ঊনপঞ্চাশ বছর আগের কথা

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ২১/১২/২০২২ - ২:৩৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ইদানিংকালে শব্দগুলো জট পাকিয়ে যায়, বাক্য শেষ হয়ে ওঠে না। সহজ কথাগুলি মুখে এসেও মুখ থেকে প্রক্ষিপ্ত হতে গিয়ে জটিল হয়ে যায়। মনে কত কথাই আসে, কত স্মৃতি, কত দেখা অদেখা উপভব অনুভব এসে এই গৃহের অন্তঃপুরে দানা বাঁধে। মায়ালিসা কতবার বলেছে- মা, এখন তুমি অনেকটা সময় পাও, একটা ডায়েরি কিনে লেখ না কেন? মেয়েরা আমাকে বলে, এখন তো আর আমাদের পেছনে সময় দিতে হয় না, কাজের চাপ তেমন নেই, তোমার ছোট বেলার বড় বেলার কত কথাই তো শুনতাম আগে, সেসব সামান্য করে দু চার লাইন করে লিখে রাখ আমরা পড়ব।
কিন্তু আজকাল মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয় তাড়াতাড়ি। নিজেকে হারিয়ে ফেলা যেমন মানুষের স্বভাব, জন্মগ্রহণ করার মুহূর্ত থেকে মাতৃজঠরের অনাবিল সুখ-কোটরতার সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবার মধ্য দিয়ে পার্থিব জগতের কঠোরতায় পদার্পণমাত্র মানুষ যেমন করে নিজেকে হারিয়ে ফেলে অন্য কিছুর সন্ধান করতে থাকে, যেমন করে মানুষ নিজ ও সেই অন্যকিছুর দোলাচলে দুলতে দুলতে একটি মধ্যজীবে পরিণত হয়, ঠিক তেমন করেই আমিও নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। তাই আর লিখতে পারি না। তবু মেয়ের প্ররোচনায় ইদানিং সামান্যই চেষ্টা নিয়েছি।

একটা অভিজ্ঞতার মধুর স্মৃতিকথা বলতে ইচ্ছে হল।

সময়টা ছিল ১৯৭৩ সালের মার্চ মাস। আমি ইন্টারমেডিয়েট সেকেন্ডইয়ারের ছাত্রী। শিক্ষা সফরেরে জন্য আমরা কয়েকজন মিলে প্রিন্সিপাল আপার কাছে বায়না ধরলাম। অনুমতিও মিলে গেল এক পর্যায়ে। খুশিতে রাতে আর ঘুম হয় না। দিন তারিখ ঠিক হতে লাগল কবে যাব, কে কে যাবে, কোন কোন স্যার আপা সাথে যাবেন ইত্যাদি। ঠিক হলো চারজন স্যার আপা আমাদের সাথে যাবেন, আমরা যাব ময়মনসিংহ ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে।
শিক্ষক এবং আমাদের কলেজ কতৃপক্ষ সব ব্যবস্থা করল। যাবার দিন এসে পড়ল। ট্রেনে আমাদের জন্য প্রথম শ্রেনীর একটা কামরা রিজার্ভ করা হয়েছে। বিশজন ছাত্রী আর চারজন শিক্ষক সহ আমাদের দলটার ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো। জীবনে কখনও ঢাকায় যাইনি, বান্ধবীরা সহ ঢাকায় যাচ্ছি, কী কী দেখব সেসব পরের কথা, আমরা ঢাকায় যাচ্ছি এটাই বড় কথা। স্যার আপারা বললেন, মেয়েরা গান ধরো, তাহলে যাত্রাটা আরও মধুর হবে। বান্ধবী রোকসানা আফরোজ রিক্তা (প্রয়াত) সেই বয়সে রংপুর বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী, সে গান ধরল। একের পর এক রিক্তার গানে আমাদের যাত্রা আরও আনন্দময় হয়ে উঠছিল।

পরদিন সকাল। আমরা কমলাপুর স্টেশনে পৌছে গেছি। দুটো জীপ গাড়ী এসেছে দেখলাম আমদের নিতে। কোথা থেকে এসেছে, কারা পাঠিয়েছে এইসব চিন্তা মাথায়ও এলো না। আমরা কলকল করতে করতে গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে উঠে পরলাম। এসে উঠলাম সিদ্ধেশ্বরী কলেজের হোস্টেলে। সব খুব ঠিকঠাক ভাবে ব্যবস্থা করে রাখা ছিল। সেদিন কোনও কাজ নেই, খাওয়া দাওয়া করে আমাদের রেস্ট নিতে বলা হলো। পরদিন সকাল নয়টায় আমাদেরকে তৈরি থাকতে বলে জীপ দুটো চলে গেল।

পরদিন নির্ধারিত সময়ে আমরা তৈরি ছিলাম। জীপ দুটো আসল। কোথায় যাচ্ছি তা জানার কারও আগ্রহ নেই। আর আমাদেরকে বলাও হলো না কোথায় যাচ্ছি, বলা হলো গেলেই দেখতে পাব। কিছুক্ষণ কিছু রাস্তা পার হয়ে একসময়ে গাড়ী দুটো একটা সরকারি ভবনের সামনে এসে থামল। আমরা মেয়েরা সবাই ফিসফিস করছিলাম। কিছুক্ষণ গাড়িতে অপেক্ষার পর আমাদের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। আমরা সারিবদ্ধভাবে যাচ্ছি আর একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছি। স্যার আপারা মিটিমিটি হাসছেন, আমাদের বললেন- মেয়েরা ভদ্র হয়ে থাকবে কিন্তু। সবাই খুব উত্তেজিত হয়ে ভাবছিলাম, আমরা যা ভাবছি তাই কি সত্যি!

আমরা একটা বড় রুমে ঢুকলাম, সামনে যাকে দেখতে পেলাম তাতে আমার হাত পা ঘাড় উত্তেজনায় কেমন কাঠ হয়ে আসল, খুব শীত করতে লাগল। চোখের সামনে বসে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। শিক্ষকেরা আমাদের কলেজের নাম বলে নিজেদের পরিচয় দিলেন। তারপর আসল আমাদের পালা। আমাকে দিয়ে শুরু হলো। মানুষ নিজের নাম দিয়ে শুরু করে, আমি অতি উত্তেজনায় কি না জানি না নিজের নামটা না বলে বলা শুরু করলাম- আমি ইন্টারমেডিয়েট সেকেন্ডইয়ারে পড়ি, আমি বেগম রোকেয়া কলেজের কলেজ পত্রিকার সম্পাদিকা, স্যার এই পত্রিকাটা আপনার জন্য। ব্যাগ থেকে তড়িৎগতিতে একটা কলেজ পত্রিকা বের করে ওনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। বঙ্গবন্ধু পত্রিকাটি হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি নাম তোর?’
কী দীর্ঘকায় দেখতে, কী গমগমে কন্ঠ তাঁর!
আমি বললাম, স্যার আমার নাম রেহানা। বঙ্গবন্ধু খানিকটা তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘তুইতো আমার ছোট মেয়ের নামটা কাইড়া নিছোস।’ আমি আনন্দে আপ্লুত হয়ে পরিস্থিতির আতিশায্যে এগিয়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধু্র পদধূলি নিলাম। এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেই মুহূর্তটির কথা। মাঝে মাঝে মনে হয় এত সাহস তখন হঠাত এসেছিল কীকরে!

আমাদের সবার জন্য বঙ্গবন্ধু স্যান্ডউইচ দিতে বললেন। চলে আসার সময় আবার একজন স্যারের হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'মেয়েদের খাবারের জন্য কিছু টাকা রাখেন প্লিজ।' কেমন অহঙ্কারবিহীন, সাদামাটা, উদাত্ত দরাজ উপস্থিতির একজন মানুষকে দেখলাম আমরা সবাই।

প্রধানমন্ত্রী দর্শন শেষে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাইদ চৌধুরীর সাথে দেখা করাতে। তারপর একদিন আমাদের সংসদভবনের ভেতরের কার্যক্রম দেখাতেও নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর আমরা গেলাম এফডিসিতে। অভিনেতা রাজ্জাক, অভিনেত্রী শাবানা, কবরী সবাইকে দেখতে পেলাম চোখের সামনে, কথা বললাম তাঁদের সাথে। আমাদের জন্য বিরাট ব্যাপার!

একদিন আমরা গেলাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাড়ীতে। বান্ধবী রোকসানা আফরোজ রিক্তা সেদিনের সেই বৈঠকে গেয়েছিল- ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি, করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি। আর কাজী নজরুল ইসলামের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরছিল, সে অশ্রু মোছার কোনও তাড়া ছিল না তাঁর।

মফস্বলের একটা কলেজের ছাত্রী ছিলাম আমরা। আমাদের কে এত বিরাট মানুষদেরকে দর্শন করানোর পেছনে যিনি সার্বক্ষনিক আমাদের সাথে সাথে ছিলেন তিনি ছিলেন কোনও একজন মন্ত্রীর পি এস (আমার স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে), নাম তাঁর ছিল যতদূর মনে পড়ে মকবুল হোসেন। জনাব মকবুল হোসেন নামের সেই ভদ্রলোক আমাদের জন্য ওই কয়দিনে যে আন্তুরিকতা, মিষ্টভাষীতা ও স্বদব্যবহারের নজির রেখেছিলেন, তা আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। সাহস করে ফিরে আসার দিন ওনাকে আমার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে বলেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সাথে আমাদের ছবিটা যদি পাঠিয়ে দেন তো খুবই কৃতজ্ঞ হবো। সেই ছবি যে উনি সত্যিই পাঠাবেন তা বিশ্বাস করতে পারিনি। এইসব বিরল আন্তরিকতা আজও মনে পড়ে।
কিন্তু সেইসব ছবি থাকে না, হাতছাড়া হয়ে যায়। ছবিটা আগলে আগলে রেখেছিলাম। একদিন একজন এসে বলল, ছবিটা তার স্ত্রী কে দেখিয়ে আবার দিয়ে যাবে। তারপর এই কাজ সেই কাজ আজ দিব কত কাজ কাল দিব ইত্যাদি করে সেই ছবি আর কোনদিন ফিরে আসেনি।
তবে আজ কিন্তু মনে হয় ছবির চেয়েও উজ্জ্বল আমার মানসপটের ঊনপঞ্চাশ বছর আগের সেই অভাবনীয় মুহূর্তটা।

---

খন্দকার রেহানা সুলতানা


মন্তব্য

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আমি আপনার মেয়েদের বয়সী নই, তবে আপনার ছোট ভাইয়ের বয়সী তো বটেই। আমিও অনুরোধ করছি, আপনি লিখুন, নিয়মিত লিখুন।

আপনি আপনার সময়কার কথা লিখুন। ঐ সময়কার মানুষ, জীবনযাত্রা, উৎসব, সামাজিকতা, মূল্যবোধ, স্বপ্ন ইত্যাদি যা খুশি - আপনার যা মনে পড়ে, আপনার যা ভালো লাগে।

মানুষ যখন অকপট মনে লেখেন তখন তাঁর লেখায় সেটার ছাপ পড়ে। আপনার লেখায় সেই অকপট ব্যাপারটি ফুটে উঠেছে। তাই আপনার লেখা সাবলীল ও মনোগ্রাহী।

জীবনে কাজ আছে, নানা ব্যস্ততা আছে, নানা দায়িত্ব আছে, অসুস্থতা আছে, মন খারাপের ব্যাপার আছে। এই সব কিছু মেনে নিয়েও প্রতিদিন কয়েক লাইন করে হলেও লিখুন। আমাদের সাথে শেয়ার করুন।

আপনার সুস্থতা কামনা করছি। ভালো থাকবেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

Rehana এর ছবি

আপনার মন্তব্যে সত্যি অনুপ্রাণিত হলাম। ধন্যবাদ অনেক।

নৈ ছৈ এর ছবি

অসাধারণ!

Rehana এর ছবি

ধন্যবাদ আপনাকে।

ডা. মো. রুমী আলম  এর ছবি

অসাধারণ স্মৃতি চারণা। বংগবন্ধুর সাথে দিতে পারলে ইতিহাসের অনন্য সাক্ষী হয়ে থাকতো। ওই অবিবেচক, যিনি ফটোটা নিয়ে আর দেননি, তাঁর জন্য করুণা হয়, যার ইতিহাসের প্রতি মায়া নেই।

Rehana এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।

কর্ণজয় এর ছবি

জীবন বয়ে যায়
জীবন থেকে জীবনে।
আপনার জীবনের স্মৃতিগুলো যেন
নবজন্ম হলো আমার মধ্যে
আমারই স্মৃতি হয়ে

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।