যৌথবাহিনীকাহিনী

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: শনি, ১৪/০৭/২০০৭ - ১১:০৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

উঁহু, আমাকে এখনও তাঁরা কারণে বা অকারণে পাকড়াও করেননি। মাঝে মাঝে অফিসে যাবার পথে রাস্তায় নামিয়ে ভুরু কুঁচকে আগাপাস্তলা দেখে অবশ্য ড়্যাবের সদস্যরা নানা প্রশ্ন করেন। তাঁদের কেউ কেউ বিনয়ের অবতার, সালাম দিয়ে বিনম্র কণ্ঠে প্রশ্ন করেন কী করি না করি; কেউ শুরুতেই ধরে নেন আমি বনসংরক্ষক বা হাওয়াভবনেরপান্ডা, কর্কশ রুক্ষ গলায় জানতে চান কী করা হয়। আমি ঘুম ঘুম গলায় ঘাম মুছতে মুছতে সদুত্তর দিয়ে তাঁদের সন্তুষ্ট করতে চাই, তাঁরা রোষকষায়িতলোচনে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ইশারা করেন আবার বাহনারোহণের, তারপর পরের আটককৃত বাহনের যাত্রীকে হুহুঙ্কারে শঙ্কিত করে তোলেন।

আমার বন্ধুদের সাথে দীর্ঘদিন পর সেদিন আড্ডা হলো, একজন জানালো যৌথবাহিনী তাকে আরেকটু হলেই পাকড়াও করে ফেলেছিলো আর কি। আমরা জানতে চাইলাম, এর মানে কী, যৌথবাহিনী তাকে কেন তাড়া করলো? তারপর সে জানায় এক আজব কাহিনী।

আমার সেই বন্ধু, ধরা যাক তার নাম তারেক, সে চাকরি করে এক কুখ্যাত লোকের গৃহনির্মাণ সংস্থায়। একদিন সে দুপুরে পেটপুরে ভাত খেয়ে বাইরে একটু ধোঁয়া টানার জন্য নিচে নামে, দেখতে পায় বাইরের দরজায় দারোয়ান তালা মেরে দন্ডায়মান। সে হেঁকে ওঠে, "অ্যাই দরজা খোলো।"

দারোয়ান জানায়, "না স্যার, স্যারের হুকুম, দরজা খোলন যাইবো না।"

তারেক আরো হেঁকে ওঠে, "আরে বলে কী? সিগারেট খাবো, দরওয়াজা খোলো!" রীতিমতো উর্দু উর্দু ভাব এনে, দরওয়াজা ...।

দরওয়ান দরওয়াজা খোলার আগেই বাইরে থেকে দরজার ফোঁকর দিয়ে উঁকি দেয় এক মুখ। "ভাই, দরজাটা খোলেন না একটু, ভেতরে আসবো।"

তারেক বলে, "কে, কে আপনি?"

এবার সেই মুখ বলে, "এত কথার কী আছে ভাই? ম্যানেজারের কাছে যাবো, দরজাটা খোলেন।"

তারেক বলে, "উঁহু, আপনি ওনাকে ফোন করেন।"

মুখটা বলে, "আরে ভাই দরজা খোলেন।"

তারেক হেঁকে ওঠে, "অ্যাই দরওয়াজা খুইলো না।"

এমন সময় বাইরে একটা গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নামেন দুই স্বাস্থ্যবান মানুষ, একজন টাই পরা, আরেকজন টাই ছাড়া। দু'জনেরই কেশ ফৌজি ঢঙে ছাঁটা। টাইধারী বলেন, "ভাই দরজাটা একটু খুলুন তো।"

তারেক বলে, "দরজা তো খোলা যাবে না।"

টাইধারী কথা বেশি বাড়ান না, বলেন, "কেন যাবে না ভাই?" বলতে বলতেই সেই ফোকর দিয়ে খপ করে তারেকের হাত পাকড়ে ধরেন। তারেক ঘাবড়ে গিয়ে আঁচড়েকামড়ে সেই হাত ছাড়িয়ে নেয়।

ও মা, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে দ্যাখে, টাইহারা সেই অপর ভদ্রলোক, যে কি না রীতিমতো ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা, সে দেয়াল বেয়ে ওঠা শুরু করেছে! তারেকের মনে হয়, আজ আর তার রক্ষা নাই! দরওয়ান এবার তার হাত চেপে ধরে, ব্যাকুল কণ্ঠে বলে, "স্যার স্যার স্যার কী করুম স্যার?"

টাইধারী বিরক্ত হন। বলেন, "অ্যাই তুমি সিনক্রিয়েট করো না তো। নামো দেয়াল থেকে, নামো! ওনারা এমনিতেই দরজা খুলে দেবেন।" বলতে বলতে আবার সে ফোকর গলিয়ে হাত বাড়ায়, দরওয়ানের কলারখানা চেপে ধরে সাপটে, তারপর নিজের দিকে সজোরে টানে। দরওয়াজায় বাড়ি খেয়ে দরওয়ানের মুখ থেঁতলে যায়, সে প্রায় অচেতন হয়ে ঝুলতে থাকে টাইধারীর হাতে, তার হাতে ধরা চাবিটা নিয়ে তালা খুলে টাইধারী ধীরেসুস্থে ভেতরে ঢোকেন। তারপর তারেকের বাহু পাকড়াও করে বলে, "আসুন দেখি আমার সাথে। কথা কম।"

তারেক ভেজা বেড়ালের মতো আবার উঠতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে। অফিসের বেয়াড়া বেয়ারাটা হাসিমুখে এসে জিজ্ঞেস করে, "কী ব্যাপার স্যার?"

অমনি বিকট এক চড় তার গালে। সে চোখ মিটমিট করে কোনমতে বলে, "মারেন ক্যান?"

এবার বিকট এক লাথি। তারপর মোটামুটি তান্ডব বয়ে যায়। অফিসের লোকজন একেবারে অ্যাটেনশন হয়ে থাকে।

ম্যানেজার নিখোঁজ। তারেকের কিউবিকল ম্যানেজারের রুমে যাবার পথেই পড়ে। টাইধারী তারেককে শুধান, "আপনি জানেন না উনি কখন বেরিয়ে গেলো? দেখেন নাই?"

তারেক দেখে নাই তার ম্যানেজারকে, সে মাথা নাড়ে। টাইধারী এবার ক্ষেপে ওঠে। বলে, "আপনি কিন্তু সহযোগিতা করছেন না। এর পরিণতিও বুঝতে পারছেন না। চিন্তা করতে থাকেন।"

তারপর তাঁরা, মানে টাইধারী আর টাইহারা, পাকড়াও করেন আরো উঁচু হর্তাকর্তাদের। একজনই উপস্থিত ছিলেন, এককালের সচিব, এখন পরামর্শদাতা, তিনি কিছু আমলাতান্ত্রিক বোলচাল ঝাড়েন। টাইধারী বিনয়ের সাথে বলেন, "স্যার, আসলে আমরা এখানে আমাদের কাজ ঠিকমতো করছি না। কোথাও গিয়ে আমরা প্রথমেই পাঁচ মিনিট করে পিটাই সবাইকে। আপনাকে কিন্তু স্যার মিনিট পাঁচেক পিটালে আপনি গড়গড়িয়ে সব বলে দিতেন, ঐ লোক কোথায় কখন গেছে, সঅব।"

আমরা রুদ্ধশ্বাসে শুনি, বলি, তারপর?

তারেক বলে, তারপর আর কী? নামধাম লিখে নিয়ে গেলো। ভয়ে ভয়ে আছি। চাকরি ছেড়ে দেবো ভাবছি। গ্যানজাইমা লোকের চাকরি করে শেষে বেহুদা মাইর খেয়ে মরি আর কি!

এই গল্পের সকল চরিত্র কাল্পনিক, আমি বাদে। কারণ আমি কাল্পনিক হলে কল্পনাটা করলাম কখন?


মন্তব্য

সৌরভ এর ছবি

আপনার সমস্যাটা কী, শুনি।
আপনাকে মাঝেসাঝেই ঢ়্যাবে ধরে কেনো?

চেহারায় একটা আকর্ণবিস্তৃত স্মাইল নিয়ে আসেন, ঢ়্যাব দেখলেই ঢ্যাব ঢ্যাব করে হাসতে থাকবেন।


আবার লিখবো হয়তো কোন দিন

হিমু এর ছবি

আমি খুব নিরীহদর্শন। দেখেই বোঝা যায় আমাকে দিয়ে কোন পাপতাপ হবে না। এ জন্যই ধরে।


হাঁটুপানির জলদস্যু

শোহেইল মতাহির চৌধুরী এর ছবি

এই দর্শনের আগে নাম শুনি নাই। নিরীহদর্শন।
একটু বয়ান করেন। এই দর্শনের সাথে ঢ়্যাবের বিরোধ কোথায়?
-----------------------------------------------
সচল থাকুন ---- সচল রাখুন

-----------------------------------------------
মানুষ যদি উভলিঙ্গ প্রাণী হতো, তবে তার কবিতা লেখবার দরকার হতো না

নজমুল আলবাব এর ছবি

আমার কিন্তু কল্পনা না! বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে

সুমন চৌধুরী এর ছবি

কন কি! সেই কাহিনি শুন্তে চাই...
.......................................
ঋণম্ কৃত্বাহ ঘৃতম্ পীবেৎ যাবৎ জীবেৎ সুখম্ জীবেৎ

তারেক এর ছবি

আল্লাহ বাচাইসে আমারে... আর নাম পান নাই খুঁজে? মন খারাপ
_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে

_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে

হাসান মোরশেদ এর ছবি

পানি পড়া খাওয়া আর দোয়াদরুদ আবশ্যক । লক্ষন সুবিধার না । আল্লাহ বাঁচানেওয়ালা
-----------------------------------
'পড়ে রইলাম বিধির বামে,ভুল হলো মোর মুল সাধনে'

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

এস এম মাহবুব মুর্শেদ এর ছবি

দেঁতো হাসি
====
চিত্ত থাকুক সমুন্নত, উচ্চ থাকুক শির

কেমিকেল আলী এর ছবি

জটিল লিখেছেন বস!!!!!
আরও চাই
আরও চাই!!!!!!!!!!!
সাথে কিন্তু বিপ্লব!

শামীম এর ছবি

স্যার, আসলে আমরা এখানে আমাদের কাজ ঠিকমতো করছি না। কোথাও গিয়ে আমরা প্রথমেই পাঁচ মিনিট করে ...

খাইছে ... ...
________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।

________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।

দ্রোহী এর ছবি

হায়, নিজের মাইর খাওয়ার গল্প আরেকজনের নামে চালাইয়া দিলো!!!


কি মাঝি? ডরাইলা?

আরিফ জেবতিক এর ছবি

জামাতি কোন মৌলানার কাছ থাইকা তাবিজ নেন।
জামাতি তাবিজ থাকলে যৌথবাহিনীর বালা মুসিবত থাইকা নিরাপদে থাকন যায়।
শত শত উদাহরন দেখা যাইতেছে।

-----------------------------------
কিস্তিমাতের যুদ্ধ শেষে,সাদাকালো ঘুটিগুলো এক বাক্সেই ফেরত যাবে...

ঝরাপাতা এর ছবি

দেশে গেলে প্রথমেই যৌথবাহিনীর সার্টিফিকেট নিতে হবে দেখছি। কিন্তু কি করে সেটা পাওয়া যায় বলুন তো।
_______________________________________
রোদ্দুরেই শুধু জন্মাবে বিদ্রোহ, যুক্তিতে নির্মিত হবে সমকাল।


বিকিয়ে যাওয়া মানুষ তুমি, আসল মানুষ চিনে নাও
আসল মানুষ ধরবে সে হাত, যদি হাত বাড়িয়ে দাও।

সাইফ তাহসিন এর ছবি

দেশে থাকতে কখনও মামু ধরত না, কিন্তা আম্রিকা আসনের পরথিকা কয়দিন পরপর ধরে, কিছু ভালু লাগে না

=================================
বাংলাদেশই আমার ভূ-স্বর্গ, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী

=================================
বাংলাদেশই আমার ভূ-স্বর্গ, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।