মানুষের মুক্তিকামিতার (আধুনিক বিরোধিতার) একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি
লিখেছেন ধ্রুব বর্ণন (তারিখ: সোম, ২৬/১২/২০১১ - ৫:৫৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অনেক আগে একবার হিটলারকে নিয়ে লেখার অনুরোধ পেয়েছিলাম। তখন না লিখলেও সম্প্রতি মুক্তমতের বিপক্ষে প্রচারণা দেখে দুর্ভাবনায় পড়ে ব্যাপারটা আবার মনে পড়ে গেলো। ঠিক হিটলারকে নিয়ে না হলেও নাৎসিবাদের দার্শনিক ভিত্তি এবং মানুষের মুক্তমতের বিরোধী অন্যান্য দর্শন নিয়ে সংক্ষেপে একটু আলোচনার চেষ্টা করা গেলো।

যখন ওরা কম্যুনিস্টদের ধরে নিয়ে গেলো,
আমি কিছু বলি নি, কারণ আমি কম্যুনিস্ট নই।

এরপর ওরা ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের ধরে নিয়ে গেলো,
আমি তখনও কিছু বলি নি, কারণ আমি ট্রেড ইউনিয়নিস্ট নই।

এরপর তারা এলো ইহুদিদের ধরে নিয়ে যেতে।
আমি তাদের হয়ে লড়লাম না, কারণ আমি তো ইহুদি নই।

একদিন ওরা এলো আমাকে নিয়ে যেতে।
কিন্তু আমার হয়ে লড়বে এমন কেউ আর তখন বাকি নেই।

বহুবার ব্যবহার হওয়া এই উক্তিটির জনক জার্মান মার্টিন নিমোলার এমনই কাছাকাছি কিছু একটা বলেছিলেন নিস্ক্রিয়তার বিপদকে তুলে ধরবার জন্যে। একজন খ্রিস্টান যাজক হিসেবে তিনি ছিলেন ধর্মহীন-কম্যুনিস্টদের বিরোধী। ফলে হিটলারের নাৎসিত্ব যখন কম্যুনিস্ট নিধনে ব্যস্ত, তিনি তখন সোৎসাহে বলেছিলেন -

Who cared about them? … We thought: Communists, those opponents of religion, those enemies of Christians …

তিনি অবশ্য ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের কথা বলেছিলেন কিনা, সে নিয়ে তর্ক আছে। নাৎসি পতনের পর ১৯৪৬ এ দেয়া ওনার ভাষণ ঘাটলে দেখা যায়, উনি সে জায়গায় বলেছিলেন নাৎসিদের দ্বারা প্রতিবন্ধী, বিকলাঙ্গ ও পঙ্গু নিধনের কথা। এরপর নাৎসিদের ইহুদি নিধনযজ্ঞ শুরু হয়। নিমোলার নিজের গর্দানের ভয়ে চুপ ছিলেন। টনক নড়লো যখন নাৎসিরা ওনার চার্চের ওপরেও শেষে গিয়ে চড়াও হলো। অসহায়বোধ করলেন। নাৎসিত্বের প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তিনি গ্রেপ্তার হলেন, “নাৎসি আন্দোলনের ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহিতবোধ না করা”র অপরাধে। যুদ্ধ শেষে তাই তিনি স্মরণ করিয়ে দেন ওনার স্বজাতিকে, মানুষের নিস্ক্রিয়তা কী নারকীয় তাণ্ডবের জন্ম দিতে পারে। নিস্ক্রিয়তা কতোটা আত্মঘাতী।

একটা সর্বগ্রাসী মতবাদ একদিনে জন্ম নেয় না। ধীরে ধীরে সে বেড়ে ওঠে। চূড়ান্তরূপটি প্রকাশ পাবার আগেই অনেক আলামত দেখায় সে। তার দার্শনিক ইমাম থাকে, যে সজ্ঞানে বা তার নানান চিন্তাশীলতার দ্বারা অজান্তেই একটি ভয়ানক মতবাদের ভিত্তি তৈরি করে। থাকে সেই ইমামের অনুসারী, যারা মতবাদকে দার্শনিকতা থেকে রাজনৈতিকতা দান করে। করণীয় ও ঔচিত্যের পলেমিক্স উৎপাদন করে। আদর্শ পলেমিসিস্টদের মতোই সেই ইমামতিবান্ধব বুদ্ধিজীবীরা তাদের প্রতিপক্ষকে প্রতিক্রিয়াশীলতার শক্তি দ্বারা ঘায়েল করতে চায় - ধর্মদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী, ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করে। তাদের ঘাড়ে ভর করে ক্ষমতালিপ্সু কোনো নেতা তখন তার সর্বোচ্চ বিস্তারের লক্ষ্যে সেই করণীয়কে প্রকৃত কর্মে পরিণত করার চেষ্টা চালায়। ক্যারিশম্যাটিক নেতা আর তুখোড় তার্কিক বুদ্ধিজীবীদের এই সমন্বয় তৈরি করে গণ সমর্থন। আর সাথে আম জনতার বড় অংশের নিস্ক্রিয়তাও আবশ্যিক। এই অপূর্ব পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে মতবাদটি ক্ষমতার আসনে নিজের জায়গা করে নেয়। একবার ক্ষমতা কুক্ষিগত হবার পর শুরু হয় তার ধ্বংসযজ্ঞ। ঘটে মানবতার বিপর্যয়।


ছবি: নাস্তিবাদ ও অস্তিত্ববাদের অন্যতম পুরোধা - ফ্রিডরিখ নিৎশে

উনবিংশ শতকের বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাশীলতার অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে বিবর্তনবাদের আগমনে। মানুষকে এক চেতনাহীন, নিয়তির ফল - পশু কল্পনা না করা তখন কঠিন হয়ে পড়ে। নাস্তিবাদ তথা মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা, মূল্যবোধের অর্থহীনতাকে বিবর্তনবাদ তথ্য প্রমাণসহ যেভাবে শক্তিশালী করেছে, তেমনটা অন্য কোনো কিছু করে নি। ফ্রিডরিখ নিৎশে দেখতে পেলেন, ঈশ্বর তার তাবৎ পবিত্রতা ও শক্তিমত্তা সমেত মৃত, জীবনের কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই, একমাত্র লক্ষ্য যদি কিছু বলা যায়, সেটা হলো টিকে থাকার সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম সহিংস, ভয়ঙ্কর। এর মাঝে উৎকৃষ্টরাই টিকে থাকবে। সংগ্রামই কেবল উত্তরণের পথ। তাই তিনি বলেন -

Not contentment, but more power; not peace at any price, but war; not virtue, but efficiency.

The weak and the botched shall perish: first principle of our charity. And one should help them to it.

বিবর্তন তথা প্রকৃতির ঘটনাকে ঔচিত্যের সাথে মিলিয়ে ফেলা ন্যাচারলিস্টিক ফ্যালাসির সরল ফাঁদে তিনি পা দেন:

I call an animal, a species, an individual corrupt, when it loses its instincts, when it chooses, when it prefers, what is injurious to it. A history of the "higher feelings," the "ideals of humanity" -- and it is possible that I'll have to write it -- would almost explain why man is so degenerate. Life itself appears to me as an instinct for growth, for survival, for the accumulation of forces, for power: whenever the will to power fails there is disaster.

তিনি দেখতে পেলেন এই সংগ্রামে শ্বেতকায়, সোনালি চুল ও নীল চোখের আর্য, জার্মানরা এগিয়ে আর কৃষ্ণকায় আফ্রিকানরা বিবর্তনের ধারায়, সংগ্রামের ধারায় এখনও যেন বানরদের কাতারে। জার্মানির তৎকালীন চলমান সামরিকতাবাদ ও আগ্রাসনের দর্শনকে নিৎশের এই সহিংস জীবনদর্শন পরিপুষ্ট করে। পরবর্তীতে গঠিত উগ্র জাতীয়তাবাদী নাৎসিবাদের দর্শনকে যদি পেঁয়াজের খোসার মতো ছাড়ানো যায়, তাহলে ভেতরে নিৎশের এই দর্শনের চেতনাকেই খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের কাছে ব্যক্তির নিজস্ব ভাবদর্শন, জীবনলক্ষ্য, মহত্ববোধ, ঔদার্য্য তুচ্ছ। উদ্দেশ্যের প্রকৃত যাচাই তাদের কাছে সংঘাতে। তারা প্রকৃতিতে রাষ্ট্রবাদী। ব্যক্তি তাই রাষ্ট্র দ্বারা নির্ধারণ করে দেয়া জাতিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য। ব্যক্তির করণীয় জাতিগত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত। এর বাইরে অন্যান্য আদর্শ হলো উৎকর্ষের পথে দুর্বলপনার আমদানি, এবং তাই তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া কর্তব্য (... shall perish ... and one should help them to it)।

নিৎশে অস্তিত্ববাদেরও জনক ছিলেন। মনে করতেন, একজন একক ব্যক্তির জীবনের অর্থ নির্ধারণের ও তা একাগ্রতার সাথে যাপনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব কেবল তার নিজের। যার যেমন বোধ ও রুচি। ব্যক্তির এককত্ব ও সার্বভৌমত্বের এই ধারণাকে উদারতাবাদীরা সাদরে গ্রহণ করে নিলো ব্যক্তি স্বাধীনতার দর্শনকে দৃঢ় করতে। কিন্তু যাদের তিনি নবী হলেন, সেই নাৎসিরা একে অস্বীকার করলো। নাৎসিদের কাছে উদারতাবাদ হাসাহাসির পাত্র। তারা ও ফ্যাসিবাদীরা উদারতাবাদের কট্টোর বিরোধী ছিলো। ব্যক্তির স্বাধীনতা, মুক্তি এসব আবার কী বস্তু? এতে জাতির বিবর্তনের ও উৎকর্ষের কী লক্ষ্য অর্জিত হয়? জাতিগত সংগ্রামের বোধ সেখানে কোথায়? তাদের কাছে উদারতাবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতাবোধ আরেকটা অচ্ছুৎপনা ঠেকে। সংগ্রামের মাঠে হীনবল হিসেবে ধ্বংসই ব্যক্তিগত আদর্শের উচিত পরিণতি বলে তারা মনে করে।


ছবি: সাম্যবাদের পুরোধা কার্ল মার্ক্স

ঠিক একই সময় বিবর্তনকে আরেক মতবাদে নিজের মতো কাজে লাগান কার্ল মার্ক্স। জাতিসকলের রাজনৈতিক ইতিহাসকে বস্তুবাদী দৃষ্টিতে সংগ্রাম ও সংঘাতের ইতিহাস হিসেবে দেখে সেখান থেকে সহিংস ও অনিবার্য পরিবর্তনের পূর্বাভাস করার দৃঢ়তা, আস্থা ও নিশ্চয়তা তাকে ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসকে বিবর্তনের চেয়ে আর কম বিষয়ই এতোটা দিয়েছে। এটা সর্বজনবিদিত যে কার্ল মার্ক্সের দার্শনিকতার প্রায় পুরোভাগ রাজনৈতিক করণীয়ের চেয়ে বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিক পূর্বাভাসেই বেশি নিবেদিত ছিলো। তথাপি, মার্ক্সের নির্লিপ্ত বিশ্লেষণের ফাঁকেও উঁকি দিয়েছে ভবিতব্য সহিংস সংগ্রামকে উৎকৃষ্ট ও প্রগতি মনে করার হাতছানি। এভাবে তিনি শ্রেণীসংগ্রামের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের আগমনকে কেবল ভবিষ্যদ্বাণী করে ক্ষান্ত হন নি, সেটার উপর তিনি ঔচিত্য আরোপ করার ন্যাচারালিস্টিক ফ্যালাসি ঘটিয়েছেন। তার এই দৃষ্টিভঙ্গির নজির আরো পাওয়া যায় তার রাজনৈতিক সক্রিয়তাকালে সহিংসতার প্রতি সমর্থন প্রদানে। ভবিতব্যকে উচিত জ্ঞান করা হলো ঘটমানকে উচিত জ্ঞান করার চেয়েও মারাত্মক-রকমভাবে ভ্রান্ত। প্রথমত যা ভবিতব্য, তাকে উচিত মনে করা যৌক্তিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। তদুপরি, যা ভবিতব্য, তা এখনো ঘটে নি এবং না ঘটারও সুযোগ রয়েছে। ফলে এটা একটা প্রকল্প। একটা প্রকল্পকে যাচাইয়ের আগেই সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে একটি ছদ্মবৈজ্ঞানিক চর্চা এবং সেই প্রকল্পকে প্রমাণ ভেবে সেটাকে ঘটানোর জন্য করণীয় নির্ধারণ হলো ভয়াবহভাবে বিপর্যয়কর।

মার্ক্সবাদী দর্শন অদ্যাবধি তার অনুসারী, সক্রিয় কর্মীদের সাহায্য করে গেছে সহিংসতাকে ন্যায্যতা দিতে। সাম্যবাদ মানেই যেমন মার্ক্সবাদ নয়, তেমনি মার্ক্সবাদ মানেই কেবলই সহিংসতা নয়। শত বছর ধরে তর্ক চলেছে আসলে মার্ক্স কী বলতে চেয়েছিলেন সে নিয়ে। তবে পিছন ফিরলে আমরা দেখতে পাই - সাম্যবাদের রাজনৈতিক ইতিহাস হলো সহিংসতা ও পৃথিবীর সর্ববৃহত্তম গণহত্যাসমূহের ইতিহাস। নাৎসিবাদের ভয়াবহতা লুকোছাপার মধ্যে ঘটে নি, কিন্তু সকল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির উপর সাম্যের লড়াইয়ের চোটপাটের ভয়াবহতার গুরু অংশে ঘটেছে অন্তরালে, নীরবে। কারণ সংবাদ মাধ্যম সমাজতন্ত্রে উগ্র জাতীয়তাবাদের থেকেও বেশি নিয়ন্ত্রিত থাকে। সোভিয়েত, গণচীন ও অন্যান্য সামাজতান্ত্রিক শাসনে সাম্যের লড়াইয়ের বলি মতান্তরে প্রায় দশ কোটি মানুষ। ব্যক্তি সেইসব তন্ত্রে তুচ্ছ। কারণ ওই যে, ব্যক্তির বা তার ইচ্ছার কী মূল্য? উৎকর্ষ যাচাই হবে কেবল সংগ্রামের মাঠে। যে মত সাম্যবাদের পক্ষে নয়, সে সাম্যের শত্রু । তার বিনাশ সাম্যবাদের বিস্তারের জন্যে জরুরি।

এইসব গণহত্যার জন্যে সাম্যবাদের নবী কার্ল মার্ক্সের দায় ততোটুকুই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার জন্যে নাৎসিবাদের নবী নিৎশের দায় যতোটুকু। কিন্তু তারপরেও অবশ্যই কার্ল মার্ক্সের চিন্তাভাবনা নিয়ে দার্শনিকতা করা সম্ভব, যেমন করা হয় নিৎশের অন্যান্য ভাবনা নিয়ে। তবে নিৎশের দর্শনের ব্যাপারে যতোটা অলিখিত নিষিদ্ধতা ও ভীতি চালু আছে, সাম্যবাদ ও মার্ক্সবাদের ব্যাপারে সেই মাত্রায় নেই, কারণ সেই সংগ্রাম এখনো হরদম চালু আছে। তাছাড়া এই দুই মতবাদ নিজেরা আবার নিজেদের শত্রু । এরা আজন্ম নিজেদের ঘায়েল করতে চেয়েছে, যুদ্ধ করেছে, হত্যা করেছে, প্রতিপক্ষের দর্শন নিয়ে আলোচনাকে নিষিদ্ধ করেছে।


ছবি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে মুদ্রার অতিস্ফীতির কারণে লাকড়ি কেনার চেয়ে বরং সরাসরি টাকা পুড়িয়েই চিমনি জ্বালানো হচ্ছে

সাম্যবাদী ও বামপন্থী শ্রেণীসংগ্রাম মাত্রই অবধারিতভাবে সহিংস বা গণহত্যাউন্মুখ এমন নয়। অসহায়ের পক্ষ নিয়ে বলার জন্যে আধুনিক যুগে শ্রেণীসংগ্রামীদের চেয়ে বেশি আর কাউকে তেমন পাশে পাওয়া যায় নি। উদারতাবাদীদের সেসবক্ষেত্রে সাধারণত পরোক্ষভাবে জড়িত কিংবা নিস্ক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। জাতীয়তাবাদীরা সাধারণত অসহায় শ্রেণী ও বিজাতীয় সংখ্যালঘুদের আন্দোলনকে জাতির লক্ষ্যের পথে ভ্রষ্টাচারিতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, ক্ষমতার আসনে থাকলে নিষ্পেষণ জারি রেখেছে। আবার, উগ্র জাতীয়তাবাদেরও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। জাতিনিধনের সময় শ্রেণীসংগ্রামীরা থাকে দ্বিধাগ্রস্ত। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পক্ষেই তখন সম্ভব হয় সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে জাতিকে একত্রিত করে আন্দোলন সংগ্রাম করে জাতির মুক্তির পথ বাতলে দেয়া। এমন কি দ্রুত জাতীয় উন্নয়নে উগ্র জাতীয়তাবাদের তুলনা মেলা ভার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জার্মানি যখন যুদ্ধের দেনার বোঝায় জর্জরিত, মুদ্রাস্ফীতি সেখানে এতোটা বেড়ে গিয়েছিলো যে জার্মান মার্ক দিয়ে লাকড়ি কেনার চেয়ে সরাসরি কয়েক বস্তা মার্ক পুড়িয়ে চিমনি জ্বালানোটাই সস্তা বিকল্প হয়ে উঠে ছিলো। সেসময় নাৎসি উগ্র জাতীয়তাবাদ তাদের প্রচণ্ড জোশ ও একতাবদ্ধতার আদর্শ গুণে জার্মানিকে অতি অল্প সময়ে (এক যুগে) অর্থনৈতিকভাবে আবার একটি প্রধান শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে পেরেছিলো। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সহিংসতার পথে এই মতবাদগুলোর যে ক্রমিক বিবর্তন, ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি হস্তক্ষেপ, ধ্বংসযজ্ঞ, তার নজির যুগে যুগে পাওয়া গেছে।

ক্ষমতায় আসীন অবস্থায় এই দুই মতবাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো সহিংসতাকে অনিবার্য লক্ষ্য হিসেবে সামনে নিয়ে আসা। প্রতিপক্ষকে খতম করা। ব্যক্তি, তার জীবন ও লক্ষ্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করা। এরা তাদের দর্শনে প্রয়োজনে বিবর্তনবাদকে ব্যবহার করেছে বৈজ্ঞানিক ন্যায্যতার ছায়া প্রদানের জন্য। এ নিয়ে বিস্তর তর্ক। সৃষ্টিবাদীরা এই ব্যাপারটার দিকে অঙুলি নির্দেশ করে বোঝাতে চায় যে বিবর্তন সাংঘাতিক ধারণা। এটা এমন ভয়াবহ সব মতবাদের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে বিবর্তনবাদের অন্ধ অনুসারীরা সেটাকে প্রতিহত করার জন্যে বোঝাতে চায় যে আসলে এই মতবাদগুলোতে বিবর্তনবাদের প্রভাব থোড়াই ছিলো। এমন কি তারা এও বোঝাতে চায় যে আসলে হিটলার ও তার নাৎসিবাদ সৃষ্টিবাদী ছিলো। অন্ধ বিবর্তনবাদীরা এভাবে নাৎসিবাদের ঐতিহাসিকতাকে অস্বীকার করে। এর পেছনের জার্মানির শত বছরের দর্শনকে অস্বীকার করা হয় ও নাৎসিবাদকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়। প্রকৃত অর্থে নাৎসিবাদীরা ছিলো ম্যালিপুলেটিভ। তারা তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে যেখানে যেমনটা প্রয়োজন বোধ করেছে সেভাবে প্রপাগান্ডা প্রচার করেছে। ধার্মিকদের জন্যে প্রয়োজনে তাদের লক্ষ্যের ধর্মবাদী ভাষ্য প্রচার করেছে। কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্যে চোখ দিলে নিৎশে ও অন্যান্য জার্মান দার্শনিকতাকে পাওয়া যাবে, যারা তাদের দর্শনের দৃঢ়তা গ্রহণ করেছে বিবর্তনবাদকে ব্যবহার করে। সাম্যবাদে বিবর্তনের ভূমিকা আরো কম তর্কসাপেক্ষ।

এটা ঠিক যে বিবর্তনবাদ থেকে এই মতবাদগুলো ছদ্ম ন্যায্যতা গ্রহণ করলেও বিবর্তনাবাদের অনুপস্থিতিতেও এরা সম্ভবত বেড়ে উঠতো নিজের মতো করে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, সৃষ্টিবাদীরা যে জায়গায় ভুল করে, বিবর্তন থেকে ত্রুটিপূর্ণভাবে ভুল ধারণা ধার করার দায় বিবর্তনের নয়। বিবর্তন বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইকৃত প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব যা ঘটনাকে বর্ণনা করে (is)। আর রাজনৈতিক মতবাদ করণীয়কে নির্ধারণ করে (ought)। যা ঘটে তাকে সঠিক মনে করার সমস্যা ইজ-ওট সমস্যা (is-ought problem) নামে দর্শনে সুপরিচিত। প্রকৃতিতে যা ঘটে, তাকে আদর্শ ও মানুষের করণীয় হিসেবে নির্ধারণ করা একটি যৌক্তিক ত্রুটি যাকে বলা হয় ন্যাচারালিস্টিক ফ্যালাসি। এখন নিৎশে আর কার্ল মার্ক্সের ন্যাচারালিস্টিক ফ্যালাসির জন্যে বিবর্তনবাদকে দায়ী করা অনেকটা খুনের জন্যে ছুরি তৈরির কৌশলকে দায়ী করার মতো। এই যুক্তি দিয়ে বিবর্তনের সত্যতাকে প্রশ্ন করা অনেকটা নিউক্লিয়ার বোমার বিভীষিকার কারণে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার সত্যতাকে প্রশ্ন করার মতো।

অন্যদিকে বিবর্তনবাদের আগমনেরও অনেক আগে থেকে, রেনেঁসা ও তদ্পরবর্তী এনলাইটেনমেন্টের মাঝখানটাতে রাজতন্ত্রকে আঘাত করে গণতন্ত্রের ভিত্তি প্রস্তুত করতে করতে উদারতাবাদের আগমন। আগে রাজার নিকট বরাদ্দ থাকতো ঐশী ক্ষমতা। সেটার ন্যায্যতার প্রদান করতো পুরোহিতরা। ধর্মভীরু, পুরোহিত-মানা মানুষ ভয়ে ভয়ে পুরোহিতের কথা মতো রাজা যা বলতো তাই মেনে চলতো। এরপর জ্যোতির্বিদ্যা ও বিজ্ঞানের সামনে পুরোহিতদের মুখে যখন চুনকালি পড়তে শুরু করে, তাদের কথা মতো রাজার কথা মানার তত্ত্বেও তখন ভাঙন ধরতে থাকে। চিন্তার নতুন দুয়ার খুলে যায়। প্রজা রাজার চেয়ে হীন নয়। রেনেঁসার মানবতাবাদ এনলাইটেনমেন্টে এসে রূপ নেয় উদারতাবাদে ও পরবর্তীতে ধ্রুপদী উদারতাবাদে। সবার কেবল সমান অধিকার শুধু নয়। সকল ব্যক্তির থাকবে অনন্যসমর্পণীয় অধিকার। অর্থাৎ এমন কিছু অধিকার, যেটা লঙ্ঘন করার ক্ষমতা রাজারও নেই। যেমন মত প্রকাশের অধিকার। ধর্মপালনের অধিকার। নিজের বাসা থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতকে (সরকারি লোক সমেত) বের করে দেয়ার অধিকার। এই মতবাদ মানুষের মুক্তিকামিতার জোয়ারে বিপ্লবে রূপ নিলো। আমেরিকানফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে এই মতবাদ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পেলো দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্র।

১০ ১১
ছবি: উদারতাবাদের পুরোধা জন লক ও ধ্রুপদী উদারতাবাদী রাজনীতিবিদ থমাস জেফারসন

উদারতাবাদ শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিকতা এই দুই দেশে পেলেও এর সুতিকাগার বলতে হয় ব্রিটেনকে। উদারতাবাদের জনক বলে পরিচিত ব্রিটিশ জন লক তার টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট লেখায় এই ধারণা মোক্ষমভাবে প্রতিষ্ঠা করেন যে শাসক তার শাসনের ন্যায্যতা ও অনুমতি শাসিতের কাছ থেকে গ্রহণ করবে, কোনো অতিপ্রাকৃত সৃষ্টিকর্তার থেকে নয়। বিপ্লবের মাধ্যমে না হলেও উদারতাবাদ ধীর গণতন্ত্রায়িকীকরণের মাধ্যমে ব্রিটেনে প্রবেশ করে। আর যুক্তরাষ্ট্র সেই ব্রিটিশ দার্শনিকদের ধারণাগুলোকেই প্রাণভরে গ্রহণ করে, নতুন গঠিত রাষ্ট্রের সংবিধানের পাতায় পাতায় সেই উদারতাবাদকে লিপিবদ্ধ করে, রাষ্ট্রকে ঐশী শক্তি হিসেবে নয় বরং সতর্কতার সাথে দেখার বিষয় হিসেবে এবং অনন্যোপায় হয়ে সকলে একমত হয়ে গঠন করার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জনক, সংবিধান রচয়িতারাই। তারা পৃথিবীকে উপহার দেন ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের মতো ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের এক অনন্য প্রতীককে, যা এখনো যে কোনো নবগঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির মুক্তি ও অধিকার নির্ধারণের পূর্বে প্রাথমিক পাঠ্য। আমাদের বাহাত্তরের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশের সাথেও যুক্তরাষ্ট্রের “বিল অব রাইট্স”-এর মিল উল্লেখযোগ্য।

মানুষ তার সদিচ্ছায়, স্বেচ্ছায় এই মতবাদ তৈরি করেছে, বিবর্তনের লক্ষ্যের সাথে একীভূত কিনা সেই প্রশ্ন ব্যতিরেকে। বিবর্তনের সাথে এই লক্ষ্য সামাঞ্জস্যপূর্ণ কিনা সেই প্রশ্ন আসলে এক তুড়িতে উদারতাবাদকে হয়তো বাতিল করে দেয়াও সম্ভব। কিন্তু বিবর্তনের লক্ষ্যের সাথে মানুষের সজ্ঞান-সচেতনভাবে নির্ধারিত (আপাত অথবা অন্তত দৃশ্যত) অবিবর্তনীয় সদিচ্ছার পার্থক্য ও দ্বিতীয়টার উৎকর্ষের একটা প্রামাণ্য উদাহরণ হয়ে থাকবে উদারতাবাদ।

ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই রাষ্ট্র সাধু বনে যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জনকরাই বারবার তাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্র দুষ্ট, তার হাতে যতো ক্ষমতা দেয়া হবে সে ততো তার অপব্যবহার করবে, শাসিতকে নির্যাতন করবে। তাই তার ক্ষমতাকে সীমিত রাখা দরকার। মানুষের যৌথ বিষয়ের নিস্পত্তির প্রয়োজন। তাই মানুষ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে রাষ্ট্রকে কিছু ক্ষমতা ন্যস্ত করে। কিন্তু সেটা সদা জবাবদিহিতা ও পাহারার মধ্যে রাখতে হবে। তাদের এই ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ধ্রুপদী উদারতাবাদ, যা সীমিত সরকার, আইনের শাসন, ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মুক্ত বাজারের কথা বলে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়করা তার প্রতিষ্ঠাতা জনকদের মতো অতোটা সাধু দৃষ্টি দিয়ে তাদের ক্ষমতাকে সদা দেখে গেছে তেমন নয়। তাদের অধীনে রাষ্ট্র সাংবিধানিকতার মধ্যে থেকেও যতোটা সম্ভব উত্তরোত্তর নিজের ক্ষমতার পরিধি বর্ধন করে গেছে। তবে মানুষের শেষ স্বস্তির অংশ, তার মতের ও বিবেকের সার্বভৌমত্ব, সেখানে কখনো আঘাত করতে পারে নি।

সাম্যবাদ ও নাৎসিবাদ তার চরম প্রাতিষ্ঠানিকতাপূর্ণ অবস্থায় অতি অল্প সময়ে নিজের মানুষকেই গণহত্যার জন্ম দিয়েছে। উদারতাবাদ কী উপহার দিয়েছে? এর সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত অবদানের কথাই বলছি। নিজের দেশের মানুষকে মুক্তি ও স্বাধীনতা দিলেও অন্যদেশের প্রতি অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে একে সোচ্চার হতে দেখা যায় নি। যুক্তরাষ্ট্র তার জন্ম থেকে অদ্যাবধি তার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালিয়ে গেছে। ঘটেছে গণহত্যা। এই সামরিকতাবাদের বিপক্ষে উদারতাবাদকে দেখা গেছে নিতান্তই মৃয়মান। ধ্রুপদী উদারতাবাদীরা অধুনা মুক্তিবাদী বলে পরিচিত। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইসলামি জঙ্গিদের মদদ দিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ইরাক-আফগানিস্তান আগ্রাসন, ইসরায়েলের সামরিকতাবাদে ঘি ঢালার বিপক্ষে সোচ্চার, কিন্তু তাদের মূল যুক্তি এই যে এতে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি। গণহত্যাকে আরো দৃঢ় কন্ঠে 'না' জানাতে তারা এখনো পেরে ওঠে নি। উদারতাবাদ কোনো সর্বরোগ নিরাময়ী নয়। উদারতাবাদ তার আগমনের সাথে সাথে মানবতার সকল বিপর্যয়কে সনাক্ত করে উঠতে পেরেছিলো তাও নয়। অনেকটা সময় সে দাসপ্রথা ও নারীর সঙ্কুচিত অধিকারের সাথে বসবাস করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জনক থমাস জেফারসনের নিজের অধীনেই শতাধিক দাস ছিলো। আমেরিকার আদিবাসীদের নিধনের সময় উদারতাবাদীদের ভাষ্যই বা কী ছিলো সেটাও প্রশ্ন।

উদারতাবাদের সবচেয়ে প্রকট ভয়াবহতাটা পরিলক্ষিত হয় এর নয়াউদারতাবাদের ভার্শনে। নয়াউদারতাবাদে “বিকল্প নাই” মন্ত্র জপে জপে ব্যবসায়ীদের গোষ্ঠিরা একত্র হয়ে বিশ্বব্যাপী মুক্ত অর্থনীতিকে কায়েম করতে নেমে পড়ে। তাদের এক এবং একমাত্র জোর বিশ্বে বাঁধাহীন অর্থনীতির প্রচলন। এর জন্যে বিভিন্ন উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে যথেচ্ছা হস্তক্ষেপ, ব্যবসায়ী স্বার্থ রক্ষার জন্যে রাষ্ট্রের হাত যতোটুকু লম্বা করা প্রয়োজন সেটা করা, মানুষের অধিকার সংকোচন, প্রয়োজনে সামরিকতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র কায়েম করা সব তারা জায়েজ মনে করেছে। সেই অর্থে নয়াউদারতাবাদ কোনো ধ্রুপদী উদারতাবাদ নয়, উদারতাবাদ তো নয়ই। ধ্রুপদী উদারতাবাদ থেকে তারা কেবল মুক্ত অর্থনীতি নিয়েছে, কিন্তু উদারতাবাদের অন্যান্য অংশ লঙ্ঘনে তাদের বাঁধা নেই। নিজে দেশেও সবকিছুর বিনিময়ে, মানুষের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের করের বিনিময়ে হলেও গোষ্ঠিগতভাবে অর্থনীতিতে যাচ্ছেতাই করার যোগাড়যন্ত্র তারা করে রেখেছে। ফলে অধুনা তারা উপহার দিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার

নয়াউদারতাবাদ এভাবে উদারতাবাদের বারোটা বাজিয়েছে। ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মুক্তিকে বিপদসঙ্কুল করেছে। কেননা, নয়াউদারতাবাদের এই বিপর্যয়ে পশ্চিম বিধ্বস্ত হলে পশ্চিম তার উদারতাবাদ সহই ধ্বংস হবে। তার অবর্তমানে বিশ্বে ঠিক কোন মতবাদের বিস্তার ঘটবে তা পরিষ্কার নয়। চীন সঙ্কল্পে ও দর্শনে এখনো উদারতাবাদ বিরোধী, ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব বিরোধী। চীনের কাছে রাষ্ট্র মহান। সেখানে মূলত রাষ্ট্র ব্যক্তির দেখভাল করে এবং ব্যক্তির দেখভাল ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রই ভালো বোঝে। তবে পশ্চিমের আসন্ন বিপর্যয় থেকে চীন নিরাপদ, এমনটাও কিন্তু ভাবা যাচ্ছে না।

পশ্চিমের বিপর্যয়ে মঙ্গল যেটা হতে পারে, প্রতিটা আলাদা জাতি তাদের নিজেদেরকে নিজেদের মতো করে পুনরাবিষ্কার করার সুযোগ পাবে। তবে ব্যাপারটা অতো সরল নয়। প্রতিটা উন্নয়নশীল দেশে প্রথম যদি না হয় তাহলে অন্তত দ্বিতীয় ও তৃতীয় শক্তি হিসেবে এখনো উঁকি ঝুঁকি দিয়ে বেড়াচ্ছে নাৎসিবাদতুল্য ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদ এবং সহিংসতার হৃদয়পূর্ণ সাম্যবাদ। এবং সাথে ইসলামি রাষ্ট্রগুলোতে রয়েছে ইসলামি শাসন কায়েমের সম্ভাবনা। জাতীয়তাবাদ বাদে বাকিগুলো বৈশিষ্ট্যে আন্তর্জাতিকতাবাদী। ফলে তারা তাদের ধারক জাতিকে যে তার নিজের মতো করে উদ্ধার করার সুযোগ দেবে, তেমন সম্ভাবনা কম। সেই সুযোগ আপাত দৃষ্টিতে জাতীয়তাবাদে রয়েছে বলে মনে হলেও এর চরম রূপটি কাঠামোগতভাবে সব দেশে মূলত একই। নিজ জাতিকে বীরের জাতির আসনে বসানো দিয়ে যার শুরু হয়, আর শেষ হয় অন্য জাতিকে ঘৃণা করা, তার দমন নিপীড়নে আর নিজ জাতির প্রতিটি ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতা সঙ্কোচন করে জাতিগত করণীয় নির্ধারণে। এছাড়া রয়েছে এদের সব কয়টির নানারকম সঙ্কর - ইসলামি বাম, জাতীয়তাবাদী বাম মোর্চা, ইসলামি জাতীয়তাবাদ।

পশ্চিম বিশ্বের প্রতিটি দেশ এখন নিজ দেশে উদারতাবাদের অন্তত আংশিকভাবে হলেও ধারক। ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সম্পত্তি অর্জনের অধিকারের ব্যাপারে তারা অনড়। পশ্চিমারা এখন বিশ্বের নায়ক অবস্থানে থাকলেও সেটা সম্ভবত ক্ষণস্থায়ী। তারা ভিন দেশের প্রতি ভয়ানক অন্যায় করে চলেছে। তাদের নিজস্ব ভুলত্রুটিপূর্ণ অর্থনীতি এখন তাদেরকে বিপর্যয়ের দ্বারে নিয়ে এসেছে। দুষ্টের বিয়োগ আমাদের কাম্য। কিন্তু তার সাথে সাথে ব্যক্তিগত যে মুক্তি ও স্বাধীনতা পশ্চিমের উদারতাবাদের বদৌলতে, যেটা একটা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পাওয়া অসম্ভব, সেটাও কি পরিত্যাজ্য?

ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদী, সহিংস বামপন্থী আর ইসলামি শাসনপন্থীদের এখন পোয়া বারো। নাৎসি ও বামরা তাদের জন্মের উষালগ্ন থেকে উদারতাবাদকে সমালোচনা করেছে। ফলে বর্তমানে উদারতাবাদের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার, তাদের মধ্যে নানা পক্ষের মানুষের সাথে ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদ ও সহিংস বামপন্থীদের খুঁজে পাওয়াও অসম্ভব না। তারা নয়াউদারতাবাদের সমালোচনার সাথে উদারতাবাদের সমালোচনাও সেড়ে নেয়। আগামিতে আমরা সেগুলোর আরো আরো আলামত দেখতে পাবো বলে আশঙ্কা করা যায়। তাদের সবচেয়ে বড় চিহ্ন কী হবে? সেটা হচ্ছে - ব্যক্তির অধিকার সঙ্কোচনের ওকালতি করা। নানাভাবে ব্যক্তির অধিকার সঙ্কোচন করার পরামর্শ, ন্যায্যতা, যুক্তি ও পরিশেষে প্রয়োগ সম্ভবত দেখতে পাবো আমরা।

কেবল এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে ভুলের সমালোচনা করা হচ্ছে, দেখা দরকার কীভাবে সমালোচনাটা করা হচ্ছে। মোহাম্মদ ইউনূস প্রসঙ্গে আমরা দেখেছি তার পদ্ধতির ত্রুটির দিকে মনোযোগ নিক্ষেপ করার চাইতে তাকে পক্ষগতভাবে ঘায়েল করাটাই যেন তাকে সমালোচনার মূল পদ্ধতি হয়ে উঠেছিল। ফলে মোহাম্মদ ইউনূসের বিপক্ষ অবস্থানগুলো নানামুখী, কিন্তু স্পষ্ট নয়। একমাত্র নয়াউদারতাবাদের বিরোধিতার দিক থেকে যে পক্ষ, তাদের বিপক্ষতাই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে স্পষ্ট ও শক্তিশালী। কিন্তু সেটা আবার সবচেয়ে দুর্বল যুক্তিও কারণ, এটা যেহেতু সম্পূর্ণ নয়াউদারতাবাদকে সমালোচনা করে, এর ফলে স্পষ্ট হয় যে মোহাম্মদ ইউনূস তাদের কাছে কেবল পক্ষ ঘায়েল করার একটি প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্র। সেক্ষেত্রে বিশেষভাবে গ্রামীণ ব্যাংকে মোহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনার যে পদ্ধতি, সে নিয়ে তাদের যেসব নির্দিষ্ট সমালোচনা, সেগুলো যে লঘু এবং নিমিত্ত কেবল, সেটা পরিষ্কার হয়। মূল লক্ষ্য যে তাদের মহান রাষ্ট্রের নিকট বিভিন্ন ব্যবসাকে অর্পণ, রাষ্ট্রবাদিতার পরিবর্ধন, সেটা বুঝতে পারা যায়। নয়াউদারতাবাদ তার আগামী অর্থনৈতিক বিপর্যয়গুলো সামলাতেই ব্যস্ত থাকবে, কিন্তু তার সমালোচনার নামে রাষ্ট্রকে মহান করে তোলা, তার ক্ষমতা বর্ধনকে ন্যায্যতা প্রদান করার যে চেষ্টা, সেটা আমাদের লক্ষণীয় বিষয় হয়ে পড়ে। আর চর্চার সুযোগ পেলে রাষ্ট্র তার ক্ষমতা বর্ধনের স্বভাব নিয়ন্ত্রণ করে না, আরো আরো পরিবর্ধন করে।

পশ্চিমের সমালোচনা মানেই যে রাষ্ট্রকে ক্ষমতাশালী হৃষ্টপুষ্ট করার পক্ষে মত দিতে হবে, সেটা ভুল ধারণা। কিন্তু আগামিতে পশ্চিমের সমালোচনার ছলে রাষ্ট্রবাদিতার পক্ষে মতামত উঁকিঝুঁকি দেবে। উগ্র জাতীয়তাবাদী, সহিংস বামপন্থী আর ইসলামি শাসনপন্থী সবাই-ই রাষ্ট্রের হাত নিজের দিকে শক্ত করে তোলার জন্য দিন গুণছে। আর এর বলি হবে সাধারণ মানুষের মুক্তিকামিতা। এরা পশ্চিমকে সমালোচনা করার ছলে সাধারণ মানুষকে বোঝাবে - দেখো, ব্যক্তিকে মুক্তি দিলে এই-ই হয়। পশ্চিম ব্যর্থ, তাই পশ্চিমের সম্পূর্ণ দর্শন দূষিত। আসো, স্বেচ্ছায় হাতকড়ি পরো। তোমার দায়িত্ব তোমার দেখভালকারী মহানুভব রাষ্ট্রের হাতে তুলে দাও।

অতি সম্প্রতি একটা অনলাইন সংবাদ পত্রিকার সম্পাদককে অনলাইনে মুক্ত মত প্রকাশকে নিয়ন্ত্রিত করার পক্ষে মত দিতে দেখা গেছে। পত্রিকাটির নিজেরও একটি ব্লগ রয়েছে। ফলে ব্যাপারটাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর আগে দেশের প্রধান মুদ্রিত সংবাদ পত্রিকাটিকেও মানুষের বিভিন্ন আদর্শ ও মূল্যবোধের উপর প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চালাতে দেখা গেছে শপথ নেয়া, চিঠি লেখা, ইত্যাদির ছলে। তবে ব্যাপারটা সম্ভবত অতোটা বিচ্ছিন্ন নয়। এটা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের একটা প্রচেষ্টা হয়ে থাকলেও এটা একটা গোষ্ঠিগত তৎপরতার অংশ ভাবা যেতে পারে। এর পূর্বে রাজনীতিবিদদরেই দেখা গেছে ব্লগারদের স্বাধীনতা নিয়ে ঈর্ষাপরায়ণ হতে। ব্লগের মাধ্যমে গণসংযোগের অভিযোগে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে আটক করা হয়েছে১২। একই অনলাইন পত্রিকা ইতোপূর্বে মোহাম্মদ ইউনূসের বিপক্ষেও সোচ্চার হয়ে উঠেছিলো। সেখানেও একটা গোষ্ঠিগত তৎপরতা লক্ষণীয় ছিলো। এইসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবাদিতার একটা ছায়া চোখে পড়ে। রাষ্ট্রবাদীরা অপছন্দনীয় বিষয়টার স্বনিয়ন্ত্রণ হরণ করে রাষ্ট্রের হাতে তা ন্যস্ত করতে চায়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চায়। তদুপরি, তারা লক্ষণে ফ্যাসিবাদী। ফলে ফ্যাসিবাদীদের মতোই তারা জনগণের অধিকার জনগণের সমর্থনেই কেড়ে নিতে চায়। তারা তাদের লক্ষ্যটা অর্জনের জন্যে গণসমর্থন তৈরি করে। জনগণই তখন হৈ চৈ করে তাদেরকে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যটি অর্জন করে দেয়। মোহাম্মদ ইউনূসের ঘটনায়ও শুরুতে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর খবরের সন্নিবেশনে মোহাম্মদ ইউনূসের বিপক্ষে গণসমর্থন তৈরির প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে।

এবারও এখানে সেখানে নানা বক্তব্য দিয়ে তারা প্রথমে গণ সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে। ধর্মপ্রাণ, ভদ্রস্থ, রুচিশীল মানুষদের থেকে এই ব্যাপারে সমর্থন আদায় সহজ। তারা সহজেই একমত হবেন যে মত প্রকাশের নামে যা তা বলা লেখা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এসবের তদারকিতে রাষ্ট্রকে ক্ষমতায়িত করতে হবে। কিন্তু ফ্যাসিবাদীরা মানুষকে জানাবে না যে সংবিধান মানুষকে কিছু অনন্যসমর্পণীয় অধিকার দিয়ে রেখেছে, যেগুলো কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা কারো নেই। কোনো বিশেষ কারণ তৈরি করে সেটা লঙ্ঘনের অধিকার রাষ্ট্রকে দিলে রাষ্ট্র সেটার অসদ্ব্যবহার করবে, মানুষের অধিকার এভাবে সঙ্কোচিত হতে থাকবে। এতে মানুষের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। রাষ্ট্র অবিশ্বস্ত। তাকে সব ক্ষমতা তুলে দিয়ে দেয়া যায় না। মানুষ তার যৌথ প্রয়োজন মেটানোর জন্যে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব দেয়। মানুষের খুঁটিনাটি বিষয়াদির রক্ষণাবেক্ষণ, দেখভাল সেবাকর্মের একক দায়িত্ব নিয়ে সর্বদ্রষ্টা, সর্বক্ষমতাবান ঈশ্বর বনে বসা রাষ্ট্রের কাজ নয়। কিন্তু ধর্মভীরু মানুষ ঈশ্বরকে যেমন ভক্তি ভরে বিশ্বাস করে, রাষ্ট্রকেও তেমনি মান্য করে, ভক্তি করে। রাষ্ট্র যে আসলে মোটেও কোনো ঐশী শুভকামিতাপূর্ণ নয়, সেটা চতুর সুযোগসন্ধানী ক্ষমতালিপ্সুরা বলতে চায় না।

লক্ষণীয় যে অনলাইনেই রাষ্ট্রবাদীদের এই প্রাথমিক প্রচেষ্টার বিপক্ষে তেমন উচ্চবাচ্য নেই। অধিকাংশ ব্লগ নীরব। পাঠকরা দ্বিধাবিভক্ত। অনেক সাধারণ পাঠকই তাদের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞ। ব্লগে আজে বাজে কিছু লেখা হলে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই এমনটা না ভেবে সেটাকে রাষ্ট্রের হাত দিয়ে শাস্তি দেওয়ানোটাকেই সঠিক কাজ মনে করছে। সেক্ষেত্রে অনলাইনের বাইরে যে বিশাল জনগোষ্ঠি, তাদের চিন্তা ভাবনা যে ঠিক কী এ বিষয়ে, সেটা সত্যি-ই আশঙ্কার। তারা কি অনলাইন গোষ্ঠির স্বার্থ দেখবে? কিন্তু রাষ্ট্রের হাত এভাবে শক্তিশালী করার উদাহরণ তৈরি করা যে পরিশেষে তাদের নিজেদের স্বার্থের বিপক্ষেই একসময় গিয়ে দাঁড়াবে, সে তাদের কে বোঝাবে! এভাবে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিয়ে ফ্যাসিবাদী, সহিংস বামপন্থী আর ইসলামি শাসনকামীদেরই অভিলাষ পূরণ হচ্ছে।

মানুষের জীবন তার সবচেয়ে বড় উপহার। এর পরের বড় উপহারটি হলো একে উপভোগ করার অধিকার। একজনের উপভোগ যাতে আরেকজনের ভোগান্তি সৃষ্টি না করে, সেজন্যে মানুষ একত্র হয়ে আইন তৈরি করেছে, সেই আইনের দেখভাল করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ন্যস্ত করেছে। মানুষ তা করেছে, যাতে আর যা কিছু করলে অনিবার্যভাবে অন্যের ভোগান্তি হয় না, জীবনযাপনের সেই সকল বিষয় যাতে মানুষ নিশ্চিন্তে স্বাধীনতার সাথে উপভোগ করতে পারে। পুরোহিত, যাজক ও নীতিপ্রচারকরা মানুষকে তাদের এই উপভোগের বাইরে এসে দায়িত্বশীল হবার আহ্বান জানায়। তারা দেখায় যে কিছু কিছু অধিকার ও আনন্দ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে অন্যের জন্যে দায়িত্ব পালন করার মাঝে কতোটা সৌন্দর্য্য নিহিত। আমরাও সেটা স্বীকার করি। সত্যিই, নিজের অধিকারভুক্ত আনন্দকে ত্যাগ করে দায়িত্ববান হয়ে ওঠাটা তখনই সবচেয়ে সুন্দর হয়ে ধরা দেয়, যখন সেটা স্বেচ্ছায় করা হয়। দুষ্টলোকেরা সেটা অস্বীকার করে। তারা মানুষকে তার অধিকার বর্জন করে দায়িত্বশীল হয়ে ওঠাকে বাধ্যতামূলক করে তুলতে চায়। দায়িত্বশীলতার উৎকর্ষ এভাবে বাধ্যতামূলকতায় নষ্ট হয়। অন্যায় করলে প্রতিকারের সুযোগ সবসময়ই রয়েছে। তার বাইরে এসেও মানুষকে খারাপ ও ভালো বাছাইয়ের সুযোগটাই যখন দেয়া না হয়, তখন সেটা পরিণত হয় দাসত্ব ও অত্যাচারে। আর অবশ্যই সেই দাসত্ব কোনো মহৎ ঈশ্বরের নয়, বরং রাষ্ট্র নামক মহান প্রতিষ্ঠানের পেছনে আরামে বসে থাকা কিছু ক্ষমতালিপ্সু গোষ্ঠির।

রাষ্ট্র অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ করা সংবিধানেরই প্রদত্ত নাগরিক অধিকার। কিন্তু রাষ্ট্রবাদীরা তারপরেও মিথ্যা মিথ্যা বোঝায়, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ রাষ্ট্রদ্রোহ, অন্যায়, দায়িত্বহীনতা। এসবই পুনরায় প্রমাণ করে যে ক্ষমতা স্বভাবে দুর্নীতিপ্রবণ। একক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে রাষ্ট্রের দুর্নীতিপ্রবণতা তাই সব থেকে প্রকট ও সর্বনাশী। রাষ্ট্রকে তাই চোখে চোখে রাখতে হয়। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। নিজের অধিকার অন্যের ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হতে দেখলেও সোচ্চার হতে হয়। মঙ্গলকামী রাষ্ট্র সেটাই যে তার সমালোচনা, জবাবদিহিতা ও প্রতিবাদ কামনা করে। একমাত্র সেই পথেই কেবল একটি রাষ্ট্র কল্যাণকামী হয়ে উঠতে পারে। মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনের তত্ত্বাবধান ও সেবার একক দায়িত্ব অধিগ্রহণের মাধ্যমে নয়।

পাদটীকা


মন্তব্য

ধ্রুবনীল এর ছবি

চলুক

রাব্বানী এর ছবি

চলুক

জনৈক বাঙাল এর ছবি

আমার ব্লগজীবনে পড়া সেই লেখাগুলোর একটি হচ্ছে এটি... যার মূলভাব থেকে শুরু করে মতবাদগত এমনকি উদ্দেশ্যগত প্রতিটা অক্ষরে আমি সহমত! লেখকের সাথে নিজ চিন্তাধারার এই আশ্চর্য মিল দেখে আশ্চর্য হচ্ছি... উত্তম জাঝা!

দ্রোহী এর ছবি

চলুক

অ.ট.:- এই জিনিস লিখতে আপনার কত সময় লেগেছে?

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

আড়াই দিন . . .

স্বাধীন এর ছবি

আড়াই দিন . . .

অ্যাঁ

তারেক অণু এর ছবি

উত্তম জাঝা! অসাধারণ লাগল। মনে হচ্ছে কাছে এসে গেছে- শেষের সে দিন ভয়ংকর !
বিজ্ঞানের কিছু ধ্রুব সত্য বাদে কোন কিছুই তো আর চিরস্থায়ী নয়, দেখা যাক, মানব সমাজ কোন দিকে এগোই।

স্বাধীন এর ছবি

লেখাটা একবার পড়েছি, তবে আরেকবার সময় নিয়ে পড়ে মন্তব্য করবো। আপাতত শুধু বলে যাই এক কথায় অসাধারণ...

কাজি মামুন এর ছবি

একটা মাস্টারপিস। আমার অনেক দিনের জমানো প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। মানুষের মুক্তি ইতিহাসের দর্শন ও প্রয়োগকে এত ছোট্র কলেবরে এত সার্থকতার সাথে ম-লাটবন্দী করা হয়েছে, যে কেউই এর থেকে আলোকিত হতে পারে!

জানার জন্য গুটিকয়েক প্রশ্ন:
১. নিৎসে একই সাথে পরস্পরবিরোধী নাস্তিবাদ ও অস্তিত্ববাদ জন্ম দিলেন?
২.বিবর্তন আর উদারতাবাদ সাংঘর্ষিক যেহেতু, এদের ভিতর কি লড়াই হবে?
৩.বাঁধাহীণ অর্থনীতির প্রচলন কি করে অর্থনৈতিক মন্দার জন্য দায়ী?

লেখককে আমার সীমাহীন কৃতজ্ঞতা! ভবিষ্যতেও এমন লেখা অব্যাহত থাকবে, এমনটাই প্রত্যাশা!

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

১. নাস্তিবাদ মানেই সহিংস সংগ্রামের হাতছানি নয়। নাস্তিবাদ করণীয় নির্ধারণ করে না। নাস্তিবাদ বলে যে কোন মূল্যবোধের কোনো চরম সত্যতা নেই। এর ফলে ব্যক্তি তার নিজের করণীয় নিজে নির্ধারণ করবে (অস্তিত্ববাদ)। এই পর্যন্ত সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যার শুরু, যখন ব্যক্তির বাছাই করা নিজ নিজ ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যগুলোর মধ্যে নিৎশে কেবল শক্তিশালীকে উৎকৃষ্ট ঘোষণা করছেন। বলে দিচ্ছেন যে দুর্বল ভাবনার অধিকারীদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া উচিত। সেখানে গিয়ে সমস্যা।

নাস্তিবাদ আর অস্তিত্ববাদের সংযোগের একটা সমস্যা হচ্ছে, নাস্তিবাদ সাধারণত হতাশাবাদে পরিণত হয় বলে অনেকে মনে করে। প্রথম দৃষ্টিতে কোনো মূল্যবোধের চরম সত্যতার অস্তিত্ব নেই স্বীকার করলে সত্যিই মনে হয় তাহলে কোনো কিছু করার মানেই বা কী? সেখান থেকে অস্তিত্ববাদের মতো প্রেরণামূলকতায় যেতে অনেকের কাছে দুঃসাধ্য মনে হয়।

২. ঠিক সাংঘর্ষিক বলা যাবে না। কোথাও কিন্তু বলা হয় নি, এরা সাংঘর্ষিক। বলা হয়েছে যে উদারতাবাদ বিবর্তন উৎসারিত নয়। বিবর্তন প্রক্রিয়াটা নিৎশে ঘরানার ভাবনার চেয়ে অনেক জটিল। দুর্বলও যদি তার পরিস্থিতির সুবিধা নিয়ে সরকার বা অন্য কারও পৃষ্ঠপোষকতার সুবিধা নিয়ে নিজের (জিন ও ভাবনার) বিস্তার অন্যান্যদের চেয়ে বেশি করে ফেলতে পারে, তাহলে বিবর্তন মতে সেই 'দুর্বল'ই তখন সার্ভাইভ করার জন্যে অন্যদের চেয়ে বেশি ফিট প্রতিপন্ন হবে। কিন্তু নিৎশের সেট পছন্দ হবে না। তার মতে দুর্বলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতেই হবে।

৩. না, বলা হয়েছে নয়াউদারতাবাদ এর জন্যে দায়ী। মুক্ত অর্থনীতি মানে সম্পূর্ণ মুক্ত অর্থনীতি। সরকারের সেখানে হাত নেই। নয়াউদারতাবাদে সরকারের যথেচ্ছা হস্তক্ষেপ বাংলাদেশেও আছে, যুক্তরাষ্ট্রেও আছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ব্যবহার করে কীভাবে মুক্ত অর্থনীতি বজায় রাখা যায়? ব্যাপারটা কী স্ববিরোধী না? ২০০৭ - ০৮ এ যখন মন্দা শুরু হলো, সেটাও বড় সমস্যা ছিলো না। বড় বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান যখন ধরা খেলো, অর্থনৈতিক সূত্র মতে তাদের যদি স্বাভাবিক উপায়ে বাজার থেকে বিদায় হবার সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে যেই ত্রুটিগুলো মন্দাটিকে ডেকে এনেছে, সেই ত্রুটিগুলো শুধরানোর সুযোগ পেতো। কিন্তু বিন্দুমাত্র কিছু শুধরানো হয় নি। বরং জনগণের করের টাকা ঢেলে ধরা খাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে। ফলে কিছুই শুধরায় নি। ফলে এর চেয়ে মারাত্মক বড় একটি বিপর্যয় এখন আসন্ন। ত্রুটি করবেন, শুধরাবেন না, সেই ত্রুটিপূর্ণতারর উপর ভিত্তি করেই অর্থনীতিকে আরো চলতে দিবেন, বিপর্যয়টা তো আবার ঘটবেই। আগামিবার করের টাকা দিয়েও বাঁচানোর হয়তো সুযোগ থাকবে না। চরম বিপর্যয় ঘটবে। অর্থনীতি ধ্বংস হবে। পুঁজিবাদের এতো এতো উন্নয়ন সীমিত হয়ে যাবে। ভোগ কমবে, চাকরি কমবে। দরকার শক্তিশালী অর্থনীতি। প্রতিটা টাকার নোট সেখানে হবে সত্যিকারের কোনো সম্পদের প্রতিনিধি। এখনের মতো হাওয়ার উপর ছাপানো নোট নয়। হাওয়ার উপর ছাপানো নোটের কারণে, ভবিষ্যত থেকে ধার করার ধারণার কারণে এখন আমরা অসীম রিসোর্সের একটা বিভ্রমে বাস করছি। প্রতিটা নোটের বিপরীতে সত্যিকারের সম্পদ থাকলে সম্পদ যে সীমিত, সেটা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেতাম। প্রতিটা বিনিময় হতো হিসেব করা, শক্ত। মানুষ বুঝে শুনে চলতো। কিন্তু হয়তো এরপর আবার আরেকটা চাপাবাজি অর্থনীতি চালু হবে। আরেকটা বিভ্রমের যুগের পর আরেকটা বিপর্যয় ঘটবে।

অনিন্দ্য রহমান এর ছবি

রক্ষণশীল রাষ্ট্রবাদী হিসাবে আমার কিছু কথা ছিল। আপনার লেখা পড়লাম। আপাতত এইটা জানাইলাম।


রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

রক্ষণশীল রাষ্ট্রবাদিতা সম্পর্কে আরো আরো জানতেই চাই। সেটার পক্ষে আপনার কাছ থেকে একটা পোস্টের প্রত্যাশায় রইলাম . . .

খায়রুল এর ছবি

সচলায়তন নিয়মিত পড়ি তিন বতসর. কখনও মন্তব্য করেনি. প্রথম দিকে মন্তব্য করার ইচ্ছা হতো কিন্তু দেখলাম আমার প্রশংসা বা প্রশ্নগুলো অন্যকেউ করছে তাই করেনি. পরে অভ্যাসে পরিনত. আজ মন্তব্য করছি কারন লেখাটির সামগ্রিকতা. এমন বড় বা অনেক বিষয় একত্রিত করা এবং সমন্নয় রেখে শেষ করা খুব কম বা পড়েনি বললেই চলে. স্যালুট ও দোয়া রইল.

উচ্ছলা এর ছবি

লর্ডী লর্ড ! কী অপূর্ব একটা লেখা!!

অনেক কিছু জানলাম, বুঝলাম। বিশাল একটা ধন্যবাদ লেখক-কে ।

sopnochari এর ছবি

এক কথায় অসাধারণ,,,এমন জটিল বিষয়ে এমন অপূর্ব একটা লেখা!! salute and hats off!! এমন আরও সব লেখা লিখুন এ কামনাই রইল।।

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

রীতিমত অসাধারণ একটা লেখা। আমিও মোটামুটি আড়াই দিন ধরে লেখাটা পড়লাম। হাসি
লেখাটা পড়ে অন্য সব মতবাদের চেয়ে উদারতাবাদ তোমার কেন বেশি পছন্দ মোটামুটি ধারণা পাওয়া গেল।
আচ্ছা, বাংলাদেশের জন্য তোমাকে যদি একটা পলিটিক্যাল সিস্টেম (মানে রাষ্ট্র পরিচালনার কলাকৌশল) ডিজাইন করতে দেয়া হয়, তাহলে তুমি সেটা কিভাবে করবে?

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

"রাষ্ট্র পরিচালনা কৌশল ডিজাইন করা" এই ধারণাটার মধ্যেই সমস্যা আছে। অনেকগুলো সমস্যা।

একটা সমস্যা হচ্ছে যে এখানে আমরা মানুষের জীবন নিয়ে কৌশল ডিজাইন করার কথা বলছি। একটা ব্রিজ কালভার্ট বা বাড়ি তৈরির ডিজাইনেই কিন্তু ইথিক্যাল সমস্যা চলে আসে। বিপদ হলে ডিজাইনারকে ধরা হয়। ওগুলোর কোনো কিছুর বিপদ না ঘটানোর একশভাগ নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না, এসব জড় বস্তু নিয়ে বিজ্ঞানের এতো উন্নয়নের পরেও। এই যে দায়বদ্ধতা, এর পেছনে এই বক্তব্যই কাজ করে যে, আমরা এখনো সবকিছু নিশ্চিতভাবে জানি না। তো জগতের কোন বস্তুটার ব্যাপারে আমাদের তথা বিজ্ঞানের জানাশোনা সবচেয়ে অনিশ্চিত? সেটা হলো মানুষের মন, মানুষের আচরণ, যার উপর ভিত্তি করে সমাজ গঠিত। যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র ও তার কৌশল গঠিত হয়। ফলে সেই কৌশলে বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা একটা ব্রিজের কৌশলের দ্বারা বিপত্তি ঘটার চেয়েও বেশি সম্ভাব্য। আমরা মানুষ, তার আচরণ, তার জীবন নিয়ে এখানে কথা বলছি। সেখানে সবার আগেই স্বীকার্য যে আমরা জানি না, ঠিক কোনটা ব্যক্তির জন্য ভালো, সমাজের জন্য ভালো, রাষ্ট্রের জন্য ভালো। আমরা অনন্যোপায় হয়ে সকলে মিলে কিছু নশ্বর সিদ্ধান্তে উপনীত হই। এই স্পিরিটটাই কৌশল করতে বসার আগে থাকা দরকার। কিন্তু প্রচলিত রাষ্ট্রবাদী ব্যবস্থায় এই ধারণাটা, এই স্বীকার্যটা থাকে না। ফলে তারা নিশ্চয়তার সাথে মানুষের জীবনের উপর কিছু অনড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, এই ধারণাবশত যে সেটাই মানদণ্ড, সেটাই ঠিক। ফলে বিপর্যয় ঘটতে থাকলেও তারা তখন তাদের কৌশলকে ডিফেন্ড করতে থাকে। কৌশল করতে যাওয়ার আগে আমাদের দশবার ভাবতে হবে যে আমরা কী নিয়ে কথা বলছি। আমাদের এই কৌশলের উপর কী নির্ভর করছে। একটা ব্রিজ নির্মাণের সময় প্রকৌশলীর দুর্ভাবনার কথা ভাবো। এরপর ভাবো যে একজন রাষ্ট্রকৌশলীর সে অনুপাতে কেমন দুর্ভাবনা হওয়া উচিত। আর তার বদলে সত্যিকার ক্ষেত্রে তার কতোটা দুর্ভাবনা রাষ্ট্রকৌশলীরা অনুভব করে। রাষ্ট্র নিয়ে, মানুষের আচরণ নিয়ে বিজ্ঞান খুব সামান্যই জানে। তাই সেই কৌশল যতোটা সম্ভব ডাইনামিক, পরিবর্তনযোগ্য ও ফ্লেক্সিবল হতে হবে। যেসব জায়গায় ডাউট আছে, সেসব জায়গায় ব্যক্তি ও জনগণকেই আগে বেনেফিট দিতে হবে, ছাড় দিতে হবে, অধিকার ও স্বাধীনতা দিতে হবে।

আরেকটা সমস্যা হচ্ছে ঘটনাকে জানার চেয়ে করণীয় নির্ধারণের তাড়া আমরা অনুভব করি। আমরা খুব দ্রুতই করণীয় কী হবে সেই সিদ্ধান্তে চলে যাই। আমাদের আরো আরো ভাবতে হবে, জানতে হবে। করণীয় নির্ধারণ করনেওয়ালার অভাব বাংলাদেশে নেই। সময় নিয়ে ধীরে ধীরে ভাবার মানুষ কয়জন আছে? এখন আমিও যদি করণীয় নির্ধারণে সময় ব্যয় করি, তাহলে ঘটমান আর ভবিতব্যকে জানার জন্য বরাদ্দ করা সময়তে যে টান পড়ে যাবে!

তৃতীয় সমস্যা হলো, আমার এই কাজ করা উচিতও না। এটা করবে মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধি। সে চোর বাটপার হলেও তাই সই। বুদ্ধিজীবীতন্ত্রের চেয়ে সেটা ভালো। যে কোনো তন্ত্র তা সে উদারতাবাদই হোক, জনগণের কামনায় সেটা উপস্থিত হবার অনেক আগেই রাষ্ট্রে জোরপূর্বক ডিজাইন করে চাপিয়ে দিলে একসময় নাৎসির মতো উদারতাবাদী ও মুক্তিকামীও একটা গালি হয়ে যাবে। চাপিয়ে দিলে আরো বিপর্যয় ঘটবে। তার চেয়ে এখন যে তন্ত্র চলছে তার প্রতি আস্থা রেখে এর ত্রুটিগুলোকে সামনে নিয়ে আসা, মানুষকে সেসব ব্যাপারে তাদের অধিকারের কথা পরিষ্কার করানো, সেটা ঢের ভালো। মানুষ তার অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে তার প্রতিনিধিদের হাত দিয়ে রাষ্ট্রকে ডিজাইন করে নিক, আমার হাত দিয়ে না করে। বা যদি বলতেই হয়, তবে এটাই হলো আমার চোখে দেখা সম্ভাব্য মঙ্গলকামী উত্তোরত্তর-উন্নয়নযোগ্য রাষ্ট্রব্যবস্থা। নিন্দা, সমালোচনাই আমার কৌশল। ধীর পরিবর্তনে আস্থা রাখতে হবে।

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

সচল হওয়ার জন্য অভিনন্দন। তোমার এই জবাবটার জবাব আমি পরে দিব। আপাতত দুটো পরস্পরবিরোধী কিন্তু এই পোস্টের সাথে প্রাসংগিক লিংক পোস্ট করে যাই। আর তোমাকে ফেসবুকে পাই না কেন?

The Soviet Story

A very detailed interview of Fidel Castro

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

ফেইসবুক ডিঅ্যাক্টিভেট করা আছে।

লিংক দুইটার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

তবে নিজের দেশের মানুষের তকদির সেইদেশের মানুষের চেয়ে নিজে বেশি বুঝা মহাজন ফিদেল ক্যাস্ট্রো ভাইজানের ৭৬৯ পৃষ্ঠার গোটা বইটা কীভাবে প্রাসঙ্গিক সেটা আরেকটু নির্দিষ্ট করে না বললে পুরাটা পড়ার আগে বুঝবাম কেমনে? যা হোক, সকল বই-ই পড়ার বিষয়, সেই অর্থে নিশ্চয়ই প্রাসঙ্গিক।

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

অনেক,অনেক জায়গায় আসলে প্রাসংগিক! একটা সিস্টেমের (যেইটার প্রতি সম্ভবত আমার একটা সহানুভূতি আছে) প্রোস এণ্ড কন্স খুব ডিটেইলে বুঝার জন্য। আমি পুরোটা পইড়া নেই, তারপর রিলেভেন্ট পয়েন্টার থ্রো করব নে আলোচনার সময়।

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

স্বহস্তে মানব জীবন নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট ও রাষ্ট্রকৌশল ডিজাইন করনেওয়ালা, লক্ষ মানুষের ভাগ্যবিধাতা, মহাজন ফিদেল ক্যাস্ট্রো ব্লগে মুক্তমতের প্রোস অ্যান্ড কন্সের ব্যাপারে কী বলেন, সেইটাও একটু জানায়ো।

আর পয়েন্টের আলোচনা শুরু করে দাও। এছাড়া এই ভাসা ভাসা আলাপ কোনো অর্থপূর্ণ দিকে এগুবে বলে মনে হয় না।

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

৭৬৯ পৃষ্ঠার একটা বই পড়তে তো একটু সময় লাগবে -- তাই একটু ধৈর্য ধর! এই ফাঁকে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টারির লিংক পোস্ট করে যাই যেইটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম হাসি

Capitalism: A Love Story

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

পড়ার আগে লিংক দেয়া কি সুন্নত? তাইলে ঠিক আছে। নাইলে মাইনাস। সোভিয়েত স্টোরি দেখলাম। সোভিয়েত বিভৎসতা আগেই জানতাম। এখানে সমস্যা হচ্ছে তথ্য ঠিক মতো হ্যান্ডেল করা হয় নাই। কিছু ভুল ভাল আছে। স্টান্টবাজির চোটে।

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

বড় একটা সাক্ষাৎকারের বই পুরোটা পড়ার আগে লিংক পোস্ট করা হারাম বা মাকরুহ হলে মাইনাস মাথা পেতে নিলাম। সোভিয়েত স্টোরির কোন কোন তথ্য ভুলভাল মনে হোল?

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

অবশ্যই পুরো বই পড়তে সময় লাগবে। পুরোটা পড়ার আগে লিংকও পোস্ট করা সুন্নত। কিন্তু পয়েন্ট তুলতে বললে বলছো পুরোটা আগে পড়ে নেই। লিংক পোস্ট নিশ্চয়ই রান্ডমলি করো নি। কিছু একটা পেয়েছো এর মধ্যে। সেগুলোই এখন সংক্ষেপে বলতে পারতে। পুরোটা পড়ার আগে লিংক যেহেতু দিয়েই ফেলেছো, পুরোটা পড়ার আগে দুয়েকটা পয়েন্ট তোলার জন্য তাই পীড়া দিচ্ছি।

ফিদেল আর মুরকে নিয়ে পোস্টই না হয় দাও বরং।

তথ্য অবহেলার উদাহরণঃ মার্ক্সের একটা কোটেশান ভিতরে ব্যবহার করা হয়েছে যেখানে মার্ক্স প্রায় নিৎসের কাছাকাছি গণহত্যা ইন্ধনকারী কথাবার্তা বলছে। ওটার দ্বিতীয় অংশটা একটা ১৯৮১ সালের জার্নালের রেফারেন্স দিয়ে বলে দিয়েছে যে ওটা মার্ক্সের। ১৯৮১ সালে মার্ক্স ছিলো না। ফলে ওটা সেকেন্ড হ্যান্ড রেফারেন্স। উচিত ছিলো মার্ক্স যেখানে কথাটা বলেছে, সেটার রেফারেন্স ব্যবহার করা। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে দেখলাম, ওটা এঙ্গেল্স বলেছে মার্ক্সের সম্পাদিত পত্রিকায়। এই বক্তব্যে মার্ক্সের দায় কম বলছি না। এটা মার্ক্সবাদেরই বক্তব্য। এখান থেকে গণহত্যার ইন্ধন মার্ক্সবাদীরা গোগ্রাসে নিয়েছে। কিন্তু মার্ক্স বলেছেন বলা আর মার্ক্সের পত্রিকায় এঙ্গেল্স বলেছেন বলাটা এক কথা না। তার ওপর হলোকাস্ট শব্দটা আনা হয়েছে ওই উদ্ধৃতিতে, যেটা উনবিংশ শতকের একজনের বক্তব্যের ইংরেজি অনুবাদে প্রযোজ্য না। এটা মার্ক্সবাদের সহিংসতার উপরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি। কিন্তু এটা নিয়ে এই তথ্য অবহেলা ঘটেছে স্টান্টবাজির চোটে।

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

"সেখানে সবার আগেই স্বীকার্য যে আমরা জানি না, ঠিক কোনটা ব্যক্তির জন্য ভালো, সমাজের জন্য ভালো, রাষ্ট্রের জন্য ভালো। আমরা অনন্যোপায় হয়ে সকলে মিলে কিছু নশ্বর সিদ্ধান্তে উপনীত হই। "

শিক্ষা যে ব্যক্তির জন্য অশিক্ষা থেকে ভালো, চিকিৎসাহীনতার চেয়ে যে সুচিকিৎসা ভালো -- এইসব জিনিস তো আমরা জানি, নাকি এইটাও ধূসর এলাকা? এখন কোন পলিটিক্যাল সিস্টেম যদি রাষ্ট্রের 'সব' নাগরিকের জন্য এই দুইটা জিনিস নিশ্চিত করে তাহলে এই দুই কনটেক্সটে সেইটা যে সিস্টেম সব নাগরিকের জন্য এই দুইটা নিশ্চিত করে না তার চেয়ে ভালো নাকি? ফিদেল ক্যাস্ত্রোর কিউবায় কোনো ফাংশনাল ইলিটারেসি নাই। নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৬০ থেকে কমে এখন ৬/৬.৫ -- একমাত্র কানাডাতে মৃত্যুহার এর চেয়ে কম। বিপ্লবের আগের চেয়ে বিপ্লবের পরে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে পনের বছর। শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষের নিজের বাড়ি আছে যেটা ট্যাক্স ফ্রি। বাকি ১৫ ভাগের বেতনের ১০ ভাগ ভাড়া দিতে হয়। দেশের ১০০ ভাগ মানুষ সোশ্যাল সিকিউরিটির আওতাধীন। তাহলে দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য এইটা খারাপ হইল কিভাবে?

"তাই সেই কৌশল যতোটা সম্ভব ডাইনামিক, পরিবর্তনযোগ্য ও ফ্লেক্সিবল হতে হবে। যেসব জায়গায় ডাউট আছে, সেসব জায়গায় ব্যক্তি ও জনগণকেই আগে বেনেফিট দিতে হবে, ছাড় দিতে হবে, অধিকার ও স্বাধীনতা দিতে হবে।"

পুরোপুরি একমত

"তৃতীয় সমস্যা হলো, আমার এই কাজ করা উচিতও না। এটা করবে মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধি। সে চোর বাটপার হলেও তাই সই। বুদ্ধিজীবীতন্ত্রের চেয়ে সেটা ভালো। "

এই জা্য়গায় দ্বিমত। এইখানে তো তোমারে কিছু প্রয়োগ করে দেখাতে বলি নাই। জিজ্ঞেস করেছি তোমার কোন মতামত আছে কিনা। তুমি এইসব বিষয়-আশয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা কর। একটা কৌতূহল ছিল যে বাংলাদেশের জন্য কোনটা ভালো হবে এই বিষয়ে তোমার কোনো ভাবনা-চিন্তা আছে কিনা। যেমন ধর আমি মনে করি আমরা যে চোর-বাটপারদের হাতেই নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসন করার দায়দায়িত্ব সঁপে দিয়েছি, এইটা থেকে যদি কোনোভাবে মুক্ত হতে পারি -- যদি তাজউদ্দীন আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, নুরুল ইসলাম নাহিদদের মত মানুষদের আরও বেশি করে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি বানাতে পারি --তাহলে বর্তমানে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে ধারা চলছে সেটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো। তোমার এই রকম কোনো মতামত আছে কিনা এইটা জানতে চেয়েছিলাম আর কি !

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

ভেনেজুয়েলা এবং হুগো শাভেজকে নিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং ডকুমেন্টারি পেলাম
South of the Border

ক্যাস্ত্রোকে নিয়ে একই পরিচালকের আরও দুইটা ডকুমেন্টারি --
Commandante

Looking for Fidel

পরিচালকের একটা ইন্টারেস্টিং ইন্টারভিউ
Hard Talk

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

প্রিয় রাজিব। আমি আবারও অনুরোধ করছি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে। বিশেষ করে মুক্তমত, ইন্টারনেট ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপারে তোমার উল্লিখিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের দৃষ্টিকোণ নিয়ে, যেহেতু সেটাই আমার পোস্টের বিষয়।

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

শিক্ষা যে ব্যক্তির জন্য অশিক্ষা থেকে ভালো, চিকিৎসাহীনতার চেয়ে যে সুচিকিৎসা ভালো

আর

কোন পলিটিক্যাল সিস্টেম যদি রাষ্ট্রের 'সব' নাগরিকের জন্য এই দুইটা জিনিস নিশ্চিত করে তাহলে এই দুই কনটেক্সটে সেইটা যে সিস্টেম সব নাগরিকের জন্য এই দুইটা নিশ্চিত করে না তার চেয়ে ভালো নাকি?

তো এক কথা নয়।

এগুলো নিশ্চিত করার জন্যে একটা সিস্টেম কী পন্থা নিচ্ছে তার উপর নির্ভর করে বলতে হবে সেটা ভালো কি না। সিস্টেমের শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা, চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা তো বিচ্ছিন্ন নয়। এর জন্যে সিস্টেমটা অসীম কর্তৃত্ব অধিগ্রহণ করছে। সেটার যে বিরূপ প্রভাব, সেটাকে বাদ দিয়ে এই দুটি ব্যাপারকে আলাদা কনটেক্সটে কীভাবে দেখা সম্ভব? মানুষ কি সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে শিক্ষা আর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রাজি আছে? আমি নেই। অন্য অনেকেই নেই। সেটা করাটা উচিত, এমন কোনো নিশ্চিত জ্ঞানও মানবজাতি ধারণ করে না। ফলে আমাদের অজ্ঞানতা বিরাজ করছেই। তুমি এই অজ্ঞানতাকে কনটেক্সট সীমিতকরণের মাধ্যমে দূর করতে চাচ্ছো। এতে অজ্ঞানতা পালিয়ে যাচ্ছে না, বরং আমাদের অবহেলা ও অন্ধত্ব বাড়ছে।

এভাবে বললে এটাও প্রশ্ন করা যায় যে অপরাধ না করা যে অপরাধ করার চেয়ে ভালো, সেটা তো আমরা জানি। এখন যে পলিটিক্যাল সিস্টেম অপরাধ না ঘটা নিশ্চিত করে, সেটা অন্য যে সিস্টেম তা করে না, তার চেয়ে কেবল অপরাধের কনটেক্সটে যে ভালো সেটা তো নিশ্চিত নাকি? যেমন সৌদি আরবে অপরাধের শাস্তিতে হাত কাটা যায়, গর্দান যায়, সেথায় সাধারণ নাগরিকের মাঝে অপরাধের হার কম। এখন আমি যদি কনটেক্সটটা সীমিত করে তোমার কাছ থেকে সম্মতি আদায় করি যে এই কনটেক্সটে সৌদি আরব ভালো এটা নিশ্চিত, তাতে আর্গুমেন্টের কী গতি হয়? একটা অসীম কর্তৃত্বধারীর হাতের নিচ দিয়ে জোর করে ভালোকে ঘটতে দেয়া ভালো কি না, সেটা যে আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, এই সত্যটা কি লাঘব হয় তাতে?

ভালো কাজ করা ভালো এটা নিশ্চিত। এটা ধূসর অঞ্চলে বাস করে না। কিন্তু সেটা জোরপূর্বক করা ভালো কিনা, এই প্রশ্নটা ধূসর অঞ্চলেরই বাসিন্দা। এবং এটা নতুন ভাবনা নয়। অনেক পুরনো দার্শনিক প্রশ্ন। স্ট্যানলি কুবরিকের ক্লকওয়ার্ক অরেন্জ ছবিটা দেখতে পারো। সেখানে একজন শাস্তিপ্রাপ্ত ধর্ষক যাতে আর ধর্ষণ করতে না পারে এটা নিশ্চিত করার জন্যে তাকে এমনভাবে মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা দিয়ে কন্ডিশন্ড করা হয় যাতে সহিংস ভাবনা মনে জন্ম নিলেই তার মনে এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটে যে সে সহিংস কর্মকাণ্ড সাধনে অপারগ হয়। এখন ধর্ষণ না করা যে করার চেয়ে ভালো, সেটা তো নিশ্চিত। এখন ছবিটার মূল প্রশ্ন হলো, এই ভালোটা এভাবে জোর করে নিশ্চিত করাটা কি ভালো?

ফলে ভালোটা জোর করে করা ভালো কিনা সেটা সত্যিই ধূসর অঞ্চলের প্রশ্ন। তবে ভালো জোর করে করতে গেলে যে অন্যান্য খারাপ উপজাত তৈরি হয়, এই জ্ঞানটা বরং একটু কমই ধূসর অঞ্চলে রয়েছে। ইতিহাসে বরং বারবার দেখা গেছে ভালোকে জোর করে ঘটানোর জন্যে কর্তা যে একক ও অসীম কর্তৃত্ব অধিগ্রহণ করে, এর ফলে অন্যান্য অন্যায় ঘটার সুযোগ তৈরি হয়। আর ক্ষমতা যেহেতু স্বভাবে দুর্নীতিপ্রবণ, একক ক্ষমতার একজন অধিকারী সে হিসেবে দুর্নীতিপরায়ণতায় হয় বিপর্যয়কর। এর ব্যতিক্রম থাকতে পারে। ইতিহাসে সৎ একক কর্তৃত্বধারী নেতার দেখা মিলেছে। মহাজন ফিদেল ক্যাস্ট্রোও হয়তো তাদেরই একজন। কিন্তু সেটা অন্য একটা রাষ্ট্রের জন্যে অনুকরণীয় ব্যবস্থা প্রদান করে না। কারণ সেটা সিস্টেমের সাফল্য যতোটা, তার চেয়ে বেশি হলো একজন একক ব্যক্তির সদিচ্ছার ফল। আর সিস্টেমটা যেহেতু ব্যাপকভাবে সেই একক ক্ষমতাধারী ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল, তার প্রস্থানে কোনোভাবেই আর নিশ্চিত করার সুযোগ থাকে না যে পরবর্তী জনেরা সমান সদিচ্ছার সাথে তাদের একক ক্ষমতার ব্যবহার করে যাবে। সদিচ্ছা ইনহেরিট করা না গেলেও এই সিস্টেমে একক ক্ষমতা ঠিকই ইনহেরিটেবল, নিজের পুত্রের কাছে না হোক, পার্টির অন্য সদস্যের কাছে হলেও গিয়ে বর্তায়। সদিচ্ছার সামান্য অনুপস্থিতিতে এই একক ক্ষমতা অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়। ফলে কিউবার এই শিক্ষা ও চিকিৎসার উন্নয়ন কতোটা সাস্টেইনেবল, েসটা প্রশ্নাসীন। এভাবে একক সদিচ্ছায় জোরপূর্বক রাষ্ট্রের মঙ্গল অত্যন্ত স্বৈরাচারী, ব্যক্তিঅভিলাষপূর্ণ ধারণা।

সমাজের কল্যাণের কথা চিন্তা করলে বরং জনমানুষের সদিচ্ছা বর্ধনের চেষ্টা করাটা উত্তম। কারণ দশজন সদিচ্ছাপূর্ণ নেতা দ্বারা মঙ্গল কেবল তাদের জীবদ্দশাতেই ঘটাটা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু একটা সাস্টেইনেবল রাষ্ট্র সমাজের জন্যে প্রয়োজন সমাজের সকল মানুষের সদিচ্ছা ও স্বেচ্ছা অংশগ্রহণ। আর জোর করে মানুষের স্বেচ্ছাসৎকর্ম আনয়ন যায় না। সেটা অর্থহীন প্রপঞ্চ।

কিন্তু মানুষের মন জোর করে ভালো ঘটাতে চায়। এক দুইজন সৎ ব্যক্তি দিয়ে দেশ পাল্টে ফেলার স্বপ্নে সে বিভোর থাকে। জোরপূর্বক নীতি, ধর্ম, সততা, সঠিকতা শেখানো মানুষের প্রাচীন, সহজাত কিন্তু দুষ্ট স্বভাবের একটা। সে ভাবে, আমি তো সৎ, আমি তো ভালো, আমার একক কর্তৃত্বে রাষ্ট্রের ক্ষতি হওয়া কীভাবে সম্ভব? সকল স্বৈরাচারীই এমনটা ভেবেই ক্ষমতা দখল করেছে। এদের মধ্যে হয়তো শতকরা একভাগ তার জীবদ্দশায় সত্যিই কল্যাণ করতে পেরেছে, বাকিরা হত্যা, গণহত্যা, জাতির সর্বনাশ সাধন করেছে। ফলে এই পলিটিক্যাল সিস্টেমটা একটা স্যাম্পল থেকে শেখাটা বিপজ্জনক। কারণ অন্যান্য একশটা স্যাম্পল কিন্তু বলছে যে স্বৈরাচারের সদিচ্ছার উপর ভরসা করে জাতির বিপর্যয়ই বেশি ঘটে। ফলে এই একক ব্যক্তি গোষ্ঠির সদিচ্ছামূলক সিস্টেম থেকে অন্য একটি রাষ্ট্রের কতোটুকু গ্রহণ করার আছে, সেটা সত্যিই প্রশ্নের সম্মুখীন।

এইখানে তো তোমারে কিছু প্রয়োগ করে দেখাতে বলি নাই। ... কোনো মতামত আছে কিনা এইটা জানতে চেয়েছিলাম

কিন্তু তুমি বলেছিলে

বাংলাদেশের জন্য তোমাকে যদি একটা পলিটিক্যাল সিস্টেম (মানে রাষ্ট্র পরিচালনার কলাকৌশল) ডিজাইন করতে দেয়া হয়, তাহলে তুমি সেটা কিভাবে করবে?

এখানে তুমি যে আমাকে পরোক্ষ দর্শকের আসনে বসিয়ে কেবল মতামত চাচ্ছো, তেমনটা মনে হয় নি। বরং এখানে তুমি আমাকে ধরতে বলেছো যে আমাকে "ডিজাইন করতে দেয়া হয়েছে"। এখন আবার বলছো "প্রয়োগ করে দেখাতে" বলা হয় নি। আমাকে "ডিজাইন করতে দেয়া হয়েছে" যদি আমি ধরে নেই, সেখানে প্রয়োগ করাটাও ধরে না নিলে সেই ডিজাইনের পরিপ্রেক্ষিতটা তবে কী? প্রয়োগের প্রশ্ন না থাকলে ডিজাইনের প্রশ্ন তো অবান্তর। আর প্রয়োগের প্রশ্ন থাকলে আমি ইতোমধ্যেই বলেছি যে সেটা বুদ্ধিজীবীতন্ত্রের ধারণার বিস্তার ঘটায়। সেটার বিপক্ষে তাই বলেছি। তুমি যদি এই দুটো কেইসের বাইরে ভিন্ন কিছু বুঝিয়ে থাকো, তাহলে আরো স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে বলো ঠিক কী বুঝিয়েছো। আমার কাছ থেকে ঠিক কী জানতে চাচ্ছো?

স্বাধীন এর ছবি

লেখাটি এইবার সময় নিয়ে পড়লাম। ভেবেছিলাম লেখাটি পড়ে বিস্তারিত মন্তব্যের সুযোগ থাকবে, কিন্তু পেলাম না। এক কথায় বলবো আমার ব্লগ জীবনে এ যাবৎ কালে পড়া সেরা কিছু ব্লগের একটি হয়ে থাকবে এই ব্লগটি। এতো স্বল্প পরিসরে রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসটুকু তুলে ধরতে পারাটা সহজ কাজ নয়। সেই সাথে তোমার এখনকার লেখাগুলোর ভাষা শুরুর দিককারের লেখাগুলোর তুলনায় অনেক সহজবোধ্য। কঠিন শব্দ খুব বেশি না থাকার কারণে পড়তে গিয়ে থামতে হয়নি। শুধু আমি একটি বিষয়ের অভাব বোধ করেছি, তা হচ্ছে নৈরাজ্যবাদের ইতিহাস বা অবস্থানটুকু। সাম্যবাদ, কিংবা উদারতাবাদ, কিংবা গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রবাদী এই সবের মধ্যে নৈরাজ্যবাদের অবস্থান কোথায় সেটা যুক্ত করা হলে লেখাটি আরো পূর্ণতা পেতো। যদি সম্ভব হয়, একটি প্যারা যোগ করতে পারো মাঝামাঝি কোথাও।

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

খুব মোটা দাগে বলছি।

একজন নৈরাজ্যবাদী ও একজন উদারতাবাদী, দু’জনেই একমত হবেন যে রাষ্ট্র একক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে অন্যায়কারী, দুষ্ট ও দুর্নীতিপ্রবণ হয়ে উঠতে বাধ্য। কিন্তু উদারতাবাদী যেখানে বলবেন যে আমরা নিরুপায় হয়ে একত্রে সীমিত শক্তির রাষ্ট্র গঠন করি, সেখানে নৈরাজ্যবাদী বলবেন - রাষ্ট্র দুষ্টই যদি হয়, সেটা গঠনের দরকারটা কোথায়? মানে আদর্শবাদিতার পরাকাষ্ঠা আর কি। ওরা বলে - এমন কোনো সেবা বা দায়িত্ব থাকবে না, যেটা সরকার একা পালন করবে। তাদের ভাষায় রাষ্ট্র হলো লিগ্যালাইজ্ড মব। মাফিয়ারা যে কাজ করতে চায়, রাষ্ট্র সেগুলো লিগ্যালি করার অধিকার পায়। জনগণ বাধ্যগতের মতো তার আয়ের একটা অংশ রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু দুরাচার সমান ঘটে। সকল সেবা বা দায়িত্ব যদি একাধিক সংগঠন পালনের অধিকার রাখে, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র বলে আলাদা কোনো বিশেষত্ব থাকে না। বা একাধিক সরকার বলা যেতে পারে। ব্যক্তি বাছাই করবে যে সে তার করের টাকা কোন সংগঠনকে দিলে তার সর্বাধিক মঙ্গল হবে। সব সংগঠন (বা সরকার) তখন তাদের সেবার মান উন্নয়নের জন্য সচেষ্ট থাকবে। না হলে তারা করের টাকা পাবে না। নৈরাজ্যবাদীরা এটাও স্বীকার করে যে এটাও কোনো সর্বরোগ নিরাময়ী নয়। তবে বর্তমানের রাজা শাসনের চেয়ে উত্তম। বর্তমানেরটা রাজার শাসন এই অর্থে যে কেবল একটা সংগঠন এখন শাসন করতে পারে। আগে যেমন এক অঞ্চলে কেবল একটা রাজা শাসন করতো। মানে বর্তমান ব্যবস্থাটা রাজার শাসনেরই অপভ্রংশ। তারা সেটা মানে না। তাই তারা নৈরাজ্যবাদী।

নৈরাজ্যবাদের দুটো রূপ আছে। ব্যক্তি নৈরাজ্যবাদে সবকিছুর চেয়ে ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব সর্বাগ্রে। সামাজিক নৈরাজ্যবাদে সামাজিক সংগঠনের সার্বভৌমত্ব অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তির আগে প্রণিধানযোগ্য। প্রথমটা এসেছে ধ্রুপদী উদারতাবাদ থেকে। পরেরটা এসেছে বামপন্থী আন্দোলন থেকে। ব্যক্তির মুক্তির আদর্শ নিয়ে উদারতাবাদীদের সাথে যেহেতু ব্যক্তি-নৈরাজ্যবাদীদের পার্থক্য নেই, আর উদারতাবাদ নিয়ে যেহেতু আলোচনা হয়ে গেছে, তাই নৈরাজ্যবাদ আর এই লেখায় স্থান পাচ্ছে না। তাদের রাজাহীন শাসন বা একাধিক রাজার শাসন ব্যবস্থা এই লেখায় খুব সংশ্লিষ্ট হচ্ছে না।

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

অভিনন্দন!

স্বাধীন এর ছবি

অভিনন্দন সচলত্বে।

তদানিন্তন পাঁঠা এর ছবি

অভিনন্দন।

ফাহিম হাসান এর ছবি

এখনো পড়ছি। জমাট লেখা, মাঝে একটু রিলিফ রাখলে ভাল হত।

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

কেন, জন লকের ছবি মাঝে আছে না?

ফাহিম হাসান এর ছবি

দেঁতো হাসি তা আছে। কিন্তু প্যাআরাগুলো বড়ই ওজনদার, তার উপর আমিও একটু ধীর পাঠক।

পঞ্চক এর ছবি

সারলীকরণ আছে প্রচুর, মোটাদাগে, ব্রাট্রান্ড রাসেলের দর্শনের ইতিহাস পাঠ এর অভিজ্ঞতায় এরকম হলেও আশ্চর্যের কিছু নাই, ডিটেইলে বলতে যাওয়ার সামর্থ নাই, তবে একটা ছোট উদাহরণ দেই, বাংলায় কার্ল পপারের কথা আর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কথার মাঝে খুব বেশি পার্থক্য পাওয়া যায় না, এক্ষণে পাঠকের বা শ্রোতার উপসংহারে যেতে হবে, সেইখানে সতর্কতা কাম্য। এই লেখায় মাঝে মাঝেই সেইটা লংঘিত হয়েছে বোধ করি, তবে প্রচেষ্টা সাধুবাদ পাবার মতন!

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

লেখাটা লিখেছি অনেকদিন হয়ে গেছে। অনেক বড় লেখা। অসতর্কতার সুযোগ এমনিতেই বেশি। সে অনুযায়ী লেখার সমালোচনা এসেছে কম। আপনি প্রচুর সারলীকরণ পেয়েছেন জেনে ভালো লাগলো। ডিটেইল বললে খুব ভালো হয়। এমনি তে "ব্রাট্রান্ড রাসেলের দর্শনের ইতিহাস পাঠ এর অভিজ্ঞতায় এরকম হলে" বলতে কী বুঝিয়েছেন বুঝি নি। আমি ওটা পড়িনি কিন্তু। আর "বাংলায় কার্ল পপারের কথা আর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কথার মাঝে খুব বেশি পার্থক্য পাওয়া যায় না" কথাটা ব্যাখ্যা করলে ভালো হয়।

পঞ্চক এর ছবি

পপার বলেছিলেন, শান্তির জন্য যুদ্ধ দরকার, এবং সেই মতে "শান্তিকামী' সার্ত্রে কিংবা রাসেলের সমালোচনা করেছিলেন, বুশের "সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' পপারের কথার সাথে হুবুহু মিলে যায়! আপনি নিটশের ট্রিটমেন্ট কিন্তু কতকটা ওরকমই করেছেন।

ধ্রুব বর্ণন এর ছবি

নিৎশে যা খুশি বলতেই পারেন। তবে আলোচনায় ওনার ফ্যালাসিটাই মুখ্য ছিলো। ওনার বক্তব্যটাকে আমি যেভাবে উপস্থাপন করেছি, তাতে ত্রুটি থাকলে দয়া করে জানান।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।