অস্তিত্বের দ্বৈততা

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বিষ্যুদ, ০২/০৬/২০১১ - ৯:৫৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১।
নোনা ধরা দেয়ালটার উপর দিয়ে হাত বুলিয়ে নিতেই কেমন সাদা লবণের মত বালুর গুড়ো ঝরে পড়লো খাটের কোনটাতে। বিছানার চাদরটাও ধোয়া হয় না কতদিন। সব সময় গুমট হয়ে থাকে ঘরটা। পাশের বাসাটা উঁচু হতে হতে এখন সাততলা হবে হবে করছে। তখনি মনে পরে সেখানে ছিল একটি বেড়ার ঘড়, একটি মজা পুকুর। বৃষ্টি হলে পুকুর আর রাস্তায় পানি জমে এক হয়ে যেত। তখন কনকদের বাসাটা নতুন। আশে পাশের সব বাড়ি থেকে উঁচু ছিল বাড়িটা। সে এই বাড়িতেই তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে। ছাদে দাড়িয়ে বাড়ির দুই পাশে দুটো পুকুরে মাছের ঘাই দেয়া ঢেউ এর দিকে তাকিয়ে সে তার জীবনের কত সকাল-সন্ধ্যা কাটিয়েছে।

ঝোপের ভেতর সাপ আর বেজির লড়াই দেখেছে। বঁড়শিতে ফড়িং গেঁথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইটের দেয়ালের উপর বসে থেকেছে ঘাপটি মেরে একটা রঙ্গিন খোলসে মাছের আশায়। চোখ ধাঁধানো রোদে খালি গায়ে নীল হাফ প্যান্ট পরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে বেরিয়েছে বাড়ির সামনের ইটের রাস্তা ধরে ভোকাট্টা হওয়া একটা গাহেল ঘুড়ির সুতায় সবার আগে হাত রাখার দুরন্ত প্রতিজ্ঞায়। বাড়িটার মেইন গেট থেকে ছোট উঠানের মত জায়গাটা পার হয়ে ভেতরের দিকে ঘরে ঢোকার মুখে একটি কেঁচি গেট আছে। সেটার সামনে চৌবাচ্চার মত করে গর্ত করেছে সারাদিন রোদে ঘেমে। বালতিতে করে পানি এনে সেখানে ঢেলে রেখেছে বড়শিতে মাছ উঠলে সেগুলো কে থাকতে দেবে বলে। যেন একটা মাটির একুরিয়াম। রেডিওতে লাক্স সঙ্গীতমালা যখন ঐ ইটের রাস্তার ওপাশে রিক্সার গ্যারেজে বাজত সে হয়ত তখন তাদের বাসার কন্সট্রাকশনের জন্যে রাখা বালির ঢিবিতে বসে কাগজে চুম্বক মুড়ে কালো বালুর চুম্বক আলাদা করতো। এই বাড়িটা তখন একদম নতুন তৈরি হচ্ছে।
সেই বাসাটা এখন পুরনো হতে হতে বুঝি মাটির নিচে ঢুকে যাচ্ছে। নোনা ধরা দেয়ালের খসে পরা আস্তর গুলো হাতে নিয়ে মনের ভেতর কত স্মৃতি হুমড়ি খেয়ে পরে। কনকের বয়স এখন চব্বিশ। ছোটবেলার সেই রৌদ্রজ্জ্বল স্বর্ণ-দিন আর নেই। তার ঘরের দেয়ালের সাথে সাথে জীবনেও নোনা ধরেছে। এই স্যাঁতস্যাঁতে পুরানো বাড়িটার কর্তী, কনকের মা যেদিন থেকে অসুস্থ, এই বাড়িটাও সেদিন থেকে নিষ্প্রাণ। মা যেদিন কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠে বাড়িটাতে প্রাণের ছটা লাগে।
কিছুদিন ধরে কনক তার জীবনে এমন একটি ভয়ানক ব্যাপার লক্ষ্য করেছে যে কাউকে সে কথা বলতেও পারছে না। সে কথা কেউ বিশ্বাস করবে না অযথা তাকে পাগল ভাববে। এমন একটি ব্যাপার যা মনেও চেপেও রাখা যায় না। তাই সে ঠিক করে গল্পের মত করে কোন একটা ব্লগে শেয়ার করবে অচেনা অজানা মানুষের সাথে। একটি অদ্ভুত গল্প হয়ে থেকে যাবে তার সেই গোপন কথা।

২।
আজ তার সেই একান্ত অস্থিরতা প্রকাশ পাবে সবার সামনে ভাবতেই বুক ধড়ফড় করে উঠে, আঙ্গুল গুলো কাপতে থাকে। ড্যাম হয়ে চুন খসে যাওয়া দেয়ালের গায়ে হাত রেখে একটি চিকন ফাটল দিয়ে কালো পিঁপড়ার লম্বা লাইনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। সাদা বালুর মত নুন জমা ধুলো গুলো কে ঐতিহাসিক মনে হয়। সে হাত মুছে লিখতে বসে। লক্ষ্য করে ল্যাপটপটাও কেমন পুরনো হয়ে যাচ্ছে। ঘরের আসবাব পত্র গুলো কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে। সবকিছুতেই কেমন অবহেলা, আর অযত্নের ছাপ। লেখা বড় হতে থাকে, আর রাত বাড়তে থাকে। যে কথা কাউকে বলা হয়নি কখনো সে কথা গুছিয়ে লিখতে বেশ খাটুনি আছে। তার উপর গভীর রাত। হঠাৎ ক্ষুধা মাথাচারা দিয়ে উঠে। কনক খাবার ঘরে যায়। মিট-সেলফ থেকে রান্না করা মাংসের পাতিলে বের করে দেখে তেল জমাট বেধে আছে। গরম না করে খাওয়া যাবে না। রান্না ঘরের লাইট ফিউজড। তাই ঘরটাতে আটকা পরেছে অন্ধকার। মোমের আলোয় পরিচিত যায়গায়ও নতুন কিছু চোখে পরে। সে দেখতে পায় জানালার শিক গুলোতে কেমন কাস্টে আঠার মত ময়লা জমে আছে। বেশ কিছুদিন ধরে রাত জেগে জেগে তার শরীর মন ক্লান্ত হয়ে ছিল। ক্লান্তির কারণেই কিনা কে জানে, একটি অচেনা ভ্রম তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। অন্য একটি চেনা রান্না ঘরের ছবি ভেসে উঠে মনে। সেখানে গভীর রাতে তেতে উঠা গ্যাসের চুলা নয়। সেখানে আছে ইলেকট্রিক স্টোভ, সাদা ওভেন, সাদা ক্লজেট। বটির বদলে ছুরি। কেমন ঘোর লাগা এই কল্পনায় দেখা সে ছবি শান্ত পানিতে তরঙ্গের মত দুলে উঠে। সে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে যেতে দেয়াল ধরে দাঁড়ায়। গ্যাসের চুলায় রাখা গরম পাতিলের ছ্যাঁকা খেয়ে কনকের হাতে ফোস্কা পরে তখন।

৩।
কনক ঘুম থেকে উঠল প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে। রাতে স্বপ্নের মত দেখা তার ফেলে আসা বাড়িতে গত রাতের ঘটনাগুলো কে সত্যি বলে মনে হয়। ইদানীং প্রতি রাতেই সে একই ধরনের স্বপ্ন দেখছে। ঘুমলেই বুঝি সে তার নিজের ঘরটাতে ফিরে যেতে পারছে। সেখানের সব কিছু সে এমন ভাবে অনুভব করে যে প্রতি সকালেই সে চোখ মেলে চমকে উঠে এই অচেনা গুমট বাক্সের মত ঘরে। চোখ বুজে আবার ফিরে যেতে চায় তার ফেলে আসা নিজের ভুবনে। যেখানে ঘর ঘর শব্দ করে চলা সিলিং ফ্যানটা ঘুরতে থাকে রাতভর। যে ঘরের জানালা ঝড়ের দমকা বাতাসে সশব্দে বাড়ি খেয়ে বাড়ির সবাই কে তটস্থ করে দেয়। বাতাসে নিয়ে আশে পেঁপে ফুলের ঘ্রাণ। বাড়ির পেছনে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা দুটো পেয়ারা আর জামরুল গাছের ডাল পালার নড়াচড়া। এসব সে প্রতি রাতে ঘুমের ঘোরে অনুভব করে। কিন্তু কেন যেন সে স্বপ্নে কোন মানুষের দেখা পায় না।
কনক ভাবে, বিদেশে পড়তে এসে বন্ধুহীন এই অমিশুক সমাজে প্রথম কিছুদিন সবারই বোধহয় এমন অনুভূতি হয়। কিন্তু সে তো অনেকদিন হল এসেছে। তার তো এতদিনে অভ্যাস হয়ে যাবার কথা। কেন স্বপ্ন গুলো কে এত সত্যি মনে হয় সে শত ভেবেও বের করতে পারেনি। কেমন করে এখনো তার ফেলে আসা নোনা ধরা ঘরটাতেই বসবাস করতে থাকে সে বুঝতে উঠতে পারে না! মানুষ মরে গেলে কখনো কখনো অতৃপ্ত প্রেতাত্মারা ঘুরে বেরায় বলে শোনা যায়। সেটাও না হয় মেনে নেয়া যায়। কিন্তু সে তো মরেনি। তার প্রেতাত্মা কোথা থেকে আসবে? তবে কি প্রচণ্ড ভাবে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশে শরীরে অনুপস্থিতিই অতৃপ্ত আত্মার জন্ম দেয়? কেউ না বিশ্বাস করলেও এটা তো সত্য যে সে এখনো সেই ফেলে আসা ঘরের সব কিছু ঠিক আগের মত অনুভব করে যাচ্ছে। কেমন করে হচ্ছে এসব সে কিছুই জানে না। কিন্তু এই যে, এই গরম পাতিলে ছ্যাঁকা খাওয়া দগদগে ফোস্কাটা যখন তার হাতে যখন স্বপ্ন থেকে বাস্তব হয়ে যায় তখন তার অস্থিরতা তাকে একটি বদ্ধ উন্মাদে পরিণত করে। সে তার জীবনের দ্বৈত উপস্থিতি টের পায়।
এই শীতার্ত শহরের কোলাহল হীন কোনে একলা একটি ঘরের কাফন-সাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়েও সে স্পষ্ট দেখতে পায় টিউব লাইটের কাছে বের হইয়ে থাকা ইলেকট্রিক ক্যাবল কে অগ্রাহ্য করে একটি শিকারি সরীসৃপ তার সাপের মত জিভ বের করে নিঃশব্দে একটি প্রজাপতি কে লক্ষ করে মাপা চোখে এগিয়ে যাচ্ছে। কনক জানে অত্যাধুনিক এই বাসায় কোণ টিউব লাইটের তার বের হয়ে নেই। নেই কোণ সরীসৃপ এই শীতের সময়। এ দৃশ্যটি তার পুরনো ফেলে আশা ঘরের। সে দুটো ঘরের অস্তিত্বই অনুভব করতে থাকে। দুটোই যায়গা কনক স্পষ্ট দেখতে পায়, শুনতে পায়, ধরতে পারে। শুধু একটি জিনিসই সে মেলাতে পারে না। বহুদিন কোন মানুষের দেখা নাই কোন খানে। প্রচণ্ড মাথা ব্যথা আর বমি বমি ভাব নিয়ে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে কনক তাকিয়ে থাকে গত রাতের গরম পাতিলে লেগে তার হাতে পুরে যাওয়া দগদগে ঘা এর দিকে। সামনের ঘোলাটে আয়নায় উষ্কখুষ্ক দাড়ি চুল আর হলুদ দাঁতের শুকনো হার জিরজিরে একটি মানুষ ঝুঁকে আছে কলের পানির দিকে চেয়ে।

ছাইপাঁশ

রকিবুল ইসলাম কমল


মন্তব্য

মেঘাচ্ছন্ন এর ছবি

বেশ ভালো লেগেছে লেখাটা।

রকিবুল ইসলাম কমল এর ছবি

ধন্যবাদ আপনাকে।

কমল

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।