বিচিত্র একক

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: রবি, ১৪/০৫/২০১৭ - ১:১৩পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে বসে বারবার অানমনা হয়ে পড়ছিলেন দিলদরাজ সোনাচৌধুরী, রেপন জুয়েলার্সের প্রতাপশালী মালিক।

এজলাসে হাকিম মহোদয় এখনও আসেননি, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছেলেটা একটু পরপর সঙ্গী কাঠগড়ির সঙ্গে কী নিয়ে যেন তামাশা উড়িয়ে খিখি করে হাসছে, পাশে বসে ছেলের মা চোখে আঁচল চেপে ফোঁপাচ্ছেন, কিন্তু দিলদরাজ সোনাচৌধুরী পাত্তা দিচ্ছেন না সেসবে। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছিলো মানুষের ভাষায় মাপভেদে শব্দবৈচিত্র্যের কথা। যার খাবলা ছোটো, তার জন্যে আছে হরেক রকম বিচিত্রনামা একক। খাবলা যার বড়, তার বেলায় আবার আরেক পদের এককমালা।

পানির কথাই ধরা যাক। টাইট্রেশনের সময় লোকে পিপেটে-বিকারে মিলিলিটারের দাগের দিকে চোখ রাখে। কিন্তু হুইস্কির সাথে মেশানোর সময় আবার আঙুলের হিসাব। বোতলে প্যাকেজ করা পানি কিনতে গেলে আধলিটার-একলিটার-দুইলিটারের প্রসঙ্গ চলে আসে। আর্সেনিকপীড়িত গ্রামে বা চিংড়িঘেরাক্রান্ত অঞ্চলে আবার মিঠাপানির দোর্দণ্ডপ্রতাপ মালিকের কাছে গিয়ে ঠিল্লা বা গ্যালনের হিসাবে পানি আনতে হয়। বস্তির লোক মাঝেমধ্যে নিরুপায় হয়ে ওয়াসার পানি কেনে ট্যাঙ্কার দরে।

কিন্তু ওয়াসার লোকে পানি মাপে হাজার ঘনমিটারে। আর মমতা ব্যানার্জি কিউসেকের কমে কোনো কিছুই বোঝেন না।

ছেলেটা কাঠগড়া থেকে ঘ্যাঁঘ্যাঁ করে ওঠে, "আব্বা, পানি খামু।" পাশে বসা বৌটা ডুকরে ওঠে, "খোকা!"

দিলদরাজ সোনাচৌধুরী পেছনে বসে থাকা ষণ্ডা চামচাকে ইশারা করেন, সে ব্যাগ থেকে একটা ইভিয়ানের বোতল বের করে উঠে যায়। দিলদরাজ সোনাচৌধুরী স্ত্রীর কান্নায় কান না দিয়ে পানি ফেলে ভাবতে থাকেন ক্ষেত্রফলের কথা। স্কুলে এক বেঞ্চে পাঁচজন ঠাসাঠাসি করে বসতে হতো তাঁকে, পাশে বসা মোটকা সহপাঠী মোফাজ্জল দু'পাশে দুই কনুই বাগিয়ে বলতো, "এই দুই কনি জায়গা আমার, তরা চাইপ্যা বয়!" চেপে বসতে রাজি না হলে মোফাজ্জলের সুতীক্ষ্ন কনুই পাঁজরে এসে বিঁধতো। বহু ক্লাসে একটি নিতম্ব শূন্যে রেখে অপরটির ওপর ভর করে লেখাপড়া করতে হয়েছে দিলদরাজ সাহেবকে। সেজন্যেই হয়তো শিক্ষার সূক্ষ্ম ব্যাপারস্যাপারগুলো কখনও তাঁর মরমে পশেনি। এক পাছা বাতাসে ভাসিয়ে কতোটুকু শিক্ষাই বা অর্জন করা যায়?

মাথা ঝাঁকিয়ে মোফাজ্জলের কনুইয়ের তিক্ত স্বাদের স্মৃতি পাঁজর থেকে সরিয়ে দিলদরাজ সোনাচৌধুরী ভাবেন ক্ষেত্রফলের কথা। সামান্তরিক, বৃত্ত, বর্গক্ষেত্র, ত্রিভূজ, ট্রাপিজিয়াম, অনেক কিছুই শিখেছিলেন। কিছুই মনে নেই এখন। কাদের কাজে লাগে ওসব? ক্ষেত্রফল মেপে কে কয়শ কোটি টাকা কামিয়েছে জীবনে? মোফাজ্জলের কনুইয়ের পর তিনি শিখেছেন গজের হিসাব, যখন ঈদের সালামি জমিয়ে শখ করে একটা কাবুলি ড্রেস বানাতে গিয়েছিলেন। কাপড়ের মাপ গজে, কাঠের মাপ ঘনফুটে, জমির মাপ পাখি-কানি-শতাংশে। খুব গোলমেলে। তবে এ সবই আমলোকের মাপ। ডেভেলপাররা জমি কেনার সময় কাঠা-বিঘা আর বেচার সময় বর্গফুটে মাপে।

কিন্তু ভূমিদস্যু মাপে একরে।

হাকিম ঘরে ঢুকতেই সবাই হাঁচড়-পাঁচড় করে উঠে দাঁড়ায়, ক'দিন আগে ভাড়া করা উকিলেরা একযোগে শোরগোল করে ওঠে, "মাই লর্ড, সব আমাদের মক্কেলের ডিভোর্সি স্ত্রীর ষড়যন্ত্র ধর্মাবতার...!" কিন্তু দিলদরাজ সোনাচৌধুরীর মাথায় শুধু এককের ছোটো-বড় খেলতে থাকে।

চালের কথাই ধরা যাক। পেটমোটা স্বাস্থ্যবায়ুগ্রস্ত লোকে চাল মাপে ক্যালরিতে। গরিবেরা মাপে মুঠিতে। আমলোকে কাপে মাপে। বাজারে গিয়ে লোকে চাল কেনে কেজি মাপে, ভাতের হোটেল মাপে মণে, পাইকার মাপে কুইন্টালে। কিন্তু দুর্গত এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মেট্রিক টনের কমে কিছু বোঝে না। শুধু তা-ই নয়, দুনিয়াটাকেই সে চালের টনে মাপে। নিজের মামাতো ভাইকে দিয়েই মনে মনে বিচার করেন দিলদরাজ সোনাচৌধুরী। বানভাসি এলাকার চেয়ারম্যান ছিলো সে। মেয়ের বিয়েতে লেহেঙ্গা কিনতে এসেছিলো ঢাকায়, মুখ ফসকে দোকানিকে শুধিয়ে বসেছে, "এইডা কয় টনে দিবাইন?"

কিন্তু হাস্কিং মিলের মালিক চাল মাপে গুদাম ধরে।

হাকিম ওকালৎনামা ঘেঁটে গম্ভীর কণ্ঠে শুনানি শুরু করেন। রাষ্ট্রপক্ষের উকিল কড়া গলায় দিলদরাজ সোনাচৌধুরীর ছেলের কুকর্মের খতিয়ান দিতে থাকেন। সে কী করেছে, কখন করেছে, কোথায় করেছে, কার সাথে করেছে, কেন করেছে, কীভাবে করেছে। আরে সোনারুর ছেলে সোনা চালিয়েছে, রাষ্ট্রের তাতে জ্বলে কেন? দিলদরাজ মনে মনে উত্তপ্ত হয়ে ওঠেন।

সোনার ক্ষেত্রেও তো সেই এককেরই খেল। গিল্টি করতে গেলে কারিগর গ্রেন ধরে সোনা মাপে, দোকানে গেলে খদ্দের মাপে ক্যারাট-গ্রাম নয় আনা-ভরি ধরে। ভদ্র জুয়েলার সোনা মাপে বিস্কুটে, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সোনা মাপে ইনগটে।

কিন্তু দিলদরাজ সোনাচৌধুরীর মতো ঝানু লোকেরা, যারা বছরের পর বছর ধরে সরকারের পর সরকারে কর্তার পর কর্তাকে খুশি রেখে চুটিয়ে সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেট চালিয়ে আসছে, তাদের সোনা মাপার এককটি বিচিত্র।

আসামী পক্ষের উকিলের যুক্তিতে সন্তুষ্ট হন না হাকিম, দিলদরাজের ছেলেটিকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠানোর হুকুম দেন তিনি। ছেলে ইভিয়ানের বোতল খালি করে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ওঠে। উকিলরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু কাজ হয় না। দিলদরাজ সোনাচৌধুরী চেয়ার ছেড়ে উঠে কাঠগড়ার কাছে গিয়ে নিচু গলায় বলেন, "কান্দিস না। কিচ্ছু হবে না তোর। আইন-কানুন-পুলিশ-সম্বাদিক-মানবাধিকার-বডিল্যাঙ্গুয়েজ-সিসিটিভি-সাক্ষী সবার মোকাবেলা হবে। ছয় পায়ুপথ সোনা অলরেডি খরচ করছি। আরও করুম।"


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

এই গল্পটির প্রেষণা যে ঘটনা থেকে সেই পার্টিকুলার ঘটনাটি একদিন মানুষ ভুলে যাবে, যেমনটি আরও দশটি ঘটনার ক্ষেত্রে হয়ে এসেছে; কিন্তু এই গল্পটি একটি বিশেষ ভূমির প্রচলিত ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে চিরায়ত রূপ পেয়ে গেছে। pun-fun-satire মিলিয়ে অসাধারণ ভারসাম্য। সমাজ বা রাষ্ট্র কখনো ইউটোপিয়া পর্যায়ে চলে যাবে না, তাই দিলদরাজ সোনাচৌধুরী এবং তার উচ্ছিষ্টভোগীরা এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপেই থাকবে। তার সোনার ছেলের মতো ছেলেরা এমন কুকর্ম কেবল করেই যাবে। অনুকম্পা প্রদর্শনের অধিকারী যারা তারা যথাযোগ্য ক্ষেত্রে অনুকম্পা প্রদর্শন করেই যাবে।

পুনশ্চঃ গল্পের শুরু থেকে নানা প্রকার এককের আগমনে পড়া যত এগিয়েছে ততই চিন্তা হয়েছে 'সোনা মাপার' চূড়ান্ত এককটি কী হবে! শেষের ট্যুইস্ট আমার চিন্তার সীমারেখা ছাড়িয়ে গেছে। পুরাই ধ্বংস!!

হিমু এর ছবি

কে জানে, সামনে কয়েকটা দিন হয়তো বিমানবন্দরগুলোতে "পুটুন সোনা" ধরা পড়ার হার কমে যাবে। সো মেনি হাংরি মাউথস টু ফিড।

অতিথি লেখক এর ছবি

হাততালি হাততালি হাততালি

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী

সাহেদ এর ছবি

হা হা হা। খুব ভাল লাগল পড়ে। হো হো হো

অতিথি লেখক এর ছবি

হাকিম ওকালৎনামা ঘেঁটে গম্ভীর কণ্ঠে শুনানি শুরু করেন।

ওকালৎনামা নয়। কথা টা হবে নথি। ওকালৎনামা হচ্ছে পাওয়ার অফ এটর্নি, যার মাধ্যমে একজন অ্যাডভোকেট কে মামলা পরিচালনার ক্ষমতা দেয়া দেয়া। নথি হচ্ছে মামলা সংক্রান্ত কাগজ পত্র, যেমন দরখাস্ত, আদেশ, আরজি ইত্যাদি।

হিমু এর ছবি

ধন্যবাদ। কিন্তু হাকিম কি শুরুতেই ওকালৎনামা যাচাই করে দেখেন না, যে যেসব আইনজীবী আদালতে আসামীর প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা আসলেই সেটা করার অধিকার রাখেন কি না?

অতিথি লেখক এর ছবি

দেখেন যদি আইনজীবী নতুন মুখ হন। তাও সব সময় দেখেন না। সিনিয়র আইনজীবী হলে সাধারণত দেখেন না। দিলদরাজ "ছয় পায়ুপথ সোনা" তো আর জুনিয়র আইনজীবীর পিছনে খরচ করবেন না! সিনিয়র আইনজীবী নিয়োগ করাটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া, বিচারকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মামলার নথি পত্র আগে দেখেন, ওকালৎনামা নয়।

ওকালৎনামা হচ্ছে এক পৃষ্ঠার একটা কাগজ। সে কারণে, আমার মতে, "ঘেঁটে" শব্দটা "ওকালৎনামা"-র সাথে ঠিক লাগসই হয় না। বরং "দেখে" বা "যাচাই" টা মানানসই হয়। "ঘেঁটে" শব্দটা বরং "নথি-র" সাথে যায়; কারণ নথি ঘেঁটে তথ্য বের করতে হয়। যাই হোক, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। লেখক হিসাবে আপনার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে।

হিমু এর ছবি

আপনার যুক্তিই সঠিক। নতুন একটা জিনিস শিখলাম, অনেক ধন্যবাদ।

সুবোধ অবোধ এর ছবি

পাঞ্চ লাইন অসাধারণ।

সোহেল ইমাম এর ছবি

হাততালি

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

আল্লায় বাঁচাইছে! সোনার গয়না পড়া লাগে না, বউও পড়ে না।

ঈয়াসীন এর ছবি

"ছয় পায়ুপথ সোনা"---- ধ্বংস

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

আয়নামতি এর ছবি

এক বৈঠকে এতসব মাপের একক সম্পর্কে জানতে পারাটা দারুণস্য দারুণ! তুখোড় গল্পে উত্তম জাঝা!

দেবদ্যুতি এর ছবি

এই এককের কথাটা জানলাম মাত্র। উত্তম জাঝা!

...............................................................
“আকাশে তো আমি রাখি নাই মোর উড়িবার ইতিহাস”

অতিথি লেখক এর ছবি

পায়ুপথ কথাটা সাধারণত চিকিৎসাবিজ্ঞান বা শরীরসংস্থানগত শব্দ হিসেবে বেশী ব্যবহৃত হয়। আমার ধারণা যারা সোনা চোরাচালান পেশায় যুক্ত আছেন তাঁরা "পায়ুপথ"এর বদলে আরও মৌখিকভাবে চলিত শব্দ যেমন "গোয়া (বা গুয়া)", "হোগা" বা "পুটকি" ইত্যাদি প্রয়োগে বেশী অভ্যস্ত হবেন। যদিও শব্দগুলো শরীরসংস্থানগতভাবে পায়ুপথের সমার্থক নয় (বরং এগুলো দিয়ে পায়ুপথের শেষপ্রান্ত বা মলদ্বার কে বুঝানো হয়), কিন্তু আমরা ধরে নিতে পারি দিলদরাজ সোনাচৌধুরীরা চলিত শব্দ ব্যবহারেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। দূর্ভাগ্যবশতভাবে পায়ুপথের শরীরসংস্থানগতভাবে সঠিক সমার্থক চলিত শব্দ বাংলায় নেই।

যেমন, দিলদরাজ সোনাচৌধুরী একদিন তাঁর সহকারী সোরাচালানকারী ছাইদুল কে ফোনে ধমক দিয়ে বলছেন -

"হালা খানকির পো তুই কইছিলি এবারের লটে নাকি ৫ পায়ুপথ মাল সাপ্লাই হইবো, আর তুই অহন কইতাছস একজনের নাকি পায়ুপথে ব্যথা, এই মাসে তুই দিলি সাড়ে ৪ পায়ুপথ, এমনে হইলে ব্যবসাপাত্তি চলবো ক্যামনে? ট্যাকা কি বলদের পায়ুপথ দিয়া আহে?"

আপনি নিজেই পড়ে দেখুন এরকম কথপোকথন ঠিক বাস্তবিক নয়, কিন্তু এবার নীচের উদাহরণ দেখুন -

"হালা খানকির পো তুই কইছিলি এবারের লটে নাকি ৫ গুয়া মাল সাপ্লাই হইবো, আর তুই অহন কইতাছস একজনের নাকি গুয়াত ব্যথা, এই মাসে তুই মাল সাপ্লাই দিলি সাড়ে ৪ গুয়া, এমনে হইলে ব্যবসাপাত্তি চলবো ক্যামনে? ট্যাকা কি বলদের গুয়া দিয়া আহে?"

এখন আপনি নিজেই চিন্তা করে বলুন আমার কথা ঠিক কিনা?

হিমু এর ছবি

কেউ বলে কিলোগ্রাম, কেউ বলে কেজি। ছাইদুল সেজ পটেইটো দিলদরাজ সেজ পোটাটো।

কনফুসিয়াস এর ছবি

গড়াগড়ি দিয়া হাসি

-----------------------------------
বইদ্বীপ ডট কম

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA