মা দিবসের ইতিবৃত্ত

রকিবুল ইসলাম কমল এর ছবি
লিখেছেন রকিবুল ইসলাম কমল [অতিথি] (তারিখ: সোম, ১৩/০৫/২০১৩ - ৮:৪২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ঘটা করে মা দিবস পালন করা নিয়ে আমাদের সমাজে দুই রকমের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। কেউ দিবসটি উপলক্ষে মা´র প্রতি সেদিন একটু বেশি ভালবাসায় সিক্ত হন, আবার কেউ হয়ত বছরে এই দিনটিতে ভক্তি-ভালবাসা প্রকাশের অতিসাহ্য কে কিছুটা বিরক্তির চোখে দেখেন। যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পুরো ব্যাপারটাই এখনো খুবই শহুরে এবং দিবসটি সরকারি ভাবে কোনো ছুটির দিনও নয়। তারপরও বিগত ১০/১২ বছর ধরে এই দিবসটি নিয়ে পত্রিকার ও অন্যান্য মিডিয়াতেও আলোচনা লক্ষ্য করেছি। আমি ব্যক্তিগত ভাবে বছরে, মাসে বা সপ্তাহে একটি করে মা দিবস থাকলেও তাতে কোনো ক্ষতি দেখি না।

আজকের মা দিবস উপলক্ষে গতকাল থেকেই লক্ষ করছি প্রায় সবার ফেইসবুকের প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তনের জোয়ার চলছে; যার যার মার ছবি দিয়ে সবাই আগের ছবিটাকে রিপ্লেস করছে। তাই দেখাদেখি হয়ত অন্য আরেক ফেইসবুক ফ্রেন্ডের মনে পড়ছে, যারা এলবাম থেকে মা´র সাথে নিজের একটা ছবি প্রো-পিক করতে গিয়ে হয়তো প্রথমবারের মত আবিস্কার করবে যে, নানান সময় নানান ভঙ্গিতে তোলা প্রায় সব বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের সাথে সুন্দর সুন্দর ছবি আছে ঠিকই কিন্তু নিজের মা´র সাথে রিসেন্টলি তোলা কোন ছবি নাই! অন্তত ফেইসবুকে দেয়ার জন্যে হলেও কেউ কেউ মাকে নিয়ে সেজেগুজে একটি ছবি তুলবে। মা ফেইসবুক কি জানুক আর না জানুক ছেলেমেয়েরা আগ্রহ নিয়ে তাঁর সাথে ছবি তুলছে তাতেই নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়ে যাবে। আবার কেউ হয়তো আজ অফিস থেকে বা স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে তার মা´র জন্যে কিছু একটা কিনে নিয়ে আসবে; দিবসটা না থাকলে হয়ত প্রতিদিনের যাপিত জীবনের আড়ষ্টতার কারণে আলাদা করে আজকে আর কিছু করা হয়ে উঠত না।

এই দিবসটি নিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনাটাটিও বেশ ইন্টারেস্টিং। আন্না জার্ভিস, যিনি মূলত মা দিবসটিকে নিজ উদ্যোগে অনেক খাটাখাটনি করে প্রচলন করতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি নিজেই শেষ বয়েসে মা দিবস উপলক্ষে ফান্ড রেইজিং সংগঠন, বিভিন্ন কার্ড বিক্রয় ও প্রোডাকশন হাউজের বিরুদ্ধে মামলা করে করে তার পারিবারিক অর্থ সম্পত্তি যা ছিল তার বহুলাংশ সেসব মামলা চলতে খরচ করেছেন। তিনি নিজে কখনোই মেনে নিতে পারেননি যে তার কষ্টের প্রচলিত মা দিবস নিয়ে গ্রিটিংস কার্ড প্রোডাকশন হাউজ, চকলেট কোম্পানি, কনফেকশনারি, জুয়েলারি গুলো ব্যবসা শুরু করবে। ইদানিং মা দিবসের থিম প্রায় প্রতিটি কোম্পানি, বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যাল এবং মোবাইল ফোন কোম্পানি গুলোও তাদের প্রোডাক্ট বিক্রয়ের বিশেষ মার্কেটিং ক্যাম্পেইন হিসাবে ব্যবহার করছে। সেসময় এধরনেরই কিছু মুনাফালোভী প্রচারনায় বাধা দেয়ায় সমাজের শান্তি নষ্টের অভিযোগে পুলিশ তাকে একবার এরেস্টও করেছিল একবার!

জার্ভিসের ইচ্ছে ছিল মে মাসের দ্বিতীয় রোব বার, এই দিনটি ছেলে মেয়েরা তাদের মা এর সাথে খুব অন্তরঙ্গ ভাবে নিজেদের মত করে সময় কাটাবে; দোকানের কার্ড, ফুল, বা কনফেকশনারির কেক চকলেট দিয়ে নয়। কিন্তু দিবসটি প্রচলিত হবার পর কিছু বছর পরই তিনি বুঝতে পারেন যে এই দিবসটি ব্যবসায়ীদের কাছে একটি কমার্শিয়াল গোল্ড মাইনে পরিনত হয়েছে। তাই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া সত্বেও জার্ভিস নিজেই আমেরিকান সরকারের কাছে লবিং করেছেন যাতে দিবসটি আর সরকারী ভাবে পালন না করা হয়।

মা দিবসের বিবর্তন:

[১৮৫০ সাল] মাদার্স ডে ওয়ার্ক ক্লাব: (ভালোভাবে শিশু পালনের উপর প্রশিক্ষণ এই ক্লাবের মূল প্রতিপাদ্য ছিল)
[১৮৬৮ সাল] মাদার্স ফ্রেন্ডশিপ ডে: (আমেরিকার সিভিল ওয়ারে বিভক্ত হয়ে পরা জনগোষ্ঠীকে একত্রীকরণ করায় ভুমিকা রাখত)
[১৯০৫ সালে] আন রিভিস জার্ভিস মারা যান। এবং পরবর্তীতে তার মেয়ে আন্না জার্ভিস, প্রথম ১৯০৮ সালে আন্না সর্ব প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাবে সন্তানদের প্রতি মায়ের ত্যাগ কে সম্মানের সাথে স্মরণ করার জন্যে মাদার্স ডে বা মা দিবস পালন করেন। যদিও তার নিজের কোনো সন্তান সন্ততি ছিল না।
[১৯৪০ সাল] আন্না জার্ভিস মা দিবস বর্জন করেন এবং দিবসটি সরকারী ক্যালেন্ডার থেকে মুছে দেবার জন্যে লবিং করেন।

[তথ্য সূত্র: হিস্টোরি ডট কম]

- ছাইপাঁশ

পুরোনো লেখা:

এসো এবার ফুলের রঙটা দেই পাল্টে
অভাজনের প্যারিস ভ্রমন -পর্ব চার
অভাজনের প্যারিস ভ্রমন – পর্ব তিন
অভাজনের প্যারিস ভ্রমন – পবর্ দুই
অবশেষে প্যারিস যাত্রা
এই গরমে ঘোল খান
অচেনা পাখি
I day 2010, প্রবাসে প্রথম সাফল্য
একজন ‘লেখক’ এবং বছরের প্রথম দিন!


মন্তব্য

তারিফ শেরহান শুভ  এর ছবি

সবকিছুকে নেতিবাচক চোখে দেখলেই দেখা যায়, আবার একটু জ্ঞানী জ্ঞানী ভাবও বোধহয় আসে এতে। তবে একটা ব্যপার দেখুন, সবাই কিন্তু শুধু লোক দেখানোর জন্য ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয় না বা ছবি আপলোড করে না। তাহলে আমরা কিছু মানুষের জন্য কেন সবার ভালবাসাকে ছোট করব? আবার দেখুন, অনেকেই কিন্তু আগে থেকেই আপলোড করা একটা ছবি শুধু নতুন করে প্রোফাইল পিকচার বানিয়েছে। তাহলে? ঐ ছবিটা তো সে মা দিবসের আগেই আপ করেছে। তার ভালোবাসাকে আমরা ছোট করব কেন? আর ব্যবসায়ের কথা যদি বলি, তাহলে তো মুখ দিয়ে গালি ছাড়া কিছু বের হয় না। প্রথম আলোর শেষ পাতায় ঐদিন 'স্বপ্ন' এর বিজ্ঞাপনটা দেখেছিলেন? কত টাকার বাজার করলে যেন ওরা মায়ের জন্য উপহার দিচ্ছিল বা এইরকম একটা কিছু ছিল। এটাকে বলে নোংরামি। অর্থাৎ, আমরা কিভাবে দিবসটি ব্যবহার করছি এইটা দিয়ে ঐ দিবসের গুরুত্বকে ছোট করার মানে হয় না। আপনার লেখাটা বেশ পরিচ্ছন্ন লেগেছে।

ছাইপাঁশ  এর ছবি

আমারতো ধারণা কেউই লোক দেখানোর জন্যে মার ছবি প্রোফাইল পিকচার করে না! সবাই ভালবাসা থেকেই করে। (আর ´´যাদের প্রোফাইল পিকে কিংবা ফেইসবুকেই মা´র ছবি নেই, তারা মা কে ভালবাসে না´´- এরকম ভাবনার কাছাকাছি চিন্তা করাও পাগলের লক্ষণ বলেই মনে করি!)

লেখাটিতে মা দিবস উদযাপনের নেতিবাচক দিকটাকে বড় করে তুলতে চাই নি। তাছাড়া দুদিন আগেও এই ঘটনাটি জানাছিল না। পড়ার সময় মনে হলো আরো কারো কাছে ইন্টারেস্টিং লাগতে পারে। তাই নিজের অনুভুতি সহ ছোট করে লিখে ফেললাম। জার্ভিসের মা দিবস বর্জনের ঘটনাটি দিয়ে মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি যে এই উদযাপনের পেছনে প্রথম থেকেই অনেকের ব্যবসায়িক মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার ধান্ধাও ছিল।

ধন্যবাদ পড়ে মন্তব্য করার জন্যে।

অতিথি লেখক এর ছবি

আমি কিন্তু আপনার লেখা পড়ে একবারও এটা মনে করিনি যে আপনি নেতিবাচকতাটাকে বড় করে দেখালেন। বরং আমি আপনার সাথে একমত। আমি সম্পূরক কথা বলেছি আর কি। হাসি

ছাইপাঁশ  এর ছবি

আমারতো ধারণা কেউই লোক দেখানোর জন্যে মার ছবি প্রোফাইল পিকচার করে না! সবাই ভালবাসা থেকেই করে। (আর ´যাদের প্রোফাইল পিকে কিংবা ফেইসবুকেই মার ছবি নেই, তারা মা কে ভালবাসে না´ এরকম ভাবনার কাছাকাছি চিন্তা করাও পাগলের লক্ষণ বলেই মনে করি!)

লেখাটিতে মা দিবস উদযাপনের নেতিবাচক দিকটাকে বড় করে তুলতে চাই নি। তাছাড়া দুদিন আগেও এই ঘটনাটি জানাছিল না। পড়ার সময় মনে হলো আরো কারো কাছে ইন্টারেস্টিং লাগতে পারে। তাই নিজের অনুভুতি সহ ছোট করে লিখে ফেললাম। জার্ভিসের মা দিবস বর্জনের ঘটনাটি দিয়ে মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি যে এই উদযাপনের পেছনে প্রথম থেকেই অনেকের ব্যবসায়িক মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার ধান্ধাও ছিল।

ধন্যবাদ পড়ে মন্তব্য করার জন্যে।

অতিথি লেখক এর ছবি

নাহ আমার দ্বিমত নাই । মা দিবসের যুক্তিগুলো ঠিকই মনে হচ্ছে । যদিও আন্না জার্ভিসের শেষ আক্ষেপটা নিয়ে আপনার মতামতটা ঠিক পরিষ্কার মনে হল না ।

তালেব মাষ্টার

ছাইপাঁশ  এর ছবি

আনা জার্ভিসের আক্ষেপটা নিয়ে আমার আসলে তেমন কোনো শক্ত অবস্থান নেই।

কেবল মাত্র মা দিবস নিয়েই নয়; স্বাধীনতা দিবস, নারী দিবস, ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে ব্যবসার ধরন আনুযায়ী ব্যবসায়ী গণ বিভন্ন রকম বিপণন কার্যক্রম হাতে নিয়ে থাকে। উচিত হবে অন্তত ততটুকু সতর্ক থাকা যাতে কৃত্রিম আবেগী বিজ্ঞাপনে ডুবে না যাওয়া। শেষ বয়েসে জার্ভিসের মা দিবস বর্জনটা অনেকে হয়ত সেদিকটা ভাবাবে।

ধন্যবাদ তালেব মাষ্টার, পড়ে মন্তব্য করার জন্যে।

মাসুম আহমদ এর ছবি

মা দিবসের ইতিবৃত্ত জানা হল -

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।