃথিবীতে ঘটে। প্রথমবার এরকম কোন কিছু ঘটলে বিশ্বাস হতে চায় না। মনে হয় বোধ হয় ভুল দেখেছি। দ্বিতীয়বার অবাক লাগে। তারপরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমার অবস্থাও তাই। আমি এখন জানি যারা মারা গিয়েছেন তাঁরা আসলে কেউ চলে যান নি। ভূত হয়ে তাঁরা আছেন। কেউ কেউ তাঁদের দেখা পায়। শূধু তাই নয়। যারা এখনও জন্ম নেয় নিÑ জন্ম নেবে বলে অপেক্ষা করছে, তাঁরাও আছে। এরা হলো ভবিষ্য। কিন্তু এই ভবিষ্যদের দেখা পায় খুব কম মানুষ। কারণটা মায়া। মানুষ মায়ায় বন্দী। মায়া আমাদের পেছনে টানে। এই জন্য আমরা ভূত বেশি দেখি। খুব কম মানুষই আছেন যারা আগামীর কথা ভাবেন। যেমন বিজ্ঞানীরা। ভবিষ্যদের সাথে তাঁদের সবচেয়ে বেশি ওঠাবসা। রাজনীতিবিদরাও কেউ কেউ তাঁদের দেখা পান। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের সাথে ভবিষ্যদের যোগাযোগ ছিল, এটা আমি নিজে জানি।
এটুকু শুনেই আপনারা কী ভাবছেন, সেটা আমি খুব বুঝতে পারছি। পাগল। অথবা উন্মাদ। অথবা কবি আর গপ্পবাজদের বানানো গল্প। তবে এটাও জানি, সবাই নয়। আপনি আর আপনার মতো দু একজন ঠিকই আছেন। যারা কথাগুলো শুনলে একটু ভাববেন। মনে মনে নিজের সাথে মিলিয়ে নেবেন । কারণ আমিই একা নই। এই সত্য আপনাদের কেউ কেউ ঠিকই জানেন। আর আমি এটাও জানিÑ আপনাদের যারা এখন কথাগুলো অবিশ্বাস করছেন তাদের কারও কারও আমার কথাগুলো মনে পড়বে। সবাই নয়, কেউ কেউ। হঠাৎ একদিন ০০০০০০০ নাম্বার থেকে তারা একটা ফোন পাবেন। যিনি ফোনটা করবেন, তিনি আপনাকে একটা চিনে রেস্তরার যাওয়ার কথা বলবেন। আর ফোনটা রেখে চোখ তুললেই দেখতে পাবেন, আপনার উল্টোদিকেই একটা অবাক চিনে রেস্তরা দাঁড়িয়ে আছে। আপনাকে ডাকছে। ঠিক তখনই আপনার আমার কথা মনে পড়ে যাবে। মনে হবে ... কথাগুলো তাহলে মিথ্যে ছিল না।


অবাক চিনে রেস্তরা

আমারও শুরু হয়েছিল সাতটা ‘শূন্য’ নাম্বারের ফোনকল দিয়েই। তখন ভর দুপুরবেলা। একটুও ছায়া নেই কোথাও। আমি হেঁেট হেঁটে যাচ্ছি। নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই। যেতে যেতে কোথাও যাওয়া হয়ে যাবে। এমন সময় ফোনটা আসলো। অপরিচিত গলা। শুরুতেই তিনি জানতে চাইলেন, আমার হাতে সময় আছে কি না। এই পৃথিবীতে এই একটা জিনিষই আমার আছে। সময়। আর কিছুই নেই। এক বাক্স সময় নিয়েই জন্মেছি আমি। বাক্সেও সময়টা আছে এখনও। ফুরিয়ে গেলে চলে যাবো। জানালাম তাঁকে। তিনি তক্ষুনি চিনে রেস্তোরায় আসতে বললেন। জানালেন, তিনি সেখানেই আমার জন্য অপেক্ষা করবেন।
চিনে রেস্তোরার কথা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেল। পৃথিবীর সেরা খাওয়ার জায়গা মনে হয় চিনে রেস্তোরাগুলোকে। অন্ধকার অন্ধকার। ঠা-া ঠা-া। টমিয়াম স্যূপ, ফ্রাইড রাইস, ভেজা ভেজা আঁধা-কাাঁচা ভেজিটেবল, ফ্রায়েড রাইস। মজার। আর অনেকক্ষণ ধরে অনেক খাওয়া যায়। খাওয়ার পরে শরীর ভারি হয়ে আসে না।
কিন্তু কোন চিনে রেস্তোরা, সেটাইতো তিনি বললেন না। ভাবলাম- জিজ্ঞেস করে নেই। ফোন করতে গিয়েই প্রথম হোঁচট খেলাম। ফোনের কললিষ্টে শেষ নাম্বারটা দেখাচ্ছে সাতটা ‘০’। ০০০০০০০। সাতটা শূন্য কোনো ফোন নাম্বার হতে পারে না। নিজের পরিচয় গোপন করে ফোন করার জন্য অনেক ফন্দি আছে। তখন নাম্বারের জাগায় এমন সব গোলমেলে জিনিস এসে বসে থাকে। এরকম একটা কিছু হবে। চিনে রেস্তরার জন্য একটু হতাশ লাগলো।
নিশ্চয়ই কেউ মজা করেছে। কাজ হবে না জেনেও ঐ নাম্বারে ফোন করে দেখলাম। যা ভেবেছিলাম। কোন আওয়াজ নেই। ওটা কোন নাম্বারই না। ঠিক তখুনি প্রথম অবাক করা ব্যাপারটা ঘটলো।
রান্তার ওপাশে ছবির মত সুন্দর একটা পুরনো ধাঁচের ছিমছাম দোতালা বাড়ি চোখে পড়লো। ফুলে ছেয়ে আছে। চারদিকে সবুজ গাছগুলো প্রচীরের মত দাঁড়িয়ে আছে। রাজার মাথায় মুকুটের মত ছাদে একটা সাইনবোর্ড শোভা পাচ্ছে। সেখানে লেখাÑ
চিনে রেস্তোরা
আসুন
সত্যি অবাক হলাম। এই রাস্তাটা আমার খুব চেনা। প্রায়ই এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসা করতে হয়। এরকম একটা বাড়ি থাকলে আমার চোখে পড়তোই। বুঝতে বাড়িটার দিকে বোকার মত তাকিয়ে থাকি। যদিও এই শহর প্রতিদিন চোখের ওপর দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। কাল যেখানে পুকুর ছিল, আজকে সেখানে বারো তালা বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। সকাল বেলায় মাঠ বিকেল বেলায় মার্কেট হয়ে ডাকছে। কোন জায়গা দেখে দুদিন আগেও এখানে কী ছিল আর কী ছিল না তা কল্পনা করা কঠিন। যাকগে। নিজের বেখেয়ালী মনের ওপর দোষ চাপিয়ে রোস্তোরার ভেতরে ঢুকলাম।
এবার আরও অবাক হলাম।
এত অবাক হলাম যে আমার আর কিছু মনেই থাকলো না।
এটা কি রেস্তরা!!!


সমুদ্রে রহস্যময়

আমি সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে। গোল একটা চাঁদ উঠেছে আকাশে। সমুদ্রের ঢেউগুলোর মাথায় তার আলো পড়েছে। যেন জরির ওড়না দুলিয়ে নাচছে। দূরে বরফ পাহাড়। রূপোর মত ঝকঝক করছে। পুরো আকাশ জুড়ে তারারা জ্বলছে। মেঘের দলগুলো উড়ে যাচ্ছে। হুহু বাতাস । স্বপ্নের মতোন। সাথে সাথে বুঝতে পারলাম, এটা বাস্তব নয়। আমি আসলে স্বপ্ন দেখছি। খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন।
এত সুন্দর আমি আগে কখনো দেখিনি। জীবনেতো নয়ই, স্বপ্নেও না। চারপাশটা মনে হচ্ছিলোÑ গিলে খাই। এত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, খেয়ালই করিনি, দূর থেকে কেউ একজন ইশারা করে ডাকছেন। লোকটার মাথায় হ্যাট, গায়ে লং কোট। সাথে সাথে ফোনটার কথা মনে পড়লো। বুঝতে পারি, স্বপ্নের ভেতরেও একটা ঘটণা ঘটছে। আমি তার কাছে গেলাম।
সমুদ্রের পাড়ে একটা টেবিল। টেবিলের ওপর লালচে টমিয়াম স্যূপে ভরা একটা বড় বাটি। টলটল করছো। মাত্র দিয়ে গেছে বোধহয়। ধোঁয়া উড়ছে এখনও। আর একটা কোকাকোলার বোতল। যেন একটা মেয়ে। খয়েরী শাড়ি পড়ে হাসছে। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। টমিয়াম স্যূপ আমার খুব প্রিয়। টমিয়্যাম স্যূপটা খেতে গেলেই এখন স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। স্বপ্নে সবসময় এমনটাই ঘটে। আনন্দটা যখন চূড়ান্ত মুহূর্তেÑ ধপাস করে ঘুম ভেঙে যায়।
কোকাকোলার বোতলটা আমার দিকে তাকিয়ে আবার হাসে। একবার ভাবি, দেবো না কি, স্বপ্নটা শেষ করে? কোকাকোলা মুখে ঢাললেই স্বপ্নটা চুরচুর করে ভেঙে যাবে। ভাবি। কিন্তু করি না। ভদ্রলোক স্যূপটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি না না করে উঠি। বাস্তবের মতোই। আপনি নিন। আর মনে মনে স্বপ্ন ভাঙার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।
“আমি এসব এখন আর খাই না।” শুনে তার দিকে তাকালাম। চারদিক তাকালাম। সমুদ্র। বরফ পাহাড়। আবার নিশ্চিত হলাম। স্বপ্ন দেখছি। “স্যূপটা তোমার জন্যই। শুরু করো। ফ্রাইড রাইস, ভেজিটেবল আর চিকেন আসছে।” ভদ্রলোকের ফোন পাওয়ার পর যে খাবারগুলোর কথা মনে হয়েছিল ঠিক সেই সেই খাবারগুলো। ওগুলো অবশ্য শেষপর্যণÍ আসবে না। স্যূপটা মুখে নেয়া মাত্রই স্বপ্ন ভেঙে যাবে।
কিন্তু এরকম কিছু ঘটলো না। আমি স্যূপটা মুখে নিলাম। টমিয়াম স্যূপ আমার প্রিয়। খুব প্রিয়। ঢাকা শহরের যতগুলো চাইনিজ রেস্তোরায় টমিয়াম স্যূপ পাওয়া যায় তা ঘুরে ঘুরে খাওয়া আমার নেশার মতোন। কিন্তু এরকম আশ্চর্য্য মজার টমিয়াম আমি কখনও খাইনি। আর স্বাদটা এত জীবন্ত, একবার সন্দেহ হলো, এটা স্বপ্ন নয়। সত্যি। আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম।
এমনিতেই রাতের অন্ধকার। তার ওপর ভদ্রলোকের মুখটা হ্যাটের নিচে অর্ধেক ঢাকা পড়েছে। তারপরও বুঝতে পারলাম, অচেনা মানুষ। অবশ্য ঠিক নেই, একটু পরেই দেখবো খুব চেনা কেউ। স্বপ্নের মধ্যে এরকম হয়। চেনা লোকও অচেনা মানুষের মতো কথা বলে। অচেনাদেরও খুব আপন মনে হয়। ভদ্রলোক মাথার হ্যাট খুলতে খুলতে বললেন,
‘তুমি, ঠিক কতটুকু সময় বর্তমানে থাকো?’
এটা খুব জটিল প্রশ্ন। আমরা আসলেই ঠিক কতটুকু বর্তমানে থাকি? সব সময় কোন না কোন ভাবনায় ঢুকে পড়ি। হয়ত স্মৃতির মধ্যে। না হয় ভবিষ্যত ভাবনার মধ্যে। না হয় কল্পনা, ইচ্ছে, চিন্তা আর কামনার মধ্যে। সত্যি, খুব কমই আমরা বর্তমানে থাকি। খুবই কম। ১% এর ভগ্নাংশও হবে না। শুধু শরীরটা মোচড় দিলেই আমরা বর্তমানে থাকি। এখন আমার শরীর কথা বলছে। গলাটা শুকিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে এক ঢোকে কোকাকোলাটা গিলে ফেলি। আমি কোকাকোলা গলায় ঢাললাম। স্বপ্নটা ভাঙার কথা ছিল। কিন্তু ভাঙলো না। শক্তিশালী স্বপ্ন। ততক্ষনে তিনি হ্যাটটা খুলে ফেলেছেন। চাঁদের আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম।


শূন্য হূমায়ূন

হুমায়ূন আহমেদ।
তখন যদি জানতাম এটা সত্যি, তাহলে ভয়ে হাত পা হিম হয়ে আসতো। কিন্তু তখনও আমি ভাবছিলাম এটা স্বপ্ন। তাই ভয় পেলাম না। বরং মজাই লাগলো। তাঁকে যেদিন কবর দেয়া হয় সেদিনের দৃশ্যগুলো চোখে ভেসে উঠলো। অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটেছিল সেদিন।
সারাজীবন দেখেছি শোকের রঙ কালো। সাদা তাকে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের জন্য শোকগুলো সেদিন হলুদ রঙে সেজেছিল। যেন উৎসব। সেই উৎসবের আমেজটা আর একটু বেড়ে গেলো। আমি স্বপ্ন ভালবাসি। কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন দেখছি বুঝতে পারার পরও স্বপ্ন দেখতে থাকাটা একদম অন্যরকম। যাকে বলে সেই রকম। দারুণ।
“আমি সেই লেখক হুমায়ূন আহমেদ নই। কিন্তু সেই লেখক হুমায়ূন আহ্মেদ একদিন আমি ছিলাম।”
আমার এবার সত্যিই মজা লাগে। হুমায়ূন আহমেদ নন। তার ভূত আমার সামনে বসে আছেন। আমি ভূত বিষয়টা আসলে কী, সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারলাম বলে মনে হলো।
ভূত হলো বড় হয়ে যাওয়ার মতো। আমি একদিন এইটে পড়তাম। সেই আমি আর এই এখনকার আমি এক নই। ক্লাস এইটের আমি ভূত হয়ে গেছি। কিন্তু আমি এখনও আছি। বুড়ো হলে যেই আমি হবো, সেই আমি আর এই আমি এক নই। কিন্তু আমি। আর যেদিন মারা যাবো, সেদিনও এই আমি থাকবো না। কিন্তু আমি থেকে যাবো। তাকেই আমরা ভূত বলি। এই যে যেমন এখনÑ হুমায়ূন আহমেদের ভূতের সাথে আমি স্বপ্নের মধ্যে কথা বলছি। ঠিক তখনই হঠাৎ মনে হলোÑ যদি এটা স্বপ্ন না হয়। যদি এটা সত্যি হয়!
মনে হতেই হাত পা ঠা-া হয়ে আসলো। সত্যিকারের ভূতের ভয়। আমার মনে হলো, আমি ভূতের সামনে বসে আছি।
“ তুমি ভবিষ্যরও দেখা পাবে।” হুমায়ূন আহমেদের ভূত বলে উঠলেন, “যারা এসেছিল তাঁদের মতোই আগামীতে জন্মাবে এমন মানুষেরাও কিন্তু আছে। ওরাই ভবিষ্য। শুধু মানুষ কেন সবকিছুই। একই সাথে ছিল, আছে, থাকবে। আর এই সব আমরা মিলে একটা শূন্য।”
‘আমরা’ শব্দের অনেক গুণ। ভয় কাটিয়ে দেয়। আমারও ভয়টা কেটে গেল। ভয়ের জায়গায় অবাক হওয়ার বিষয়টা চলে আসলো। কিন্তু শূন্যর বিষয়টা মাথায় ঢুকলো না। শূন্য মানে নেই। নেই জিনিষ আছেÑ তা কী করে হয়?
“শূন্য! ”
“আমিও শূন্য। তুমিও শূন্য।”
“আমিও শূন্য!”
“সকলেই। যা দেখছো। শুধু মানুষই না। গোটা ব্রহ্মান্ডটাই।”
“তাহলে কিছুই নেই?”
“সবই আছে। সবই শূন্যের এক একটা প্রকাশ। এক একটা এক্সপেরিয়েন্স। এই এক্সপেরিয়েন্সের টোটাল রেজাল্ট হচ্ছে শূন্য। সকল অভিজ্ঞতার সমষ্টি। একটা অভিজ্ঞান।’
ভাল করে বুঝতে পারছিলাম না বিষয়টা। শুধু বুঝতে পারলাম মৃত্যুর পরের মতো জন্মের আগেরও একটা বিষয় আছে। কিন্তু দুটোই আমার অজানা। আমার না বোঝাটা বোধহয় হুমায়ূন আহমেদ বুঝতে পারলেন। প্রসঙ্গটা থেকে সরে এসে বললেনÑ
“আচ্ছা সে যাক। আমরা সবাই একদিন সবই জেনে যাবো। এখন কাজের কথায় আসি।”


ডায়েরী লেখকের খোঁজে

কাজ! কোন কাজই আমি ঠিকমত পারি না। অনেক কাজই করতে গিয়েছিলাম জীবনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনটাতেই মন বসাতে পারিনি। একদিন আমি আর সুমী লেকের ধারে হাঁটছিলাম। সুমীর মুখটা লাল হয়ে আছে। রাগলে ওর মুখটা লাল হয়ে যায়। কোন কথা বলে না। আমি ওর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করি। যদিও জানি কোন লাভ হবে না। কমপক্ষে তিনদিন রাগ থাকবে। এই তিনদিন আমাকে ক্রমাগত ওর রাগ কমানোর চেষ্টা করে যেতে হবে। তিনদিন পর অদ্ভুত কোনো বায়না ধরবে। একবার বায়না ধরেছিল, শাপলা ফুলের একটা মালা বানিয়ে দিলে তারপর আমার সাথে কথা বলবে। আর সেই শাপলা অন্য কেউ তুললে হবে না। আমাকেই তুলতে হবে। সমস্যাটা এখানেই। আমি সাঁত্ার পারি না। অন্য কাউকে দিয়ে যে শাপলা তুলে নিজের কথা বলবো, সে উপায় নেই। চোখের দিকে তাকিয়ে ঠিক বুঝে ফেলবে। কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে শাপলা তুলতে বের হয়েছিলাম। এই শহরে কোন পুকুর নেই, যেখানে শাপলা ফুঁটবে। শহর ছাড়িয়ে অনেকদূর গিয়ে একটা গ্রাম। সেই গ্রাম থেকে অনেক কষ্টে শাপলা তুলে মালা বানিয়ে ওর জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন ওর রাগ কমেছিল।
তবে সেবারের রাগটা অন্যবারের মত ছিল না। তার বাসায় বিয়ের কথা চলছে। এখন আমি কী করবো, ও জানতে চাইলো।
‘ঠিক করেছি, দেখে দেখেই জীবনটা কাটিয়ে দেবো। কিছু করার চেষ্টা করবো না।’ আমি বিষয়টাকে হালকা করতে চাইলাম।
ও হালকা হলো না। আরো গম্ভীর হয়ে গেল। আমি আড়চোখে ওর দিকে তাকালাম। মনে হলো, এই রাগটা সাত দিনের হবে। এই সাত দিন ও নিজের মধ্যে থাকবে। কিন্তু অবাক করে দিয়ে ও আমার হাত ধরলো। তারপর টেনে নিয়ে একটা বটগাছের নিচে নিয়ে গেলো।
বাটগাছের নিচে একটা সাদা কাপড় বিছিয়ে এক জ্যোতিষি বসে আছেন। গাছের ওপর থেকে লাল রঙের একটা ব্যানার ঝুলছে। ব্যানারে লেখা, ‘জ্যোতিষরতœ মহারাজ- স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। হাত দেখে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত বলে দেয়া হয়।’ সুমী গিয়ে আমার হাতটা জ্যোতিষির দিকে বাড়িয়ে দিলো। আমার হাত দেখতে এক সেকেন্ডের বেশি লাগলো না। এক নজর বুলিয়েই হাতটা ফিরিয়ে সুমীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘ফলাফলশূন্য অতীত, বেকার বর্তমান আর আশাহীন ভবিষ্যত।’
এরপর সুমী আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে একা একাই রিকশা নিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় শান্ত গলায় বললো, এবার আর তিনদিন আর সাতদিনের বিষয় নেই। তুমি কাজ জোটাবে, তারপর আমার সাথে যোগাযোগ করবে। কাল হলে কাল। আর তা না হলে, এই তোমার সাথে শেষ কথা।
কাজ জোটানো আমার পক্ষে সম্ভব না। তাও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম। রাগ করলেও অন্য সময় যোগাযোগ করলে ও সাড়া দেয়। রাগী সাড়া। কিন্তু এবার সেটাও দিচ্ছে না। খুব চিন্তায় আছি। কাজ জোগাড় করা আমার মত মানুষের জন্য্য সত্যি খুব কঠিন। এই নিয়ে একটু দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি। বুঝতে পারলাম, এই স্বপ্নটা আসলে সেই দুশ্চিন্তারই ফল। স্বপ্নের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ আমাকে বাঁচাতে কাজ নিয়ে এসেছেন।
“কী কাজ?” দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞাসা করলাম।
হুমায়ূন আহ্মেদ আমার দিকে তাকালেন। মনে হলো আমার ভেতরটা দেখছেন। এমন অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। আমার কেমন জানি পুতুল পুতুল মনে হলো নিজেকে।
“কাজটার জন্য তোমাকে কেন ডাকলাম, জানো?”
“না। কেনা?”
“দুটো কারণে। প্রথম কারণ হলোÑ তুমি আমার ভক্ত নও।”
আমার একটু লজ্জ্বা লজ্বা লাগলো। আসলেই আমি তাঁর ভক্ত নই। সুমী তাঁর ভক্ত। আমি ভক্ত না হলেওÑ তার যতগুলো বই পড়েছি আর কোন লেখকের তার চার ভাগের একভাগও পড়িনি। পড়লেও বইগুলো পড়েছি বলে মনে হয়নি। মনে হয়েছে, সময় কাটিয়েছি। সময় কাটানোর জন্য আসলেই তাঁর বইয়ের মত কোন ওষুধ নেই। তাঁর সব বইগুলোই এক রকম লাগে। ঘুমের ওষুধের মত। চারপাশটা হারিয়ে যায়। সবকিছু ছবির মতো হতে শুরু করে। ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যাই। বইটা রেখে দিলেই ঘোরটা ভেঙে যায়। তারপর সব ভুলে যাই। আর কিছু মনে থাকে না। যেন পড়িইনি। এরকম লেখা আমার ভাল লাগেনা। বই হবে ল্যাম্পপোস্টের মতো। অন্ধকার সরিয়ে পৃথিবীর পথে ডাকবে। জীবনের জটিল অলিগলিগুলো তুলে ধরবে। সেই পথে হেঁটে গিয়ে জীবনকে দেখতে বলবে।
কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তা নন। তার বইগুলো আমাদের মনকে উসকে দেয় না। তৃপ্ত করে। জিজ্ঞাসাকে জাগিয়ে তোলে না। ঘুম পাড়িয়ে দেয়। বই হলো এক একটা চোখের মতো। মানুষ একটা বই পড়বে আর একটা চোখ তৈরি হবে। যত বই পড়বে তত চোখ তৈরি হবে। অনেক চোখ দিয়ে জীবনকে দেখতে পারবে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের বইগুলো কোন চোখ তৈরি করে না। আমি দেখেছি, হুমায়ূন আহমেদের ভক্তরা অন্য কারও বই পড়ে না। কষ্ট হয়। একটা শিশু বড় হয়। জীবনকে দেখতে শেখে। কিন্তু কোন শিশু যদি না বাড়ে? একটা বয়সে আঁটকে যায়? তাহলে কী হয়? হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের আমার সেরকম লাগে। হুমায়ূন আহমেদের যারা ভক্ত, তারা আর বড় হয় না। একটা জায়গায় আঁটকে থাকে। অন্য কারও বই পড়ে না। জটিল লাগে। বাচ্চারা যেমন বড়দের বই পড়তে গেলে কিছু বোঝে না, সেরকম। সত্যি বলতে কী, এজন্য হুমায়ূন আহমেদকে অপছন্দই করিÑ
এ কথাটা তিনি জানেন! ভেবে খুব লজ্জ্বা পেলাম। মনে হলো ভেতর থেকে কেউ সুড়সুড়ি দিচ্ছে। অস্বোস্তি হলে এরকম হয়। ভাবছিলাম না বলে উঠে পড়ি। কিন্তু এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি হাসতে লাগলেন, আমিও হেসে ফেললাম। অপরাধ স্বীকারের হাসি। তার কাছে অস্বীকারের কোন উপায় নেই।
“দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে তুমি একজন লেখক।”
এবার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এটা ভুল। আমাকে ডাকাত বললেও এতটা ভুল হতো না। অনেকবারই ডাকাতির কথা ভেবেছি। আমি প্রায়ই ইংল্যান্ডের রাণীর মুকুট থেকে কোহিনুর হীরা লুঠ করার কথা ভাবি। দস্যূ রবিন হুডের দলে নাম লেখানোর কথা ছোটবেলায় ভেবেছি অনেকবার। একবার ব্যাংক ডাকাতির কথাও ভেবেছিলাম। কিন্তু লেখক হওয়ার কথা কখনও মনেও আসেনি। এমনকী ছোট-বড় কোন লেখকের সাথে পরিচয়ও নেই। কাঁচা বয়সে প্রথম প্রেমে পড়ে প্রায় সবাই দু একটা কবিতা লিখে ফেলে। আমি সেই চেষ্টাটাও করি নি কোনদিন।
হুমায়ূন আহমেদ আমার দিকে তাকালেন। স্থির মায়াবী একজোড়া চোখ। একটা প্রচ্ছন্ন কৌতূক সেখানে খেলা করছে।
“দেখ, তুমি যা ভাবছো তা ঠিক নয়। তুমি একজন লেখক। বেশ ভাল একজন ডায়েরী লেখক।”
ডায়েরী লেখক! শুনে কী বলবো বুঝতে পারি না। কিছু কিছু হাসি আছে কান্নার মত। আমার ভেতরে ভেতরে ওরকম একটা হাসি পায়। ‘ডায়েরী লেখক... আমি একজন ভাল ডায়েরী লেখক...’ এটা যে একটা পরিচয় হতে পারে স্বপ্নের মধ্যেও এটা কল্পনা করি নি কখনও।
এটা ঠিক, আমি প্রতিদিন ডায়েরী লিখি। কিন্তু আমার ডায়েরী লেখার কথা কেউ জানে না। ওটা আমি আমার জন্যই লিখি। দাদু মরে যাওয়ার আগে আমাকে ডেকে তিনটা মোটা চামড়ার বাঁধাই করা খাতা দিয়েছিলেন। ওগুলো ছিল দাদুর ডায়েরী। ডায়েরীটা দেয়ার সময় কতগুলো কথা বলেছিলেনÑ
“পৃথিবীতে দুই রকমের মানুষ আছে। একদল ডায়েরী লেখে। আরেকদল লেখে না। যারা ডায়েরী লেখে তাদের শেষ বিচারের দিনে বিচার হবে না। কারণ বিচার হচ্ছে কোন কাজকে পুনরায় দেখা। যে ব্যক্তি সৎভাবে নিজের জন্য ডায়েরী লেখে সে প্রতিদিন নিজের কাজকে আবার দেখে। সে প্রতিদিনই নিজের কাজের মুখোমুখি হয়। এটাই বিচার। তার আর বিচারের দরকার নেই।”
দাদু মারা যাওয়ার পর আমি ডায়েরী লেখা শুরু করি। ডায়েরী লিখতে গিয়ে দেখলাম, বিষয়টা খুব মজার। নিজের ফেলে আসা সময়গুলো সিনেমার মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, কিছুই হারায়নি। সেই শুরু। এক যুগের চেয়ে বেশি হয়ে গেলো। এই এতগুলো বছরে এমন একদিনও নেই, যেদিন আমি ডায়েরী লিখিনি। এটা এখন অনেকটা অভ্যাসের মতো হয়ে গিয়েছে। দাঁত ব্রাশ না করলে যেমন অস্বোস্তি হয়, ডায়েরী না লিখলে আমার সেরকম হয়। একবার কয়েকদিনের জন্য পাহাড়ের একদম গহীন হারিয়ে গিয়েছিলাম। অনেক ভেতরে। সভ্যতার চিহ্ন নেই কোথাও। এদিকে ডায়েরীর পাতা আর কলমের কালি শেষ। লেখার কোন উপায়ই নেই। শেষ পর্যন্ত একটা চোখা পাথর হাতে তুলে নেই। পাথুরে পাহাড়ের গায়ে সেই পাথর ঠুকে ঠুকে দেখি অক্ষরের মত ফুটে উঠছে। গুহা মানবের মত লাগছিল নিজেকে। পাক্কা তিন ঘন্টা লেগেছিল মাত্র দুটো লাইন লিখতে। যতদিন ছিলাম এভাবেই লিখে গিয়েছি। কিন্তু তাই বলেÑ ‘ডায়েরী লেখক’! ‘ডায়েরী লেখক’ শব্দটা আবার মাথায় ধাক্কা দেয়। আমি একজন ডায়েরী লেখক!
“কাজটার জন্য ডায়েরী লেখার অভ্যাসটাই সবচেয়ে জরুরি। বলতে পারো একমাত্র।”
কী কাজে ডায়েরী লেখাটা কাজে আসতে পারে, ভাবতে গিয়ে খুঁজে পাই না। বিখ্যাত হয়ে গেলে আলাদা কথা। তখন তার পায়ের ধূলোও অনেক দামী। বড় বড় সাইনবোর্ডে লেখা থাকবে, এইখানে বিখ্যাত অমুক এই খানে পদধূলি দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি বিখ্যাততো দূরের কথা, অখ্যাতও নই। আমি হলাম, নেই গোত্রের মানুষ। আমার পক্ষে কিছু হওয়াও সম্ভব না। হুমায়ূন আহমেদ যতই শূন্য শূন্য করুন, যা নেই তা দিয়ে কিছু হয় না।
এদিকে চশমা খুলে ফেলেছেন হুমায়ূন আহমেদ। মুখের হাসিহাসি ভাবটা চলে গেছে। সিরিয়াস একটা ভাব তাঁর মুখে ফুটে উঠেছে।
“ তুমি তোমার মতই থাকবে। প্রতিদিন যা করো তাইই করবে। শুধুÑ” বলে তিনি চুপ করে গেলেন।
মনে হলো ঘুমটা এখনই ভেঙে যাবে। তারপর আমি দেখবো সকাল হয়ে গেছে। না কি সন্ধ্যা? আমি ভাবার চেষ্টা করি, আমি কি দিনে স্বপ্ন দেখছি? নাকি রাতে?


চোখ বদল

“ শুধু তুমি তোমার চোখদুটো তুলেÑ” হুমায়ূন আহমেদ এমন গলায় বলতে শুরু করেন, আমি ভুলে যাই এটা স্বপ্ন। গা ছমছম করে ওঠে। “সে জায়গায় আমার চোখদুটো বসিয়ে দেবো।”
হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো- এই যা ঘটছে- এটা হুমায়ূন আহমেদের কোন বই নাতো। বইয়ের মধ্যে ডুবে গেছি। চারদিকে চরিত্ররা হাঁটাহাটি করছে। তার বই পড়লে এরকম হয়।
“এই চল্লিশ দিন তুমি তোমার চোখে আমার চোখ পরে থাকবে। আমি যে চোখ দিয়ে দেখতাম সেই চোখে দেখবে। এরপর তোমার চোখ দিয়ে আমার চোখদুটো নিয়ে যাবো। কেন এটা করছি, সেটা বলি। তাহলে আরও ভাল করে বুঝতে পারবে। ডায়েরীর লেখাটা আসলে নিজের জন্য। অন্য কারও কথা ভেবে লিখলে সেটা আর ডায়েরী থাকে না। ওটা স্মৃতিকথা হয়ে যায়। তুমি ডায়েরীই লিখবে। আমার চোখ দিয়ে দেখা তোমার নিজের কথা। এই চল্লিশ দিনের ডায়েরীটা আমি পড়বো। আমি পড়লে, অন্য কারও পড়া হবে না। কারণ, আমিতো আর মানুষই নই...”
বলতে বলতে হুমায়ূন আহমেদ আমার কাঁধে হাত রাখলেন। মনে হলো হাতটা প্রবাহমান হিমেল হাওয়ার মত। ঠা-া। আমি চমকে উঠলাম। তিনি মাথা ঝুকিয়ে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। স্বপ্ন জেনেও ভয় করতে লাগলো। “চল্লিশ দিনের জন্য। তোমার চোখের জায়গায় আমার চোখ। এখন তুমি যদি রাজী হও তোমার চোখ দুটো তুলে আমার চোখদুটো লাগিয়ে দেবো।নেবে আমার চোখ দুটো?”
তাঁর চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। তিনি আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। আর আমি বোকার মত বসে থাকি। কী বলবো বুঝতে পারি না। তিনি আবার অবস্থা দেখে একটা কোকের বোতল এগিয়ে দিলেন।
“কোকটা খাও।”
ঠান্ডা একটা বোতল। গায়ে শিশির বিন্দুর মত পানি জমে আছে। বোতলটা দেখামাত্র প্রাণ ফিরে পেলাম। ভেতরটা পিপাসায় ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল টেরই পাই নি। গলার ভেতর বরফ ঠান্ডা কোক ঢালতে ঢালতে হটাৎ বুঝতে পারলাম লোকটাকে আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। এবং আমার ভয়টা কেটে যাচ্ছে।
“না জানার মধ্যে ভয়, আকর্ষন সবকিছু। জেনে ফেললে ভয়টাও থাকে না। আকর্ষনটাও থাকে না। এ জন্য আমরা মৃত্যুকে ভয় করি। তাহলে কাজটা করছো। তাই না?”
“জ্বী”
তিনি তার চোখের মধ্যে হাত দিয়ে চোখের মণিদুটো বের করে আনলেন।
“এই চোখ জোড়া দেখÑ” বলতে বলতে তিনি হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর হাতের দিকে তাকাই। জ্যান্ত দুটো চোখ। টলটলে। যেন হাসছে। কথা বলছে। হুমায়ূন আহমেদ আরেক হাত দিয়ে আমার চোখ দুটো চেপে ধরলেন। একটা তীব্র শীত আমার কোটর বেয়ে শরীরের ভেতরে হারিয়ে গেল। একটা তীব্র আলো জ্বলে অন্ধকার ঘনিয়ে আসলো। যেন প্রচ- এক মহা বিস্ফোরণে সবকিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। তখন মনে হলো, এখনই ঘুমটা ভেঙে যাবে। স্বপ্নগুলো সাধারণত এভাবেই শেষ হয়...
কিন্তু এটা স্বপ্ন ছিল না। তিনি আরেক হাতে তাঁর চোখ দুটো আমার চোখের জায়গায় বসিয়ে দিলেন। অন্ধকার একটু একটু কাটতে শুরু করলো। আমি দেখতে শুরু করলাম। এই দেখাটা আমার চোখে দেখা নয়। হুমায়ূন আহমেদের চোখে দেখা। একটা অদ্ভুত অনুভূতি। সামনে অসীম সমুদ্র। দূরে বরফ পাহাড়। আকাশে চেয়ে দেখলাম, হাজার হাজার তারা। উজ্বল চাঁদ। আর সামনে হুমায়ূন আহমেদ বসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। তার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব চেনা মনে হলো তাঁকে। আমিও হাসলাম।
“এই চল্লিশদিনÑ সাতটা শূন্য নাম্বারে ডায়াল করলেই চোখের সামনে এই রেস্তোরা হাজির হয়ে যাবে। দিন-রাত যখন খুশি। আর রেস্তোরাটা যে শুধু এখন যেমন দেখছো এমনই থাকবে তা কিন্তু নয়। তুমি যেমন চাইবে এই রেস্তোরাটা তেমন করেই সাজানো থাকবে। আর খাওয়ার বাইরে চাইলে তুমি এখানেÑ আমার মতো ভূত আর ভবিষ্যদের সাথে কথা বলতে পারো। ঐ যে দেখোÑ” হুমায়ূন আহমেদের একদিকে ইশারা করলেন। তাকিয়ে দেখি একটা নৌকা সমুদ্রের তীরে ভিড়েছে। নৌকা থেকে দুজন সৈকতে লাফিয়ে নামলো।
“চিনতে পারো?”
একজনকে কোথাও দেখেছি দেখেছি লাগে। কিন্তু কোথায় মনে করতে পারি না।
“শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আর সাথের জনকে দেখো...”
ঠিকই। শরৎবাবু। অবাক হয়ে দেখি। কিন্তু অন্যজনকে কখনওই দেখিনি। নিশ্চয় বিখ্যাত কেউ হবেন। না হলে হুমায়ূন আহমেদ এভাবে বলতেন না। “চিনতে পারছি না।” বলি আমি।
“তুমি যদি ২৩৫০ সালের মানুষ হতে তাহলে চিনতে পারতে। উনি একজন ভবিষ্য। ২৩৪৫ সালে প্রথমবারের জন্য স্বপ্ন দেখাতে তিনি নোবেল পাবেন।”

আমি অবাক হয়ে দুজনকে দেখি। একজন ভূত। আরেকজন ভবিষ্য। হাঠাৎ দেখি শরৎচন্দ্রের ভূত আমাকে ডাকছেন। কী করবো বুঝতে পারি না। হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি শরৎচন্দ্রকে ইশারা করছেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। আমাকে নয়, হুমায়ূন আমদেকে ডাকছেন। হুমায়ূন আহমেদ উঠে দাঁড়ান।
“আমি উঠছি এখন। চল্লিশ দিন পর তোমার সাথে দেখা হবে। এই রেস্তোরা এ কদিন তোমার জন্য খোলা।”
শরৎচন্দ্র আর ভবিষ্যকে সাথে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ অন্ধকারের মত মিলিয়ে গেলেন। যতক্ষন তাাঁদের দেখা গেল তাকিয়ে দেখলাম। তারপর টেবিলে চোখ রেখে দেখি, ভেজিটেবল, ফ্রাইড রাইস আর চিকেন ফ্রাই। আমার দিকে চেয়ে আছে। এত মজা। আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম। এত খেলাম এত খেলাম যে বলার মতো নয়। যখন উঠে দাঁড়ালাম পেটে এক ফোঁটা জায়গাও নেই। দরজাটা কোথায়? ভাবতেই দেখি শূন্যের মধ্যে একটা দরজার মত। বুঝতে পারলাম, এখানে সব মনের ইশারায় চলে। বের হতেই দেখি সেই ঝকঝকে রোদ। চেনা রাস্তা। সেই রেস্তোরার কোন চিহ্নই নেই।
নিশ্চয় স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু খাওয়ার তৃপ্তিটা পুরো শরীর মন জুড়ে। স্বপ্নে এমন হওয়ার কথা নয়। স্বপ্নে পেট পুরে খেলেও জেগে উঠে ক্ষিধে লাগে। তাহলে। মনে হলো, ০০০০০০০ নাম্বরে ফোন করলে রেস্তোরাটা চোখের সামনে হাজির হয়ে যাওয়ার কথা। জানি আসবে না। তাও ফোনটা করলাম। সাথে সাথেই রাস্তার উল্টো দিকে একটা রেস্তোরা চোখে পড়লো। আগেরটার মতোই। শুধু এটা কাঠের তৈরি। আর বাগানটা একটু আলাদা। তার মানে এটা স্বপ্ন নয়। সত্যি।
অথবা তখনও স্বপ্ন দেখছি।

(আমরা একেকজন একেকভাবে জীবনকে দেখি। এই দেখার চোখটা আলাদা বলেই আমরা সবাই আলাদা আলাদা। নিজের নিজের মতন। আমরা সবাই এই নিজের নিজের দেখার ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবন ও জগতকে সাজাই। একজন মানুষ কীভাবে তার চারপাশের নানা ঘটণা আর অনুসঙ্গকে দেখছে সেটা জানা গেলে তার অনেকখানি চেনা যায়। আমরা এজন্যই সবচেয়ে ভালভাবে চিনি বন্ধুদের। কারণ, আমরা কীভাবে চারপাশকে দেখি সেটা সবচেয়ে বেশি বন্ধুদের সাথেই ভাগ করি। অন্যরা সেটার নাগাল সহজে পায় না।
একজন লেখকের সবচেয়ে ভাল বন্ধু তার কলম আর কাগজ। অথবা কম্পিউটার। আরও ভালভাবে বললে তার লেখা। এই লেখার মধ্য দিয়ে একজন লেখক তার জীবন আর জগতকে কীভাবে দেখলেন, সেই গল্প আমাদের নানাভাবে বলে যান। সেজন্য অনেক লেখকই মনে করেন, একজন লেখক সারাজীবন ধরে একটি বইই লেখার চেষ্টা করেন। আর সেটা হলো, তার জীবন।
এজন্যই অনেকে আমরা গল্পের মধ্যে লেখকের জীবনকে খুঁজি। ব্যক্তিগত জীবনের ঘটণা কতটুকু আমরা লেখকের গল্প থেকে আমরা খুঁজে পাই, সেটা নিয়ে অবশ্য সন্দেহ থেকে যায়। কিন্তু তিনি জগত আর জীবনকে কীভাবে দেখেছেন- সেই চোখের সন্ধান আমরা একজন লেখকের লেখা থেকে আমরা পেয়েই যাই। আমাদের কোন লেখা যখন ভাল লাগে, তখন লেখাটার মধ্যে লেখকের দেখাটাকেই দেখতে পাই। আর আমাদের দেখার মধ্যে সেই দেখাটাও চলে আসে। আমাদের চোখে তার চোখ যোগ হয়। এভাবেই আমরা বড় হই। অন্যের দেখা থেকে আমরা শিখি। আমাদের নতুন দেখার চোখ তৈরি হয়। এজন্য একটা বই মানুষকে যেভাবে প্রভাবিত করে, আর কোন কিছুই তা করে না। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর উদাহরণ। কাজী নজরুল ইসলাম এর উদাহরন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও তার উদাহরন। তাঁরা তাদের সময় পেরিয়ে এখনও আমাদের দেখার দৃষ্টি তৈরি করে চলেছেন।
লেখক হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে দেখতেন, তার দেখার চোখ আমাদের চোখে কোন আলো বা অন্ধকার ফেলেছে, এই গল্পÑ গল্পের ছলে সেটাকেই খুঁজে বেড়ানো... )


মন্তব্য

কর্ণজয় এর ছবি

এই লেখাটা অনেক আগে .. ৫-৬ বছর আগে বা তারও আগে, এখানেই লিখেছিলাম। নতুন করে আবার লিখতে শুরু করেছি... তাই নতুন করে আবার..

আয়নামতি এর ছবি

অন্যরকম লাগছে গল্পটা। প্রথম পাতা থেকে এ পর্বটা দ্রুত সরে গিয়ে পরের পর্ব আসুক।

সোহেল ইমাম এর ছবি

পড়লাম। পরের পর্বের অপেক্ষা এখন। চলুক

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA