স্কুলে প্রথম দিন

পুতুল এর ছবি
লিখেছেন পুতুল (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৭/০১/২০১৬ - ৩:১৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

স্কুল শুরু হলে দীর্ঘ সময়ের জন্য আর দেশে যাওয়া যাবে না। কারণ এ দেশে স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। বাধ্যতামূলক মানে যেতেই হবে, অন্ততঃ আঠারো বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত। স্কুলে না গেলে অভিভাবকের শাস্তি অবধারিত। কিন্তু দেশে গিয়ে স্কুলে ভর্তির শারীরিক এবং মানসিক পরীক্ষার ধার্যদিন পার করে এসেছে আঁচল। জার্মানে ফিরে পরীক্ষার জন্য নতুন দিন-ক্ষণ নিলাম। আঁচল পাশ করলো।

স্কুলের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলাম একটা বিরাট বড় ঘরে। প্রায় একটা ফুটবল খেলার মাঠের সমান। নাম তার আউলা। আউলায় ঢুকে মাথাও কিছুটা এলো-মেলো হয়ে গেলো! সেখান থেকে বিভিন্ন দিকে বহু দরজা এবং সিঁড়ি দিয়ে বিভিন্ন ক্লাসে যাওয়ার ব্যবস্থা। সে বিরাট হল ঘরে সরকারী পাঠাগার, স্কুলের পরে বাচ্চাকে রাখার সংস্থার ডেস্ক। সম্পূর্ণ দিন স্কুল প্লেকার্ড লেখা ডেস্কের দিকে গেলাম। কারনঃ সেখানেই আমাদের সব সমস্যার সমাধান। সব শুনে বুঝলামঃ সম্পূর্ণ দিন মানে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত। স্কুলের শ্রেণী শিক্ষকরা নিজেই বাড়ির কাজ করিয়ে দেয়। এবং কোন বিষয় কতক্ষণ পড়াবে সেটা শিক্ষকরা ছাত্রদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করে নেয়, এবং পড়ানোর জন্য তারা বাধ্যতামূলক স্কুলের চেয়ে বেশী সময় পায়।

সমস্যা হলঃ এর পর বাচ্চাকে বাড়ি যেতে হবে। গিন্নীর বহু দিনের স্বপ্ন যে, বাচ্চারা স্কুলে গেলে সে কাজ করে টাকা-পয়সা দিয়ে আমাদের ঘর ভরে ফেলবে। কিন্তু সে কাজ করতে হলে অন্ততঃ আট ঘন্টা বাচ্চাকে কোথাও রাখতে হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হল পুরো দিন মানে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত স্কুল আঁচলের জন্য খুবই ভাল হবে। আমি সকাল-দুপুর-রাত্রি কাজ করি। সব সময় মেয়েকে বাড়ির কাজে সাহায্য করতে পারব না। বেগম জার্মান ভাষায় আমার চেয়ে একটু বেশী দুর্বল। কাজেই বাড়ির কাজ স্কুল থেকে করে আসতে পারবে এবং সেটা নিজের ক্লাসের শিক্ষকদের কাছ থেকেই।

কিন্তু সাড়ে তিনটায় ছুটির পর আঁচল থাকবে কোথায়! মধ্যহ্ণ সদনে নিচ্ছে যে বাচ্চারা দুপুর বারোটা পর্যন্ত স্কুলে যাচ্ছে তাদের। আরেকটা পদ্ধতির খবর পেলাম, যেখানে বাচ্চারা বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত থাকতে পারবে। কিন্তু সেখানে পূর্ণদিন মানে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত ক্লাস করা বাচ্চাদের নেয়া হচ্ছে না। এবং এ কারণে শুভ কিছুতেই আঁচলকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত ক্লাসে দেবে না। অথচ আমার বিবেচনায় আঁচলের জন্য এর চেয়ে ভাল আর কিছু হতে পারে না। পূর্ণ দিন স্কুলে সব বাচ্চাকে নেয়াও হয় না। শারীরিক এবং মানসিক গঠনও একটা বিবেচ্য বিষয়।

জার্মান সরকার গত বছর থেকেই জানিয়েছে আঁচল কোন স্কুলে যাবে। কিন্তু এত প্রকারের যে প্রাইমারী স্কুল সে ব্যাপারে কিছুই বলেনি। এখন ইচ্ছে করছে মাথার চুল ছিড়ি। ভেবে দেখলাম পুরো দিনের নিবন্ধন থেকে দুপুর বারটা পর্যন্ত ক্লাসে যাওয়া যাবে। কিন্তু উল্টোটা সম্ভব না। সেখানে আবেদন করলাম এই শর্তে যে, বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত থাকার জায়গা পেলেই আঁচল সে ক্লাসে যাবে।

আঁচলের ভর্তি পরিক্ষা হয়ে গেল, পাশও করল। কিন্তু বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত আঁচলকে আশ্রয় দাতা সংস্থাটি নিশ্চিৎ করে বলতে পারলা না যে, আঁচল ক্লাস শেষে সেখানে যেতে পারবে, কী না। এভাবেই আঁচলের নিবন্ধন শেষ হয়েও হইল না শেষ অবস্থায় ঝুলে রইল গ্রীষ্মের ছুটি পর্যন্ত। ছুটি শুরুর প্রথম দিনে চিঠি পেলাম। আমরা অভীষ্ট লাভ করেছি। আঁচলের জন্য একটি ব্যতিক্রম করা হল। সে পুরো দিন (বিকেল সাড়ে তিনটা) পর্যন্ত ক্লাস করেও বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত শিশু সদনে থাকতে পারবে। তার জন্য দিতে হবে মাসিক প্রায় দু'শ ইউরো।

এবারে (পাঠ্য বই সরকার বিনামূল্যে সরবরাহ করে) আমাদের কিনে দিতে হবে এমন শিক্ষা উপকরনে তালিকা দেখে মাথা ভনভন করে ঘুরতে লাগল! বাধ্যতামূলক স্কুলে নেয়ার একটি বিশেষ ব্যাগ আনিস ভাই এবং উশী ভাবী উপহার দিয়েছে। স্কুলের সারপ্রাইজিং ঠোঙ্গা আঁচল কিন্ডার গার্টেন থেকেই বানিয়ে এনেছে। এখন এই ঠোঙ্গা আঁচলের প্রার্থিত উপহার দিয়ে পূর্ণ করতে হবে। এ দিকে স্কুলের ফরজে আইনের জিনিস পত্র কিনেই আমার মানিব্যাগের ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। শুভ বিরক্ত হয়ে বলে; মেয়ের বিয়েতেও মনে হয় এত বাজার লাগবে না। এর মধ্যে দু'একটা জিনিস স্কুলের তালিকা মতো পাওয়া গেল না। আমরা সবার শেষে কেনা শুরু করেছি তো।

আঁচলের সাথে স্কুলে যাওয়ার জন্য দু'সপ্তাহের ছুটি নিয়েছি। প্রথম দিন স্কুল সকাল ন'টায়। তারপর নিয়মিত সকাল আটটায়। স্কুলে গিয়ে দেখি মানুষের মাথা মানুষে খায়। জার্মানরা সাধারণত বিদায় দিতে নিতেও এত মানুষ বিমান বন্দরে আসে না। আমরা দেরী করে ফেলেছি। শুভ আঁচলকে কোন প্রকারে স্কুলে প্রথম দিন যাদের, তাদের গোল চক্করে ঢুকিয়ে দিল। আমি চারুকে নিয়ে বহু বহু পেছনে পৃথিবীর বহু দেশের জাতীয় পতাকার ভীর ঠেলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার ছবি তুলছি। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা এবং সরকারের একজন প্রতিনিধি শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন।

আঁচলের ওয়ান বি দলের ডাক পড়ল। প্রথম দিন পরিবারের সবাই ক্লাসে যেতে পারবে। আমরাও যাচ্ছি। করিডোরে হাতের বাঁ দিকে ডাইনোসার-ঘাস-লতাপাতা আঁকা। তার পর গুহাবসী মানুষ পাথরে পাথর ঠুকে আগুন জ্বালাচ্ছে। তারপর বাষ্পীয় ইঞ্জিন, রেডিও, টেলিফোন। তারপর উড়ো জাহাজ, চাঁদের পিঠে মানুষ ডিএনএর ডাবল হেলিক্স মডেল। তার পর বাচ্চাদের জ্যাকেট জুতা রাখার আলমারী। তারপর শ্রেণী কক্ষ। সব শিশু তাদের জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারে বসার পর সবাই ছবি তোললাম।

তার পর আমাদেরকে ক্লাস থেকে স্বসম্মানে বের করে দিলেন শিক্ষিকা। বিরতির সময় বাচ্চারা যে ঘরে খেলবে আমরা সবাই সেখানে গেলাম। মনটা খুশীতে ভরে গেল। এ যেন "ছাত্রনাম তঃপ খেলাধূলা"। এত সুন্দর, ছোটদের বসার চেয়ার টেবিল, সোফা, খেলনা। একটা দেয়াল জুড়ে পৃথিবীর ম্যাপ। তার মধ্যে বাংলাদেশ যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। আছে অন্য জায়গায়। ঠিক জায়গায় বাংলাদেশ আনতে গিয়ে দেখি সেটা ইচ্ছে মতো তুলে যেখানে সেখানে লাগানো যায়। জায়গা মতো বাংলাদেশ লাগিয়ে দেখি ভারত মহা সাগরের নীচে ঢাকা পড়ে আছে। ঢাকাকে লাগিয়ে দিলাম বাংলাদেশের নীচে।

চার্চের স্কুল। প্রার্থনা করা হল যেন, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় শিশুরা যিশুর মতো ত্যাগী মানুষ হয়। বাড়ি ফিরে আঁচল তার সারপ্রইজিং ঠোঙ্গা খোলার অধীর আগ্রহে পাগল প্রায়। খুলে সব দেখে খুব খুশী। কিন্তু এ যেন বরের জন্য সঞ্চিত পূণ্য কিন্তু বর এখনো মেলেনি। ঠোঙ্গার সব চকলেট, মিষ্টি চারু কিছু খাচ্ছে, কিছু ভবিষৎ-এর জন্য সোফা এবং খাবার টেবিলের নীচে সঞ্চয় করছে। আঁচলের ফরমায়েসী সারপ্রাইজ ঠোঙ্গার ভেতর আঁটেনি বলে শুভ অন্য প্যাকেটে রেখেছে। আনন্দ বিষাদে রূপান্তরিত হওয়ার উপক্রম দেখে আমি প্যাকেট এগিয়ে দিলাম। ত্রস্তে প্যাকেট খুলে আঁচল বলে হ্যাঁ বাপু আমি এটাই চেয়েছিলাম। তুমি খুব cool বাপু বলে ব্যাঙ্গের মতো একটা ঝাপ দিয়ে আমার গলায় ঝুলে গেল। আমি বললাম জলপরী বারবি তোমার জন্য মা কিনিছে, আমি নই। এবার মাকে সইতে হল আর এক দফা গলায় ঝুলোনী।

পরের দিন সকাল ছ'টায় লাফ দিয়ে এত দ্রুত খাট থেকে নামল আঁচল যে, ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে পড়ে গেল মেঝে। আমার মেয়ে এত আগ্রহ নিয়ে কখনো কিছু করে নি। এই্ আগ্রহ যেন শেষ আব্দি থাকে।

ছবি: 
18/10/2007 - 10:08অপরাহ্ন

মন্তব্য

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

বহুদিন পর লিখলেন, আচ্ছা 'তীর্থের কাক' কি বই আকারে বেরিয়েছিলো?

অতিথি লেখক এর ছবি

পৃথিবীর সকল শুভ কামনা তোমার জন্য আঁচল মামণি! বাস্তবের দুনিয়াতে পথ চলা শুরু করলে। তোমার এই পথ চলা নিরাপদ হোক, সফল হোক। বড় হয়ে বুঝতে পারবে তোমার বাবা-মা কি নিদারুণ সংগ্রাম করে, কি অপার মমতায় তোমাকে এই জীবন উপহার দিয়েছেন। আশীর্বাদ করি তাঁদের মতো ভালো মানুষ হও।

রানা মেহের এর ছবি

কাল আপনার নাম দেখেই পড়ে ফেলেছিলাম। কতদিন পর লিখলেন।

আঁচল মামণির জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
আমার ছেলেও এই সেপ্টেম্বরে স্কুলে যাবে। ভালো লাগছেনা। বাচ্চাগুলো এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায় কেন?

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

মেঘলা মানুষ এর ছবি

সব বাচ্চার স্কুল আনন্দে ভরে থাকুক হাসি

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

সবার অভিজ্ঞতাই মোটামুটি একই রকম। আঁচলের জন্য শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

এক লহমা এর ছবি

অবশ্যই থাকবে।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

এখানে এলিমেন্টারি স্কুল শিক্ষাবোর্ডের মটো হচ্ছে "পাওয়ার অব প্লে"। কাজকর্ম দেখে মনে হয় লেখাপড়া ব্যাপারটা খেলাধুলা আর খেলাধুলা ব্যপারটা লেখাপড়া।
_____________________
সৌমিত্র পালিত

PARTHA এর ছবি

শুভ কামনা আঁচল মা!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA