অমিতাভকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ০১/০৩/২০২১ - ৭:১৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অমিতাভকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না

করবী মালাকার

অমিতাভকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকলে ভাবছে এই মানুষটির অনেককিছু করার ক্ষমতা আছে কিন্তু তার যে শারীরিক অক্ষমতা তাতে তার হারিয়ে যাবার ক্ষমতা তো নেই। কোন অপঘাত ঘটেছে এই ভাবনায় বাধ সাধছে অমিতাভের নিজ হাতের লেখার চিরকুট এবং সেটা রাখা ছিল তার বিছানার উপরে। তাই নানা আশংকা, অনিশ্চয়তা থাকলেও সবাই মোটামুটি সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাতে পেরেছে যে এটা অমিতাভের স্বেচ্ছা নির্বাসন।

আটত্রিশ বছর আগের এক সন্ধ্যা। ঘরময় আনন্দ। কিছু বেলুন উড়ছে। রঙিন চীন কাগজে কিছু ঝালর বানিয়ে দেয়ালে টাঙানো হয়েছে। সাথে ঝুলছে কিছু কাগজের শিকল। হাসপাতাল থেকে ছেলেকে নিয়ে মা যখন ঘরে ফিরল তখন দাদী মা-কে যে তাঁতের শাড়ী উপহার দিয়েছিল সেই শাড়ীটা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে ডাইনিং টেবিলে । টেবিলের উপর ফুলদানিতে ফুল সাজিয়ে ছোট ছোট কিছু ডেকোরেশন পিস রাখা হয়েছে। মা ঘরে যে কেক ও পায়েস করছে তা রেডি। দোকানে যে কেকের অর্ডার করা হয়েছে সেটাও চলে এসেছে। খুব বেশী অতিথী নয়। প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধুদের মধ্যে যাদের ঘরে বাচ্চা আছে তাদের কযেকজনকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। একটা পরিবারের আসার অপেক্ষা করা হচ্ছিল তারাও চলে এসেছে।

শুরু হল কেক কাটা অনুষ্ঠান। অমিতাভ, যার আজ প্রথম জন্মদিন এত লোক দেখে সে একটু ভরকে গেল। একটু কান্না করল। তবে মায়ের কোলে গিয়ে কান্না থামিয়ে বেশ খুশি খুশি মুডে কেক কাটল। বাচ্চাদের কলকাকলিতে ঘর মুখর। বড়রা চায়ে চুমুক দিয়ে গল্প করছে। হঠাৎ ঝুমুরের আব্বা আলতাফ সাহেব বললেন - ভাবী অমিতাভ কি এখন হাঁটে? মা জানালেন - না। অমিতাভের দাদী বললেন - "হাঁটবে কি ওতো এখনো দাঁড়াতেই পারে না। আমার কিন্তু ভাল ঠেকছে না। আমার নাতী সুস্থ আছে তো! গতবার জ্বর হবার পর থেকেই ওকে বেশ দুর্বল মনেহচ্ছে"। মায়ের মুখটা মুহূর্তে মলিন হয়ে উঠল। কবিতার মা বলল - না না খালাম্মা এত দুশ্চিন্তা করবেন না। অনেক বাচ্চাই একটু দেরীতে হাঁটতে শেখে। সবাই আবার গাল গল্পে ফিরে গেলেন। তবে মায়ের বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগল।

সারা দিনের ক্লান্তিতে মা ঘুমিয়ে গেলেন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে । তবে অনেক ভোরেই তার ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙতেই ছেলের পায়ে হাত বুলালেন মা। কেবল ঐটুকুই, আর কিছু ভাবলেন না। ফ্রেশ হয়ে কিচেনে ঢুকলেন। এক কাপ চা খেতে খেতে সবার জন্য নাস্তা বানালেন। অফিসে যাবার তাড়া আছে অমিতাভের আব্বার তবু নাস্তার টেবিলে বললেন - " আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। ছেলের আমার পায়ে কোন সমস্যা হয়নি তো"?অমিতাভের আব্বা হাসলেন-" তুমি মিছেই দুশ্চিন্তা করছ। দেখ ছেলে আমাদের কয়েকদিনের মধ্যেই হাঁটতে শিখবে"। কিন্তু না , ছেলে তিনমাস পরেও দাঁড়াতেই শিখল না। ডাক্তার দেখানো হল। নানা পরীক্ষার পর ডাক্তার বললেন- "ওর আসলে পলিও হয়েছিল। আপনারা বুঝতে পারেন নি। কেবল পা নয় ওর বাম দিকের সম্পূর্ণ অংশটিই অবশ। তবে ডান দিকটা সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। ওকে ডান অংশ দিয়ে সবকিছু করতে শেখান।

এক বুক কষ্ট নিয়ে বাবা মা অমিতাভকে বিশেষ যত্ন নিয়ে লালন করতে শুরু করলেন। তবে অচিরেই
বোঝা গেল ওর মাথা, কন্ঠ একদম সুস্থ। বুদ্ধিমত্তা যেন একটু বেশী রকম ধারালো। নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে, খুব ভালভাবে সবকিছু দেখে। তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হল। সত্যিই দেখা গেল অমিতাভ খুব বুদ্ধিমান। লেখাপড়ায় খুব ভাল করছে। বাবা মা চেহারায় একটু খুশি ঝিলিক দিল। যদিও মা প্রায়শই বিষণ্নতায় ভোগেন - এত বুদ্ধিমান ছেলে আমার, শারিরীক ভাবে সুস্থ হলে কত উজ্জ্বল হতে পারত। অমিতাভের ছোট চাচা যিনি সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করেন তারও দৃষ্টি পড়ল অমিতাভের দিকে। চাচার রুমে আছে মোটা মোটা বই। অমিতাভের অবাধ যাতায়ত চাচার রুমে।
খুব ভাল ভাল রেজাল্ট নিয়ে অমিতাভ বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তির দোর গোড়ায় পৌঁছাল। ভাল ছাত্র হিসেবে সকলেরই বিশ্বাস সে ভাল কোন বিষয়ে পড়ারই সুযোগ পাবে। কিন্তু অমিতাভের মন যেন অন্য কিছু চাইছে। চাচার বুক সেলফ থেকে ভারী ভারী বই নামিয়ে সে পড়ে । পাঠে খুব আনন্দ পায় যদিও কিন্তু পাঠ্য পুস্তক, পরীক্ষা, সনদ এইসব একাডেমিকে তার আগ্রহ নেই। মন বলছে অন্য কিছু চাই, অন্য কিছু করি। তবু সকলের আকাঙ্খা পূরণের জন্য সে অর্থনীতিতে ভর্তি হল। অর্থনীতি পড়তে তার খারাপ লাগছে না তবু মনেহচ্ছে তার - অন্য কিছু করি, অন্য কিছু ভাবি, অন্য কিছু দেখি। "সৃষ্টি সুখের উল্লাসে" মাতি।

অমিতাভ ক্লাস করে খুব কম। সে আকাশ দেখে, ফুলে ফুলে প্রজাপতির ঘুরে বেড়ানো দেখে। আর দেখে মানুষ। পরিচিত, অপরিচিত সকল মানুষকে সে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কত বিচিত্র মানুষ। আবার একই মানুষের মধ্যে কত বিচিত্র আচরণ। তার সময় বেশী কাটে চাচার কক্ষে। বই পড়ে আর ডিভিডিতে সিনেমা দেখে। সিনেমা দেখে সে খুব মজা পায়। সিনেমার কাহিনী নয় সিনেমার নির্মাণ শৈলী তাকে বেশী আকর্ষণ করে। ঋত্বিক ঘটক,সত্যজিৎ রায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, জহির রায়হান, আলমগীর কবির, Vittorio De Sica, William Wyler প্রমুখ পরিচালকের কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। "দাদা আমি বাঁচতে চাই" সুপ্রিয়ার এই দৃশ্য সে শতবার দেখেছে। সেইসঙ্গে সে ভীষণ ভালবাসে কবিতা পড়তে।

একদিন ধাম করে অমিতাভ ঘোষণা দিল আমি আর পড়ব না। আমি সিনেমা বানাব। বাবার কপালে চিন্তার রেখা দেখা দিল। দাদী বলছেন "দাদুভাই কি পাগলামি করছ "। মা আর্ত চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। বললেন- "তোর এই শারিরীক প্রতিবন্ধকতায় তুই সিনেমা করার মত কাজ কিভাবে করবি। আমি তো ভেবেছি তুই প্রফেসর হবি"।কেবল অমিতাভের চাচা বললেন তোমরা শান্ত হও। আমি ওর সাথে কথা বলব। এরপরে বেশ কিছুদিন ধরে চাচা ভাতিজার কথা চলতে থাকল। চাচা অভিভূত ভাতিজার জ্ঞানে। অনেক বিষয়েই তার অনেক জ্ঞান। তবে সিনেমা বিষয়ে সে বলা যায় একাডেমিক জ্ঞান রাখে। ইতিমধ্যেই সে বাংলা ও অন্যান্য ভাষার প্রচুর সিনেমা দেখে ফেলেছে। সিনেমাগুলোর নির্মাণ শৈলীর বিশ্লেষণে চাচা অভিভূত। চাচা বুঝলেন অমিতাভের চলচিত্র তৈরী করতে পারবে। তিনি অমিতাভের মায়ের নামে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা চেক লিখে দিলেন। ভাবীকে বললেন-" টাকাটা অমিতাভের জন্য। ওর কাজের জন্য যখন লাগবে তখন ওকে দিও"। অমিতাভের চাচা বিশ্বাস রাখলেন ভাতিজার উপর। এই ছেলে একদিন চলচিত্র নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের নাম উজ্জ্বল করবে। রাজনীতি করা চাচার কাছে দেশের ভাবনাই সব আগে প্রাধান্য পায়।

চাচার উৎসাহে শুরু হলো অমিতাভের কর্মযজ্ঞ । কিছু সম বয়সী বন্ধু, কিছু সিনিয়র বন্ধুর সঙ্গে আলাপ চলতে থাকল। যদিও অনেকের মনেই ভাবনা হুইল চেয়ারে বসা এই অচল মানুষটি কি পারবে! যদিও তার জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা যে কেবল সচল নয় প্রবল গতিময় সে বিষয়টা ইতিমধ্যেই স্পট। অমিতাভ ধাপে ধাপে এগুতে থাকলেন। প্রথমে ইউটিউবে কিছু ক্লিপ, পরে কিছু বিজ্ঞাপন, কিছু টেলিভিশনের নাটক বানালেন। অমিতাভের নাম ছড়িয়ে পড়ল । তারপরে এলো আসল কাজ। অমিতাভ একটা আস্ত সিনেমা বানিয়ে ফেললেন। সিনেমা নির্মাণে, বাণিজ্যে, প্রচারে আধুনিক এপ্রোচে অমিতাভ স্পেসিফিক জ্ঞান রাখেন। এই জ্ঞান প্রয়োগে সাড়া পড়ে গেল অমিতাভের সিনেমার। হল বিমুখ দর্শক রীতিমত লাইন ধরে টিকিট কেটে হলে ঢুকুল। সন্তুষ্ট হলো সকল বয়সের দর্শক, সিনেমা ক্রিটিক। ওয়েস্টার্ন মুভিতে যারা নিমগ্ন তারাও খুশি। বেশ কিছু প্রডিউসার এগিয়ে আসল বিনিয়গের প্রস্তাব নিয়ে। অমিতাভ তাড়াহুড়োয় যেতে ইচ্ছুক নন। দ্বিতীয় সিনেমা করার জন্য তিনি সময় নিলেন। তবে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেল বর্তমানকালের প্রবাহ - টকশো, সাক্ষাৎকার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অমিতাভকে নিয়ে আসার চাপ। অমিতাভের যেহেতু সিনেমা নিয়ে অনেক কথা বলারও আছে, বিশেষ করে দেশের এই শিল্পকে সমৃদ্ধ করার তাই তিনিও এসবে যোগ দিতে বিশেষ আপত্তি করলেন না। কিন্তু ক্রমশই অমিতাভ অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি ঠিক ভাবে তার কথাগুলি পৌঁছাতেই পারছেন না। তার দর্শনের গভীরতায় কেউ যেতে চাইছে না অথবা যেতে পারছে না। সবারই খুব শ্যালো ভাবনা। শ্যালো অবস্থানে বিচরণ। সকলে অমিতাভকে তাদের অবস্থানে নিয়ে এসে বাজিমাত করতে বলছেন। অমিতাভ অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি কেবল বাজিমাত করা সিনেমা উপহার দিতে চাইছেন না। তিনি চাইছেন তার নিজ দেশে এই শিল্প সমৃদ্ধ হোক ঐতিহ্যে, আধুনিকতায়, রুচিশীলতায়, ভাবনার উচ্চতায়। কিন্তু এদেশের মানুষ এত গভীরে প্রবেশের প্রজ্ঞায় যেন নেই। অমিতাভ হতাশ। দেশের বাইরে গিয়ে কিছু করার ভাবনা অমিতাভের নেই। চাচার কাছে থেকে পাওয়া রাজনৈতিক ভাবনা তাকে দেশের জন্যই ভাবতে শিখিয়েছে। তার ভাবনার সাথে যেতে পারছেন না অথচ কাজ করার, কথা বলার চাপ ক্রমশই বাড়ছে। অমিতাভের অস্থিরতা ক্রমশ বেড়ে প্রায় পাগলামির পর্যায়ে চলে গেল। এমন পাগল হয়েই অমিতাভ চিরকুট লিখলেন - আমি স্বেচ্ছা নির্বাসনে গেলাম।

অমিতাভকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। অমিতাভের অন্তর্ধানের গল্পটি যেন সুবাস বোসের অন্তর্ধানের গল্পটির মতই হয়ে থাকল।


মন্তব্য

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।