মুড়ি - মুড়কি - খৈ - চিড়া

আবু রেজা এর ছবি
লিখেছেন আবু রেজা [অতিথি] (তারিখ: রবি, ১৯/১০/২০০৮ - ১০:০৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আম-কাঁঠালের দেশ, মুড়ি-মুড়কির দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এদেশে আম-কাঁঠালের চাষ করার প্রয়োজন হয় না। আপনজালা গাছ বড় হয়। ফলবতী হয়। ফল দেয়। লাগে না সেচ, সার। বিনা যত্নআত্তিতে, এমন কি জঙ্গলা ঝোপঝাড়েও আম-কাঁঠালের গাছ জন্মে। মাটি থেকে খাদ্যরস নেয়। বৃষ্টি দেয় সেচ। বেড়ে ওঠে গাছে।

পুরো দেশ জুড়েই যেন আম-কাঁঠালের এক বিশাল বাগান। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে আম-কাঁঠাল পাকে। পাকা আম-কাঁঠালের গন্ধে সুবাসিত থাকে পুরো দেশ।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের এই মওসুমে আম-কাঁঠাল, খুশি মতো, যেখাবে ইচ্ছে খাওয়া যায়। কিন্তু অনেক আগে থেকেই আম-কাঁঠাল খাওয়ার সঙ্গে মুড়ির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এটা আমাদের লোক ঐতিহ্য। এই দিনে গেরস্থ বাড়ি কেউ বেড়াতে এলেই আম-কাঁঠাল দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। সঙ্গে থাকে মুড়ি। মুড়ির সঙ্গে কাঁঠাল, মুড়ি-কাঁঠাল; খৈয়ের সঙ্গে আম, খৈ-আম। এর সঙ্গে দুধ-দই। আম-কাঁঠাল, মুড়ি-চিড়া-খৈ, দুধ-দই এক সঙ্গে খেতে দেওয়া হয়।

আম-কাঁঠাল ছাড়াও মুড়ি-চিড়া-খৈ খাওয়া হয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে। প্রথমেই বলি মুড়ির কথা। মুড়ি-চানাচুর, কাঁচা মরিচ-পিঁয়াজ দিয়ে মেখে, ছোলার সাথে মুড়ি-পিঁয়াজ, ঘি-চিনি দিয়ে মুড়ি কিংবা মুড়ির সঙ্গে কোড়ানো নারকেল-চিনি দিয়ে মেখে খাওয়া হয়। অনেক সময় বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে তেল-মরিচ-পিঁয়াজ দিয়ে ভেজে খাওয়া হয় মুড়ি। অনেকের প্রিয় খাবার গুড়-মুড়ি। চাষী ভাইয়ের সকাল-বিকালের নাস্তা গুড়-মুড়ি। অনেকে আবার তরকারি দিযে মুড়ি খেতে পছন্দ করেন। যেমন: গরুর মাংস দিয়ে মুড়ি কিংবা লাউ তরকারি বা মাষ ডালের সঙ্গে মুড়ি খাওয়া। তবে মুড়ি দিয়ে যে একটি মজার খাবার তৈরি হয়, সে কথাই বলা হয় নি। সেটা হলো মুড়ির মোয়া। হালকা আঁচে গুড় গলিয়ে তাতে ছেড়ে দেওয়া হয় মুড়ি। মুড়ি পাকানো হয়ে গেলে দুই হাতের তালুতে চেপে চেপে গোলাকার করে মোয়া তৈরি করা হয়।

চিড়া ভাজা ভারি মজা। বৃষ্টির দিনে চিড়া ভেজে চানাচুরের সঙ্গে কাঁচামরিচ-পিঁয়াজ-তেল দিয়ে মেখে খেতে বেশ ভালোই লাগে। চিড়া দিয়েও মুড়ির মোয়ার মতো মজাদার মোয়া তৈরি হয়। চিড়ার আবার ঔষধিগুণও আছে। পেটের পীড়া যেমন- ডায়রিয়া, আমাশয় হলে, চিড়া ভিজিয়ে চটকে খাওয়ালে কিংবা চিড়া ভিজানো পানি খাওয়ালে আরাম হয়। নানি-দাদিরা বলেন, চটকানো লেবু-দই-চিড়া আমাশয়ের মহৌষধ। দুধ-চিড়া, দুধ-কলা-চিড়া মজাদার খাবার। লোক ঐতিহ্য অনুযায়ী অনেক জায়গায় দই-চিড়া নতুন জামাইয়ের সকালের নাস্তা।

আমরা সবাই নিশ্চয়ই খৈ খেয়েছি। আগুনের আঁচে তাতানো গুড়ে খৈ পাক দিয়ে এক ধরনের মিষ্টি জাতীয় খাবার তৈরি করা হয়। অনেকে একে মুড়কি বলে। দুধের সঙ্গে খৈ শুধু মজাদারই নয় শরীরের জন্য উপকারীরও বটে। দুধ-খৈ খুবই সহজপাচ্য। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে কিংবা হজম শক্তি কম তাদের জন্য দুধ-খৈ খুবই আরামদায়ক। দুধ-খৈ একসঙ্গে অনেক খাওয়া যায়। কমে পেট পুরে না। সহজে হজম হয়। এজন্য অনেকে একে লোক ঠকানো খাবারও বলে থাকে।

একটি কথা না বললেই নয়, আগে ছিল শুধুই কৃষি সমাজ; মানুষ কৃষির ওপরই নির্ভর করত, বাণিজ্য তখনো প্রসার লাভ করে নি। মানুষ তখন প্রয়োজনীয় চিড়া-মুড়ি-খৈ নিজ ঘরে তৈরি করত। কিন্তু এখন চিড়া-মুড়ি-খৈ বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হয়। এ কাজ করে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করে।

গেরস্থ বউ কীভাবে চিড়া-মুড়ি-খৈ তৈরি করে আসছে, সে কথাই বলি।

চিড়া-মুড়ি-খৈ তৈরি করতে দরকার হয় ধান-চালের। চিড়া তৈরির জন্য আতপ ধান এক দিন ভিজিয়ে রাখতে হয়। এরপর বাঁশের সাজি বা ধামায় সেই ভিজিয়ে রাখা ধানের পানি ঝরাতে হয়। পানি ছাঁকা হলে পর সেই ধান মাটির পাতিলে ভাজতে হয়। প্রয়োজন মতো ভাজা হলে ঢেঁকি কিংবা কাহাইল ছিয়াতে (কোনো কোনো এলাকায় বলে গাহাইল ছিয়া) পাড় দিতে হয়। ঢেঁকির পাড়ে ধান প্রথমে জটা বাঁধে, পরে ঝুরঝুর হয়ে যায়। পাড় কম হলে ধান ক্যাবড়া ধরে যায়। পাড় দিতে দিতে ধান থেকে খোসা খসে যায়। চালের অংশ চিড়ায় পরিণত হয়। কুলায় ঝেড়ে চিড়া-তুষ আলাদা করা হয়। এই তুষ আবার জ্বালানিরূপে ব্যবহার করা হয়। শালিধান, কাটারীভোগ ধানে চিড়া ভালো হয়।

খৈ তৈরির জন্য আতপ ধান বেশ কয়েকদিন কড়া রোদে শুকাতে হয়। উনুনে মাটির হাঁড়ির মধ্যে (হাঁড়ির এক পাশে গোলাকার করে কেটে আরেকটি মুখ তৈরি করতে হয়) বালিতে কড়া আগুনের আঁচ দিতে হয়। বালি তেতে উঠলে তাতে পরিমাণ মতো শুকানো ধান দিয়ে ছাপির (বাঁশের তৈরি এক ধরনের নাডুনি) সাহায্যে নাড়তে হয়। নাড়তে নাড়তে ধান খৈয়ে পরিণত হয়। খৈ হয়ে গেলে তা দ্রুত নামিয়ে নিতে হয় নতুবা পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এরপর খৈয়ের সঙ্গে লেগে থাকা ধানের খোসা বাঁশের ছাঁকনিতে ছেঁকে আলাদা করা হয়। প্রয়োজনীয় ঝাড়াঝাড়ির কাজ শেষে তা সংরক্ষণ করা হয়। কালিজিরা, বিন্নী, বেতী, পারঙ্গী ধানে ভালো খৈ হয়। ঢ্যাঁপ থেকেও খৈ হয়। কিন্তু ঢ্যাঁপ আবার কী? শাপলার বৃন্তই ঢ্যাঁপ। ঢ্যাঁপ ফাটালে সরষে দানার মতো দানা পাওয়া যায়। এ থেকেও খৈ হয়। ইদানিং ভুট্টা দিয়েও এক ধরনের খৈ তৈরি হচ্ছে। একে বলে ভুট্টার খৈ।

চিড়া আর খৈ যেমন সরাসরি ধান থেকে হয় মুড়ি কিন্তু সেভাবে হয় না। মুড়ি তৈরির জন্য ধান ছেঁটে চাল করে নিতে হয়। অবশ্য তারও আবার বিশেষ পদ্ধতি আছে। মুড়ির জন্য আতপ ধান দুই-আড়াই দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। ভিজানো ধান সিদ্ধ করতে হয় এমনভাবে যাতে কটকটে শুকনো না হয়, একটু আধশুকনো থাকে। শুকনো ধান ঢেঁকিতে ছেঁটে চাল তৈরি করতে হয়। চাল ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হয় যাতে চালের সঙ্গে কুঁড়া না থাকে। দুই মুখো উনুনের একটিতে বড় মাটির হাঁড়িতে রাখা বালিতে আঁচ দিতে হবে; অন্যটিতে মাটির পাতিলে চাল ভাজতে হবে। চালের সঙ্গে লবণ-পানি মেশাতে হবে। চাল ঘন ঘন নাড়তে হবে।

চালের রঙ লালচে হয়ে উঠলে আঁচ কমিয়ে দিতে হবে। পাশের হাঁড়ির বালি প্রয়োজন মতো গরম হলো কি না তা পরখ করে দেখতে হবে। পরখ করার জন্য একটি বাঁশের নল তাতানো বালিতে চেপে ধরতে হয়। যদি দেখা যায় বাঁশের নলের আগায় আগুন লাগার মতো অবস্থা হয়েছে বা ধোঁয়া উঠেছে, তবে বুঝতে হবে বালি প্রয়োজন মতো গরম হয়েছে। তখন চালগুলো বালিতে ঢেলে দিতে হবে এবং মোটা কাপড় বা চট দিয়ে বালির পাতিল আঁটসাঁট করে চেপে ধরে এপাশ ওপাশ করে ঘোরাতে হবে। এতে বালির আঁচে চাল ফুটে মুড়ি তৈরি হবে। বালিসহ মুড়ি মাটির ঝাঁজরে ঢেলে কলাপাতার ডগা দিয়ে নাড়তে হবে। এতে মুড়ি থেকে বালি আলাদা হয়ে নিচের ছাঁকনিতে পড়ে যাবে, মুড়ি থেকে যাবে ঝাঁজরে। মুড়ি আবার বাঁশের চালুনিতে ঢেলে, ঝেড়ে-মুছে টিনে রেখে দিলে বাতাসে নষ্ট হয় না। ঘিগজ, লোহাসূরা, চাক্কল, বেতী, পাইজাম, বিজমালী, তুলসীমালা ইত্যাদি ধানে মুড়ি ভালো হয়।


মন্তব্য

আলমগীর এর ছবি

অনেক পুরনো কথা মনে করিয়ে দিলেন রে ভাই।
ভাল লাগল লেখাটা।

আবু রেজা এর ছবি

ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।

যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গ বাণী
সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।

শেখ জলিল এর ছবি

এই সিরিজের প্রতিটি লেখাই আমার প্রিয়। স্যালুট জানাই লোকজ ঐতিহ্যের লেখককে।

যতবার তাকে পাই মৃত্যুর শীতল ঢেউ এসে থামে বুকে
আমার জীবন নিয়ে সে থাকে আনন্দ ও স্পর্শের সুখে!

আবু রেজা এর ছবি

আপনাকেও স্যালুট জানাই। ধন্যবাদ।

যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গ বাণী
সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।

রাফি এর ছবি

শুভ ফিরাগমন আবু রেজা ভাই।
লেখা সুন্দর হয়েছে।

---------------------------------------
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মতন ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!

---------------------------------------
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মতন ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!

আবু রেজা এর ছবি

আমি তো আছিই, মাঝে কিছু বিরতি ছিল মাত্র।
অনেক দিন পর আপনার মন্তব্য দেখে ভালো লাগল।
ধন্যবাদ।
---------------------------------------------------
যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গ বাণী
সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।

যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গ বাণী
সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।

তীরন্দাজ এর ছবি

জিবে জল এসে গেল! বিদেশে বসে সব খাওয়া না হলেও মুড়ি চানাচুর মিশিয়ে খাই। না হলে একেবারেই চলে না।
**********************************
কৌনিক দুরত্ব মাপে পৌরাণিক ঘোড়া!

**********************************
যাহা বলিব, সত্য বলিব

আবু রেজা এর ছবি

সজল ধন্যবাদ ও সজল শুভেচ্ছা।
মুড়ি-চানাচুরের দাওয়াত রইল।
----------------------------------------------------
যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গ বাণী
সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।

যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গ বাণী
সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।